শ্লোক – ৩২-৩৫

কিং নো রাজ্যেন গোবিন্দ কিং ভোগৈর্জীবিতেন বা।

যেষামর্থে কাঙ্ক্ষিতং নো রাজ্যং ভোগাঃ সুখানি চ ।। ৩২ ।।

ত ইমেহবস্থিতা যুদ্ধে প্রাণাংস্ত্যক্তা ধনানি চ ।

আচার্যাঃ পিতরঃ পুত্রাস্তথৈব চ পিতামহাঃ ।। ৩৩ ।।

মাতুলাঃ শ্বশুরাঃ পৌত্রাঃ শ্যালাঃ সম্বন্ধিনস্তথা।

এতান্ন হন্তুমিচ্ছামি ঘ্নতোহপি মধুসূদন ।। ৩৪ ।।

অপি ত্রৈলোক্যরাজ্যস্য হেতোঃ কিং নু মহীকৃতে।

নিহত্য ধার্তরাষ্ট্রান্নঃ কা প্রীতিঃ স্যাজ্জনার্দন ।। ৩৫ ।।

কিম- কি প্রয়োজন; নঃ- আমাদের; রাজ্যেন- রাজ্যে; গোবিন্দ- মহে কৃষ্ণ; কিম- কি; ভোগৈঃ- সুখভোগ; জীবিতেন- বেঁচে থেকে; বা- অথবা; যেষাম- যাদের; অর্থে- জন্য; কাঙ্ক্ষিতম- আকাঙ্ক্ষিত; নঃ- আমাদের; রাজ্যম- রাজ্য; ভোগাঃ- ভোগসমূহ; সুখানি- সমস্ত সুখ; চ- ও; তে- তারা সকলে; ইমে- এই; অবস্থিতাঃ- অবস্থিত; যুদ্ধে- রণক্ষেত্রে; প্রাণাণ- প্রাণ; ত্যক্তা- ত্যাগ করে; ধনানি- ধনসম্পদ; চ- ও; আচার্যাঃ- আচার্যগণ; পিতরঃ- পিতৃব্যগণ; পুত্রাঃ- পুত্রগণ; তথা- এবং; এব- অবশ্যই চ- ও; পিতামহাঃ- পিতামহগণ; মাতুলাঃ- মাতুলগণ; শ্বশুরাঃ- শ্বশুরগণ; পৌত্রাঃ- পৌত্রগণ; শ্যালাঃ- শ্যালকগণ; সম্বন্ধিনঃ- কুটুম্বগণ; তথা- এবং; এতান- এই সমস্ত; ন- না; হন্তুম- হত্যা করতে; ইচ্ছামি- ইচ্ছা করি; ঘ্নতঃ- হত হলে; অপি- ও; মধুসূদন- হে মধু দৈত্যহন্তা (শ্রীকৃষ্ণ); অপি- এমন কি; ত্রৈলোক্য- ত্রিভুবনের; রাজ্যস্য- রাজ্যের জন্য; হেতোঃ- বিনিময়ে; কিম নু- কি আর কথা; মহীকৃতে- পৃথিবীর জন্য; নিহত্য- বধ করে; ধার্তরাষ্ট্রান- ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণের; নঃ- আমাদের; কা- কি; প্রীতিঃ- সুখ; স্যাৎ- হবে; জনার্দন- হে সমস্ত জীবের পালনকর্তা।

গীতার গান

যাদের লাগিয়া চাহি সুখ-ভোগ শান্তি।

তারাই এসেছে হেথা দিতে সে অশান্তি।।

ধন প্রাণ সব ত্যজি মরিবার তরে।

সবাই এসেছে হেথা কে জীয়ে কে মরে।।

এসেছে আচার্য পূজ্য পিতার সমান।

সঙ্গে আছে পিতামত আর পুত্রগণ।।

মাতুল শ্বশুর পৌত্র কত যে কহিব।

শালা আর সম্বন্ধী সবাই মরিব।।

আমি মরি ক্ষতি নাই এরা যদি মরে।

এদের মরিতে শক্তি নাহি দেখিবারে।।

ত্রিভুবন রাজ্য যদি পাইব জিনিয়া।

তথাপি না লই তাহা এদের মারিয়া।।

ধার্তরাষ্ট্রগণে মারি কিবা প্রীতি হবে।

জনার্দন তুমি কৃষ্ণ আপনি কহিবে।।

অনুবাদঃ হে গোবিন্দ। আমাদের রাজ্যে কি প্রয়োজন, আর সুখভোগ বা জীবন ধারণেই বা কি প্রয়োজন, যখন দেখছি – যাদের জন্য রাজ্য ভোগসুখের কামনা, তারা সকলেই এই রণক্ষেত্রে আজ উপস্থিত? হে মধুসূদন। যখন আচার্য, পিতৃব্য, পুত্র, পিতামহ, মাতুল, শ্বশুর, পৌত্র, শ্যালক ও আত্মীয়স্বজন, সকলেই প্রাণ ও ধনাদির আশা পরিত্যাগ করে আমার সামনে যুদ্ধে উপস্থিত হয়েছেন, তখন তাঁরা আমাকে বধ করলেও আমি তাঁদের হত্যা করতে চাইব কেন? হে সমস্ত জীবের প্রতিপালক জনার্দন। পৃথিবীর তো কথাই নেই, এমন কি সমগ্র ত্রিভুবনের বিনিময়েও আমি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত নই। ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের নিধন করে কি সন্তোষ আমরা লাভ করতে পারব?

তাৎপর্যঃ অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে গোবিন্দ নামে সম্বোধন করেছেন, যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ গো অর্থাৎ গরু ও ইন্দ্রিয়গুলিকে আনন্দ দান করেন। এই তাৎপর্যপূর্ণ নামের দ্বারা তাঁকে সম্বোধন করার মাধ্যমে তিনি প্রকাশ করেছেন, কিসে তাঁর নিজের ইন্দ্রিয় তৃপ্ত হবে। বাস্তবিকপক্ষে, গোবিন্দ নিজে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলিকে তৃপ্ত করেন না, কিন্তু আমরা যদি গোবিন্দের ইন্দ্রিয়গুলিকে তৃপ্ত করি, তবে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি আপনা থেকেই তৃপ্ত জয়ে যায়। দেহাত্মবুদ্ধি-সম্পন্ন মানুষেরা তাদের নিজেদের ইন্দ্রিয়গুলির তৃপ্তিসাধন করতে ব্যস্ত এবং তারা চায়, ভগবান তাদের ইন্দ্রিয়গুলির সব রকম তৃপ্তির যোগান দিয়ে যাবেন। যার যতটা ইন্দ্রিয়তৃপ্তি প্রাপ্য, ভগবান তাকে তা দিয়ে থাকেন। কিন্তু তা বলে আমরা যত চাইব, ভগবান ততই দিয়ে যাবেন, মনে করা ভুল। কিন্তু তার বিপরীত পন্থা গ্রহণ করে, অর্থাৎ যখন আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির কথা না ভেবে গোবিন্দের ইন্দ্রিয়ের সেবায় ব্রতী হই, তখন গোবিন্দের আশীর্বাদে আমাদের মসস্ত বাসনা আপনা থেকেই তৃপ্ত হয়ে যায়। আত্মীয়-স্বজনের প্রতি অর্জুনের গভীর মমতা তাঁর স্বভাবজাত করুণার প্রকাশ এবং এই মমতার বশবর্তী হয়ে তিনি যুদ্ধ করতে নারাজ হন। প্রত্যেকেই নিজের সৌভাগ্য ও ঐশ্চর্য তার বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনকে দেখাতে চায়। কিন্তু অর্জুন যখন বুঝতে পারলেন, যুদ্ধে তাঁর সমস্ত আত্মীয়স্বজন নিহত হবে এবং যুদ্ধের শেষে সেই যুদ্ধলব্ধ ঐশ্চর্য ভোগ করবার জন্য তাঁর সঙ্গে আর কেউ থাকবে না, তখন ভয়ে ও নৈরাশ্যে তিনি মুহ্যমান হয়ে পড়েন। সাংসারিক মানুষের স্বভাবতই হচ্ছে ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে এই ধরনের হিসাব-নিকাশ এবং জল্পনা-কল্পনা করা। কিন্তু অপ্রাকৃত অনুভূতিসম্পন্ন জীবন অবশ্য ভিন্ন ধরনের। তাই ভগবদ্ভক্তের মনোভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভগবানকে তৃপ্ত করাটাই হচ্ছে তাঁর একমাত্র ব্রত, তাই ভগবান যখন চান, তখন তিনি পৃথিবীর সব রকম ঐশ্চর্য গ্রহণ করতে কুন্ঠিত হন না। আবার ভগবান যখন চান না, তখন তিনি একটি কপর্দকও গ্রহণ করেন না। অর্জুন সেই যুদ্ধে তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করতে চাননি এবং তাঁদের হত্যা করাটা যদি একান্তই প্রয়োজন থাকে, তবে তিনি চেয়েছিলেন, শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তাদের বিনাশ করুন। তখনও অবশ্য তিনি জানতেন না, যুদ্ধক্ষেত্রে আসার পূর্বেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছায় তারা সকলেই হত হয়ে আছে, এবং সেই ইচ্ছাকে রূপ দেবার জন্য তিনি ছিলেন কেবল একটি উপলক্ষ্য মাত্র। পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে এই কথা বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত অর্জুনের কোন ইচ্ছাই ছিল না তাঁর দুর্বৃত্ত ভাইদের উপর প্রতিশোধ নেবার, কিন্তু ভগবান চেয়েছিলেন তাদের সকলকে বিনাশ করতে। ভগবানের ভক্ত কখনই কারও প্রতি প্রতিহিংসা পরায়ণ হন না, অন্যায়ভাবে যে তাঁকে প্রতারণা করে, তার প্রতিও তিনি করুণা বর্ষণ করেন। কিন্তু ভগবানের ভক্তকে যে আঘাত দেয়, ভগবান কখনোই তাকে সহ্য করেন না। ভগবানের শ্রীচরণে কোন অপরাধ করলে ভগবান তা ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু তাঁর ভক্তের প্রতি অন্যায় ভগবান ক্ষমা করেন না। তাই অর্জুন যদিও সেই দুর্বৃত্তদের ক্ষমা করতে চেয়েছিলেন, তবুও ভগবান তাদের বিনাশ করা থেকে নিরস্ত হননি।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x