বার্ষিক বৃত্তিদান অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তৃতা

মাননীয় সভাপতি সাহেব, সুধু সদস্য ও অতিথিবৃন্দ এবং আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীগণ আজ আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরীর ৫ম বার্ষিক বৃত্তিদান অনুষ্ঠান উদযাপিত হচ্ছে। কিন্তু আজকের এ অনুষ্ঠানটি নতুন কোন অনুষ্ঠান নয়। বিগত ১৮.১২.৮৪ তারিখে এ লাইব্রেরীর বার্ষিক অনুষ্ঠানের কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত একটি অসম্পূর্ণ বিষয় সম্পন্ন করার অধিবেশন মাত্র।

এ লাইব্রেরীটির উদ্বোধন পর্বে পৌরহিত্য করেছিলেন তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলা প্রশাসক মাননীয় আব্দুল আউয়াল সাহেব বিগত ২৫.১.৮১ তারিখে। এবং তিনি স্বহস্তে বৃত্তি প্রদান করেছিলেন উত্তর লামচরি ও দক্ষিণ লামচরির দুইটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দ্বিতীয় বছর বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে চরমোনাই মাদ্রাসা প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তৃতীয় বছর বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে চরবাড়িয়া লামচরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। চতুর্থ বছর বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে লামচরি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ ৫টিতে এবং বর্তমান পঞ্চম বছর বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে চরবাড়িয়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সহ মোট ৭টি বিদ্যালয়ে। জানিনা আমার মুমূর্ষু জীবনে বৃত্তিদানযোগ্য বিদ্যালয়ের আরো সংখ্যাবৃদ্ধি দেখতে পাবো কিনা। কিন্তু বৃত্তিদানের ব্যাপারে আমি এমন একটি চিরস্থায়ী ব্যবস্থা করে রেখেছি, যাতে আমার মৃত্যুর পরে এধরনের দ্রুত না হলেও, ভবিষ্যতে প্রতি ৫-৬ বছর পর পর একটি করে বৃত্তিদানযোগ্য বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, যদি লাইব্রেরী কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখেন।

ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠানুরাগ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বার্ষিক বৃত্তি ছাড়া আমি আর একটি নিয়ম প্রবর্তন করেছি ১৯৮৩ সাল থেকে। সে নিয়মটি হচ্ছে বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বার্ষিক পরীক্ষাকালীন যে ছাত্র বা ছাত্রীটির রোল নম্বর সর্বাধিক ছিলো, তাকে একখানা বই পুরস্কার দেওয়া হবে। রোল নম্বর পর্যালোচনার মাধ্যমে জানা যায় যে, কোন ছাত্র বা ছাত্রীটির লেখাপড়ার আগ্রহ কতটুকু বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কি হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মনে করুন, ক্লাসে একটি ছাত্রের ১৯৮৪ সালের রোল নম্বর ১০ এবং সে বার্ষিক পরীক্ষায় ১ম স্থান অধিকার করেছে। সুতরাং ১৯৮৫ সালে তার রোল ন. ১ অর্থাৎ সে এ বছর ৯ জন ছাত্র-ছাত্রীকে পরাজিত করেছে। এভাবে রোল ন. যার যত বেশি ছিলো, সে ততো বেশি সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীকে পরাজিত করেছে। সুতরাং তার এ কৃতিত্বের স্বীকৃতি দান করা সমীচীন। তাই আমি সর্বোচ্চ রোল নম্বরের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র একটি পুরস্কার প্রদানের নিয়ম প্রবর্তন করেছি। পুরস্কারটি নির্বাচিত হবে প্রাপকের পড়ার যোগ্যতার মাপকাঠিতে। পুরস্কারের বইখানা হবে শিক্ষামূলক। অদ্যকার বৃত্তিদান অনুষ্ঠানে বৃত্তি প্রাপকদের মধ্যে সর্বোচ্চ রোল ন. ছিলো ৩৮। এ নম্বরটি যার সে হচ্ছে উত্তর লামচরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ম শ্রেণীর ছাত্রী মাসুমা বেগম, পিতা – মো. আমির আলী গাজী, গ্রাম – উত্তর লামচরি। সুতরাং এ বছরের পুরস্কার তার প্রাপ্য। এ ছাড়া আর একটি পরিকল্পনা রয়েছে আমার, যা কার্যকর করার সময় এখনো আসেনি। সে পরিকল্পনাটি হচ্ছে এই যে, যদি কোন ছাত্র বা ছাত্রী একাদিক্রমে পাঁচ বছর তার রোল নম্বর ১ রাখতে সক্ষম হয়, তবে সে এই লাইব্রেরী থেকে একখানা পুস্তক উপহার পাবে। বইখানা নির্বাচিত হবে প্রাপকের শ্রেণীগত যোগ্যতার ভিত্তিতে।

আমার জীবনের ব্রত হচ্ছে মানুষের অন্ধবিশ্বাসও কুসংস্কার দূর করা। আমার মনে হয় যে, সে উদ্দেশ্য সিদ্ধির বিশেষ উপায় হচ্ছে মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি করা। অর্থাৎ লোক শিক্ষার দ্রুত অগ্রগতি সাধন করা। আর সের উদ্দেশ্য সিদ্ধির সামান্য ইন্ধন যোগাচ্ছি পুস্তকাদি প্রণয়ন, লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা ও বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে। এছাড়া আমার অন্যান্য যাবতীয় কর্মকান্ডের মুখ্য উদ্দেশ্য মানবকল্যাণ।

এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, লামচরির মতো একটি গণ্ডগ্রামে এরূপ একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে দেশের কতটুকু কল্যাণ করা যাবে? এর উত্তরে বলছি, গ্রাম দেশেরই একটি অংশ। সুতরাং একটি গ্রামের কল্যাণ দেশের আংশিক কল্যাণও বটে। আমি এ আশাও করি যে,  এ ক্ষুদ্র নিকৃষ্ট প্রতিষ্ঠানটির অনুকরণে দেশের অন্যত্র বা সর্বত্র বৃহৎ বা উৎকৃষ্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। আর যদি কখনো তাই হয়, ,তবে তখনই সার্থক হবে আমার এ হীন প্রচেষ্টা।

দেশ, প্রদেশ, জেলা তো দূরের কথা, শুধুমাত্র লামচরি গ্রামেও আমার কোনরূপ বৈশিষ্ট্য নেই বিদ্যা-বুদ্ধি বা অর্থ-সম্পদে, কথাটি আপনারা সবাই জানেন। পক্ষান্তরে এ দেশে বা এ অঞ্চলে এমন যোগ্য ব্যক্তি আছেন, যাদের একখানা পাকশালার সমান  মূল্য নেই আমার এ সমস্ত সম্পদের। আমি আশা করি, দেশের মানুষের শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁরা এ ধরণের কিছুটা অবদান রাখবেন।

দেশে হয়তো এখনো বহু লোক আছেন, যারা হচ্ছেন আমার মতোই, অর্থাৎ যাঁদের ইচ্ছা আছে কিন্তু উপায় নেই। তাঁরা হয়তো ১০-২০ জন লোক মিলে সমবায় নীতিতে এরূপ ক্ষুদ্র বা এর চেয়েও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন। ক্রমে এ ধরণের প্রতিষ্টানের প্রসার ও প্রচারের ফলে দেশের অন্যত্র বা সর্বত্র পল্লী অঞ্চলে পাবলিক লাইব্রেরী গড়ে উঠবে।

পরম পরিতাপের বিষয় এই যে, আজ সারা দেশে চলছে ভোগের তুমুল লড়াই, ত্যাগের নয়। ভোগের ময়দানে সৈন্যরা গিজগিজ করে, কিন্তু ত্যাগের ময়দান সৈন্যহীন।

মাননীয় সভাপতি সাহেব ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! আমার মূল্যহীন বক্তব্য দ্বারা আপনাদের আর অধিক কষ্ট দিতে চাই না। আপনাদের এ দুরাগমনের কষ্ট স্বীকারের জন্য সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করছি। এখন ছাত্র-ছাত্রীদের সুকোমল হস্তে বৃত্তি প্রদান ও আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করে আপনারা আমার এ কুৎসিত কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করুন।

ধন্যবাদ, শুভ হোক।

১১.১.১৯৮৫

১. মানুষের পক্ষে

২. নিবেদন

৩. সৃষ্টি রহস্য

৪. ম্যাকগ্লেসান চুলা

অপ্রকাশিত

৫. কৃষকের ভাগ্য গ্রহ

৬. সীজের ফুল

৭. সংক্ষিপ্ত জীবন বাণী

৮. ভাষণ সংকলন

৮.১ মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ভাষণ

৮.২ বাংলাদেশ সোসিও-ফিলসফিক হিউম্যানিস্ট গিল্ড সেমিনারে ভাষণ

৮.৩ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৪ নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৫ গুণী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৬ বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৭ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর বার্ষিক বিবরণী ভাষণ

৮.৮ মানবিক উন্নয়নে যুব সমাজের ভূমিকা সেমিনারে ভাষণ

৮.৯ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সভায় ভাষণ

৮.১০ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর বার্ষিক অধিবেশনে ভাষণ

৮.১১ বার্ষিক বৃত্তিপ্রদান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.১২ বাংলাদেশ কুটির শিল্প সংস্থায় ভাষণ

৮.১৩ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর বার্ষিক বিবরণী ভাষণ

৮.১৪ বাংলাদেশ দর্শন সমিতিতে ভাষণ

৮.১৫ বার্ষিক বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.১৬ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীতে ভাষণ

৮.১৭ বাংলা একাডেমীর সংবর্ধনা ভাষণ

৮.১৮ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর ষষ্ঠ বার্ষিক অনুষ্ঠানে ভাষণ

৯. নির্ঘণ্ট

১০. বিভিন্ন আলোকচিত্র

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x