সাধারণভাবে বহু মানুষের মধ্যেই একটা ধারণা রয়েছে, সত্যিই কারও কারও ‘বাণ মারা’র ক্ষমতা আছে। আদিবাসীরা যেমন বাণ মারায় গভীর বিশ্বাসী, তেমনি অ-আদিবাসীদের মধ্যেও বাণ মারায় বিশ্বাসীর সংখ্যা কম নয়।

বাণ মারায় যারা বিশ্বাসী, তাদের চোখে বিষয়টা কি? একটু দেখা যাক। বাণ মারা এক ধরনের মন্ত্রশক্তি, যার সাহায্যে অন্যের ক্ষতি করা যায়- তা সে যত দূরেই থাকুক না কেন। ক্ষতি করা যায় নানা ধরনের, যেমন ঘুসঘুসে জ্বর, কাশি, মুখ দিয়ে রক্ত ওঠা, শরীরে ঘা হওয়া, ঘা না শুকোনো, ঘন ঘন অজ্ঞান হওয়া, প্রস্রাবের রক্ত পড়া, গরুর বাঁট দিয়ে রক্ত পড়া, শরীর দুর্বল করে দেওয়া, শরীর শুকিয়ে দেওয়ায় মৃত্যু, অপঘাত মৃত্যু, অন্যের রোগ চালান করা। এছাড়াও দেখা যায়, কেউ হয়তো শত্রুতা করে কারও গরুর ওপর বাণ মারলো। এবেলা ওবেলা মিলিয়ে তিন সের দুধ দিত। কোথায় কিছু নেই গরুর বাঁট থেকে বেরোতে লাগল দুধের বদলে রক্ত। বাগানে থনথন করে উঠেছিল কুমড়ো গাছ। মাচান বেঁধে গাছটাকে ওপরে তুললেন। কড়া পড়লো রাশি রাশি। কি বিপুল সংখ্যায় কুমড়ো হবে ভেবে যখন প্রতিদিন পরম যত্নে জলসিঞ্চন করে চলেছেন, তখন হঠাৎই একদিন আবিষ্কার করলেন গাছটা কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে। গোঁড়ার মাটি আলগা করে সার চাপালেন। কিন্তু কোনও কাজ হল না, গাছটা শুকিয়ে মরে গেল। অতএব ধরে নিলেন, আসলে বাঁচানো সম্ভব ছিল না। গাছের অত ফলন দেখে কেউ হিংসেয় বাণ মেরে দিয়েছে। অতএব…।

এমনি বাণ মারার ফলেই নাকি অনেকের কোলের বাছা হঠাৎ কেমন ঝিম মেরে যায়। শরীরের পেটটা শুধু বাড়ে, আর সমস্ত শরীরটাই কমতে থাকে। কোমরের তামার পয়সা, জালের সীসে লোহা- কোন কিছুতেই কাজ হয়  না। হবে কি করে, ওকে যে বাণ মেরেছে। পোয়াতি জলজ্যান্ত বউটা বাচ্চা বিয়োতে গিয়ে মারা গেল। কেন? কেউ নিশ্চয়ই বাণ মেরেছে। এমনই শতেক অসুখ আর ঘটনার পিছনে অনেক মানুষই সর্বনাশা মন্ত্রের অদৃশ্য বাণ বা তীরের অস্তিত্ব খুঁজে পায়।

বাণ মারা শুধুমাত্র সাঁওতাল আদিবাসিদের বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে নেই। অসম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মণিপুর, ত্রিপুরা, সিকিম, উত্তরবঙ্গ এবগ্ন ভারতের বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যেই বাণ মারা প্রতি গভীর বিশ্বাস মানুষ রয়েছেন। আফ্রিকাবাসীদের অনেকেই মনে করেন, ভুডু মন্ত্রে বাণ মেরে যে কোনও শত্রুরই শারীরিক ক্ষতি করা সম্ভব। আফ্রিকার ভুডু চর্চা ইউরোপিয় দেশগুলোতেও প্রভাব বিস্তার করেছে।

শরীর বিজ্ঞানে উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার সুযোগ পাওয়া মানুষ জানতে পেরেছে, বুঝতে শিখেছে আমাদের রোগের কারণ কোনও তুক-তাক, বাণ মারা ইত্যাদি অশুভ শক্তির ফল নয়, নয় পাপের ভোগ। প্রতিটি রোগকে বিশ্লেষণ করলেই অলৌকিক কারণের হদিশ পাওয়া যাবে। যদিও এটা বাস্তব সত্য, চিকিৎসা বিজ্ঞান এখনও সব রোগ মুক্তির উপায় উদ্ভাবন করতে পারেনি। পারেনি মৃত্যুকে ঠেকাতে। কিন্তু না পারার অর্থ এই নয়- রোগের পিছনে বাণ মারা, তুক-তাকের মত অলৌকিক কিছু শক্তি কাজ করে। ক্যানসার, যক্ষ্মা, ধনুষ্টঙ্কার, গ্যাংগ্রিন, ম্যালেরিয়া, অনাহারজনিত অপুষ্টি ইত্যাদি রোগের লক্ষণকেই অনেকে বাণ মারা বা তুক-তাকের অব্যর্থ ফল বলে ধরে নেয়।

আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির, শাখা সংগঠন ও সহযোগী সংস্থাগুলো আজ পর্যন্ত দু’পাশের ওপর বাণ মারার দাবীদারদের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। কোনও ক্ষেত্রেই বাণ মারায় সমিতির কোনও সদস্যের মৃত্যু হয়নি- যদিও প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাণ মেরে মেরে ফেলার দাবীই ওঝা, গুণীন, তান্ত্রিকরা করেছিল। বাণ মারার শারীরিক প্রতিক্রিয়া দুর্বল চিত্তের অলৌকিকে বিশ্বাসীদের ক্ষেত্রেই শুধু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর সে সব ক্ষেত্রে গুণীন, তান্ত্রিকদের ক্ষমতার কাহিনী পল্লবিত হয়, ওদের ক্ষমতায় বিশ্বাসীদের সংখ্যা বাড়ে, রমরমা বাড়ে।

বাণ মেরে কারও যেমন মৃত্যু ঘটানো সম্ভব নয়, তেমনই সম্ভব নয়, মন্ত্রে অন্যের শরীরে রোগ চালান করা বা রোগমুক্ত করা। অনেক সময় রোগী চিকিৎসক ও গুণীনের সাহায্য একই সঙ্গে গ্রহণ করে। চিকিৎসার গুণে রোগ সারানোও রোগী অনেক সময় বাণ মারার ক্ষমতায় বিশ্বাসী হওয়ার দরুন গুণীনের কৃপায় রোগমুক্তি ঘটেছে বলে মনে করে। আবার অনেক সময় শুধুমাত্র গুণীনের বাণ মারায় রোগমুক্তি ঘটেছে এমন কথা দিব্যি গেলে বলার মত অনেক লোকও পেয়েছি। তাদের কেউ কেউ হয়তো মিথ্যাশ্রয়ী। কিন্তু সকলেই নন, কারণ এমনটা ঘটা সম্ভব।

রোগ সৃষ্টি ও নিরাময়ের ক্ষেত্রে আমাদের বিশ্বাসবোধের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের বহু রোগের উৎপত্তি হয় ভয়, ভাবনা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ইত্যাদি থেকে। মানসিক কারণে বহু অসুখই হতে পারে, যেমন- মাথাধরা, মাথার ব্যথা, শরীরের কোনও অংশে বা হাড়ে ব্যথা, স্পন্ডালাইসিস,স্পন্ডালাইসিস, আরথ্রাইটিস, বুক ধড়ফড়, ব্লাডপ্রেসার, কাশি, ব্রঙ্কাইল অ্যাজমা, প্লেটের গোলমাল, পেটের আলসার, কামশীতলতা, পুরুষত্বহীনতা, শরীরের কোনও অঙ্গের অসারতা, কৃশতা এমনি আরও বহু রোগ মানসিক কারণে সৃষ্ট। এইসব রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা অনেক সময়ই ঔষধি-মূল্যহীন ক্যাপসুল, ট্যাবলেট, ইনজেকশন ইত্যাদি প্রয়োগ করেন, সঠিক এবং আধুনিকতম চিকিৎসার সাহায্যে রোগ মুক্ত করা হচ্ছে, এই ধারণা রোগীর মনে সৃষ্টি করে অনেক ক্ষেত্রেই রোগীকে আরোগ্যের পথে নিয়ে যান। এই রোগীর বিশ্বাস নির্ভর এই চিকিৎসা পদ্ধতিকে বলে ‘প্ল্যাসিবো’ (Placebo) চিকিৎসা পদ্ধতি। প্ল্যাসিবো চিকিৎসা পদ্ধতি বিষয়ে ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ বইটির প্রথম খন্ডে বহু উদাহরণ সহ বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে বলে এখানে আর বিস্তৃত আলোচনায় গেলাম না। শুধু এটকু বলেই শেষ করতে চাই, যারা চিকিৎসকের সাহায্য ছাড়া বাণ মারা বা তুকতাকের ক্ষমতায় মুক্ত হয়েছে বলে মনে করে, তারা প্রতি ক্ষেত্রেই মানসিক কারণে নিজের দেহে রোগ সৃষ্টি করেছিল। এবং তাদের আরোগ্যের পেছনে বাণ মারা, তুকতাক বা তন্ত্রমন্ত্রের কোনও গুণ বা বৈশিষ্ট্য সামান্যতম কাজ করেনি, কাজ করেছেন বাণ মারা, তুকতাক ও মন্ত্র-তন্ত্রের প্রতি রোগীদের অন্ধ বিশ্বাস।