শ্লোক – ১৩

ততঃ শঙ্খাশ্চ ভের্যশ্চ পণবানকগোমুখাঃ।

সহসৈবাভ্যহন্যন্ত স শব্দস্তুমুলোহভবৎ ।। ১৩ ।।

ততঃ- তারপর; শঙ্খাঃ- শঙ্খসমূহ; চ- ও; ভের্যঃ- ভেরীসমূহ; চ- এবং; পণবআনক- পণব ও আনক ঢাক; গোমুখাঃ- গোমুখ শিঙ্গা; সহসা- হঠাৎ; এব- অবশ্যই; অভ্যহন্যন্ত- একসঙ্গে বাজতে লাগল; সঃ- সেই; শব্দঃ- মিলিত শব্দ; তুমুলঃ- তুমুল; অভবৎ- হয়েছিল।

গীতার গান

শুনি সেই শত্রুরব যত শঙ্খ ভেরী।

গোমুখ পণবানক বাজিল সত্বরী।।

সহসা উঠিল সেই রণের ঝঙ্কার।

তুমুল হইল শব্দ বহুল অপার।।

অনুবাদঃ তারপর শঙ্খ, ভেরী, পণব, আনক, ঢাক ও গোমুখ শিঙ্গাসমূহ হঠাৎ একত্রে ধ্বনিত হয়ে এক তুমুল শব্দের সৃষ্টি হল।

শ্লোক – ১৪

ততঃ শ্বেতৈরহয়ৈর্যুক্তে মহতি স্যন্দনে স্থিতৌ।

মাধবঃ পান্ডবশ্চৈব দিব্যৌ শঙ্খৌ প্রদধ্মতুঃ ।। ১৪ ।।

ততঃ- তখন; শ্বেতৈঃ- শ্বেত; হয়ৈঃ- অশ্বগণ; যুক্তে- যুক্ত হয়ে; মহতি- মহান; স্যন্দনে- রথ; স্থিতৌ- অবস্থিত হয়ে; মাধবঃ- শ্রীকৃষ্ণ (লক্ষ্মীর পতি); পান্ডবঃ- অর্জুন (পান্ডুর পুত্র); চ- ও; এব- অবশ্যই; দিব্যৌ- অপ্রাকৃত; শঙ্খৌ- শঙ্খগুলি; প্রদধ্মতুঃ- বাজালেন।

গীতার গান

তারপর শ্বেত অশ্ব রথেতে বসিয়া।

আসিল যে মহাযুদ্ধে নিযুক্ত হইয়া।।

মাধব আর পান্ডব দিব্য শঙ্খ ধরি।

বাজাইল পরে পরে অপূর্ব মাধুরী।।

 অনুবাদঃ অন্য দিকে, শ্বেত অশ্বযুক্ত এক দিব্য রথে স্থিত শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন উভয়ে তাঁদের দিব্য শঙ্খ বাজালেন।

তাৎপর্যঃ ভীষ্মদেবের শঙ্খের সঙ্গে বৈসাদৃশ্য দেখিয়ে শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের শঙ্খকে ‘দিব্য’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই দিব্য শঙ্খধ্বনি ঘোষণা করল যে, কুরুপক্ষের যুদ্ধজয়ের কোন আশাই নেই, কারণ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পান্ডব-পক্ষে যোগদান করেছেন। জয়স্তু পান্ডপুত্রাণাং যেষাং জনার্দনঃ। পান্ডবদের জয় অবধারিত, কারণ জনার্দন শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের পক্ষে যোগ দিয়েছেন। ভগবান যে পক্ষে যোগদান করেন, সৌভাগ্য-লক্ষ্মীও সেই পক্ষেই থাকেন, কারণ সৌভাগ্য-লক্ষ্মী সর্বদাই তাঁর পতির অনুগামী। তাই বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের দিব্য শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে ঘোষিত হল যে, অর্জুনের জন্য বিষয় ও সৌভাগ্য প্রতীক্ষা করছে। তা ছাড়া, যে রথে চড়ে দুই বন্ধু শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তা অগ্নিদেব অর্জুনকে দান করেছিলেন এবং সেই দুব্য রথ ছিল অর্জুন ত্রিভুবনে সর্বত্রই অপরাজেয়।

শ্লোক – ১৫

পাঞ্চজন্যং হৃষীকেশো দেবদত্তং ধনঞ্জয়ঃ।

পৌন্ড্রং দধ্মৌ মহাশঙ্খং ভীমকর্মা বৃকোদরঃ ।। ১৫ ।।

পাঞ্চজন্যম- পাঞ্চজন্য নামক শঙ্খ; হৃষীকেশঃ- হৃষীকেশ (শ্রীকৃষ্ণ, যিনি তাঁর ভক্তদের ইন্দ্রিয়ের পরিচালক); দেবদত্তম- দেবদত্ত নামক শঙ্খ; ধনঞ্জয়ঃ- ধনঞ্জয় (অর্জুন, যিনি ধনসম্পদ জয় করেছেন); পৌন্ড্রম- পৌন্ড্র নামক শঙ্খ; দধ্মৌ- বাজালেন; মহাশঙ্খম- ভয়ংকর শঙ্খ; ভীমকর্মা- প্রচন্ড কর্ম সম্পাদনকারী; বৃকোদরঃ- বিপুল ভোজনপ্রিয় (ভীম)।

গীতার গান

হৃষীকেশ ভগবান পাঞ্চজন্যরবে।

ধনঞ্জয় বাজাইল দেবদত্ত সবে।।

ভীমকর্মা ভীমসেন বাজাইল পরে।

পৌন্ড্রনাম শঙ্খ সেই অতি উচ্চৈঃস্বরে।।

অনুবাদঃ তখন, শ্রীকৃষ্ণ পাঞ্চজন্য নামক তাঁর শঙ্খ বাজালেন, অর্জুন বাজালেন, তাঁর দেবদত্ত নামক শঙ্খ এবং বিপুল ভোজনপ্রিয় ও ভীমকর্মা ভীমসেন বাজালেন পৌন্ড্র নামক তাঁর ভয়ংকর শঙ্খ।

তাৎপর্যঃ শ্রীকৃষ্ণকে এই শ্লোকে হৃষীকেশ বলা হয়েছে, যেহেতু তিনি হচ্ছেন সমস্ত হৃষীক বা ইন্দ্রিয়ের ঈশ্বর। জীবেরা হচ্ছে তাঁর অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই জীবদের ইন্দ্রিয়গুলিও হচ্ছে তাঁর ইন্দ্রিয়সমূহের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নির্বিশেষবাদীরা জীবের ইন্দ্রিয়সমূহের মূল উৎস কোথায় তার হদিস খুঁজে পায় না, তাই তারা সমস্ত জীবদের ইন্দ্রিয়বিহীন ও নির্বিশেষ বলে বর্ণনা করতে তৎপর। সমস্ত জীবের অন্তরে অবস্থান করে ভগবান তাদের ইন্দ্রিয়গুলিকে পরিচালিত করেন। তবে এটি নির্ভর করে আত্মসমর্পণের মাত্রার উপর এবং শুদ্ধ ভক্তের ক্ষেত্রে তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে ভগবান প্রত্যক্ষভাবে পরিচালিত করেন। এখানে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনের দিব্য ইন্দ্রিয়গুলিকে ভগবান সরাসরিভাবে পরিচালিত করেছেন, তাই এখানে তাঁকে হৃষীকেশ নামে অভিহিত করা হয়েছে। ভগবানের বিভিন্ন কার্যকলাপ অনুসারে তাঁর ভিন্ন ভিন্ন নাম আছে। যেমন, মধু নামক দানবকে সংহার করার জন্য তাঁর নাম মধুসুদন; গাভী ও ইন্দ্রিয়গুলিকে আনন্দ দান করেন বলে তাঁর নাম গোবিন্দ; বসুদেবের পুত্ররূপে অবতীর্ণ হয়েছেন বলে তাঁর নাম বাসুদেব; দেবকীর সন্তান রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম দেবকীনন্দন; বৃন্দাবনে যশোদার সন্তানরূপে তিনি তাঁর বাল্যলীলা প্রদর্শন করেন বলে তাঁর নাম যশোদানন্দন এবং সখা অর্জুনের সারথী হয়েছিলেন বলে তাঁর নাম পার্থসারথী। সেদি রকম, কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুনকে পরিচালনা করেছিলেন বলে তাঁর নাম হৃষীকেশ।

এখানে অর্জুনকে ধনঞ্জয় বলে অভিহিত করা হয়েছে, কারণ বিভিন্ন যাগযজ্ঞ্রে অনুষ্ঠান করার জন্য তিনি যুধিষ্ঠীরকে ধন সংগ্রহ করতে সাহায্য করতেন। তেমনই, ভীমকে এখানে বৃকোদর বলা হয়েছে, কারণ যেমন তিনি হিড়িম্ব আদি দানবকে বধ করার মতো দুঃসাধ্য কাজ সাধন করতে পারতেন, তেমনই তিনি প্রচুর পরিমাণে আহার করতে পারতেন। সুতরাং পান্ডবপক্ষে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সহ বিভিন্ন ব্যক্তিরা যখন তাঁদের বিশেষ ধরণের শঙ্খ বাজালেন, সেই দিব্য শঙ্খধ্বনি তাঁদের সৈন্যদের অন্তরে অনুপ্রেরণা সঞ্চার করল। পক্ষান্তরে, কৌরবপক্ষে আমরা কোন শুভ লক্ষণের ইঙ্গিত পাই না, সেই পক্ষে পরম নিয়ন্তা ভগবান নেই, সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মীদেবীও নেই। অতএব, তাঁদের পক্ষে যে যুদ্ধ-জয়ের কোন আশাই ছিল না তা পূর্বেই নির্ধারিত ছিল এবং যুদ্ধের শুরুতেই শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে সেই বার্তা ঘোষিত হল।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x