উত্তর ২৪ পরগনা জেলার মহকুমা শহর বনগাঁর গাঁ ছুঁয়ে ঘটাবাওড় গ্রাম। ‘হাজি-বাড়ি’ গ্রামের সম্ভ্রম জাগানো সচ্ছল পরিবার। এই পরিবারেই মানুষ মেহেবুব আলি। বয়স তিরিশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। স্বল্প উচ্চতার মাঝারি চেহারার মানুষটির ঝকঝকে দুটি চোখ বুদ্ধির সাক্ষ্য বহন করছে।

১৯৮৯-এর মে মাস নাগাদ দাবানলের মতো একটা খবর দ্রুত আশপাশের অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল –মেহবুব আলীর বকনা (স্ত্রী বাছুর) দুধ দিচ্ছে। যে কোন একটি রোগ আরোগ্যের প্রার্থনা নিয়ে পরস্পর তিনদিন ঐ দুধ খেলে রোগটি আশ্চর্যজনকভাবে সেরে যাচ্ছে।

শুরু গল ভিড়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্রোতের মতো মানুষ আসতে লাগলেন দূর-দূরান্ত থেকে। এমন কি বাংলাদেশ থেকেও। লরি, টেম্পোর গাদা লেগে গেল। পরপর তিনদিন অলৌকিক দুধ খেয়ে রোগ মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নারী-পুরুষ সকলেই রাত কাটাতে লাগলেন খোলা আকাশের নীচে।

অলৌকিক বকনা

কারণ অনেকেই এতোদূর থেকে আসেন, যেখান থেকে পরপর তিনদিন যাওয়া আসা অসম্ভব বা কষ্টসাধ্য। দুধ দেওয়া বন্ধ থাকে শুক্তবার ও বাংলা মাসের ১৪ তারিখ। দুধ খাওয়ার নিয়ম হল, দুধ কোথাও নিয়ে যাওয়া চলবে না, ওখানেই খেতে হবে। অর্থাৎ রোগীকে স্বয়ং আসতে হবে।

এতগুলো মানুষ থাকছেন, প্রাকৃতিক কাজ সারছেন, পরিবেশ দূষণ রোধে এগিয়ে এলো স্থানীয় ক্লাব ‘নজরুল ক্রীড়া চক্র’। বিনিময়ে মানুষগুলোর কাছ থেকে আদায় করতে লাগলো ২০ পয়সা করে। মেহবুব আলীর সঙ্গে ক্রীড়া চক্রের এই নিয়ে মন কষাকষি। ফলে পুলিশের হস্তক্ষেপ। ক্রীড়া চক্র ২০ পয়সা কমিয়ে ১০ পয়সা করল।

মেহবুব আলী রোগীদের দুধ দেন নস্যির চামচের এক চামচ করে। বিনিময়ে কোন পয়সা দাবি করেন না। ভালবেসে শ্রদ্ধার সঙ্গে যে যা দেন তাই নেন।

‘বনগাঁ সায়েন্স ক্লাব’ তখন ছিল ‘যুক্তিবাদী স্মিতি’র সহযোগী সংস্থা। ক্লাবের কিছু সদস্য এই বিষয়ে অনুসন্ধান চালান। অনুসন্ধান চালিয়ে বিভিন্ন সময়ে যেসব রিপোর্ট আমাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তাতে জানতে পারি –প্রতিদিন পাঁচ-ছ’হাজার মানুষ আসছেন রোগমুক্তির আশায়। দৈনিক প্রণামী পড়ছে চার-পাঁচ হাজার টাকা। এত মানুষের ভিড়ে ও রাত কাটাবার ফলে মল-মূত্র ত্যাগের জন্য পরিবেশ দূষণ হচ্ছে।

মেহেবুব আলী ও লেখক

রাতে মাথা গোঁজার ভালো ব্যবস্থার অভাব ও আগতদের রক্ষার কোন ব্যবস্থা না থাকায় মহিলাদের শ্লীলতাহানি ঘটছে বলে বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও থানাকে এই দুটি জানায় নজরুল ক্রীড়াচক্র। কোন শযোগিতাই নাকি এই দুই সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। গড়ে ওঠা খাবারের দোকানগুলো চড়া দাম নিচ্ছে। একইভাবে, যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার সুযোগ নিয়ে মানুষগুলোর কাছ থেকে মোটা টাকা আদায় করছে লড়ি, টেম্পো ও রিকশা। প্রতিটি লড়ি ও টেম্পোতেও নাকি থাকে মেহবুব আলীর এজেন্ট। এরা লড়ি, টেম্পোর ভাড়া থেকে কমিশন আদায় করছে। আগে হাজার দুয়েক মানুষকে দুধ বিতরণ করতেই দুধ শেষ হয়ে যেত। এখন যত লোকই আসুক দুধ শেষ হয় না। সবার সামনেই দুধ দোয়া হয় বটে, তবে দোয়া দুধ ঘরের ভেতরে চলে যায়। দফায় দফায় ভেতর থেকে দুধ আসে।

বনগাঁ সায়েন্স ক্লাবের সদস্যরা একাধিকবার চেষ্টা করেছিলেন গরুর ছবি তুলতে। ব্যর্থ হয়েছেন। ছবি তোলা নিষিদ্ধ। মেহবুব আলী ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের নজর এড়িয়ে গোপনে ছবি তোলা অসম্ভব। পরীক্ষার জন্য দুধ সংগ্রহ করতে রোগী সেজে একাধিকবার হাজির হয়েছেন সায়েন্স ক্লাবের সভ্য-সভ্যারা। মেহবুব ও তাঁর সাঙ্গদের দৃষ্টি এড়িয়ে হাতের তালুতে ঢাকা দুধ কোনোভাবে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি।

জুন মাসের মাঝামাঝি মেহবুব বিশেষ রোগীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা চালু করলেন। বিনিময়ে নিতে লাগলেন মাত্র দশ টাকা। সেই সঙ্গে প্রচার চলতে লাগল গরুটি ‘কামধেনু’। এই মত নাকি মেহবুবের নয়। তারকেশ্বর থেকে গরুটিকে দেখতে আসা কিছু পণ্ডিত ব্রাক্ষ্মণই বিদায়কালে নাকি এই মত প্রকাশ করে গেছেন মেহবুবের কাছে।

যুক্তিবাদী সমিতির তরফ থেকে গিয়েছিলাম মেহেবুব আলীর কাছে। অবশ্যই পরিচয় গোপন রেখে। চতুর মেহবুবের আস্থা ভাজন করতে পুরোপুরি সক্ষম হয়েছিলাম। ফলে অনেক কিছুই জেনেছিলাম। পেয়েছিলাম অলৌকিক দুধে রোগমুক্ত হওয়া মানুষদের ঠিকানা। মেহেবুবের কথায় -১৯ এপ্রিল রাতে নামাজ পড়ে ইফতার করে শুয়েছি। রাতে স্বপ্নে দেখলাম, ফুরফুরার দাদা পীর সাহেব বলেছেন, কাল থেকে অ্যান্টানীর দুধ হবে। এই দুধ যে পরম বিশ্বাসে রোগ সারার প্রার্থনা নিয়ে পরপর তিনদিন খাবে, তারই অসুখ সেরে যাবে। তবে সব অসুখ নয়। একটা মাত্র অসুখ সারার প্রার্থনা নিয়ে খেতে হবে। দুধ নস্যির চামচের এক চামচ খেলেই হবে।

স্বপ্নের পর ঘুম ভেঙ্গে গেল। স্বপ্নকে স্বপ্ন বলেই ভাবলাম। কি করে বিশ্বাস করি ২২ মাস বয়সের বকনা অ্যান্টনি গর্ভ না হতেই দুধ দেবে? অ্যান্টনি জার্সি বকনা। ভেবেছিলাম ওকে কুরবানী দেব। সকাল না হতেই কিছুটা অবিশ্বাস্য ও কিছুটা কৌতূহল নিয়ে অ্যান্টনির বাঁটে হাত দিলাম। অবাক কান্ড। অ্যান্টনি দেড় সেরের মতো দুধ দিল।

দিন দুয়েক পর থেকে সাহস করে দাদা পীর সাহাবের নির্দেশ মতে রোগীদের দুধ বিতরণ শুরু করলাম। অবাক হয়ে দেখলাম তিন দিন দুধ খেয়ে বোবা কথা বলতে লাগল। প্যারালাইসিস রোগী উঠে বসল। সাহস পেলাম। পীর সাহেবের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে আমার কাপড়ের দোকান বন্ধ করে মানুষের সেবায় নিজেকে লাগিয়ে দিলাম। মেহেবুব আমাকে দুধ খেতে দিয়েছিলেন। একটা শিশিতে পরম যত্নে কিছুটা দুধও দিয়ে দিয়েছিলেন। ছবি তোলায়ও কোন আপত্তি করেননি।

বনগাঁ সায়েন্স ক্লাব ও নজরুল ক্রীড়া চক্রের সাহায্যে আমরা আগত ভক্তদের কছে তথ্য হাজির করে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম,

কোন গরুর হরমোনের ভারসাম্য হীনতার জন্য বাচ্চা না হলেও কোন গরুর পক্ষে যথেষ্ট পরিমাণে দুধ দেওয়া সম্ভব। ল্যাকটোজেনিক হরমোন ইঞ্জেক্ট করেও বকনার বাঁটে দুধ আনা সম্ভব। এমন যদি হয়, গরুটা গর্ভবতী হয়েছিল এবং কোন কারণে গর্ভ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, সে ক্ষেত্রেও এমনি ঘটা সম্ভব।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পশু চিকিৎসা বিভাগের রোগ অনুসন্ধান আধিকারিক ডাঃ পরিতোষকুমার বিশ্বাস আমাদের এই বিষয়ে তথ্যগুলো জানিয়েছিলেন।

ব্যাপক প্রচারের পাশাপাশি বনগাঁ সায়েন্স ক্লাব ও কমল বিশ্বাসের নেতৃত্বে ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির ঠাকুরনগর শাখা ৪৫ জন রোগীর উপর অনুসন্ধান চালান। ৬ জন জানান সম্পূর্ণ সেরে গেছেন। ৫ জন জানান মোটামুটি ভাল আছে। ৩৪ জন জানান রোগত একটুও কমেনি, বরং অনেকের বেড়েছে।

ডাব-বাবার তুলনায় মেহেবুব আলীর রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারণ ব্যাপক যুক্তিবাদী প্রচারের ফলে বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রে অলৌকিক দুধ (?) বিশ্বাস অর্জন করতে পারেনি।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x