সিনেমায়, যাত্রায়, নাটকে, গল্পে-উপন্যাসে যখনই দেশ প্রেমের প্রসঙ্গ এসেছে, সাধারণ মানুষের মগজ ধোলাই করতে বার বার বোঝান হয়েছে, দেশ মানে ‘ধরতি’, ‘দেশের মাটি’ ‘দেশের নদী-পাহার’। দেশের মাটিকেই এক খাবলা তুলে নিয়ে শপথ নিচ্ছে দেশপ্রেমিকরা এবং তার জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিয়ে দিচ্ছে।

বার বার প্রচারে যে কথাটা আমাদের মাথায় ঢোকানো হয়েছে এবং হচ্ছে, তা তো বাস্তব সত্য নয়। ‘দেশপ্রেম’ মানে কখনোই দেশে মাটিকে ভালোবাসা হতে পারে না।

দেশপ্রেম মানে ‘দেশবাসীর প্রতি প্রেম’। কিন্তু তামাম দেশবাসীকে তো এক সঙ্গে প্রেম বিলোন যায় না। হুজুরের দলকে বিলোলে মজুরের দলকে অপ্রেম বিলোতে হয়, আর মজুরের দলকে প্রেম বিলোন মানেই হুজুরের দলকে অপ্রেম।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘আত্মপরিচয়’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, “দেশ মানুষের সৃষ্টি। দেশ মৃন্ময় নয়, সে চিন্ময়। মানুষ যদি প্রকাশমান হয় তবে দেশ প্রকাশিত। সুজলা সুফলা মলয়জশীতলা ভূমির কথা যতই উচ্চকন্ঠে রটান ততই জবাবদিহির দায় বাড়বে, প্রশ্ন উঠবে প্রাকৃতিক দেশ তো উপাদান মাত্র, তা নিয়ে মানবিক সম্পদ কতটা গড়ে তোলা হল। মানুষের হাতে দেশের জল যদি শুকিয়ে যায়, ফল যদি যায় মরে, মলয়জ যদি বিষিয়ে ওঠে মারীবীজে, শস্যের জমি যদি হয় বন্ধ্যা, তবে কাব্য কথায় দেশের লজ্জা চাপা পড়বে না। দেশ মাটিতে তৈরি নয়, দেশ মানুষে তৈরি।”

এক শতাব্দী আগে রবীন্দ্রনাথ যে পরম সত্যটি অনুভব করেছিলেন, উপলব্ধি করেছিলেন, সেই উপলব্ধি ও অনুভবে এখনও যদি বুদ্ধিজীবীরা পৌঁছতে না পেরে থাকেন, তবে এইসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের হয় নির্বোধ অথবা অতি বুদ্ধিজীবী অর্থাৎ ‘ধান্দাবাজ’ বলতে হয়।

আজ দেশপ্রেম বলতে দেশের মাটিকে দেশের ভূখন্ডের চৌহদ্দিকে চিহ্নিত করাটাই প্রচলিত সংস্কার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই দেশপ্রেমের প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করে যখন কোনও মানবগোষ্ঠি হুজুরের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তাদের শোষণের থাবা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তখন মগজ ধোলাইয়ের কল্যাণে অমনি চারদিক থেকে নিপীরিত মানুষগুলোই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের সুরে সুর মিলিয়ে ‘গেল গেল’ রব তুলে ছুটে আসে, এবং যা নয় তাই বলে গাল পাড়তে থাকে। এরপর ওইসব আন্দোলনকারীদের ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে পারলে কাজ অর্ধেক হাসিল। আমাদের সমাজে প্রকৃত দেশপ্রেমের কোনও ঐতিহ্য নেই, আর সেই ঐতিহ্য যাতে গড়ে উঠতে না পারে সেজন্য তথাকথিত দেশপ্রেমীরা সদা-সতর্ক, সদা-তৎপর। এ-দেশের ঐতিহ্যে দেশপ্রেমিক বলতে চিত্রিত রাণাপ্রতাপ, শিবাজী থেকে শুরু করে ঝান্সির রাণী, বারো ভুঁইয়ার মত ভিড় করে আসা বহু চরিত্র। এঁদের ব্যক্তিস্বার্থের দ্বন্দ্বকেই বিকৃত ভাবে আমাদের সামনে বার বার হাজির করা হয়েছে ও হচ্ছে দেশপ্রেমের নিদর্শন হিসেবে। ধনীকশ্রেণীর অর্থপুষ্ট, ধনীক শ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী রাজনীতিকদেরই ‘ভারতরত্ন’ বলে ভূষিত করার ঐতিহ্যই আমরা বহন করে চলেছি। হুজুরের প্রতি প্রেমময় এইসব ভারতরত্নরা যদি দেশপ্রেমিক হন, তাহলে দেশদ্রোহী কারা? এই ঐতিহ্য অনুসারী হিসবে আমরা তাই নিপীড়িতদের স্বার্থরক্ষাকারীদেরই ‘দেশদ্রোহী’ বলে চিহ্নিত করেই চলেছি।

‘দেশ মাটিতে তৈরি নয়, দেশ মানুষে তৈরি’ -এই সত্যকে মাথায় রেখেই আমাদের ‘দেশপ্রেমী’ও ‘দেশদ্রোহী’ শব্দগুলোর সংজ্ঞা খুঁজতে হবে।

 

বিচ্ছিন্নতাবাদ নিয়ে গোলপাকান চিন্তা

‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ শব্দটির সঙ্গে এখন আমরা বড় বেশি রকম ভাবেই পরিচিত হয়ে উঠেছি ব্যাপক ও লাগাতার প্রচারের দৌলতে। আমরা অনেকেই এই প্রচারের আবর্তে প্রভাবিত হয়ে ভাবতে শুরু করেছি ‘বিচ্ছিন্নতা’ এক ধরনের নৈরাশ্যতাড়িত অভিব্যক্তি। ‘বিচ্ছিন্নতা’র এই নেতিবাচক আবেদন আমাদের চিন্তাকে প্রভাবিত করায় আমরা ‘বিচ্ছিন্নতা’ বা ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ শব্দগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে অবচেতন ও সচেতন ভাবে কিছুটা বিরক্ত ও বিরূপ হয়ে উঠি। সরকার যে ‘জনগোষ্ঠি’ বা আন্দোলনকারীদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বলে ঘোষণা করে, তাদের সম্বন্ধেও আমরা যথেষ্ট বিরূপ ধারণা পোষণ করতে শুরু করি। আমরা ভাবতে থাকি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আমাদের দেশ-মাতৃকার অঙ্গহানী ঘটাতে চাইছে। এ-ভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আরও বেশি বেশ হতে থাকলে আমাদের দেশের তো অস্তিত্বই থাকবে না। ‘দেশকে আমরা টুকরো হতে দেব না’ -এই মানসিকতাই তখন আমাদের মধ্যে প্রবল হয়ে ওঠে।

‘বিচ্ছিন্নতা’ কি? সকলের থেকে স্বতন্ত্র, সকলের থেকে আলাদা, সকলের সঙ্গে না মানিয়ে নিতে পারা।

কোনও অসুস্থ সমাজ ব্যবস্থায় সুস্থ ব্যক্তিত্ববোধ সম্পন্ন মানুষ ‘বিচ্ছিন্ন’ হতে বাধ্য।

পৃথিবীর ইতিহাসে গ্যালিলিও, প্যারাসেলসাস, ব্রুনো, বিদ্যাসাগর-এর মতন অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের আগমনের কথা লেখা আছে, যারা প্রত্যেকেই সমাজে ছিলেন একাকী। এইসব বিদ্রোহী মানুষগুলো প্রথমত চিন্তার স্ববিরত্বকে চূর্ণ করতে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন সেই সময়কার সমাজের বৃহত্তর মানবগোষ্ঠি থেকে। সে-কালের বিচ্ছিন্ন মানুষদের সঠিক মূল্যায়ন করার ক্ষমতা ছিল না সে-সময়কার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানবগোষ্ঠির। আজ সেই সব বিচ্ছিন্ন মানুষরাই এ-যুগের মানুষদের কাছে আদর্শ ও প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন।

যে বিচ্ছিন্নতার অর্থ শোষণের অবসানমুখী সংগ্রাম, শোষণমুক্ত সমাজ থেকে বিযুক্ত হওয়ার তীব্র আকুতি, সুস্থ আত্মবিকাশের চেতনা, সে বিচ্ছিন্নতা অবশ্যই মনুষ্যত্বের কাম্য, সভ্যতার কাম্য।

যে সমাজ আগাপাছতলা ডুবে আছে দুরনীতির পঙ্কিলতায়, সে সমাজে শাসন ক্ষমতায় বসতে রাজনৈতিক দলগুলোকে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে ঘুরতে হয় ধনকুবেরদের দোরে দোরে, যে সমাজে বৈষম্য ও শোষণ লাগাম-ছাড়া, সেই সমাজ থেকে কোনও জনগোষ্ঠী যদি বেড়িয়ে যেতে চায়, তবে তাদের সেই উচ্চশির স্পর্ধিত সংগ্রামকে অভিনন্দন জানানোই প্রতিটি বঞ্ছিত মানুষের একমাত্র অভিব্যক্তি হওয়া উচিৎ। কিন্তু সেই ‘উচিৎ’টাই ঘটছে না শাসকশ্রেণীর সুনিপণ মগজ ধোলাইয়ের কল্যাণে।

শক্তিমান বহু সাহিত্যিকের কলমে এমন বহু চরিত্র উঠে এসেছে যারা ‘স্যাডিস্ট’ ধ্বংসকামী, বিকারগ্রস্থ, নৈরাশ্যতাড়িত, অসুস্থ, বিচ্ছিন্নতার শিকার এক মানসিক রোগী। এদের কেউ কেউ যৌন উশৃঙ্খলার পক্ষে যুক্তি হাজির করে ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে। আর এইসব সাহিত্যিকদের সৃষ্ট ওইসব চরিত্রগুলো দু-মলাটের বাইরে দূরদর্শনের ও সিনেমার পর্দাতে হাজির হয়ে আমাদের চেতনাকে প্রভাবিত করেছে। ফলে আমরা একটা ধারণা পোষণ করতে শুরু করেছি ‘বিচ্ছিন্নতা’ একটা সামাজিক ব্যধি। আমরা ভুলে থেকেছি ব্যাধিগ্রস্থ সমাজের বিরুদ্ধে আদর্শবাদী তরুণদের স্বাভাবিক প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং সংগ্রামও ‘বিচ্ছিন্নতা’।

কোনও জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশ যখন তাদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে অথবা শোষনযুক্ত সমাজ থেকে বিযুক্ত হতে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন সেই জন-জাগরণকে সামাল দেওয়ার সাধ্য রাষ্ট্রশক্তির থাকে না।

যে আন্দোলনে শরীক হয়েছে একটি জনগোষ্ঠীর প্রায় প্রতিটি পরিবার, সেই আন্দোলনকে শেষ করতে হলে সেই জনগোষ্ঠীর প্রতিটি পরিবারকেই শেষ করতে হয়। যা সীমিত সেনা ও পুলিশের সাহায্যে সম্ভব নয়।

ওই জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে ধ্বংসের আগুনে প্রতিবাদী প্রতিটি পরিবারকে শেষ করে দিয়ে শ্মশানের স্তব্ধতা আনাও এ-যুগে সম্ভব নয়। আধুনিকতম যোগাযোগের কল্যাণে পৃথিবী অনেক ছোট হয়ে গেছে। এইভাবে একটি জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে গেলে পৃথিবীর বহু প্রান্ত থেকেই এমন নৃশংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চারে প্রতিবাদের ঝড় উঠবেই। আর তাই পৃথিবীর বহু দেশেই বিভিন্ন গোষ্ঠির জনজাগরণের কাছে পিছু হটতে হয়েছে শাসক ও শোষকশ্রেণীকে।

এই বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণে পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে আছে বহু দৃষ্টান্ত। আমাদের খুব কাছের দেশ শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও দেখতে পাচ্ছি সংগ্রামী তামিল জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে পুলিশ, সেনা এমন কি প্রতিবেশীদেশ ভারতের সেনা নামিয়ে সমস্ত রকম ভাবে দমননীতি চালিয়েও দমন করতে পারেনি তামিল জনগোষ্ঠীর সংগ্রামকে।

আমাদের দেশেও এমন উদাহরণ বিরল নয়। হাতের কাছেই দুটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত পাঞ্জাব ও কাশ্মীর, সেখানে জনসমষ্টির সিংহভাগের আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন থাকায় আন্দোলন ধ্বংস করতে গিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও সরকার এমন নিদারুণভাবে বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ ওসব জায়গায় আন্দোলন ধ্বংস করতে হলে প্রায় সমগ্র জনসমষ্টিকেই ধ্বংস করতে হয়; যা অসম্ভব। অসম ও অন্ধ্রে একইভাবে যত বেশি বেশি করে স্থানীয় মানুষরা আন্দোলনের সমর্থনে এগিয়ে আসছেন ততই এই আন্দোলন ধ্বংস করা সরকারের পক্ষে অর্থাৎ রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে কঠিন কাজ হয়ে উঠছে।

শ্রীলঙ্কা, পাঞ্জাব, কাশ্মীর, অসম বা অন্ধ্রের আন্দোলনকে সমর্থন বা অসমর্থন করা এটা উদাহরণ টেনে আনার উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য- আন্দোলনকারীদের সামনে দৃষ্টান্ত টেনে এনে বোঝার ব্যাপারটা সহজতর করা। সঙ্গে সঙ্গে একথা মনে রাখাটাও প্রয়োজনীয়, বিচ্ছিন্নতার সুস্থ ও বলিষ্ঠ প্রকাশ শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের প্রয়াসে। যখন কোনও জনগোষ্ঠীর যুক্তিবাদী চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হবে আদর্শ-উব্দুদ্ধ শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের চেতনা, তখন রাষ্ট্রশক্তি ওই জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেশবাসীকে ক্ষেপিয়ে তুলতে জনগোষ্ঠীর বুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী লেবেল লাগাবে। ‘বিচ্ছিন্নবাদী’ শব্দটা ‘নাস্তিক’ শব্দের মতই এমনই এক নেগেটিভ এ্যাপ্রোচ বা নেতিবাচক আবেদনে ভরা দীর্ঘ প্রচারের দৌলতে। ভাবুন তো, একটা শোষণযুক্ত সমাজ থেকে বেরিয়ে গিয়ে জনগোষ্ঠী শোষণ মুক্ত সমাজ গড়তে চাইবে, নিজেদের শাসন কায়েম করতে চাইবে, তারা তো দেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতেই বাধ্য। যে সমাজে শোষক ও শোষিতদের সহবস্থান বিরাজ করছে, সে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তবেই কোনও জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে পারে শোষনমুক্ত সমাজ। একটি শোষণমুক্ত জনগোষ্ঠি বহুকে প্রভাবিত করতে পারবে এই পরম সত্যটি মাথায় রেখেই জনগোষ্ঠীকে তাঁবেতে রাখতে সচেষ্ট বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আক্রমণকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ রাষ্ট্রশক্তি এমন ভাবে প্রচার চালাতে থাকে যে সাধারণ মানুষ দেশ বলতে, দেশের বৃহত্তম নিপীড়িত জনসাধারণ, এই সত্যটি ভুলে গিয়ে দেশকে একটা ভূখন্ড একটা ম্যাপ ভেবে ফেলে। ফলে শোষণযুক্ত সমাজব্যবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চাওয়া রক্তাক্ত শোষিত মানুষগুলোর সংগ্রামকে অভিনন্দিত করার পরিবর্তে,  নীতিগতভাবে সমর্থন জানাবার পরিবর্তে,আমরা শোষিত মানুষরাও ভুল করে অঙ্গহাণীর ব্যথা অনুভব করি। শোষক শ্রেণীর খপ্পর থেকে কিছু মানুষ যে অন্তত মুক্তি পেয়েছে, ম্যাপের ওই বিচ্ছিন্ন অংশটা কিছু কিছু মুক্তিকামী মানুষদের জয়েরই প্রতীক যা আরও অনেক নিপীরিত মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে, এ-কথা ভুলিয়ে রাখতেই রাষ্ট্রশক্তি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে জুড়ে দিতে সচেষ্ট একটা নেতিবাচক আবেদন।

বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে আদর্শ ও পরিষ্কার স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হয়েই গড়ে ওঠে বিপ্লবী চেতনা। পরিষ্কার স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলাই যুক্তির কাজ, যুক্তিবাদী আন্দোলনের কাজ।

যুক্তিবাদী আন্দোলন, কুসংস্কার মুক্তির আন্দোলন আপাত-নিরীহ এক আন্দোলন, যার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক অসাধারণ শক্তিশালী গণ-অভ্যুত্থানের বীজ, ঠাসা রয়েছে শোষণমুক্তির বিস্ফোরক বারুদ।
 
গোল পাকাতে জাতীয়তাবাদ নিয়ে গোল-গোল কথা

‘দেশপ্রেম’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দ দুটির ব্যাপক ও বহুল অপব্যাখ্যায় সাধারণ মানুষ এতোটাই প্রভাবিত যে এই শব্দ দুটিই আজ শোষক ও শাসকশ্রেণীর শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কখনো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালনের ব্যর্থতা ঢাকতে, কখনো তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কটের অনিবার্য ফল হিসেবে বঞ্ছিত, নিপীড়িত মানুষদের মধ্যে ধূমায়িত ক্ষোভে একগাদা ঠান্ডা জল ঢালতে হঠাৎই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জুজু দেখান হতে থাকে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র আমাদের সীমান্তে তৎপর হয়ে উঠেছে, আমাদের দেশে নানা নাশকতা মূলক কাজ করে বেড়াচ্ছে ওদের দেশের গেরিলা সেনারা। আর দুই প্রতিবেশী দেশের শাসক ও শোষকগোষ্ঠীর একই সমস্যা হলে তো কথাই নেই, দুই সরকার গোপন সমঝোতায় নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়ে বেতারে দূরদর্শনে দেশপ্রেমের গানের বন্যা বইয়ে দিয়ে এমন গণউন্মাদনার সৃষ্টি করে যে, ভিখারীও একদিন উপোস করে থেকে তার একদিনের ভিক্ষে করে পাওয়া অর্থ যুদ্ধখাতে তুলে দেয়, সদ্য বিবাহিতা গা থেকে খুলে দেয় গয়না। দরিদ্র মানুষগুলো আরও বেশি দারিদ্রতার পাঁকে ডুবতে ডুবতে স্বপ্ন দেখে তাদের দেশের সেনারা অন্য দেশের লোকদের কিভাবে গুলিগোলায় ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। গরীব মানুষগুলো দেশের স্বার্থে ভুলে যায় ব্যক্তিগত পাওয়া না পাওয়ার ক্ষোভ বঞ্ছনার তীব্র জ্বালা।

গরীব দেশগুলো যখন একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়ে, সীমান্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, তখন লাভ হয় কাদের? ক্ষতিই বা কাদের? লাভ বিদেশী অস্ত্র ব্যবসায়ীদের, লাভ দেশী অস্ত্র-দালালদের, লাভ শাসক ও শোষকের, বহু সঙ্কটময় মুহূর্তে মানুষের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায় বলে লোকসান পুরোটাই সাধারণ মানুষের। অনেক আন্দোলন, অনেক অবরোধ, অনেক ক্ষোভ যুদ্ধের আগুনে পুড়ে খাঁক হয়ে যায়। যুদ্ধের সময় যদি আন্দোলন চালাতে যান, শাসককুল আপনার সামনে পিছনে ‘পশ্চিমবাহিনীর’ অর্থাৎ শত্রুদের গুপ্তচর বলে ছাপ মেরে দেবে। আর জাতীয়তাবাদের গণ-উন্মাদনার জোয়ারে শোষিত মানুষই সেই কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করে নেবে, বিরোধীতা করবে আপনাদের আন্দোলনের।

‘জাতীয়বাদ’ শব্দটার বাস্তবিকই অর্থ কি? আসলে ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দের কোনও অর্থই হয় না, অর্থ হতেই পারে না। ‘জাতি’ কথার অভিধানগত অর্থ সমলক্ষণ অনুযায়ী বিভাগ। যেমন মানবজাতি, উদ্ভিদজাতি, পশুজাতি, নারীজাতি, পুরুষজাতি, আবার ধর্মের অন্তর্গত মানবসমষ্টিও জাতি। যেমন হিন্দুজাতি, মুসলমানজাতি, খৃষ্টানজাতি। আবার সামাজিক বিভাগজাত মানবসমষ্টিও জাতি। যেমন ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য, চন্ডাল। এমনিভাবে জাতি-বিভাগ নিয়ে আলোচনা প্রায় অসীম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

‘জাতীয়’ কথার অর্থ জাতি সম্বন্ধীয়। ‘বোধ’ কথার অর্থ উপলব্ধি, অনুভব।

তাহলে আমরা ‘জাতীয়তাবাদ’ কথাটির অর্থ হিসেবে পেলাম ‘জাতি সম্বন্ধীয় উপলব্ধি’। কিন্তু কোন জাতি সম্বন্ধীয় উপলব্ধি? মযে কোনও জাতি সম্বন্ধীয় উপলব্ধিই হতে পারে।

শাসকশ্রেনী ও রাজনীতিকরা অথবা তাদের স্নেহধন্য কলমচীরা ‘জাতীয়তাবাদী’ বলতে ভারতবর্ষের প্রতি ভালবাসা বলে ব্যাখ্যা চাপাতে চেয়েছেন। ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ ও ‘বিশ্বহিন্দু পরিষদ’ ‘জাতীয়তাবাদী’ শব্দটিকে ব্যবহার করে হিন্দুজাতীয়তাবোধ জাগ্রত করতে চাইছে, হিন্দু জাতীয়তাবোধের গণউন্মাদনা সৃষ্টি করতে চাইছে। এই বিষয়ে ওরা যে বিশাল সাফল্য পেয়েছে, সাম্প্রতিক সংসদীয় নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির সাফল্য তারই প্রমাণ। ‘আমরা বাঙ্গালী’ আবার ‘জাতীয়তাবাদী’ শব্দটিকে প্রয়োগ করে বাঙ্গালীদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সুড়সুড়ি দিয়ে বাঙ্গালীত্ব জাগাবার চেষ্টা করছে।

শাসনশ্রেণী জাতীয়তাবাদের ধ্যানধারনা সাধারণের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে ধনীজাতীয় মানুষ ও গরীবজাতীয় মানুষদের সহবস্থানের কথা বোঝায়।

ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে প্রত্যেককে দেশের জন্য, জাতির জন্য একতাবদ্ধ হওয়ার পক্ষে হাওয়া তোলে। এমন ব্যাপক প্রচারে নিপীড়িত দরিদ্র মানুষগুলো তাদের শোষকদের চিনতে ভুলে যায়, তাদের শত্রু চিনতে ভুলে যায়। ভুলে যায় তাদের কারো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে শোষণ করছে, গিলে খাওয়ার চেষ্টা করছে।

‘জাতীয়তাবোধ’ বলতে যদি মানবজাতি সম্বন্ধীয় উপলব্ধিকে আমরা বুঝি, এবং ‘জাতীয়তাবাদ’ বলতে যদি মানবজাতি সম্বন্ধীয় মতবাদকে বুঝি তাহলেও সেই একই সমস্যা থেকেই যায়। এই জাতীয় কোনও মতবাদ দ্বারা সম্পূর্ণ মানবজাতীর মঙ্গল অসম্ভব। মানবজাতির মধ্যেকার শোষকশ্রেণীর মঙ্গল মানেই শোষিত শ্রেণীর অমঙ্গল। আর শোষিত শ্রেণীর মঙ্গল মানেই শোষকশ্রেণীর অমঙ্গল। দুই শ্রেণীর মঙ্গল যেহেতু একই সঙ্গে সম্ভব নয়, তাই দুই শ্রেণীর সহবস্থান মানবজাতির মঙ্গলচিন্তাও অতি অবান্তর। শোষিত শ্রেণীর মাথার থেকে শোষিত শ্রেণীর চেতনা দূর করতেই এই ধরনের জগাখিচুড়ির মতবাদ গেলানোর নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রশক্তি।

 

ধর্ম-নিরপেক্ষতা নিয়ে যে ভুল ধারণা চাপানর চেষ্টা চলছে নিরন্তর

সম্প্রতি ধর্ম-নিরপেক্ষতা নিয়ে দেশজুড়ে অনেক হৈচৈ হচ্ছে। প্রচুর আলোচনা, প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। শহরে হোডিং পড়েছে, পোস্টার পড়েছে। এই হোডিং পোস্টারে শহর কলকাতাও ঝলমল করছে। এইসব আলোচনা, লেখালেখি ও হোডিং-পোস্টার পড়ে সাধারণ মানুষ ধর্ম-নিরপেক্ষতা শব্দের সঙ্গে দারুণভাবে পরিচিত হয়েছে। জেনেছে ;ধর্ম-নিরপেক্ষতা’ কথার অর্থ ‘সব ধর্মের সমান অধিকার।‘

বিপুল সরকারী অর্থব্যয়ে ধর্ম-নিরপেক্ষতা শব্দের এই যে ব্যাখ্যা সর্বত্র হাজির করা হচ্ছে এবং এরই সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে আমাদের দেশের মন্ত্রী, আমলা ও রাজনীতিকরা মন্দিরে মন্দিরে পূজো দিয়ে বেড়াচ্ছেন, গুরুদোয়ারায় নতজানু হচ্ছেন, গীর্জায় শ্রদ্ধা জানিয়ে আসছেন, দেওয়ালি, ঈদ, বড়দিন ইত্যাদিতে রাষ্ট্রনায়করা বেতার দূরদর্শন মারফৎ শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে অর্থ সাহায্য দিলে আয়কর থেকে রেহাইয়ের ব্যবস্থাও করে দিচ্ছেন।

সাধারণের ভাল লাগছে- ‘সব ধর্মের সমান অধিকার’ মেনে নিয়ে মন্ত্রী, আমলা, রাজনীতিকদের সমস্ত ধর্মের কাছে নতজানু হতে দেখে। উদার হৃদয়ের মানুষ হিসেবে নিজেদের ভাবতে ভাল লাগছে জনসাধারণের- হু হু বাবা, আমাদের দেশ ধর্মনিরপেক্ষ, এখানে সব ধর্মই সমান অধিকার ও শ্রদ্ধা পায় মন্ত্রীর আমলার। মন্ত্রীরা এরই মাঝে বুঝিয়ে দেন, সমস্ত ধর্মের সমান অধিকার বজায় রাখতে, দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার মশাল জ্বালিয়ে রাখতে রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা রাখতে হবে।

‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটিকে নিয়ে কি নিদারুণভাবে অপব্যাখ্যা করে সাধারণ মানুষের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে, ভাবা যায় না?

‘নিরপেক্ষ’ শব্দের অর্থ কোনও পক্ষে নয়। ‘ধর্ম-নিরপেক্ষ’
শব্দের অর্থ, কোনও ধর্মের পক্ষে নয়। অর্থাৎ সমস্ত ধর্মের
সঙ্গে সম্পর্কজনিত। ‘Secularism’ শব্দের অভিধানিক
অর্থ- একটি মতবাদ, যা মনে করে, রাষ্ট্রনীতি, শিক্ষা
প্রভৃতি ধর্মীয় শাসন থেকে মুক্ত থাকা উচিৎ।

একি! এদেশে ধর্ম-নিরপেক্ষতার নামে আমরা কি দেখছি? সেকুলার রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও এদেশে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয়। কোনও প্রকল্পের উদ্বোধন বা শিলাবিন্যাস হয় মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে প্রদীপ জ্বালিয়ে, পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে, নারকোল ফাটিয়ে।

সেকুলার রাষ্ট্রে ধর্ম কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচরণের ব্যাপার হতে পারে। রাষ্ট্রীয় জীবনে বা রাষ্ট্রীয় নীতিতে এই ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস যেন প্রকাশ্যেনা এসে পড়ে, এ-বিষয়ে অতি সতর্ক থাকা সেকুলার বা ধর্ম-নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের কর্তব্য। কিন্তু ভারতবর্ষে মন্ত্রী, রাজনীতিক ও আমলারা প্রকাশ্যেই বিশেষ রাষ্ট্রের কর্তব্য। কিন্তু ভারতবর্ষে মন্ত্রী, রাজনীতিক ও আমলারা প্রকাশ্যেই বিশেষ সম্প্রদায়ের ধর্মাচার পালন করেন। প্রয়োজনে এইসব রাজনীতিকরা সব ধর্মকেই সমান প্রশ্রয় দেয়। ফলে এইসব রাজনীতিকরাই যখন ধর্ম-নিরপেক্ষকতার বড় বড় বুলি কপচায় ও রাজনীতি থেকে ধর্মকে পৃথক করার কথা বলে তখন এদের দ্বিচারী ধান্দাবাজ চরিত্রই প্রকাশ পায়।