একটা কথা বলি। অনেকের কাছেই হয়তো অদ্ভুত শোনাবে। স্বাভাবিক মস্তিষ্ককোষের অধিকারী মানুষদের ক্ষেত্রে ‘দুর্বল স্মৃতি’ বলে কিছু নেই। আমাদের স্মৃতি শক্তির একটা পর্যায় (Retention)। শেষ পর্যায়ে আছে স্মরণ (Recall)। যা দেখি, যা শুনি সে-সব সংরক্ষণের বিষয়ে আমাদের কারুরই কোনও ঘাটতি নেই। স্মরণের ক্ষেত্রেই দেখা যায় আমাদের নানা ধরনের ত্রুটি।

আমার কর্মক্ষেত্রে একটি ছেলে ঘুরে ঘুরে আমাদের চা দিত। প্রতিদিন দেড়শো মানুষকে চা খাওয়াতো। কেউ নিতেন এক কাপ, কেউ দু’কাপ, কেউ অভ্যাগতকে অভ্যর্থনা জানাতে নিতেন পাঁচ কাপ। প্রতিদিনই প্রায় সকলের ক্ষেত্রেই  হিসেবেরও তারতম্য হতো। কাল যিনি এক কাপ নিয়েছিলেন, আজ তিনি হয়তো নিয়েছেন তিন কাপ। ‘টি-বয়’ ছেলেটি প্রত্যেকের হিসেব স্মৃতিতে ধরে রাখতো এবং প্রয়োজনের সময় স্মরণ করতে পারতো। এমনকি সে পাঁচ কাপের হিসেব দিলে যদি কেউ অভ্যাগতর কথা ভুলে তিন কাপ নিয়েছেন বলে জানাতেন, ‘টি বয়’ ছেলেটিই মনে করিয়ে দিত- ‘এগারোটা নাগাদ নীল শার্ট সাদা প্যান্ট পরা এক ভদ্রলোককে এক কাপ চা খাওয়ালেন, দুটো তিরিশ নাগাদ একটা ঝাঁকড়া চুলো ইয়ং ছেলেকে খাওয়ালেন এক কাপ।‘ এমন অসাধারণ স্মৃতির অধিকারী ছেলেটির দৃঢ় ধারণা, ওর স্মৃতি খুবই দুর্বল তাই লেখাপড়া শেখা হয়ে ওঠেনি।

আমার শৈশব কেটেছে পুরুলিয়া জেলার ছোট্ট রেল-শহর আদ্রার বড়-পলাশখোলায়। রোজকার দুধ নেওয়া হতো একটি আদিবাসী প্রবীণার কাছ থেকে তিনি ছিলেন নিরক্ষর। কিন্তু কবে কতটা বাড়তি দুধ রাখতাম, তার পাক্কা হিসেব রাখতেন। ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তুমি তো আরও অনেক বাড়িতেই দুধ দাও, না লিখে সবার বাড়ির হিসেব রাখ কি করে?

এমন অনেক মা-বাবা আমার কাছে এসেছেন, যাঁদের সমস্যা সন্তানের দুর্বল স্মৃতিশক্তি। পড়লে মনে থাকে না, পরীক্ষার ফল খারাপ হচ্ছে। সন্তানদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি এঁদের অনেকেই এক একটি জীবন্ত তথ্যভান্ডার। কেউ কপিল, রবি শাস্ত্রী, ইমরান, মুদসসর নজর, আজাহারউদ্দিন, হ্যাডলি, রণতুঙ্গের ব্যাটিং, বোলিং-এর গড় বলে চলেছে; কেউ বা ব্রুস লী, সিলভেস্টার স্ট্যালোন প্রমুখদের বহু তথ্য স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে অনর্গল বলে চলেছে চর্ম উত্তেজনার সঙ্গে। কোনও কিশোরীকে দেখেছি বোম্বের নায়ক-নায়িকাদের যত খবর জনপ্রিয় সিনেমা পত্রিকাগুলোয় প্রকাশিত হয় সবই কন্ঠস্থ। কেউবা চিমা, চিবুজোর, সুব্রত, মনোরঞ্জনের নাড়ি-নক্ষত্রের খবর জানে। এরপরও এদের কাউকেই কি আমরা স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার জন্য অভিযুক্ত করতে পারি? ওরা সেই সব তথ্যই মনে রাখে যা মনে রাখতে ওরা খুব ভালোবাসে অথবা প্রয়োজনে বাধ্য হয়। আমাদের টি-বয়টি বা আদিবাসী দুধওয়ালী অমনি বাধ্য হয়ে মনে রাখার নজির। অমন নজির আরও বহু সহস্র আছে। আমার জীবনেই অমন বহু নজির দেখেছি। আপনাদের মধ্যে অনেকেই নিশ্চয় দেখেছেন।