বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী বরিশাল শাখার চতুর্দশ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সংবর্ধনার উত্তরে

মাননীয় সভাপতি সাহেব, উপস্থিত সুধীবৃন্দ এবং প্রিয় তরুণ-তরুণীগণ! আমার বক্তৃতা করার অভ্যাস নেই – এ কথাটি বললে পুরো সত্য কথা বলা হবে না। বরং এতাই সত্য কথা যে, আমার বক্তৃতা করার যোগ্যতা নেই। তাই আমি লিখিতভাবে দু-চারটে কথা আপনাদের কাছে পেশ করছি।

আপনাদের আজকের এ মহতী অনুষ্ঠানে আমি একজন অদ্বিতীয় ব্যক্তি। তবে তা উৎকর্ষজনিত নয়, অপকর্ষজনিত। এমন কতগুলো বিষয় আছে, যাতে আজকের এ মহতী অনুষ্ঠানে আমার সমতুল্য অন্য কেউ আছেন বলে মনে হয় না। এ বিষয়ে কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি।

(১) শিক্ষা – বিদ্যাশিক্ষা আমার পাঠশালার দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত। আমার মনে হয় যে, শিক্ষাক্ষেত্রে আমার সমকক্ষ এ সভায় অপর কেউ নেই। সুতরাং এ সভায় আমি একজন অদ্বিতীয় বিদ্বান।

(২) বাসস্থান – আমার সহগামী দু-চারজন ছাড়া এ সভায় এমন কেউ আছেন বলে মনে হয় না, যিনি আজীবন পল্লীবাসী। অর্থাৎ কোন শহরের সাথে যার কোনরূপ আবাসিক সম্পর্ক নেই। আমার মনে হয় যে, এ বিষয়টিতেও আমি অদ্বিতীয়।

(৩) পেশা – পেশায় আমি একজন খাঁটি কৃষক। আমার মনে হয় যে, এ সভায় এমন আর একজন লোকও নেই, যিনি একমাত্র কৃষিকাজেই জীবন অতিবাহিত করেছেন বা করছেন। সুতরাং এ বিষয়টিতেও আমি অদ্বিতীয়।

(৪) পরিবেশ – পল্লীবাসী চাষীদের প্রাকৃতিক পরিবেশ যে কি রকম, সে বিষয়ে কিছু না বললেও চলে এবং সামাজিক পরিবেশের বর্ণনাও নিষ্প্রয়োজন। ভাইটগাছ, গুঁড়িকচু, কচুরিপানা ও ঝোপ-জঙ্গলে আচ্ছাদিত কুঁড়েঘরেই অতিবাহিত হয়েছে আমার জীবন এবং জীবনের অধিকাংশ সময়ই আমার সহচর ছিলো গরু। আমার মনে হয় যে, আমার পরিবেশের ন্যায় নোংড়া পরিবেশে বাস করা মানুষ এ সভায় অপর একজনও নেই। সুতরাং পরিবেশভিত্তিক হিসেবেও এ সভায় আমি অদ্বিতীয়।

(৫) বয়স – আমার বর্তমান বয়স ৮২ বছর। স্বাভাবিক কারণেই দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়েছে, হ্রাস পেয়েছে শ্রবনশক্তি, চিন্তাশক্তি, স্মৃতিশক্তি এবং অভাব ঘটেছে কায়িক শক্তিরও। আমার মনে হয় যে, এরূপ শক্তিহীন মানুষ এ সভায় অপর কেউ নেই। সুতরাং শক্তিহীনতায়ও আমি অদ্বিতীয়ই বটে।

(৬) ভাষা – আজকের এ সভায় হয়তো এমন আর একজন লোকও পাবেন না, যিনি বাংলা ছাড়া অন্য কোন ভাষা বিশেষত ইংরেজি ভাষা জানেন না। কিন্তু আমি হচ্ছি একজন ‘ইংরেজিমূর্খ’ মানুষ। একাধিক ভাষা বিশেষত ইংরেজি ভাষা না জানায় আমি পঙ্গু জীবন যাপন করছি। কেননা যে ব্যক্তি একখানা পায়ের অধিকারী, সে লাঠি বা কৃত্রিম পা ব্যবহার করে সমতল মাটিতে চলতে সক্ষম হলেও তার পক্ষে পর্বতে আরোহণ সম্ভব নয়। তদ্রূপ একাধিক ভাষা বিশেষত ইংরেজি ভাষা না জানায় উচ্চতর জ্ঞান লাভে আমি বঞ্চিত। আমার মনে হয়, যে কোন মানুষের পক্ষে উচ্চতর জ্ঞান লাভের মাধ্যম হচ্ছে ইংরেজি ভাষা। আর তা-ই আমার অনায়ত্ত। কাজেই এ সভায় আমি ইংরেজি ভাষায় অদ্বিতীয় মূর্খ।

আমার লিখিত ‘সত্যের সন্ধান’ ও ‘সৃষ্টি রহস্য’ নামক বই দু’খানা যিনি পড়েছেন, তিনি হয়তো ভাবতে পারেন যে, কিছু কিছু ইংরেজি আমি নিশ্চয়ই জানি। যেহেতু উক্ত পুস্তকদ্বয়ের কোন কোন স্থানে বাংলার সাথে ইংরেজি প্রতিশব্দ দেয়া আছে। কিন্তু তিনি যদি উক্ত বইয়ের পাণ্ডুলিপি দু’খানা দেখতে পান, তাহলে তিনি দেখতে পাবেন যে, তা সমস্তই শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির সাহেবের হাতে লেখা।

অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির সাহেব বরিশালের বিদগ্ধ সমাজে অপরিচিত নন। তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয়, মনে পড়ে, ১৯৪৪ সালের কোন এক শুভদিনে। ‘শুভদিন’ বলছি এই জন্য যে, স্থানটি ছিল একটি বিবাহ মজলিস। আর বিবাহ অনুষ্ঠান তো শুভদিন দেখেই হয়। কাজী সাহেব তখন ছিলেন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের দর্শন বিভাগের চতুর্থ ব্রষের ছাত্র। সেই দিনের প্রাথমিক পরিচয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কাজী সাহেবের কিশোর মনে হয়তো কৌতূহল জন্মেছিল একজন চাষীর অজানাকে জানার স্পৃহা দেখে এবং আমিও বিস্মিত হয়েছিলাম একজন শিক্ষানবীশ তরুণের জ্ঞানের বিস্তৃতি ও গভীরতা দেখে। সেইদিন থেকে আজ পর্যন্ত তিনি আমার হিতাকাঙ্ক্ষী এবং তিনি সার্বিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছেন আমার জীবনের মানোন্নয়নের জন্যে। এই সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে আমি তাঁর সহযোগিতায় যে সমস্ত মহামূল্য দানসামগ্রীপ্রাপ্ত হয়েছি, আজ যদি তিনি তা ফিরিয়ে নেন, তাহলে আমার বিশেষ কোন সম্বলই থাকবে না – একমাত্র লাঙ্গল-জোয়াল ও কাস্তে-কোদাল ছাড়া। তিনি আমার ব্যক্তিত্বের সমঅংশীদার বা তার চেয়ে বেশি। আজকে আপনারা আমাকে যে সংবর্ধনা দান করছেন, তা মূলত আমার প্রাপ্য নয়, তা প্রাপ্য শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির সাহেবের।

পরিশেষে, আমি একজন অদ্বিতীয় নির্গুণ মানুষ। তথাপি আমাকে ‘গুণী’ পর্যাভুক্ত করে নিতান্ত ভুল করেছেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী বরিশাল শাখার সুধী সদস্যবৃন্দ। আর সেই ভুলের জন্য আমি তাঁদের সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং মহান অতিথিবৃন্দকে মোবারকবাদ ও তরুণ-তরুণীদের আশীর্বাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য পেশ করছি।

ধন্যবাদ, শুভ হোক।

৫.১১ ১৯৮২

১. মানুষের পক্ষে

২. নিবেদন

৩. সৃষ্টি রহস্য

৪. ম্যাকগ্লেসান চুলা

অপ্রকাশিত

৫. কৃষকের ভাগ্য গ্রহ

৬. সীজের ফুল

৭. সংক্ষিপ্ত জীবন বাণী

৮. ভাষণ সংকলন

৮.১ মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ভাষণ

৮.২ বাংলাদেশ সোসিও-ফিলসফিক হিউম্যানিস্ট গিল্ড সেমিনারে ভাষণ

৮.৩ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৪ নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৫ গুণী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৬ বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৭ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর বার্ষিক বিবরণী ভাষণ

৮.৮ মানবিক উন্নয়নে যুব সমাজের ভূমিকা সেমিনারে ভাষণ

৮.৯ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সভায় ভাষণ

৮.১০ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর বার্ষিক অধিবেশনে ভাষণ

৮.১১ বার্ষিক বৃত্তিপ্রদান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.১২ বাংলাদেশ কুটির শিল্প সংস্থায় ভাষণ

৮.১৩ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর বার্ষিক বিবরণী ভাষণ

৮.১৪ বাংলাদেশ দর্শন সমিতিতে ভাষণ

৮.১৫ বার্ষিক বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.১৬ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীতে ভাষণ

৮.১৭ বাংলা একাডেমীর সংবর্ধনা ভাষণ

৮.১৮ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর ষষ্ঠ বার্ষিক অনুষ্ঠানে ভাষণ

৯. নির্ঘণ্ট

১০. বিভিন্ন আলোকচিত্র

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x