উপন্যাসের উদ্ভব ঘটেছিলো নানা উদ্দেশ্যে; তার একটি নারীদের নীতিশিক্ষা দেয়া, অর্থাৎ শুরু থেকেই উপন্যাসের বিশেষ লক্ষ্যবস্তু নারীরা। পশ্চিমের পুঁজিবাদী পুরুষেরা চেয়েছিলো নারী উপন্যাস উপভোগ ও উপন্যাসের ফল ভোগ করবে, সতী হবে, এবং রমণীর গুণে সুখে ভ’রে উঠবে সংসার। তখন তারা ভাবে নি ওই নারীও উপন্যাস লিখবে একদিন, শোনাবে নিজের মর্মান্তিক পুরুষপীড়িত জীবনকাহিনী। পুরুষ নারীর সৃষ্টিশীলতায় বিশ্বাস করে নি কখনো, আজো সন্দেহের চোখে দেখে নারীর সমস্ত সৃষ্টিকে; সাধারণত তাকে স্বীকৃতি দেয় না, বা দেয় নিজেরই স্বার্থে। বাঙলা ভাষায় প্রথম উপন্যাস লেখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন এক বিদেশিনী, হেনা ক্যাথেরিন মুলেন্স, যিনি ফুলমণি ও করুণার বিবরণ (১৮৫২) নামের একটি উপন্যাস-খসড়ায় নারীদের দিতে চেয়েছিলেন খ্রিস্টীয় করুণার শিক্ষা, পুরুষের ছক অনুসারে ঢালাই করতে চেয়েছিলেন নারীদের। বাঙালি নারীরা যখন প্রথম উপন্যাস লেখা শুরু করে, তখন পুরুষ এ-কাজকে অনাচার ব’লেই গণ্য করে; আজো বাঙালি পুরুষ তাদের সম্পূর্ণরূপে স্বীকার ক’রে নেয় নি। তবে বাঙালি নারী উপন্যাসে হাত দিতে দেরি করে নি; পুরুষের প্রথম উদ্যোগের দু-দশকের মধ্যেই বেরোয় নারীর প্রথম উপন্যাস : স্বর্ণকুমারী দেবীর দীপনির্বাণ (১৮৭৬)। তাঁর অন্য কয়েকটি উপন্যাস ছিন্ন মুকুল (১৮৭৬), বিদ্রোহ (১৮৯০), স্নেহলতা (১৮৯২), ফুলের মালা (১৮৯৪), হুগলীর ইমামবাড়ী (১৮৯৪), কাহাকে (১৮৯৮)। অল্প পরেই দেখা দেন জনপ্রিয় অনুরূপা দেবী ও নিরুপমা দেবী, তাঁরা দুজনে লেখেন প্রচুর উপন্যাস। নিরুপমার উপন্যাস অন্নপূর্ণার মন্দির, দিদি (১৯১৫), বিধিলিপি (১৯১৭), শ্যামলী (১৯১৮); অনুরূপার উপন্যাস মন্ত্রশক্তি (১৯১৫), মহানিশা (১৯১৯), মা (১৯২০), গরিবের মেয়ে, পথহারা, ত্রিবেণী (১৯২৮), জ্যোতিঃহারা, চক্র, এবং দেখা দেন প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, শৈলবালা ঘোষজায়া, সীতা দেবী, শান্তা দেবী, ও আরো অনেকে। ভার্জিনিয়া উল্ফ বলেছিলেন যে উপন্যাস নারীর একান্ত শিল্পাঙ্গিক, বাঙালি নারীরা তাঁর কথাকে অনেকখানি সত্যে পরিণত করেছে।

বাঙালি নারী ঔপন্যাসিকদের উপন্যাস জনপ্রিয় হয়েছিলো, কিন্তু তা পুরুষের কাছে গুরুত্ব পায় নি; বরং উপহাসের সামগ্রী হয়েছে। তাঁরা প্রচুর উপন্যাস লিখেছেন, বিক্রিও হয়েছে প্রচুর; তবে তা হয়ে আছে এক উপসংস্কৃতিধারা, যেনো তা নারীদের জন্যে নারীদের লেখা, পুরুষের মূলধারার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অযোগ্য। বঙ্কিমচন্দ্র নারীদের উপন্যাসকে দেখেছেন আত্মম্ভরী পুংসুলভ করুণা ও উপহাসের চোখে। তিনি বাঙালি নারী ঔপন্যাসিকদের গোণার মধ্যেই ধরেন নি, তখনো তাঁরা দেখা দেন নি ব’লেই শুধু নয়, দেখা দিলেও পুছতেন না তিনি তাঁদের; তিনি পশ্চিমের প্রধান নারী ঔপন্যাসিকদেরও করুণা করেছেন। কমলাকান্তের দপ্তর-এ (১৮৭৫) ‘মনুষ্য ফল’ রচনায় কমলাকান্তের মুখে বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন :

তার পরে মালা– এটি স্ত্রীলোকের বিদ্যা– কখন আধখানা বৈ পূরা দেখিতে পাইলাম না। নারিকেলের মালা বড় কাজে লাগে না; স্ত্রীলোকের বিদ্যাও বড় নয়। মেরি সমরবিল বিজ্ঞান লিখিয়াছেন, জেন অষ্টে বা জর্জ এলিয়ট উপন্যাস লিখিয়াছেন-মন্দ হয় নাই, কিন্তু দুই মালার মাপে।

কমলাকান্তের মতকে বঙ্কিমের মত ব’লেই ধরতে পারি, এতে প্রকাশ পেয়েছে উগ্র পুংতান্ত্রিক মনোভাব। যে-জর্জ এলিয়টকে ‘মালার মাপের’ ঔপন্যাসিক ব’লে বাতিল ক’রে দিয়েছেন বঙ্কিম, বাঙলার প্রথম নারী ঔপন্যাসিক স্বর্ণকুমারীর দেবীর কাহাকে (১৮৯৮) উপন্যাসের চরিত্ররা তাঁকে নিয়ে তর্ক করেছে, তুলনা করেছে শেক্সপিয়রের সাথে। স্বর্ণকুমারী ডাক্তার বিনয়কুমারের মুখে দিয়েছেন তাঁর নিজেরই কথা, যা পুরুষতান্ত্রিকদের কাছে গণ্য হবে ক্ষমার অযোগ্য অবিনয় ব’লে। এটা বুঝিয়ে দেয় নারীরা সব সময়ই সন্দেহ বোধ করেছে পুরুষের মূল্যায়ন সম্বন্ধে; তারা নিজেরাও মূল্যায়ন করেছে সব কিছু, যদিও তা প্রকাশ করার সুযোগ ও সাহস পায় নি। সুযোগ পেলেই তারা ভিন্ন মত প্রকাশ করতে দ্বিধা করে নি। স্বর্ণকুমারীর চোখে জর্জ এলিয়ট এক শেক্সপিয়র, তাঁর চোখে বঙ্কিম কী, তা জানা যায় নি; কিন্তু তিনি যদি জর্জ এলিয়ট ও বঙ্কিমের তুলনা করতেন, তাহলে বঙ্কিমকে হয়তো গণ্য করতেন জর্জ এলিয়টের তুলনায় খুবই তুচ্ছ ঔপন্যাসিকরূপে। পুরুষ মেনে নিতে পারে নি নারীর সাহিত্যসাধনাকে, কেননা এটা পুরুষের এলাকা; তাই নারীকে পুরুষ বার বার ফেরত পাঠাতে চেয়েছে ঘরের ভেতরে, সরাসরি রান্নাঘরে। যেমন জগদীশ্বরী দেবীর দ্রৌপদী কাব্য সম্পর্কে দীনেশচন্দ্র সেন (১৩১২) বলেছেন :

গ্রন্থকর্ত্রী যদি কাব্যশালা হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়া রন্ধনশালার ভার গ্রহণ করেন, তবে অনেক উপাদেয় সামগ্রী প্রস্তুত হইতে পারে-সে স্বাভাবিক পন্থা ছাড়িয়া তিনি ভিন্ন উপায়ে লোকরঞ্জনের প্রয়াসী হইয়া মোটেই ভাল করেন নাই।

দীনেশচন্দ্র সাহিত্য সমালোচনায় ব’সে ভুলতে পারেন নি যে কবিটি নারী, তাঁর কাজ রান্না করা। পশ্চিমের পুরুষতান্ত্রিক সমালোচকেরা নারীসাহিত্য সমালোচনার নামে সাধারণত মাপেন বইয়ের বক্ষ ও নিতম্ব, সম্ভোগ করেন নারীদের বই; বাঙালি সমালোচকেরা তা পারেন না সমাজিক কারণে, তাই তাঁরা খাদ্যের মতো আস্বাদন করেন নারীসাহিত্য। স্বামী হিশেবে যেমন তাঁরা পরখ করেন স্ত্রীর রান্না, সমালোচক হিশেবে তেমনি স্বাদ নেন সাহিত্যরান্নার। বাঙালি পুরুষের কাছে নারীসাহিত্য এক ধরনের পাকপ্রণালি, যা আসল পাকপ্রণালির থেকে নিকৃষ্ট। রান্নাবান্নার থেকে উৎকৃষ্ট, নারীর জন্যে শ্রেষ্ঠ, কাজ হচ্ছে স্বামীসেবা; তাই নারীসাহিত্য তখন প্রশংসা পেয়েছে, যখন তা স্বামী ও সংসারসেবার গান গেয়েছে। ভারতীতে (১৩১৬) অজ্ঞাতনাম এক সমালোচক শরৎকুমারীর শুভবিবাহ উপন্যাসটি আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ‘সাহিত্য-সেবারতা, নিষ্ঠাবতী শরৎকুমারীর পতিভক্তি ও সংসারপালনদক্ষতা প্রভৃতি প্রকৃতই অনুকরণীয়।’ তাঁর সাহিত্যের মূল্য নেই, মূল্যবান তাঁর পতিভক্তি ও সংসারপালনদক্ষতা। নারী কিছু লিখেছে, এটাই আপত্তিকর; তার ওপর যদি তাতে থাকে পাণ্ডিত্য, তবে তা হয়ে ওঠে দ্বিগুণ আপত্তিকর। পুরুষের প্রিয় হচ্ছে মূর্খ নির্বোধ নারী, পুরুষের কাছে প্রিয় নারীর শান্ত সরলতা; নারী যখন শান্ত সরলতার সীমা পেরিয়ে যায়, তখন সহ্য করা অসম্ভব হয়ে ওঠে পুরুষের পক্ষে। শরৎচন্দ্র, যিনি নারীর পক্ষে লিখেছিলেন নারীর মূল্য (১৩২০), তিনিও নারীর পাণ্ডিত্যের ঝাঁজ সহ্য করতে পারেন নি। অনিলা দেবী ছদ্মনামে শরৎচন্দ্র লেখেন ‘নারীর লেখা’ (১৩১৯) নামে একটি নারীসাহিত্যবিদ্বেষী প্রবন্ধ। নারীনামের ছদ্মবেশে লুকিয়ে নারীকে আক্রমণ করা পুরুষের এক প্রিয় হীন স্বভাব। এতে তিনি উপহাস করেন নারী লেখকদের- আমোদিনী ঘোষজায়া, অনরূপ দেবী ও নিরুপমা দেবীকে; পরিহাস করেন তাঁদের পাণ্ডিত্যকে, উপহাস করেন তাঁদের অভিজ্ঞতার অভাবকে। ধরেন তাঁদের নানা রকমের ভুল, এবং উড়িয়ে দেন নারীসাহিত্যকে, যেনো সাহিত্যচর্চা নারীদের জন্যে অনধিকারচর্চা। কুমুদিনীমোহন নিয়োগী (১৩২৯) এক লেখিকাকে প্রশংসা ক’রে লিখেছেন : ‘তাঁর রচনার একটি প্রধান বিশেষত্ব সরলতা আর শান্ত সংযত ভাব। অনেক নারীর রচনায় দেখি, পাণ্ডিত্যের ঝাঁজ এম্‌নি তীব্র হল্কা ফুটাইয়া রহিয়াছে যে গা একেবারে জ্বলিয়া যায়। এই ঝাঁজ ইন্দিরা দেবীর রচনায় মোটেই নাই।’ ঝাঁজ সৃষ্টির অধিকার শুধু পুরুষের; নারী ঝাঁজ সৃষ্টি করবে না, এমন কিছু করবে না যা পুরুষের অহমিকাকে পীড়িত করতে পারে। নারী যদি সাহিত্য সৃষ্টি করতেই চায়, তাহলে সে এমনভাবে করবে, যা উপাদেয় হবে পুরুষের রসনায়।

প্রভুর দর্শনে দীক্ষিত হয় অসংখ্য দাসদাসী, অসংখ্য নারীও দীক্ষিত হয় পুরুষের মন্ত্রে; আজো অনেক নারী গলগল করে উচ্চারণ করে প্রভুপুরুষের মন্ত্র। যেমন, নগেন্দ্রবালা সরস্বতী নারীধর্ম্ম কাব্যের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘সংসারে রমণীগণ প্রেমপ্রীতির আকরস্বরূপ। তাহাদেরই স্নেহ-মমতা-পবিত্রতায় সংসার শান্তিময়, এই জন্যই হিন্দু সংসারে রমণীগণ দেবীবৎপূজনীয়া। কিরূপে রমণীগণ নিজ নিজ কর্তব্য পালন পূর্ব্বক নারীধর্ম রক্ষা করিয়া- সংসারে অমৃত স্রোত প্রবাহিত করিতে পারেন, কিরূপে নারীচরিত্রে প্রকৃত দেবীচরিত্র প্রতিভাত হইতে পারে, এই নারীধর্ম্মে তাহারই আলোচনা করিয়াছি।’ এতে খুব প্রীত হওয়ার কথা পুরুষের, যেমন হয়েছেন চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায় (১৩১০)। তিনি নারীধর্ম্ম-এর প্রশংসা করেছেন এভাবে :

মোটের উপর এগ্রন্থ পাঠে আমরা বড় প্রীত হইয়াছি–প্রীত হইবার আর একটি বিশেষ কারণ এই যে, শ্রীমতী নগেন্দ্রবালা এতদিন কবিতার আলোচনা করিয়া যশঃসঞ্চয়ে ব্রতিনী ছিলেন–এখন তিনি সংসারধর্ম্মের সংস্কারে মন দিয়াছেন; নিরবচ্ছিন্ন কবিতা রচনাই যে রমণীজীবনের চরম লক্ষ্য নহে, এবং তাহাতে যে রমণীর তৃপ্তি হয় না, ইহা তিনি বুঝিয়াছেন।

কবিতা লিখতে গিয়ে নগেন্দ্রবালা যে ভুল ও অপরাধ করেছিলেন, তা বুঝতে পেরে তিনি যে আবার মন দিয়েছেন ‘রমণীজীবনের চরম লক্ষ্য’ সংসারধর্মে, এতে সমগ্র পুরুষসমাজেরই প্রীত বোধ করার কথা। নারীর সাহিত্যচর্চা পুরুষের চোখে বিকার, নারীর বিখ্যাত হওয়ার বাসনা অমার্জনীয় অপরাধ; তবু নারী সাহিত্য সৃষ্টি করেছে। এ-অপরাধের শাস্তি নারীর প্রাপ্য; পুরুষ তাকে শাস্তি দিয়েছে তার সাহিত্যকে অস্বীকার ক’রে।

পুরুষসমাজের এ-স্বভাব, এবং তাদের মন্ত্রে দীক্ষিত সংসারধর্মী অজস্র নারীর নারীপ্রতিভাবিরোধিতা বুঝতে পেরেছিলেন ভারতীর ‘বঙ্গনারী’ (১৩৩৯)। তিনি ‘স্ত্রীলেখিকা’ নামের এক রচনায় লিখেছিলেন :

মাসিক পত্রের পৃষ্ঠা উল্টাইতে উল্টাইতে তাহার যে নমুনা পাওয়া যায়, তাহাতে আমাদের দেশে লিখিতে সমর্থ,-সুতরাং “শিক্ষিতা”দের মধ্যেও Mrs. Grundyর প্রাদুর্ভাব দেখিয়া দমিয়া যাইতে হয়। ইহা অবশ্য আশ্চর্য্যের কথা নহে,-সকল দেশেই ইহাদের দর্শন পাওয়া যায়; এবং সৰ্ব্বত্রই ইহাঁরা করতালি পাইয়া থাকেন। তবে মেয়েদের উঠিতে হইলে ঘরে বাহিরে কি পরিমাণ বাধা অতিক্রম করিতে হইবে, ইহাঁরা কেবল তাহাই মনে করাইয়া দেন। মেয়েদের বিষয় যে রকম অসঙ্কোচে হীনভাবে ইহারা বলিতে পারেন, পুরুষের পক্ষে অবশ্য তাহা সম্ভব নয়। আর সর্ব্বত্রই ইহাদের বদ্ধ ও স্থুল দৃষ্টি এবং মনের পরিধির সঙ্কীর্ণতা পীড়া দেয়। ‘দাস মনোভাব’ যে ইহাদের কতটা মজ্জাগত তাহা বলাই বাহুল্য।…বাস্তবিকই, বৰ্ত্তমান পৃথিবীব্যাপী নারী-জাগরণের দিনে তাহার কোন তরঙ্গই ইহাদের স্পর্শও করে নাই, বাঙ্গালী ঘরের বদ্ধ একান্ত দূষিত, হীন, খুঁটিনাটি ছাড়াইয়া কল্পনাও একতিল উপরে উঠিতে পারে নাই।…ইহাদের মধ্যে কাহারও কাহারও মেয়েদের জন্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও অপূর্ব্ব কিছু করিবার চেষ্টা দেখা যায়। ইহাঁরা তাহাতেই একটী মৌলিক পথ আবিষ্কার করিয়াছেন বলিয়া মনে করেন। কিন্তু ইহারা ধারণা করিতে পারেন না,-ইহাও তাঁহাদের “নারীত্ব” হইতে প্রাপ্ত অদ্ভুত কোন পদার্থ নয়,-অপর পক্ষেরই শিখানো বুলি। তাঁহারাই ত মেয়েদের “পুরুষের মত” করিয়া কিছু করিতে জোরের সহিত বারণ করিয়া আসিতেছেন। বাস্তবিকই ইহাদেরও মেয়েদের সকল শিক্ষাদীক্ষা গোড়া হইতে মেয়েলি করিয়া ফেলিবার আগ্রহ দেখিয়া দুঃখও হয়। ইহাঁরা অপর পক্ষের চারটী বেশ গিলিয়াছেন বোঝা যায়। মেয়েরা ইহাদের মতে চলিয়া “বুদ্ধিমতী” না হইয়া “প্ৰাণময়ী” বনিতে থাকিলে তাঁহাদের আর সুনিদ্রার ব্যাঘাত হইবার কোন কারণ থাকিবে না।

নারীর শত্রু শুধু পুরুষ নয়, তাদের শত্রু হিশেবে রয়েছে পুরুষমন্ত্রে দীক্ষিত একপাল নারীও। এরা পুরুষের চর হিশেবে কাজ করে, নারীর সাংঘাতিক ক্ষতি করে।

বাঙালি পুরুষ, সব জাতির পুরুষের মতোই, নারীসাহিত্যকে অনুমোদন করে নি, নারীসাহিত্যকে দেখেছে রান্নাবান্না বা সংসারসেবারূপে; নারী লেখকদের মধ্যে তারা খুঁজেছে আদর্শ স্ত্রীকে। নারী লেখক, বা তার লেখা মূল্যবান নয় পুরুষের কাছে; তাই বাঙালি নারীসাহিত্যের কোনো ইতিহাস আজো লেখা হয় নি, তাঁদের প্রতিভার প্রকৃতি বিচার ও মূল্যায়ন হয় নি; এমনকি তাঁদের সম্বন্ধে সম্পূর্ণ তথ্যও বেশ দুষ্প্রাপ্য। স্বর্ণকুমারী দেবী, অনুরূপা দেবী, নিরুপমা দেবী, শৈলবালা ঘোষজায়া, সীতা দেবী, শান্তা দেবী ও আরো অনেকের সব বইয়ের নামও খুঁজে পাওয়া যায় না আজ, পাওয়া যায় না তাঁদের বইয়ের প্রকাশের তারিখ। তাঁরা শিকার হয়েছেন পুরুষতান্ত্রিক উপেক্ষার। পুরুষ সমালোচকেরা ধ’লেই নেন তাঁদের সাহিত্য অপাঠ্য; বিশেষ ক’রে যাঁদের বই জনপ্রিয় হয়েছিলো তাঁরা সম্পূর্ণ অপাঠ্য, এমন একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তাঁদের বইয়ে সমালোচকেরা, যেমন শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (১৩৬৯), খোঁজেন ‘নারীর সুর-বৈশিষ্ট্যের’ পরিচয়। এ-সুর বৈশিষ্ট্য’ কিন্তু নারীর নিজস্ব সুর নয়, তাঁরা খোঁজেন নারীর কণ্ঠ থেকে কতোখানি উঠেছে পুরুষের শেখানো সুর। তাঁরা খোঁজেন পুরুষের বিধিবদ্ধ নারীত্ব, যা এক বানানো জিনিশ। পুরুষ তৈরি করেছে নারীর একরাশ ছক : নারী দেবী বা দানবী, নারী অক্রিয়, নারী মাতা, স্ত্রী, কন্যা, সেবিকা, নারীর জীবন ধন্য হয় আত্মোৎসর্গে। পুরুষের চোখে নারী চূড়ান্ত মর্ষকামী, যে ধন্য বোধ ও স্বর্গলাভ করে চরম পীড়নের মধ্যে। নারী এ-ছক মানে নি, কিন্তু বাধ্য হয়েছে মেনে নিতে। বাঙলার নারীরা যখন উপন্যাস লেখায় হাত দেন, তখন কি তাঁরা এ-ছক মেনে চলেন? তাঁরা কি পুরুষতন্ত্রের দীক্ষাকেই পুনঃপ্রচারের জন্যে ধরেন লেখনি? সব নারী ঔপন্যাসিকের সব উপন্যাস আমি প’ড়ে উঠতে পারি নি,-তাঁদের বই আজ দুষ্প্রাপ্য; বহু কষ্টে আমি সংগ্রহ করেছি ছটি উপন্যাস : স্বর্ণকুমারী দেবীর কাহাকে (১৮৯৮), শৈলবালা ঘোষজায়ার জন্ম-অপরাধী (?), অনুরূপা দেবীর মন্ত্রশক্তি (১৯১৫), নিরুপমা দেবীর দিদি (১৯১৫), ও শ্যামলী (১৯১৮), শান্তা দেবীর জীবনদোলা (?)। এঁরাই আমাদের আদি নারী ঔপন্যাসিক। এঁরা কেউ জর্জ এলিয়ট, বা বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ নন; বাঙলা উপন্যাসধারার কোনো শ্রেষ্ঠ উপন্যাস তাঁরা কেউ লেখেন নি। তাঁরা বেশ গৌণ ঔপন্যাসিক; তবে তাঁদের গৌণতার মূলে কোনো সহজাত কারণ নেই, রয়েছে সামাজিক কারণ। যে-নারীর সৃষ্টিশীলতাকেই স্বীকার করে নি পুরুষ, তাঁরা কলম ধ’রেই মহান সাহিত্য সৃষ্টি করবেন, এটা আশা করা অন্যায়। তবে ইংরেজি উপন্যাসে যেমন নারী ঔপন্যাসিকেরা তেমনি তাঁরাও পুরুষ-ঐতিহ্যের পাশাপাশি সৃষ্টি করেন একটি গতিশীল অন্তঃস্রোত, সুস্পষ্টভাবে পৃথক এক নারীসাহিত্যধারা। তাঁদের সাহিত্য বহুলাংশে আমূলবাদী, এবং নারীকেন্দ্রিক; এমনকি যাঁরা রক্ষণশীল, তাঁরাও নারীর দুর্দশার কথা ভুলে যান নি। আদি বাঙালি নারী ঔপন্যাসিকেরা সাধ্বী স্ত্রীরূপে কলম ধরেন নি, তাঁরা কলম ধরেন পুরুষতন্ত্রের বহু ছক ভেঙে ফেলার জন্যে। তাঁরা বিশ্বাস করেন নি পুরুষের তৈরি নারীভাবমূর্তিতে, শুরু থেকেই বাঙালি নারী ঔপন্যাসিকেরা ভাবমূর্তির থেকে বেশি গুরুত্ব দেন নারীর বাস্তবতার ওপর, এবং লিপ্ত থাকেন পুরুষের সঙ্গে নিরন্তর বিরোধে। এ-বিরোধ স্বর্ণকুমারী, শৈলবালা, শান্তার মধ্যে তীব্র; অনুরূপা ও নিরুপমা যদিও অনেকখানি দীক্ষিত ছিলেন পুরুষের বিধানে, কিন্তু নারীপুরুষের যখন বিরোধ বেধেছে তখন তাঁরাও পক্ষ নিয়েছেন নারীর। পুরুষ, স্বামী, বিধাতা প্রভৃতি শব্দ উচ্চারণের সময় নারী ঔপন্যাসিকেরা ভক্তির থেকে অভক্তিই দেখিয়েছেন বেশি, আর জ্ঞাপন করেছেন এমন বাণী যে নারীর দুর্দশার মূলে রয়েছে পুরুষ। নারী ঔপন্যাসিকদের উপন্যাস প্রধানত পুরুষদ্রোহিতার উপন্যাস, যাতে এমন একটি ইঙ্গিত মেলে যে পৃথিবীতে পুরুষ না থাকলে নারীর জীবন সুখের হতো। নারী ঔপন্যাসিকদের নারীদের জীবনে ভয়াবহ শব্দ ‘বিবাহ’, যা নারীদের প্রধান সংকট, যা সম্পন্ন না হ’লে তাদের জীবন ধ্বংস হয়, আর সম্পন্ন হ’লেও ধ্বংস হয়।

স্বর্ণকুমারী দেবী প্রথম বাঙালি নারী ঔপন্যাসিক, এবং তিনিই আমার নেয়া পাঁচজনের মধ্যে আধুনিকতম চেতনাসম্পন্ন, শিল্পিতায়ও শ্রেষ্ঠ। তাঁর যে-উপন্যাসটি আমি নিয়েছি, সেটির নাম কাহাকে (১৮৯৮), যাতে কাজ করেছে প্রবল নারীবাদী মনোভাব। দ্য বোভোয়ার নারীর জীবনে প্রেমের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উদ্ধৃত করেছেন বায়রনের যে-দুটি পংক্তি, Man’s love is of man’s life a thing apart/Tis woman’s whole existence, স্বর্ণকুমারী তাঁর উপন্যাস শুরু করেছেন সে-পংক্তি দুটি উদ্ধৃত ক’রে, এবং তাঁর নায়িকা মণি বলেছে :

এ কথা যিনি বলিয়াছেন, তিনি একজন পুরুষ। পুরুষ হইয়া রমণীর অন্তর্গত প্রকৃতি এমন হুবহু ঠিকটি কি করিয়া ধরিলেন. ভারি আশ্চর্য্য মনে হয়। আমি ত আমার জীবনের দিকে চাহিয়া এ কথার সত্যতা অনুভব করি। যতদূর অতীতে চলিয়া যাই, যখন হইতে জ্ঞানের বিকাশ মনে করিতে পারি, তখন হইতে দেখিতে পাই-কেবল ভালবাসিয়াই আসিতেছি, ভালবাসা ও জীবন আমার পক্ষে একই কথা; সে পদার্থটাকে আমা হইতে বিচ্ছিন্ন করিলে জীবনটা একেবারে শূন্য অপদার্থ হইয়া পড়ে- আমার আমিত্বই লোপ পাইয়া যায়।

প্রেম সম্পর্কে মণির ব্যাখ্যা অবশ্য দ্য বোভোয়ারের ব্যাখ্যার মতো নয়, তবে সে ক্রমশ এগিয়েছে সে-দিকেই। মণি বা মৃণালিনী কাহাকের নায়িকা, সে নিজের প্রেম ও বিয়ের উপাখ্যান বলেছে নিজেই। নিজের জীবন, প্রেম, ও বিয়ের কাহিনী সে যেভাবে অকপটে বলেছে, তাতেই নষ্ট হয়ে গেছে লজ্জাবতী নারীর ছকটি। মণি অক্রিয় নয়, নিজের গল্প অকপটে বলার মধ্যেই তার সক্রিয়তার পরিচয় মেলে, এবং সে সক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণও করে পরিস্থিতি। সারা উপন্যাসেই টের পাওয়া যায় যে তার শুধু হৃদয় নয়, একটি মস্তিষ্ক রয়েছে, এবং মস্তিষ্কটিই বেশি সক্রিয়। তার জীবনকাহিনী জটিল নয়, এবং সে বাঙলার অধিকাংশ নারীর দুটি অভিশাপ থেকে মুক্ত;-সে দরিদ্রকন্যা নয়, ও অশিক্ষিত নয়; তবু বিয়েই সৃষ্টি করে তার জীবনের সমস্যা। মণি ছোটো বা বিনয়কুমারের সাথে তার বাল্যপ্রেম, যৌবনে ব্যারিস্টার রমানাথের সাথে ব্যর্থ প্রণয়, অবশেষে বাল্যপ্রেমিক ডাক্তার বিনয়কুমারের সাথে রোমাঞ্চকর রোম্যান্টিক মিলনের কাহিনী অকপটে বলেছে। মণির কথা বলার ভঙ্গি থেকে বোঝা যায় নারীমুক্তি আন্দোলনের বাণীর সাথে সে পরিচিত, আমূল নারীবাদী না হ’লেও সে নারীবাদী। সে পুরুষবিদ্বেষী নয়, কিন্তু পুরুষের সাথে তার লিঙ্গের যে বিরোধ রয়েছে, সেটা কখনো স্পষ্ট কখনো প্রচ্ছন্নভাবে সে জানাতে দ্বিধা করে নি। শুরুতেই নিজের বয়সের কথা বলতে গিয়ে সে বলে, ‘তখন আমার বয়স কত? সাল তারিখ ধরিয়া এখনি তাহা ঠিক করিয়া বলিতে পারিতেছি না।…পুরুষে সম্ভবতঃ আমার সারল্যে অবিশ্বাস করিয়া ইহার মধ্য হইতে গূঢ় অভিপ্রায় টানিয়া বাহির করিবেন, কিন্তু স্ত্রীলোক বুঝিবেন, বাস্তবিক পক্ষে সাল তারিখ মনে করিয়া রাখা আমাদের পক্ষে কিরূপ কঠিন ব্যাপার।’ সে ধ’রেই নিয়েছে নারীরা তার কথায় বিশ্বাস করবে, কিন্তু ‘পুরুষে সম্ভবতঃ’ অবিশ্বাস করবে; অর্থাৎ পুরুষ ও নারী বিশ্বাস করে না পরস্পরকে, তারা জড়িত অবিশ্বাসের সম্পর্কে। শুধু পুরুষকে নয়, পুরুষের মধ্যে যে প্রধান, তাকেও মণি দেখে একই দৃষ্টিতে; সে বলে, ‘বিধাতা পুরুষ তাহা অসম্ভব করিয়া তুলিয়াছেন।’ যা সম্ভব হ’তে পারতো, হওয়াই স্বাভাবিক ছিলো, তা যে অসম্ভব হয়ে উঠেছে, তার মূলে রয়েছে একটি পুরুষ- বিধাতাপুরুষ, যে নারীর প্রতিপক্ষ। সে যেভাবে নিজের বয়স জানিয়েছে, তাতেও সে ভেঙে ফেলেছে প্রথাগত নারীভাবমূর্তি, প্রকাশ করেছে পুরুষের সাথে বিরোধ; সে বলেছে, ‘ধরিয়া লওয়া যাক, আমার বয়স তখন আঠার উনিশ, আমি এখনো অবিবাহিত। শুনিয়া কি কেহ আশ্চর্য্য হইতেছেন?’ বোঝা যায় তার লক্ষ্য পুরুষ, তার আইবুড়ীত্বে বিস্মিত হবে পুরুষই, কেননা সেটি এক ভিন্ন প্রজাতি।

মণি তার প্রেমের কথা বলেছে অকপটে, প্রেমে প্রথাগত অক্রিয়তার বদলে পালন করেছে সক্রিয় ভূমিকা, অমান্য করেছে পিতৃতান্ত্রিক বিধান যে নারীর প্রেম শুধু স্বামীরই জন্যে। মণি বলেছে, ‘আমি ভালবাসি, বিবাহের পূর্ব্বেই ভালবাসি, তিনি যে স্বামী হইবেন, এমনতর আশা করিয়াও ভালবাসি নাই। কেবল তাহাই নহে, এই ভালবাসাই আমার একমাত্র প্রথম ও শেষ ভালবাসা নহে।’ উনিশশতকের শেষ দশকের পক্ষে খুবই ভয়ঙ্কর কথা বলেছে সে অবলীলায় যে সে ভালোবেসেছে বিয়ের আগেই, পুরুষটিকে ভবিষ্যৎ স্বামী ভেবেও ভালোবাসে নি, এবং চরম ভয়ঙ্কর কথা হচ্ছে সে প্রেমে পড়েছে একাধিকবার। নিষ্ঠাবতী সতী নারীর ভাবিমূর্তি সে ভেঙেচুরে দিয়েছে। প্রেমে সে বিশ্বাস করে সাম্যে, শুধু নারীই পুজো করবে প্রেমিককে, আর প্রেমিক পুজো করবে না প্রেমিকাকে, এটা তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়; সে বলে : ‘সে রমণীই ধন্য-যে তাহার মনোদেবতার সন্ধান পাইয়া এই পরিপূর্ণ উথলিত আবেগময় প্রাণের পূজায় জীবন সার্থক করিতে পারে; আর সেই পুরুষই ধন্য, যে এই পূজারতা হৃদয়ের দেবতারূপে বরিত হইয়া তাহার পূজায় জীবন উৎসর্গ করিয়া জীবনের উদ্দেশ্য সফল করিতে পারে, আর সেই প্রেমই প্রকৃত প্রেম, যাহা এই উভয়ের আত্মহারা পূজায় অধিষ্ঠিত হইয়া প্রবলভাবে চিরবিরাজমান।’ পুরুষ অবশ্য এমন প্রেমে বিশ্বাস করে না, পুরুষ চায় বহু হৃদয় ও দেহের দেবতা হ’তে। প্রেম সম্পর্কে প্রথাগত ধারণা সে বাতিল করে দিয়েছে স্পষ্টভাবে, শৈশবের প্রেমও যে ইন্দ্রিয় কামনাতুর হ’তে পারে, তাও সে জানিয়েছে; বলেছে, ‘শৈশব ও যৌবনপ্রেমে তফাৎ অল্পই’, বলেছে, ‘ভাবিতাম, ছোট্ট ত আমাকে চুম্বন করে না; তবে বাবার মত আমাকে ভালবাসে না, আমি কেন তবে ভালবাসিব?’ শৈশবের নিষ্পাপতার মধ্যে সে মিশিয়ে দিয়েছে একটু পাপ, এবং যৌবনের প্রেমকে স্থান দিয়েছে পিতৃপ্রেমের ওপরে : ‘আমি পিতাকে ভালবাসি, তাঁহার সুখের জন্য আত্মবিসর্জ্জনেও কুণ্ঠিত নহি– কিন্তু তিনি এখন আর আমার জীবনের একমাত্র সুখদুঃখ আশ্রয় অবলম্বন, আকাঙ্ক্ষা কামনা পূজা আরাধনা, দেবতাসৰ্ব্বস্ব নহেন।’ পিতাকে সরিয়ে দিয়ে সে প্রথাগত কন্যার ভাবমূর্তি বিপন্ন করেছে সম্পূর্ণরূপে। পিতৃতন্ত্রের ভালো লাগতো যদি সে বলতো পিতাই তার দেবতাসর্বস্ব, কিন্তু মণি সেখানে বসিয়েছে তার প্রেমকে, প্রেমিককে। প্রেম তার কাছে যেরূপে দেখা দিয়েছে, তাও সে জানিয়েছে : ‘তাহার পর আট দশ বৎসর কাটিয়া গিয়াছে, তাহার পর আমি ভালও বাসিয়াছি, শৈশবের স্নিগ্ধ কোমল ভালবাসা নহে, যাহাকে লোকে বলে প্রেম-যৌবনের সেই জ্বলন্ত অনুরাগ- তাহারও অভিজ্ঞতা জন্মিয়াছে।’ মণি অভিনব নারী, যে ছক ভেঙেছে, স্বায়ত্তশাসিত মানুষ হয়ে উঠেছে।

প্রেমে পড়ার প্রথাগত রোম্যান্টিক সূত্রটিকেও সে অস্বীকার করেছে; বলেছে, ‘প্রথম দর্শনেই কি আমি প্রাণসমর্পণ করিয়াছিলাম? মোটেই নহে।’ সে প্রেমে পড়েছে ধীরে ধীরে, তার বাল্যস্মৃতি তাকে যৌবনে ঠেলে দিয়েছে প্রেমের দিকে। বাল্যকালে পাঠশালায় তার প্রথম প্রেমিক ছোটু যে-গানটি তাকে শুনিয়েছিলো, সেটি অনেক বছর পর সে শুনতে পায় রমানাথের কণ্ঠে; তার ফল হচ্ছে : ‘কিন্তু গানটি গাহিলেই সমস্ত বিপৰ্য্যয় হইয়া পড়িত।…গানটির যে কি মোহ ছিল জানি না, শুনিতে শুনিতে বাল্যের স্মৃতিধারা পূর্ণ প্রবাহে উথলিয়া কুমারীহৃদয়ের অতৃপ্ত প্রেমাকাঙ্ক্ষাকে স্ফীত উচ্ছ্বসিত করিয়া তুলিল।…তিনি চলিয়া যাইবার পরেও সমস্ত রাত্রি ধরিয়া কেমন মেঘাচ্ছন্ন থাকিতাম-স্বপ্নে জাগরণে ঐ একইরূপ ভাব আমাকে অভিভূত করিয়া রাখিত; পরদিন নিদ্রাভঙ্গের পর হইতে সে ভাব অল্পে অল্পে দূর হইয়া যাইত।’ তবে প্রেম নারীজীবনের বড়ো কথা নয়, বড়ো কথা বিয়ে; মণির জীবনেও বিয়েই বড়ো হয়ে দেখা দেয়। সে দেখতে পায় যাকে সে হৃদয় দিয়েছে, সমাজের চোখে সে তার স্বামী হওয়ার যোগ্য হ’লেও তার হৃদয়ের যোগ্য নয়। ফলে যে-সংকট দেখা দেয় তার জীবনে, তাতে সে এমন এক আন্তর-বাহ্যিক লড়াইয়ে নামে যাতে সে বদলে দেয় প্রথাগত নারীর ভাবমূর্তি। বিয়ে হচ্ছে একটি স্বামীর জন্ম, মণিও চারদিকে পরিবৃত হয়ে পড়ে স্বামীর ভাবমূর্তি দিয়ে : ‘চারিদিক হইতেই আমি শুনিতে লাগিলাম, বুঝিতে লাগিলাম, তিনি আমার স্বামী হইবেন, কোন বঙ্গবালার মনে এই বিশ্বাসের কিরূপ প্রবল প্রভাব, তাহা বিশেষ করিয়া বলিবার আবশ্যক আছে কি?’ স্বামী সম্পর্কে শিশুকাল থেকেই মেয়েদের মনে তৈরি করা হয় এক দেবভাবমূর্তি, মেয়েরা বড়ো হয় ওই মূর্তিটিকে পুজো ক’রে ক’রে, মণিও তার বাইরে নয়। স্বামীর যে-ছক তার সামনে ছিলো, সেটি সম্বন্ধে সে বলেছে : ‘স্বামী যেমনই হৌন, তিনি রমণীর একমাত্র পূজ্য আরাধ্য দেবতা, প্রাণের প্রিয়তম, জীবনের সর্বস্ব-এই বাক্য, এই ভাব, এই সংস্কার আজন্মকাল হইতে আমাদের মনে বদ্ধমূল হইয়া বসিতেছে, সুতরাং বিশেষ কারণে স্পষ্ট বীতরাগ না থাকিলে এই বিশ্বাসই প্রেমাঙ্কুরিত করিবার যথেষ্ট কারণ।’ মণি, অন্য মেয়েদের মতো, বড়ো হয়েছে স্বামী ভাবমূর্তির পদতলে, ওই পায়ের নিচে নিজের মাথাটি রেখেই বেড়েছে সে; এবং ‘আত্মদানে অন্যকে সুখী করিব নারীপ্রকৃতির এই যে সর্ব্বগ্রাসী আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছাপ্রবণতা, নারীপ্রেমের শিরায় মজ্জায় যে আকাঙ্ক্ষা শোণিতাকারে প্রবাহিত বর্ত্তমান, তাহার সফলতাতেই, তাহার বিশ্বাসেই রমণী-হৃদয় পরিপূর্ণ, বিকসিত, জীবনজন্ম সার্থক, চরিতার্থ; আবার এ বিশ্বাসেই সে ভ্রান্ত, কলঙ্কিত, মহাপাপী। প্রেমময়ী রমণী ইহার জন্য কতদূর আত্মত্যাগ করিতেছে; আর কতদূর না করিতে পারে?’ তবে স্বামী ভাবমূর্তির পায়ে আত্মদানের পাশাপাশি সব নারীই পোষে স্বামী ভাবমূর্তির সাথে একটা বিরোধ, এটা নারী ঔপন্যাসিকদের প্রায় সব উপন্যাসেই স্পষ্ট বা প্রচ্ছন্নভাবে দেখা যায়, এবং মণির মধ্যে তা স্পষ্ট দেখা দেয় প্রেমে পড়ার অল্প পরেই।

বাঙালি নারীকে পিতৃতন্ত্র দিয়েছে স্বামীভক্তির পাঠ, পুরুষে আস্থা; কিন্তু বাঙালি নারীপুরুষের সম্পর্ক একটু ঘাঁটলে ধরা পড়ে তাদের পারস্পরিক অনাস্থা। পুরুষ তার নারী-অনাস্থা উচ্চকণ্ঠে প্রচার ক’রে আসছে পিতৃতন্ত্রের শুরু থেকে, নানা সংহিতা লিখেছে নারীঘৃণার; আর নারী তা বিষের মতো লালন ক’রে এসেছে নিজের বুকে। মণি যার ওপর আস্থা স্থাপন করতে যাচ্ছিলো, অচিরেই তার ওপর তার আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। যে-রমানাথের সঙ্গে সে প্রণয়ে জড়িত, যে তার স্বামী হ’তে যাচ্ছে, মণি জানতে পারে সে সৎ নয়; বিলেতে সে এক নারীকে কথা দিয়েছিলো। মণি বলেছে, ‘স্বপ্নে দেখিলাম, যেন আমার বিবাহ হইতেছে, আমি আগ্রহদৃষ্টিতে বরের দিকে চাহিলাম, কিন্তু মনে হইল, এ সে নহে।’ শুরু হয় তার সংকট; সে নতুন প্রজাতির নারী, যে প্রথাগত ছক অনুসারে চলে না। তার প্রেম বিপর্যস্ত, তবে সে নিজে বিপর্যস্ত নয়। সে বলেছে, “কিন্তু এ নৈরাশ্যে করুণ কষ্টের দারুণতা, অসহনীয়তা উপলব্ধি করিলাম না; কিংবা সে যেমনই হৌক, তবু আমার দেবতা-তবু তাঁহার চরণে হৃদয় বিকাইব, মনে এমনতর ভাবেরও উদয় হইল না। পরিপূর্ণ বিশ্বাসে প্রতারিত বোধ করিয়া এ যেন প্রত্যাখ্যাত ভিক্ষুক দুর্ব্বাসা মুনির ন্যায় গৰ্ব্বাহত নিরাশাক্ষুব্ধ হইলাম, প্রতারকের উপর ভীষণ ক্রোধের উদয় হইল। কেবল তাহার উপর নহে, নিজের উপরেও ক্রুদ্ধ হইলাম-কি করিয়া আমি এমন লোককে দেবতা মনে করিয়াছিলাম!’ প্রথাগত কতকগুলো বিশ্বাস ও বোধ সে ত্যাগ করেছে : প্রণয়সম্পর্ক নষ্ট হওয়ায় সে ‘করুণ কষ্টের দারুণতা, অসহনীয়তা উপলব্ধি’ করে নি, যা তার কাছে প্রত্যাশিত ছিলো, এবং ‘সে যেমনই হৌক, তবু আমার দেবতা- তবু তাঁহার চরণে হৃদয় বিকাইব, মনে এমনতর ভাবেরও উদয় হইল না।’ সে পুরুষের ছক অনুসারে তৈরি নয়, প্রতারককে দেবতা গণ্য করার বদলে তার ওপর সে হয় ক্রুদ্ধ। তার বোন তার মতো নয়, সে পুরুষের ছক অনুসারী; তার দিদি তার কাছে তুলে ধরে পুরুষতান্ত্রিক বাস্তব পরিস্থিতি : ‘সে পুরুষ মানুষ, তার কি, তোর সঙ্গে না হ’লে এখনি অন্য আর একজন সেধে মেয়ে দেবে, আর তোর নামে এ থেকে এত কথা উঠবে যে, পরে বিয়ে হওয়াই ভার হবে।’ পুরুষতন্ত্রে পুরুষ চিরনিষ্পাপ, সে দণ্ডিত হওয়ার বদলে পায় পুরস্কার; তার জন্যে নারীর অভাব হয় না, বরং নারীরাই অভাব বোধ করে তার। মণি ছকভাঙা; সে জানায়, ‘নাই বা বিয়ে হ’ল, আমি ত সেজন্য কিছুমাত্র ব্যস্ত নই।’ ছক থেকে স’রে এসেছে সে, বিয়েকে সে নিয়তি মনে করে না।

নারীর জন্যে পুরুষ মানদণ্ড স্থির ক’রে রেখেছে, তাকে হ’তে হবে সতীসাধ্বী; মণি স্বামীর জন্যে স্থির করে নতুন মানদণ্ড : ‘যে আমার ক্ষমার পাত্র, সে আমার প্রণয়ী আমার স্বামী হইবার যোগ্য নহে; আমার স্বামীতে আমি সুর্য্যের মত জ্যোতিষ্মান গৌরবমণি দেখিতে চাই। সংসার যেমনই হৌক, পৃথিবীতে সে আমাকে স্বর্গ দেখাইবে, আমি তাহাতে দেবতা পাইব।’ পুরুষ যেমন জন্মজন্মান্তর ধ’রে সতী চায়, মণিও চায় সৎ পুরুষ : ‘আমার স্বামীর বর্ত্তমানটুকু লইয়াই আমি সন্তুষ্ট নহি, অতীতে, বৰ্ত্তমানে. ভবিষ্যতে তাঁহার সমস্ত জীবনে আমি আপনাকে বিরাজিত দেখিতে চাই, তাঁহার জীবনের কোন ভাগ যে আমাছাড়া ছিল বা তাহার সম্ভাবনা আছে, আমার সর্ব্বগ্রাসী প্রেমাকাঙ্ক্ষা এ চিন্তা সহ্য করিতে পারে না, এ সম্বন্ধে আমার হৃদয় পুরুষের ন্যায়, পুরুষ পত্নীতে যেরূপ অক্ষুণ্ণ অমর পবিত্রতা, অনাদি অনন্ত নিষ্ঠতা চাহেন, আমি তেমন আমার স্বামীর সমস্ত জীবনই আমার বলিয়া অনুভব করিতে চাহি।’ এতোদিন ধ’রে নারীর কাছে পুরুষ যা চেয়ে এসেছে, মণি তা-ই দাবি করে পুরুষের কাছে; দ্বৈতমানদণ্ড লোপ ক’রে দিয়ে সে হয়ে উঠেছে পুরুষের সমান : ‘আমি কি করিয়া বুঝাইব যে, আমি তাঁহাকে ক্ষমা করিতে পারি, বিবাহ করিতে পারি– তিনি আমার স্বামী হইতে পারেন। কিন্তু আমার হৃদয়ের আদর্শ আকাঙ্ক্ষা তিনি পূর্ণ করিতে পারিবেন না,… রমণীতে এরূপ পৌরুষিক হৃদয়ভাবের কি সহানুভূতি আছে?’ মণি তার হৃদয়ভাবকে ‘পৌরুষিক’ ব’লে আখ্যা দিয়েছে, তবে সেও জানে ভাবে কোনো লৈঙ্গিক পার্থক্য নেই; সংস্কৃতিই ওই পার্থক্য সৃষ্টি ক’রে রেখেছে। সে অস্বীকার করেছে ওই লৈঙ্গিক পার্থক্যটুকু।

মণি নতুন মূল্যবোধসম্পন্ন অভিনব নারী, তার বিচারও অভিনব; তা গভীর সত্যকে বের ক’রে আনে। রমানাথ আত্মপক্ষ সমর্থন করে জানায় সে ইংরেজ নারীটিকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় নি, ওই নারীই তার প্রতি মোহগ্রস্ত হয়েছিলো; তাই সে কোনো অপরাধ করে নি। তার আত্মপক্ষ সমর্থনের সাথে সায় দেয় প্রথাগত সবাই, কিন্তু মণি সায় দিতে পারে নি; সে বরং সহানুভূতি বোধ করেছে প্রতারিত ইংরেজ নারীটির প্রতি :”তিনি যাহা বলিলেন, তাহাতে সেই ইংরাজ-ললনার উপরই বর্ত্তমান সমাজপ্রথার দোষ অধিক পৌঁছায়।…জানি না, এই বিবরণের জন্য সকলে সেই মুগ্ধা অভিযুক্তা রমণীকে কিরূপ দৃষ্টিতে দেখিতেছেন, আমার কিন্তু এ কথায় তাঁহার উপর বরঞ্চ মমতা হইল এবং অভিযোগীর উপর যে বড় শ্রদ্ধা বাড়িল-তাহাও নহে।’ সে জানে বর্তমান সমাজপ্রথা যাকে অপরাধ মনে করে, তা আসলে অপরাধ নয়; আর যাকে অপরাধ মনে করে না, তাই আসলে অপরাধ। নারীর এক ছক হচ্ছে নারী ক্ষমাশীল, তার কাজ পুরুষকে ক্ষমা ক’রে দেবতার পংক্তিতে বসানো। মনি এর বিরোধী : ‘যেন ভালবাসিলে লোকে ন্যায়ান্যায় জ্ঞান পৰ্য্যন্ত হারাইয়া ফেলে, অন্যায়কে-দোষকে পূজা করাই যেন ভালবাসা! আমি তাঁহাকে যেরূপ ভাল লোক মনে করিয়া ভালবাসিয়াছিলাম-তিনি যে তাহা নহেন, সে যেন আমারি দোষ!’ মণি পুরুষের অত্যাচার ও নারীর অবস্থা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবহিত : ‘যাহারা স্ত্রীলোকের আবদার সহ্য করিতে না পারিয়া খড়গহস্তে তাহার দমন করিয়া থাকেন, মুহূর্ত্তের জন্য যদি কেবল তাঁহারা দিব্যহৃদয় লাভ করিয়া অনুভব করিতে পারেন,…তবে সংসারের রূপ এবং স্ত্রীলোকের ভাগ্য যে অনেকটা পরিবর্ত্তিত হইত, তাহাতে সন্দেহ নাই!’ সে জানে বিয়ে তাকে করতে হবে, তবে চায় এমন স্বামী, যা পিতৃতন্ত্র তখনো তৈরি করার কথা ভাবে নি; তার জন্ম হয়েছে শুধু মণির মতো নারীবাদীর ভাবনায় : ‘যাঁহাকে একবার স্বামী মনে করিয়াছি-তিনিই আমার স্বামী হইবেন। তাঁহাকে বিবাহ করিব-কিন্তু প্রতারণা করিব না; আমার মনের ভাব খুলিয়া বলিব, যদি ইহাতেও তিনি আমাকে বিবাহ করিতে চাহেন, আমি তাঁহারি। সমস্ত শুনিয়াও অবশ্যই তিনি আমাকে বিবাহ করিবেন, তাঁহার প্রেম অটল অচল, আমি যাহাই হই, তিনি দেবতা, তাঁহার প্রেমে তিনি পতিত- আমাকে উদ্ধার করিবেন।’ প্রথাগত নারীর যে-বাসনার কোনো অধিকার নেই, মণি তা-ই দাবি করেছে।

মণির একটি সুবিধা হচ্ছে বিয়ে না হ’লেও সে দুর্দশায় থাকতো না, বিয়ে না হ’লে তার জীবন বিপন্ন হতো না; তবে তার অবস্থায় থেকেও অধিকাংশ তরুণীই ব্যারিস্টার রমানাথের গলায় মালা দিতে ব্যগ্র হতো, কেননা তারা পিতৃতন্ত্রের বাণীতে দীক্ষিত, এবং শারীরিক সুখের জন্যে তারা দ্বিধাহীনভাবে বিক্রি করতে পারে নিজেদের দেহ। রমানাথ যখন তাকে জানায় যে বিয়ে না হ’লে মণির অসুবিধা হবে, তখন সে প্রত্যাখ্যান করে রমানাথকে; বলে, ‘সুবিধার জন্য আমি বিবাহ করতে চাই নে-আপনার সুখ যখন এর উপর নির্ভর কচ্ছে না– তখন আমি অব্যাহতি প্রার্থনা করি।’ পুরুষ তাকে দয়া ক’রে বিয়ে ক’রে উদ্ধার করবে, এমন উদ্ধার সে চায় না। মৃণালিনী যদিও জানে ‘সুপাত্রে ন্যস্ত হওয়াই কন্যাজীবনের চরম সৌভাগ্য, পরম সার্থকতা’, তবু সে বলতে রাজি হয় নি যে ‘আপনি ভাল বাসুন না বাসুন, তাতে কিছু আসে যায় না, আমার মঙ্গলের জন্যই আমি বিয়ে করতে প্রস্তুত!’ রমানাথের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর যার সাথে সে প্রেমে, এবং শেষে বিয়েতে জড়িত হয়, সে-ডাক্তার বিনয়কুমার বিলেতের নারীদের প্রশংসা ক’রে বলেছে, ‘আমার সবচেয়ে ভাল লাগত সে দেশের মেয়েদের স্বাধীনতা, আত্মনির্ভর ভাব। দিন দিন সে দেশে স্ত্রীলোকের কার্য্যক্ষেত্র বাড়ছে– এমন কি, পলিটিক্সে পর্য্যন্ত তাহারা হস্তক্ষেপ করেছে।’ এটা মণিরও ভালো লাগে, সেও চায় নারীকে ঘর থেকে বাইরে যেতে দেখতে। স্মরণ করতে পারি যে কংগ্রেসের অধিবেশনে যে-বাঙালি নারী প্রথম অংশ নিয়েছিলেন, তিনি মণির স্রষ্টা বা মূলসত্তা স্বর্ণকুমারী দেবী। পরিস্থিতি এমন হয়ে ওঠে এক সময় যে মণি তার বাবাকে চিঠি লেখে : ‘বাবা আমার বিবাহ করিতে ইচ্ছা নাই;…আমি খুব ভাল করিয়া হৃদয় পরীক্ষা করিয়া দেখিয়া বলিতেছি, বিবাহে আমার সুখ নাই।’ এটা শুধু কথার কথা নয়, আসলে বিয়েতে নারীর কোনো সুখ নেই, যদিও বিয়ে করা ছাড়া তাদের কোনো বিকল্প সুখও নেই। তবে তার পিতা তাকে দিয়েছে বাস্তবসম্মত পরামর্শ : ‘আমাদের দেশের যে রকম অবস্থা, অবিবাহিত স্ত্রীলোকের পক্ষেই বরঞ্চ এসব কাজে বাধা বিঘ্ন অধিক।… স্ত্রীলোকের ঐহিক, পারমার্থিক, সকল প্রকার মঙ্গলের জন্যই বিবাহ শ্রেষ্ঠ, প্রশস্ত পথ।’ এবং সে মেনে নিয়েছে, ‘আমি মৰ্ম্মে মর্মে দুর্ব্বল বঙ্গনারী, আজ্ঞাবৰ্ত্তী দুহিতা। জীবন বিসর্জ্জন দিতে পারি-কিন্তু ইহার পরে বিবাহ সম্বন্ধে দ্বিরুক্তি করা আমার পক্ষে অসম্ভব।’ পরে সে রোমঞ্চকরভাবে বিয়ে করেছে ডাক্তার বিনয়কুমারকে, এবং উপন্যাসের সুপরিকল্পিত প্লট অনুসারে দেখতে পেয়েছে তার প্রথম প্রেমই অনন্ত প্রেম, ডাক্তার বিনয়কুমারই তার বাল্যপ্রেমিক ছোটু। তবে মণি ভেঙে দিয়েছে কুমারীর প্রথাগত ভাবমূর্তি, সে স্বামীকে দেবতা ব’লে মনে করে নি, বিয়েতেই নারীজীবনের সার্থকতা ব’লে বিশ্বাস করে নি, এবং বিশ্বাস করে নি পিতৃতান্ত্রিক সতীত্বে।

শৈলবালা ঘোষজায়ার জন্ম-অপরাধী নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এক অসামান্য, সম্ভবত বাঙলা ভাষায় অনন্য, উপন্যাস। নামকরণ থেকে শেষ পংক্তি পর্যন্ত এতে লিপিবদ্ধ হয়েছে পিতৃতন্ত্রের হাতে নারীর নিপীড়িত হওয়ার শোচনীয় উপাখ্যান। শৈলবালার আর কোনো বই আমি পড়ি নি, তিনি প্রথাগত না প্রথাবিরোধী ছিলেন তাও জানি না, জানি না নারীমুক্তির বাণীতে তিনি দীক্ষিত ছিলেন কিনা, কিন্তু জন্ম-অপরাধীতে নারীজীবনের যে-মর্মস্পর্শী রূপ তিনি এঁকেছেন, তা এটিকে হয়তো বাঙলা ভাষায় লেখা শ্রেষ্ঠ নারীবাদী উপন্যাসে পরিণত করেছে। তিনি বিদ্রোহ বা প্রতিবাদের রূপ আঁকেন নি, নারীমুক্তির কৃত্রিম কৌশল উদ্ভাবন করেন নি, যেমন করেছেন বেগম রোকেয়া ও শান্তা দেবী; তিনি লিখেছেন নারীর অবিরাম পীড়িত দণ্ডিত জীবনী। এ-পীড়িত রূপ কাজ করে কল্পিত বিদ্রোহী রূপের থেকে অনেক তীব্র মর্মস্পর্শীভাবে। জন্ম-অপরাধী নামটিই প্রগাঢ় তাৎপর্যপূর্ণ, তা নির্মমভাবে তুলে ধরে পিতৃতন্ত্রে নারীর অস্তিত্বের বিভীষিকা। শৈলবালা উপস্থাপিত করেছেন পীড়ন আর পীড়নের রূপ, যেনো পিতৃতন্ত্র নারীর ওপর যতো পীড়ন করেছে তা একযোগে ভোগ করেছে তার নায়িকা অপেরা। অপেরাকে তিনি ক’রে তুলেছেন পীড়িত নির্যাতিত সমগ্ৰ বঙ্গনারীর আদিরূপ। তিনি ছক ভাঙেন নি, ছকের মধ্যে রেখেই পীড়নের মধ্য দিয়ে ভেঙে দিয়েছেন নারী-ছকটি। শৈলবালা ঘোষজায়ার নায়িকা অপেরার জন্ম-অপরাধ দুটি : প্রথম অপরাধ সে নারী, দ্বিতীয় অপরাধ সে দরিদ্র ঘরের অনাথ মেয়ে। তার বিয়ে হয়েছিলো প্রকৌশলী বিনোদলালের সাথে, তবে তার স্বামী এক হিংস্র পাষণ্ড। অপেরা বিদ্রোহী নয়, সে পুরুষতন্ত্রের ছক মেনে নিয়েই বেঁচে থাকতে চেয়েছে; কিন্তু তাকে বাঁচতে দেয়া হয় নি। তাই সে মনে দাগ কাটে প্রতিবাদীর থেকে অনেক বেশি, তার শোচনীয় জীবনই হয়ে ওঠে এক নিরন্তর নিঃশব্দ বিদ্রোহ। ‘সম্পূর্ণ নিৰ্দ্দোষ হইয়া সহস্র অপমান তিরস্কার সহিয়াও সে উদ্ধতভাবে কখনও প্রতিবাদ করিত না’; সে চেয়েছে শুধু একটু বেঁচে থাকতে। তাঁর পিতামাতা নেই, তাব বোন ও ভগ্নিপতি তাকে স্নেহেই পালন করে, এবং প্রথাগতভাবে সৎপাত্রে দানও করে। কিন্তু বিয়ের পরই তার জীবন হয়ে ওঠে নরক। সে জীবন যাপন করেছে শুধু বাল্যকালে : ‘এক বছর বয়সে মা ও চার বছর বয়সে তাহার বাবা মারা গিয়াছেন।…একটুখানি জ্ঞান হইতেই বই শ্লেট বগলে করিয়া গাড়ী চড়িয়া স্কুলে যাতায়াত-বছর বছর ফার্ষ্ট হইয়া ক্লাশে ওঠার তীব্র আনন্দ উত্তেজনা! এমন করিয়া কোন দিক দিয়া কয় বছর কাটিয়া যাইবার পর যখন থার্ড ক্লাশের সীমা ডিঙ্গাইয়া সেকেণ্ড ক্লাশে উঠিল, তখন হঠাৎ তাহার স্কুল যাওয়া বন্ধ হইল…সূৰ্য-চন্দ্ৰ- যম-বরুণ-বাসবের সমকক্ষ শিক্ষিত বাঙ্গালী যুবকের পত্নীত্ব পদে সমারূঢ় হইয়া রাঁচিতে চলিয়া আসিল।’ সে বইশ্লেট হাতে ইস্কুলে যেতো, বছর বছর শ্রেণীতে প্রথম হতো, পুরুষ হ’লে তার জীবন হতো সাফল্যে পরিপূর্ণ, কিন্তু তার অপরাধ সে নারী। তাই তার জীবন সম্পূর্ণ ব্যর্থ। শৈলবালা পাতায় পাতায় শেষ করেছেন পুরুষ, ঈশ্বর, ধর্মকে; কথায় কথায় ব্যবহার করেছেন পরিহাসসূচক বিস্ময়চিহ্ন, যেমন এখানে অপেরার বরটিকে পরিহাস করেছেন ‘সূর্য্য-চন্দ্র-যম-বরুণ-বাসবের সমকক্ষ শিক্ষিত বাঙ্গালী’ যুবক ব’লে। বিয়ের পর সম্ভাবনাময় কিশোরীটির জীবনের সমস্ত সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায় তার জীবনই। তার জীবনের নাম পীড়ন।

পিতৃতন্ত্রে নারীর কোনো সম্মান নেই, অপেরারও কোনো সম্মান নেই শ্বশুরবাড়িতে : ‘অপেরা খুব ভাল করিয়াই জানে, এ বাড়ীতে তাহার সম্মানের মূল্য কতটুকু!- অতএব নিষ্ফল মনস্তাপ বিসর্জ্জন দিয়া সমস্ত অন্যায় অপমান নিঃশব্দে মাথায় তুলিয়া লইয়া, শ্ৰান্ত ক্লান্ত কুটুম্ব-সন্তানকে সাদর শিষ্টাচার জানাইয়া-শ্বশুরবাড়ীর সম্মান বাঁচাইয়া রাখিবার জন্য একটা বিপদের দায় ঘাড়ে তুলিয়া লইতে হইবে।’ শ্বশুরবাড়িতে তার সম্মান নেই, কিন্তু তার দায়িত্ব শ্বশুরবাড়ির সম্মান রাখা। অপেরার স্বামী শিক্ষিত পাষণ্ড, ধর্ষকামী; তার কাজ অপেরারকে নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন করা; যেমন, “দূর হয়ে যাও- স্বেচ্ছাচারিণী স্ত্রীলোক!”-বলিয়া বিনোদ সক্রোধে অপেরার বাঁ পাঁজরে সজোরে কনুইয়ের গুঁতা মারিলেন। অপেরা ছিট্‌কাইয়া গিয়া মেঝের উপর পড়িল।’ অপেরা এ-অত্যাচারের বিরুদ্ধে কী করতে পারে? সে প্রতিবাদ করবে? সে যে-প্রতিবাদ জানায়, তা পিতৃতন্ত্রের জন্মকাল থেকে জানিয়ে এসেছে নারী : ‘মুহূর্তে তাহার শান্ত নম্র মুখমণ্ডলে দৃপ্ত-বিদ্রোহের বিদ্যুদগ্নি ঝলসিয়া উঠিল,–কিন্তু সে কেবল মুহূর্ত্তের জন্যই! পরক্ষণেই সংযত হইয়া নিঃশব্দে বাহিরে চলিয়া আসিল।’ শৈলবালা নারীর অব্যক্ত বিদ্রোহের আবেগ সকাতর ভাষায় প্রকাশ করেছেন : ‘হায় গো বিধাতা, তোমার সুপবিত্র বিধানের নিকট সশ্রদ্ধ সম্মানে মাথা নোয়াইয়া হাসিমুখে যেখানে আত্মোৎসর্গ করিয়া চলাই নারীহৃদয়ের স্বভাব-ধৰ্ম্ম-সেখানে কেনই যে এমন অস্বাভাবিক অধর্ম্মের উত্তেজনায় বর্ঝর নৃশংসতা জাগিয়া ওঠে, সে প্রশ্নের উত্তর তুমিই জান নারায়ণ!’ বিনোদলাল আনন্দ পায় স্ত্রীনির্যাতনে; যেমন, ‘অমনি তিনি হঠাৎ বিছানা ছাড়িয়া লাফাইয়া পড়িয়া, চক্ষের নিমেষে মেঝে হইতে একপাটি পম্প-সু তুলিয়া লইয়া, বিনা বাক্যে অপেরার কর্ণমূলে সশব্দে ফটাস করিয়া বসাইয়া দিলেন।’ বিনোদলাল পাষণ্ড, কিন্তু সে পুরুষ ও সম্মানিত; তাই লেখক তার পাশবিকতা বর্ণনার সময়ও ব্যবহার করেছেন সম্মানসূচক ক্রিয়ারূপ ‘দিলেন’; অপেরার কোনো সম্মান নেই, তাই নির্যাতিত হয়ে সে যখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, তখন তার জন্যে ক্রিয়ারূপ হচ্ছে সম্মানহীন ‘আসিল’। অপেরার সবই অপরাধ; অপেরা বাপের বাড়ি গেছে, তাই তার স্বামীর কথা হচ্ছে, ‘তার মত স্ত্রীর পাপের উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত হচ্ছে, তাকে খুন করে ফেলা।’ শুধু তার স্বামী নয়, তার শ্বশুরবাড়ির অন্য পুরুষেরাও সমান হিংস্র; তার বঠাকুর বলে, “আমার পরিবার যদি ওরকম হত, তাহলে আমি তাকে লাথির ওপর লাথি, জুতোর ওপর জুতো, ঝাঁটার ওপর ঝাঁটা মারতাম!– লাঠির চোটে ভূত জব্দ, মেয়েমানুষ তো কোন ছার! শাসন থাকলে মেয়েমানুষ কখনো অমন স্বেচ্ছাচারিণী হতে পারে!”“ পুরুষের যে-হিংস্রতার ছবি এঁকেছেন শৈলবালা, তা পুরুষ সম্পর্কে তাঁর মৌল ধারণার প্রকাশ; তিনি পুরুষকে দেখেছেন হিংস্র পশুরূপে। নারীপুরুষের ঘনিষ্ঠতম সম্পর্কও পশুবৃত্তি : ‘শুধু পশুবৃত্তির উত্তেজনায় যে ক্ষণিক আকর্ষণ, ক্ষণিক সম্মিলন- তাহাই কি দাম্পত্য ধর্ম্মের শ্রেষ্ঠ সার্থকতা? ধিক্, এত বড় সাংঘাতিক প্রবঞ্চনা, এত বড় মৰ্মান্তিক লাঞ্ছনা মানুষের জীবনে যে আর নাই!

অপেরার সবই অপরাধ; সে কিছুটা লেখাপড়া জানে, এটা তার অপরাধ; সে একটু পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন থাকতে চায়, এও তার অপরাধ। তার স্বামী লেখাপড়া সম্পর্কে পোষে এমন শ্রদ্ধাবোধ : ‘মেয়ে মানুষের লেখাপড়া শেখা! দুচক্ষে যা দেখতে পারি নে, তাই জুটেছে ঘরে।…জুতিয়ে অম্লি মুখ ছিঁড়ে দিতে পারি!’ সে বিশ্বাস করে, ‘যে মেয়ে মানুষ লেখাপড়া শিখেছে, তার কি ভদ্রস্থ আছে? সে ত বেশ্যা!’ সে পরিষ্কারপরিচ্ছন্নও থাকতে পারবে না, কেননা তাও নারীর অপরাধ। শৈলবালা প্রশ্ন করেছেন, “হিন্দুসমাজের কোন্ শাস্ত্রের কোন্ খানে এক জায়গায় বুঝি লেখা আছে, এমনতর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ‘বাই’ যে মেয়েমানুষের থাকে, তাহারা নাকি নিতান্ত শীঘ্রই আধঃপাতে যায়!’ তার জীবনই অপরাধ, তাই তার প্রাপ্য নিরন্তর শাস্তি : ‘কিন্তু নিরুপায় সে! হতভাগ্য বাংলা দেশের ভদ্রগৃহস্থ গৃহের, হতভাগিনী বধু সে! গুরুজনের সম্মান লঙ্ঘনের অপরাধ-আশঙ্কা তাহার পায়ে পায়ে!– মিথ্যা সাক্ষ্য ও অন্যায় প্রমাণের জোরে, বিনা অপরাধে সহস্র দণ্ড ভোগ করিতে হইলেও, নিজের নির্দোষিতা সম্বন্ধে কোন কৈফিয়ৎ তাহার মুখ ফুটিয়া উচ্চারণ করিবার অধিকার নাই,- তাহা হইলেই সৰ্ব্বনাশ! জাতিনাশের চেয়েও বেশী অপরাধের দায়ে তাকে পড়িতে হইবে! ইহাই আমাদের বাংলা দেশের ভদ্রগৃহস্থ গৃহের গার্হস্থ্যবিধি! বাংলা দেশের অজ্ঞ বিজ্ঞ সকলেই একটা সুমহান মোটা নীতি শিখিয়াছে,– “হলুদ জব্দ শিলে আর বউ জব্দ কীলে”।’

অপেরার, সমস্ত নির্যাতিত নারীর মতোই, প্রতিবাদের অধিকার নেই; এমনকি অধিকার নেই চোখের জলের : ‘কেহ আসিয়া দেখিয়া ফেলে, এই ভয়ে তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছিয়া ফেলিল। ছিঃ, একি চপলতা করিতেছে? স্বামীর অসদ্ব্যবহার- ইহাই যে তাহার প্রাক্তন! এ কর্ম্মভোগ নারী-জীবনের কর্তব্য বলিয়া শান্ত সহিষ্ণু ভাবে বহন করিতে হইবে।’ নারীজীবন পেয়েছে সে জীবনের বদলে পীড়ন উপভোগের জন্যে, তাই পীড়নভোগই তার পুণ্য। অপেরা মর্ষকামী নয়, পীড়িত হয়ে সে কোনো সুখ পায় না; অন্য সমস্ত নারীর মতো পীড়ন ভোগ করাই তার প্রতিবাদ। তার ভেতরটা যখন গর্জন ক’রে ওঠে, তখনও তাকে থাকতে হয় নিঃশব্দ নারী : ‘অপেরার স্তব্ধ-ব্যথাহত নারীত্ব দৃপ্ত-অভিমানে অন্তরের মধ্যে গৰ্জ্জিয়া উঠিল,–কিন্তু সেটা প্রকাশ করিবার অধিকার তাহার নাই! তাহা হইলেই না কি–স্বামীর গুরু-সম্মানকে লঘু করিয়া দেওয়ার পাপে পড়িতে হইবে!’ পীড়ন সহ্য করতে একদিন সে রূপান্তরিত হয়ে যায় : ‘এখন কাঁদিয়া হাল্কা হইতে তাহার প্রবৃত্তি হয় না, লজ্জা করে রাগও হয়!’ এটা প্রতিবাদের বিপরীত রূপ, পীড়ন ভোগ করেই সে জানায় তার প্রতিবাদ।

শৈলবালা পুরুষকে দেখেছেন হিংস্র অমানবিক জন্তুরূপে, যাদের কাজ নারীপীড়ন :

সংসারের শক্তিমান, স্বার্থপর, নিষ্ঠুর, দাম্ভিক, সুখ-সম্ভোগ-বিলাসী, মহারত্ন পুরুষগুলির ফরমাস অনুসারে সৃষ্টিকে নিখুঁত সুন্দর রূপে গড়িয়া তোলা বিধাতার শক্তিতে কুলাইয়া উঠে নাই। কাযেই সে-হেন বিশিষ্টগুণ সম্পন্ন প্রবল শক্তিমান পুরুষেরা যখন তাঁহাদের ইচ্ছা অভিরুচির ক্রীতদাসী দুর্ব্বল প্রাণীগুলিকে, তাঁহাদের মত যথেচ্ছাচার সহিবার পক্ষে একান্ত অযোগ্য-অলস, নির্জ্জীব, অথবা বিদ্রোহভাবাপন্ন হইতে দেখেন, তখন তাঁহারা বিধাতার মুণ্ড ভোজনে উদ্যত হন! স্বেচ্ছাচারী পুরুষ তাঁহারা তাঁহারা কি বিধাতার স্বাধীনতা সহ্য করিতে পারেন? তাই তাঁহারা বিধির বিধান উল্টাইয়া দিবার জন্য অপরূপ বিধানের সৃষ্টি করেন! তাঁহাদের ফরমাসী মাপের অযোগ্য যে জন একান্ত নিরুপায় ভাবে তাঁহাদের করায়ত্ত হইয়া পড়ে-সেটাকে চাবকাইয়া দুরস্ত করিবার জন্য তাঁহারা অমানুষিক শক্তিতে বন-মানুষী প্রতিভা দেখাইবার জন্য কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন।

পুরুষের প্রকৃতি সম্পর্কে এখানে শৈলবালা প্রকাশ করেছেন তীব্রতম ঘৃণা; পুরুষ স্বেচ্ছাচারী, অত্যাচারী, যে-বিধাতার বিধানকেও বদলে দেয় নারীপীড়নের জন্যে। নারী কী ক’রে এর প্রতিবাদ করবে, যেখানে সব কিছুই নারীর বিপক্ষে? শৈলবালা এটা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে :

বাঙ্গালার পল্লীগৃহে অকাটমূর্খ ভদ্রনামের ইতর শ্রেণীর স্বামীস্ত্রীর বিবাদে মারধোর গালমন্দের পর এমনই ভাবে বাড়ী হইতে খেদাইয়া দিবার প্রথা প্রচলিত আছে বটে, তবে সেটা-সে শ্রেণীর মূর্খ-ইতর স্বামীদের পক্ষেও শোভনীয়,-স্ত্রীদের পক্ষেও সহনীয়! স্বামীদের এই অত্যাচার সমর্থনার্থে, কোন শাস্ত্র হইতে নাকি সার-সঙ্কলন করিয়া, মূর্খে নয়, অনেক বিদ্বানেও নাকি প্রবল বিজ্ঞতা সহ যুক্তি প্রদর্শন করিয়াছেন যে, স্বামী সহস্র অন্যায় করুন কিন্তু স্ত্রী যদি তাহার বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ করে, তবে পরজন্মে তাহাকে কুক্কুরীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করিতে হইবে।
ইহার পর মূর্খ, অধম, শাস্ত্রজ্ঞানহীন, তৃণাদপি তুচ্ছ নারী জাতি কোন সাহসে কথা কহিবে? পৃথিবীতে জন্মগ্রহণই যাহাদের একটা মহৎ অপরাধ বলিয়া গণ্য-সূতিকাগার হইতে মৃত্যুকামনাই যাহাদের আত্মীয় স্বজনের কর্ত্তব্য, সে-হেন ‘মেয়েগুলা’ যে দুনিয়ার বাজারে কোন্ স্পর্দ্ধায় বাঁচিয়া থাকে, ইহাই ত একটা ভয়ানক আশ্চর্য্য ব্যাপার!

শৈলবালা আক্রমণ করেছেন সমগ্র পিতৃতন্ত্রকে, পিতৃতন্ত্রের শাস্ত্রকে, যা নারীকে শুধু পীড়নের বিধান দিয়েই পরিতৃপ্ত নয়, পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকেও নিষিদ্ধ ক’রে দিয়েছে। বিধানে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও অপেরার মনে জাগে প্রতিবাদ। তখন ‘নিৰ্দ্দয় শক্তিতে বজ্রনিষ্পেষণে অপেরার হাত টিপিয়া ধরিয়া কঠোর ভূভঙ্গী করিয়া রূঢ় স্বরে তিনি (স্বামী) বলিলেন, “দেখ, মেয়েমানুষের অতটা তেজ ভাল নয়।” তখন :

অপেরার গ্রহদেবতা বিরূপ!-কোথা হইতে দুষ্ট সরস্বতী আসিয়া তাহার স্কন্ধে চাপিয়া বসিলেন,-অপেরা ধৈর্য্য হারাইল!-চির-অনাদৃতা চির-অবজ্ঞাতা স্ত্রীলোকের কতটা তেজ যে ভাল, অপেরা সে হিসাবের অঙ্কটা জানিয়া বুঝিয়া, বিজ্ঞতা প্রকাশের অবসর লইল না,-এইবার অকুণ্ঠিত দৃষ্টি তুলিয়া বলিল-”তেজ! একেও তোমরা তেজ বলবে? বেশ, তোমাদের বিচারই ভাল! কিন্তু রক্তে মাংসে গড়া মানুষ আমি, আমার মন পাথর দিয়ে গড়া নয় সেটা মনে রেখো–”

অপেরা মুক্ত নারীর জীবন চায় নি, সে প্রথা মেনেই যাপন করতে চেয়েছে তার দণ্ডিত জীবন। সে বলেছে, ‘স্বামী তুমি তোমার স্থান আমার মাথার উপর, সে একবার নয় একশো বার আমি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করছি।’ তবে তারও যে সামান্য অধিকার আছে, তা সে জানাতে চেয়েছে; বলেছে ‘স্ত্রী বলে আমারও কি−’, কিন্তু বাক্য সে শেষ করতে পারে নি, জানাতে পারে নি তার কী আছে? এক সময় পীড়ন তার সহ্য হয়ে যায়, আর অসহ্য হয়ে ওঠে কৃত্রিম আদর : ‘লাথির উপর লাথি, জুতোর উপর জুতো, ঝাঁটার উপর ঝাঁটা, যার জন্যে প্রেস্কৃপসন্ ঠিক হয়ে আছে, তাকে শান্ত সহিষ্ণুভাবে তার ন্যায্য প্রাপ্যটা গ্রহণ করিতে দাও- মাঝে মাঝে খেয়াল মত এমন যথেচ্ছ অনুগ্রহ দেখিয়ে কেন তার মাথা খারাপ করে স্পর্দ্ধা বাড়াও?-এতে তোমার কোন গ্লানি বোধ না হতে পারে, কিন্তু দোহাই ধৰ্ম্ম সত্যি বলছি, ঝাঁটা লাথি সহ্য করবার জন্যে যার মন কঠিন ভাবে প্রস্তুত হয়েছে, এ আদর অনুগ্রহ তার অসহ্য।’ নারী যেমন পীড়নের শিকার হয় পুরুষের, তেমনি হয় পুরুষের সোহাগেরও শিকার; প্রেমহীন সোহাগ তার জন্যে শোচনীয়তম অপমান। পুরুষ সোহাগ করে নিজেকেই পরিতৃপ্ত করার জন্যে, নিজেরই প্রভুত্বকে ভিন্নভাবে নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়ার জন্যে; তাতে নারীর কোনো সুখ নেই। নারী কি কোনো তেজ দেখাতে পারে, তার কি সে-অধিকার আছে? নেই। বুকে যখন একটু প্রতিবাদের অগ্নিকণা জন্ম নেয়, তখন ‘অপেরার মনে হইল, সত্যই ত, মেয়েমানুষের এত তেজ, এ যে বাস্তবিকই একটা বিষম স্পর্দ্ধা!’ মেয়েমানুষ কী করবে? তার জন্যে রয়েছে আত্মদমন : ‘নিজের এই অস্বাভাবিক দুঃসাহসিকতার জন্য অপেরা মনে মনে ত্রাহি মধুসূদন জপিতে জপিতে আড়ষ্ট হইয়া পড়িয়া রহিল,…তাহার মন উষ্ণ উত্তেজনায় বিদ্রোহী হইয়া উঠিয়াছে,-সামান্য সংঘর্ষে এখনই হয়ত সে বজ্রপাত ঘটাইয়া বসিবে। প্রাণপণে আত্মদমন করিবার জন্য অপেরা আড়ষ্ট নির্জ্জীবের মত পড়িয়া রহিল। ক্রীতদাসী ক্ষুব্ধ হ’তে পারে, তবে ক্ষোভ বিপন্ন করে তার জীবন, তাই নিজের ক্ষোভকে দমন করাই তাঁর বেঁচে থাকার পদ্ধতি।

মেয়েমানুষের অবস্থান কোথায় শৈলবালা তা বারবার নির্দেশ করেছেন :

[ক] গোটা দুই ধমক ও একটা পদাঘাতে যাহাকে কাবু করিয়া ফেলিতে পারা যায়, সে কি আবার মানুষ। বিশেষতঃ মেয়ে মানুষ ত জন্তু জানোয়ারের সামিল নগণ্য জীব।-তবে সভ্য জগতে? ওঃ, সে আলাদা কথা।-আর আমাদের ঘরে এই সব “মাগী ছাগী”-উহাদের জীবন মূল্যহীন। উহাদের ধমনীতে যে তরল পদার্থটা প্রবাহিত হয়, সে ত রক্ত নয়,-অসার পদার্থ, লাল জল মাত্র।

[খ] স্ত্রীলোকের ভাগ্য নিশ্চল জড় পদার্থ!… পুরুষ মানুষের চরিত্র সহস্র অসৎ কাযে, সহস্র হীনতা, নীচতায়,–কখনও অপবিত্র হইবার নয়, সোণার মাড়ী বুঝি বাঁকা হইলে ক্ষতি আছে? কি স্পর্দ্ধা রে! আর স্ত্রী চরিত্র?-সত্যযুগ হইতে প্রমাণ চলিয়া আসিতেছে, দ্বিতীয় বাক্য নিষ্প্রয়োজন! পৃথিবীর ইতিহাসে আজ পর্য্যন্ত চরিত্রহীনতার জন্য যত লক্ষ কোটি অপরাধ ঘটিয়াছে, সে শুধু স্ত্রীজাতির একান্ত নিজস্ব কলঙ্ক! সে কলঙ্কের সহিত পুরুষ জাতির কোন পুরুষেও তিলার্দ্ধ সংস্রব নাই। বেশী কথা কি, ঐ কঠোর অপরাধী জাতিটার চরিত্র এমনই অবিশ্বাস্য ও মন এতই দুরভিসন্ধিপূর্ণ যে, মৃত্যুর পরও উহাদের বিশ্বাস করা নিষেধ! দেহটা চিতার আগুনে ভস্মসাৎ হইয়া বাতাসে যখন ছাই উড়িয়া যাইবে, তখন নিৰ্ভয়!

[গ] যেহেতু বসুন্ধরার সর্ব্বোত্তম জীব পুরুষ-মানুষরা স্বতঃসিদ্ধ, অথবা সোজা ভাষায় যাহাকে স্বেচ্ছাচারী বলা যায়, তাহাই। সুতরাং তাহারা ত কাহারও সুবিধা বা মঙ্গলের মুখ চাহিয়া নিজেদের উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতি ও মন্দ অভ্যাস সংশোধন করিতে বাধ্য নন,-তা, তাহাতে সৃষ্টি রসাতলেই যাক, আর সৃষ্টিকর্তা কারাগারে, দ্বীপান্তরে যেখানে খুশী শৃঙ্খলাবদ্ধ হইয়া থাকুন, কোন ক্ষতি নাই।–কিন্তু বসুন্ধরার অধমাধম জীব মেয়ে-জাতটার প্রত্যেক জনকে যে এক একটি স্বেচ্ছাচারীর ছন্দ মাত্ৰা প্রকরণ অনুসারে, ঠিক মাপ মিলাইয়া নির্দিষ্ট ছাঁচে স্বতন্ত্র ভাবে গড়িয়া উঠিতে হইবে, সে বিধান অবশ্য প্রতিপাল্য!…বেচারা অপেরা চুপ করিয়া যতই সহিতে লাগিল, তাহার অন্তঃকরণ ততই বিদ্রোহী হইয়া উঠিতে লাগিল।

[ঘ] পুরুষ মানুষের চটি জুতার স্থানটা যেখানে, বিবাহিতা স্ত্রীর স্থান যে তাহার ঢের নীচে… [ঙ] স্বামীর সহিত সদ্ভাব না থাকিলে, স্বামী অত্যাচার-পরায়ণ নিষ্ঠুর নির্দয় হইলে, স্ত্রী পৃথক্ হইবে? ওমা, একি অসম্ভব কথা!…যে দেশে নারীর স্থান বুট, ঘোরতোলা, পাম্পসু, প্রভৃতি দামী জুতার নীচে নয়,-একেবারে সব চেয়ে অধম চটিজুতার নীচে বলিয়া কীৰ্ত্তিত হইয়াছে, যে সমাজে নারীর জন্মগ্রহণ মহা অপরাধ-বাঁচিয়া থাকার ত কথাই নাই; সে দেশের সে সমাজের কোনও নারী যদি অত্যাচারী স্বামীর উৎপীড়নের হাত এড়াইয়া স্বচ্ছন্দ শান্তিতে সৎভাবে জীবনটা কাটাইবার জন্য, সাহস করিয়া পৃথক হইয়া যায়, তবে সে দুঃসাহসের দণ্ডের পরিমাণ কতখানি?

আক্রমণ, শ্লেষ, বিদ্রূপ, বর্ণনার মধ্য দিয়ে পুরুষের পাশবিকতা ও নারীর শোচনীয় অবস্থানটিকে শৈলবালা মর্মস্পর্শীভাবে নির্দেশ করেছেন; অপেরার জীবনের ভেতর দিয়ে শৈলবালা তুলে ধরেছেন সমগ্র পীড়িত নারীর যন্ত্রণার রূপ। পুরুষ তাঁর চোখে নৃশংস দানব। লৈঙ্গিক রাজনীতির চরম রূপটি চিত্রিত করেছেন শৈলবালা; দেখিয়েছেন পুরুষের স্বৈরাচারের ফলে নারীর অবস্থা শোচনীয় হ’তে পারে কতোখানি। তিনি দেখিয়েছেন নারী-পুরুষ, স্ত্রী-স্বামীর মধ্যে রয়েছে এক অনাদি বিরোধ, যার শিকার নারী। নারী এ-বিরোধ সৃষ্টি করে নি, পুরুষই নিজের স্বেচ্ছাচারিতায় নারীকে শত্রু ক’রে তুলেছে; পুরুষপ্রজাতির সাথে নারীর জীবনযাপন এক অসম্ভব পীড়াদায়ক ব্যাপার। স্বামী কি নারীর সুখ? শৈলবালা লিখেছেন, ‘স্বামীর দিকে চাহিয়া হঠাৎ অপেরার মনে হইল, ইনিই যত অনিষ্টের মূল।’ এক অপেরার অনুভবের মধ্য দিয়ে তিনি নির্দেশ করেছেন সমস্ত নারীর জীবনের অনিষ্টের মূলটি। অপেরা পীড়নের প্রতিবাদও করতে পারে না, পীড়নে পীড়নে সে শিশুর মতো অসহায় হয়ে ওঠে : ‘অভিমানী শিশু যেমন তুচ্ছ ছুতা অবলম্বন করিয়া সর্ব্বদাই কাঁদিবার জন্য ব্যাকুল হয়-অপেরার বুকের ভিতর তেমনই একটা অর্থহীন ব্যাকুলতার আবেগ ঠেলিয়া উঠিল।’ পিতৃতন্ত্র নারীকে শিশুই মনে করে, যে-নারী শিশু হ’তে চায় না তাকে নির্যাতনের মধ্য দিয়ে পরিণত করে অবোধ অসহায় শিশুতে।

শৈলবালা শুধু অপেরার স্বামীকে নয়, প্রায় সব পুরুষই দেখেছেন অমানুষরূপে; এক চিকিৎসকের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে : ‘তাহার উপর তিনি নিষ্ঠাবান জ্ঞানাভিমানী পুরুষ, পৃথিবীতে মেয়েমানুষদের বাঁচিয়া থাকাটা অত্যন্ত ঘৃণা ও লজ্জার বিষয় বলিয়া তাঁহার জ্ঞানচক্ষুতে প্রতিভাত হইত।’ পুরুষ এতো অমানুষ যে স্ত্রীকে খুন করার পর তার স্বামী বক্তৃতা দেয় : ‘আজ কালকার মেয়েরা যে ধর্ম কর্ম ভুলিয়া, হিন্দু স্ত্রীর কর্তব্য ভুলিয়া, ঘোরতর অহিন্দু আচার অবলম্বন করিয়া, অসদুপায়ে বিষ খাইয়া, গলায় দড়ি দিয়া, জলে ডুবিয়া ও কেরোসিন তৈলে পুড়িয়া মরিতেছে, তৎসম্বন্ধে উদ্দীপনাপূর্ণ ভাষায় বিস্তর নিন্দাবাদ করিতেছেন!’ নারী কী কী উপায়ে পুরুষের হাত থেকে নিজেকে উদ্ধার করছে, তার তালিকাটি তিনি উপস্থিত করেছেন এখানে। পুরুষের কবল থেকে নারীর নিজেকে উদ্ধারের উপায় আত্মহত্যা; অপেরা জানে, ‘এই চির পরাধীন জীবনের অবস্থা!–এদের স্বচ্ছন্দভাবে নিঃশ্বাস ফেলবার অধিকার পর্য্যন্ত নেই…এরা জন্মেছে শুধু সংসারের সকলের অসন্তোষ বিরক্তির জ্বলায় উৎপীড়িত হয়ে,–আত্মগ্লানির ধিক্কারে আত্মহত্যা করতে!’ অপেরা বলেছে, ‘আমার আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যে আমায় যথার্থ ভালবাসে, সে যেন আমার মৃত্যুর প্রার্থনাই করে!’ জন্ম-অপরাধী অপেরার এ-প্রার্থনা যে পূর্ণ হবে, তাতে সন্দেহের কারণ নেই; উপন্যাসের শেষে সে ঢ’লে পড়ে অপমৃত্যুর কোলে। মৃত্যুই তার মুক্তি, মৃত্যুই তার চরম বিদ্রোহ : ‘অপেরা নিরুত্তর!- আজ সে তাঁহার (স্বামীর) শাসন বাধ্যতার আইনের কবল চিরদিনের মত এড়াইয়া নির্ভয়ে অবাধ্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে! আজ সে আর উত্তর দিবে না!’ জীবন অপেরাকে যে-অধিকার দেয় নি, মৃত্যু দিয়েছে তাকে সে-অধিকার : পুরুষের অবাধ্য হওয়ার স্বাধীনতা। শৈলবালা এঁকেছেন পুরুষের নারীপীড়নের রূপটি, অপেরাকে ক’রে তুলেছেন সমস্ত নিপীড়িত বাঙালি নারীর আদিরূপ। নারী কোনো অপরাধ না ক’রেও যে পুরুষতন্ত্রের কাছে অপরাধী, জন্মদণ্ডিত, এর বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলনের আয়োজন না ক’রেও শুধু একটি নারীর শোচনীয় জীবন চিত্রিত ক’রে শৈলবালা জানিয়েছেন প্রবল প্রতিবাদ; এবং রচিত হয়েছে একটি অসাধারণ নারীবাদী উপন্যাস।

অনুরূপা দেবী হিন্দু বিধানে দীক্ষিত প্রথাগত ঔপন্যাসিক; মন্ত্রশক্তি (১৯১৫) লিখেছেন তিনি বেদমন্ত্রের মহাশক্তি প্রমাণের জন্যে; কিন্তু তাঁর উপন্যাসেও নারীপুরুষের বিরোধ স্পষ্ট। তিনি তাঁর নায়িকা বাণীকে শেষে পুরুষের পায়েই সঁপে দিয়েছেন, তবে এঁকেছেন নারীপুরুষের দীর্ঘ লৈঙ্গিক রাজনীতি বা বিরোধের চিত্র। তাঁর মন্ত্রশক্তিও নারীকেন্দ্রিক; তাঁর নায়িকা রাধারাণী বা বাণীর বিয়ে ও স্বামীর সাথে অপসম্পর্ক এর বিষয়। রাজনগরের জমিদার হরিবল্লভের বংশে এক বড়ো সমস্যা দেখা দেয় পুত্র রমাবল্লভের (?) ঘরে কোনো সন্তান জন্ম না নেয়ায়। তবে ‘হরিবল্লভ বাবু সুদীর্ঘ জীবনের মধ্যে পৌত্রমুখ সন্দর্শনের আশায় হতাশপ্রায় হইয়া তাঁহার বিপুল ধনৈশ্বর্য্য পরমার্থে উৎসর্গের কল্পনা করিয়া এই মন্দির নির্মাণে মনোযোগী হইয়াছেন, এমন সময় পুত্রবধূ কৃষ্ণপ্রিয়া একটি পুষ্পকোরকতুল্য সন্তান প্রসব করিলেন। শিশুটি পুত্র সন্তান নহে, কন্যা সন্তান। তথাপি এই ‘হাপুত্রে’র ঘরে তাহার আদরের সীমা রহিল না।’ একটি পুত্র জন্ম নিলে যা হতো স্বর্গীয় আনন্দ, কন্যার জন্মের ফলে তা হয়ে ওঠে মহাসংকট। অনুরূপা জানিয়েছেন, এবং বিবরণও দিয়েছেন যে মেয়েটিকে হরিবল্লভ থেকে রমাবল্লভ অসীম আদর করে, কিন্তু মেয়েটির জীবনে ওই আদর নিরর্থক। হরিবল্লভ আদর ক’রেও বাণীর জীবনকে ধ্বংস ক’রে যেতে দ্বিধা করে নি। রমাবল্লভ সন্তানের-পুত্রের আশায় আরেকটি বা অনেক বিয়ে করতে পারতো, তবে পিতার বিরাগভাজন হইয়াও কেবল এই হতভাগিনীর মুখ চাহিয়াই গৃহে পুনর্ব্বার সৌভাগ্যবতী নব বধূ আনয়ন করেন নাই।’ এই শুধু কারণ নয়; অনুরূপা আরেকটি নব বধু আনতে দেন নি, কেননা তিনি এ-’হতভাগিনী’র থেকে অনেক বেশি ‘হতভাগিনী’ আরেকজনের কাহিনী বলতে চেয়েছেন। অনুরূপা প্রথাগত বিধানের প্রতিপক্ষ নন; তিনি জানেন ‘পতিব্রতা হিন্দু রমণী নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে বড় করিয়া দেখিতে জানেন না।’ রমাবল্লভের স্ত্রী ‘অনেক অনুনয় অনুরোধেও স্বামীকে পুনর্বিবাহে সম্মত করাইতে পারেন নাই।’ পুরুষকে একটু দেবতা ক’রেই এগিয়েছেন অনুরূপা।

বিয়ে মায়ের জীবনে সমস্যা সৃষ্টি না করলেও কন্যার জীবনকে নষ্ট ক’রে দেয়। সমস্যা যোগ্য পাত্রের অভাব; ন-বছর বয়স থেকেই বাণীকে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা শুরু হয়, কিন্তু তেরো বছর বয়সেও তা সম্ভব হয় নি। পিতৃতন্ত্র নারীর বিয়ের আবশ্যিক বিধান দিয়েছে, এবং পিতৃতন্ত্রের এক বড়ো পুরোহিত হরিবল্লভ স্নেহ করা সত্ত্বেও পিতৃতন্ত্রের স্বার্থে পৌত্রীর জীবন নষ্ট ক’রে যেতে দ্বিধা করে নি। পিতৃতন্ত্র হরিবল্লভের হাতে লিখিয়ে নেয় নারীপীড়নের একটি উইল : ‘যদি পঞ্চদশ বৎসর বয়সের মধ্যে তাহার পৌত্রী রাধারানী কোন সমশ্রেণীর সমান ঘরে কুলীনসন্তানের সহিত বিবাহিতা হয়, তবেই সে অথবা তাহার সন্তান সন্ততিগণ দেবসেবা ব্যতিরেকে আয়ের সমুদয় উপস্বত্ব পুরুষানুক্রমে ভোগদখল করিতে পারিবে। কিন্তু যদি তাহা না হয়-অর্থাৎ অসমান ঘরে বিবাহ হয় অথবা উক্ত সময়মধ্যে বিবাহ না হয়, তাহা হইলে রাধারানীর পঞ্চদশ বৎসব পূর্ণ হওয়ার পর দিবস প্রাতঃকালেই তাঁহার সুদূর কুটুম্বপুত্র মৃগাঙ্কমোহন সম্পূর্ণ উত্তরাধিকার প্রাপ্ত হইবেন। রমাবল্লভ যাবজ্জীবন সহস্র মুদ্রা মাসহারা পাইবেন মাত্র, এই পৈতৃক গৃহে সেইদিন হইতে তাঁহার কোনই অধিকার থাকিবে না।’ এমন একটি নিষ্ঠুর উইল করতে তার হাত কাঁপে নি, অথচ সে খুব ভালোবাসততা তার নাতনীকে; বাণী যদি নাতী হতো, হতো পাষণ্ড, তাহলেও সে এমন উইল করতে পারতো না। বোঝা যাচ্ছে কোনো মেয়েকে স্নেহ করা আসলে তাকে উপহাস করা। নাতনীর কোনো মূল্য নেই, স্নেহেরও মূল্য নেই; মূল্যবান হচ্ছে পিতৃতন্ত্রের বিধান। জমিদার তার প্রিয় নাতনীকে বনবাসে পাঠিয়ে নির্দ্বিধায় সম্পত্তি উইল ক’রে গেছে এক কুটুম্বপুত্রের নামে, যাকে সে কখনো আদর করে নি, কাছেও পায় নি, এমনকি পছন্দও করে না। তাই দেখতে পাই পিতৃতন্ত্রের পুরোহিতদের কাছে স্নেহের পাত্রীর থেকে অনেক প্রিয় হচ্ছে পুত্র, তা তার নিজের হোক বা যারই হোক। বাণীর জীবনেকে পিতৃতন্ত্রের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে সে পরলোক চ’লে যায়। অল্প বয়সে বিয়ে না হওয়ায় বাণী অবশ্য এমন কিছু সুখ ভোগ করেছে, যার সুযোগ হিন্দু মেয়েরা পায় না : ‘কুমারী জীবনের যে সুখাস্বাদে হিন্দু বালিকারা চিরবঞ্চিতা, সেই অনুপমেয় শান্তির আস্বাদ গ্রহণে সে নিজেকে চরিতার্থ মনে করিতেছিল।’

ধনী পরিবারে মেয়েদের স্বামীর বিকল্প হয়ে ওঠে কোনো দেবতা; রাধারাণীর বিকল্প স্বামী হয় কৃষ্ণ, যার পুজোয় সে নিজেকে সমর্পণ করে। অনেক উপাখ্যানে দেখা যায় যে অবিবাহিত বালিকারা মেতে উঠেছে পুজোয়, বিশেষ ক’রে কৃষ্ণের পুজোয়। অবিবাহিত বালিকাদের মন্দির নিয়ে মেতে ওঠার, বিশেষ ক’রে কৃষ্ণের পুজোয় নিজেদের বিলিয়ে দেয়ার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গোপন তাৎপর্য : কৃষ্ণ চরিতার্থ করে তাদের কাম; কৃষ্ণপ্রেমের ভেতর দিয়ে তারা জানায় তাদের পুরুষ ও স্বামীবিদ্বেষ। এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন রাধারাণী বলে, ‘আমার কৃষ্ণ ত দিনরাত্তির আমার কাছেই রয়েছেন,… তোরা তোদের স্বামীকে কি এমন করে সাজাতে পারিস? না, এমন ভালই বাসতে পারিস? তারা পান থেকে চূণ খসলে ঝগড়া করে, দাসীর মত খাঁটিয়ে নিয়ে দুটো ভাল কথাও সকল সময় কয়ে উঠতে ফুরসৎ পায় না।…আমি তাই স্বয়ম্বরা হয়েছি।’ যেনো সব নারীর মতোই তার জানা আছে পুরুষের পাশবিকতা, তাই পুরুষকে প্রত্যাখ্যান ক’রে গ্রহণ করে সে কৃষ্ণকে; বলে, ‘আমি যে প্রতিজ্ঞা করেছি, এ জন্মে বিবাহ করিব না। নারীর একমাত্র একান্ত সম্পদ তার দেহ, যার প্রতি পুরুষের একমাত্র মোহ। নারীর পুরুষবিরোধিতার একটি রূপ হচ্ছে সে তার দেহটিকে রক্ষা করতে চায় পুরুষের গ্রাস থেকে; সে বোধ করে তার দেহটি যদি পুরুষের কবলে পড়ে তখন তার আর নিজের ব’লে কিছু থাকে না। তার দেহ নষ্ট হয়, সেও নষ্ট হয়। নারী তখন হয়ে ওঠে কামবিরূপ, কামশীতল। এটাও নারীর এক বড়ো বিদ্রোহ। রাধারাণী জানে তার দেহটি তুলে দিতে হবে পুরুষের ক্ষুধার কাছে; তার পিতামহ যে-দলিল ক’রে যায়, তা হচ্ছে পুরুষকে দেহদানের অনিবার্য নির্দেশ। তার জীবনের করুণ পরিহাস : ‘তাহার দেবোদ্দেশ্যে উৎসর্গিত মনঃপ্রাণ কোন এক ক্ষুদ্র মানব চরণে উৎসর্গ করিতে হইবে। শ্রীকৃষ্ণ সমর্পিত এ জীবন যৌবন নরভোগ্য করিয়া তবেই এ আশৈশবের আশ্রয় ক্রয় করা।’ কিন্তু তা সে চায় না, তার সাধ হয় : ‘এই ঐশ্বৰ্য্য সে জীর্ণ বস্ত্রখণ্ডের মত পরিত্যাগ করিবে সেও ভাল, তবু এ দেহ কাহাকেও দান করিতে পারিবে না।… কোথাকার কে একটা মানুষ! সে তাহার মালিক মোক্তার হইয়া বসিবে?’ অনুরূপা দেহের ওপর বেশ জোর দিয়েছেন, নারীদেহকে ‘নরভোগ্য’ হ’তে দেয়ার অর্থ ওই দেহকে দূষিত করা, এমন একটি মনোভাব তিনি জ্ঞাপন করেছেন।

বাণী বিয়ে করতে রাজি হয় এক শর্তে : যার সঙ্গে তার বিয়ে হবে, তার সঙ্গে সে একরাতও কাটাবে না। সে দেহ দিতে পারবে না পুরুষকে, দাসীত্ব করতে পারবে না পুরুষের; সে বলে, ‘এই জন্যই বিবাহে বিতৃষ্ণা হয়। সাধ করে কি বলি, বিবাহের নামই দাসীত্ব।’ তবে তার জীবনের ট্র্যাজেডি হচ্ছে নিজেকে সম্পদের মধ্যে রাখার জন্যে তাকে বিয়ে করতে হয় এমন একজনকে, যাকে সে একদিন বরখাস্ত করেছে মন্দিরের পুরোহিতের দায়িত্ব থেকে। তার নাম অম্বরনাথ। অম্বরনাথের অবশ্য নায়কোচিত সব গুণ রয়েছে, যদিও সে দরিদ্র। বাণীর সংকট দুটি, সে পুরুষবিরূপ, এবং অম্বরনাথের ওপর বিরূপ; তবু ‘তাহারই মন্দিরের অযোগ্য পুরোহিত বলিয়া এই সে দিন মাত্র সে তাহাকে অক্ষমতার জন্য তিরস্কার করিয়া বিদায় দিয়াছে,- সেই ব্যক্তিরই পায়ে ধরিয়া তাহার পিতা তাহাকে দান করিবেন?- আর এই দেব-চরণে উৎসর্গিত শরীর,- তৎকর্তৃক লাঞ্ছিত সেই ভিখারীকেই সমর্পণ করিতে হইবে? বাণী ভাবিল, এ কথা শুনিবার পূর্ব্বে সে মরিয়া গেল না কেন?’ বাণী যে কামশীতল, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই; বাণী যে পুরুষকে দেহদানের কথা বার বার ভেবেছে, ঘেন্না বোধ করেছে দেহ দিতে, এটা তার পুরুষের বিরুদ্ধে চরম বিদ্রোহ। ‘সে বড় নিশ্চিন্ত ছিল যে, মানুষকে কোনমতেই সে বিবাহ করিবে না’, এবং সারা উপন্যাসে সে পুরুষকে তার দেহ দেয় নি। এক সময় ঔপন্যাসিক হস্তক্ষেপ করেন, তিনি যে-দিকে বাণীকে নিয়ে যেতে চান সে-দিকে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন; মানুষ তাকে যাতে রাজি করাতে পারে নি, সেখানে প্রকৃতি হস্তক্ষেপ করে : ‘মহাপ্রকৃতি রাধা স্মিতমুখে তিরস্কার করিয়া কহিলেন, ‘পাপিষ্ঠা! প্রকৃতি স্বয়ং পুরুষের দাসী, তুই এমন কি যে, ঠাকুরালী হইয়া থাকিবি,–দাসী হইবি না?” অতিপ্রাকৃতের সহায়তায় অনুরূপা পিতৃতন্ত্রে দীক্ষিত করতে থাকেন বাণীকে। কিন্তু বাণী তার দেহ রক্ষা করতে চায় পুরুষের কামকলুষ থেকে : ‘তখন অশুপরিপুত নেত্রে যুক্তপাণি বাণী দেবতার উদ্দেশ্যে কহিল, তুমি কি শুনিতেছ, আমি অন্য কাহাকেও স্বামী বলিয়া স্বীকার করিতে পারিব না? তুমি যদি আমার পণ না রাখ, আমি নিজেই রাখিব। যদি বিবাহ করিতেই হয়, করিব। কিন্তু এ দেহ প্রাণ যখন তোমায় দিয়াছি, তখন এ কেবল তোমারি থাকিবে।’ শরীরই তার অমূল্য সম্পদ : ‘তাহার এ শরীরটাও সে অন্যের নিকট বেচিতে পারিবে না।’ বাণী তার দেহশুচিতা রক্ষার যে-প্রয়াস চালিয়েছে, তা নারীর গভীর পুরুষবিরূপতার প্রকাশ।

কিন্তু পুরুষের সঙ্গে তাকে জড়িত হ’তে হয়, এবং বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সে দেখতে পায় নারীকে বন্দী করার কৌশল : ‘অম্বর যখন প্রথম দাঁড়াইয়াছিল, তখন-অম্বরের উত্তরীয়ে গাটছড়া বাঁধা-কাজেই বাণীকেও সেই সঙ্গে বাধ্য হইয়াই দাঁড়াইতে হয়। সে অমনি ঘোর বিরক্ত হইয়া ভাবিল,–এই ত প্রভুত্ব আরম্ভ হইয়া গেল দেখিতেছি!– উনি দাঁড়াইলে দাঁড়াইতে হইবে, চলিলে চলিতে হইবে। আমায় যেন কিনিয়া ফেলিয়াছেন।’ অম্বরনাথ তার অযোগ্য, তাকে সে বিয়ে করেছে সম্পত্তি রক্ষার জন্যে; মহৎ অম্বরনাথও স্বামীর অধিকার দাবি না ক’রে রাজি হয়েছে তাকে উদ্ধার করতে; তবু বাণীর ‘মনে হইতে লাগিল, আজ এ গৃহের সম্রাজ্ঞী সে হইলেও এ ব্যক্তি তাহার প্রভু। তাহার উপর যেন ইহার একটা দখলী স্বত্ব জন্মিয়া গিয়াছে।’ তার মনে জাগে হিন্দু নারীর মহাপ্রশ্ন : ‘হিন্দুর সব ভাল, কেবল এইটিই বড় মন্দ। বিবাহ করিতে হইবে। কেন,–এমন কঠোর নিয়ম, কেন? মেয়ে হইয়া জন্মিয়াছি বলিয়া এতই কি মহাপাতক করিয়াছি…যিনি আমারই অন্নে প্রতিপালিত হইবেন, তিনিই হইবেন, আমার প্রভু?’ যে-বিয়েকে এতো ঘেন্না করে নারী, তাতেই বসতে হয় তাকে। বিয়ের পর বাণী মিলিত হয় নি স্বামীর সাথে, তার স্বামী দেবতার অধিক মহত্ত্ব দেখিয়ে দূরে চ’লে গেছে। তবে অনুরূপা দেবী এর পর বাণী ও নিজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ক’রে বাণীকে দীক্ষিত করতে থাকেন পিতৃতন্ত্রের বিধিবিধানে, স্বামীকে ক’রে তুলতে থাকেন দেবতা। তিনি ছক ভেঙেছেন শুধু ছকটিকে আরো শক্ত ক’রে নির্মাণ করার জন্যে। তিনি বাণীর মধ্যে ঢোকাতে থাকেন বেদমন্ত্র, তাকে ক’রে তুলতে থাকেন মহাসতী : ‘বাণী গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করিল। হিন্দুর মেয়ে যে স্বামীর সহিত হাসিমুখে কেমন করিয়া জ্বলন্ত চিতায় পুড়িয়া বিচ্ছেদের শান্তি করিত আজ তাহা বুঝিলাম। এ যে কি অচ্ছেদ্য বন্ধন!…সেই যে কালমন্ত্র…সেই অনুজ্ঞার সম্মোহনবিদ্যা প্রভাবে লুপ্তচৈতন্যবৎ হইয়া পত্নী সেই দিনই পতির হৃদয়ে হৃদয়, চিন্তায় বাক্যে চিন্তা বাক্য সমস্তই সঁপিয়া দেয়; তাহার আর স্বাতন্ত্র্য কিছুই বাকি থাকে না।’ অনুরূপা বাণীর কানে বাজাতে থাকেন পিতৃতন্ত্রের গীতিকা : ‘তাহার কানের কাছে সেই মুহূর্ত্তে যেন বাজিয়া উঠিল, “স্ত্রীলোকের স্বামী ভিন্ন অন্য সুখ নাই, অন্য কামনা নাই, এমন কি, অন্য দেবতাও নাই।”-সে ঈষৎ শিহরিয়া উঠিল। এ কি মার কথা-না দেবতার আদেশ?’ এটা আসলে পিতৃতন্ত্রে দীক্ষিত অনুরূপার চক্রান্ত।

অনুরূপা বেদমন্ত্র দিয়ে বাণীকে পুরুষপুজোয় আগ্রহী ক’রে তোলেন : “যদি প্রতিমায় তাহার পূজা করি, তবে মানুষের মধ্যেই বা না করি কেন?’ লেখিকা বাণীকে ক্রমশ দীক্ষিত করতে থাকেন পিতৃতান্ত্রিক বিধানে, আলোর নামে তাকে ঠেলে দিতে থাকেন অন্ধকারে : ‘এইরূপে তাহার জীবনে একসঙ্গে দুইটী আলো জ্বলিয়া উঠিতেছিল,– নারীজীবনের সারধর্ম পতিপ্রেম, অপরটী সকল প্রেমের সার ভগবৎপ্রেম।’ বাণীর মধ্যে তিনি জাগিয়ে তোলেন ছকবাঁধা এক নারীকে : ‘স্বামী স্ত্রীর গুরু কেন, আজ তাহা বুঝিতেছি। আর কে আমায় এমন করিয়া এ শিক্ষা দিতে পারিত?’ অনুরূপা কাজ করেছেন পুরুষতন্ত্রের চর হিশেবে; তিনি নারীকে প্রথম নিজের অধিকার দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে পরে বেঁধেছেন শেকলে, বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন নিজের লিঙ্গের সাথে। তাঁর চক্রান্তে বাণী হয়ে ওঠে পুরুষের প্রিয় ছকবাঁধা নারী : ‘সেই ভস্মমুষ্টি পরে পতিপ্রেমের অমৃতাভিষেকে এবং নির্ব্বাসিত অম্বরের মন্ত্রশক্তি তেজে তপঃপূত-চরিত্রা, ব্রহ্মচারিণী, স্নেহ প্রেম করুণার জীবন্ত মূর্ত্তি এক সতী নারীর প্রতিষ্ঠা করিল।’ বাণী সমগ্র নারীজাতিকে নিয়ে আত্মসমর্পণ করে স্বামী ও পিতৃতন্ত্রের পায়ে : “হ্যাঁ, তোমার বাণী, তোমারই স্ত্রী, তোমারই দাসী, তোমারই সহধর্মিনী।…আমি তোমায় অনেক কষ্ট দিয়েছি, তবু আমি তোমার স্ত্রী, তোমার শিষ্যা-তোমার দাসী। আমায় ক্ষমা করিবে না কি?”“ যে-বাণী স্বামীর দেহও কখনো ছোঁয় নি, সে মৃত্যুর হাত থেকে স্বামীকে ফিরিয়ে আনার জন্যে অবতীর্ণ হয় সতীরূপে : ‘এ নূতন জন্মে মৃত্যুর কাছে তোমায় ভিক্ষা করে ফিরিয়ে নিয়ে তোমায় আমি আমার করব। পারব না? কেন পারব না? সাবিত্রী তার মৃত স্বামীকে বাঁচিয়েছিলেন,-আর আমি পারব না?-কেন, আমি কি সতী স্ত্রী নই?’ বেদমন্ত্রদীক্ষিত এ-আধুনিক সতী তার স্বামীকে মৃত্যুর কবল থেকে ফিরিয়ে আনার জন্যে প্রয়োগ করে এ-পদ্ধতি : ‘তাহার মনের মধ্যে কোথা হইতে এ প্ৰতীতি

সুদৃঢ় হইয়া উঠিল, যে তাহা হইলেই সে তাহার এই মৃত-কল্প স্বামীকে বাঁচাইয়া তুলিতে পারিবে। তাহার শোণিতোষ্ণতাহীন নীল শিরার উপর সে নিজের উষ্ণশোণিত প্রবাহিত ধমনী একাগ্রচিত্তে স্থাপন করিয়া রাখিয়াছিল, যেন সেই সঙ্গে কোন্ অদৃশ্য শক্তিবলে সে আপনার শরীর হইতে তপ্ত শোণিত ধারা তাঁহার অঙ্গে সঞ্চালিত করিয়া দিতেছে,…সমস্ত ইন্দ্রিয়দ্বার এক সঙ্গে রুদ্ধ হইয়া গিয়াছিল। কেবল সেই সৰ্ব্বসমাহিত সতী চিত্তের সমুদয় শক্তিকে উদ্বুদ্ধ করিয়া সে তাহার মৃতবৎ স্থির স্বামীর দেহে আপনার জীবন হইতে জীবনী-ধারা ঢালিয়া দিতে চাহিতেছিল।’ বেদমন্ত্র চিকিৎসাপদ্ধতিতে সে সফল হয়েছে কিনা অনুরূপা দেবী তা বলেন নি, তবে তিনি সফলভাবে একটি নারীকে বিন্যস্ত করেছেন পিতৃতন্ত্রের ছকে। নারীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ক’রে অনুরূপা অর্জন করেছিলেন জনপ্রিয়তা।

নিরুপমা দেবীর দিদি (১৯১৫) চেতনায় ও কাঠামোয় অনুরূপার মন্ত্রশক্তির সাথে অভিন্ন; এতেও প্রচার করা হয়েছে পিতৃতন্ত্রের বিধান। অনুরূপা ও নিরুপমা, দুজনেই, ব্যবহার করেছেন একই ছক : মন্ত্রশক্তিতে বাণী সারা উপন্যাস জুড়ে নিজের দেহ রক্ষা করেছে স্বামীর কবল থেকে, শেষে আত্মসমর্পণ করেছে মৃত স্বামীর পায়ে; দিদির সুরমাও স্বামীকে দেহ দেয় নি, কিন্তু উপন্যাসের শেষ পাতায় আশ্রয় নিয়েছে স্বামীর পায়ে। তাঁদের উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়গুলো নারীর জন্যে প্রলোভন, মাঝের অধ্যায়গুলো নারীর বিরুদ্ধে চক্রান্ত, আর শেষ পৃষ্ঠাগুলো বিশ্বাসঘাতকতা। কালিগঞ্জের জমিদারকন্যা সুরমা দাসীর বিয়ে হয় মাণিকগঞ্জের জমিদারপুত্র ডাক্তার অমরনাথের সাথে। তারা একটি বাসর রাত কাটিয়েছিলো পরস্পরকে না ছুঁয়ে– ‘যথারীতি পাকস্পর্শ ফুলশয্যা সমস্ত হইয়া গেল। অমরনাথ ফুলশয্যার দিন জড়সড়ভাবে কোন রকমে খাটের এক পার্শ্বে শুইয়া রাত কাটাইয়া দিল। তাহার লজ্জা করিতেছিল। কন্যাটি নিতান্ত ছেলেমানুষ নয়; তের-চৌদ্দ বৎসর বয়স হইতে পারে।’ পরে আকস্মিকভাবে অমরনাথ বিয়ে করে অনাথ চারুলতাকে। সুরমা এজন্যে স্বামীকে ক্ষমা করে নি; স্বামীকে ছেড়ে দেয়া সম্ভব হয় নি তার পক্ষে, তবে স্বামীকে সে গণ্য করেছে পরপুরুষ হিশেবেই। বিষবৃক্ষ-এ কুন্দকে আত্মহত্যা করতে হয়েছিলো, দিদি যেনো তার উত্তর; চারুলতাকে আত্মহত্যা করতে হয় নি, বরং সে-ই উপভোগ করে অমরনাথের স্ত্রীর ভূমিকা। সুরমা হয় তার দিদি। অমরনাথ ও সুরমা এক বাড়িতে থেকেও কখনো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে আসে নি। নারীদের উপন্যাসে একটি লক্ষণীয় ব্যাপার স্বামী-স্ত্রীর দূরত্ব, এ-উপন্যাসে তা চরম রূপ নিয়েছে।

অমরনাথ চারুলতাকে বিয়ে করার পর তার পিতা তাকে ত্যাগ করতে চেয়েছে, কিন্তু সে পুত্র, তাকে ত্যাগ করা অসম্ভব; বরং তার পিতা মৃত্যুর আগে পুত্রবধু সুরমাকে দেবীর বেদিতে বসিয়ে উৎসর্গ ক’রে যায় সুরমার জীবনটি : ‘মা, আমি একে তোমার হাতে দিয়া গেলাম। এ তোমার ছোট বোন। ছোট-বৌমা, তোমার দিদিকে প্রণাম কর। ইনি দেবী।’ সুরমা চরম ঘৃণায় মেনে নেয় দেবীর ছক, সে হয় এমন দেবী যে ঘৃণা করে স্বামীকে : ‘অমরকে যে তাচ্ছিল্য দেখাইয়া সে ফিরাইয়া দিতে পারিয়াছে, ইহা মনে করিয়া একটি বিজয়ানন্দে সুরমার হৃদয় পূর্ণ হইয়া উঠিল।’ নিঃশব্দ বিরোধই হয়ে ওঠে তাদের জীবন। এতে অবশ্য অমরনাথের জীবনে কোনো শূন্যতা দেখা দেয় নি, সে চারুলতাকে নিয়মিতভাবে গর্ভবতী করেছে; চরম শূন্যতায় দিদির দেবী মহিমার জ্বালার মধ্যে বাস করেছে সুরমা। দেহ তাকেও পীড়িত করেছে; কিন্তু তার কাজ সহ্য করা : ‘জীবনের প্রথম-যৌবনের আকুল বাসনার পুষ্পগুলি পরার্থপরতার দীপ্ত হোমানলে ভস্ম করিয়া ফেলিয়া তাহার হৃদয় কি একটুও বলিষ্ঠ হয় নাই? জীবনের স্নেহ, ভালবাসা, আশা, তৃষ্ণা এতগুলি জিনিস এক নিমেষে পান করিয়া তাহার মৃত্যুঞ্জয় কঠিন প্রাণ কি এখনও এত দুৰ্ব্বল? না, এ প্রাণকে সবল করিতেই হইবে।’ সে জানে, ‘তাহার জীবনের সমস্তটা একটা খরচেরই তালিকা- তাহার জমার ঘর একেবারে খালি।’ তার স্বামীও তাকে মনে করে আত্মোৎসর্গিত দেবী : ‘অমর ভাবিত, চারু-চারু-চারুই তাহার স্ত্রী,…সুরমার কাহারও সহিত বিবাহ হয় নাই, হইতে পারে না, কেন না পৃথিবীর কেহ কি সে? না। সে দেবী, শুধু স্নেহ দিবার জন্যই সে সংসারের সহিত আবদ্ধ।’ কিন্তু তার চোখে অমরনাথ ‘সপত্নীপ্রণয়ে অবিচারক স্বামী’। অমরনাথ এক সময় প্রলুব্ধ বোধ করে সুরমার প্রতি, সুরমা তা প্রত্যাখ্যান করে; কেননা ‘বলা কি যাইত না, “আজ তুমি আমায় যাহা দিতে আসিয়াছ, তাহা ইতিপূর্ব্বে কোথায় ছিল? আমার নবীন বাসনাময় তরুণ-যৌবনের প্রথম আগ্রহ যে অন্ধের মত চাহিয়া দেখে নাই বা দেখিতে ইচ্ছা করে নাই, সেই তুমি! সেই অবিচারক তুমি!…যাহা আমার নিকট হইতে কাড়িয়া লইয়া অন্যের চরণতলে উপহার দিয়াছিলে, তাহাই আবার আজ আমায় দিতে চাও?’ স্বামীর সাথে বাঙালি নারীর সম্পর্ক যে পারস্পরিক প্রতিপক্ষের, তা সুরমাও বোধ করে : ‘তাহাকে সুরমার এখন তাহার জীবনের সুখস্বর্গ হইতে ভ্রষ্টকারী দুরদৃষ্ট বলিয়া জীবনের সর্ব্ব জ্বালাযন্ত্রণার মূলীভূত রুষ্ট কুগ্রহ বলিয়া, জন্মের সুখদুঃখের নিয়ন্তা, জন্মকেন্দ্ৰস্থিত দুষ্ট নক্ষত্র বলিয়া মনে করিত।’ বাঙালি নারীর চোখে দেবতা হয়ে ওঠে দুষ্ট নক্ষত্র, একে যুগান্তর বলা যায়।

কিন্তু এ-সুরমাকে অবশেষে নিরুপমা বিন্যস্ত করেন পুরুষতন্ত্রের ছকে; চাপিয়ে দেয়া দেবীর ভূমিকা পালন ক’রে যে ক্লান্ত, যার জীবনে পুরুষের প্রয়োজন প্রায় কেটে গেছে, নিরুপমা বিশ্বাসঘাতকতা করেন তার সাথে, উদ্যোগ নেন তাকে অনিচ্ছায়-মেনে-নেয়া দেবীর আসন থেকে দাসীর আসনে বসানোর। তবে তিনি দাসীর গ্লানিকে অস্বীকার করেন নিঃ ‘একদিন একস্থানে একজনকে সে ‘না’ বলিয়া গিয়াছিল, সেইস্থানে সেই ব্যক্তিকে আর একবার বলিতে হইবে ‘হ্যাঁ’। বলিতে হইবে, নারী-জন্মের দোষ, ভাগ্যের দোষ, সর্ব্বোপরি বিধাতার দোষ। বলিতে হইবে, “হে দেব, তোমারই জয় হইয়াছে!– আর কেন- সৰ্ব্বস্ব আহুতি দিয়াছি, সব পুড়িয়া গিয়াছে, এখন এ হোমাগ্নি নিবাও।” প্রণাম করিয়া বলিতে হইবে, “ভস্ম তিলক ললাটে প্রসাদচিহ্ন-স্বরূপ নির্মাল্য-স্বরূপ দাও। তুমি তৃপ্ত হইয়াছ, এখন আমায় মুক্তি দাও।’ নারীজন্মের অপমান ও যন্ত্রণাকে নিরুপমা অস্বীকার করেন নি, তবে মেনে নিয়েছেন; তিনি যেনো জানেন জয় নারীর জন্যে নয় : ‘তাহার পরাজয় যেন তাহারা দিব্যচক্ষে দেখিয়াই বসিয়া আছে। এমনি নারী-জন্ম লইয়া সে আসিয়াছে! ধিক!’ সুরমা নিজের জীবন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর উপন্যাসের শেষে বিসর্জন দেয় তার অস্তিত্বকেও; বলে, ‘নারীর দর্প তেজ অভিমান কিছু নেই,…কেবল ভালবাসা, কেবল দাসীত্ব…।’ নিরুপমা সুরমাকে অবশেষে বসিয়েছেন পুরুষতন্ত্রের পদতলে : ‘সুরমা সহসা নতজানু হইয়া স্বামীর পাদমূলে বসিয়া পড়িল। দুই হস্তে অমরের পদযুগল জড়াইয়া ধরিয়া অজস্রবাষ্পবারিসিক্ত মুখ ঊর্দ্ধে তুলিয়া বলিল, “কেবল- এইটুকু, আর কিছু নয়। আমায় কোথায় যেতে বল? আমার স্থান কোথায়? আমি যাব না।”“ নিরুপমা তাঁর অপচয়িত দেবীকে পরিণত করেন অসহায় দাসীতে, জানিয়ে দেন যে নারীর মুক্তি নেই; নারীকে বন্দী থাকতেই হবে ছকে ও যন্ত্রণায়। নিজের লিঙ্গের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার এটা এক স্মরণীয় উদাহরণ।

নিরুপমা শ্যামলীতে (১৯১৮) নিয়েছেন শ্যামলী নামের এক ‘কালা বোবা পাগলী’কে, কাব্যিক নামটি ছাড়া আর সবই যার শোচনীয়। তাঁর নায়িকা যে কালা বোবা পাগলী, এটা তাৎপর্যপূর্ণ। নিরুপমা হয়তো এমন একটি নায়িকা বেছে নিয়েছিলেন চরম ভাবাবেগ উৎপাদনের জন্যে, কিন্তু এটাকে আমার মনে হয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ : নারীমাত্রই, পুরুষতন্ত্রের কাছে, কালা বোবা পাগলী; তারা যতোই শুনতে বলতে চিন্তা করতে পারুক। পুরুষতন্ত্র সব নারীকেই কালা বোবা পাগলী ক’রে রেখেছে। শ্যামলী কালা বোবা পাগলী, তবে তাকে কেন্দ্র ক’রেই আবর্তিত হয়েছে সব কিছু। শ্যামলী নারীর চরম দুর্দশার রূপ, তবে নিরুপমা তাকে দিয়েছেন এমন একটি স্বামী, যে তাকে মানুষের জীবন দিয়েছে। পুরুষের ওপর দিয়েছেন তিনি কালা বোবা পাগলীকে অর্থাৎ নারীকে মানুষ ক’রে তোলার ভার। এ-কাহিনী বাস্তবের নয়, ইচ্ছাপূরণের; সব নারীই যদি পেতো এমন পুরুষ, তাহলে তাদের জীবন মানুষের জীবন হয়ে উঠতো। শ্যামলী নারী, তার জীবন নিষ্ফল হওয়ার জন্যে এ-ই যথেষ্ট, তার ওপর সে কালা বোবা পাগলী; অন্যরা ও নিরুপমা তাকে বার বার ‘জন্তু’, ‘জানোয়ার’ ব’লেই নির্দেশ করেছেন। সমস্ত নারীর মতো বিয়েই তার প্রধান সংকট। তার বিয়ের কোনো সম্ভাবনা ছিলো না; কিন্তু তার পিতার এক উন্মত্ততায় তার বিয়ে হয়ে যায় তারই ছোটোবোনোর বর অনিলের সাথে। শ্যামলী নিজের জন্যে যতোটা সমস্যা, তার চেয়ে বড়ো সমস্যা পিতার জন্যে : ‘কিন্তু কালা বোবা এবং পাগল এই ত্রিবিশেষণ-বিশিষ্টা কন্যাকে নামে মাত্র সম্প্রদানের জন্য ও স্বজাতি এবং সমকুলস্থ এমন কোন পাত্রই তিনি তখন খুঁজিয়া পাইলেন না যে তাঁহাকে জাতিচ্যুতি হইতে রক্ষা করে।’ তাই পিতা এক অদ্ভুত উন্মাদের কাজ করে; তার ভাষায়, ‘আমি সমাজের এই অত্যাচার থেকে বাঁচবার জন্যই এই অভাগা জীবটাকে একবার গোটাকতক মন্ত্র পড়িয়ে বিজলীর বিয়ের আগে সম্প্রদান করে নিলাম মাত্র।’ শ্যামলী তার বাবার চোখেও ‘একটি জানোয়ার মাত্র’। নিজেকে বাঁচানোর জন্যে সে মন্ত্র পড়িয়ে নেয়, তবে মেয়েকে বাঁচানোর কোনো আগ্রহ তার নেই; সে অনিলকে বলে, ‘এখন এ ঘটনা তুমি মন থেকে শীগিরই মুছে ফেলো, ভাল মেয়ে দেখে বিয়ে কোরো-সুখী হয়ো, এই আমার তোমায় আন্তরিক আশীর্ব্বাদ।’ অনিল আদর্শবাদী পুরুষ; সে শ্যামলীর ছোটো বোন বিজলীকে আর বিয়ে করতে রাজি হয় নি, বরং তখনি বিজলীর বিয়ের ব্যবস্থা করেছে বন্ধু শিশিরের সাথে। এরপর নিরুপমা দীর্ঘ কাহিনী ব’লে একটি আদর্শবাদী স্বামীকে দিয়ে শ্যামলীকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন জীবনে। নিরুপমা নারীকে প্রথাগত ছক অনুসারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সাথে সাথে প্রকাশ করেছেন নারীর বেদনা। অনিল তাকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে আসার পর শ্যামলীর অব্যক্ত আর্তনাদে প্রকাশ পায় সব নারীর যন্ত্রণা : ‘মাগো-কোথায় তুমি! এ আমি কোথায় আসিলাম মা?…এখানে যে আমি আর একদণ্ডও বাঁচিতে পারিতেছি না।’ পৃথিবীতে পা দিয়ে প্রতিটি নারীই এমনভাবে চিৎকার ক’রে উঠতে পারে।

শ্যামলীর ভাগ্য ভালো সে অনিলের মতো দেবতার পায়ে পড়েছে। অনিল আর বিয়ে করতে রাজি হয় নি, এটা তার মহত্ত্ব; তবে শ্যামলীর কি রয়েছে আবার বিয়ের অধিকার? অনিলের মনে নিরুপমা যে-প্রশ্ন জাগিয়ে দিয়েছেন, সেটি আসলে নারীর প্রশ্ন : ‘সমাজ পুরুষের দ্বিতীয়বার বিবাহ স্বচ্ছন্দে অনুমোদন করিবে আর স্ত্রীলোকের পক্ষে তাহা খাঁটিবে না, সেই জন্যই কি এ ব্যবস্থা? এই অর্দ্ধমনুষ্য প্রাণীটির পক্ষেও কি এই নিয়ম! অনিলের যদি এ বিবাহ অসিদ্ধ হয়, তাহারই বা কেন না হইবে? তাহাকে আর কেহ বিবাহও করিবে না এবং যাহার সহিত বিবাহ হইল তাহারও গ্রহণযোগ্য সে হইবে না? তবু অনিলকে মনে মনে স্বামী বলিয়া তাহাকে চিরদিন জানিতে হইবে। তাহার বিবাহের সম্ভাবনা না থাকিলেও অন্য ভয়ের সম্ভাবনা যথেষ্ট আছে, সেইজন্যই তাহার জানিতে হইবে তাহার বিবাহ হইয়াছে, তাহার স্বামী আছে, অমুক তাহার স্বামী!’ অনিলের বন্ধু ব্যক্ত করেছে পুরুষতন্ত্রের সিদ্ধান্ত : ‘তুমিও জান এবং আমিও জানি যে স্ত্রীপুরুষের এ সাম্যবাদের নীতি বহু দেশে বহু তর্কের সঙ্গে চললেও সমত্ব কখনই মানুষে তাদের দিতে পারবে না। কিসে পারবে- প্রকৃতিই যে তাদের দুর্ব্বল করে রেখেছে।… হাজার শিক্ষা দাও, সুবিধা দাও, স্বাধীনতা দাও, ভগবান তাদের নীড় বাঁধবার জন্যেই তৈরী করেছেন; তর্ক মীমাংসা শ্রুতি স্মৃতি ঘাঁটবার জন্যে বা যুদ্ধ করবার জন্যে নয়।… সাধারণতঃ নারীদের ভগবান স্নেহদুর্ব্বল স্বভাবদুর্ব্বল করে যে সৃষ্টি করেছেন।…গৃহের মেরুদণ্ড স্বরূপেই ভগবান স্ত্রীজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। তাঁরা শিক্ষাদীক্ষা বা অন্যান্য সব অধিকারে পুরুষের তুল্য হোন ক্ষতি নেই, কিন্তু তাঁরা এই গৃহকে না অতিক্রম করেন, তাঁদের নারীত্ব না ভুলে যান! তা হলেই ধৰ্ম্মনাশ হবে!’ নিরুপমা প্রথাগত, তবে তিনিও পুরুষতান্ত্রিক এ-বক্তৃতায় বিশ্বাস করেন না।

অনিল আদর্শবাদী হ’লেও নিরুপমা একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটিয়েই শুধু অনিলকে দিয়ে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করিয়েছেন শ্যামলীকে। অনিলকে তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত ক’রে কুৎসিত পুরুষে রূপান্তরিত করেন। যখন সে সুদর্শন ছিলো, যোগ্য ছিলো যে-কোনো রূপসী তরুণীর স্বামী হওয়ার, তখন সে তার আদর্শবাদ সত্ত্বেও নির্দ্বিধায় শ্যামলীকে স্ত্রী হিশেবে গ্রহণ করতে পারে নি, পেরেছে বসন্তে বিকৃত হয়ে যাওয়ার পর। একটি বিকৃত কুদর্শন পুরুষ একটি ‘অৰ্দ্ধর্মনুষ্য’, ‘অসম্পূর্ণ জীব’কে স্ত্রী হিশেবে নিতে পারে, এটা সমাজের কাছে স্বস্তিকর; একটি যোগ্য পুরুষ গ্রহণ করবে একটি অযোগ্য নারীকে, এটা স্বস্তিকর নয়। সে জন্তুর সমতুল্য হ’লেও মাঝে মাঝে দেখা যায় তার ‘কেমন এক রকম দৃষ্টি,-মুখের ও সারা অঙ্গের বিদ্রোহসূচক ভাব!’ অনিল তাকে মূক-বধিরদের শেখানোর রীতিতে শিক্ষা দিতে থাকে, জাগিয়ে তুলতে থাকে তার ‘প্রকৃত নারীত্ব’। তার নারীত্ব জেগে ওঠে ঈর্ষার মধ্য দিয়ে : ‘এই অৰ্দ্ধমনুষ্য জীবটি, যাহাকে এতদিন উন্মাদ জড় বলিয়াই সকলে জানিত, অনিলও যাহাকে এতদিন পূর্ণ নারী বলিয়া অনুভব করিতে পারে নাই, যাহার বুদ্ধি স্নেহ ভালবাসা রাগ বা দুঃখ সমস্ত একেবারে এতদিন বালকের মতই ছিল, সেই শ্যামলীতে নারীত্বের এই নিকৃষ্ট অংশটি সহসা এমনই ভাবে কি ফুটিতে পারে? সে হিংসা করিতেছে?’ নিরুপমা প্রশ্ন করেছেন : ‘এই ঈর্ষা, নারীত্বের এই রহস্য, এ যে বিধাতারই নিজহস্তে দত্ত নারী-জীবনের অভিশাপ!– ইহা হইতে কোন্ নারী মুক্ত?’ বিধাতা যে-শ্যামলীকে জন্তু হিশেবে সৃষ্টি করেছিলো, অনিল, এক পুরুষ, তাকে পুনরায় সৃষ্টি করে মানবী ও দেবীরূপে : ‘সেই জড়বুদ্ধিসম্পন্না অৰ্দ্ধোন্মাদ শ্যামলীতে প্রথমে মানবীত্ব আনিয়া পরে ক্রমশঃ তাহতে আজিকার এই দেবীত্বের স্ফুরণ ইহাও অনিলের জীবন-ঢালা ব্রতেরই ফল বলিয়া রেবার মনে হইল।’ শ্যামলীতে একটি জন্তুকে উন্নীত করা হয়েছে ছকবাঁধা নারীর স্তরে, এতে ভূমিকা পালন করেছে একটি পুরুষ; পুরুষই হয়ে উঠেছে নারীর স্রষ্টা।

শান্তা দেবীর জীবনদোলা (?১৯৩৮) সচেতনভাবে লেখা হয়েছে নারীমুক্তির বাণী প্রচারের জন্যে, তবে তিনি বিধবার বিয়ের অধিকারকেই গণ্য করেছেন মুক্তি ব’লে। উপন্যাসটি আট বছর বয়সে বিবাহিত বালবিধবা গৌরীর উপাখ্যান। দু-খণ্ডে তিনি কাহিনী বলেছেন : প্রথম খণ্ডে দিয়েছেন বালিকা গৌরীর বিধবাজীবনের দুর্দশার বিবরণ, এবং দ্বিতীয় খণ্ডে বর্ণনা করেছেন ওই জীবন থেকে মুক্তির কাহিনী। প্রথম খণ্ডটির কোনো কোনো অংশ মর্মস্পর্শী, তবে দ্বিতীয় খণ্ডে তিনি গৌরীকে মুক্ত করার জন্যে যে-কাহিনী তৈরি করেছেন, তা আবেদন জাগায় না। রচনা হিশেবে আলোচিত ছটি উপন্যাসের মধ্যে জীবনদোলাই সবচেয়ে দুর্বল। শান্তা দেবী জীবন উপস্থাপনের থেকে প্রচারে বেশি মন দিয়েছেন ব’লে লক্ষ্য অর্জনেও তিনি সফল হন নি; তবে তাঁর কৃতিত্ব হচ্ছে তিনি নারীকে মুক্ত ক’রে ছক থেকে বের ক’রে আনতে চেয়েছেন। শুরু থেকেই তিনি বিয়ে ও পুরুষবিরোধী মনোভাব প্রচার করেছেন; তাঁর অবোধ বালিকা গৌরী বলে, ‘ছাই বর! আমাকে মার কাছ থেকে আবার নিয়ে যাবে!… আমি ধুতি পর্ব, চুল কেটে ফে; মেয়েমানুষ হব না। আমি ঘরে-ঘরে বিয়ে করব।’ গৌরী যেনো প্রতিশোধ নিতে চায় পুরুষের ওপর। বিয়ের পর গৌরী একবার শ্বশুর বাড়ি গিয়েছিলো : ‘একরাত্রি নয় আট রাত্রি এই অজানা পুরীতে ভয়ে শোকে দুঃখে অনিদ্রায় অৰ্দ্ধনিদ্রায় মাতৃক্রোেড়চ্যুতা গৌরীর প্রাণ কাঁদিয়াছিল’, ফেরার পর দু-বছরেও তার ‘মন হইতে শ্বশুরবাড়ীর সে বিভীষিকার ছবি’ মোছে নি। গৌরীর ভাগ্য সে ‘বাড়ীর বড় আদরের মেয়ে’। তার বাবা ‘আট বছরের মেয়েটাকে দান করে পুণ্য সঞ্চয়’ করতে গিয়েছিলো; তার জন্যে যা পুণ্য গৌরীর জন্যে তা হয়ে ওঠে বিনাশ। তার শ্বশুরবাড়ি খবর যায় যে ‘বিধবা মেয়েকে হরিকেশব সধবা বেশে ত রাখিয়াছেনই তাহার বৈধব্যের খবর পর্যন্ত তাহাকে জানিতে দেন নাই।’ এটা গৌরীর শ্বশুরবাড়িতে উত্তেজনা সৃষ্টি করে; এক আশ্রিতা বিধবা ব’লেই বসে, ‘তোমার বেয়াই মেয়েকে কলমা পড়াবে, নিকে দেবে।’ নারীর বিরুদ্ধে নারীও কাজ করতে পারে নিপুণ ও নিষ্ঠুরভাবে। গৌরীর বাবা পুরুষ, তবে মানুষ; তাই মেয়ের জীবনকে কিছুটা স্বস্তিকর ক’রে তোলার জন্যে তিনি মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তীর্থভ্রমণে। তার বাবা জানে, ‘তারা [পুত্ররা] যে পুরুষ। সংসারে তারা লড়তে জন্মেছে, সংসার তাদের লডুবার অধিকারও দিয়েছে। আর এ অসহায় শিশু বালিকা; মেয়ে হ’য়ে জন্মানোই এদেশে তার এক পরম দুর্ভাগ্য, তার উপর নূতন একটা দুর্ভাগ্যের বোঝা আজীবনের জন্য তার কচি মাথার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ গৌরী অবশ্য জানে না সে বিধবা, সে বোঝে না বিধবা কাকে বলে; তবে পিতৃতন্ত্র তাকে এর মাঝেই বিধবার শাস্তি দেয়ার জন্যে ব্যগ্র হয়ে পড়েছে। শান্তা দেবী গৌরীর বাবামার মনে প্রশ্ন জাগিয়ে দিয়েছেন : ‘সেই তরুণ শৈশবের দেখা অপরিচিতপ্রায় একটি বালকের তিরোধানে তাহার জীবনমুকুল সমাজের চক্ষে চির-অভিশপ্ত হইয়া গিয়াছে?…কিন্তু অচেনা মানুষের অজানা মৃত্যুতে শিশুকেও যে চির-সন্ন্যাসের বোঝা বহিয়া অপমান ও লাঞ্ছনায় আজীবন কৃত্রিম শোকের অভিনয় করিয়া যাইতে হয়, তাহাকেই ধৰ্ম্ম বলিয়া মানিতে হয়, সে-কথা তাঁহার এই আদরিণী অভিমানিনী বালিকা কন্যাকে তিনি কি করিয়া বুঝাইবেন?’ গৌরী যখন জানতে পায় যে সে বিধবা, তখন তার অবস্থা : ‘বাঙ্গালীর মেয়ে সে আপনার বঞ্চিত জীবনের কথা যতটুকু বুঝিল তাহাতেই নিরানন্দের ম্লান ছায়ায় তাহার ফুলের মত মুখখানি অন্ধকার হইয়া গেল। অজানা সেই মানুষের মৃত্যু তাহার কাছে যতই অর্থহীন হোক পৃথিবীর কাছে তাহার বহু অধিকার যে সেই মানুষটিই হরণ করিয়া লইয়া গিয়াছে হিন্দুর মেয়ের মনে সেকথা ধরা পড়িলই।’ শান্তা দেবী চিরস্বামীত্বের ধারণাটিকে স্পষ্টভাবেই বাদ দিয়েছেন। এমনকি গৌরীর প্রথাগত মায়ের মনেও হিন্দুবিবাহের বিধান সম্পর্কে সন্দেহ জাগিয়ে তুলেছেন : ‘তরঙ্গিনীর স্বামীর কথা মনে পড়িল, “আবার যদি ওর বিয়ে হয়।” এমন পাপ কথা মনে আনিতে তাঁহার যতখানি ঘৃণা যতখানি লজ্জা হওয়া উচিত ছিল, তিনি আশ্চর্য্য হইয়া দেখিলেন কই সে লজ্জা, সে ঘৃণা ত তাঁহার মনে আসিল না।’ শান্তা দেবী পুত্র ও কন্যার জীবনের দুই মেরুরূপের চিত্রও এঁকেছেন : ‘এই ত্যাগ সমাজ তাহার নিকট জোর করিয়া আজীবন নিষ্ঠুর মহাজনের মত আদায় করিবে; তাহার পাঁচ ভাই যখন পিতার ঐশ্বর্য্যে ভোগ বিলাসে মাতিয়া থাকিবে তখন এই সকলের ছোট বোনটি বঞ্চিত জীবনের বোঝা বহিয়া বিস্মৃত স্বামীর প্রতি প্রেম ও ভক্তি নিবেদন করিবে।’ গৌরী বোঝে না যে সে বিধবা, কিন্তু তার মুখে শান্তা এমন কথা দিয়েছেন, যেমন, ‘আমার মেয়েকে আমি কখনো বিয়ে দেব না। বাবা, শেষকালে যদি বিধবা হ’য়ে যায়’ বা ‘বিধবা হ’তে আমার ভাল লাগে না। কেন মা, আমি বাইরের লোকের জন্যে বিধবা হব?’, যা তুলে ধরেছে পিতৃতান্ত্রিক বিধানের নিষ্ঠুরতা। শান্তা গৌরীকে আত্মোৎসর্গিত বিধবার ছকের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্যে তার মনে জাগিয়ে দিয়েছেন মুক্তির অভিলাষ : ‘গৌরী ঠিক করিল এমন করিয়া পুতুলের মত দিন সে কাটিতে দিবে না। যেমন করিয়াই হউক একটা পথ তাহাকে করিতে হইবে।… তাহাকে মুক্ত হইতে হইবে।’ দ্বিতীয় বা মুক্তিখণ্ডে শান্তা প্রচুর পরিশ্রম করেছেন গৌরীর মুক্তির গল্প বানাতে : তৈরি করেছেন তিনটি স্বদেশী যুবক, প্রতিষ্ঠা করেছেন হৈমবতীর কন্যাশ্রম, সেখানে বহু দুর্গত তরুণীর সাথে রেখেছেন গৌরীকে, এবং তরুণতরুণীদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন প্রেমাবেগ। নারীকে মুক্ত করার জন্যে পরিশেষে দিয়েছেন দুটি প্লটবাঁধা যুগ্ম বিয়ে : বিধবা গৌরীকে বিয়ে দিয়েছেন সঞ্জয়ের সাথে, আর সঞ্জয়ের পিতার অবৈধ কন্যা চঞ্চলাকে বিয়ে দিয়েছেন গৌরীর ভাই শঙ্করের সাথে। ভাইয়েরা উদ্ধার করেছে পরস্পরের বোনদের। তিনি ছক ভেঙেছেন, নতুন ভাবমূর্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন; কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন উপন্যাস লিখতে এবং নারীর সপক্ষে গভীর আবেদন সৃষ্টি করতে।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x