প্রস্তাবনা

আকস্মিকতার চেয়ে ধারাবাহিকতাই বেশি

মে, ২০০৬ জিনতত্ত্বের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে সামগ্রিক জেনেটিক কোড জানা সম্পূর্ণ করলেন বিজ্ঞানীরা। ক্রোমোজোম ১-এর সিকুয়েন্সিং বাঁকি ছিল। এবার সেটির কাজ শেষ হল। এর ফলে ক্যানসার, অলজাইমারস ও পারকিনসনসের মতো অদ্ভুত ৩৫০টি রোগের গোপন রহস্য জানা সম্ভব হবে। এইসব রোগের আরোগ্য এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। বিশ্বখ্যাত জিনতত্ত্বের বিজ্ঞানীরা মানব সভ্যতাকে এক লাফে এগিয়ে দিলেন অনেকটা।

একই বছরে বিভিন্ন ভারতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর।

 

বিহার বিধানসভার অধ্যক্ষের পত্নীর মৃত্যু,

আবার ফাঁসলেন রামদেব

হিন্দি ভাষার জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘সরস সলিল’-এর জুন ২০০৬ সংখ্যায় একটি খবর প্রচন্ড হৈ-চৈ ফেলে দিয়েছে।

খবরে বলা হয়েছে, রামদেব মার্চ ২০০৬-এ তাঁর পাটনায় শিবির বসান। শিবিরে বিহার বিধানসভার অধ্যক্ষ উদর নারায়ণ চৌধুরীর ক্যানসার রোগে আক্রান্ত পত্নীর চিকিৎসা শুরু করেন। কিছু ‘জড়িবুটি’-র সঙ্গে প্রাণায়াম এবং মন্ত্র ছিল রামদেবের ‘অব্যর্থ’ চিকিৎসার অঙ্গ।

২৫ মার্চ ২০০৬ পাটনা-শিবির শেষ হয়। তার দশ দিন পর (অর্থাৎ ৪ এপ্রিল ২০০৬) অধ্যক্ষ-পত্নী ভরোনিকা চৌধুরীর মৃত্যু হয়।

এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল গ্যারান্টি দিয়ে ১০ হাজার ক্যানসার রোগী সারিয়ে তোমার রামদেবের দাবি কি বিশাল ভন্ডামী।

৭ জানুয়ারী ২০০৬ বাবা রামদেবকে জিজ্ঞেস করেছিলাম (‘NDTV’ ইন্ডিয়া’র মুকাবিলা অনুষ্ঠানে), আপনি ‘যোগ সাধনা বইতে লিখেছেন ‘প্রাণ মুদ্রা’য় যে কোনও চোখের রোগ সারে। আপনার বাঁ চোখ পিটপিট করা রোগটা সারাচ্ছেন না কেন? আমার প্রশ্নের উত্তরে গালাগাল দিয়েছেন। রামদেব জানালেন, ‘খেচরী মুদ্রা’ জানেন। যোগের আকর-গ্রন্থ ‘হঠযোগ প্রদীপিকা’ তুলে ধরে বললাম, এতে লেখা আছে, ‘খেচরী মুদ্রা’ জানলে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, মৃত্যু নেই। আপনি কি অমর থাকবেন? উত্তরে জানালেন, অবশ্যই অমর থাকবেন। আমি সত্যি বলেছেন, না কি মিথ্যে? খেচরী মুদ্রা জানার পর আপনাকে খাদ্য-পানীয় কেন গ্রহণ করতে হয়? উত্তর দিলেন না বাবা রামদেব। প্রশ্ন করেছিলাম, হাতের নখে নখ ঘষলে টেকো মাথায় চুল গজায় বলে আপনি দাবী করেছেন। এ দাবী কি সত্যি? রামদেবের কথা- হাজার হাজার টাকে এ’ভাবে চুল গজিয়েছে। চ্যালেঞ্জ করতেই রামদেব তোতলাতে তোতলাতে পিছু হটলেন।

‘আবার ফাঁসলেন’ কথার অর্থ- তার আগেও ফেঁসেছিলেন, NDTV ইন্ডিয়া’র ‘মুহাকিবা’ অনুষ্ঠানে আমারই কাছে। তারিখটা ছিল ৭ জানুয়ারী, সাল ২০০৬। রাত ১০টা থেকে ১১-৩০ পর্যন্ত পাক্কা দেড় ঘণ্টার অনুষ্ঠানে রামদেবের ভন্ডামী, অজ্ঞতা, মিথ্যাচারিতা সবই কিমা-কিমা করেছি। (গোটা বিষয়টা বিস্তৃত জানতে পড়তে পারেন, ‘মনের নিয়ন্ত্রণ-যোগ-মেডিটেন’ গ্রন্থটি)।

একবিংশ শতাব্দীতে, সেলফোন, মাইক্রোচিপস, স্যাটেলাইট, ইন্টারনেটের যুগে আগস্ট ২০০৬ দেবমূর্তির ‘দুধপান’ নিয়ে হুজুগে মাতলো ‘শিক্ষিত’ ভারতবাসী। এগার বছর আগে একই ঘটনা ঘটেছিল। তখন শুধু গণেশমূর্তি দুধ খেয়েছিল। সেবার সারাদিন ঘুরে ঘুরে গণেশের দুধ পান দেখে বিকেলে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকার দপ্তরে বসে লেখাটা শেষ করেই দৌড়েছিলাম ‘বিড়লা মিউজিয়াম’ –এ। সেখানে দূরদর্শনের Live অনুষ্ঠানে গণেশের দুধ খাওয়ার পিছনে হাতে-কলমে বোঝাতে আমি ছাড়াও ছিলেন একাধিক বিজ্ঞানী। ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫ –এ ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় আমার তাতে ‘দুধ পান রহস্য’ উন্মোচন করা লেখাটি বিশাল গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু তার এগারো বছর পর আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। একে কি বলবো- আকস্মিকতা? নাকি ধারাবাহিকতা?

বর্তমান ভারতে একই সঙ্গে ধর্মের রমরমা ও যুক্তিবাদের দ্রুত অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এদেশে বিশ্বায়ন এসে পড়েছে। তারই সঙ্গে তাল রেখে যখন এ’দেশেরই একটা অংশ মেলাচ্ছে, তখন আর একটা অংশ আকন্ঠ ডুবে রয়েছে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারে।

২০ আগস্ট ২০০৬ সন্ধে থেকে ও ২১ আগস্ট সন্ধে পর্যন্ত দেবমূর্তিরা ‘দুধপান’ করেছেন। ১১ বছর আগে দুধ পান’ গুজবের উৎস ছিল দিল্লি। এবার গাজিয়াবাদ। গাজিয়াবাদ থেকে দ্রুত গুজব ছড়িয়ে পড়ে দিল্লি, চন্ডীগড়, লুধিয়ানা, জয়পুর, এলাহাবাদ, কাশী, পাটনা, কলকাতা সহ আরও বিভিন্ন শহরে। হাজারে হাজারে মানুষ মন্দিরে হাজির হন দুধ-চামচে নিয়ে। এদের মধ্যে প্রথাগত ভাবে শিক্ষিতের সংখ্যা বিপুল।

২০ আগস্ট রাত ১০টা নাগাদ প্রথম ফোন করে আমার প্রতিক্রিয়া জানতে চান ‘স্টার নিউজ’- এর প্রতিনিধি। ১০টা ১৫-তে আমাকে ফোনে ধরলেন ‘স্টার নিউজ’- এর প্রতিনিধি। তাঁর সঙ্গে আমার ফোনের কথোপকথন প্রচারিত হল। বললাম, ১১ বছর আগের অভিজ্ঞতার কথা। জানালাম, গণেশ বাঁ অন্য দেবমূর্তির দুধ পানের মধ্যে অলৌকিক কিছু নেই। আপনাদের তোলা যে ছবি দেখাচ্ছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে সমস্ত দুধই শ্বেতপাথরের দেবমূর্তির গা বেয়ে নেমে যাচ্ছে। মূর্তির তলা বেয়ে সিঁড়ি পর্যন্ত ভেসে যাচ্ছে দুধে। ভক্তরা দুধভরা চামচ ধরছেন মূর্তির ভেজা শুঁড়ে বাঁ ঠোঁটে। শুঁড়ের বাঁ ঠোঁটের একটি জলবিন্দু চামচের দুধকে আকর্ষণ করছে। এটা তরল পদার্থের ধর্ম। তারপর মাধ্যাকর্ষণের পৃষ্ঠটানে আকর্ষিত হয়ে দুধের কিছুটা ভাঁজ শরীর বেয়ে নেমে যাচ্ছে তলায়। ওমনি ভক্তরা চামচকে বেশি করে হেলিয়ে ধরছেন। চামচের দুধ যতই কমতে থাকে, ততই চামচ আরও বেশি করে হেলিয়ে ধরেন ভক্তরা। ভক্তি যখন অবচেতন মন চামচে হেলাতে শুরু করতেই পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়া। আবার কেউ নিজেকে জাহির করতে ইচ্ছে করেও হেলাতে পারে।

সে’দিন রাতেই আনন্দবাজারের প্রতিনিধি এ বিষয়ে আমার সাক্ষাৎকার নিলেন। পরদিন ভোরে আমাকে ঘুম থেকে তুললেন ‘স্টার আনন্দ’। ফোনে সাক্ষাৎকার। বললাম, যে পদার্থ যত বেশি, তরল অর্থাৎ সান্দ্রতা বেশি, সে-পদার্থকে তত বেশি তাড়াতাড়ি আকর্ষণ করবে দেবমূর্তির শরীরে লেগে থাকা তরলবিন্দু। কেরসিন থেকে হুইস্কি, ফলিডল থেকে সাবানজল দেবতারা সব পান করবে। শুধু খেতে পারবে না লাড্ডু, পেঁড়া, আপেল এইসব না-তরল পদার্থ।

২১ আগস্ট দুপুরে ‘স্টার আনন্দ’ –এর ঋতবত এলেন। সঙ্গে ফটোগ্রাফার। ওদের কাজ শেষ করেই ‘তারা’-র ওবি ভ্যানের সঙ্গে মন্দির পরিক্রমা শুরু করলাম। ‘তারা’র প্রতিনিধি অয়নদেবের এক প্রশ্নের উত্তর জানালাম, যেসব পদার্থ বিজ্ঞানী বলেছেন, কাঁচ, চিনেমাটি, ধাতুর তৈরি মূর্তি দুধপান করবে না, তাঁরা যদি হাতে কলমে পরীক্ষা করতেন তো দেখতেন ওইসব ধাতুমূর্তিও দুধ খায়। ওঁদের বক্তব্য ছিল, যে-সব মূর্তির গায়ে খালি চোখে দেখা যায় না, এমন ছোট ছোট ছিদ্র থাকে, তারাই শুধু ‘দুধপান’ করে। এটা দুধপানের অন্যতম শর্ত। ছিদ্রগুলোতে দুধ ঢুকে যায়, তাইতেই চামচের দুধ কমে। ছিদ্রগুলো দুধে ভর্তি হয়ে গেলে মূর্তি খাওয়া বন্ধ করে।

অয়নদেবকে আমি দেখালাম চিনেমাটির মূর্তি থেকে ধাতুর মূর্তিও দুধপানে করছে হৈ-হৈ করে।

রাতে ‘এখন বাংলা’ এবং তারপর ‘তারা’র স্টুডিওতে হাজির হলাম। সেখানে সঞ্চালক ও দর্শকদের প্রশ্নের উত্তরের ফাঁকে ফাঁকে দেখাতে হল, ঘোড়া থেকে সাপ সব্বাই দুধ, ঠান্ডা পানীয়, কেরসিন- সব পান করছে। খাচ্ছে না শুধু আপেল-আঙ্গুর।

দেবমূর্তিরা যখন ‘দুধপান’ –এ ব্যস্ত, তখনই আরব সাগরের জল মিষ্টি হয়ে গেছে- গুজবে সারা মুম্বাই নাচলো। সুফি সন্ত মকদুম শাহের কৃপায় নাকি এমনটা ঘটেছে। সর্বরোগহর এই ‘মিষ্টি’ জল বোতলবন্দি করতে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। লবণাক্ত সমুদ্রের জলে লবণের পরিমাণ কমে সাদা জল (plain water) হয়ে যায় জলে ফ্লোরাইড ও ক্লোরাইডের যৌগ বৃদ্ধি হলে। এই প্রাকৃতিক ঘটনার মধ্যে অপ্রাকৃত ঘটনাকে আবিষ্কার করার মতো অপ্রকৃতিস্থ শিক্ষিত মানুষের আজও অভাব ঘটেনি ভারতে।

মোবাইল ভূত থেকে লাইট ভূতের আঁচরে দেওয়ার মত ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গ তোলপাড় হয়। ভূতের ভয়ে বর্ধমানের ‘বেনাগ্রাম’ –এর সব মানুষ গ্রাম ছেড়ে পালায়।

এতসব তোলপাড় করা ঘটনা দেখে মনে হয় ভারতের শিক্ষিতরা কি মধ্যযুগের দিকে ফিরছেন? এতসব ‘অলৌকিক’ কান্ডকারখানাগুলো সবই কি আকস্মিক? নাকি এটাই “মূর্খ’ –ভারতের ধারাবাহিকতা?

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x