রোকেয়া এখন বাঙালি মুসলমান পিতৃতন্ত্রের কাছে এক মহীয়সী, তিনি আজ অলঙ্কত করছেন পুণ্যময়ীদের পংক্তি;–কোনো প্রথাগত নারীর জন্যে এটা পরম প্রাপ্তি, কিন্তু রোকেয়ার জন্যে এটা খুবই শোচনীয় স্বীকৃতি। ভারতীয় ভূভাগের এক বড়ো বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে বিদ্রোহীদের মূলেই উপড়ে ফেলা হয় বা চেষ্ট করা হয় উপড়ে ফেলার, তবে তা সম্ভব না হ’লে তাদের নিষ্ক্রিয় ক’রে দেয়া হয় প্রথার ভেতর বিন্যস্ত ক’রে। বিদ্রোহীরা হয়ে ওঠেন প্রথাগত। রোকেয়াকেও তাই করা হয়েছে; রোকেয়া হয়ে উঠেছেন এক মহীয়সী পুণ্যময়ী সতী নারী, বা একজন মুসলমান ভদ্রমহিলা। এভাবে চূড়ান্তরূপে নিনি স্ক্রয় ক’রে দেয়া হয়েছে রোকেয়াকে। তার নামটিই এর ভালো পরিচয় দেয়। পুরুষেরা ও তাঁর ভক্ত প্রথাগ্রস্ত নারীরা তাকে বিখ্যাত ক’রে তুলেছেন ‘বেগম রোকেয়া’ নামে, যদিও তার নামে কখনো ‘বেগম ছিলো না। তার নাম ছিলো রোকেয়া বা রুকাইয়া খাতুন; তবে তিনি নিজেও মেনে নিয়েছিলেন পশ্চিমি পুরুষতান্ত্রিক নাম ‘আর এস হোসেন’ বা ‘রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন’। তার জন্মের সালতারিখকেও অনেকটা কিংবদন্তি মনে হয়;-অনেকে শুধু ১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে তার জন্ম হয়েছিলো বলে জানান, জন্মের তারিখ উল্লেখ করেন না; আবার কেউ কেউ বলেন তার জন্ম হয়েছিলো। ১৮৮০ সালের ডিসেম্বরের ৯ তারিখে, এবং পুণ্যবানদের মতো তার মত্যুও হয়েছিলো ডিসেম্বরের ৯ তারিখেই (১৯৩২)। হয়তো তার জন্মের আসল তারিখটি লুপ্তই হয়ে গেছে। তাঁর জীবনকাহিনীও জানা যায় সামান্য; তবে তার ভেতরেও চোখে পড়ে রোকেয়া নামের অগ্নিশিখাটি।

পিতৃতান্ত্রিক, দুশ্চরিত্র, অপব্যয়ী, জমিদার পিতার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর গর্ভে তাঁর জন্ম হয়েছিলো। বেড়েছেন তিনি অন্ধকার অবরোধের মধ্যে, যেখানে মেয়েদের পড়াশুনো ছিলো নিষিদ্ধ। তবে বড়ো ভাইয়ের কাছে গোপনে শিখেছেন বাঙলা ও ইংরেজি, এবং শিখেছেন অত্যন্ত ভালোভাবে নিজেরই সহজাত প্ৰতিভায়। কেউ কেউ মনে করেন। রোকেয়া বিয়ের পরে স্বামীর কাছে ভালোভাবে শিখেছিলেন ইংরেজি: এটাও এক পুরুষতান্ত্রিক বিশ্বাস। তাদের কাছে নারীর ইংরেজি শেখা বিস্ময়কব ব্যাপাব, বাঙলা নিজে নিজেই শেখা সম্ভব; ইংরেজি শিখতে হ’লে দরকার একটি উদার শিক্ষিত স্বামী! যদি ধরি যে রোকেয়ার বিয়ে হয়েছিলো আঠারো বা ষোলো বছর বয়সে, তাহলে স্বামীর কাছে ইংরেজি শেখার তত্ত্বটি বাতিল ক’রে দিতে হয়; কেননা ওই বন্যাসের পর একটি বিদেশি ভাষা শেখা এবং তাতে Sultana’s Draum লেখা ভাষা অর্জন সম্পর্কে ভুল ধারণামাত্র। তাঁর বিয়ে হয়। কারো মতে ষোলো, কায়ো মতে আঠারো বছর বয়সে। বেশ বড়ো পরিহাস বলে মনে হয় রোকেয়াব বিয়েটিকে : বাঙালি নারীমুক্তির সন্তের বিয়ে হয় এক দোজবর, অবাঙালি, বিহারির সাথে। তার স্বামীটি যে-বছর, ১৮৮০তে, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হন, সে-বছর জন্ম হয় তার; তিনি স্ত্রী হন। পিতার বয়স্ক এক পুরুষের। সাখাওয়াতের বয়স তখন ছিলো ৩৮ বা ৪২, রোকেয়ার ছিলো ১৬ বা ১৮। ওটি ছিলো বিয়ের জন্যে বিয়ে; বিয়ের সময়ই সবাই জানতো যে দীর্ঘ বৈধব্য পালনই হবে রোকেয়ার বিবাহিত জীবন। মুসলমান পিতৃতন্ত্র রোকেয়ার জীবনকে মর্মস্পশী ক’রে তুলতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করে নি; তাকে ধ্বংস ক’রে দিতে পারলেই সেটি সার্থকতা বোধ করতো, কিন্তু পারে নি।

রোকেয়ার পিতা অমানুষ ছিলেন, কিন্তু বড়ো ভাই ও তাঁর স্বামীটি ভিন্ন ছিলেন ওই সময়ের মুসলমান পুরুষদের থেকে। রোকেয়ার সমগ্র রচনাবলি ভ’রে বয়েছে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ও ঘৃণা; পুরুষ’ ধারণাটিই ছিলো তার কাছে আপত্তিকর। পুরুষদের তিনি যে সামান্য করুণা করেছেন, তা সম্ভবত ভাই ও স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে। রোকেয়ার রচনাবলির প্রধান বৈশিষ্ট্য পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ; পশ্চিমের প্রথম নারীবাদী মেরি ওলস্টোনক্র্যাফটের মধ্যেও এতোখানি পুরষবিদ্বেষ ও দ্রোহিতা দেখা যায় না। মেরি পুরুষকে সমকক্ষ বন্ধু হিশেবে মেনে নিয়েছিলেন রোকেয়া তাও মানতে রাজি হন নি। মেরিব সাথে রোকেয়ার জীবনের মিল ও অমিল দু-ই চোখে পড়ে। মেরি ছিলেন গরিব পরিবারের মেয়ে, লেখাপড়া শিখেছিলেন নিজের চেষ্টায়, বালিকা বিদ্যালয় খুলেছিলেন, বই লিখেছিলেন বালিকাদের শিক্ষা সম্পর্কে। তিনি বিয়ে না ক’রে বাস করেছেন প্রেমিকের সাথে, জন্ম দিয়েছেন অপ্ৰথাগত কন্যা; প্রতারিত হয়েছেন, তারপর আবার প্রেমে পড়ে গর্ভবতী হয়েছেন, এবং কন্যা জন্ম দিতে গিয়ে লোকান্তরিত হয়েছেন মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সে। মেলােমশার সুযোগ পেয়েছেন মেরি ওই সময়ের শ্রেষ্ঠ পুরুষদের সাথে। রোকেয়া জন্মেছেন ধনী পরিবারে, ব্যান্য কেটেছে অবরোধে, বিয়ে হয়েছে পিতার বয়সী পুরুষের সাথে, জন্ম দিয়েছেন দুটি অকালমৃত কন্যা। তাঁর বিবাহিত জীবন এগারো বা তেরো বছরের। মেরি শারীরিক সম্পর্কে এসেছেন দুটি পুরুষের সাথে, এবং সংস্পর্শে এসেছেন বহু পুরুষের; রোকেয়া শারীরিকভাবে জেনেছেন একটি পুরুষকে, সে-জানাও ছিলো সম্ভবত অতৃপ্তিকর; আর সংস্পর্শে আসেন নি কোনো পুরুষের। রোকেয়ার সমাজের পুরুষ তার কাছে ছিলো পশুর সমান। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি পুরুষপ্রসঙ্গ তোলেনই নি : পিতাকে তিনি প্রায় পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন, স্বামী ও ভাইদের স্বীকার করেছেন অনেকটা করুণা ক’রে।

নিজের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে নীরবতাই ছিলো তার স্বভাব, কিন্তু ইঙ্গিতেই তিনি জানাতে পারতেন প্রচুর। ৩০, ৪ ৩১-এর এক চিঠিতে লিখেছিলেন : শৈশবে বাপের আব্দর পাই নি, বিবাহিত জীবনে কেবল স্বামীর রোগের সেবা করেছি। প্রত্যহ Urine পরীক্ষা করেছি। পথ্য রোধেছি, ডাক্তাবকে চিঠি লিখেছি। দুবার মা হয়েছিলুম-তাদেরও প্রাণভরে কোলে নিতে পারি নি। একজন ৫ মাস বয়সে, অপরটি ৪ মাস বয়সে চলে গেছে। আর এই ২২ বৎসর যাবত বৈধব্যের আগুনে পুড়ছি’ [দ্র মোশফেকা (১৯৬৫, ১৫)]। এ হচ্ছে রোকেয়ার সমগ্র আত্মজীবনী, কয়েক পংক্তিতে লেখা কয়েক খণ্ড। এতে জীবনের প্রথাগত ব্যর্থতার ছবিটি যেমন মর্মস্পশী, তেমনই এর একটি পংক্তি সাংঘাতিক : ‘আর এই ২২ বৎসর যাবত বৈধব্যের আগুনে পুড়ছি।’ বৈধব্যের কথা এলেই কেনো আসে আগুনের রূপক, দাউ দাউ ক’রে ওঠে কেনো দেহবিহঁকুৎসব? বিদ্যাসাগর বালিকা বিধবার ‘অসহ্য বৈধব্যযন্ত্ৰণানলের কথা বার বার বলেছেন, রোকেয়া বলেছেন নিজেরই কথা। শরীরকে তিনি সম্পূর্ণ চেপে গেছেন কাজে ও লেখায়, পালন ক’রে গেছেন মুসলমান ব্ৰহ্মচর্য। মুসলমান পুরুষেরা যে তাকে ধন্যধন্য করে, তার অনেকটা তার ওই মর্ষকামী ব্ৰহ্মচর্যের জন্যে। তিনি বলেছেন, ‘আশরাফগণ সপ্তম বর্ষীয়া বিধবা কন্যাকে চির-বিধবা রাখিয়া গৌরব বোধ করেন (রানী ভিখারিণী’, রোর, ২৯১); পদ্মরাগ-এ (রোর, ৪৬২) বলেছেন, ‘সিদিকা নিজেকে ‘চিরকুমারী’ জ্ঞান করিবেন না, কারণ চিরকুমারী নিঃস্ব;.তিনি নিজেকে বিধবা মনে করবেন, যেহেতু বিধবার স্বামী-স্মৃতিরূপ বহুমূল্য সম্পদ থাকে। পতিধ্যান তাহার জীবনের নিত্যসহচর। তাহা না হইলে বিধবা বাচিবে কি লইয়া?’ এ হচ্ছে পুরুষতন্ত্রকে মেনে নিয়ে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।

তবে রোকেয়া নিজে পতিধ্যান করেন নি। ২৫ ৪ ৩২-এর এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন : ‘আপনি ঘৃণাক্ষরেও ভাববেন না যে, আমার শ্রদ্ধেয় স্বামীর স্মৃতিরক্ষার জন্যই আমি এ স্কুল আঁকড়ে পড়ে আছি।… আমি আমার স্বামীর নামের কাঙ্গাল নই [মোশফেকা (১৯৬৫,২৪-২৫)]। তিনি বিদ্যালয়ের নামবদলের জন্যেও প্রস্তুত ছিলেন; কিন্তু তাঁর পুরুষ অভিভাবকেরা তাতে রাজি ছিলেন না; কেননা তারা সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল’ নামটিতে দেখতেন পুরুষতেন্ত্রর জয়’;–একটি নারী বালিকাদের শিক্ষা দেয়ার ছলে পুজো ক’রে চলছেন একটি মৃত পুরুষকে! নারীকে মুক্তি চাইতে হবে পুরুষাধিপত্য মেনে নিয়ে; পুরুষের লাশ অনেক গুরুত্বপূর্ণ জীবিত নারীর থেকে। রোকেয়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন নি, বিয়ে তার কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিলো না: তবে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো পুরুষতন্ত্রের কাছে। রোকেয়া যদি আবার বিয়ে করতেন, তাহলে পুরুষতন্ত্র তাকে বাতিল ক’রে দিতো; নারীমুক্তির কথা ভুলে তাকে থাকতে বাধ্য করতো স্বামীর পদতলে। রোকেয়া ছিলেন আমূল নারীবাদী, কিন্তু তিনি জানতেন। তিনি পৃথিবীর এক বর্বর পিতৃতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত; তাঁকে বিদ্রোহ করতে হবে ওই বর্বরতাকে স্বীকার ক’রেই। ওলস্টোক্র্যাফটের জীবন এ-সমাজে অকল্পনীয় { রোকেয়া নিজের মধ্যে সংহত করেছিলেন প্রবল দ্রোহিতা ও মর্ষকামিতাকে, পুরুষতন্ত্রকে আক্রমণ ও পরাভূত করার জন্যে তাকে সুখের সাথে সহ্য করতে হয়েছে পুরুষতন্ত্রের পীড়ন। কিন্তু তিনি পুরুষতন্ত্রকে ধ্বংস করার জন্যে নিরন্তর লড়াই ক’রে গেছেন; তাঁর রচনাবলি পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ধারাবাহিক মহাযুদ্ধ।

রোকেয়া লিখেছেন প্ৰবন্ধ, গল্প, উপন্যাস; এবং প্রতিটি আঙ্গিক তিনি ব্যবহার করেছেন। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্ররূপে। তাঁর প্রবন্ধ বিশুদ্ধ মননশীল প্ৰবন্ধ নয়, তাতে রয়েছে কথাশিল্পিতার ছাপ; আবার তার উপন্যাসও পুরোপুরি উপন্যাস নয়, তাতে রয়েছে প্রাবন্ধিকতার ছাপ। বিশুদ্ধ শিল্পসৃষ্টি তাঁর লক্ষ্য ছিলো না; তাঁর লক্ষ্য ছিলো পৌনপুনিক আক্রমণে পুরুষতন্ত্রকে দুর্বল ক’রে নারীকে সমাজে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা। চেতনায় তিনি এগিয়ে ছিলেন তাঁর সময়ের মুসলমান ও হিন্দু সমস্ত পুরুষ, নারী ও মহাপুরুষদের থেকে; তার ছিলো সরাসরি মতপ্রকাশের চমৎকার স্বভাব, এবং ছিলো। প্রখর পরিহাসের শক্তি। স্বামীর মৃত্যুর আগের রোকেয়ার লেখায় দেখা যায় আক্রমণাত্মক প্রবণতা, একাকী জীবনে তাঁর লেখায় বড়ো হয়ে ওঠে পরিহাস, তীক্ষু উইট, যা তাঁর অন্তৰ্গত বিষগ্নতার প্রকাশ। তিনটি ভাষা-বাঙলা, উর্দু, ইংরেজি-ছিলো তাঁর আয়ত্তে, তার হাতের লেখা ছিলো পুষ্পপাপড়ির মতো মনোহর; অনুরাগী ছিলেন তিনি প্রথাগত কবিতার, তিনি নিজেই ছিলেন ভালো কবি; এবং মননশীলতায় ছিলেন সে-সময়ের শ্রেষ্ঠদের একজন। উপন্যাস রচনায় ছিলেন তিনি বঙ্কিমানুসারী, তার পদ্মরাগ-এর প্লট বঙ্কিমী রীতিতে তৈরি। তিনি কি ওলস্টোনক্র্যাফটের নাম শুনেছিলেন, তার বইটি দেখেছিলেন? এর কোনো প্রমাণ তিনি রেখে যান নি, তবে মনে হয় মেরির বই তিনি দেখেন নি; দেখলে রোকেয়া স্ত্রীজাতির অবনতি’ নামে প্ৰবন্ধ না লিখে লিখতেন। সুপরিকল্পিত পূর্ণাঙ্গ বই। তিনি ইংরেজিতে একটি চমৎকার ইউটোপিয়া লিখেছিলেন, এবং বাঙলায় অনুবাদ করেছিলেন; আজো সেটিই বাঙলায় লেখা একমাত্র ইউটোপিয়া। ইউটোপিয়া ও অ্যান্টি-ইউটোপিয়া বা ডিস্টোপিয়া তার চেতনায় বড়ো স্থান ক’রে নিয়েছিলো; কেননা তিনি যে-সমাজে বাস করতেন সেটিই ছিলো এক মূর্ত অ্যান্টি-ইউটোপিয়।, এবং তিনি পেরিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। ওই সমাজকে। শুধু ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নয়, তাঁর পদ্মরাগও একধরনের ইউটোপিয়া, আর তার কয়েকটি রূপকথা- ‘জ্ঞানফল’, ‘সৃষ্টিতত্ত্ব’, ‘নারীসৃষ্টি’, ‘মুক্তিফল’ ইউটোপিয়া ও অ্যান্টি-ইউটোপিয়ার মিশ্রণী।

রোকেয়া পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে চালিয়েছিলেন সার্বিক আক্রমণ। তিনি ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছেন। পুরুষতন্ত্রের তৈরি নারী ও পুরুষের ভাতৃমূর্তি, বর্জন করেছেন নারীপুরুষের প্রথাগত ভূমিকা; তুলনাহীনভাবে আক্রমণ করেছেন। পুরুষতন্ত্রের বলপ্রয়োগসংস্থা ধর্মকে। রোকেয়া পরে ধর্মের সাথে কিছুটা সন্ধি করেছেন আত্মরক্ষার জন্যে; নইলে তাকে ও তাঁর আদর্শকে অত্যন্ত বিপন্ন ক’রে তুলতো মুসলমান পিতৃতন্ত্র। তিনি এমন এক পিতৃতন্ত্রের সদস্য ছিলেন, যেখানে পুত্র মাকে শেখায় সতীত্ব। তাঁর ভাগনে আবদুল করিম গজনভি, বাল্যকালেই বিলেতে গিয়েছিলেন, মন্ত্রী আর স্যার হয়েছিলেন, কিন্তু মধ্যযুগ থেকে বেরোতে পারেন নি; তিনি খালা রোকেয়াকে পর্দা শেখাতে দ্বিধা করেন নি। খালাকে শর্ত দিয়েছিলেন যদি খালা পর্দা মানেন (এর অর্থ রোকেয়ার আচরণ পর্দাসম্মত ছিলো না বিলোতফেরত স্যার-ভাগনের মতে), তবে তিনি রোকেয়ার স্কুলটি সরকারি করে দেবেন। পুত্র যেখানে মাকে সতীত্ব শেখায়, সে-উৎকট ভূখণ্ডে রোকেয়া ধর্মের নামে মাঝেমধ্যে দু-একটি খাই উৎসর্গ ক’রে নিস্তেজ ক’রে দিতে চেয়েছেন ধর্মকে। ১৯০৪-এ বেরোয রোকেয়ার মূর্তিভাঙা প্ৰবন্ধ ‘আমাদের অবনতি’ (নবনূর : ১৩১১, ভাদ্র)। মতিচুর-এ (প্রথম খণ্ড : ১৯০৫) মুদ্রিত হয় এর খণ্ডিত, মুসলমান পিতৃতন্ত্রের অনুমোদিত রূপ : স্ত্রীজাতির অবনতি’। এটি রোকেয়ার Vindication of the Rights of Wonian। ওলস্টোনক্র্যাফটের মতো রোকেয়া নারীমুক্তির সার্বিক প্ৰস্তাব পেশা করেন নি। এ-প্রবন্ধে, তবে নারীমুক্তির মূলকথার সবই এতে রয়েছে সংক্ষেপে। এর ‘আপত্তিকর’ অংশের সাথে বিস্ময়কর মিল পাওয়া যায় এলিজাবেথ কেডি স্ট্যান্টন ও অন্যান্যের ‘নারীর বাইবেল’-এর (১৮৯৫, ১৮৯৮)।

নারীবাদনেত্রী স্ট্যান্টন দেখেছিলেন, নারীমুক্তির বিরুদ্ধে পুরুষতন্ত্র সব সময়ই উচিয়ে ধরে বাইবেল, তাই তিনি বাতিল ক’রে দেন বাইবেলকেই। তিনি আক্রমণ করেন বাইবেলি নারীর ভূমিকা ও ভাবমূর্তিকে; বলেন : ‘বাইবেলকে আমরা দীর্ঘকাল ধ’রে অন্ধভক্তির বস্তু ক’রে তুলেছি। এখন এটি অন্যান্য বইয়ের মতো পড়ার সময় এসে গেছে, নিতে হবে এর ভালো শিক্ষা বাদ দিতে হবে খারাপটা’ [দ্র হোল ও লেভিন (১৯৭৩, ৪৪৫)]। তিনি ‘পাঁজরের হাড়ের গল্পটিকে ‘তুচ্ছ অস্ত্ৰোপচার’ বলে বাতিল ক’রে দেন; দেখান যে সম্পূর্ণ বাইবেল দাঁড়িয়ে আছে হাওয়া বা নারীর পাপের ধারণা ভিত্তি করে। তিনি বলেন, সাপটি, ফলগাছটি এবং নারীটিকে সরিয়ে নাও; তারপর আর থাকে না কোনো পতন, কোনো ক্রুদ্ধ বিচারক, কোনো নরক, কোনো চিরশাস্তি:- সুতরাং দরকার পড়ে না কোনো ত্ৰাতার। এভাবে খসে পড়ে সমগ্র খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের তলদেশ। এ-কারণেই সমস্ত বাইবেলি গবেষণা ও উচ্চতর সমালোচনায় পণ্ডিতেরা কখনো নারীর অবস্থানটি ছুয়ে দেখেন না’ [দ্র হোল ও লেভিন (১৯৭৩, ৪৪৫)]। এর ফলে হৈচৈ পড়ে পশ্চিমে; ভদ্ৰ নারীমুক্তিবাদীরা অস্বীকার করেন স্ট্যান্টনকে। এর মাত্র ন-বছর পরে পৃথিবীর এক অন্ধকার কোণে উগ্র পিতৃতন্ত্রের মধ্যে রোকেয়া, মাত্র চব্বিশ বছরের তরুণী, ঘোষণা করেন : ‘আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন।’ পিতৃতন্ত্রের দীর্ঘ ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নারী সরাসরি বাতিল ক’রে দেন কোনো বিশেষ একটি ধর্মগ্রন্থকে নয়, সমস্ত ধর্মগ্রন্থকে; ধর্মগ্রন্থের পেছনের সত্যকে প্রকাশ করেন অকপটে। পিতৃতন্ত্রের বলপ্রয়োগসংস্থাটি এর আগে, ও পরে, এমন আঘাত আর কখনো বোধ করে নি। [রোর, সম্পাদকের নিবেদন, (১১)-(১৩)] :

‘আমাদেব যথাসম্ভব অধঃপতন হওয়াব পর দাসত্ত্বের বিরুদ্ধে কখনও মাথা তুলিতে পাৱি নাই;. যখনই কোন ভগ্নী মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা কবিয়াছেন, আমনই ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচন রূপ অস্ত্ৰাঘাতে তাহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। আমরা প্রথমতঃ যাহা সহজে মানি নাই, তাহ পরে ধর্মেৰি আদেশ ভাবিয়া শিবোধাৰ্য করিয়াছি; এখন ত অবস্থা এই যে, ভূমিষ্ঠ হওয মাত্রই শুনিতে পাই : ‘প্যাটু তুই জন্মেছিস্ গোলাম, থাকিবি গোলাম।’ সুতরাং আমাদের আত্মা পর্যন্ত গোলাম হইয়া যায় …
আমরা যখনই উন্নত মস্তকে অতীত ও বর্তমানেব প্রতি দৃষ্টিপাত করি, আমনই সমাজ বলে : ‘ঘুমাও, ঘুমাও, ঐ দেখ নরক।’ মনে বিশ্বাস না হইলেও অন্ততঃ আমরা মুখে কিছু না বলিয়া নীরব থাকি।…. আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ কবিয়াছেন।…
এই ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষ-রূচিত বিধি-ব্যবস্থা ভিন্ন আব্ব কিছুই নহে। মুণিদের বিধানে যে-কথা শুনিতে পান, কোন স্ত্রী মুণির পিন্ধানে হয়ত তাহার বিপরীত নিযাম দেখিতে পাইতেন। যাহা হউক, ধর্মগ্রন্থসমূহ ঈশ্বর-প্রেরিত কি না, তাহা কেহই নিশ্চয় বলিতে পারে না। যদি ঈশ্বর কোন দূত বৰ্মণী-শাসনের নিমিত্ত প্রেরণ করিতেন, তবে সে দূত বোধ হয় কেবল এশিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকিতেন না।…এখন আমাদের আর ধর্মের নামে নত মস্তকে নরের অযথা প্ৰভুত্ব সহ উচিত নহে। আরও দেখ, যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ়, সেইখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক।…
‘ধর্ম’ শেষে আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর কবিয়াছে, ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমণীর উপর প্রভুত্ব করিতেছেন।…’

রোকেয়া কোনো বিশেষ ধর্মকে বাতিল করেন নি, বাতিল করেছেন সব ধর্মকেই। ১৯০৪-এ এটা সম্ভব ছিলো, কিন্তু রোকেয়া যদি আজ একথা বলতেন, তবে তাকে প্রকাশ্য রাস্তায় ছিড়ে ফেলা হতো। মুসলমান পিতৃতন্ত্র তাঁর ধর্মসমালোচনা অনুমোদন করে নি, তাই রোকেয়াকে বাদ দিতে হয়েছিলো তাঁর রচনার শ্রেষ্ঠাংশ; এবং পরে তাকে কিছুটা সন্ধি করতে হয়েছিলো মুসলমান পিতৃতন্ত্রের সাথে। স্ত্রীজাতির অবনতি’তে রোকেয়া শুধু পিতৃতন্ত্রের হিংস্র বলপ্রয়োগসংস্থাটিকে আক্রমণ করেন নি, তিনি আক্রমণ করেছেন। পুরুষতন্ত্রের সমগ্র জীবনপরিকল্পনাকেই। তিনি ব্যাখ্যা ও বাতিল করেছেন। পুরুষতন্ত্রের তৈরি প্রতিটি ভাবমূর্তি। নারীর সমস্ত প্রথাগত ভাবমূর্তি বর্জন ক’রে তিনি নারীর অবস্থানের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন নারী দাসী মাত্র। তিনি বলেছেন, ‘এই বিংশ শতাব্দীর সভ্যজগতে আমরা কি? দাসী৷’ (রোর, ১৭)!! একবার নয়, বলেছেন বার বার। তিনি বলেছেন, ‘দাসী৷’ শব্দে অনেক শ্ৰীমতি আপত্তি করিতে পারেন। কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, ‘স্বামী’ শব্দের অর্থ কি? দানকর্তাকে ‘দাতা’ বলিলে যেমন গ্রহণকর্তালে “গ্রহীতা” বলিতেই হয়, সেইরূপ একজনকে “স্বামী, প্রভু, ঈশ্বর” বলিলে অপরকে “দাসী” না বলিয়া আর কি বলিতে পারেন’ (রোর, পাদটীকা, ১৮-১৯)? তার কাছে নারীপুরুষের প্রথাগত সম্পর্ক কোনো পবিত্র মহৎ ব্যাপার নয়; তা শক্তিব সম্পর্ক, যাতে একজন জয়ী ও আরেকজন পরাজিত। রোকেয়া জানতেন। নারীপুরুষের লৈঙ্গিক রাজনীতিতে বলপ্রয়োগের ফলে নারী পরাজিত; তাদের সম্পর্ক লৈঙ্গিক রাজনীতিক।

নারী কেনো দাসী হয়েছে, তাও ব্যাখ্যা করেছেন রোকেযা; তাঁর ব্যাখ্যা অনেকটা এঙ্গেলসের (১৮৮৪) ব্যাখ্যার কাছাকাছি। এঙ্গেলস দেখিয়েছেন ব্যক্তিমালিকানা ও পরিবারের উৎপত্তিই নারীর পুরুষাধীনতার মূলে; এবং রোকেয়া (রোর, ১৭) বলেছেন :

‘পুবাকালে যখন সভ্যতা ছিল না, সমাজবন্ধন ছিল না, তখন আমাদের অবস্থা এরূপ ছিল না। কোন অজ্ঞাত কারণবশতঃ মানবজাতিব এক অংশ (নর) যেমন নানা বিষয়ে উন্নতি করিতে লাগিল, অপর অংশ (নারী) তাহার সঙ্গে সঙ্গে সেরূপ উন্নতি করিতে পাবিল না বলিয়া পুরুষের সহচরী বা সহধর্মিণী না হইয়া দাসী হইয়া পড়িল।‘

তিনি বিশ্বাস করেন যখন সমাজবন্ধন ছিলো না, তখন মুক্ত স্বায়ত্তশাসিত ছিলো নারী। সমাজবন্ধনের মূলেই রয়েছে পরিবার, তাই পরিবারই যে নারীর দাসীত্বের মূল কারণ, তা অস্পষ্ট থাকে নি তার কাছে। পরিবারে পুরুষ হয়েছে প্ৰভু, নারী দাসী। তিনি অবশ্য প্রশ্ন করেছেন, ‘আমাদের এ বিশ্বব্যাপী অধঃপতনের কারণ কেহ বলিতে পারেন কি? সম্ভবত সুযোগের অভাব ইহার প্রধান কারণ। স্ত্রীজাতি সুবিধা না পইয়া সংসারের সকল প্রকার কার্য হইতে অবসর লইয়াছে’ (রোর, ১৭)। সুযোগটা যে নারীকে দেয় নি। পুরুষ, তাও তিনি জানিয়েছেন। যুগ যুগ ধরে দাসত্বের কুপ্রভাব পড়ে দাসদের স্বভাবের ওপর, নারীর ওপরেও পড়েছে; রোকেয়া তাও দেখিয়েছেন চমৎকার ও বিস্তৃতভাবে। ওলস্টোনক্র্যাফটের ভিডিকেশন-এর চতুর্থ পরিচ্ছেদের নাম ‘Observations on the State of Degradation to which Woman is Reduced by Various Causes’: নানা কারণে নারীর যে-অবনতি ঘটেছে, সে-সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ’। রোকেয়ার প্রবন্ধটির নাম ‘আমাদের/স্ত্রীজাতির অবনতি’ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ওলস্টোনক্র্যাফটু দেখিয়েছেন নারীকে বন্দী করার পর তার মানসিক শক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট ক’রে ফেলা হয়েছে, নারীকে শেখানো হয়েছে তুচ্ছ রূপ, বিনোদন, ভাবাবেগ প্রভৃতিতে মেতে থাকতে, আর তারাও বোধ করেছে ‘নিকৃষ্টতায় মহিমান্বিত’! রোকেয়াও বলেছেন একই কথা : ‘আমাদের মন পর্যন্ত দাস (enslaved) হইয়া গিয়াছে’ (রোর, ১৭)। ওলস্টোনক্র্যাফটু রূপচর্চা, অলঙ্কার, বিনোদন, উপন্যাস পড়া, শারীরিক ও মানসিক বলহীনতাকে আক্রমণ করেছেন। প্রবলভাবে, রোকেয়াও তাই করেছেন। রোকেয়া বলেছেন, ‘সৌন্দর্যবর্ধনের চেষ্টাও কি মানসিক দুর্বলতা নহে* (রোর, ২১)? তিনি প্রশ্ন করেছেন, ‘আমরা শারীরিক বল, মানসিক সাহস, সব কাহার চরণে উৎসর্গ করিয়াছি (রোর, ২৪)? ওলস্টোনক্র্যাফটের মতোই বলেছেন, ‘শরীর যেমন জড়পিণ্ড, মন ততোধিক জড়’ (রোর, ২৫); বলেছেন, আমাদের শয়ন-কক্ষে যেমন সূর্যালোক প্রবেশ করে না, তদুপ মনোকক্ষেও জ্ঞানের আলোক প্রবেশ করিতে পায় না’ (রোর, ২৬); বহুকাল হইতে নারী-হৃদয়ের উচ্চ বৃত্তিগুলো অঙ্কুরে বিনষ্ট হওয়ায়, নারীর অন্তর, বাহির, মস্তিষ্ক, হৃদয় সবই “দাসী” হইয়া পড়িয়াছে’ (রোর, ১৮)।

রোকেয়া ভিন্ডিকেশন পড়েন নি ব’লেই মনে হয়, পড়লে নারীর অধিকার সম্পর্কে হয়তো সম্পূর্ণ বইই লিখতেন; কিন্তু কেনো মিল ওলস্টোনক্র্যাফটের সাথে তাঁর? এর এক চমৎকার উত্তর অন্য প্রসঙ্গে তিনি নিজেই দিয়েছেন : ‘বঙ্গদেশ, পাঞ্জাব, ডেকান (হায়দরাবাদ), বোম্বাই, ইংলন্ড- সৰ্ব্বত্র হইতে একই ভাবের উচ্ছাস উখিত হয় কেন? …ইহার কারণ সম্ভবতঃ ব্রিটীশ সাম্রাজ্যের অবলাবৃন্দের আধ্যাত্মিক একতা’ (মতিচুর, নিবেদন)! এ যে প্রচণ্ড পরিহাস- ব্রিটীশ সাম্রাজ্যের অবলাবৃন্দের আধ্যাত্মিক একতা’- এটাও পুরুষতন্ত্রকেই পরিহাস। তিনি জানেন এটা আধ্যাত্মিক নয় সম্পূর্ণ বাস্তবের একতা, নারীর দাসীত্ব বিশ্বজনীন ব্যাপার। অলঙ্কারের যে-ব্যাখ্যা রোকেয়া (রোর, ১৯-২০) দিয়েছেন, তা নারীকে দাসী থেকে পশুর স্তরে নামিয়ে দিয়েছে :

‘আমাদের অতিপ্রিয় অলঙ্কারগুলি-এগুলি দাসত্বের নিদর্শন বিশেষ! এখন ইহা সৌন্দর্যবর্ধনের আশায় ব্যবহার করা হয় বটে; কিন্তু অনেক মান্যগণ্য ব্যক্তির মতে অলঙ্কার দাসত্ত্বের নিদর্শন (originally hadges of slavery) ছিল। তাই দেখা যায় কারাগারে বন্দীগণ পায় লৌহনির্মিত বেড়ী পরে, আমরা (আদরের জিনিস বলিয়া) স্বর্ণরৌপ্যের বেড়ী অর্থাৎ ‘মল’ পারি। উহাদের হাতকড়ি লৌহ-নির্মিত, আমাদেব হাতকড়ি স্বর্ণ বা রৌপ্য-নির্মিত চুড়িা কুকুরের গলে যে গলাবন্ধ (চমথ-ড়মফফটব্য) দেখি, উহারই অনুকরণে বোধ হয় আমাদের জড়োয় চিক নির্মিত হইয়াছো…গো-স্বামী বলদের নাসিকা বিদ্ধ করিয়া ‘নাকাদড়ী’ পরায়, এদেশে আমাদের স্বামী আমাদের ‘নোলক’ পরাইয়াছেন!! ঐ নোলক হইতেছে ‘স্বামী’ব অস্তিত্বের (সধবার) নিদর্শন!’

নারী শুধু দাসীই নয়, তারও নিম্নস্তরের; তিনি বলেছেন, ‘আমি আজ ২২ বৎসর হইতে ভারতের সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীবের জন্য রোদন করিতেছি’ (রোর, ২৭৭)। তিনি দেখিয়েছেন নারী আসলে নিরাশ্রয়, কেননা তার নিজের বলে কিছু নেই; এমনকি নিজের ওপরও নেই নারীর নিজের অধিকার। নারীর সবখানেই থাকে পরাশ্ৰিত; যখন আমরা রাজকন্যা, রাজবধুরূপে প্রাসাদে থাকি, তখনও প্রভু-গৃহে থাকি। যখন… গোশালায় গিয়া আশ্রয় লই,-তখনও অভিভাবকের বাটিতে থাকি।.গৃহ বলিতে আমাদের একটিও পর্ণকুটীর নাই। প্ৰাণী-জগতের কোন জন্তুই আমাদের মত নিরাশ্রয় { নহে। সকলেরই গৃহ আছে- নাই কেবল আমাদের’ (‘গৃহ’, রোর, ৭৪)। মনে পড়ে উলফের এ রুম অফ ও অ্যান্স জেট্রন-এর কথা। পুরুষতন্ত্রকে আক্রমণের জন্যে তিনি নারীর অবস্থানটিকে শনাক্ত ক’রে নিয়েছেন, এবং নারীর বিকৃত স্বভাবের পরিচয় দিয়েছেন।

‘পুরুষ’ ধারণাটি রোকেয়ার ধারাবাহিক আক্রমণস্থল : তিনি উপহাস করেছেন পুরুষকে, তাকে গণ্য করেছেন পশুর থেকেও নিকৃষ্ট, আদমেব কাল থেকেই পুরুষকে দেখিয়েছেন নির্বোধরূপে। পুরুষ তার চোখে প্ৰতারক আর পীড়নকারী। প্রাচীন কাল থেকে বিশ্বজুড়ে চলে এসেছে নারীবিদ্বেষের যে-ধারাটি, রোকেয়া একা যেনো তাকে প্রতিরোধ করতে চেয়েছেন প্রচণ্ড পুরুষবিদ্বেষের সাহায্যে। পুরুষ তাঁর নিরন্তর আক্রমণলক্ষ্য, কেননা পুরুষ নারীকে পরিণত করেছে দাসীতে, পুরুষ কেড়ে নিয়েছে নারীর স্বাধিকার ও স্বাধীনতা; কিন্তু তিনি নারীর সাম্য চেয়েছেন তাঁর ধিক্কৃত পুরুষের সাথেই। তাঁর পুরুষবিদ্বেষ ও পুরুষের সাথে সাম্য লাভের দাবি এমনভাবে প্রকাশ পেয়েছে যে ফ্রয়েড বা ফ্রয়েডীয়রা তাকে পেলে খুব সুখবোধ করতেন; তাঁরা তাকে শনাক্ত করতেন এক পুংগূঢ়ৈষ্যা-শিশ্নাসূয়াগ্রস্ত নারীরূপে; কিন্তু তিনি তাদের যে-উত্তর দিতেন, তাতে অনেক আগেই ভেঙে পড়তো ফ্রয়োডীয় মনোবিজ্ঞানের কুসংস্কারসৌধ। তিনি পুরুষকে বলেছেন, ‘নিরাকারে পিশাচ’ (‘গৃহ’, রোর, ৭৩); বলেছেন, ‘ডাকাতী, জুয়াচুরি, পরস্বাপহরণ, পঞ্চ ‘মকার’ আদি কোন পাপের লাইসেন্স তাঁহাদের নাই’ (পদ্মরাগ : রোর, ৩৩৪)? বাঙালি পুরুষকে পরিহাস ক’রে বলেছেন, ‘ভারতের পুরুষসমাজে বাঙ্গালী পুরুষিকা’ (‘নিরীহ বাঙ্গালী’, রোর, ৩২)! পদ্মরাগ-এর সকিনা লতিফকে বিদ্রুপ করে বলেছে, ‘খোদাতালার সৃষ্টিজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ জীব পুরুষ হইয়াছেন, ইহা অপেক্ষা আর কি বাঞ্ছনীয়’ (রোর, ৩৫২)? এক বাক্যে তিনি কাঁপিয়ে দিয়েছেন পুরুষ ও তার স্রষ্টাকে। পুরুষকে বলেছেন প্রতারক : বহুকাল হইতে পুরুষ নারীকে প্রতারণা করিয়া আসিতেছে, আর নারী কেবল নীরবে সহ্য করিয়া আসিতেছে’ (রোর, ২৭৮)। বলেছেন, ‘কুকুরজাতি পুরুষাপেক্ষা অধিক বিশ্বাসযোগ্য। (‘ডেলিশিয়াহত্য’, রোর, ১৬২); যদি স্বার্থপরতা, ধূৰ্ততা ও কপটাচারকে সদগুণ বলা যায়, তবে অবশ্য পুরুষজাতি কুকুরের তুলনায় শ্রেষ্ঠ’ (রোর, ১৭০)! পুরুষ তাঁর চোখে অলস, বলেছেন : ‘অলসেরা অতিশয় বাকপটু হয়’ (‘সুলতানার স্বপ্ন’, রোর, ১৩৫)।

রোকেয়া তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রে পুরুষদের রেখেছেন, তাদের সম্পূর্ণ বহিষ্কার করেন নি; হয়তো তিনি ভেবেছেন। পুরুষদের অন্তত একটি উপযোগিতা রয়েছে; কিন্তু সাম্প্রতিক প্ৰজননবিজ্ঞানের কথা যদি তিনি কল্পনা করতে পারতেন, ভাবতে পারতেন যদি কোনো ‘সাহসী নতুন বিশ্ব’-এর কথা, তাহলে হয়তো তিনি পুরুষ প্ৰজাতিটিকেই বাতিল ক’রে দিতেন। তিনি আদর্শ রাষ্ট্রে পুরুষ রেখেছেন, কিন্তু তাদের বন্দী করেছেন। অবরোধে। নারীস্থানে রাস্তায় কেনো পুরুষ নেই, জানতে চায় সুলতানা। সারা তাকে জানায়, ‘এ দেশে পুরুষজাতি গৃহাভ্যন্তরে অবরুদ্ধ থাকে’ (‘সুলতানার স্বপ্ন’, রোর, ১৩৬); এতে পরম তৃপ্তি পেয়েছে সুলতানা : ‘আমি প্ৰাণে বড় আরাম পাইলাম;-পৃথিবীতে অন্ততঃ এমন একটি দেশও আছে, যেখানে পুরুষজাতি অন্তঃপুরে আবদ্ধ থাকে’ (রোর, ১৩৬)! তাদের জন্যে তিনি তৈরি করেছেন ‘জেনানা’র প্রতিরূপ মর্দানা’। সেখানকার ভাষা বিপরীত ধরনের লিঙ্গবাদী, বাঙলায় ‘নারীভাবাপন্ন বলতে যা বোঝায়, নারীস্থানে তা বোঝায্য ‘পুরুষভাবাপন্ন’ শব্দে, যার অর্থ ‘পুরুষের মত ভীরু ও লজ্জানম’ (রোর, ১৩৪)। তার কাছে পুরুষ বন্য জন্তু, বদ্ধ পাগল; তাই নারী ‘নিরাপদ নহে,-যতদিন পুরুষজাতি বাহিরে থাকে’ (রোর, ১৩৬)! সারা বলেছে, তাহারা (পুরুষেরা) কোন ভাল কাজের উপযুক্ত নহে (রোর, ১৩৮)। তিনি পুরুষদের নিয়োগ করেছেন নিম্নপদ ও পেশায় : ‘তাহারা (পুরুষেরা) কেরানী মুটে মজুরের কাজ করিয়া থাকেন’ (রোর, ১৪৯)। নারীস্থান যে কল্যাণময়, তার কারণ পুরুষ-শয়তানেরা সেখানে অবরুদ্ধ; সুলতানা বলেছে, আপনার স্বয়ং শয়তানকেই শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়াছেন, আর দেশে শয়তানী থাকিবে কিরূপে (রোর, ১৪৭)। রোকেয়া চান না যে তাঁর একটি তীরও ব্যৰ্থ হোক; তাই তিনি পাদটীকায় ‘শয়তানকে’ কথাটি ব্যাখ্যা ক’রে দিয়েছেন ‘পুরুষ জাতিকে’ বলে।

কিন্তু রোকেয়া নারীর জন্যে চেয়েছেন অপদাৰ্থ নির্বোধি দুশ্চরিত্র পাপিষ্ঠ শয়তান পাশবিক পুরুষেরই সমকক্ষতা। এটা কোনো শিশ্নাসূয়াগ্ৰস্ততা বা পুংগূঢ়ৈষ্যা নয়, এটা একটি হারানো শিশ্ন ফিরে পাওয়ার ফ্রয়োড়ীয় রোগ নয়; এটা নারীর পূর্ণ অধিকার লাভ। তিনি পুরুষকে ঈর্ষা করেন নি, ঈৰ্ষা করেছেন। পুরুষের স্বাধীনতা ও অধিকারকে; বলেছেন, ‘একই সঙ্গে সকলে স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হও…। স্বাধীনতা অর্থে পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থা বুঝিতে হইবে …পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব’ (স্ত্রীজাতির অবনতি’, রোর, ২৯)। পুরুষের সাথে সমকক্ষতার ব্যাপারটি তিনি ব্যাখ্যা ক’রে দিয়ে কোনো ফ্রয়েডীয় অপবিজ্ঞানের অপব্যাখ্যার সম্ভাবনা নষ্ট করে দিয়েছেন। বলেছেন, ‘আমাদের উন্নতির ভাব বুঝাইবার জন্য পুরুষের সমকক্ষতা বলিতেছি। নচেৎ কিসের সহিত এ উন্নতির তুলনা দিব? পুরুষের অবস্থাই আমাদের উন্নতির আদর্শ (রোর, পাদটীকা, ২৯)। রোকেয়া চেয়েছেন পুরুষের সাথে সম্পূর্ণ সাম্য; তাঁর কাছে নারীপুরুষ লিঙ্গগতভাবে ভিন্ন, কিন্তু উভয়ই মানুষ, এবং উভয়ের জীবনেরই লক্ষ্য ও সার্থকতা এক : ‘পুরুষদের স্বাৰ্থ এবং আমাদের স্বাৰ্থ ভিন্ন নহে- একই। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা, আমাদের লক্ষ্যও তাহাই’ (রোর, ৩১)। তিনি নারীর অধীনতার মূল কারণ হিশেবে, প্রাচীন থেকে আধুনিক কালের অন্যান্যের মতোই, ধরেছেন শারীরিক দুর্বলতাকে : শারীরিক দুর্বলতাবশতঃ নারীজাতি অপর জাতির সাহায্যে নির্ভর করে। তাই বলিয়া পুরুষ ‘প্ৰভু!’ হইতে পারে না’ (অর্ধাঙ্গী’, রোর, ৪৩)। অপর জাতি’ কথাটি লক্ষ্য করার মতো; পুরুষ যেনো একটি ভিন্ন ও বিরোধী জাতি নারীর থেকে। তিনি শারীরিক শক্তির উপকারিতা বুঝেছেন, তিন্তু তাকে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড ব’লে স্বীকার করেন নি; তার কাছে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড মানসিক শক্তি। তিনি নারীর জন্যে চেয়েছেন মানসিক শক্তি, যা অর্জনের উপায় হচ্ছে শিক্ষা : ‘আমরা পুরুষের ন্যায় সুশিক্ষা অনুশীলনের সম্যক সুবিধা না পাওয়ায় পশ্চাতে পড়িয়া আছি। সমান সুবিধা পাইলে আমরাও কি শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিতে পারিতাম না? আশৈশব আত্মনিন্দ শুনিতেছি, তাই এখন আমরা অন্ধভাবে পুরুষের শ্রেষ্ঠতা স্বীকার করি এবং নিজেকে অতি তুচ্ছ মনে করি (রোর, ৪৩-৪৪)।

পুরুষতন্ত্রের তৈরি এক ঐশী ভাবাদর্শ স্বামী, যা পুরুষকে উত্তীর্ণ করেছে নারীর বিধাতার স্তরে। হিন্দু নারীরা স্বামীকে পুজো করে, হিন্দু নারীর জন্যে স্বামী ছাড়া আর কোনো প্ৰভু নেই; মুসলমান নারীর বেহেস্তও স্বামীর পদতলে, এবং হাদিসে আছেআল্লা ছাড়া আর কাউকে সেজদা করার বিধান যদি থাকতো, তাহলে নারীকে নির্দেশ দেযা হতো স্বামীকে সেজদা করার। বাঙলায় ‘স্বামী’ শব্দ ও ধারণাটি এখন অশ্লীল হয়ে উঠেছে, এটা এখন পরিহার্য শব্দগুলোর একটি; রোকেয়া অনেক আগেই বাতিল করেছিলেন ‘স্বামী’ ধারণাটি। এটিকে বাতিল করার অর্থ হচ্ছে পুরুষতন্ত্রের একটি বড়ো মন্দিব ধ্বংস করা। রোকেয়া বলেছেন, ‘তাঁহারা ভূস্বামী, গৃহস্বামী প্রভৃতি হইতে হইতে ক্ৰমে আমাদের স্বামী হইয়া উঠিলেন। আর আমরা ক্রমশঃ তাঁহাদের গৃহপালিত পশুপক্ষীর অন্তর্গত অথবা মূল্যবান সম্পত্তি বিশেষ হই। পড়িয়াছি (রোর, ১৮-১৯)! তিনি দাবি করেছেন নারী দাসীত্ব করে, তবে পুরুষও প্রেমবশত একধরনের দাসত্ব করে, কিন্তু পুরুষকে ‘দাস’ বলা হয় না। তিনি প্রশ্ন করেছেন, সমাজ তবু বিবাহিত পুরুষকে ‘প্রেম-দাস’ না বলিয়া স্বামী বলে কেন’ (রোর, পাদটীকা, ১৯)? ‘স্বামী’ তাঁর কাছে অত্যন্ত আপত্তিকর শব্দ; প্রশ্ন করেছেন, শ্ৰীমতীগণ জীবনের চিরসঙ্গী শ্ৰীমানদিগকে ‘স্বামী’ ভাববেন কেন’ (রোর, ৪৩)? তিনি এ-শব্দটি বাতিল ক’রে প্রস্তাব করেছেন একটি নতুন শব্দ : ‘আশা করি এখন ‘স্বামী’ স্থলে ‘অর্ধাঙ্গ’ শব্দ প্রচলিত হইবে’ (রোর, ৪৪)।

রোকেয়া প্রথাগত ছকবাধা নারীভাবমূর্তি বা ‘স্টেরিঅটাইপ স্বীকার করেন নি; তিনি ওই ভাবমূর্তির বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে তা বর্জন করেছেন। নারী হবে সীতা বা রহিমা, হবে মর্ষকামিতার উদাহরণ, পুরুষতন্ত্র তৈরি করেছে এমন ধারণা; তিনি তা বাতিল করেছেন। রোকেয়া বলেছেন, ‘এ দেশের গ্রন্থকারেরা নারী চরিত্রকে নানা গুণ ভূষায় সজ্জিত করেন বটে; বেশীর ভাগে অবলা হৃদয়ের সহিষ্ণুতা বর্ণনা করা হয় (কারণ রমণী পাষাণ প্ৰায় সহিষ্ণু না হইলে তাহার প্রতি অত্যাচারের সুবিধা হইত না যে!)’ (‘ডেলিশিয়া-হত্য’, রোর, ১৫৫)। পুরুষতন্ত্র নারীকে ক’রে তুলেছে মর্ষকামিতার উদাহরণ, সে-নারীই পুরুষতন্ত্রের প্রশংসিত যে সহ্য করে অসহ্য পীড়ন; কিন্তু রোকেয়া তা মানেন নি। তিনি (রোর, ৩৬-৩৭) বলেছেন :

‘নারীকে শিক্ষা দিবার জন্য গুরুলোকে সীতা দেবীকে আদর্শরূপে দেখাইয়া থাকেন।… পুতুলের সঙ্গে কোন বালকের যে-সম্বন্ধ, সীতার সঙ্গে রামের সম্বন্ধও প্রায় সেইরূপ।… রামচন্দ্ৰ ‘স্বামিত্বের’ ষোল আনা পরিচয় দিয়াছেন!! আর সীতা?–কেবল প্ৰভু রামের সহিত বনযাত্রার ইচ্ছা প্ৰকাশ কবিয়া দেখাইয়াছেন যে, তাহারও ইচ্ছা প্ৰকাশের শক্তি আছে।‘

তিনি সীতার এক প্রতিরূপ তৈরি করেছেন পদ্মরাগ-এ, যার নাম সিদ্দিকা। রামায়ণ-এ রাম ত্যাগ করেছিলো সীতাকে, পদ্মরাগ-এ নেয়া হয় তার প্রতিশোধ : সিদিকা ত্যাগ করে স্বামীকে। সমগ্ৰ নারীসমাজের পক্ষে প্ৰতিশোধ নেয়ার জন্যে কয়েক হাজার বছরের প্রস্তুতি নেয় একটি নারী, তাকে সৃষ্টি করেন রোকেয়া, তার নাম সিদ্দিকা। রোকেয়ার পদ্মরাগ, অসাধারণ উপন্যাস নয়, কিন্তু এতেই ঘটে এক অসাধারণ ঘটনা : এই প্রথম পূর্বদেশের এক নারী পরিত্যাগ করে পুরুষকে, তার স্বামীকে। সিদ্দিকা বলেছে (রোর, ৪৫৩) :

‘আমি যদি উপেক্ষা লাঞ্ছনার কথা ভুলিয়া গিয়া সংসারের নিকট ধরা দিই, তাহা হইলে ভবিষ্যতে এই আদর্শ দেখাইয়া দিদিমা ঠাকুমাগণ উদীয়মানা তেজস্বিনী রমণীদের বলিবেন, ‘আর রােখ তোমার পণ ও তেজ- ঐ দেখ না, এতখানি বিড়ম্বনাব পরে জয়নব আবার স্বামী-সেবাই জীবনের সার করিয়াছিল।’ আর পুরুষ-সমাজ সগৰ্বে বলিবেন, ‘নারা যতই উচ্চশিক্ষিতা, উন্নতমনা, তেজস্বিনী, মহীয়সী, গবীয়সী হউক না কেন,- ঘুরিয়া ফিৱিযা আবাব আমাদের পদতলে পড়িবেই পড়িবে!’ আমি সমাজকে দেখাইতে চাই, একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারী-জন্মের চরম লক্ষ্য নহে; সংসারধর্মই জীবনের সারধর্ম নহে। পক্ষান্তরে আমার এই আত্মত্যাগ। ভবিষ্যতে নারীজাতির কল্যাণের কারণ হইবে বলিয়া আশা করি।‘

সিদ্দিকা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তার অতীতের, বর্তমানের, ভবিষ্যতের সমস্ত সমস্ত নারীর পক্ষে। সে দেখিয়েছে ‘একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারী-জন্মের চরম লক্ষ্য নহেঃ সংসারধর্মই জীবনের সারধর্ম নহে।’ পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এমন স্পষ্ট উচ্চারণ ও পদক্ষেপ সমগ্র বাঙলা সাহিত্যে দুর্লভ; সিদ্দিকা শুধু মনে করিয়ে দেয় ইবসেনের নোরাকে। লতিফ জানতে চেয়েছে, ‘সিদ্দিকী, স্পষ্ট বল, তুমি আমার গৃহিণী হইবে কি না?’ সিদিক বলেছে, ‘না। তুমি তোমার পথ দেখ, আমি আমার পথ দেখি’ (রোর, ৪৫৯)। সিদিক নিষ্ঠুর নয়, সে যেমন বিবাহবিচ্ছেদ চায় নি, তেমনই চায় নি। স্বামীর পায়ের নিচে বেহেস্তও। সিদ্দিকা হয়ে উঠেছে বিশ্বপুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারীতন্ত্রের কণ্ঠস্বর, এবং সে শুধু কথা বলে নি, বাস্তবায়িত করেছে নিজের লক্ষ্য। সমগ্ৰ নারীজাতির দায়ভার সে তুলে নিয়েছে নিজের কাঁধে। রোকেয়া কোনো মধুর মোহ জাগিয়ে রাখতে চান নি, পাঠকের মনে এমন কোনো রোম্যানটিক ভাববিলাস লালনের সুযোগ রাখেন নি যে পরে কোনো দিন মিলন ঘটবে সিদ্দিকা আর লতিফের। উপন্যাসের শেষবাক্য দুটি যেমন মানবিকতায় কোমল, তেমনই বিদ্রোহে নির্মম; লতীফ সিদ্দিকার হাত ধরিয়া গাড়ী হইতে নামাইলেন। এই তাহদের শেষ দেখা’ (‘রোর, ৪৬৮)। সিদ্দিকা নোরার থেকেও কঠোর।

নারীর পুরুষাধীনতার দুটি প্রধান কারণ : শরীর ও অর্থনীতি। রোকেয়া বিশ্বাস করেছেন। পুরুষ নারীকে প্রথমে শারীরিক শক্তিতে পরাভূত ক’রেই বন্দী করেছে, শেষে নারীকে আর্থনীতিক এলাকা থেকে বের করে দিয়ে ক’রে তুলেছে অসহায়। শারীরিক শক্তিতে নারী কখনো পুরুষের সমান হবে না বলে তিনি বিশ্বাস করেছেন, তার দরকার আছে ব’লেও মনে করেন নি। কিন্তু যদি প্রতিষ্ঠিত হয় আর্থনীতিক সাম্য, তাহলে ঘুচিবে নারীর পুরুষাধীনতা। তাই তিনি দাবি করেছেন নারীর আর্থ স্বাধিকার। তিনি বলেছেন, ‘পুরুষের উপার্জিত ধন ভোগ করে বলিয়া নারী তাহার প্রভুত্ব সহ্য করে। কথাটা অনেক পরিমাণে ঠিক। বোধ হয়, স্ত্রীজাতি প্ৰথমে শারীরিক শ্ৰমে অক্ষম হইয়া পরের উপার্জিত ধনভোগে বাধ্য হয় এবং সেইজন্য তাহাকে মস্তক নত করিতে হয়’ (রোর, ২৮)। নারীর মুক্তির উপায় আর্থ স্বনির্ভরতা লাভ : ‘যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিব।’ (রোর, ২৯-৩০)। তিনি জানেন যে নারী কম পরিশ্রম করে না, তবে তার পরিশ্রমের কোনো আর্থ মূল্য নেই। স্বামীর সংসারে নারী বেতনাহীন দাসী। তিনি বলেছেন, ‘উপার্জন করিব না কেন?…যে পরিশ্রম আমরা ‘স্বামী’র গৃহকার্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না।’ (রোর, ৩০)? কোনো পেশাই তার কাছে উপেক্ষণীয় নয়; বলেছেন, ‘আমরা যদি রাজকীয় কার্যক্ষেত্রে প্রবেশ করিতে না পারি, তবে কৃষিক্ষেত্রে প্রবেশ করিব। ভারতে বর দুর্লভ হইয়াছে বলিয়া কন্যাদায়ে কাদিয়া মারি কেন’ (রোর, ৩০)? তিনি উচ্চারণ করেছেন নারীমুক্তির এক চরম বাণী (রোর, ৩০) :

‘কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিতা করিয়া কাৰ্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও, নিজের। অন্নবস্ত্ৰ উপাৰ্জন করুক।‘

কিন্তু আজো কন্যাগুলোকে সুশিক্ষিত করা হয় নি; আর যাদের করা হয়েছে তারা কর্মক্ষেত্রের স্বাধীনতার থেকে পছন্দ করে শুভবিবাহেম শেকল।

পুরুষতন্ত্রকে বহুমুখি আক্রমণে বিপর্যস্ত করে রোকেয়া প্ৰতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁর নারীতন্ত্র। নারীতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি সৃষ্টি করেছেন নারীস্থান, এবং পুরুষকে অবরুদ্ধ করেছেন গৃহের ভেতরে (পুরুষের প্রয়োজন কেনো তা তিনি স্পষ্ট করে বলেন নি), বদলে দিয়েছেন পুংলিঙ্গবাদী ভাষার স্বভাব, বার বার লিখেছেন ইউটোপিয়া ও অ্যান্টি-ইউটোপিয়া (বা ডিস্টোপিয়া)। নারীতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সার্বিক উদ্যোগ নিয়েছেন রোকেয়া Sultana’s Dream (১৯০৫) বা সুলতানার স্বপ্ন’-এ। ইউটোপীয় ভাবনাকল্পনার মূলে থাকে বিশেষ ধরনের সমাজ, ওই বিকৃত সমাজের চরম সংশোধন সম্পন্ন করা হয় ইউটোপিয়ায়। অরওয়েল বলেছেন, ‘ন্যায়সঙ্গত সমাজের স্বপ্ন মানুষের কল্পনাকে যুগে যুগে দুৰ্মরভাবে আলোড়িত করেছে, তাকে আমরা স্বৰ্গরাজ্য বলতে পারি বা বলতে পারি শ্রেণীহীন সমাজ, বা তাকে মনে করতে পারি অতীতের কোনো স্বর্ণযুগ, যা থেকে অধঃপতিত হয়েছি আমরা ‘ [দ্র কৃষাণ কুমার (১৯৮৭, ২)। ইউটোপিয়ার উদ্ভববিকাশ ঘটেছে পশ্চিমে, পূর্বাঞ্চলে কেউ। ইউটোপিয়া লেখেন নি; এর একমাত্র ব্যতিক্রম রোকেয়া। অনেকে মনে করেন। পশ্চিমে যতো ইউটোপিয়া লেখা হয়েছে, তার সবই কোনো-না-কোনোরূপে প্লাতোর রিপাবলিক থেকে উৎসারিত, ওগুলো রিপাবলিক-এর

 

 

পাদটীকা। তবে প্লাতোর অনেক আগেই ইউটোপীয় ভাবনার বিকাশ ঘটেছে ইউরোপে, যার পরিচয় মেলে খ্রিপূ সপ্তম শতকের হেসিঅব্দের ও অর্কস অ্যান্ড ডেইজ-এ। তিনিই প্রথম কল্পনা করেছিলেন এক স্বর্ণযুগের, যখন মানুষেরা বাস করতো দেবতার মতো, যাদের মন মুক্ত ছিলো সমস্ত দুঃখকষ্ট থেকে, যখন কোনো কাজ ছিলো না, যখন গাছে গাছে ধ’রে থাকতো সুমিষ্ট ফল। অসংখ্য ইউটোপিয়া লেখা হয়েছে, তবে সাহিত্যের এ-আঙ্গিকটি নাম পেয়েছে টমাস মুরের ইউটোপিয়া (১৫১৬) থেকে। মুরের বই থেকে ইউটোপিয়ার চরিত্র বদলে যায়; তিনি একটি শুদ্ধ সমাজের বিধান না দিয়ে তা বাস্তবায়িত করেন তাঁর বইতে। ইউটোপিয়ায় চিত্রিত হয় উৎকৃষ্টতম সমাজব্যবস্থা, তাকে বিমূর্ত না রেখে ক’রে তোলা হয় মূর্ত। ইউটোপিয়া বর্তমানে প্রচলিত কোনো সমাজের বিদুপাত্মক রূপ নয়, তাতে চিত্রিত হয় একটি সম্পূর্ণ সমাজ। অ্যান্টি-ইউটোপিয়া বা ডিস্টোপিয়ায় চিত্রিত হয় নিকৃষ্টতম সমাজ।

রোকেয়া তার নারীতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে লিখেছেন ইউটোপিয়া ও ডিস্টোপিয়া দু-ই। রোকেয়ার ‘সৌরজগৎ’ সংলাপটিতে আভাস পাওয়া যায় ইউটোপিয়ার : ওই পরিবারে একটি মাত্র পুরুষ, আর সবাই নারী। ওই পরিবারে রয়েছে গৃহিণী ও নটি কন্যা, কোনো ছেলে নেই। সেখানে পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি হয়ে এসেছে জাফর আলী। বিজ্ঞানের প্রতি রোকেয়ার আকর্ষণ ছিলো, ওই পরিবারের মেয়েবাও বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট; তাদের তিনজন ভর্তি হতে চায় ‘টেকনিকাল স্কুলে’। রোকেয়াই বোধ হয় এ-অঞ্চলে প্রথম ভাষায় লিঙ্গবাদ ব্যাপারটি উপলব্ধি করেছিলেন। গওহর জাফরকে তিরষ্কার করে, ‘ইহা C57 womanishness (স্ত্রীভাবে)।’ নূরজাহী এতে প্ৰবল আপত্তি জানিয়ে বলে : ‘womanish’ শব্দে আমি আপত্তি করি! ভীরুতা’, ‘কাপুরুষতা’ বল না কেন’ (রোর, ১১৬)? পশ্চিমের নারীবাদীদের ভাষিক লিঙ্গবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অনেক আগে রোকেয়া এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন; ভাষা থেকে মুছে দিয়েছিলেন। লিঙ্গবাদ। নূরজাহী প্রধান শিক্ষয়িত্রীর প্রশংসা ক’রে বলে, ‘উক্ত শিক্ষয়িত্রীটি অতিশয় ভদ্রলোক’ (রোর, ১১৭)। ভাষা থেকে লিঙ্গবাদ কমছে, কিন্তু শিক্ষয়িত্রীকে ‘ভদ্রলোক’ বলার অবস্থা আজো আসে নি, তবে রোকেয়া ১৯০৫ সালেই ‘ভদ্রমহিলা’ বাদ দিয়ে ব্যবহার করেছিলেন ‘ভদ্রলোক’। শুধু লিঙ্গবাদ মুছে দিয়েই তিনি তৃপ্তি পান নি, তিনি শুরু করেছিলেন বিপরীত ধরনের লিঙ্গবাদ। ‘সুলতানার স্বপ্ল’-এ সারা সুলতানাকে বলে, আপনি অনেকটা পুরুষভাবাপন্ন।’ রোকেয়া ‘পুরুষভাবাপন্ন’ শব্দের দেন নতুন অর্থ : ‘পুরুষের মত ভীরু ও লজ্জানম’ (রোর, ১৩৪)। বিয়ের ভাষায় প্রকাশ পায় পুরুষের সক্রিয়তা আর নারীর নিষ্ক্রিয়তা; রোকেয়া ওই ভাষারীতিকেও উল্টে দিয়েছেন। ডেলিশিয়ার বিয়েকে তিনি বর্ণনা করেছেন, ‘সচরাচর বলা হয়, ‘বর কন্যাকে বিবাহ করিল’, কিন্তু এ ক্ষেত্রে বলিতে হইবে, ‘কন্যা বরকে বিবাহ করিলেন। কেননা ডেলিশিয়াই মিঃ কারলীঅনের অন্নবস্ত্ৰ ইত্যাদি যোগাইবার ভার লাইলেন’ (রোর, ১৫৬)!

রোকেয়া প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। পুরুষতন্ত্রের বদলে নারীতন্ত্র, পুরুষাধিপত্যের স্থলে নারী-আধিপত্য। তার ডিক্টোপিয়াধর্মী রূপকথাগুলোতে সমাজের দুরবস্থার জন্যে সম্পূর্ণরূপে দায়ী করেছেন তিনি পুরুষদের, যারা তার চোখে সমস্ত দোষের সমষ্টি। তারা অপদাৰ্থ, দায়িত্বহীন, অবিবেচক, মিথ্যাবাদী, এবং সমাজরাষ্ট্র পরিচালনার অযোগ্য। তার ‘জ্ঞানফল’-এ দেশটির নাম কনকদ্বীপ হ’লেও সেটি বসবাসের অযোগ্য: পুরুষেরা সেটি নষ্ট করেছে। রোকেয়া বাইবেলি স্বৰ্গচ্যুতির উপাখ্যানটি ব্যাখ্যা করেছেন নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে, এবং ওই পতনই তার কাছে গ্ৰহণযোগ্য, নির্বোধের স্বৰ্গ গ্রহণযোগ্য নয়। নারী যে আগে নিষিদ্ধ ফল খেয়েছিলো একে তিনি নিয়েছেন নারীর গৌরব হিশেবে, কেননা নারীরই রয়েছে জ্ঞানের প্রতি সহজাত আকর্ষণ : ‘ফল ভক্ষণ করিবামাত্র হাভার জ্ঞানচক্ষু উন্মিলিত হইল।. এই সময় তথায় আদম গিয়া উপস্থিত হইলেন। হাভা তাঁহাকে স্বীয় হস্তস্থিত ফল খাইতে অনুরোধ করিলেন। পত্নীর উচ্ছিষ্ট জ্ঞানফল ভক্ষণে আদমেরও জ্ঞানোদয় হইল’ (রোর, ১৮০)। রোকেয়ার বর্ণনায় আদম নির্বোধ পুরুষ, জ্ঞানের প্রতি তার কোনো আকর্ষণ নেই। ‘পত্নীর উচ্ছিষ্ট জ্ঞানফল ভক্ষণে’ কথাটি তাৎপর্যপূর্ণ; রোকেয়া বোঝাতে চান পুরুষ জ্ঞানী নারীর উচ্ছিষ্ট জ্ঞানে। আদম শুধু নির্বোধ, উচ্ছিষ্টভোজীই নয়, সে অমানিবকও; রোকেয়ার হাওয়া তার কন্যাদের বর দিয়ে দীর্ঘায়ু করেছে, কিন্তু আদম- ‘তাঁহার ইচ্ছাশক্তি তাদৃশ প্রবল না থাকায়’- পুত্রদের কোনো বক্স দেয় নি। ওই দ্বীপের পতন ঘটেছিলো পুরুষেরা ‘নারীর আহৃত জ্ঞানে নারীকেই বঞ্চিত করিয়ছিল’ (রোর, ১৮৮) ব’লে। মুক্তিফল’ও আরেক অ্যান্টি-ইউটোপিয়া, ভোলাপুরেরও পতন ঘটে নারীকে অধিকারহীন ক’রে রাখার ফলে। সেখানে নারীর অধিকারের মাত্রা প্ৰকাশ পেয়েছে ভাই প্ৰবীণের উক্তিতে : ‘না বোন, তোমাকে কৈলাস পর্যন্ত যাইতে দিতে পারি না। তুমি আমার সহিত গল্প কর, উপন্যাস পাঠ কর, আমার সঙ্গে পারমার্থিক গান গাও-এই পর্যন্তই যথেষ্ট, ইহা অপেক্ষা অধিক স্বাধীনতা বা সমকক্ষতা দিতে পারি না’ (রোর, ২:১২)। নারীকে দেয়া হয়েছে গল্প করার. উপন্যাস পড়ার, আর ‘পারমার্থিক গান গাওয়ার স্বাধীনতা; ভোলাপুর যে ভারতবর্ষ তাতে কোনো সন্দেহ নেই!

পুরুষের সৃষ্ট অ্যান্টি-ইউটোপিয়ার বর্ণনা রোকেয়াকে তৃপ্তি দিতে পারে নি, কেননা সেখানকার নষ্ট সমাজে নারীও অসুস্থ। তাই রোকেয়া পুরুষের সমাজকেই অস্বীকার ক’রে প্রতিষ্ঠা করেন তার নারীস্থান। রোকেয়ার পক্ষে অসম্ভব ছিলো Sultana’s Dream বা ‘সুলতানার স্বপ্ন’ না লেখা; কেননা নারীতন্ত্র বা নারী-আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত দেখা ছিলো তার জন্যে অনিবাৰ্য। এজন্যে তাকেই লিখতে হয় বাঙলা ভাষায় প্রথম ও শেষ ইউটোপিয়া; সম্ভবত কোনো এশীয় ভাষায়ও এটিই একমাত্র ইউটোপিয়া। পচিশ বছরের এক আমূল নারীবাদী তরুণীর নারী-আধিপত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে ‘সুলতানার স্বপ্ল’-এ, যা কোমলমধুর। কিন্তু প্রতিশোধস্পৃহায় ক্ষমাহীন নির্মম। রোকেয়া ব্যাপকভাবে নারীস্থানেব সমাজজীবন উপস্থাপিত করেন নি, কিন্তু সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ করেছেন। পুরুষদের। পুরুষের ওই দেশে কী প্রয়োজন, তা তিনি বলেন নি; তবে প্রতিশোধগ্রহণের জন্যে পুরুষদের অত্যন্ত দরকার ছিলো সেখানে। রোকেয়া পুরুষজাতিটিকেই বাদ দিতে পারতেন। ওই সমাজ থেকে, কিন্তু তিনি দেন নি; তিনি হয়তো মনে করেছেন সামাজিকভাবে পুরুষ দরকার, তবে তার চেয়ে বেশি দরকার পুরুষপীড়নের জন্যে। রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ বৈজ্ঞানিক ইউটোপিয়া; তিনি কোনো আদিম স্বর্ণযুগ সৃষ্টি করেন নি, সৃষ্টি করেছেন ভবিষ্যতের বিজ্ঞাননির্ভর সমাজ, কেননা বিজ্ঞানই শুধু মুক্তি দিতে পারে নারীকে। রোকেয়া নারীর শারীরিক দুর্বলতা সম্পর্কে ছিলেন সচেতন, তাই কোনো আদিম আর্কেডিয়া তার কাজে আসতো না; তার দরকার ছিলো এমন শক্তি, যা শারীরিক শক্তিকে সহজেই পরাভূত করে। বিজ্ঞান সে-শক্তি, তাই রোকেয়ার নারীস্থান বিজ্ঞাননির্ভর। রোকেয়ার নারীস্থান তাঁর স্বদেশের বিপরীত : ‘ভারতে পুরুষজাতি প্ৰভু,- তাহারা সমুদয় সুখ-সুবিধা ও প্ৰভুত্ব আপনাদের জন্য হস্তগত কবিয়া ফেলিয়াছে, আর সরলা অবলাকে অন্তঃপুর রূপ পিঞ্জরে রাখিয়াছে’ (রোর, ১৩৭)! তিনি তার নারীস্থান থেকে মুছে ফেলেছেন ভারতবর্ষের সমস্ত সামাজিক ব্যাধি। ‘সুলতানার স্বপ্ন রোকেয়ার নারীতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয়ের ও পুরুষতন্ত্রের চূড়ান্ত পরাজয়ের কাহিনী।

যে-পুরুষতন্ত্র ও পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে ধারাবািহক লড়াই করেছেন রোকেয়া, তার সাথে কি তিনি কিছুটা সন্ধি করেছিলেন। কখনো কখনো? পিতৃতন্ত্রের সাথে সন্ধির কিছুটা পরিচয় রয়েছে তাঁর রচনাবলিতে। পিতৃতন্ত্রের বলপ্রয়োগসংস্থাটির সাথে, সম্ভবত বাধ্য হয়ে, তিনি সন্ধি করেছেন মাঝেমাঝে; কিন্তু খুব বেশি ছাড় দেন নি সেটিকে। চব্বিশ বছর বয়সে তিনি প্ৰচণ্ড আক্রমণ করেছিলেন ধর্মকে, ওই আক্রমণের পরেও যে তিনি টিকে ছিলেন তার কারণ তখন পরিবেশ ছিলো ভিন্ন: আজ হ’লে রাস্তায় তার লাশ পাওয়া যেতো, ব। তিনি নিন্দিত জীবন কাটাতে বাধ্য হতেন নির্বাসনে। তার ওপর নিশ্চয়ই পড়েছিলো মুসলমান পিতৃতন্ত্রের প্রবল চাপ। তিনি বুঝেছিলেন টিকে থাকতে হ’লে কিছুটা সন্ধি পাতিয়ে নিষ্ক্রিয় ক’রে দিতে হবে পিতৃতন্ত্রের বলপ্রয়োগসংস্থাটিকে। তিনি মাঝেমাঝে ধর্মকর্মের কথা বলেছেন, কিন্তু প্রথাগত ধর্মে তার অন্ধ আস্থা ছিলো না। তার নারীস্থানেও ধর্ম আছে : সেখানে ‘ধর্মবিধান’ হচ্ছে ‘প্রেম ও সত্য’, যা খুবই প্রথাবিরোধী। তিরিশোত্তর রোকেয়া ধর্মের কথা কিছু বলেছেন, এবং অবরোধবাসিনীদের ভয়াবহ জীবন আঁকার পাশাপাশি অবরোধের পক্ষেও বলেছেন কিছু কথা। শুনে স্তম্ভিত বোধ করি যখন অবৰ্বোধিবাসিনীর রোকেয়া বলেন, ‘আমি অবরোধ প্রথার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হই নাই’ (অর্ধাঙ্গী’, রোর, ৩৫)!! নিশ্চয়ই বড়ো একটা চাপের মধ্যে পড়েছিলেন তিনি তখন।

পিতৃতন্ত্রের সাথে বেশ কিছুটা মিটমাটের উদাহরণ ‘বোরকা’ প্ৰবন্ধটি } তিনি এতে যে শিকার হয়েছেন স্ববিরোধিতার, তা নিজেও বুঝেছেন; তাই আত্মসমর্থনের যে-চমৎকার প্রতিভা ছিলো তাঁর, তা তিনি প্রযোগ কবেছেন পুরোপুরি। তিনি বলেছেন, ‘তাহারা প্রায়ই আমাকে ‘বোরক’ ছাড়িতে বলেন। বাল, উন্নতি জিনিসটা কি? তাহা কি কেবল বোরকার বাহিরেই থাকে? যদি তাই হয় তবে বুঝিবে যে জেলেনী, চামারনী, কি ডুমুনী প্রভৃতি স্ত্রীলোকেরা আমাদের অপেক্ষা অধিক উন্নতি লাভ করিয়াছে’। (বোরকা’,রোর, ৫৬)? বোরকা জিনিশটি কুৎসিত, মধ্যযুগীয় পিতৃতন্ত্র এটি চাপিয়ে দিয়েছে নারীর ওপর, এটা তার বোঝার কথা; তবু তিনি এর পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি কি মনে করেছিলেন যে নারী উন্নতি করবে। বোরকার ভেতরে থেকেই? তা কি হবে না নারীর জন্যে চরম গ্রানিকরা? অবরোধপ্রথার উদ্ভব ঘটে নারী সম্পর্কে একটি অত্যন্ত আপত্তিকর ইসলামি ধারণা থেকে যে নারী হচ্ছে ‘ফিৎনা’। ইসলামি বিশ্বাস হচ্ছে যে নারীর কাম প্রবল, তা নষ্ট ক’রে দিতে পারে সমাজশৃঙ্খলা; তাই নারীকে রুদ্ধ করে রাখতে হবে অবরোধে। ইসলামি ধারণায় নারী মানসিক শক্তিতে দুর্বল, সে নিজের কামকে বশে রাখতে পারে না; তাই নারীর কামের গ্রাস থেকে সমাজকে বাচানোর জন্যে নারীকে আটকে রাখতে হবে অবরোধে, তাকে ঢেকে দিতে হবে বোরকায়। রোকেয়া বোরকা মেনে নিয়েছেন, খুব অবজ্ঞা করেছেন ‘জেলেনী, চামারনী, ডুমুনী’কে, কেননা তিনি চেয়েছেন উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত নারীর কল্যাণ; এবং একটি কথা বুঝতে চান নি যে তাঁর অবজ্ঞার ‘জেলেনী, চামারনী, ডুমুনীরা আসলেই অনেক উন্নতি করেছে অবরুদ্ধ মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নারীদের থেকে। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত নারীরা যেখানে অপদাৰ্থ, ‘জেলেনী, চামারনী, ডুমুনী’রা সেখানে অনেক মুক্ত। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের ত বিশ্বাস যে, অবরোধের সহিত উন্নতির বেশী বিরোধ নাই’ (রোর, ৫৭)। ‘বেশী বিরোধ নাই’ ব’লে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে অবরোধ ও উন্নতির মধ্যে বিরোধ রয়েছে, এবং তিনি বোরকার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ক্রমশ চ’লে গেছেন নিজেরই বিপক্ষে।

তিনি বলেছেন, ‘অবরোধ-প্ৰথা স্বাভাবিক নহে-নৈতিক।…মানুষের ‘অস্বাভাবিক’ সভ্যতার ফলেই অন্তঃপুরের সৃষ্টি’ (রোর, ৫৭)। ‘স্বাভাবিক’ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন অসভ্যতাকে, আর অস্বাভাবিক’ বলতে সভ্যতাকে; তিনি সভ্যতা ও অস্বাভাবিকতার পক্ষে, তাই অবরোধেরও পক্ষে। যদি তিনি মেনে নেন সভ্যতার সৃষ্টি অন্তঃপুরকে, তাহলে তাকে মেনে নিতে হয়। অন্যান্য বিধানও। তিনি নৈতিকতার কথা বলেছেন, এ-নৈতিকতা পুরুষতন্ত্রের নৈতিকতা; যে-পুরুষতািন্ত্ৰ মনে করে নারী ফিৎনা বা বিশৃঙ্খলা। রোকেয়৷ কি নিজেকে ফিৎনা ব’লে স্বীকার করবেন? রোকেয়ার পক্ষে স্বাভাবিক ছিলো পুরুমকে বোরকা পরানোর প্রস্তাব করা, যেমন করেছেন তিনি ‘সুলতানার স্বপ্ল’-এ, পুরুষকে ঢুকিয়েছেন। অবরোধে। তিনি বোরকার পক্ষে একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন (রোর, ৫৮) :

‘বেলওয়ে প্লাটফরমে দাঁড়াইয়া কোন সন্ত্রান্ত মহিলাই ইচ্ছা করেন না যে, তাহার প্রতি দর্শকবৃন্দ আকৃষ্ট হয়। সুতরাং ঐরুপ কুৎসিত জীব সাজিয়া দর্শকেব। ঘৃণা, উদ্রেক করিলে কোন ক্ষতি নাই।.. রেলওয়ে ভ্ৰমণকালে সাধারণের দৃষ্টি (public gaze) হইতে বাক্ষা পাইবার জন্য ঘোমটা কিম্বা বোরকার দবকার হয়।’

যদি রেলস্টেশনে কোনো মহিলা দর্শক আকৃষ্ট করেন, তবে ্দোষটা কার? মহিলার, না লোলুপ দর্শকের? যে-অপরাধ পুরুষের, তার জন্যে শাস্তি পাবেন মহিলা? তিনি ‘কুৎসিত জীব সাজিয়া দর্শকের ঘৃণা উদ্রেক ক’রে রক্ষা করবেন পর্দা? রোকেয়া অবরোধবাসিনীতে রেলস্টেশনে নারীর দুরবস্থার বেশ কয়েকটি শোচনীয় কাহিনী বলেছেন, আর তিনিই চাচ্ছেন নারী বোরকা পরে সেখানে পুরুষের মনে ঘৃণা জাগিয়ে আত্মরক্ষা করবে। তিনি অবরোধের পক্ষে দিয়েছেন সভ্যতার দোহাই : ‘সকল সভ্য জাতিদেরই কোন-না-কোন রূপ অবরোধ-প্ৰথা আছে (রোর, ৫৯)। তিনি জানেন যে তথাকথিত সভ্যতা হরণ করেছে নারীর অধিকার, আর তিনি লড়াই করছেন ওই পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার বিরুদ্ধেই। তিনি অবরোধের পক্ষে একটি ভুল যুক্তি দিয়েছেন : ‘আমরা যে এমন নিস্তেজ, সঙ্কীর্ণমনা ও ভীরু হইয়া পড়িয়াছি, ইহা অবরোধে থাকার জন্য হয় নাই- শিক্ষার অভাবে হইয়াছে’ (রোর, ৬১)। অবরোধ ও শিক্ষা একসাথে চলতে পারে না; কাউকে মহাপণ্ডিত ক’রে যদি রেখে দেয়া হয়। অবরোধে, তাহলে সে তেজপূর্ণ, মহৎ সাহসী হবে না; ব্যর্থ হয়ে যাবে তার শিক্ষা; শিক্ষিত হওয়ার পরও সে থাকবে পুরুষের দাসী ও কামসামগ্ৰী। তবে রোকেয়া জানেন। অবরোধ ক্ষতিকর; তিনি বলেছেন (রোরা, ৫৯-৬০) :

‘আমাদের অববোধ-প্রথাটা বেশী কঠোর হইযা পড়িষাছে … ঐ সকল কৃত্রিম পর্দা কম (numderate ); কবিতে হইবে 1. আমরা অন্যান্য পর্দা ছাড়িয়া আবশ্যকীয় পর্দা রাখিব।…বোরকাব আকৃতি অত্যন্ত মোটা (c(parse) হইয়া থাকে। সুহাকে কিছু সুদর্শন কবিতে হইবে।‘

তিনি অবরোধকে সুদৰ্শন করার প্রস্তাব করেছেন, চেয়েছেন মসৃণ অবরোধ; কিন্তু অবরোধ হচ্ছে অবরোধ, তা কোনো মসৃণতা জানে না। ‘বোরকা’ রচনাটিতে বিস্ময়করভাবে রোকেয়ার ওপর চেপে আছে আরব পিতৃতন্ত্র, এবং তিনি বিচ্যুত হযেছেন নিজের স্বভাব থেকে। ধৰ্মকর্মের কথাও রোকেয়া বলেছেন। পুরুষতন্ত্রের চাপে, কিন্তু ভালোভাবে চোখ দিলে দেখি যে ধর্মকে রোকেয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ ব’লে ভাবতেন না। ‘বঙ্গীয় নারী-শিক্ষা সমিতি : সভানেত্রীর অভিভাষণ’-এ (রোর, ২৮২) রোকেয়া একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন :

‘মুসলমান বালিকাদের প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে কোবান শিক্ষাদান করা সর্বাপেক্ষা অধিক প্রয়োজন ,। আপনাবা কেহ মনে কবিবেন না যে, প্রাথমিক শিক্ষাধঃ সঙ্গে সঙ্গে কোবান শিক্ষা দিতে বলিয়া আমি গোড়ামীব পবিচয় দিলাম। তাহা নহে, আমি গোড়ামী হওঁতে বহু দূৰে! প্রকৃত কথা এই যে, প্রাথমিক শিক্ষা বলিতে যাহা কিছু শিক্ষা দেওয়া হয়, সে সমস্ত ব্যবস্থাই কোরানে পাওয়া যায়!’

তিনি বালিকাদের কোরান শেখাতে চেয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষার সাথে, কারণটিও বলে দিয়েছেন : ‘প্রাথমিক শিক্ষা বলিতে যাহা কিছু শিক্ষা দেওয়া হয়, সে সমস্ত ব্যবস্থাই কোরানে পাওয়া যায়। তিনি ইসলামি পিতৃতন্ত্রের সাথে সুর মিলিয়ে বলেন নি যে সব শিক্ষাই পাওয়া যায় ওই গ্রন্থে; তিনি বলেছেন প্ৰাথমিক শিক্ষার জন্যে ওই গ্রন্থটি উৎকৃষ্ট। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য।

পুরুষতন্ত্র নারীকে কয়েকটি ভূমিকা পালন করতে বাধ্য করেছে; তার একটি গৃহিণীর ভূমিকা। রোকেয়া নারীর প্রথাগক ভূমিকায় বিশ্বাসী ছিলেন না, কিন্তু গৃহিণীর ভূমিকাটি তিনি মেনে নিয়েছিলেন। এটা তার একান্ত নিজের বিশ্বাস থেকে নয়, অন্যদেব বিশ্বাসকে তিনি দিয়েছিলেন স্বীকৃতি। তিনি প্রশ্ন করেছেন : ‘আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কি? বোধ হয় আপনারা সমস্বরে বলিবেন, ‘সুগৃহিণী হওয়া’ (সুগৃহিণী,রোর, ৪৫)। বোকেয়া সুগৃহিণী হওয়াকে যে বড়ো কাজ বলে স্বীকার করেছেন, তা নয়; তবে তিনি মেনে নিয়েছেন। পুরুষতন্ত্রের এ-বিধানটি। বলেছেন, ‘পুরুষ বিদ্যালাভ করেন। অন্ন উপার্জনের আশায়’, আর আমরা উচ্চশিক্ষা লাভ (অথবা Mental Culture) করব। কিসের জন্যে? আমি বলি, সুগৃহিণী হওয়ার নিমিত্তই সুশিক্ষা (Mental Culture) আবশ্যক’ (রোর, ৪৫-৪৬)। সুশিক্ষার উদ্দেশ্য সুগৃহিণী হওয়া? তাহলে কি সম্পূর্ণ নিরর্থক হয়ে পড়ে না শিক্ষা? যে-কাজ অশিক্ষিত পরিচারিকা করতে পারে একটু যত্ন নিলে, বা চিরকাল ধরে ক’রে আসছে নিরক্ষর সুগৃহিণীরা, তার জন্যে সুশিক্ষা এক প্রচণ্ড অপচয়। রোকেয়া ঘরকন্নার ক্লান্তিকর কাজের যে-দীর্ঘ তালিকা দিয়েছেন : ‘গৃহ এবং গৃহসামগ্ৰী পরিষ্কার ও সুন্দরীরূপে সাজাইয়া রাখা, পরিমিত ব্যয়ে সুচারুরূপে গৃহস্থলী সম্পন্ন করা, রন্ধন ও পরিবেশন, সূচিকর্ম, পরিজনন্দিগকে যত্ন করা, সন্তানপালন করা’ (রোর, ৪৬), এবং সেগুলো সম্পন্ন করার যে-রীতি নির্দেশ করেছেন, তাতে সুগৃহিণী হয়ে ওঠে একটি শিক্ষিত দাসী, শিক্ষার শোচনীয় অপব্যয়। রোকেয়া নিশ্চয়ই উন্নত জাতের দাসী উৎপাদনের জন্যে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন নি। রোকেয়া সূর্যোিত্তাপে রান্না’র স্বপ্ন দেখেছিলেন গৃহিণীকে ক্লান্তিকর ঘরকন্না থেকে মুক্তি দেয়ার জন্যে, কিন্তু ‘সুগৃহিণীতে তিনি গৃহিণীর ওপর যে-ভার চাপিয়ে দেন তাতে খুব খুশি হবে পুরুষতন্ত্র। তারা তাদের স্ত্রীদের শিক্ষা দেয়ার জন্যে খুব ব্যগ্র হয়ে উঠবে, কিন্তু শুধু নষ্ট হয়ে যাবে রোকেয়ার নারীরা।

পুরুষতন্ত্রের সাথে, বাধ্য হয়ে, সামান্য সন্ধির কথা বাদ দিলে রোকেয়া হয়ে ওঠেন পৃথিবীর এক শ্ৰেষ্ঠ আমূল নারীবাদী, পিতৃ-ও পুরুষ-তন্ত্রকে যিনি ধারাবাহিক আক্রমণে বিপর্যস্ত করে গেছেন। কিন্তু বঙ্গীয় মুসলমান পুরুষতন্ত্র তাকেও নিষ্ক্রিয় ক’রে দিয়েছে, এবং তিনি যে-উত্তরাধিকারীদের সৃষ্টি ক’রে গেছেন, তাঁরা বহু দূরে স’রে গেছেন তার চেতনা থেকে। তার উত্তরাধিকারী নারীবাদ f হয়েছেন ‘ভদ্রমহিলা’, স্বামীর শিক্ষিত দাসী ও প্রমোদসঙ্গিনী, সামাজিক সুবিধাভোগী, এবং তারা ব্যৰ্থ ক’রে দিয়েছেন রোকেয়াকে।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x