যখন বলি বাঙলা ভাষা বা বাঙলা গদ্য, তখন অসচেতন কিন্তু দৃঢ়ভাবে পুষি এমন ধারণা যে একটি ভাষা রয়েছে, যার নাম বাঙলা; এবং তার, অন্যান্য ভাষার মতোই, রয়েছে বক্তব্য প্রকাশের একটি রীতি : গদ্য। বাঙলা ভাষা বা গদ্যের এক আদর্শ রূপের ধারণা যে খুব স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে বাঙালির মনে, তার মূলে যাঁর প্রতিভা কাজ করেছে সবচেয়ে বেশি, তাঁর নাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। যে-ভাষাকে এখন বলি বাঙলা ভাষা, কয়েক দশক আগেও যাকে বলা হতো বঙ্গভাষা, বা বাঙ্গলা বা বাঙ্গালা ভাষা, রামমোহনের মতো অনেকে যাকে বলেছেন গৌড়ীয় ভাষা, উনিশশতকের শুরু দিকে যে-ভাষার কোনো নাম খুঁজে না পেয়ে অনেকেই যাকে বলতেন শুধুভাষা, তার কি রয়েছে কোনো একক রৌপ পরিচয়? সেটি কি একটি ভাষা, নাকি বহু আঞ্চলিক ভাষার সমষ্টি? যে-ভাষায় সামাজিক যোগাযোগ সম্পন্ন বা ভাবপ্রকাশ করে বিক্রমপুরের, দিনাজপুরের, চট্টগ্রামের, যশোরের, সিলেটের, বীরভূমের, ঢাকার, কলকাতার, অর্থাৎ বাঙলা ভাষাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার বাঙালি, সেগুলোই কি বাঙলা ভাষা, নাকি ওই সব আঞ্চলিক রূপ পেরিয়ে বাঙলা ভাষার রয়েছে একটি বা একাধিক সর্বজনীন ভাষিক রূপ যাকে মনে করা হয়বাঙলা ভাষা? আঞ্চলিক রূপগুলো অবশ্যই বাঙলা, ওই রূপগুলোর মধ্যে রয়েছে নানা মিল আর অমিল; কিন্তু যখন আমরা বাঙলা ভাষা বা গদ্যের কথা বলি, তখন বোঝাই না ওই আঞ্চলিক রূপগুলোকে, বোঝাই বাঙলা ভাষার দুটি মানরূপকে, যে-দুটি পেরিয়ে গেছে আঞ্চলিকতার সীমা; হয়ে উঠেছে সর্বজনীন, সর্ববঙ্গীয় বা বাঙলা ভাষা। ওই দুটি রূপের প্রথমটির, সাধুরূপটির, সুস্থিতিবিধানকর্তার নাম বিদ্যাসাগর। আজকের শিক্ষিত বাঙালির কাছে হয়তো চলতি রীতিটিই বাঙলা ভাষা; কিন্তু কয়েক দশক আগে শিক্ষিত বাঙালির কাছে বাঙলা ভাষা ছিলো সাধুভাষা, যে-ভাষা ছিলো সর্ববঙ্গীয়, যে-ভাষায় লেখার মাধ্যমে পরস্পরের সাথে জড়িত থেকেছে বাঙালি বিদ্যাসাগরের প্রতিভা বাঙালিকে দিয়েছে অনেক কিছু, কিন্তু তাঁর শ্রেষ্ঠ দান হচ্ছে বাঙলা ভাষার এক সর্ববঙ্গীয় সুস্থিত রূপ, যাকে একদা বাঙালি মনে করেছে বাঙলা ভাষা।

মানুষ ভাষিক প্রাণী; মানুষের প্রতিটি গোত্র সামাজিক যোগাযোগ বা ভাববিনিময়ের জন্যে ব্যবহার করে থাকে কোনো-না-কোনো ভাষা; তবে সব ভাষা সমান বিকশিত বামান সম্পন্ন নয়। বহু ভাষা আছে পৃথিবীতে, যেগুলো পালন করে সামাজিক যোগাযোগের প্রাথমিক দায়িত্ব; আর রয়েছে বেশ কিছু ভাষা, যেগুলো পালন করে ব্যাপক ভূমিকা। যে-সব ভাষা পালন করে ভাষার প্রাথমিক দায়িত্ব, সেগুলো হয়তো লেখাই হয় না, ব্যবহৃত হয় কোনো সংকীর্ণ অঞ্চলে। সে-সব ভাষাকে বলতে পারি উপভাষা। ব্যাপক দায়িত্ব পালন করে যে-সব ভাষা, যেগুলো পেরিয়ে যায় আঞ্চলিকতার সীমা, সামাজিক যোগাযোগের প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও যেগুলো ব্যবহৃত হয় সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায়, সেগুলোকেই সাধারণত দেয়া হয়ভাষা র মর্যাদা। প্রশ্ন করতে পারি ভাষা কাকে বলে? কালকেন্দ্রিকভাবে অর্থাৎ এক বিশেষ সময়ে এক বিশেষ অবস্থা অনুসারে ভাষা হচ্ছে একটি বিশেষআদর্শ বারীতি, বা পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত ভাষিক আদর্শ বা রীতির সমষ্টি। কালানুক্রমিকভাবে ভাষা হচ্ছে এমন এক সাধারণ ভাষা, যার বিসংহতির ফলে জন্ম নেয় একাধিক উপভাষা, বা ভাষা হচ্ছে একাধিক উপভাষার সংহতির ফলে উদ্ভূত কোনো সাধারণ ভাষা। ভূমিকা অনুসারে ভাষা হচ্ছে এমন এক উপরিপন্ন মানরূপ, যা হয়তো প্রথম ও প্রাত্যহিক ভাষা নয় তার ভাষীদের। বিভিন্ন উপভাষীদের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমই ভাষা। কোনো ভাষাই সহজাতভাবে দুর্বল নয়, পৃথিবীর সমস্ত মহৎ ভাষাই এক সময় অনুন্নত বা অবিকশিত ভাষা ছিলো। কোনো ভাষা যখন জাতি ও রাষ্টের সাথে জড়িত হয়, তখনই সূচনা হয় তার উন্নতি বা বিকাশের। প্রত্যেক আত্মমর্যাদাশীল জাতিরই থাকতে হয় একটি নিজস্ব ভাষা, যে-ভাষা পরিপূর্ণরূপে বিকশিত। জাতীয়তাবাদের চরিত্র হচ্ছে জাতির জন্যে একটি বিশেষ ভাষা নির্ধারণ করা, দেশে প্রচলিত উপভাষাগুলোর মধ্য থেকে একটিকে বেছে নিয়ে সকলের কাছে সেটিকেই ভাষারূপে উপস্থিত করা। ওই ভাষাটি হয় একটি মানভাষা, যেটি পালন করে রাষ্ট্রের বা জাতির সমস্ত ভাষিক দায়িত্ব। উনিশশতকে বাঙালির জাতীয় চেতনা উদ্যোগ নিয়েছিলো এমন একটি ভাষা স্থির করার, অজস্র মানুষের সাধনায় গ’ড়ে উঠছিলো তার কাঠামো; ওই কাঠামোকে সুস্থিত করেছিলেন বিদ্যাসাগর। পাণিনি ব্যাকরণ লিখে সুস্থিত করেছিলেন সংস্কৃত ভাষা, আর বিদ্যাসাগর বাঙলা ভাষার একটি সর্ববঙ্গীয় মানরূপ সুস্থিত করেছিলেন গদ্য লিখে।

মানভাষা এমন এক বিধিবদ্ধ ভাষিক রূপ, যা গৃহীত কোনো বড়ো ভাষাসমাজে, এবং ব্যবহৃত হয় ভাষার আদর্শ কাঠামোরূপে। ওই ভাষা বিধিবদ্ধ, অর্থাৎ নির্দিষ্ট তার সমস্ত নিয়মশৃঙ্খলা, কোনো বড়ো ভাষাসমাজ সেটিকে মানে নিজের ভাষা ব’লে, এবং ওই রূপটিকেই গণ্য করে ভাষিক শুদ্ধতার নিয়ামকরূপে। মানভাষার থাকতে হয় দুটি বড়ো গুণ :নমনীয় সুস্থিতি, ওমননীকরণশক্তি। নমনীয় সুস্থিতি বোঝায় ভাষাটি ঠিকমতো বিধিবদ্ধ হয়ে সুস্থিত হবে, তার যাচ্ছেতাই প্রয়োগ চলবে না; তবে ওই বিধিগুলো বেশি কঠোর হবে না, হবে নমনীয়, যাতে সময়বদলের সাথে সম্ভব হয় তার উৎকর্ষসাধন। মননীকরণশক্তি ভাষাকে প্রাত্যহিক যোগাযোগের ভাষা থেকে উন্নীত করে জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চার ভাষায়। মানভাষা একগুচ্ছ উপভাষা অঞ্চলকে সংহত করে একটি মানভাষাঞ্চলে, এবং প্রতিবেশী ভাষাসমাজের সাথে নির্দেশ করে নিজ অঞ্চলের স্বাতন্ত্র্য। মানভাষা তার ভাষীদের এনে দেয় মর্যাদা, তাদের প্রতিষ্ঠিত করে শক্তিমানমণ্ডলিতে, এবং নির্দেশ করে শুদ্ধতার মানরূপ। ভাষাসমাজ অনুগত থাকে তার মানভাষার প্রতি, গৌরব বোধ করে ওই ভাষা নিয়ে, এবং থাকে মানভাষাসচেতন। কোনো ভাষাকে মানভাষা হয়ে ওঠার জন্যে জয় করতে হয় দুটি সমস্যাকে : একটি বিধিবদ্ধকরণসমস্যা, আরেকটি বিশদীকরণসমস্যা। বিধিবদ্ধকরণ হচ্ছে ‘ন্যূনতম রৌপ বৈচিত্র্য বা ভিন্নতা’, আর বিশদীকরণ হচ্ছে ‘সর্বাধিক ভূমিকাগত বৈচিত্র্য বা ভিন্নতা’। ন্যূনতম রৌপ বৈচিত্র্য হচ্ছে এমন এক বিশুদ্ধ ভাষারীতি, যার প্রতিটি শব্দের রয়েছে মাত্র একটি বানান ও উচ্চারণ, প্রত্যেক অর্থের জন্যে রয়েছে মাত্র একটি শব্দ, এবং সমস্ত উক্তির জন্যে রয়েছে মাত্র একটি ব্যাকরণিক কাঠামো। সুষ্ঠু যোগাযোগের জন্যে এমন ভাষাই আদর্শ বিধি, তবে এমন সুস্থিতি অর্জন করতে পারে শুধু সংস্কৃত বা লাতিনের মতো মৃত ভাষা, যাতে বিধিবিধানের ফলে থামিয়ে দেয়া হয়েছে ভাষিক বিবর্তন। অতি বিধিবদ্ধকরণের ফলে কোনো একটি ভাষারীতি চিরকাল বা খণ্ডকালের জন্যে স্থির অবিচল হয়ে ওঠে এ-প্রক্রিয়ার বিপরীত হচ্ছে সর্বাধিক ভূমিকাগত বৈচিত্র্য : একটি পূর্ণবিকশিত ভাষার কাছে আশা করা হয় যে ভাষাটি মেটাবে তার ভাষাসমাজের সমস্ত ভাষিক প্রয়োজন। ওই ভাষা পালন করবে নানা দায়িত্ব, বহু জটিল ভূমিকা : সেটি যেমন পালন করবে ব্যক্তিগত ও সামাজিক যোগাযোগের দায়িত্ব, তেমনি সেটি দিয়ে চর্চা করা যাবে সাহিত্য ও জ্ঞানবিজ্ঞান, চালানো যাবে রাষ্ট্র; সেটিকে ক’রে তোলা যাবে দীর্ঘনিশ্বাসের মতো কোমল আর বজ্রের মতো নির্মম। এমন কোনো বাঙলা ভাষা ছিলো না উনিশশতকের আগে; এমন একটি ভাষা সৃষ্টির প্রয়াস চলে উনিশশতকের প্রথম ছ-দশক ধ’রে। ওই প্রয়াসের পরিণতিদাতা বিদ্যাসাগর। তাঁর গদ্যে বাঙালি পায় একটি বিধিবদ্ধ ভাষাকাঠামো।

বাঙলা গদ্যচর্চা ও বিদ্যাসাগর সম্পর্কে আলোচনার শুরুতে ওপরের আলোচনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কেননা বিদ্যাসাগরপরবর্তীদের গদ্য হচ্ছে ব্যক্তিগত রীতি বা স্টাইল সৃষ্টি, আর বিদ্যাসাগরের গদ্য হচ্ছে জাতির জন্যে একটি ভাষাকাঠামো সৃষ্টি। বিদ্যাসাগর একটি মান বা নম্, আর তাঁর পরবর্তীরা ওই মান অর্জন বা ওই মান থেকে স’রে যাওয়ার সাফল্য বা ব্যর্থতা। বাঙলা ভাষা বলতে কয়েক দশক আগেও যে-আদর্শ কাঠামোটিকে বোঝাতো, তা চূড়ান্তরূপে বিধিবদ্ধ হয়েছিলো বিদ্যাসাগরের গদ্যে। প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষার বিশ্লিষ্টীকরণের ফলে উদ্ভূত অপভ্রংশ থেকে একটি বাঙলা ভাষা জন্ম নেয় নি, নিয়েছিলো অনেক উপভাষা। ওই উপভাষাগুলোই, আদি, মধ্য ও উনিশশতকের কয়েক দশক জুড়ে, ছিলো বাঙলা ভাষা; তখন ছিলো না বাঙলা ভাষার কোনো মানরূপ। মধ্যযুগেই শুরু হয়েছিলো মানরূপের বিকাশ, তবে তা ঘটেছিলো অসচেতন প্রক্রিয়ায়, এবং অত্যন্ত ধীরে বিকশিত হচ্ছিলো একটি সর্ববঙ্গীয় ভাষারীতি, যা উনিশশতকে রূপ নেয় সাধুভাষার। উনিশশতকের আগে বাঙলা ভাষার ছিলো নানা আঞ্চলিক বৈচিত্র্য, তা ছিলো অনুন্নত অবিকশিত ভাষা; তার রূপ বিধিবদ্ধ হয় নি, ভূমিকাও বিশদ হয় নি। তখন তার ছিলো ব্যাপক রৌপ বৈচিত্র্য, কিন্তু ভূমিকাগত বৈচিত্র্য ছিলো সীমাবদ্ধ। উনিশশতকেই সচেতনভাবে বিকাশ ঘটানো হয় একটি বিধিবদ্ধ মান বাঙলা ভাষার। উনিশশতকীরা অবশ্য খুঁজেছিলেন একটি লেখ্য বাঙলা মানভাষারূপ, যাতে সৃষ্টি করা যাবে সাহিত্য, চর্চা করা যাবে জ্ঞানবিজ্ঞান, প্রচার করা যাবে সংবাদ, পালন করা যাবে লেখ্য সমস্ত দায়িত্ব। এরই ফলে উদ্ভূত হয় সাধুরীতিটি, যা শুধুই লেখ্য। উনিশশতকের বাঙলা মানভাষাসন্ধানীরা একটি সর্বগ্রাসী জীবন্ত মানভাষা সৃষ্টির বদলে উদ্ভাবন করেন সীমাবদ্ধ দায়িত্বপালনের উপযোগী একটি ভাষারীতি। এতে অবশ্য তাঁদের কৃতিত্ব অসামান্য : তাঁরা ভাষাটির ভূমিকা বিশদ করতে না পারলেও বিধিবদ্ধ করতে পেরেছিলেন ভাষাটির মানরূপ। এ-মানরূপ বিধিবদ্ধকরণে যাঁর ভূমিকা প্রধান, তিনি বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগর শুধু ব্যক্তিগত রীতি নন, তিনি বাঙলা ভাষার কাঠামো।

অনেক ভাষাঞ্চলে দেখা যায় এমন পরিস্থিতি : কোনো ভাষার একটি রূপ ব্যবহৃত হয় লেখায় ও সাহিত্যে, আরেকটি রূপ কথোপকথনে বা সামাজিক যোগাযোগে। এটা দ্বিরীতিক পরিস্থিতি, যাতে একটি রীতিকে মনে করা হয় উচ্চ অন্যটিকে নিম্ন। উচ্চরীতিটি পায় ভাষার মর্যাদা। উনিশশতকের প্রথমার্ধে মানভাষাসন্ধানীরা সৃষ্টি করেছিলেন একটি উচ্চরীতি, যার নাম সাধুভাষা বা রীতি। বাঙলা মানভাষা বিধিবদ্ধকরণপ্রক্রিয়ার একটি মহিমাময় পরিণতি সাধুরীতি। মধ্যযুগে কোনো মান বাঙলা ভাষা ছিলো না, ছিলো নানা আঞ্চলিক ভাষিক বৈচিত্র্য; তবে মধ্যযুগের সাহিত্যও এগিয়ে চলছিলো একটি ভাষিক আদর্শের দিকে, যাকে উনিশশতকের গদ্যলেখকেরা দেন সুসংবদ্ধ সুস্থিত মানরূপ। সাধুভাষায় বিধিবদ্ধকরণপ্রক্রিয়াটি সফলভাবে কাজ করে, তাই রীতিটি অর্জন করে সুস্থিতি; কিন্তু তাঁরা এর ভূমিকা বিশদ করতে পারেন নি, তাই এটি হয়ে ওঠে অর্ধেক দায়িত্ব পালনের উপযোগী, অর্থাৎ শুধুই লেখ্য। তবু সাধুরীতি উদ্ভাবন ও বিধিবদ্ধকরণ ঘটনা হিশেবে অসামান্য, কেননা বাঙালি এ-রীতিতেই প্রথম পায় তার ভাষার একটি সর্ববঙ্গীয় আদর্শরূপ; এবং এটিকেই মনে করে নিজের ভাষা। তাঁরা সৃষ্টি করেছিলেন বাঙালির জন্যে একটি ভাষা, বিধিবদ্ধ করেছিলেন তার রূপ, এবং ওই রূপটি ব্যবহার করেছিলেন একটি আধুনিকতামনস্ক জাতির বাস্তব ও স্বপ্নকে ধরার জন্যে। উনিশশতকে বাঙলা ভাষা নিয়েছিলো সাধুরীতির রূপ, যার ব্যাপকতার সাথে পূর্ববর্তী বাঙলা ভাষাগুচ্ছের কোনো তুলনা হয় না। বিদ্যাসাগরের গদ্যে ওই রীতিটি পায় চূড়ান্ত রূপ; বিদ্যাসাগর বাঙালিকে উপহার দেন একটি ভাষা।

সাধুরীতি মনে পড়িয়ে দেয় বিদ্যাসাগরকে, আর বিদ্যাসাগর মনে পরিয়ে দেন সাধুরীতি, ও গদ্যকে। বিদ্যাসাগর, সাধুভাষা বা রীতি, গদ্য অবিচ্ছেদ্য; বিদ্যাসাগর অর্থই গদ্য বা সাধুভাষা। মধ্যযুগ থেকে উনিশশতক পর্যন্ত বাঙলা গদ্যের, সাধুভাষার, যে-বিকাশ ঘটে, তাতে চোখে পড়ে দুটি ব্যাপার : ওই গদ্য পড়ার সময় অবিরাম বোধ করতে হয় যে মধ্যযুগের বাঙালি চিন্তা করতে শেখে নি; তাই সৃষ্টিও করতে পারে নি চিন্তাপ্রকাশের উপযুক্ত ভাষার রূপ। ভাষা ও চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করে পরস্পরকে; বিকশিত ভাষা ঘটাতে পারে চিন্তার বিকাশ, এবং গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা ভাষাকে দিতে পারে গুরুত্বপূর্ণ রূপ। বাঙালি চিন্তা করতে শেখে উনিশশতকে, তাই উনিশশতকেই বিকাশ ঘটে গদ্যের। ষোড়শ থেকে উনিশশতকের ছ-দশক ধ’রে চলেছিলো বাঙলা গদ্যের আদর্শকাঠামোর খোঁজ : স্থির করতে হয়েছিলো বাঙলার শব্দসম্ভার, বিধিবদ্ধ করতে হয়েছিলো শব্দের রূপ ও বানান, সুস্থিত করতে হয়েছিলো বাক্যকাঠামো, এবং শব্দসম্ভারকে পূর্ণ করতে হয়েছিলো অভিনব বিভিন্ন অর্থে। সেটা ছিলো না গদ্যশিল্পসৌন্দর্য সৃষ্টির সময়, ছিলো গদ্যসৃষ্টির সময়, যার জন্যে দরকার ছিলো মূল্যবান সুশৃঙ্খল চিন্তা। যদি ষোলো বা সতেরো শতকে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা জাগতো বাঙালির মনে বা মস্তিষ্কে, গদ্যের বিকাশ ঘটতো সে-সময়েই, তখনই পাওয়া যেতো বাঙলা ভাষার আদর্শ কাঠামো। বাঙলা গদ্য প্রথম চিন্তা করতে শুরু করে বিদেশিদের রচনায়, আইনের অনুবাদে; বাঙালির লেখা উনিশশতকপূর্ব গদ্যের যে-উদাহরণ পাই, তা বেদনাদায়ক এজন্যে নয় যে ওই গদ্য অবিকশিত; তা শোকাবহ এ-কারণে যে বাঙালি চিন্তা করতে শেখে নি। বিদ্যাসাগরের বেতালপঞ্চবিংশতির (১৮৪৭) পূর্ব পর্যন্ত যে-গদ্য পাই, তার রূপ বিধিবদ্ধ হয় নি, শব্দসম্ভার অনির্ণীত ও শব্দের রূপ অবিধিবদ্ধ, বাক্য বিশৃঙ্খল; তবে এসবই বাইরের ব্যাপার, যা ভেতরের তা হচ্ছে বাঙালির মস্তিষ্কে জন্মে নি সুশৃঙ্খল ও মূল্যবান চিন্তা। ছিন্নবিচ্ছিন্ন আবেগ কবিতা জাগাতে পারে, কিন্তু গদ্যের জন্যে দরকার সুশৃঙ্খল চিন্তা।

সুশৃঙ্খল চিন্তা কতো দুরূহ, তা ভাষায় প্রকাশ কেমন দুরূহতর, তা বিদ্যাসাগরের পূর্ববর্তী সাধারণদের চেষ্টা থেকে নয়, এক অসাধারণের প্রয়াস থেকেই অনুমান করতে পারি। তিনি রামমোহন, যিনি বাঙলা ভাষার ব্যাকরণ লিখেছিলেন, বাঙলা ভাষার প্রকৃতিও বুঝেছিলেন, কিন্তু বাঙলা ভাষাটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন নি। রামমোহন বেদান্ত গ্রন্থ-এর (১৮১৫) ‘অনুষ্ঠান’-এ চিন্তা ও বাক্যের দ্বন্দ্ব মেটানোর জন্যে দিয়েছিলেন এমন পরামর্শ :

প্রথমত বাঙলা ভাষাতে আবশ্যক গৃহব্যাপার নির্ব্বাহের যোগ্য কেবল কথকগুলিন শব্দ আছে এ ভাষা সংস্কৃতের জেরূপ অধীন হয় তাহা অন্য ভাষার ব্যাখ্যা ইহাতে করিবার সময় স্পষ্ট হইয়া থাকে দ্বিতীয়ত এ ভাষায় গদ্যতে অদ্যাপি কোনো শাস্ত্র কিম্বা কাব্য বর্ণনে আইসে না ইহাতে এতদ্দেশীয় অনেক লোক অনভ্যাসপ্রযুক্ত দুই তিন বাক্যের অন্বয় করিয়া গদ্য হইতে অর্থ বোধ করিতে হঠাৎ পারেণ না ইহা প্রত্যক্ষ কানুনের তরজমার অর্থবোধের সময় অনুভব হয় অতএব বেদান্তশাস্ত্রের ভাষার বিবরণ সামান্য আলাপের ভাষার ন্যায় সুগম না পাইয়া কেহ2 ইহাতে মনোযোগের নূন্যতা করিতে পারেণ এ নিমিত্ত ইহার অনুষ্ঠানের প্রকরণ লিখিতেছি। জাঁহাদের সংস্কৃতে ব্যুৎপত্তি কিঞ্চিতো থাকিবেক আর জাঁহারা ব্যুৎপন্ন লোকের সহিত সহবাস দ্বারা সাধু ভাষা কহেন আর সুনেন তাঁহাদের অল্প শ্রমেই ইহাতে অধিকার জন্মিবেক। বাক্যের প্রারম্ভে আর সমাপ্তি এই দুইয়ের বিবেচনা বিশেষ মতে করতে উচিত হয়। জে২ স্থানে যখন জাহা জেমন ইত্যাদি শব্দ আছে তাহার প্রতিশব্দ তখন তাহা সেই রূপ ইত্যাদিকে পূর্ব্বের সহিত অন্বিত করিয়া বাক্যের শেষ করিবেন। যাবৎ ক্রিয়া না পাইবেন তাবৎ পর্যন্ত বাক্যের শেষ অঙ্গীকার করিয়া অর্থ করিবার চেষ্টা না পাইবেন।

বিদ্যাসাগরপূর্ব বাঙলা গদ্যের প্রায় সব বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাবে উদ্ধৃতিটিতে : অনেক শব্দের রূপ ও বানান স্থির হয় নি, বাক্যের কাঠামো পায় নি নিশ্চিত অবয়ব, শব্দের ক্রম অস্থির; তবে এতে চিন্তার চেষ্টা স্পষ্ট। কিন্তু চিন্তা যে পদেপদে বিপন্ন এখানে, তা ধরা পড়ে, যা আরো বড়ো হয়ে ধরা পড়ে এরও আগের গদ্যে। শীর্ণ চিন্তা যেমন পাওয়া যায় সতেরোশতকের কড়চায় : ‘তুমি কি। আমি জীব। তুমি কোন জীব। আমি তটস্থ জীব। থাকেন কোথা। ভাণ্ডে।’, তেমনি পাওয়া যায় রামরাম বসুর রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র-এ (১৮০১) : ‘সংপ্রতি সর্ব্বারম্ভে এ দেশে প্রতাপাদিত্য নামে এক রাজা হইয়াছিলেন তাহার বিবরণ কিঞ্চিত পারস্য ভাষায় গ্রন্থিত আছে সাঙ্গ পাঙ্গ রূপে সামুদাইক নাহি’, পাওয়া যায় বিদ্যাসাগরপূর্ব সমগ্র গদ্যে। বিদ্যাসাগরপূর্ব গদ্যের সাথে এক দিকে চম ৎকার মিল রয়েছে চর্যাপদের ভাষার; হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদের ভাষাকে যেমন বলেছিলেন সন্ধ্যাভাষা, বিদ্যাসাগরপূর্ব বাঙলা গদ্যকেও তেমনি বলতে পারি সন্ধ্যাভাষা বা সন্ধ্যাগদ্য, যার আলোআঁধারি জন্মেছে চিন্তার আলোআঁধারি থেকে। বিদ্যাসাগরে কেটে যায় আঁধারটুকু, জ্ব’লে ওঠে আলো। বিদ্যাসাগর পূর্ববর্তীদের থেকে পাওয়া ভাষার সমস্ত বিশৃঙ্খলাকে বিন্যস্ত করেন একটি সুশৃঙ্খল ভাষাকাঠামোতে, যার শব্দসম্ভার সুপরিকল্পিত, শব্দের রূপ বিধিবদ্ধ, বানান সুস্থির, এবং বাক্যকাঠামো সুস্থিত অবয়বসম্পন্ন। বিদ্যাসাগরই প্রথম বাঙালি, যিনি আয়ত্ত করেছিলেন সুশৃঙ্খল চিন্তা ও সুশৃঙ্খল বাক্য। মালার্মে বলেছেন কবির কাজ গোত্রের ভাষাকে পরিস্রুত করা; বিদ্যাসাগর কবি ছিলেন না, কিন্তু তিনি পরিস্রুত করেছিলেন তাঁর জাতির ভাষা। তিনি জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন একটি ভাষাকাঠামো, যার স্থান ব্যক্তিগত গদ্যরীতি বা স্টাইলের অনেক ওপরে

যে-কোনো ভাষা চারটি স্তরের : ধ্বনি, রূপ বা শব্দ, বাক্য ও অর্থের সৃষ্টিশীল সংশয়। মানভাষাকে বিধিবদ্ধ হ’তে হয় চারটি স্তরেই, এবং লিখিত মানভাষার জন্যে দরকার সুস্থির বানানরীতি। বিদ্যাসাগর এ-চারটি স্তর ও বানানরীতিতে, প্রতি ক্ষেত্রেই, পরিচয় দেন তাঁর পূর্ববর্তী ও সমকালীনদের থেকে অনেক বেশি সুপরিকল্পনার ও সুস্থিরতার : তাঁর কোনো বানান বিশৃঙ্খল নয়, কোনো শব্দ অব্যবস্থিত নয়, যা অন্যদের লেখায় তখন ছিলো স্বাভাবিক; তাঁর কোনো শব্দে নেই ‘গ্রাম্য বর্বরতার’ ছাপ– হঠাৎ একটি অপভ্রষ্ট শব্দ ব্যবহার ক’রে তিনি বোধকে আকাশ থেকে আবর্জনায় নামিয়ে আনেন নি, তাঁর কোনো সমাসবদ্ধ পদ উৎকট নয়, এবং তাঁর বাক্য সুশৃঙ্খল চিন্তার সুস্থির প্রকাশ। বিদ্যাসাগরের গদ্যে প্রথমেই চোখে পড়ে বাঙলা ভাষার শাব্দ অবয়বের সুষ্ঠু পরিকল্পনা। বহু উপভাষার মধ্য থেকে একটিকে মান বাঙলা ভাষায় রূপ দিতে গিয়ে বাড়াতে হয়েছিলো শব্দসম্ভার, অনিবার্য হাত পাততে হয়েছিলো সংস্কৃতের কাছে। জাতির জীবনের সমস্ত লিখিত দায়িত্ব পালন সম্ভব ছিলো না তদ্ভব ও আঞ্চলিক, এবং কিছু বিদেশি শব্দে; তাই তৎসম শব্দের উদারতায় গ’ড়ে তুলতে হয়েছিলো অভিনব বাঙলা ভাষার শাব্দ অবয়ব। উনিশশতকের দ্বিতীয়াংশ থেকে, অনেকের মনে, এমন ধারণা জন্ম নিতে থাকে যে ফোর্ট উইলিয়মের ভেতর ও বাইরের পণ্ডিতদের ষড়যন্ত্রে বাঙলা ভাষা হয়ে ওঠে সংস্কৃতের উপনিবেশ; নইলে দেশি-তদ্ভব ও ইসলামি শব্দে বাঙলা হয়ে উঠতো একটি চমৎকার ভাষা। খুব ভুল ধারণা এটি; সংস্কৃতের সাহায্য ছাড়া বহু-আঞ্চলিক বাঙলা ভাষা আজকের বাঙলা ভাষা হয়ে উঠতে পারতো না। বিদেশি শব্দ সম্পর্কে বাঙলা ভাষাঞ্চলে অনেক দিন ধরেই চলছে একটি ভুল ধারণা : একদল বাঙলা ভাষায় বিদেশি শব্দের প্রাচুর্যকে সমৃদ্ধি ব’লে মনে করেন, তবে তা সমৃদ্ধি নয় দারিদ্র্য। বাঙলা ভাষায় বিদেশি শব্দ ঢুকেছে ভাষাসাম্রাজ্যবাদী প্রক্রিয়ায়, তার অধিকাংশই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বাঙলা ভাষার ওপর। বাঙলা ভাষা বিদেশি শব্দ নিজের প্রয়োজনে স্বেচ্ছায় নেয় নি, রাজনীতিক কারণে ওগুলো ঢুকেছে বাঙলা ভাষায়। সংস্কৃতের কাছে ঋণ করা ছাড়া বাঙলা ভাষার একটি শক্তিশালী কাঠামো বিধিবদ্ধ করা অসম্ভব, এটা বুঝেছিলেন বিদ্যাসাগর। তাঁর পরিমিতিবোধও ছিলো অসামান্য।

বাঙলা ভাষার শাব্দ অবয়ব পরিকল্পনায় বিদ্যাসাগর পরিচয় দিয়েছিলেন অন্যদের থেকে গভীর অন্তর্দৃষ্টির : তিনি তৎসম, তদ্ভব ও বিদেশি শব্দের অনুপাত স্থির করেছিলেন ঠিকভাবে, এবং করেছিলেন তার সুষ্ঠু প্রয়োগ। তাঁর গদ্যে প্রত্ন বা অপরিচিত শব্দ বেশি মেলে না; ‘নির্বত, আস্যে, দুর্বিগাহ, একৈকের, প্রত্যানিত, ক্রব্যাদ, প্রত্যাহর্তা, রশ্মি (বল্লা), সংহিত, দীর্ঘায়ুরস্তু, দুষ্পরিহর ‘-এর মতো শব্দ কিছু মেলে, কিন্তু মনে হয় না উৎকট, কেননা তা বিষয়ের সাথে খাপ খেয়েছে চমৎকারভাবে। তাঁর সমাসও পীড়াদায়ক নয়, সাধারণত চারটির বেশি শব্দের সমাস করেন নি তিনি, যখন করেছেন তখন নিয়েছেন পরিচিত মনোরম শব্দ। তাঁর সমাসবদ্ধ শব্দ সাধারণত ‘লোকান্তরপ্রাপ্তি, লক্ষযোজনবিস্তীর্ণ, বোধসুধাকর, নবমালিকাকুসুমকোমলা, গিরিতরঙ্গিণীতীরবর্তী ধরনের। বাক্যিক প্রয়োজনে তিনি বারবার ব্যবহার করেছেন ‘পূর্বক’যুক্ত শব্দ : প্রাণসংহারপূর্বক, আহ্লাদপ্রদর্শনপূর্বক, অবগাহনপূর্বক, প্রবেশপূর্বক, পরিত্যাগপূর্বক, বিরাগপ্রদর্শনপূর্বক, অপত্যস্নেহবিস্মরণপূর্বক, রাজ্যাধিকারপরিহারপূর্বক, অতিদীর্ঘনি শ্বাসভারপরিত্যাগপূর্বক’ প্রভৃতি এবং ‘সমভিব্যাহারে, কার্যান্তরব্যপদেশে, যৎপরোনাস্তি’ প্রভৃতিও মেলে মাঝেমাঝে। তিনি ‘মাদৃশ, এতাদৃশী, ঈদৃশ, এতাদৃশ’ ধরনের সর্বনাম ও নির্দেশক ব্যবহার করেছেন, এবং তিনিই প্রথম ব্যবহার করেছেন দ্বিতীয় পুরুষের সম্মানসূচক সর্বনাম ‘আপনি’। তাঁর আগে আত্মবাচক ‘আপন’ পাওয়া যায়, কিন্তু দ্বিতীয় পুরুষ সম্মানসূচক ‘আপনি’ প্রথম মেলে বিদ্যাসাগরেই। তিনি ‘জিজ্ঞাসিলেন, সম্বোধিয়া র মতো নামধাতু ব্যবহার করেছেন, বাঙলা ভাষার ক্রিয়ার অভাব কাটানোর জন্যে প্রচুর ব্যবহার করেছেন ‘গমন করিলেন’-ধরনের যুক্ত ক্রিয়া, কিন্তু ‘জন্ম গ্রহণ করে বা করিল’ না লিখে ‘জনে’ ও লিখেছেন প্রচুর। তিনি ‘সখে, শকুন্তলে, অনুসূয়ে, প্রিয়বন্ধো, কুলগুরো, হা পরমোপকারিন্ সখে, বিধে’ ধরনের সম্বোধন ব্যবহার করেছেন প্রচুর। অনুপ্রাসের সুমিত ব্যবহার পাই তাঁর রচনায় : ‘শীতল সুগন্ধ গন্ধবহের মন্দ মন্দ সঞ্চার, মধুকর মাধবীলতার অভিনব মুকুলে মধুপান করিতেছিল, গিরির শিখরদেশ আকাশপথে সতত সঞ্চরমাণ জলধরমণ্ডলীর যোগে নিরন্তর নিবিড় নীলিমায় অলঙ্কৃত, এই সেই সিদ্ধ শবরী শ্রমণা’র সঙ্গীত যেমন পাই, তেমন পাই ‘বুঝিলাম, আজ উদ্যানলতা, সৌন্দর্যগুণে, বনলতার নিকট পরাজিত হইল’র মতো কবিত্ব।

বিদ্যাসাগর সাধুভাষার কাঠামো বিধিবদ্ধ ও সুস্থিত করেছিলেন একটি, তবে বিষয় ও লক্ষ্য অনুসারে সৃষ্টি করেছিলেন তিনটি ব্যক্তিগত গদ্যরীতি বা স্টাইল। সাধুভাষার যে-কাঠামোটি চূড়ান্তরূপে সুস্থিতি পায় তাঁর প্রধান রচনাগুলোতে, অন্যদের বই থেকে জন্ম নেয়া তাঁর মৌলিক বইগুলোতে, সেটিই তাঁর প্রধান বা বিদ্যাসাগরী রীতি : ওই রীতিটি তিনি ব্যবহার করেন তাঁর কথাশ্রেণীর বইগুলোতে। বেতালপঞ্চবিংশতি (১৮৪৭), শকুন্তলা (১৮৫৪), সীতার বনবাস (১৮৬০), ভ্রান্তিবিলাস-এ (১৮৬৯) মুদ্রিত তাঁর এ-মহিমামণ্ডিত রীতিটি। এ-রীতিটিই কিছুটা কঠোর কর্কশ হয়ে ওঠে বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব [প্রথম ও দ্বিতীয় পুস্তক (১৮৫৫)], বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার [প্রথম ও দ্বিতীয় পুস্তক (১৮৭১, ১৮৭৩)], এবং কোমল হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত শোকাকুল প্রভাবতীসম্ভাষণ-এ। তাঁর প্রধান রীতির একটি সরলিত রূপ ব্যবহার করেন তিনি পাঠ্যপুস্তকগুলোতে : কথামালা (১৮৫৬), বোধোদয় (১৮৫১), বর্ণপরিচয়-এ (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ, ১৮৫৫)। তিনি তাঁর প্রধান রীতিটিতে কিছুটা সাধুচলতি মিশিয়ে, আরবিফারসি শব্দ ছড়িয়ে তৈরি করেন একটি লঘু পরিহাসপরায়ণ গদ্যরীতি, যার পরিচয় পাই অতি অল্প হইল (১৮৭৩), আবার অতি অল্প হইল (১৮৭৩), ব্রজবিলাস (১৮৮৪), রত্নপরীক্ষা (১৮৮৬) প্রভৃতিতে। তবে তাঁর তিনটি রীতি একই সাধুরীতির তিন রকম উৎসারণ।

বিদ্যাসাগরের গদ্য বাক্যকেন্দ্রিক, তাঁর গদ্যে লক্ষণীয় হচ্ছে বাক্যসৃষ্টির কৌশল। বিদ্যাসাগরের স্বভাবে চিন্তা বা ভাব পরস্পরসম্পর্কিত, পরম্পরাগ্রথিত। তিনি সুশৃঙখল পরম্পরায় প্রকাশ করেছেন চিন্তা বা ভাব, তাই সরল সংক্ষিপ্ত বাক্য সৃষ্টি করেছেন কম; তিনি রচনা করেছেন সাধারণত মিশ্রবাক্যসংগঠন। মিশ্রবাক্যসংগঠনের ভেতরে তিনি গেঁথে দিয়েছেন উপবাক্যের পর উপবাক্য; একাধিক মিশ্রবাক্যসংগঠনকে পরিণত করেছেন যৌগিক সংগঠনে, এবং যখনি কোনো পদ বা উপবাক্যের ভাব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে তাঁর, তিনি সেটি বসিয়ছেন কমার ভেতরে। এমনকি নিয়ে এসেছেন বাক্যের শুরুতে, এবং সেটিকে কমা দিয়ে বিচ্ছিন্ন ক’রে রেখেছেন বাক্যের পরবর্তী অংশ থেকে। তাঁর বাক্যে বিভিন্ন যতিচিহ্নের, কমা ও সেমিকোলনের, যে-প্রাচুর্য দেখা যায়, তা বিশেষবিশেষ ভাবকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার জন্যেই। কয়েকটি সরল বাক্য নিচ্ছি :

[ক] একদা, এক বাঘের গলায় হাড় ফুটিয়াছিল।

[খ] এক কুকুর, মাংসের এক খণ্ড মুখে করিয়া, নদী পার হইতেছিল।

[গ] এক ব্যাঘ্র, পর্বতের ঝরনায় জলপান করিতে করিতে, দেখিতে পাইল, কিছু দূরে, নীচের দিকে, এক মেষশাবক জলপান করিতেছে।

প্রথম বাক্যে একটি, দ্বিতীয়টিতে দুটি, এবং তৃতীয়টি পাঁচটি কমা ব্যবহার করেছেন বিদ্যাসাগর, যেখানে আজ কোনো কমাই ব্যবহার করা হবে না। তিনি ব্যবহার করেছেন, কেননা প্রতিটি পৃথক ও গুরুত্বপূর্ণ ভাবকে তিনি পৃথক মূল্য দিয়েছেন। তাঁর কথাশ্রেণীর রচনাগুলোতে ভাব এসেছে একের পর এক, যেগুলোকে তিনি পৃথক সরল বাক্যে প্রকাশ না ক’রে দিয়েছেন মিশ্রবাক্যসংগঠনের রূপ। সরল বাক্য ভাষাকে সরল করে না, আবার মিশ্র বা যৌগিক বাক্যও ভাষাকে জটিল করে না; জটিলতা সৃষ্টি হয় যদি বাক্য থেকে লুপ্ত হয়ে যায় বাক্যের জন্যে আবশ্যিক উপাদান। বিদ্যাসাগর সংযোগ ও মিশ্রণ ঘটিয়েছেন বাক্যের, কিন্তু আবশ্যিক উপাদান লোপ করেন নি; তাই তাঁর বাক্য দুর্বোধ্য নয়। বিদ্যাসাগর কথাশ্রেণীর রচনাগুলোতে বিবৃত করেছেন ঘটনা ও অনুভবক্রম, ওই ক্রমের প্রয়োজনে তিনি ব্যবহার করেছেন এমন এক ধরনের বাক্যসংগঠন, যাকে বলতে পারি ক্রমিক বাক্যসংগঠন। এ-ধরনের সংগঠন তৈরি হয় ‘ইয়া’- বা ‘পূৰ্বক’-অন্ত অসমাপিকা ক্রিয়ার বারবার ব্যবহারে। দুটি উদাহরণ :

[ক] রাজা, অমরফল বারাঙ্গনার হস্তগত দেখিয়া, বিস্ময়াপন্ন হইলেন; এবং, ফল লইয়া, পুরস্কারপ্রদানপূর্বক, তাহাকে বিদায় দিয়া, ভাবিতে লাগিলেন, এই ফল রাজ্ঞীকে দিয়াছি; ইহা কিরূপে বারাঙ্গনার হস্তগত হইল। পরে, সবিশেষ অনুসন্ধানদ্বারা, তিনি পূর্বাপর সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইলেন, এবং, সাংসারিক বিষয়ে নিরতিশয় বীতরাগহইয়া, বিবেচনা করিতে লাগিলেন, সংসার অতি অকিঞ্চিৎকর, ইহাতে সুখের লেশমাত্র নাই; অতএব, বৃথা মায়ায় মুগ্ধহইয়া, আর ইহাতে লিপ্ত থাকা, কোনও ক্রমে, শ্রেয়স্কর নহে [ বেতালপঞ্চবিংশতি।

[খ] সীতার ক্রন্দনশব্দ শ্রবণগোচরকরিয়া, সন্নিহিত ঋষিকুমারেরা শব্দ অনুসারে ক্রন্দনস্থানে উপস্থিত হইলেন; দেখিলেন, এক অসূর্যম্পশ্যারূপা কামিনী, হাহাকার ও শিরে করাঘাতকরিয়া, অশেষবিধ বিলাপ ও পরিতাপ করিতেছেন।দেখিয়া, তাঁহাদের কোমল হৃদয়ে যার পর নাই কারুণ্যরস আবির্ভূত হইল। তাঁহারা, ত্বরিত গমনে বাল্মীকিসমীপে উপস্থিতহইয়া, বিনয়ম্র বচনে নিবেদন করিলেন, ভগবন্! আমরা, ফল কুসুম কুশ সমিধ আহরণের নিমিত্ত, ভাগীরথীসন্নিহিত অটবীবিভাগে পর্যটন করিতেছিলাম; অকস্মাৎ স্ত্রীলোকের আর্তনাদ শুনিতে পাইলাম, এবং ইতস্ততঃ অনুসন্ধানকরিয়া, কিয়ৎ ক্ষণ পরে দেখিতে পাইলাম, এক অলৌকিক রূপলাবণ্যে পরিস্ফূর্ণা কামিনী, নিতান্ত অনাথার ন্যায়, একান্ত কাতরা হইয়া, উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতেছেন। তাঁহাকে দেখিলে বোধ হয়, যেন কমলা দেবী ভূমণ্ডলে অবতীর্ণা হইয়াছেন [সীতার বনবাস]।

প্রথম উদাহরণে বিদ্যাসাগর কয়েকটি বাক্যকে নানাভাবে রূপান্তরিত ক’রে পরিণত করেছেন দুটি মিশ্রবাক্যে। প্রথম বাক্যটির শুরুতেই তিনি একটি সরল বাক্যের [রাজা বিস্ময়াপন্ন হইলেন] ভেতরে কর্মরূপে গ্রথিত করেছেন একটি উপবাক্য [অমরফল বারাঙ্গনার হস্তগত দেখিয়া (= দেখিলেন)], যার ক্রিয়াটি পেয়েছে অসমাপিকারূপ; তারপর ব্যবহার করেছেন সমাপিকা ক্রিয়া। এর ফলে বাঙলা বাক্যে কর্তা-কর্ম-ক্রিয়ার ক্রম স্থির রয়েছে। এ-মিশ্রবাক্যটির সাথে যুক্ত করেছেন আরেকটি মিশ্র বাক্য, যাতে ক্রমিকভাবে এসেছে সংকুচিত উপবাক্য-’ফল লইয়া’, ‘পুরস্কারপ্রদানপূর্বক’, ‘তাহাকে বিদায় দিয়া’, এবং শেষে বসিয়েছেন সমাপিকা ক্রিয়া, এবং এর সাথে সম্পূরক উপবাক্যরূপে গেঁথে দিয়েছেন একটি যৌগিক বাক্য- ‘এই ফল রাজ্ঞীকে দিয়াছিঃ ইহা কিরূপে বারাঙ্গনার হস্তগত হইল’ [= এই ফল আমি রাজ্ঞীকে দিয়াছি; কিন্তু ইহা কিরূপে বারাঙ্গনার হস্তগত হইল]। বাক্যটির শুরুতে আছে একটি মিশ্রবাক্য, তার সাথে ‘এবং’ দিয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে আরেকটি মিশ্রবাক্য, যেটি সাংগঠনিকভাবে জটিলতর ভাবের দিক দিয়ে সম্পূর্ণ বাক্যটি ঘটনা ও ভাবনার ক্রম। বিদ্যাসাগর ক্রমিক ভাবনা প্রকাশ করেছেন ক্রমিক মিশ্রবাক্যসংগঠনের সাহায্যে। দ্বিতীয় বাক্যটির শুরুতে একটি যৌগিক বাক্যকে [পরে রাজা সবিশেষ অনুসন্ধান করিলেন এবং রাজা পূর্বাপর সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইলেন] পরিণত করেছেন মিশ্রবাক্যে, এবং এর সাথে সংযুক্ত করেছেন সাংগঠনিকভাবে বেশ জটিল একটি মিশ্রবাক্য। মিশ্রণের ফলে বাক্যের ভাব দুর্বোধ্য হয় নি; তিনি ভাবের ক্রমকে গ্রথিত রেখেছেন পরস্পরের সাথে। তিনি প্রধান উপবাক্যের ভেতরে রূপান্তরিত উপবাক্যগুলোকে ঘিরে দিয়েছেন কমা দিয়ে, কেননা ওই বাক্যগুলো রূপান্তরের ফলে বাক্যের কাঠামো হারিয়ে ফেললেও বিদ্যাসাগর ভোলেন নি যে ওগুলো বাক্য, এবং বহন করে গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য। বাক্যগঠনে বিদ্যাসাগরের রীতি এই, এবং এ হচ্ছে বিদ্যাসাগরী গদ্যের প্রকৃতি। একাধিক মিশ্রবাক্যের যৌগিকরূপ বা যৌগিক বাক্যের মিশ্ররূপের সাহায্যে ভাবপ্রকাশ বিদ্যাসাগরের স্বভাব। সরল বাক্যসংগঠন তিনি ব্যবহার করেন এমন ভাবপ্রকাশের জন্যে, যা নিরপেক্ষ, অন্য কোনো ভাবের সাথে ক্রমিকভাবে সংযুক্ত নয়।

দ্বিতীয় উদাহরণটিতে প্রথম বাক্যটি মিশ্রবাক্য, যাতে একটি বাক্য রূপান্তরিত হয়েছে, এবং ক্রিয়াটি পেয়েছে অসমাপিকারূপ [সীতার ক্রন্দনশব্দ শ্রবণগোচর করিয়া], বিন্যস্ত হয়েছে বাক্যের শুরুতে। এর সাথে সংযুক্ত ক’রে দেয়া হয়েছে একটি জটিলতর মিশ্রবাক্যসংগঠন। এটি একটি যৌগিক বাক্য, তবে বিদ্যাসাগর ‘এবং’ দিয়ে সংযুক্ত করেন নি, তিনি সেমিকোলন ব্যবহার ক’রে লোপ ক’রে দিয়েছেন সংযোজকটি। এর পরের বাক্যটিও মিশ্রবাক্য, যাতে একটি উপবাক্য [তাঁহারা ইহা দেখিলেন] রূপান্তরিত হয়ে পেয়েছে ‘দেখিয়া’ অসমাপিকা ক্রিয়ার রূপ, এবং গেঁথে দেয়া হয়েছে একটি সরল বাক্যের গায়ে। তৃতীয় বাক্যটির শুরুতে একটি যৌগিক বাক্যকে [তাঁহারা ত্বরিত গমনে বাল্মীকিসমীপে উপস্থিত হইলেন এবং তাঁহারা বিনয়নম্র বচনে নিবেদন করিলেন] রূপান্তরিত করা হয়েছে একটি ক্রমিক মিশ্রবাক্যসংগঠনে [তাঁহারা, ত্বরিত গমনে বাল্মীকিসমীপে উপস্থিতহইয়া, বিনয়নম্র বচনে নিবেদন করিলেন], এবং তার গায়ে গেঁথে দেয়া হয়েছে একটি উক্তি, যা গ’ড়ে উঠেছে বিদ্যাসাগরী ধরনের দীর্ঘ মিশ্রবাক্যে। বিদ্যাসাগর ক্রমিক সংগঠনে একের পর এক ক্রিয়ার অসমাপিকারূপ ব্যবহার করেন না, সমাপিকার পর অসমাপিকা, তারপর সমাপিকা, এমন ক্রম মেনে চলেন [ যেমন : শুনিতে পাইলাম…অনুসন্ধান করিয়া…দেখিতে পাইলাম…কাতরা হইয়া… করিতেছেন]।

বিদ্যাসাগরের গদ্য সুপরিকল্পিত মিশ্রবাক্যের গদ্য; তা দুর্বোধ্য নয়, কেননা তিনি কোনো উপাদান বাদ দেন নি বাক্য থেকে। মিশ্রবাক্যের ফাঁকেফাঁকে বিদ্যাসাগর বিন্যস্ত করেছেন সরল ও হ্রস্ব বাক্য, এবং ওই বাক্যের শাব্দ অবয়ব গ’ড়ে তুলেছেন সুপরিকল্পিত তৎসম শব্দে, বাক্যে পদের ও উপবাক্যের ক্রমবিন্যাস করেছেন বাঙলা ভাষার প্রতিভা অনুসারে, এবং সৃষ্টি করেছেন বাঙলা ভাষার আদর্শ সাধুকাঠামোটি। তাঁর গদ্যে ইংরেজি বাক্যসংগঠনেরও প্রভাব পড়েছে, তবে তিনি তাকে খাপ খাইয়ে দিয়েছেন বাঙলা ভাষার স্বভাবের সাথে। সাধুকাঠামোটিকে তিনি চরমভাবে সুস্থিত করেন নি, কোনো জীবন্ত ভাষার কাঠামো চরমভাবে কেউ সুস্থিত করতে পারেন না; পাণিনি হওয়ার জন্যে দরকার একটি মৃতভাষা। সাধুকাঠামোটি নমনীয়ভাবে সুস্থিত, যার ফলে তাঁর কাঠামোর ওপর ভিত্তি ক’রেই পরে বিকাশ ঘটেছে নানা ধরনের ব্যক্তিগত গদ্যরীতি। বিদ্যাসাগর যে অবিচল ভাষিক কাঠামোতে বিশ্বাসী ছিলেন না, বিশ্বাসী ছিলেন নমনীয় কাঠামোতে, তার পরিচয় দিয়েছেন তিনি নিজেরই গদ্যে; তিনি ব্যবহার করেছেন একাধিক রীতি। তাঁর কাঠামোটিকে যুক্তিতর্কতথ্য দিয়ে ভ’রে তুললে জন্মে বিধবাবিবাহ ও বহুবিবাহ- বিষয়ক পুস্তকগুলোর গদ্য, আর ব্যক্তিগত কাতরতা সংক্রমিত করলে সৃষ্টি হয় প্রভাবতীসম্ভাষণ-এর গদ্য :

বৎসে প্রভাবতি! তুমি, দয়া, মমতা ও বিবেচনায় বিসর্জন দিয়া, এ জন্মের মত, সহসা, সকলের দৃষ্টিপথের বহির্ভূত হইয়াছ। কিন্তু আমি, অনন্যচিত্ত হইয়া, অবিচলিত স্নেহভরে তোমার চিন্তায় নিরন্তর এরূপ নিবিষ্ট থাকে যে, তুমি, এক মুহূর্তের নিমিত্ত, আমার দৃষ্টিপথের বহির্ভূত হইতে পার নাই।

একটি লঘু রীতি তিনি তৈরি করেছিলেন অতি অল্প হইল, আবার অতি অল্প হইল, ব্রজবিলাস, রত্নপরীক্ষায়। এগুলো বেরিয়েছিলো ছদ্মনামে, এগুলো থেকে মুছে ফেলা দরকার ছিলো বিদ্যাসাগরকে; নিজেকে মুছে ফেলতে পারাই ছিলো এগুলোর সাফল্য। এগুলো লেখার জন্যে দরকার ছিলো ব্যক্তিত্ববদল, আর বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিত্ব হচ্ছে তাঁর গদ্য, তাই তিনি স’রে গিয়েছিলেন নিজের ব্যক্তিত্ব বা রীতি থেকে। এগুলোতে মেলে সাধুচলতির মিশ্রণ : ‘তাঁর/তাঁহার, হয়েছে/কহিতেছে, হয়ে/হইয়া, লিখেছেন/ লিখিয়াছিলেন’-এর মতো মিশ্রণ তিনি এগুলোতে ঘটিয়েছেন স্বেচ্ছায়, যেমন পরিকল্পিত বিভ্রান্তিসৃষ্টির জন্যে ব্যবহার করেছেন ‘বেহুদা, ফেসাৎ, মেহনৎ, চালাকি খেলিয়াছেন ‘ প্রভৃতি। স্বেচ্ছাবিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্যে না হ’লে ‘আমি যে কিস্তি দিয়াছিলাম, তাতেই খুড় মাৎ হয়েছেন’-এর মতো দূষিত বাক্য লিখতেন না তিনি। তাঁর এ-রীতিটি লঘু, মর্মান্তিক কৌতুককর, এবং স্বেচ্ছাদূষিত। এটা বোঝায় যে বিদ্যাসাগর বিশ্বাসী ছিলেন নমনীয়তায়।

বিদ্যাসাগরের প্রধান কাঠামোটি নির্ভার হয়ে উঠেছে তাঁর পাঠ্যপুস্তকে, বিশেষ করে বর্ণপরিচয় ও বোধোদয়-এ। নির্ভার হওয়ার কারণ তাঁর লক্ষ্য-পাঠকেরা, যারা বিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি তৎসম শব্দ ও শব্দের ভার কমিয়ে, কথ্য ক্রিয়া বসিয়ে এগুলোর ভাষাকে ক’রে তুলেছিলেন মনোরম। সরল বাক্য এগুলোতে বেশি, কিন্তু মিশ্রবাক্য এড়িয়ে যান নি তিনি। যেমন :

[ক] সদা সত্য কথা কহিবে। যে সত্য কথা কয়, সকলে তাহাকে ভালবাসে। যে মিথ্যা কথা কয়, কেহ তাহাকে ভাল বাসে না, সকলেই তাহাকে ঘৃণা করে [বর্ণপরিচয়–দ্বিতীয় ভাগ, প্ৰথম পাঠ]।

[খ] আমিযে সময়ের যে কাজ, সে সময়ের সে কাজ করি। এজন্য বাবা আমাকে ভালবাসেন। আমি তাঁর কাছে যখন যা চাই, তাই দেন। যদি আমি এখন, পড়িতে না গিয়া, তোমার সহিত খেলা করি,বাবা আমাকে আর ভালবাসিবেন না [বর্ণপরিচয়–দ্বিতীয় ভাগ, পঞ্চম পাঠ]।

[গ] পারদ, রৌপ্যের ন্যায় শুভ্র ও উজ্জ্বল। এই ধাতু জল অপেক্ষা প্রায় চৌদ্দগুণ ভারী। ইহা আর আর ধাতুর মতন কঠিন নহে, জলের ন্যায় তরল; যাবতীয় তরল দ্রব্য অপেক্ষা অধিক ভারী; সর্বদা দ্রব অবস্থায় থাকে; কিন্তু মেরুসন্নিহিত দেশে লইয়া গেলে জমিয়া যায় [বোধোদয়, পারদ]।

উদাহরণ তিনটিতে সরল বাক্য আছে মাত্র দুটি। প্রথম উদাহরণ দুটিতে সাধুরীতি কথ্যের কাছাকাছি হয়ে উঠেছে; এ-দুটিতে শুধু ‘কয়’, ‘যে’, ‘সে’, ‘বাবা’, ‘যা’, ‘তাই’ প্রভৃতি চলতি রূপই নেই, সর্বনামের চলতি ‘তাঁর’ রূপটিও বসেছে। তৃতীয় উদাহরণটিতে বিদ্যাসাগরের প্রধান গদ্যরীতিটি হয়ে উঠেছে নির্ভার।

বিদ্যাসাগর সাধুরীতির যে-কাঠামোটি সুস্থিত করেন, উনিশশতকের মাঝভাগে সেটি হয়ে ওঠে বাঙলা ভাষা, মানকাঠামো, লেখ্য বাঙলার শুদ্ধতার নিয়ামক। তখন থেকে দেখা দেয় দুটি প্রবণতা : একটি ওই মান অর্জন, আরেকটি ওই মান থেকে স’রে যাওয়া। এ-সময়ে আরেকটি রীতি বা বাঙলা মানভাষার বিকাশ ঘটছিলো মৌখিকভাবে, যার নাম চলতি ভাষা। এটি তখন যদিও বিধিবদ্ধ হয়ে ওঠে নি, তবু উনিশশতকের মাঝ ভাগেই, অসময়ে, এটি লিপ্ত হয় সাধুরীতির সাথে সংঘর্ষে; এবং জয়ের জন্যে তাকে অপেক্ষা করতে হয় আরো আধশতকেরও বেশি সময়। বিদ্যাসাগরের সুস্থিত রীতির বিরুদ্ধে উনিশশতকের পঞ্চাশের দশকের বিদ্রোহ ওই রীতির রৌপকাঠামোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিলো না, ছিলো তার শাব্দ অবয়ব ও ভঙ্গির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। বিদ্রোহীরাও সাধুরীতির রৌপ কাঠামো ছেড়ে দিতে চান নি, চেয়েছিলেন তার ভেতরে কথ্য কণ্ঠস্বর বাজাতে। বঙ্কিমচন্দ্রও ছাড়েন নি ওই রীতির রৌপ কাঠামো, তিনি তাতে সংক্রামিত করেন ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য। বিশশতকে অর্ধেক দায়িত্বপালনের উপযোগী সাধুরীতি হেরে যায় পূর্ণ দায়িত্ব পালনের উপযোগী চলতির কাছে, বাঙালি পায় আরেকটি ভাষাকাঠামো। তবে এর সাথে বিদ্যাসাগরের রীতির প্রধান পার্থক্য ক্রিয়া ও সর্বনামের রূপে, গৌণ পার্থক্য শাব্দ অবয়বে; আর বাক্যিক পার্থক্য খুবই কম। বিদ্যাসাগর তাঁর জাতিকে শুধু গদ্য নয়, দিয়েছিলেন একটি ভাষিক কাঠামো; তাঁর পরবর্তীরা ওই কাঠামোর ওপর তুলেছেন বিচিত্র ব্যক্তিগত গদ্যের সৌধ, যার ভিত্তিতে প্রত্যক্ষপরোক্ষভাবে আছেন বিদ্যাসাগর।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x