২২/১, রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডে তারা কুটিরে প্রতি শনি, মঙ্গলবার অসংখ্য মানুষের ভিড় হয়। ভক্তেরা আসেন দূর-দূরান্ত থেকে। কেউ তারা মাকে প্রণাম জানাতে ছুটে আসেন। কেউ আসেন সমস্যার সমাধানের আশায়। এখানে শনি-মঙ্গলে বিজলী চক্রবর্তীর ওপর মা তারার ভর হয়, অর্থাৎ সহজ-সরল অর্থে ঈশ্বর তারা মা ভক্তদের আর্জি মত প্রশ্নের উত্তর, সমাধানের উপায় বাৎলান মিডিয়াম বিজলী চক্রবর্তীর মাধ্যমে।

৩০-৩৫ বছর আগে স্বপ্নে তারা মূর্তি দেখেন বিজলী। এই সময় থেকে ভরের শুরু। প্রথমে ভরের সময় পাড়ার ছেলেরাই ডাক্তার ডেকে আনেন। ডাক্তার পরীক্ষা করে অবাক হন। সব কিছুই স্বাভাবিক। বিজলী দেবীর দাবী মত ডাক্তার রোগ সারাতে তাঁর অক্ষমতা জানান। কোনও ওষুধ প্রেসক্রাইব না করে দিয়েই বিদায় নেন। এর কিছুদিন পর দ্বিতীয় ভর সন্ধ্যের সময় তলসীতলায় প্রদীপ দিতে গিয়ে, সেই সময় মা তারা নাকি বিজলীর মুখ দিয়ে জানান তাঁর ঘট-স্থাপন করে পুজো দিতে। তারপর থেকে ঘট-স্থাপন ও পুজো। মন্দিরে মায়ের যে মূর্তিটি আছে বিজলীই ভগ্নীপতিই তা তৈরি করান স্বপ্নে দেখা মূর্তির অনুকরণে।

বিজলী তারা মা নামেই বেশি পরিচিতা। তিনি যেসব ওষুধ দেন বা যাঁদের ঝেড়ে দেন তাঁদের অনেকেই নাকি রোগমুক্ত হয়েছেন। তারা মার কথায়ঃ দৈব ওষুধ-টষুদের আমি কছুই জানি না। আমার অলৌকিক কোন ক্ষমতাই নেই। যা করেন, যা ক্ষমতা সবই মা তারার।

অসুখ-বিসুখে অনেকে ঝাড়াতে যান। ভরে তারা মা ঝেড়েও দেন। কয়েক বছর আগে আমি তাঁরই এক ভক্ত শিষ্যের সঙ্গী হয়ে গিয়েছিলাম। অতি স্পষ্টভাবেই জেনে ফিরেছিলাম, ‘তারা মা’র সত্যি-মিথ্যা বোঝার সামান্যতম ক্ষমতাও নেই।

 

দুপুর থেকে সন্ধে তারাপীঠ ছেড়ে ‘মা’ নেমে আসেন নমিতা মাকাল-এর শরীরে

নাওভাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে শান্তিনগর ইস্টার্ন বাইপাসে ভাঙ্গরের একটি অতি সাধারণ ঘরে থাকেন নমিতা মাকাল। সম্প্রতি পত্র-পত্রিকায় ছবি সহ তাঁকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় সময় ভালই যাচ্ছে। ভক্তেরা প্রণামী দিচ্ছেন টাকা-পয়সা, শাড়ি, কাপড়, এটা-ওটা। শহরতলীর এই এলাকাটি কিছুদিন আগেও ছিল হতশ্রী। এখন কিছুটা রং ফিরেছে।

নমিতার বয়স বছর তিরিশ। বিয়ে বছর পনের আগে। স্বামী ও দুই ছেলে নিয়ে সংসার। দ্বিতীয় সন্তান হবার এক বছর বাদে বাড়িতে প্রথম কালীপুজো হল নমিতারই একান্ত আগ্রহে। মূর্তি বিসর্জনের সময় এক অলৌকিক ঘটনা ঘটলো। নামিতার দাবী- কেউই মায়ের মূর্তি তুলতে পারেনি। সকলে বললেন, মা যখন যেতে চান না, এখানেই থাকুন। সেই থেকে এখানেই মা আছেন। মায়ের মন্দিরও তৈরি হয়েছে বছর ছয়েক হল।

কালীপুজোর মাস দুয়েক পরের ঘটনা। বাড়িতে জন্ম অশৌচ চলছিল। সেদিনটি ছিল মঙ্গলবার। নমিতার বোন এসেছেন বাড়িতে। তাঁকেই ঠাকুরের কাছে সন্ধ্যাদ্বীপ দিতে পাঠান নমিতা। বোন প্রচণ্ড ভয় পেয়ে ফিরে আসেন। বলেন, ঘরে কে যেন আছেন মনে হল, সারা শরীরের লোম আমার খাড়া হয়ে উঠলো সেই অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গে। আমি প্রদীপ জ্বালতে পারব না। অশৌচ থাকা সত্ত্বেও নমিতাই গেলেন। প্রদীপ জ্বালতেই কি যে হয়েছিল, নমিতার জানা নেই। পরে তিনি বাড়ির লোক ও প্রতিবেশীদের কাছে শুনলেন,  মা তারা তাঁর ওপর ভর করেছিলেন। ভরে জানিয়েছেন, প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার আসবেন।

আগে ভর হতো সন্ধ্যের সময়। এখন হয় দুপুরে। এই বিষয়ে নমিতার বক্তব্য- সন্ধ্যের সময় তারাপীঠে মায়ের সন্ধ্যেরতি হয়, তাই দুপুর ১টা ১৫ থেকে সন্ধ্যে ৬টা পর্যন্ত মা তারা আসেন নমিতার শরীরে।

নমিতার কথা শুনে একটা নতুন তথ্য জানতে পারলাম, তারা মা ঈশ্বর হলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে একই সঙ্গে একাধিক স্থানে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না। নমিতার দাবী, ভরের সময় যে কেউ যে কোনও সমস্যা নিয়ে গেলে মায়ের কৃপা হলে সমস্যার সামধানের পথও তিনি করে দেন। যারাই বিশ্বাস নিয়ে এসেছেন, তাঁরাই ফল

নমিতা মাকাল

পেয়েছেন, দাক্তার না ডেকেও শুধুমাত্র মায়ের দয়ায় জীবন পেয়েছে এমন অনেক উদাহরণও আছে।

নমিতা মাকালকে বলেছিলাম, “আপনার কথা শুনে বুঝতেই পারছি মা শনি-মঙ্গলবার দুপুর থেকে সন্ধ্যে থাকেন আপনার কাছে, রাতে তারাপীঠে। এবং রাতে তারাপীঠে থাকেন বলেই আপনার কাছে আসা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না। অথচ দেখুন, বেলেঘাটা থেকে এক ভদ্রলোক জ্যোতি মুখোপাধ্যায় আমাকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন- শনি মঙ্গলবার দুপুর ১টা ১৫ থেকে ৬টা পর্যন্ত মা তারা তাঁর কাছেই থাকেন, এবং তিনি নাকি তাঁর এই কথার স্বপক্ষে প্রমাণও দেবেন। আপনাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছেন, আপনি স্রেফ টাকা রোজগারের ধান্দায় লোক ঠকাতে ভরের গপ্পো ফেঁদেছেন। জ্যোতিবাবু আরও জানিয়েছেন, আপনি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলে তিনি প্রমাণ করে দেবেন আপনি একজন প্রতারক। জ্যোতিবাবু এই বক্তব্য জানিয়েই আপনার বিষয়ে যে পত্রিকা প্রচার করেছে, তাঁদের কাছেও একটি চিঠি দিয়েছেন। আমি একটি বিজ্ঞান সংস্থার সম্পাদক, জ্যোতিবাবু চান, আমি আপনাদের দুজনের দাবির বিষয়ে পরীক্ষা নিয়ে জানাই কার দাবি যথার্থ। আপনি কি আমাদের পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে সহযোগিতা করবেন?”

নমিতার সহজ সরল-বক্তব্য, “আ মোলো যা, ওই লোকটার কুঠ হবে, কুঠ হবে গো! ভাত দেওয়ার মুরদ নেই কিল মারার গোঁসাই!”

না, নমিতা আমদের সঙ্গে কোনও সহযোগিতা করতে রাজি হন না। এবার একটা গোপন খবর ফাঁস করছি, জ্যোতি মুখোপাধ্যায় শ্বাস-প্রশ্বাসে, ঘুমে-নিঘুমে যুক্তিবাদী, আমাদের সমিতির অতি সক্রিয় এক আটান্ন বছরের কিশোর, চ্যালেঞ্জটা রেখেছিলেন নমিতা মাকালকে ‘মাকাল’ প্রমাণ করতে।