শ্লোকঃ ৩৯

কুলক্ষয়ে প্রণশ্যন্তি কুলধর্মাঃ সনাতনাঃ।

ধর্মে নষ্টে কুলং কৃৎস্নমধর্মোহভিভবত্যুত ।। ৩৯ ।।

কুলক্ষয়ে- বংশনাশ হলে; প্রণশ্যন্তি- বিনষ্ট হয়; কুলধর্মাঃ- কুলধর্ম; সনাতনাঃ- চিরাচরিত; ধর্মে- ধর্ম; নষ্টে- নষ্ট হলে; কুলম- বংশকে; কৃৎস্নম- সমগ্র; অধর্মঃ- অধর্মঃ- অধর্ম; অভিভবতি- অভিভূত- অভিভূত করে; উত- বলা হয়।

গীতার গান

কুলক্ষয়ে কলুষিত সনাতন ধর্ম।

ধর্মনষ্টে প্রাদুর্ভাবে হইবে অধর্ম।।

অনুবাদঃ কুলক্ষয় হলে সনাতন কুলধর্ম বিনষ্ট হয় এবং তা হলে সমগ্র বংশ অধর্মে অভিভূত হয়।

তাৎপর্যঃ বর্ণাশ্রম সমাজ-ব্যবস্থায় অনেক রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের নির্দেশ দেওয়া আছে, যা পরিবারের প্রতিটি লোকের যথাযথ পারমার্থিক উন্নতি সাধনে সহায়তা করে। পরিবারের প্রবীণ সদস্যেরা পরিবারভুক্ত অন্য সকলের জন্ম থেকে আরম্ভ করে মৃত্যু পর্যন্ত শুদ্ধিকরণ সংস্কার দ্বারা তাদের যথাযথ মঙ্গল সাধন করার জন্য সর্বদাই তৎপর থাকেন। কিন্তু এই সমস্ত প্রবীণ লোকদের মৃত্যু হলে, মঙ্গলজনক এই সমস্ত পারিবারিক প্রথাকে রূপ দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। তখন পরিবারের অল্পবয়স্ক সদস্যেরা অমঙ্গলজনক কাজকর্মে লিপ্ত হতে পারে এবং তার ফলে তাদের আত্মার মুক্তির সম্ভাবনা চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। তাই, কোন কারণেই পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা উচিত নয়।

শ্লোকঃ ৪০

অধর্মাভিভবাৎ কৃষ্ণ প্রদুষ্যন্তি কুলস্ত্রিয়ঃ।

স্ত্রীষু দুষ্টাসু বারষ্ণেয় জায়তে বর্ণসঙ্করঃ ।। ৪০ ।।

অধর্ম- অধর্ম; অভিভাৎ- প্রাদুর্ভাব  হলে; কৃষ্ণ- হে কৃষ্ণ; প্রদুষ্যন্তি- ব্যভিচারে প্রবৃত্ত হয়; কুলস্ত্রিয়ঃ- কুলবধূগণ; স্ত্রীষু- স্ত্রীলোকেরা; দুষ্টাসু- অসৎ চরিত্রা হলে; বারষ্ণেয়- হে বৃষ্ণিবংশজ; জায়তে- উৎপন্ন হয়; বর্ণসঙ্করঃ- অবাঞ্চিত প্রজাতি।

গীতার গান

অধর্মের প্রাদুর্ভাবে কুলনারীগণ।।

পতিতা হইবে সব কর অন্বেষণ।।

অনুবাদঃ হে কৃষ্ণ। কুল অধর্মের দ্বারা অভিভূত হলে কুলবধূগণ ব্যবভিচারে প্রবৃত্ত হয় এবং হে বারষ্ণেয়। কুলস্ত্রীগণ অসৎ চরিত্রা হলে অবাঞ্চিত প্রজাতি উৎপন্ন হয়।

তাৎপর্যঃ সমাজের প্রতিটি মানুষ যখন সৎ জীবনযাপন করে, তখনই সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধি দেখা দেয় এবং মানুষের জীবন অপ্রাকৃত ঐশ্চর্যে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্ণাশ্রম প্রথার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সমাজ-ব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যার ফলে সমাজের মানুষেরা সৎ জীবনযাপন করে সর্বতোভাবে পারমার্থিক উন্নতি লাভ করতে পারে। এই ধরনের সৎ জীবনযাপন করে সর্বতোভাবে পারমার্থিক উন্নতি লাভ করতে পারে। এই ধরণের সৎ জীবনযাপন করে সর্বতোভাবে পারমার্থিক উন্নতি লাভ করতে পারে। এই ধরণের সৎ জনগণ তখনই উৎপন্ন হন, যখন সমাজের স্ত্রীলোকেরা সৎ চরিত্রবর্তী ও সত্যনিষ্ঠ হয়। শিশুদের মধ্যে এমন অতি সহজেই বিপথগামী হবার প্রবণতা দেখা যায়, স্ত্রীলোকদের মধ্যেও তেমন অতি সহজেই অধঃপতিত হবার প্রবণতা থাকে। তাই, শিশু ও স্ত্রীলোক উভয়েরই পরিবারের প্রবীণদের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা ও তত্বাবধানের একান্ত প্রয়োজন। নানা রকম ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিয়োজিত করার মাধ্যমে স্ত্রীলোকদের চিত্তবৃত্তিকে পবিত্র ও নির্মল রাখা হয় এবং এভাবেই তাদের ব্যভিচারী মনোবৃত্তিকে সংযত করা হয়। চাণক্য পণ্ডিত বলে গেছেন, স্ত্রীলোকেরা সাধারণত অল্পবুদ্ধিসম্পন্না, তাই তারা নির্ভরযোগ্য অথবা বিশ্বস্ত নয়। সেই জন্য তাদের পূজার্চনা আদি গৃহস্থালির নানা রকম ধর্মানুষ্ঠানে সব সময় নিয়োজিত রাখতে হয় এবং তার ফলে তাদের ধর্মে মতি হয় এবং চরিত্র নির্মল হয়। তারা তখন চরিত্রবান, ধর্মপরায়ণ সন্তানের জন্ম দেয়, যারা হয় বর্ণাশ্রম-ধর্ম পালন করার উপযুক্ত। বর্ণাশ্রম-ধর্ম পালন না করলে, স্বভাবতই স্ত্রীলোকেরা অবাধে পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা করতে শুরু করে এবং তাদের ব্যভিচারের ফলে সমাজে অবাঞ্চিত সন্তান-সন্ততির জন্ম হয়। দায়িত্বজ্ঞানশূন্য লোকদের পৃষ্ঠপোষকতায় যখন সমাজে ব্যভিচার প্রকট হয়ে ওঠে এবং অবাঞ্চিত মানুষে সমাজ ছেয়ে যায়, তখন মহামারী ও যুদ্ধ দেখা দিয়ে মানব-সমাজকে ধ্বংসোন্মুখ করে তোলে।

শ্লোকঃ ৪১

সঙ্করো নরকায়ৈব কুলঘ্নানাং কুলস্য চ ।

পতন্তি পিতরো হ্যেষাং লুপ্তপিন্ডোদকক্রিয়াঃ ।। ৪১ ।।

সঙ্করঃ- এই প্রকার অবাঞ্চিত সন্তান; নরকায়- নারকীয় জীবনের জন্য সৃষ্টি; এব- অবশ্যই; কুলঘ্নানাম- কুলনাশক; কুলস্য- বংশের; চ- ও; পতন্তি- পতিত হয়; পিতরঃ- পিতৃপুরুষেরা; হই- অবশ্যই; এষাম- তাদের; লুপ্ত- লুপ্ত; পিন্ড- পিন্ডদান; উদক-ক্রিয়াঃ- তর্পণক্রিয়া।

গীতার গান

দুষ্টা স্ত্রী হইলে জন্মে বর্ণসঙ্কর দল।

বর্ণসঙ্কর হলে হবে নরকের ফল।।

যেই সে কারণ হয় বর্ণসঙ্করের।

কুলক্ষয় কুলঘ্নানি যেই অপরের।।

অনুবাদঃ বর্ণসঙ্কর উৎপাদন বৃদ্ধি হলে কুল ও কুলঘাতকেরা নরকগামী হয়। সেই কুলে পিন্ডদান ও তর্পণক্রিয়া লোপ পাওয়ার ফলে তাদের পিতৃপুরুষেরাও নরকে অধঃ পতিত হয়।

তাৎপর্যঃ কর্মকান্ডের বিধি অনুসারে পিতৃপুরুষের আত্মাদের প্রতি পিন্ডদান ও জল উৎসর্গ করা প্রয়োজন। এই উৎসর্গ সম্পন্ন করা হয় বিষ্ণুকে পূজা করার মাধ্যমে, কারণ বিষ্ণুকে উৎসর্গীকৃত প্রসাদ সেবন করার ফলে সমস্ত পাপ থেকে মুক্তিলাভ হয়। অনেক সময় পিতৃপুরুষেরা নানা রকমের পাপের ফল ভোগ করতে থাকে এবং অনেক সময় তাদের কেউ কেউ জড় দেহ পর্যন্ত ধারণ করতে পারে না। সূক্ষ্ম দেহে প্রেতাত্মারূপে থাকতে বাধ্য করা হয়। যখন বংশের কেউ তার পিতৃপুরুষদের ভগবৎ-প্রসাদ উৎসর্গ করে পিন্ডদান করে, তখন  তাদের আত্মা ভূতের দেহ অথবা অন্যান্য দুঃখময় জীবন থেকে মুক্ত হয়ে শান্তি লাভ করে। পিতৃপুরুষের আত্মার সদগতির জন্য এই পিন্ডদান করাটা বংশানুক্রমিক রীতি। তবে যে সমস্ত লোক ভক্তিযোগ সাধন করেন, তাঁদের এই অনুষ্ঠান করার প্রয়োজন নেই। ভক্তিযোগ সাধন করার মাধ্যমে ভক্ত শত-সহস্র পূর্বপুরুষের আত্মার মুক্তির সাধন করতে পারেন। শ্রীমদ্ভগবতে (১১/৫/৪১) বলা হয়েছে-

দেবর্ষিভূতাপ্তনৃণাং পিতৃণাং

ন কিঙ্করো নায়মৃণী চ রাজন।

সর্বাত্মনা যঃ শরণং শরণ্যং

গতো মুকুন্দং পরিহৃত্য কর্তম।।

“যিনি সব রকম কর্তব্য পরিত্যাগ করে মুক্তি দানকারী মুকুন্দের চরণ-কমলে শরণ নিয়েছেন এবং ঐকান্তিকভাবে পন্থাটি গ্রহণ করেছেন, তাঁর আর দেব-দেবী, মুনি-ঋষি, পরিবার-পরিজন মানব-সমাজ ও পিতৃপুরুষের প্রতি কোন কর্তব্য থাকে না। পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করার ফলে এই ধরনের কর্তব্যগুলি আপনা থেকেই সম্পাদিত হয়ে যায়।“

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x