তৃতীয় মুদ্রণের ভূমিকা

সিলেটের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী জনাব লিয়াকত হোসেন সাহেব আমার ছেলেবেলায় উল্লিখিত শুক্লাদি এবং মাথামোটা শংকর সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়েছেন। আমি তার চিঠি থেকে সেই অংশ হুবহু তুলে দিলাম।

শুক্লাদি : মীরা বাজারের এস. কে. রায় চৌধুরী-এর বড় কন্যা শুক্লা রায় চৌধুরী ভারতে অধ্যয়নকালে অকাল মৃত্যুবরণ করেন। তিনি এম. সি, কলেজের রসায়ন বিভাগ-এর বিভাগীয় প্রধানের মেয়ে ছিলেন। তিনি ১৯৫৪-তে সিলেট গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। তার বড় ভাই সাধন ১৯৬১-তে পাটনায় অকাল মৃত্যুবরণ করেন এবং অধ্যাপক রায় চৌধুরী ১৯৭১-এর কিছুদিন আগে আসামের করিমগঞ্জে মৃত্যুমুখে পতিত হন। ওঁদের পরিবারের সঙ্গে আমার জানাশোনা ছিল। বর্তমানে রত্না, শংকর ও মানস ভারতে চাকুরি করছে। ঐ বাড়ি লতিফ চৌধুরী নামে একজন ব্যবসায়ী কিনেছেন। তিনিও আমার খুব পরিচিত। আপনার দেওয়া বাড়ির বর্ণনা ঠিক আছে—হিন্দুবনেদী বাড়ি গাছপালা বেষ্টিত থাকতো। মাথামোটা শংকরঃ আপনার ক্লাসমেট শংকর তার ছাত্রজীবন ইতি দিয়ে মাদ্রাসা মাঠে মোটা মাথা নিয়ে বাদাম বিক্রি করতো। জানি না এখন কোথায় আছে। মীরা বাজারের কারো সঙ্গে দেখা হলে তার খবর জানতে পারবো। নতুন খবর জানলে আপনাকে জানাবার ইচ্ছা রাখি।

হুমায়ূন আহমেদ
শহীদুল্লাহ হল
৫. ১০. ৯১

ভূমিকা

এক দুপরে ভাত খেতে বসেছি। আমার মেজো মেয়ে কী-একটা দুষ্টুমি করায় মার কাছে বকা খেয়েছে। মুখ অন্ধকার করে ভাতের থালা সামনে নিয়ে বসে আছে। অনেক সাধাসাধি করেও তাকে খাওয়ানো যাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত আমি বললাম, মা, তোমাকে আমি আমার ছেলেবেলার একটা গল্প বলব। গল্প শুনে তুমি যদি হেসে ফেলো তা হলে কিন্তু ভাত খেতে হবে।

আমি গল্প শুরু করলাম। সে প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল না হাসার। শেষ পর্যন্ত খিলখিল করে হেসে ফেলে বলল, তুমি যদি তোমার ছেলেবেলার আরেকটা গল্প বল তা হলে ভাত খাব।

আমি যে একসময় তাদের মতো ছোট ছিলাম এবং খুব দুষ্ট ছিলাম এই বিস্ময়ই তাদের জন্যে যথেষ্ট। তার সঙ্গে যুক্ত হল মজার মজার ঘটনা। ওদের সঙ্গে গল্প করতে করতে মনে হল ছেলেবেলাটা লিখে ফেললে কেমন হয়। বিশ-পঁচিশ পৃষ্ঠা লিখেও ফেললাম। আমার বড় মেয়ে খুব উৎসাহ নিয়ে সেই পাণ্ডুলিপি আমার মাকে পড়াল। মার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি শীতল গলায় আমাকে বললেন, এইসব কী লিখেছিস? নিজের আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে রসিকতা?

আমার ছোট বোনও পাণ্ডুলিপি পড়ল। সে কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, আমাকে নিয়ে মাকড়সা প্রসঙ্গে যে গল্পটা লিখেছ ঐটা কেটে দাও। লোকে কী ভাববে? পাণ্ডুলিপির খবর ছড়িয়ে পড়ল। আমার ছোটমামা খুলনা থেকে চলে এলেন পড়ার জন্যে। তিনি পড়লেন এবং কোনো কথা না বলে খুলনা চলে গেলেন। বুঝলাম তারও পছন্দ হয়নি। তবু একসময় শেষ করলাম এবং কোথাও কোনো ভুলটুল আছে কি না তা যাচাই করবার জন্য নিজেই নানিজানকে পড়ে শোনালাম।

নানিজান বললেন, অনেক ভুলভ্রান্তি আছে। এই ধর, তুই লিখলি তোর মা পাগল হয়ে গিয়েছিল। পাগল হবে কীজন্যে? মানুষ চিনত না। উলটাপালটা কথা বলত-এর বেশি তো কিছু না। এটাকে পাগল বলে?

আমি দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। আমার মেজো মেয়ে বলল, তুমি মন-খারাপ করছ কেন? লেখাটা তো মোটামুটি ভালোই হয়েছে। তবে তুমি একটা জিনিস লিখতে ভুলে গেছ।

কোন জিনিস মা? ছেলেবেলায় দুধ আর ডিম খেতে তোমার কেমন খারাপ লাগত তা তো লেখনি। দুধ ডিম তো মা তোমরা খাচ্ছ। আমরা খেতে পারিনি। এত পয়সা আমার বাবা-মার ছিল।

মেজো মেয়ে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, আহা কী সুখের ছিল তোমাদের ছেলেবেলা! হ্যাঁ, সুখেরই ছিল।

সেই সুখের খানিকটা ভাগ আজকের পাঠক-পাঠিকাদের দেয়ার জন্যেই এই লেখা। ছেলেবেলা লেখার সময় শৈশবে ফিরে গিয়েছিলাম। যতক্ষণ লিখেছি গভীর আনন্দে হৃদয় আচ্ছন হয়ে ছিল। পেছনে ফিরে তাকানো যে এত আনন্দময় হবে কে জানত?

হুমায়ূন আহমেদ

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x