বরিশালের পাবলিক লাইব্রেরীর সহিত আমার পরিচয় শৈশব কাল হ’তে। তখন আমার বয়স দশ কি এগারো বছর। লেখতে ও পড়তে শিখিনি। অথচ ঐ লাইব্রেরীতে যেতাম প্রায়ই। বই-পুথি পড়বার জন্য নয়, তিমি মাছের হাড় দেখতে। শুনছিলাম যে, বিগত ১২৮৩ সালের বন্যার পানির সঙ্গে বঙ্গোপসাগর হতে একটি তিমি মাছ ভোলা মহকুমার দৌলত খাঁ থানার  কোন এলাকায় প্রবেশ করেছিল। সে বন্যায় ঐ অঞ্চলের মাঠগুলোতে নাকি চৌদ্দ হাত পানি হয়েছিল। তথাচ ঐ পানিতেও সাঁতারিয়ে যেতে না পেরে মাছটি ওখানে মারা পড়েছিল। পরে ওটার হাড়-গোর গুলো বরিশাল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ইত্যাদি বিভিন্ন স্থানে জন সাধারণের “দর্শনীয়” রূপে রাখা হয়েছে। তারই একটা অংশ রাখা হয়েছিল বরিশালে পাবলিক লাইব্রেরীর বারান্দায়। শোনা যায় যে, আসল মাছটি লম্বায় ছিল প্রায় চল্লিশ হাত। হাড়-গোর দেখে ইহা “মিথ্যে” বলে মনে হয় না।

তখন হতে তিমি মাছের হাড় দেখবার কৌতূহল নিয়ে বহুদিন ওখানে গিয়েছি, হাড় দেখেছি, আর দেখেছি বহু লোককে বই পত্র পড়তে। শুনছিলাম যে, ওটা সরকারী গ্রন্থাগার। যে কোন লোক ওখানে বসে বই পত্র পড়তে পারে। আমি লাইব্রেরীর বারান্দায় গিয়েছি বহুদিন কিন্তু ভিতরে যাইনি একদিনও। কেননা অভাব ছিল- কিছুটা দরকারের ও কিছুটা সাহসের।

মনে পড়ে তখন ছিল ১৩৩০ সাল। একদা পাবলিক লাইব্রেরীতে গেলাম। তিমি মাছের হাড় দেখবার জন্য নয়, বই পড়বার জন্য। স-সঙ্কোচে ভিতরে প্রবেশ করলাম এবং টেবিলের উপর পাঠকদের রেখে যাওয়া বই গুলো নেড়েচেড়ে দেখলাম ও কিছু কিছু পড়লাম। অজানা-অচেনা লোক বলে আমাকে কেহ কিছু বলল না দেখে সাহস পেলাম।

এর পরে বরিশালে গিয়ে সময় পেলে প্রায়ই আমি ওখানে যেতাম, বই পড়তাম; কিন্তু এতে তৃপ্তি হত না। কেননা স্বল্প সময়ে কোন বইয়ের অংশ বিশেষ পড়ে শান্তি পাওয়া যায় না। আবার গোটা বইয়ের ধারাবাহিকভাবে শেষ করতে হলে হয়ত কয়েক মাস কেটে যায়। হয়ত সে বই অন্য কোন পাঠক নিয়ে গেলে আর পড়াই হয় না। তবুও এভাবে পড়লাম কয়েক বছর।

“অন্য উদ্দেশ্যে বরিশাল গিয়ে সময় পেলে বই পড়া”, – এ নিয়মটি পরিত্যাগ করে- “বই পড়ার উদ্দেশ্য বরিশাল যাওয়া” – আরম্ভ করলাম ১৩৪০ সাল থেকে। কিন্তু এতেও অশান্তি কমলো না কেননা- পাবলিক লাইব্রেররীটি খোলা হয় বিকেল চারটায়। এতে সন্ধ্যা হবার পূর্বে (বারো মাসের গড়ে) বেলা থাকে মাত্র দু ঘণ্টা। পক্ষান্তরে- বরিশাল হতে লামচরি গ্রামের দূরত্ব প্রায় ছ-মাইল হেঁটে, আসতে সময়ও লাগে প্রায় দু ঘণ্টা। কাজেই সন্ধ্যায় বাড়িতে আসতে হলে বই পড়া যায় না, আর বই পড়তে হলে- যত ঘণ্টা বই পড়া যায়, তত ঘণ্টা রাত্রি হয় বাড়ি আসতে। তথাপি আমি বই পড়েছি- সন্ধ্যা ছটা, সাতটা, ও কোন দিন রাত আটটা পর্যন্ত এবং বাড়িতে এসেছি রাত আটটা, ন’টা বা কখনো দশটায়। এতে হাঁটার জন্য কষ্ট বা নিঃসঙ্গতার জন্য আমার ভয় হ’ত না। কষ্ট হত- শীত কালের রাতের শীতে, কালবৈশাখীর ঝড়ে এবং বর্ষাকালের বৃষ্টি ও জল কাঁদায়-চলতে। কেননা তখন লামচরি হতে বরিশাল যাতায়াতের জন্য কোন রকম রাস্তা ছিল না। সব রকম অসুবিধা সত্ত্বেও এভাবে পাবলিক লাইব্রেরীতে যাতায়াত করে বই পত্র পড়লাম প্রায় চার বছর। কিন্তু এভাবে বই পড়ার শান্তির চেয়ে অশান্তিই ভোগ করতে হয় বেশি, লোকসানের তুলনায় লাভ হয় অল্প। কেননা এতে নিবিষ্ট মনে বই-পড়া আর হয় না। হয়ত অধ্যয়নের সুখ-স্বপ্ন হঠাৎ ভেঙ্গে দেয় প্রত্যাবর্তনের বিভীষিকা মনোরাজ্যে এসে।

বহুদিন যাতায়াতের ফলে লাইব্রেরিয়ানের সাথে আমার কিছুটা পরিচয় হচ্ছিল। তাঁর কাছে জানতে পারলাম যে, কেহ লাইব্রেরীর .”সদস্য” শ্রেণীভুক্ত হলে তিনি বই পত্র বাসায় নিয়ে পড়তে পারেন। আমি লাইব্রেরীর সদস্য হবার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি আমাকে বললেন যে, এখানে মিউনিসিপালিটির বাইরের কোন লোককে সদস্য করবার ও টাউনের বাইরে বই দেওয়ার নিয়ম নেই। টাউনে আমার কোন বন্ধু ব্যক্তি থাকলে, তাঁকে সদস্য করে, তার নামে বই নিয়ে আমি উহা বাড়িতে এনে পড়তে পারি।

সে সময় বরিশাল শহরে আমার বন্ধু বা পরিচিত ব্যক্তি কেউ ছিল না। তবে আমার জ্ঞাতি ভ্রাতা আঃ রহিম মৃধার এক জন বন্ধু ছিলেন- চরমোনাই গ্রাম নিবাসী জনাব ওয়াজেদ আলী তালুকদার। বরিশালের চকের পোলের দক্ষিণ পাশে ফরিয়া পট্টির মোড়ে তখন তিনি টুপীর দোকান করতেন। একদিন আমি মৃধা সা’ব কে সাথে নিয়ে তালুকদার সাবের দোকানে গেলাম তাঁকে সুপারিশ করার জন্য এবং মৃধা সাহেব তাঁকে অনুরোধ করলেন- আমার পক্ষে পাবলিক লাইব্রেরীর সদস্য হয়ে আমার বই পড়ার সহায়তা করার জন্য। তিনি সম্মত হলেন।

একদা লাইব্রেরীতে গিয়ে সদস্য হবার আবেদন পত্রের ফরম এনে, তালুকদার সাহেবের নামে উহা লিখে তাঁর সই নিলাম এবং লাইব্রেরীর সেক্রেটারী সাহেবের অনুমোদন গ্রহণান্তে লাইব্রেরীয়ানের কাছে দাখিল করলাম। তৎসহ আরো দাখিল করলাম- ডিপোজিট হিসাবে ৩.০০ টাকা, ভর্তি ফি- ১.০০ টাকা ও মাসিক চাঁদা .৫০ পয়সা (৪.৫০)। রশিদ ও সনদ পেয়ে আমি পাবলিক লাইব্রেরীর (বেনামীতে) একজন সদস্য হলাম ১৩৪৪ সালের ১৯শে পৌষ তারিখে। এর ব্যবস্থা এরূপ হল যে, তালুকদার সাহেব পাবলিক লাইব্রেরীর একজন সদস্য। আমি তাঁর দোকানের একজন কর্মচারী। তাই তাঁর পক্ষে আমি বই পত্র লেন-দেন করছি। লাইব্রেরী হতে এ দিন আমি গ্রহণ করলাম- “পৃথিবীর ইতিহাস” (৩য় খন্ড)। দুর্গাদাশ লাহিড়ী। পাঃ লাঃ নং- ত (৩,৩) (৪)।

—- সালে তালুকদার সাহেব তাঁর ব্যবসায় বন্ধ করে গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়ায় লাইব্রেরী হতে তাঁর সদস্য পদ বাতিল হয়ে যায়। অগত্যা আমাকে লাইব্রেরী হতে আমার ডিপোজিট (৩.০০) টাকা তুলে আনতে হয় এবং বাড়িতে এনে বই পড়া বন্ধ হয়ে যায়।

শুরু হতে সদস্য হবার আগে পর্যন্ত পাঃ লাঃ হতে কতখানা বই-পুথি পড়েছি, তার হিসাব রাখিনি। আমার আকাঙ্ক্ষার অর্ধেকেরও কম। আমি আশা করছিলাম যে, প্রতি সপ্তাহে একখানা করে বই পড়ব। তা হলে এ বছর বইয়ের সংখ্যা হত — খানা। কিন্তু কার্যতঃ হয়েছে — খানা। অর্থাৎ প্রতি — দিনে একখানা করে বই লেনদেন হয়েছে। বই-পুথি আমার ‘পড়বার’ সময়ের অভাব হয় না। কেননা উহা আমার রাতের কাজ। সময়ের অভাব হয় “লেন-দেন” এর।

নিয়মিত কৃষিকাজ ছাড়া অতিরিক্ত আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাজ আমাকে এ সময় করতে হয়েছে। যথা- ইউনিয়ন বোর্ড, ঋণ সালিসী, পল্লী মঙ্গল সমিতি ইত্যাদি। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানের কাজ দিনে ও রাতে যথারীতি সম্পন্ন করতে গিয়ে সময়ের ঘাটতিটা সমস্তই পড়েছে আমার অধ্যয়নের ভাগে। তাই আশানুরূপ বই পড়া হয় নাই।

লাইব্রেরীর সমস্ত বিভাগের বই আমি সমান হারে পড়িনি এবং কোন কোন বিভাগের বই আদৌ পড়িনি। আমি পড়েছি মাত্র- ধর্ম, ইতিহাস, ভ্রমণ, জীবনী, উপন্যাস, দর্শন ও বিজ্ঞান এবং কিছু মাসিক ও বার্ষিক পত্র-পত্রিকা। তবে সব চেয়ে বিজ্ঞানের বইয়ের সংখ্যাই বেশি।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x