অনেক সময় ওষুধ ছাড়াই এই সব অবতারেরা অনেক রোগ নিরাময় করেন। অনেক সময় ওষুধ ছাড়াও রোগ কমে। সেই সব রোগ কমার কারণ অলৌকিকত্ব নয়। কারণ অনেক অসুখ আপনা-আপনি সারে। শরীরের রোগ প্রতিহত করার ক্ষমতায় সারে। এই অবসরে একটি ঘটনা বলি ১৯৮৭-র মে মাসের এক সন্ধ্যায় কলকাতার থেকে প্রকাশিত একটু সুপরিচিত পত্রিকার সম্পাদকের স্ত্রী এসেছিলেন আমার ফ্ল্যাটে। সঙ্গে ছিলেন তাঁর পারিবারিক চিকিৎসক এক সাহিত্যিক-সাংবাদিক এবং জনৈক ভদ্রলোক।

চিকিৎসক জানালেন বছর আড়াই আগে সম্পাদকের স্ত্রী ডান উরুতে একটা ফোড়া হয়েছিল। ছোট অস্ত্রোপচার, প্রয়োজনীয় ইঞ্জেকশন ও ওষুধে ফোঁড়ার ক্ষত সম্পূর্ণভাবে সেরে যায়। কিন্তু এরপর ওই শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতস্থান নিয়ে শুরু হয় নতুন এক সমস্যা। মাঝে-মাঝেই উরুর শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত ও তার আশপাশে প্রচন্ড ব্যথা হয়, কখনো ব্যাথার তীব্রতায় রোগিণী অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এ বিষয়ে যেসব চিকিৎসকদের দেখানো হয়েছে ও পরামর্শ নেওয়া হয়েছে তাঁরা প্রত্যেকেই কলকাতার শীর্ষস্থানীয়। ব্যথার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য কারণ এঁরা খুঁজে পাননি। চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র, এক্স-রে ও ছবি ও রিপোর্ট সবই দেখালেন আমাকে।

আমি পেশায় মানসিক চিকিৎসক না হলে মাঝে-মধ্যে এই ধরনের কিছু সমস্যা নিয়ে কেউ কেউ আমার কাছে হাজির হন। কাউন্সিলিং করি বা পরামর্শ দেই। রোগিণীর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক নানা বিষয়ে কথা বলতে বলতে উরুর শুকনো ক্ষতটা পরীক্ষা করে বললাম, “একবার খড়্গপুরে থাকতে দেখেছিলাম একটি লোকের হাতের বিষ-ফোঁড়া সেপটিক হয়ে, পরবর্তীকালে গ্যাংগ্রিন হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বাস করুন, সামান্য ফোঁড়া থেকেও এই ধরনের ঘটনাও ঘটে।“

রোগিণী বললেন, “আমি নিজেই এই ধরনের একটা ঘটনার সাক্ষী। মেয়েটির হাতে বিষফোঁড়া জাতীয় কিছু একটা হয়েছিল। ফোঁড়াটা শুকিয়ে যাঔয়ার পরও শুকনো ক্ষতের আশেপাশে ব্যথা হতো। একসময় জানা গেল, ব্যথার কারণ গ্যাংগ্রিন। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত কাঁধ থেকে হাত বাদ দিতে হয়।“

যা জানতে গ্যাংগ্রিনের গল্পের অবতারণা করেছিলাম তা আমার জানা হয়ে গেছে। এটা এখন আমার কাছে দিনের মতোই স্পষ্ট যে, সম্পাদকের স্ত্রী ফোঁড়া হওয়ার পর থেকেই গ্যাংগ্রিন স্মৃতি তাঁর মনে গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এই ফোঁড়া থেকেই আবার গ্যাংগ্রিন হবে না তো? এই প্রতিনিয়ত আতঙ্ক থেকেই এক সময় ভাবতে শুরু করেন, “ফোঁড়া তো শুকিয়ে গেল, কিন্তু মাঝে-মধ্যেই যেন শুকনো ক্ষতের আশেপাশে ব্যথা অনুভব করছি? আমারও আবার গ্যাংগ্রিন হল না তো? সেই লোকটার মতোই একটা অসহ্য কষ্টময় জীবন বহন করতে হবে না তো?

এমনি করেই যত দুশ্চিন্তা বেড়েছে, ততই ব্যথাও বেড়েছে। বিশ্বাস থেকে যে ব্যথার শুরু, তাকে শেষ করতে হবে বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়েই।

আমি আরও একবার উরুর শুকনো ক্ষত গভীরভাবে পরীক্ষা করে এবং শরীরের আর কোথায় কোথায় কেমনভাবে ব্যথাটা ছড়াচ্ছে, ব্যথার অনুভূতিটা কি ধরনের ইত্যাদি প্রশ্ন রেখে গম্ভীর মুখে এটা নিপাট মিথ্যে কথা বললাম, “একটা কঠিন সত্যকে না জানিয়ে পারছি না, আপনারও সম্ভবত গ্যাংগ্রিনের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে একটু একটু করে।“

আমার কথা শুনে রোগিণী মোটেই দুঃখিত হলেন না। বরং উজ্জ্বল মুখে বললেন, “আপনিই আমার অসুখের সঠিক কারণ ধরতে পেরেছেন।“

আমি আশ্বাস দিলাম, “আমি অবশ্য নিশ্চিত নই, তবে আধুনিক মেশিনের সাহায্যে পরীক্ষা করলেই জানা যাবে, আমার অনুমান ঠিক কি না। আমার অনুমান যদি ঠিক হয়, তবে আপনার কর্তাটিকে একটু কষ্ট করতে হবে। বিদেশ থেকে ওষুধ-পত্তর আনাবার ব্যবস্থা করতে হবে। দেখবেন, তারপর সপ্তাহ তিনেকের মধ্যে আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছেন।“

রোগ নিরাময়ের জন্য আমাদের বিশ্বাসবোধের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের শরীরে বহু রোগের উৎপত্তি হয় ভয়, ভাবনা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা থেকে। আমাদের মানসিক ভারসাম্য নির্ভর করে সামাজিক পরিবেশের উপর। সমাজ জীবনে  অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা,ধর্মোন্মাদনা, জাত-পাতের লড়াই ইত্যাদি যত বাড়ছে দেহ-মনজনিত অসুখ বা Psycho-somatic disorder তত বাড়ছে। সাম্প্রদায়িক লড়াইয়ের সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় প্রচন্ড মানসিক চাপের মধ্যে থাকে বলে এই সময় তাঁদের অনেক দেহ-মনজনিত অসুখের শিকার হয়ে পড়েন।

মানসিক কারনে যেসব অসুখ হতে পারে তার মধ্যে রয়েছে, শরীরের বিভিন্ন স্থানের ব্যথা, মাথার ব্যথা, হাড়ে ব্যথা, স্পন্ডালাইটিস আরথ্রাইটিস, বুক ধরফর, পেটের গোলমাল, পেটের আলসার, গ্যাস্ট্রিকের অসুখ, ব্লাডপ্রেসার, কাশি, ব্রংকাইল অ্যাজমা, ক্লান্তি, অবসাদ ইত্যাদি। মানসিক কারণে শারিরীক অসুখের ক্ষেত্রে ঔষধি-মূল্যহীন ক্যাপসুল, ইনজেকশন বা ট্যাবলেট প্রয়োগ করে অনেক ক্ষেত্রেই ভাল ফল পাওয়া যায়। এই ধরনের বিশ্বাস-নির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতিকে বলে ‘প্ল্যাসিবো’ (placebo) চিকিৎসা পদ্ধতি। Placebo কথার অর্থ “I will please.” বাংলায় অনুবাদ করে বলতে পারি, “আমি খুশি করব।“ ভাবানুবাদ করে বলতে পারি “আরোগ্য করব।“

রোগিণীর পারিবারিক চিকিৎসকের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলে জানলাম, কোনও পরীক্ষাতেই রোগের কোন কারণ ধরা পড়েনি। ডাক্তারদের অনুমান ব্যথার কারণ সম্পূর্ণ মানসিক। রোগিণীর মনে সন্দেহের পথ ধরে এক সময় বিশ্বাসের জন্ম নিয়েছে তাঁর উরুর ফোঁড়া সারে নি, বরং আপাত শুকনো ফোঁড়ার মধ্যে রয়েছে গ্যাংগ্রিনের বিষ। রোগিণীর বিশ্বাসবোধকে কাজে লাগিয়ে কেমনভাবে প্ল্যাসিবো চিকিৎসা পদ্ধতি চালাতে হবে সে বিষয়ে একটা পরিকল্পনার কথা খুলে বললাম।

এই ঘটনার কয়েক দিন পরে রোগিণীর পারিবারিক ডাক্তার সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাওয়া উরুর ফোঁড়ার ওপর নানা রকম পরীক্ষা চালিয়ে একটা মেশিনের সাহায্যে রেখা-চিত্র তৈরি করে গম্ভীরভাবে মাথা নাড়িয়ে আবার রেখা-চিত্র তোলা হল। দু-বারের রেখা-চিত্রেই রেখার প্রচন্ড রকমের ওঠা-নামা লক্ষ্য করে স্থির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন, গ্যাংগ্রিনের অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। একটা হৈ-চৈ পড়ে গেল। নিউ ইয়র্কে খবর পাঠিয়ে দ্রুত আনানো হল এমনই চোরা গ্যাংগ্রিনের অব্যর্থ ইনজেকশন। সপ্তাহে দুটি করে ইনজেকশন ও দু’বার করে রেখা-চিত্র গ্রহণ চলল তিন সপ্তাহ। প্রতিবার রেখা-চিত্রেই দেখা যেতে লাগল রেখা ওঠা-নামা আগের বারের চেয়ে কম। ওষুধের দারুণ গুণে ডাক্তার যেমন অবাক হচ্ছিলেন, তেমন রোগিণীও। প্রতিবার ইনজেকশনেই ব্যথা লক্ষণীয়ভাবে কমছে। তিন সপ্তাহ পরে দেখা গেল রেখা আর আঁকা-বাঁকা নেই, সরল। রোগিণীও এই প্রথম অনুভব করলেন, বাস্তবিকই একটুও ব্যথা নেই। অথচ মজাটা হল এই যে, বিদেশী দামী ইনজেকশনের নামে তিন সপ্তাহ ধরে রোগিণীকে দেওয়া হয়েছিল স্রেফ ডিসটিলড ওয়াটার।

পঞ্চম সপ্তাহে ’আজকাল’ পত্রিকার রবিবারের ক্রোড়পত্র একটা আমার প্রবন্ধ প্রকাশিত হল। শিরোনাম ‘বিশ্বাসে অসুখ সারে’। মহিলাটির ঘটনার উল্লেখ করে লেখাটা শুরু করেছিলাম।

বছর পনেরো আগের ঘটনা। আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে দমদমের ‘শান্তিসদন’ নার্সিং হোমে ভর্তি হন। ওই সময় শান্তি সদনের অন্যতম কর্ণধার অতীন রায়ের সঙ্গে কিছু ঘনিষ্ঠতার সুযোগ হয়। তিনি সেই সময় অতি সম্প্রতি আসা এক রোগিণীর কেস হিস্ট্রি শোনালেন। মাঝে মাঝেই রোগিণীর পেটে ও তার আশেপাশে ব্যথা হত। আশ্চর্য ব্যাপার ব্যাপার হল, প্রতিবারই ব্যথাটা পেটের বিভিন্ন জায়গায় স্থান পরিবর্তন করত। এই দিকে আর এক সমস্যা হল, নানা পরীক্ষা করেও ব্যথার কোন যুক্তিগ্রাহ্য কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ডাক্তার রোগিণীকে একটা ক্যাপসুল দিয়ে বললেন, এটা খান, ব্যথা সেরে যাবে। ক্যাপসুল খাওয়ার পর রোগিণীর ব্যথার কিছুটা উপশম হল। অথচ ক্যাপসুলটা ছিল নেহাতই ভিটামিনের। ব্যথা কিন্তু বারো ঘণ্টা পরে আবার ফিরে এলো।

আবার ভিটামিন ক্যাপসুল দেওয়া হল। এবারও উপশম হল সাময়িক। এভাবে আর কতবার চালানো যায়। ডাক্তারবাবু শেষ পর্যন্ত রোগিণীকে জানালেন, যে বিশেষ ইনজেকশনটা এই ব্যথায় সবচেয়ে কার্যকর সেটি বহু কষ্টে তিনি জোগার করেছেন। এবার ব্যথা চিরকালের মতো সেরে যাবেই।

সুবিধা অনুযায়ী আকুপ্রেসার স্যান্ডেল পড়ে প্রতিদিন দু'বার (সকাল সন্ধ্যায়) কেবলমাত্র ৭-৮ মিনিট হাঁটুন। এই স্যান্ডেলের রবারের নরম ও স্থিতিস্থাপক ডগাগুলি খুবই মোলায়েম ও সমান ভাবে আপনার পায়ের তলা ম্যাসেজ করে দেবে, সঙ্গে সঙ্গে ৩৮টি নার্ভের অগ্রভাগে সঞ্জীবনী শক্তি সঞ্চার করবে। যেসব জায়গায় চাপ পড়ে, সেইসব জায়গার সঙ্গে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির যোগাযোগ থাকায় হজম শক্তিরও দারুন উন্নতি হয়।

ডাক্তারবাবু ইনজেকশনের নামে ডিসটিলড ওয়াটার পুশ করলেন। রোগিণীর ব্যথাও পুরোপুরি সেরে গেল।

বছর কুড়ি আগেও কলকাতা জেনারেল পোস্টে অফিসের আশপাশে এক গৌরকান্তি, দীর্ঘদেহী বৃদ্ধ তান্ত্রিক ঘুরে বেড়াতেন। গলায় মালা (যতদূর মনে পড়ছে রুদ্রাক্ষের)। মালার লকেট হিসেবে ছিল একটি ছোট্ট রুপোর খাঁড়া। বৃদ্ধকে ঘিরে সব সময়ই অফিস-পাড়ার মানুষগুলোর ভির লেগেই থাকতো। এদের উদ্দেশ্য ছিল তান্ত্রিক বাবার অলৌকিক শক্তি সাহায্য নিয়ে নানা ধরনের অসুখ-বিসুখ থেকে নিজেকে মুক্ত করা। বেশ কয়েকদিন লক্ষ্য করে দেখেছি এদের অসুখগুলো সাধারণত অম্বলের ব্যথা, হাঁপানি, শরীরের বিভিন্ন স্থানের ব্যথা, বুক ধরফর, অর্শ, বাত ইত্যাদি।

সাধুবাবা রোগীর ব্যথার জায়গায় লকেটের খাঁড়া বুলিয়ে জোরে-জোরে বার কয়েক ফুঁ দিয়ে বলতেন, “ব্যথা কমেছে না?”

রোগী ধন্দে পড়ে যেতেন। সত্যিই ব্যথা কমেছে কি কমেনি, বেশ কিছুক্ষন বোঝার চেষ্টা করে প্রায় সকলেই বলতেন, “কমেছে মনে হচ্ছে।“

এই আরোগ্য লাভের পিছনে তান্ত্রিকটির কোন অলৌকিক ক্ষমতা কাজ করত না, কাজ করত তান্ত্রিকটির অলৌকিক ক্ষমতার প্রতি রোগীদের অন্ধ বিশ্বাস।

এবারের ঘটনাটা আমার শোনা। বলেছিলেন প্রখ্যাত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ বিশ্বনাথ রায়। ডাঃ রায়ের সার্জারির অধ্যাপক ছিলেন ডাঃ অমর মুখার্জি। তাঁর কাছে চিকিৎসিত হতে আসেন এক মহিলা। মহিলাটির একান্ত বিশ্বাস, তাঁর গলস্টোন হয়েছে। এর আগে কয়েকজন চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকেই পরীক্ষা করে জানিয়েছিলেন পেটে ব্যথার কারণ গলস্টোন নয়। চিকিৎসকদের এই ব্যাখ্যায় মহিলা আদৌ সন্তুষ্ট হতে পারেননি।

ডাঃ মুখার্জি মহিলাম গল-ব্লাডারের এক্স-রে করালেন। দেখা গেল কোন স্টোন নেই। তবু ডাঃ মুখার্জি তাঁর ছাত্রদের শিখিয়ে দিলেন রোগিণীকে বলতে, তাঁর গলস্টোন হয়েছে। এক্স-রে-তে দুটো স্টোন দেখা গেছে। অপারেশন করে স্টোন দুটো বার করে দিলেই ব্যথার উপশম হবে।

রোগিণীকে জানানো হল অমুক দিন অপারেশন হবে। নির্দিষ্ট দিনে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গিয়ে অজ্ঞান করে পেটের চামড়া চর্বিস্তর পর্যন্ত কাটলেন এবং আবার সেলাই করে দিলেন। ও.টি. স্টাফের হাতে ছোট্ট দুটো রঙ্গিন পাথর দিয়ে ডাঃ মুখার্জি বললেন, রোগিণী জ্ঞান ফেরার পর স্টোন দেখতে চাইলে পাথর দুটো দেখিয়ে বলবেন, এ-দুটো ও পিত্তথলি থেকেই বেরিয়েছে।

রোগিণী কয়েকদিন হাসপাতালেই ছিলেন। সেলাই কেটেছিলেন ডাঃ রায়। রোগিণী হৃষ্ঠচিত্তে রঙ্গিন পাথর দুটো নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। যে ক-দিন হাসপাতালে ছিলেন সে ক-দিন গলব্লাডারের কোন ব্যথা অনুভব করেননি। অথচ আশ্চর্য, সাজানো অপারেশনের আগে প্রতিদিনই নাকি রোগিণী গলব্লাডার প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করতেন।

এবার যে ঘটনাটি বলছি, তা শুনেছিলাম চিকিৎসক এবং ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির একসময়ের সভাপতি ডাঃ বিষ্ণু মুখার্জির কাছে। ঘটনাস্থল জমশেদপুর। ডাঃ মুখার্জি তখন জমশেদপুরের বাসিন্দা। নায়িকা তরুণী, সুন্দরী, বিধবা। ডাঃ মুখার্জির কাছে তরুণীটিকে নিয়ে আসেন তাঁরই এক আত্মীয়া। তরুণীটির বিশ্বাস তিনি মা হতে চলেছেন। মাসিক বন্ধ আছে মাস তিনেক। ডাঃ মুখার্জির আগেও অন্য চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন। তিনি পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, মাতৃত্বের কোন চিহ্ন নেই। ডাক্তারের স্থির নিশ্চিত সিদ্ধান্তে মেয়েটির পরিবারের আর সকলে বিশ্বাস স্থাপন করলেও, মেয়েটি কিন্তু তাঁর পূর্ব বিশ্বাস থেকে নড়েননি।  তাঁর এখনো দৃঢ় বিশ্বাস, মা হতে চলেছেন। এবং মা হলে তাঁর সামাজিক সম্মান নষ্ট হবে। ইতিমধ্যে সম্মান বাঁচাতে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।

পূর্ব ইতিহাস জানার পর ডাঃ মুখার্জি পরীক্ষা করে মেয়েটিকে জানালেন, “আপনার ধারণাই সত্যি। আপনি মা হতে চলেছেন। যদি অবাঞ্ছিত মাতৃত্ব থেকে অব্যাহতি চান নিশ্চয়ই তা পেতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে অ্যাবরশন করতে হবে।

মেয়েটি এককথায় অপারেশনে রাজি হয়ে গেলেন। সাজানো অ্যাবরেশন শেষে জ্ঞান ফিরতে রোগিণীকে দেখানো হল অন্য এক রোগিণীর দু’মাসের ফিটাস ট্রেতে রক্তসহ সাজিয়ে।

মেয়েটি সুখ ও স্বস্তি মেশানো নিশ্বাস ছাড়লেন। পরবর্তীকালে মেয়েটি তাঁর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক জীবন ফিরে পেয়েছিলেন।

অনেল পুরনো বা chronic রোগ আছে যেসব রোগের প্রকোপ বিভিন্ন সময় কমে-বাড়ে। যেমন গেঁটে বাত, অর্শ, হাঁপানি, অম্বল। আবার হাঁপানি, অম্বলের মতো কিছু পুরনো রোগ কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঔষুধ ছাড়াই স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মে সেরে যায়। অলৌকিক বাবাদের কাছে কৃপা প্রার্থনার পরই এক ধরণের অসুখ বিশ্বাসে বা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মে কিছুটা কমলে বা সেরে গেল অলৌকিক বাবার মাহাত্ম্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রাক্তন চীফ সেক্রেটারী অমিয় সেন একবার আমাকে বলেছিলেন, “মার্কসবাদে বিশ্বাসী হলেও আমি কিন্তু অলৌকিক ক্ষমতাবান পুরোহিতের দেখা পেয়েছিলাম। আমার স্ত্রী গেঁটে-বাতে পায়ে ও কোমরে মাঝে-মাঝে খুব কষ্ট পান। একবার দীঘায় বেড়াতে গিয়ে ওই পুরোহিতের খবর পাই। শুনলাম উনি অনেকের অসুখ-টসুক ভাল করে দিয়েছেন। এক সন্ধ্যায় আমার স্বামী-স্ত্রীতে গেলাম মন্দিরে। পূজো দিলাম। সন্ধ্যারতির পর পুরোহিতকে প্রণাম করে নিজের পরিচয় দিয়ে আসার উদ্দেশ্য জানালাম। পুরোহিত বিড়-বিড় করে মন্ত্র পড়ে আমার স্ত্রীর কোমর ও পায়ে হত বুলিয়ে দিলেন। এক সময় জিজ্ঞেস করলেন, “কি, এখন ব্যথা কমেছে না?” অবাক হয়ে গেলাম আমার স্ত্রী জবাব শুনে। ও নিজের শরীরটা নাড়া-চাড়া করে বলল, “হ্যাঁ, ব্যথা অনেক কমেছে।“ এইসব অতি-মানুষের হয়তো কোনও দিনই আপনার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণ দিতে হাজির হবেন না। কিন্তু এদের অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণ পাওয়ার পর তা অস্বীকার করব কি ভাবে?”

আমি বলেছিলাম, “যতদূর জানি আপনার স্ত্রীর বাতের ব্যথা এখনও আছে।“

আমার মুখের কথা প্রায় কেড়ে নিয়ে প্রাক্তন চীফ সেক্রেটারী জবাব দিয়েছিলেন, “পুরোহিত অবশ্য আরও কয়েকবার ঝেড়ে দিতে হবে বলে জানিয়েছিলেন। কাজের তাগিদে আর যাওয়া হয়নি। ত্রুতিটা আমাদেরই।“

এই সাময়িক আরোগ্যের কারণ পুরোহিতের প্রতি রোগিণীর বিশ্বাস, পুরোহিতের অলৌকিক কোনও ক্ষমতা নয়। অথবা, পুরনো রোগের নিয়ম অনুসারেই স্বাভাবিকভাবেই সেই সময় গেঁটে-বাতের প্রকোপ কিছুটা কম ছিল।

অর্শ রোগীদের অনেকেরই হাতের আঙ্গুলে শোভিত হয় আড়াই প্যাঁচের একটা রুপোর তারের আংটি। যারা এই আংটি পরেন, তাঁদের কাছে কোনও অর্শ রোগী আংটি ধারণ করে নিরাময় চাইলে সাধারণতভাবে আড়াই-প্যাঁচি আংটির ধারক তাঁর আংটির তারের ছোট্ট একটা টুকরো কেটে দেন। ওই টুকরো স্যাকরাকে দিয়ে আড়াই-প্যাঁচ আংটি তৈরি করে ধারণ করেন। ধারণ করার পর অর্শ রোগ সত্যিই কি সারে? আমি দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে ২০০ জনের উপর একটা অনুসন্ধান চালিয়েছিলাম। সাধারণত যাদের হাতেই আড়াই-প্যাঁচ আংটি দেখেছি, তাদের সঙ্গে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছি, আংটি পরে কতটা উপকৃত হয়েছেন। শতকরা ৪৫ ভাগের মতো জানিয়েছেন, আংটির গুণ আছে কি না, এই বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে আসার মতো কিছু বোঝেননি। বাঁকি ২৫ ভাগ জানিয়েছেন, কিছুই কাজ হয়নি। অর্শ অনেক সময় স্বাভাবিক নিয়মেই প্রাকৃতিক সারে। যাদের সেরেছে, তাঁরা প্রাকৃতিক নিয়মকেই আংটির অলৌকিক নিয়ম বলে ভুল করেছেন।

এই প্রসঙ্গে আর একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ১৯৮৮-র ২৯ জুলাই সাংবাদিক পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের এক প্রতিবেদনে আনন্দবাজার পত্রিকায় মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে লেখা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের চিঠি প্রকাশিত হয়েছে। চিঠিটা এখানে তুলে দিচ্ছি।

“প্রীতিভাজনেষু জ্যোতিবাবু,

আনন্দবাজার পত্রিকায় পড়লাম আপনি স্পন্ডিলাইটিসে কষ্ট পাচ্ছেন। আমি স্পন্ডিলাইটিসে অনেকদিন ধরে ভুগেছি। তখন তদানীন্তন প্রেসিডেন্সী কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ প্রতুল মুখার্জি আমাকে একটা বালা দন যার মধ্যে হাই ইলেক্ট্রিসিটি ভোল্ট পাশ করানো হয়েছে। সেটা পরে কয়েকদিনের মধ্যেই আমি সুস্থ হই। আমি আপনাকে কয়েকদিনের মধ্যেই একটি তামার বালা পাঠাব, আশা করি সেটা পরে আপনি উপকার পাবেন।

আপনার দ্রুত নিরাময় কামনা করি, আমি এখন আরামবাগে আছি।

পুনঃসম্ভবপর হলে সাইকেলে অন্তত দৈনিক আধঘণ্টা চাপবেন। আপনি বোধহয় জানেন, আমি সাইকেলে চেপে ভাল ফল পেয়েছি।

স্বাঃ প্রফুল্লচন্দ্র সেন

২৮.৭.৮৮

পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের এক প্রশ্নের উত্তরে প্রফুল্লচন্দ্র সেন জানান, তামার বালা পরেছিলেন ১৯৭৯ সালে। শ্রীসেনের কথায়, “স্পন্ডালাইটিস হয়েছিল। ডঃ নীলকান্ত ঘোষাল দেখেছিলেন। কিছুই হল না। কিন্তু যেই তামার বালা ব্যবহার করলাম, প্রথম ৭ দিনে ব্যথা কমে গেল। পরের ১৫ দিনে গলা থেকে কলার খুলে ফেললাম।“

এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর নাকি তামার বালা বিক্রি খুব কেড়ে গিয়েছিল শহর কলকাতায়। প্রফুল্লচন্দ্র সেনের বক্তব্য এবং জ্যোতি বসুকে লেখা চিঠি শুধুমাত্র সাধারণ মানুষদের মধ্যে নয়, বিজ্ঞানকর্মীদের মধ্যেও যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছিল। যার ফলশ্রুতি হিসেবে শরীরের ওপর ধাতুর প্রভাব কতখানি অথবা বাস্তবিকই প্রভাব আছে কি না, বহু প্রশ্নের ও পত্রের মুখোমুখি হয়েছি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁদের জানিয়েছি, ‘শরীরের উপর ধাতুর প্রভাব আছে’, এতা সম্পূর্ণ অলীক ধারণা।

‘আর্থ’ না করে তামার বালা পরে জীবনধারণ করার চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়। তামাকে ‘আর্থ’ হওয়া থেকে বাঁচাতে বালাধারণকারীকে তবে পৃথিবীর ছোঁয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে জীবন ধারণ করতে হয়। কারণ, বালাধারণকারী পৃথিবীর সংস্পর্শে এলেই বালার তামা ‘আর্থ’ হয়ে যাবে।

আরও একটি বৈজ্ঞানিক সত্য এই প্রসঙ্গে জেনে রাখা প্রয়োজন, বিদ্যুৎ-প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর তামার মধ্যে বৈদ্যুতিক শক্তি থাকে না।

মানবদেহে অল্প পরিমাণে বিভিন্ন মৌলিক দ্রব্যের অস্তিত্ব দ্রব্যের অস্তিত্ব আছে এবং নানা ধরনের অসুখের চিকিৎসাতে মৌলিক দ্রব্যের ব্যবহার সুবিদিত। গর্ভবতীদের রক্তস্বল্পতার জন্য LIVOGEN CAPSULE বা ঐ জাতীয় ঔষুধ ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে সংশোধিত অবস্থায় রয়েছে লৌহ। প্রস্রাব সংক্রান্ত অসুখের জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে MERCUREAL DIURETIC (DIAMOX) দেওয়া হয়, যার মধ্যে সংশোধিত অবস্থায় পারদ রয়েছে। এক ধরনের বাতের চিকিৎসায় অনেক সময় MYOCRISIN দেওয়া হয়, যার মধ্যে সংশোধিত অবস্থায় সোনা রয়েছে।

যখন রোগিণীকে LIVOGEN CAPSULE বা ঐ জাতীয় ওষুধ দেওয়ার প্রয়োজন তখন পরিবর্তে রোগিণীকে এক কুইন্টাল লোহার উপর শুইয়ে রাখলেও ফল পাওয়া যাবে না। কারণ, মৌল দ্রব্য বা ধাতু শরীরে ধারণ করলে তা কখনোই শোষিত হয়ে দেহে প্রবেশ করে না।

উপরের দুটি স্তবকে যা লিখেছি তা আমার ব্যক্তি-বিশ্বাসের কথা নয়, বিজ্ঞানের সত্য।

এরপর যে প্রশ্নটা সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেবে, তা হলে প্রফুল্লচন্দ্র কি তবে মিথ্যে কথা বলেছিলেন? যদিও আমরা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বুঝতে শিখেছি সমাজশীর্ষ মানুষরাও মিথ্যাশ্রয়ী হন তবু তামার বালা পরে প্রফুল্লচন্দ্রের স্পন্ডালাইটিস আরোগ্যের মধ্যে কোন অবাস্তবতা দেখতে পাচ্ছি না।

আমার এই কথার মধ্যে অনেকেই নিশ্চয়ই পরস্পর বিরোধীতা খুঁজে পাচ্ছেন। কিন্তু যারা এতক্ষণে প্ল্যাসিবো চিকিৎসা পদ্ধতির বিষয়টি বুঝে নিয়েছেন, তাঁদের কাছে নিশ্চয়ই পরিষ্কার হয়েছে প্রফুল্লচন্দ্রের রোগমুক্তির ক্ষেত্রে তামা বা বিদ্যুৎ শক্তির কোন বৈশিষ্ট্য বা গুণই কাজ করেনি, কাজ করেছিল তামা, বিদ্যুৎশক্তি এবং সম্ভবত ডঃ প্রতুল মুখার্জির প্রতি প্রফুল্লচন্দ্রের একান্ত বিশ্বাস।

অ্যাকুপ্রেসার সান্ডেলের কথা ব্যাপক বিজ্ঞানের দৌলতে অনেকেরই জানা। সর্বরোগহর এক অসাধারণ স্যান্ডেল। প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় মাত্র দু’বার হাঁটলেই নাকি নার্ভে সঞ্জীবনী শক্তির সঞ্চার হয়, দূর হয় হরেক রকমের অসুখ, হজমশক্তির দারূন রকমের উন্নতি হয়। রোগমুক্তির এমন সহজ-সরল উপায়ে অনেকেই আকর্ষিত হচ্ছেন। কিনেও ফেলছেন। ব্যবহারের পর অনেকের নাকি অনেক অসুখ-বিসুখ সেরেও যাচ্ছে। অথচ বাস্তব সত্য হল এই যে, যারা আরোগ্য লাভ করছেন, তাঁদের আরোগ্যের পিছনে স্যান্ডেলের কোন গুণ বা বৈশিষ্ট্য সামান্যতম কাজ করেনি, কাজ করেছে স্যান্ডেলের প্রতি রোগীদের অন্ধ-বিশ্বাস।

ডাঃ বিরল মল্লিক বিখ্যাত স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তাঁকেও দেখেছি রক্তচাপ কন্ট্রোলে রাখতে ম্যাগনেটিক বেল্ট পরতে। এসব যে ফালতু ব্যাপার –তা বুঝিয়ে ছিলাম নানা যুক্তি বা তত্ত্ব দিয়ে। তারপর ডাঃ মল্লিক বেল্ট ছেড়েছিলেন।

এ-বারের ঘটনায় নায়ক ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিং। নায়িকা তাঁর প্রেমিকা এলিজাবেথ। এলিজাবেথ ছিলেন রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে। এলিজাবেথের পরিবারের সকলের না-পছন্দ মানুষ ছিলেন রবার্ট ব্রাউনিং। রবার্ট ব্রাউনিং পরিকল্পনা ক্রেছিলেন এলিজাবেথ নিজের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলে দু’জনে বিয়ে করবেন। এলিজাবেথের বাড়ি ছেড়ে বেরোন ছিল একটা সমস্যা। কারণ শিরদাঁড়ায় প্রচন্ড ব্যথায় তিনি ছিলেন শয্যাশায়ী। ব্রাউনিং-এর উৎসাহ এলিজাবেথকে রোগ জয় করতে সক্ষম করেছিল। এলিজাবেথ শিরদাঁড়ার ব্যথা ভুলে বাড়ির উঁচু পাঁচিল টপকে বাইরে এসেছিলেন এবং রবার্ট ব্রাউনিংকে বিয়ে করেছিলেন।

সালটা সম্ভবত ১৯৮৪। সে সময়কার বিখ্যাত পুস্তক প্রকাশক ‘বিশ্ববাণী’র মালিক ব্রজ মণ্ডলের সঙ্গে শান্তিনিকেতনে গিয়েছি। হোটেলে পৌঁছতেই রাত দশটা পার হয়ে গেল। এগারোটায় খাবারের পাট চুকানোর পর প্রকাশক বন্ধুটির খেয়াল হল সঙ্গে ঘুমের বড়ি নেই। অথচ প্রতি রাতের ঘুম আনে ঘুমের বড়ি। বেচারা অস্থির ও অসহায় হয়ে পড়লেন। “কি হবে প্রবীর? এত রাতে কোন ওষুধের দোকান খোলা পাওয়া অসম্ভব। তোমার কাছে কোন ঘুমের ওষুধ আছে?” বললাম, “আমারও তোমার মতোই ঘুম নিয়ে সমস্যা। অতএব সমাধানের ব্যবস্থা সব সময়ই সঙ্গে রাখি। শোবার আগেই ওষুধ পেয়ে যাবে।“

শুতে যাবার আগে প্রকাশকের হাতে একটা ভিটামিন ক্যাপসুল দিয়ে আমিও একটা খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়লাম। ক্যাপসুলটা নেড়ে-চেড়ে দেখে প্রকাশক বললেন, “এটা আবার কি ধরনের ওষুধ? ক্যাপসুলে ঘুমের ওষুধ? নাম কি?”

একটা কাল্পনিক নাম বলে বললাম, “ইউ.এস. এ’র ওষুধ।“ কলকাতার এক সুপরিচিত চিকিৎসকের নাম বলে বললাম, “আমার হার্টের পক্ষে এই ঘুমের ওষুধই সবচেয়ে সুইটেবল বলে প্রতি তিন মাসে একশোটা ক্যাপসুলের একটা করে ফাইল এনে দেন। যে চিকিৎসকের নাম বলেছিলাম তিনি যে আমাকে খুবই স্নেহ করেন সেটা প্রকাশক বন্ধুটির জানা থাকায় আমার কথায় পুরোপুরি বিশ্বাস করে ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়লেন। পরের দিন সকালে জিজ্ঞেস করলাম, “কেমন ঘুম হল?”

“ফাইন। আমাকেও মাঝে-মধ্যে এক ফাইল করে দিও।“

প্রকাশকের বিশ্বাস হেতু এ ক্ষেত্রে ওষুধবিহীন ক্যাপসুলেই ঘুম আনতে সক্ষম হয়েছিল।

গত শতকের নয়ের দশকের গোড়ার কথা। আমার কাছে এসেছিলেন এক চিকিৎসক বন্ধু এক বিচিত্র সমস্যা নিয়ে। বন্ধুটি একটি নার্সিংহোমের সঙ্গে যুক্ত। সেখানে এক রোগিণী ভর্তি হয়েছেন। তাঁকে নিয়েই সমস্যা। তিনি মাঝে মাঝে অনুভব করেন গলায় কিছু আটকে রয়েছে। এই সময় তীব্র শ্বাসকষ্ট হয়। এক্স-রেও করা হয়েছে, কিছু মেলেনি। দেহ-মনজনিত অসুখ বলেই মনে হচ্ছে। এই অবস্থায় কি ধরণের পদক্ষেপ নিলে রোগিণী তাঁর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন বলে আমি মনে করি, সেটা জানতে আসা।

পরের দিনই নার্সিংহোমে রোগিণীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিলেন বন্ধুটি। নানা ধরনের কথাবার্তার মধ্যে রোগিণী তাঁর উপসর্গের কারণ হিসেবে কি ভাবছেন, এইটুকু জানতে চাইছিলাম। জানতেও পারলাম। চিকিৎসক বন্ধুটিকে জানালাম, ,রোগিণীর ধারণা তাঁর পেটে একটা বিশাল কৃমি আছে। সেটাই মাঝে-মাঝে গলায় এসে হাজির হয়। অতএব রোগিণীকে আরোগ্য করতে চাইলে একটা বড় ফিতে কৃমি যোগার করে তারপর সেটাকে রোগিণীর শরীর থেকে বার করা হয়েছে এই বিশ্বাসটুকু রোগিণীর মনের মধ্যে গেঁথে দিতে পারলে আশা করি তাঁর এই সাইকো-সোমাটিক ডিসঅর্ডার ঠিক হয়ে যাবে।

কয়েক দিন  পরে বন্ধুটি আমাকে ফোনে খবর দিলেন রোগিণীর গলা থেকে পেট পর্যন্ত এক্স-রে করে তাঁকে জানানো হয়েছিল একটা বিশাল ফিতে কৃমির অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। অপারেশন করে কৃমিটাকে বের করা প্রয়োজন। তারপর পেটে অপারেশনের নামে হালকা ছুড়ি চালিয়ে রোগিণীর জ্ঞান ফেরার পর তাঁকে কৃমিটা দেখানো হয়েছে। এরপর চারদিন রোগিণী নার্সিংহোমে ছিলেন। গলার কোনও উপসর্গ নেই। রোগিণীও খুব খুশি। বারবার ধন্যবাদ জানিয়েছেন ডাক্তার বন্ধুটিকে।

বিশ্বাসবোধকে যে শুধুমাত্র চিকিৎসকেরাই কাজে লাগান, তা নয়। অনেক তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতাধরেরাও বিশ্বাসবোধকে কাজে লাগিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগ নিরাময় ঘটিয়ে অলৌকিক ‘ইমেজ’ বজায় রাখেন অথবা বর্ধিত করেন।

সত্তর ও আশি’র দশকে কলকাতার ‘ফুঁ বাবা’ ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার গোবিন্দপুর অঞ্চলের ‘ডাব বাবা’ তো জীবন্ত কিংবদন্তী হয়ে গিয়েছিলেন। এঁরা দু’জনেই সর্বরোগহর হিসেবে প্রসিদ্ধি পেয়েছিলেন।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x