পরম বিস্ময়কর শিশু প্রতিভার অনেক কাহিনীই মাঝে-মধ্যে শোনা যায়। এদের বেশির ভাগই বিখ্যাত হয় মিথ্যা প্রচারে, গুজবে, অলীক-কল্পনায়। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ঈশ্বরের কৃপাধন্য, ঈশ্বরের অংশ বা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা নেই- ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত হয়। বেশ কিছু শিশু প্রতিভার খবর অবশ্য নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে আমরা অভ্রান্ত বলে মেনে নিই। বাস্তবিকই যারা পরম বিস্ময়কর শিশু প্রতিভা তাদের ক্ষেত্রেও ‘বুদ্ধিতে যে প্রতিভার ব্যাখ্যা নেই’ ধরনের কোনও বিশেষণ প্রয়োগ একান্তই বিজ্ঞান বিরোধী, বিজ্ঞানমনস্কতা বিরোধী চিন্তার ফসল। একজন বিজ্ঞান বিষয়ক লেখার সঙ্গে যুক্ত মানুষ এই ধরনের বাক্য প্রয়োগ করলে যে কোনও যুক্তিবাদী মানুষকেই তা ব্যথিত করে, শঙ্কিত করে। কারণ –

বিজ্ঞান বর্তমানে যতটুকু
এগুতে পেরেছে তারই সাহায্যে যে
কোনও অসাধারণ বিস্ময়কর প্রতিভাধরের
কার্যকলাপের ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে;
তা সে শিশু মস্তিষ্কের স্বাভাবিক
শারীর ভিত্তিক ধর্মের অকাল বিকাশের
ফলেই হোক, জেনেটিক কোনও
কারণেই হোক, অথবা অন্য যে
কোনও কারণেই হোক।

সব দেশেই বিভিন্ন সময়ে বিস্ময়কর প্রতিভাধর শিশুর দেখা মেলে। এরা কেউ পড়াশুনোয়, কেউ খেলাধুলায়, কেউ সঙ্গীতে, কেউ নৃত্যে, কেউ বা ছবি আঁকায় অথবা অন্য কোনও বিষয়ে বিরল প্রতিভা বলে চিহ্নিত হয়েছে। এদের অনেকেই পরবর্তীকালে চূড়ান্তভাবে নিজের প্রতিভাবে বিকশিত করতে সমর্থ হয়েছে, আবার অনেকে হারিয়ে গেছে সাধারণের মিছিলে।

আবার এই বিপরীতটাও ঘটতে দেখা গেছে বহুক্ষেত্রে। শৈশবে যার মধ্যে অসাধারণত্বের হদিশ খুঁজে পাওয়া যায়নি, পরবর্তী সময়ে তারই প্রতিভাকে মানুষ বার বার সেলাম জানিয়েছে। মাইক্রোসস্কোপের আবিষ্কার লিউয়েনহউক, বিবর্তনবাদের প্রবক্তা চার্লস ডারউইন, বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা শরৎচন্দ্র- এঁরা কেউই শিশু প্রডিজি ছিলেন না। বরং লিউয়েনহউক এবং ডারউইন ‘ফালতু’ বলেই চিহ্নিত হয়েছিলেন। লেখাপড়ায় মোটেই জুতসই ছিলেন না, ছিলেন নড়বড়ে। ছাত্র জীবনে আইনস্টাইনও এঁদের থেকে ভিন্নতর কিছু ছিলেন না। একবার পদার্থবিদ্যায় অকৃতকার্যও হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ছাত্রজীবনও কৃতিত্বপূর্ণ ছিল না, শরৎচন্দ্রের ক্ষেত্রেও একই কথাই বলতে হয়। বিশ্বত্রাস বোলার চন্দ্রশেখর শৈশবে পোলিও-তে আক্রান্ত হয়ে চিহ্নিত হয়েছিলেন ‘বিকলাঙ্গ’ হিসেবে। তাঁর ক্রীড়া-জগতে অক্ষয় কীর্তি স্থাপনের কথা সেই সময় কারো কষ্ট-কল্পনাতেও আসেনি। এমন উদাহরণ বহু আছে।

আমাদের দেশে শুধু মৌসুমীই নয়, বর্তমানে আরও কয়েকজনের সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা বিস্ময়কর শিশু প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। এমনই একজন চার বছরের মেয়ে পায়েল। ৮৯-তে পুনে ম্যারাথন দৌড় প্রতিযোগিতায় ২ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট ৫২ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে সারা বিশ্বকে চমকিত করেছে। দৌড়ের সময় পায়েলের ওজন ছিল মাত্র ১৫ কেজি, উচ্চতা ৫৪ মিটার। অনসূয়া নটরাজন ১১ বছরের বালিকা। নিবাস কোলকাতায়। ভরতনাট্যমে অসাধারণ প্রতিভাধর স্বাক্ষর রেখে বহু গুণীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ইতিমধ্যেই। তাল ও লয়ের দখল, ভাব উপলব্ধির ক্ষমতা বিস্ময়কর।

মধ্যপ্রদেশের গ্রামের ছেলে ন’বছরের বীরেন্দ্র সিং ইতিমধ্যেই ৩০০ কবিতা লিখেছে, যেগুলো কাব্যগুণে সাহিত্যিক ও সাহিত্য-রসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ভূপালের কবি মহল থেকে পেয়েছে ‘বাল কবি নাদান’ উপাধি। ওর প্রতিভার প্রকাশ মাত্র চার বছর বয়সে। ওর কাব্য প্রতিভা শুধু কবিতাতেই আবদ্ধ থাকেনি। বেশ কিছু গল্পও লিখেছে, লিখেছে সিনেমার চিত্রনাট্য। ইতিমধ্যে বোম্বাই ফিল্ম জগতের চিত্র-পরিচালক শেখর কাপরের ফিল্মে সাহায্যকারী হিসেবে নাকি থাকার আমন্ত্রণ পেয়েছে।

অমিত পাল সিং চাড্ডা ক্লাস থ্রির ছাত্র। পড়ে বালভারতী এয়ারফোরস স্কুলে। ইতিমধ্যে জীবন্ত ‘ইয়ার বুক’ হিসেবে অনেক প্রচার মাধ্যমের নজর কেড়েছে। টু-তে পড়তে ওর বাবা কিনে দিয়েছিলেন ‘কম্পিটিশন সাকসেস রিভিউ’। মাত্র দু-ঘণ্টায় মুখস্ত করে অমিত শুরু করেছে ওর জয়যাত্রা।

আমেরিকান টেলিভিশন একটি সাত বছরের শিশুর অদ্ভুত কান্ডকারখানার সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছে কোটি কোটী দর্শকের। শিশুটি ভারতীয়- জিপসা মাক্কর। মারুতি, ফিয়াট ও মারুতি জিপসি ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগের দুরন্ত-গতির স্টিয়ারিং কন্ট্রোল করছে চূড়ান্ত নিখুঁতভাবে।

অন্ধ্রে কিশোর শ্রীনিবাস মাত্র ছ-বছর বয়সেই ম্যাণ্ডলিন বাজানো শুরু করেছিল। বর্তমান বয়স ১৯। বিদেশী এই যন্ত্রে ভারতীয় রাগ-রাগিণীর সুর সাগরে দেশ বিদেশের সুর-রসিকদের ভাসিয়ে দিয়ে গেছে।

পেরামবুরের ন’বছরের বাসুদেবন মুখে মুখে চার অঙ্কের যে কোনও সংখ্যার স্কোয়ার রুট, কিউব রুট, ফোরথ রুট কষে ফেলছে।

তের বছরের ভরতনাট্যম শিল্পী বর্ণনা বসু তালে, ভাবে বিস্ময়কর শিশু প্রতিভার প্রমাণ রেখেছে।

অনুসূয়া নটরাজন
বীরেন্দ্র সিং
আমিত পাল
জিপসা মাক্কর
বসুদেবন
পিনাকী

ক্যালিফোর্নিয়ার প্রবাসী ভারতীয় ন’বছরের স্বেতা ভরদ্বাজ আজ ভরতনাট্যমের পেসাদার নৃত্য শিল্পী। মুদ্রা, তাল, লয়, ভাবে এক কথায় অনন্য।

বাঙ্গালোরের ১৬ বছরের কিশোর আর নিরঞ্জন কম্পিউটার প্রয়োগে নতুন তত্ত্ব হাজির করে বিশ্বের কম্পিউটার বিশেষজ্ঞদের যথেষ্ট নাড়া দিয়েছে।

প্রবাসী ভারতীয় বালা অনতি মাত্র ১১ বছরের বয়সে অসাধারণ বিদ্যা-বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাবিদদের স্তম্বিত করে দিয়েছে। ও ইতিমধ্যে একটি বইও লিখেছে- এইডস নিয়ে। বালা এ বছর কলেজে পড়ছে, বয়স মাত্র ১৩।

১৬ বছরের কিরণ কেডলায়া ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত ম্যাথামেটিক্যাল অলিম্পিয়াডে প্রথম স্থান দখলে রেখে অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। অঙ্কের বিরল প্রতিভা কিরণের দখলে আজ বহু পুরস্কার।

নেহাতই উদাহরণ টানতে এই প্রসঙ্গে এমন একজনের প্রসঙ্গ টানতে চলেছি, যে আমারই পুত্র হওয়ার দরুন একান্তভাবেই সঙ্কোচ অনুভব করছি। পিনাকী যখন ১১ বছরের বালক, ক্লাস ফাইভের ছাত্র তখন থেকেই সম্মোহন করতে সক্ষম। না; জাদুকরদের মত নকল বা সাজান অথবা লোক ঠাকনো সম্মোহনের কথা বলছি না; বলছি পাভলভিয় পদ্ধতি অনুসরণ করে মনোরোগ চিকিৎসকরা বা মনোবিজ্ঞানীরা যে সম্মোহন করেন- তার কথা। আমার যে কোনও পান্ডুলিপি প্রকাশের আগে একজনই পড়ে, পিনাকী। সংযোজন, সঙ্কোচন বা পরিমার্জনের ক্ষেত্রে ওর মতামতকে বহুক্ষেত্রেই যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করি। ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ বইটির দ্বিতীয় খন্ডের সম্পাদনার দায়িত্ব ওর ওপরই তুলে দিয়েছিলাম। ওর বয়স এখন ষোল, ক্লাস টেনের ছাত্র।

আমরা আপাতভাবে যে সব ঘটনা দেখে অলৌকিক ক্ষমতার প্রকাশ বলে মনে করি, সাধারণভাবে সে-সবই ঘটে থাকে হয় কৌশলের সাহায্যে, নতুবা আমাদের বিশেষ শারীরবৃত্তির জন্য। জাদু কৌশল ও শারীরবৃত্তি বিষয়ক বিষয়ে পিনাকীর আপাতত যতটুকু জ্ঞান আছে, তাতে কোনও অলৌকিক বাবার পক্ষে পিনাকীর আপাতত যতটুকু জ্ঞান আছে, তাতে কোনও অলৌকিক বাবার পক্ষে পিনাকীর সামনে কোনও অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে দেখিয়ে পার পাওয়া অসম্ভব, পিনাকীর চ্যালেঞ্জে পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় একশো ভাগ।

এতক্ষণ যাদের কথা বললাম, তারা সকলেই এ-যুগেরই মানুষ। এ-বার যার কথা বলবো, তাঁর মুঠোতেই রয়েছে সবচেয়ে কম বয়সে ম্যাট্রিক অর্থাৎ দশম মান পাশ করার রেকর্ড।

১৯৩৯ সালে অর্থাৎ আজ থেকে ৫১ বছর আগে মাত্র ১০ বছর ৭ মাস বয়সে ম্যাট্রিক পাশ করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিলেন বাণী ঘোষ। পাশ করেছিলেন প্রথম বিভাগে।

বাণীদেবীর বিয়ের পর পদবী হয়েছে গুহঠাকুরতা। থাকেন কলকাতার বেহালায়। বাবা ক্যাপ্টেন জিতেন্দ্রমোহন ঘোষ ছিলেন নেপাল সরকারের চিকিৎসক। থাকতেন কাঠমুন্ডুতে। নেপালে সে সময় মেয়েদের পড়াশোনার চল ছিল না। তাই মেয়েদের স্কুলও ছিল না। গৃহশিক্ষকের কাছেই পড়াশোনা, গৃহশিক্ষক আনা হয়েছিল কলকাতা থেকে, নেপালের মহারাজা এনে দিয়েছিলেন জিতেন্দ্রমোহনের অনুরোধে। কাকা শচীন্দ্রমোহন ছিলেন কলকাতায় স্মল জাজেস কোর্টের উকিল। তিনিই নিয়মিত বইপত্র ও সিলেবাস পাঠাতেন কাঠমুন্ডুতে। পরীক্ষার তিন মাস আগে কলকাতায় এলেন। এখানেও গৃহশিক্ষকের কাছেই পড়েছিলেন। আমহারস্ট স্ট্রিটের সিটি গার্লস স্কুল থেকে পরীক্ষা দেন।

দশ বছরের ম্যাট্টিক পাশ করেই বাণীদেবী বসে থাকেননি। ৪১-এ মাত্র ১২ বছর বয়সে বেথুন কলেজ থেকে পাশ করেন ইন্টারমিডিয়েট। এটাও সবচেয়ে কম বয়েসে ইন্টারমিডিয়েট পাশের রেকর্ড। খবরটা লন্ডন টাইমস, আনন্দবাজার, যুগান্তর সহ বহু পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ৪৩-এ বি এ পাশ করলেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে। বয়স তখন ১৪। ভর্তি হলেন এম এ ক্লাসে। ৪৫-এ বিয়ে হল। স্বামী ইঞ্জিনিয়ার। তারপর আর পড়তে পারেননি।

বিভিন্ন সংবাদপত্র এবং সাময়িকপত্রে বাণীদেবীর বহু রম্যরচনা ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে। অংশ নিয়েছেন আকাশবাণীর কথিকায়। বাণীদেবী এখনো প্রচণ্ড কর্মক্ষম। দুই মেয়ে এক ছেলে। এক মেয়ে ডক্তার, অন্যজন আর্কিটেক্ট। একমাত্র ছেলে ইঞ্জিনিয়ার।

বাণী গুহঠাকুরতা (ঘোষ)

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয় দেশগুলোতে প্রডিজি চিহ্নিত প্রতিভার দেখা মেলে আমাদের দেশের তুলনায় বহুগুণ বেশি। প্রডিজির আবির্ভাব অনেক ঘটে, কিন্তু কালজয়ী প্রতিভার আবির্ভাবের ঘটনা একান্তই বিরল। প্রডিজি পরম বিস্ময়কর প্রতিভা বলে যাকে আমরা স্বীকৃতি দিয়ে থাকি তার প্রতিভার সঙ্গে মৌলিকত্ব যুক্ত হলে তবেই কালজয়ী প্রতিভা হিসেবে বিকশিত হওয়ার দৃঢ় সম্ভাবনা থাকে।

অনেক ক্ষেত্রে প্রতিভার দ্রুত বিকাশ-গতি শিশুকাল থেকে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এগিয়েই চলে। ফলে সমাজ পায় এক এক অসাধারণ প্রতিভা। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উত্তরকালে এঁদের বিকাশ-গতি মন্থর হয়ে আসে। ফলে সম্ভাবনাময় শিশু-প্রতিভা পরবর্তীকালে নেমে আসে প্রায় সাধারণভাবে আমরা পরিচিত নই। তাই এই ধরনের শিশু প্রতিভার সঙ্গে যখন আমরা পরিচিত হই, তখন তার অনেক কিছুই আমাদের কাছে রহস্যময়, বিস্ময়কর, ব্যাখ্যাহীন, অলৌকিক ক্ষমতার প্রকাশ, ঈশ্বরের দান, ঈশ্বরের প্রকাশ, জাতিস্মরতার প্রমাণ ইত্যাদি মনে হয়।