লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যে সব বছর ভাল ফসল হয়। সামজে অভাব অনটন কম হয়, সেসব বছর ‘ডাইনি’ হত্যা বা ডাইনি বিচারের ঘটনা কম ঘটে। যেসব বছর ফসল ভাল হয় না, গো-মড়ক দেখা দেয়, সেসব বছরগুলিতে ডাইনি নিয়ে অভিযোগ ওঠে বেশি।

জানগুরুদের অলৌকিক ক্ষমতায় বিশ্বাস সাধারণ মানুষদের এমনি আসেনি। তাঁরা দেখেছেন জানগুরুদের ‘অলৌকিক’ সব কান্ডকারখানা। জানগুরুরা আত্মা, ভূতদের নিয়ে আসতে পারেন, কাজে লাগান। ভূতেরা গ্লাস থেকে তাড়ি খায়, কঞ্চি চালান করে, নখদর্পণে, আটার গোলা ভাসিয়ে, হাতে ছাই ঘষে নাম ফুটিয়ে চুরি যাওয়া জিনিসের হদিশ দিচ্ছেন। যেভাবে এসব ঘটনা জানগুরু ঘটাচ্ছেন, সেগুলোর ব্যাখ্যা সাধারণ বুদ্ধিতে পাওয়া যাচ্ছে না বলেই ঘটনাগুলোকে অলৌকিক ক্ষমতার প্রকাশ ছাড়া আর কিছু অবকাশ থাকছে না। তারই ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি সমাজের শিক্ষিত স্নাতক, শিক্ষকরাও জানগুরুদের নির্দেশকে অভ্রান্ত মনে করে ডাইনি হত্যায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন।

ডাইনি হত্যার পিছনে রয়েছে ডাইনিদের এবং জানগুরুদের অলৌকিক ক্ষমতার প্রতি সাধারণের অন্ধ-বিশ্বাস। অন্ধ-বিশ্বাস কিন্তু শিক্ষার সঙ্গেই শুধুমাত্র সম্পর্কিত নয়। যারা মনে করেন আদিবাসী সমাজকে শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ সুবিধে দিলেই ডাইনি হত্যা বন্ধ হয়ে যাবে। তাঁরা প্রকৃত সত্য বিষয়ে বা সমস্যার গভীরতা বিষয়ে ঠিক মত অবহিত নন, এ কথা অবশ্যই বলা চলে। ডাইনি ও জানগুরুদের অলৌকিক ক্ষমতার প্রতি বিশ্বাস শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যাতেই দূর করা সম্ভব বলে যারা মনে করেন তাঁদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি কুসংস্কার ও অন্ধ-বিশ্বাসে আচ্ছন্ন শিক্ষিতের সংখ্যাই যে আমাদের দেশের শিক্ষিতদের মধ্যে সংখ্যাগুরু, এ সত্যকে কি আমরা অস্বীকার করতে পারি? বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ, বিজ্ঞান পেশার মানুষ, শিক্ষক, অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী এমনকি স্বীকৃত মার্কসবাদীদের মধ্যে কি আমরা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন মানুষের সাক্ষাৎ পাই না? বাস্তব সত্যটি এই যুক্তি দিয়ে সহানুভূতির সঙ্গে বোঝালে শুধুমাত্র শিক্ষার সুযোগ পাওয়া মানুষরাই নন, শিক্ষার সুযোগ লাভে বঞ্চিত মানুষরাও সংস্কার মুক্ত হন। এই কথাগুলো কেবলমাত্র কল্পনাপ্রসূত বা ধারণাপ্রসূত নয়, বরং বলতে পারি হাতে-কলমে কাজ করার মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতার ফলশ্রুতি। মানুষ শৈশব থেকেই বেড়ে উঠছে অলৌকিকের প্রতি আস্থাশীল পরিবারে, সমাজে পরিবেশে। পড়ার বি ও গল্পের বইয়ের মাধ্যমেও অলৌকিকতার প্রতি বিশ্বাস ও ভুল ধারণাই প্রতিনিয়ত সঞ্চারিত হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্ক স্নায়ুকোষে। বিপরীত কোনও যুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় সুযোগ না পাওয়ার ফলে অলৌকিকতার প্রতি বিশ্বাসগুলোই দিনে দিনে দৃঢ়বদ্ধ হয়েছে। মানুষ যুক্তির সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ পেলে যে আন্তরিকতার সঙ্গেই যুক্তিকেই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করেন এই সত্যটুকু যুক্তিবাদী আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে উপলব্ধি করেছি।

শত শত বছর ধরে ভাববাদী দর্শন যে অন্ধ-বিশ্বাসগুলোকে, আমাদের চিন্তার জগৎকে, প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করে চলেছে যুক্তিবাদী দর্শন মুহূর্তের চেষ্টায় কোটি কোটি মানুষকে সেই প্রভাব থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হবে, এমনটা ভাবা বাতুলতা মাত্র। আমাদের দেশে অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা অতি নগণ্য। শিক্ষিতদের মধ্যেও অতি প্রয়োজনীয় (লেখাপড়া শিখতে যতটুকু না কিনলেই নয়) বই কেনা ছাড়া বই কেনার অভ্যাস খুবই কম। অন্ন-বস্ত্রের মত বই কেনাকে বেঁচে থাকার ন্যূনতম প্রয়োজন বলে মনে করেন না। কিনলেও সাধারণভাবে ‘শেষ পাড়ানের করি’ হিসেবে ধর্মগ্রন্থই সেখানে গুরুত্ব পায়। কুসংস্কার মুক্তির কাজ এক বা কয়েকজন ব্যক্তির কিছু লেখাতেই সমাধান হয়ে যাবে এমন ভাবাটা একান্তই অমূলক। যুক্তিবাদী লেখা-পত্তর কিছু মানুষ বা কিছু সংগঠনকে যুক্তিবাদ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চিন্তার স্বচ্ছতা আনতে সাহায্য করতে পারে, দিশা দিতে পারে মাত্র। এর বেশি কিছু নয়, স্বচ্ছতাপ্রাপ্ত মানুষরা বিভিন্ন গণসংগঠন করে যেদিন অক্ষরজ্ঞানহীন, শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া মানুষদের স্বচ্ছ যুক্তির আলোতে উদ্ভাসিত করতে পারবেন, সেদিনই যুক্তিবাদী আন্দোলনে নতুন মাত্রা নতুন গতি যুক্ত হবে।

শিক্ষিত এবং ডাইনি হত্যা বিরোধী মানুষদের লেখাতেও আমরা বার বার লক্ষ্য করেছি, সবচ্ছতার অভাব। নেতৃত্বের স্বচ্ছতার অভাবই ডাইনি হত্যা বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠার পক্ষে প্রবলতর বাধা। শরচ্চন্দ্র রায়ের বিখ্যাত বই ‘ওঁরাও রিলিজিয়ন অ্যান্ড কাস্টমস’-এ শ্রী রায় এ কথাও লিখেছেন, জানগুরু সম্প্রদায়ের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী মানুষগুলো এ সব বিদ্যা শেখে কখনো ভালবেসে, কখনো আয়ের পথ হিসেবে। এরা বুঝতে পারে কোনটা স্বাভাবিক, কোনটা অতিপ্রাকৃত। এরা অলৌকিক বিদ্যার পাশাপাশি, ভেষজ বিদ্যাও শেখে।

এভারেন্ড পি. ও. ব্যক্তি ‘ট্যাবু কাস্টমস অ্যামাং দি সানতালস’ গ্রন্থে একথাই বলেছেন, মেয়েরা, সে ভাল বা মন্দ উদ্দেশ্যেই হোক, অলৌকিক ক্ষমতাগুলোর কাছে পৌঁছুতে চায়। সেটা প্রকাশ্যে পারে না। কারণ পুরুষেরা মত দেয় না। তাই গোপনে ডাইনি বিদ্যার অনুশীলন করে।

অসিতবরণ চৌধুরীর ‘উইচ কিলিং অ্যামাং দি সানতালস’ বইটি পড়লে কোথাও এমন কথা পাই না যাতে মনে হয় ‘জান’ এবং ‘ডান’ কারোই কোনও অলৌকিক ক্ষমতা-টমতা বলে কিছু নেই। বরং শ্রীচৌধুরীর কথায় সন্দেহ জাগে এ বিষয়ে তাঁর নিজস্ব বিশ্বাস রয়েছে দোদুল্যমান অবস্থায়।

শ্রী চৌধুরীর বিভিন্ন লেখা পড়েও এ বিষয়ে তাঁর মতামত বুঝে ওঠা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাঁর কথায়, ‘মন্ত্র-তন্ত্রসমন্বিত জানগুরুর কার্যকলাপকে আমরা হিতকারী জাদু বা white magic বলে অভিহিত করতে পারি। অনুরূপভাবে, অনিষ্টকারী যেসব ব্যক্তি তন্ত্র-তন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছে, তাঁদের কার্যকলাপকে অহিতকারী জাদু বা black magic আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। সাঁওতাল সমাজে যারা black magic করছে বা জাদু করছে, তাদের ‘ডান’ আখ্যা দেওয়া হয়।

তার মানে? তিনি কি ‘ডান’ সত্যিই আছে কিনা’র উত্তরে জানাচ্ছেন ‘ডানরা black magic করছে?’ এতো ঈপ্সিতা রায় চক্রবর্তীর মত ‘ওয়ার্ল্ড উইচ ফেডারেশন’ –এর সর্বময়কর্তী বলবেন। অসিতবরণ চৌধুরী’র লেখা-পত্তরকে যেখানে আমাদের সমাজের উচ্চকোটির মানুষ ও পত্র-পত্রিকা মূল্যবান বলে মনে করেন, সেখানে তাঁর এই সিদ্ধান্তের পিছনে যুক্তিগুলো কি? এ বিষয়ে জানার আগ্রহ যে কোনও যুক্তিবাদী মানুষেরাই স্বাভাবিক।

শ্রীচৌধুরী লেখাটিতে ঠিক পরের লাইনটিতেই বলেছেন, ‘এখানে এটুকু ব্লাই যথেষ্ট যে সাঁওতাল অধ্যুষিত সব জেলাতেই বহু প্রাণহানি ঘটেছে ‘ডান’ হওয়ার অভিযোগে।‘

না। ‘ডান’ প্রথা বন্ধে এটুকু বলাই যথেষ্ট নয়। বরং মনে হয়েছে- যেহেতু তাঁর লেখা-পত্তর ‘ডান’ প্রথা বিরোধী বলে প্রচলিত, তাই এ বিষয়ে তাঁর আরও সতর্কতা ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন ছিল।

ডাইনি প্রথার মত একটা অমানবিক প্রথার অবসান প্রতিটি মানবিকতায় বিশ্বাসী যুক্তিবাদী আন্দোলনকর্মী, সাংস্কৃতিক আন্দোলনকর্মী আন্তরিকভাবেই চান। যুক্তিবাদী আন্দোলনকর্মী সাংস্কৃতিক আন্দোলনকর্মী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রগতিশীল বিভিন্ন সংস্থা ও মানুষ ডাইনি প্রথার বিরুদ্ধে সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে যাতে আন্দোলনকে সার্থক করে তুলতে পারেন, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই সাঁওতাল সমাজ বিষয়ে কিছু আলোচনায় গিয়েছিলাম। আলোচনা অনেকের কাছে নীরস মনে হতেই পারে, কিন্তু যারা যুক্তিবাদী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আগ্রহী, তাঁদের আগেই জেনে নেওয়া উচিৎ, স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিৎ, কাদের জন্য করছি? কি তাঁদের সমাজ জীবন? কি তাঁদের সমস্যা ইত্যাদি। যাঁদের সামাজিক-অর্থনৈতিক, ধর্মীয় জীবন ও সমস্যা বিষয়ে আমরা অন্ধকারে থাকবো। তাদের সঠিক আলোর সন্ধান দেওয়া দুরুহ।

এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার উল্লেখ করার ইচ্ছেতে রাশ টানতে পারলাম না। সম্প্রতি মদনপুর থেকে একটি তরুণ এসেছিলেন আমার সঙ্গে দেখা করতে। কথা প্রসঙ্গে জানালেন, তিনি একজন যুক্তিবাদী। যুক্তিবাদ বিষয়ক কিছু লেখা লিখতে আগ্রহী। তাঁর ইচ্ছে ‘যুক্তিবাদের চোখে স্বামী বিবেকানন্দ’ এই নামে একটি বই লিখবেন। বললেন, এই বিষয়ে নিরঞ্জন ধরের একটি বই পড়েছেন। আর কি কি বই পড়লে লেখার খোরাক পাবেন, এই বিষয়ে আমার মতামত চাইলেন। বলেছিলাম, আপনার উচিৎ সবার আগে স্বামী বিবেকানন্দকে জানা। তাঁর লেখা-পত্তর ও কাজকর্মের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। তারপর আপনার যুক্তিতে স্বামীজীর লেখাপত্তর বা কাজ কর্মের যেগুলো যুক্তিহীন বা যুক্তি বিরোধী মনে হবে, সেই বিষয়ে আপনি আপনার যুক্তি দিয়ে পাঠকদের বোঝাতে চেষ্টা করুন, কেন আপনার চোখে স্বামী বিবেকানন্দের ওইসব কাজকর্ম যুক্তি বিরোধী।” তরুণটি বললেন, বিবেকানন্দ রচনাবলী তাঁর পড়া আছে। বললাম, তাতে কোনও কিছু যুক্তি বিরোধী মনে হয়েছে কি?

তরুণটি বললেন, -না, তেমন কিছু চোখে পড়েনি। বিবেকানন্দ রচনাবলী থেকেই কিছু কিছু কথা বলে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এসব বিবেকানন্দেরই কথা, আপনি কি মনে করেন, এগুলোর পিছনে যুক্তি আছে? তরুণটি বললেন, “বিবেকানন্দ এ ধরনের কোনও কথা বলেছেন বলে তো কোনও বইতে পাইনি।” একটা ডাইরীর পৃষ্ঠা খুলে কলম বাগিয়ে বললেন, “ঠিক লাইনগুলো কি একটি বলুন না? অথবা বইটির নাম? পৃষ্ঠা সংখ্যা?”

বলেছিলাম, “বিবেকানন্দ রচনাবলী থেকেই কথাগুলো বললাম। আপনি রচনাবলী ভালমত পড়লে কথাগুলো অপরিচিত মনে হত না। বাস্তবিকই যুক্তিবাদী মানসিকতা নিয়ে লিখতে চাইলে যে বিষয়ের বিরোধীতা করতে চান, সেই বিষয়টিকে আগে ভালমত জানার চেষ্টা করুন। তার দোষ-ত্রুটি, দুর্বলতা, যুক্তিহীনতাকে খুঁজে বের করুন, তবে তো ভাল লেখা হবে। আপনি যদি লেখার সর্ট-কার্ট কিছু রাস্তার খোঁজে আমার কাছে এসে থাকেন তো বলব সে বিষয়ে সাহায্য করতে আমি অক্ষম।”

এই প্রসঙ্গে আরও একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ৮৯-এর জানুয়ারী। একটি বিজ্ঞান ক্লাবের অলৌকিক বিরোধী শিক্ষা শিবির পরিচালনা করতে গিয়েছি। এই উপলক্ষে দু’দিনের একটি বিজ্ঞান মেলারও আয়োজন করা হয়েছে। বড়-সড় মেলা। আশেপাশের কয়েকটি জেলা থেকেও এসেছেন অনেক বিজ্ঞান ক্লাব। ব্যবস্থাপক বিজ্ঞান ক্লাবের সম্পাদক এক তরুণ শিক্ষক। আমাকে সম্পাদক জানিয়েছিলেন, শিক্ষণ-শিবিরে আমি যেন আত্মা, জাতিস্মর, প্ল্যানচেট, সম্মোহন, ভূতে ভর, ঈশ্বর ভর এইসব বিষয়ের মধ্যে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখি। জ্যোতিষ নিয়ে আলোচনার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ জ্যোতিষ শাস্ত্র নিয়ে ক্লাবের সভ্যদের জ্ঞান যথেষ্ট গভীর। মনে আছে, আমি একটু মজা করতেই বলেছিলাম, “জ্যোতিষ শাস্ত্রের পক্ষে বক্তব্য রাখি, আমাক আপনারা হারাতে পারবেন তো?” সম্পাদক দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছিলেন, ‘অবশ্যই’।

মাঠের তিনপাশ ঘিরে রঙ্গিন কাপড় দিয়ে তৈরি এক একটি ঘরে এক একটি বিষয় নিয়ে মডেল ও ছবির সাহায্যে বিজ্ঞান বোঝাবার প্রদর্শনী চলছিল। প্রথম দিন বিকেলেই জ্যোতিষ বিষয়ক প্রদর্শনী কক্ষে যুক্তির আক্রমণ চালালেন দুই জ্যোতিষী। একজন স্থানীয় এবং অপরজন নৈহাটির জ্যোতিষী। ওই পক্ষে টাঙান দুটি চার্ট দেখিয়ে জ্যোতিষী দুজন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানালেন, এই পোস্টার দুটিতে দেওয়া তথ্যগুলো ভুল। এবং জ্যোতিষ শাস্ত্রকে মিথ্যা প্রমাণ করতেই মিথ্যাচারিতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞান ক্লাবের অনেকেই বিতর্কে অংশ নিলেন, অংশ নিলেন সম্পাদক স্বয়ং। শেষ পর্যন্ত সম্পাদকই আমাকে ওখানে ডেকে নিয়ে গেলেন। জ্যোতিষী দুজনের অভিযোগের উত্তরে বিনীতভাবেই স্বীকার করে নিলাম, পোস্টার দুটিতেই ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে। একই জন্ম সময় নিয়ে বিভিন্ন জ্যোতিষী বিভিন্ন ধরনের গ্রহ অবস্থান দেখিয়ে ছক করছেন এটা অবিশ্বাস্য। বরং এই ছক তিনটি দেখলে সন্দেহ জাগে, জ্যোতিষ শাস্ত্রকে এবং জ্যোতিষীদের হাসির খোরাক করতে গিয়ে নিজেরাই মিথ্যেচারিতার আশ্রয় নিয়েছেন। দ্বিতীয় পোস্টারটিতে কয়েকটি গ্রহরত্ন বিষয়ে তথ্যগত ভুল ছিল। সম্পাদক জানালেন, তাঁরা এই তথ্যগুলো একটি বিজ্ঞান পত্রিকা থেক সংগ্রহ করেছেন। ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। শর্টকার্ট-এ বাজিমাৎ যে করা যায় না, অন্তত নেতৃত্ব দিতে গেলে প্রতি-আক্রমণের মুখে সামাল দিতে, যাঁদের বিরুদ্ধে আক্রমণ হানবো, তাদের বিষয়ে যথেষ্ট স্পষ্ট ধারণার প্রয়োজন। এর কোন ব্যতিক্রম সম্ভব নয়। নতুবা তেমন আঘাতের মুখে ভেঙ্গে পড়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।

আবার আমার মূল আলোচনায় ফেরা যাক। আদিবাসীদের বা সাঁওতালদের মধ্যে যারা খৃষ্টান বা হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে তারাও কিন্তু ডাইনি বিশ্বাস থেকে মুক্ত হতে পারেন নি। কারণ, সমাজের আশেপাশের মানুষদের ডাইনির প্রতি বিশ্বাস তাঁদের চিন্তা ও বিশ্বাসকে প্রভাবিত করেছিল।

এও দেখেছি সাঁওতাল গ্রামের আশেপাশের শহরের বা গ্রামের ব্রাহ্মণরা পর্যন্ত জানগুরুদের কাছে দৌড়োন নানা বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার আশায়।

ডাইনি ও জানগুরুর অলৌকিক ক্ষমতার প্রতি যে বিশ্বাস বংশপরম্পরায় সমাজজীবনে চলে এসেছে, তারই পরিণতিতে ঘটে চলেছে ডাইনি হত্যার মত বীভৎস প্রথা।

এ সমস্যা সামাজিক অর্থনৈতিক সমস্যা। এর জন্য শুধু আইন নয়, প্রয়োজন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের। অন্ধ-বিশ্বাসী মানুষগুলোকে বোঝাতে হবে ‘ডান’ বা ‘জান’ কারোর কোনও অলৌকিক ক্ষমতা নাই। এসব বোঝাতে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে জানগুরুদের তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতার রহস্য ফাঁস। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অনেকেই উদ্যোগ নিয়ে ডাইনি বিরোধী নাটক লিখছেন।

যদি এমন নাটক আদিবাসী
সমাজের কাছে হাজির করা হয় যাতে
সেই এলাকার জানগুরুদের ঘটানো তথাকথিত
অলৌকিক ঘটনার কৌশলগুলো বুঝিয়ে দেওয়া হবে,
তবে সে নাটকই হবে জানগুরুদের প্রতি সবচেয়ে
বড় আঘাত। জানগুরুদের প্রতি ছুঁড়ে
দেওয়া এই চ্যালেঞ্জ তাদের
অস্তিত্বকেই বিপন্ন
করে তুলবে।

জানগুরুরা বুজরুক, জানগুরুদের কোনও অলৌকিক ক্ষমতা নেই, যুক্তি দিয়ে এই বিশ্বাস মানুষের ভিতর যদি ঢুকিয়ে দেওয়া যায় তবে ডাইনি হত্যা বন্ধের ক্ষেত্রে অনেকটাই এগোন যাবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, বলা সোজা, কিন্তু করা কঠিন, কারণ জানগুরুদের কৌশলগুলো জানবো কেমন করে? উৎসাহী আন্দোলনের সাথীদের উদ্দেশ্যে বিনীতভাবে জানাচ্ছি, আমার সঙ্গে আমাদের সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করলে কৌশলগুলো অবশ্যই তাঁদের হাতে-কলমে বুঝিয়ে দেব। ডাইনির ভর, ডাইনির নজর লাগা মানুষগুলোর ‘আতা-পাতা’ সহ্য করতে না পারার কারণ বিষয়েও নাটকে ব্যাখ্যা থাকতে পারে। আদিবাসী সমাজের শিক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্ব যাঁদের উপর তাঁদের নিয়ে শিক্ষণ শিবির করে শেখাতে হবে ভূতে ভর, জিনের ভর, ডাইনির নজর লাগা, জানগুরুদের অলৌকিক ক্ষমতার রহস্য। ছাত্র-ছাত্রীদের এই বাস্তব সত্যকে জানালে কার্যকর হবে। এই বিষয়ে আমি ও ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি সমস্ত রকমের সাহায্য ও সহযোগিতা করতে তৈরি আছি।

ডাইনি প্রথা রোধে
কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার যদি
আন্তরিক ও নির্ভীক হন তবে এই বিষয়ে
নিশ্চয়ই কার্যকর ভূমিকা নেবে এবং আমাদেরও
সহযোগিতা গ্রহণ করবে। সরকারের যদি এই ধারণা হয়
আদিবাসী সমাজের এই অন্ধ-বিশ্বাসের (যেগুলো
ওঁদের ধর্মের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে
রয়েছে) উপর আঘাত হানলে আদিবাসী
সমাজ ক্ষেপে উঠবে তাহলে
স্পষ্টভাবে জানাই,
এ ধারণা আদৌ
সত্য নয়।

সাঁওতাল সমাজের অনেকেই আজ এই প্রথা থেকে সমাজকে মুক্ত করতে আন্তরিকভাবেই আগ্রহী। সরকার এঁদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে অবশ্যই ডাইনি প্রথা বিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি যুক্ত হবে।

এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই, জানগুরুদের অর্থের লোভ বা রাজনৈতিক ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে অনেক ব্যক্তি বা রাজনীতিক তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে ডাইনি-বিশ্বাসকে কাজে লাগাচ্ছেন। এই স্বার্থভোগীরা যে ডাইনি প্রথা বিরোধী আন্দোলনকে ব্যর্থ করতে সচেষ্ট হবে এই কথা স্পষ্টভাবে মাথায় রেখেই সরকারকে এগুতে হবে।