চর বাড়ীয়া নিবাসী মুন্সি মোবাক্ষার উদ্দিন নামক আমার এক বন্ধুর কাছে এক খানা বই পেলাম। বই খানা উদ্ভিদ বিজ্ঞানের, নাম “গাছপালা”, লেখক বিজ্ঞানাচার্য জগদানন্দ রায়। কিছু দিন পড়বার জন্য বই খানা নিয়ে এলাম এবং দিনে-রাতে বই খানা পড়া শেষ করলাম। উদ্ভিদ জগতের বিজ্ঞান ভিত্তিক কিছু কিছু তত্ত্ব পাঠ্য বইয়ে আগে পড়েছি, এরূপ ধারাবাহিক ভাবে বিস্তৃত বিবরণ আর কখনো পড়িনি। বই খানা পড়ে আমার মনে হল যে, উদ্ভিদ জগতের তত্ত্ব জানতে আর যেন কিছু বাঁকি নেই। কিন্তু সমস্ত বইখানা পড়ে আমার যে লাভ হল, তার চেয়ে বেশি লাভ হল শেষের অতিরিক্ত পাতাটি পড়ে। ওখানে ছিল গ্রন্থকারের প্রণীত আরো কতিপয় বইয়ের তালিকা।

মানুষের নামের সাথে প্রায়ই চেহারা চরিত্রের মিল থাকে না। লালচাঁদ কালো এবং কালাচাঁদ সুন্দর হতে পারে এবং “সুধীর” নামের ব্যক্তিও চঞ্চল হতে পারে। কিন্তু বই পুথির নামের সাথে উহার চরিত্রের অর্থাৎ আলোচ্য বিষয়ের মিল প্রায়ই থাকে।

এমন অনেক বিষয় আছে, যা জানবার জন্য আমি একান্তই আগ্রহী, অথচ তার ছিটে ফোটা বিবরণ ছাড়া পাঠ্য পুস্তকাদি আশানুরূপ কিছু জানতে পাইনি। সেই সবের মধ্যে এক একটি বিষয় নিয়ে এক একখানা বইয়ের নাম দেখে আমি হর্ষোৎফুল্ল হলাম এবং তালিকাটি থেকে আমার ইপ্সিত কয়েক খানা বই নির্বাচন করলাম। যথা- গ্রহ-নক্ষত্র, পোকা-মাকড়, শব্দ, আলো, তাপ, চুম্বক, স্থির বিদ্যুৎ, চল বিদ্যুৎ, পাখী, মাছ, ব্যাং, সাপ ইত্যাদি। বই গুলোর প্রাপ্তিস্থান-ইন্ডিয়ান পাবলিশিং হাউজ, ২২/১ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রিট, কলিকাতা।

অবিলম্বে আমি উক্ত ঠিকানায় একখানা চিঠি লেখলাম বই গুলো পাঠাবার জন্য কিন্তু “বইয়ের মূল্য বাবদ কিছু অগিম পাঠানো হল না” বলে নিশ্চিত হলাম না। তথাপি দিন দশের মধ্যে একটি ভি, পি, এলো, দাবী তের টাকা। টাকা দিয়ে পার্সেলটি রেখে দিলাম (১৮/৭/৩৮) এবং খেয়ে না খেয়ে বই গুলো পড়তে শুরু করলাম।

আমার একটি স্বভাব হচ্ছে এই যে, কোন নূতন বই হাতে পেলে, ওটা পড়ে শেষ না করা অবধি আমার স্বস্তি থাকে না, অন্য কাজে মন বসে না। পড়তে শুরু করলে- আহারের সময় পেরিয়ে যায়, চক্ষে ঘুম আসে না, অন্য কাজের কথা স্মরণ থাকে না; মুখেতে সিগারেট থাকে নিভে। বই গুলো পড়ে শুধু শেষ করলাম না- কতগুলো পড়লাম কয়েকবার; চুম্বক, স্থির বিদ্যুৎ ও চল বিদ্যুৎ পড়লাম বহুবার এবং গ্রহ-নক্ষত্র খানাকে করলাম জীবন সঙ্গী।

বাংলা ভাষায়ে- কঠিন ও প্যাচানো বিষয় সমূহের এতাধিক সরল ও রসালো বর্ণনা আচার্য গেদানন্দ রায়ের লেখা ভিন্ন আমি আর কোথায়ও দেখিনি। কবি সম্রাটের “গ্রান তত্ত্ব” ও “বিশ্ব পরিচয়” নামক গ্রন্থদ্বয়ও সরল ভাষায় রচিত। কিন্তু রায় সাহেবের এ বই গুলোর মত রসালো নয়। বই গুলো পড়ে মনে হয় যেন গল্পের বই পড়ছি। রায় সাহেব পরিবেশন করেছেন ছোটদের ভোজ্য। কিন্তু ইহা ভোজনে তৃপ্ত হন বড়রাও।

বিজ্ঞান জগতের যাবতীয় আবিষ্কৃত পদার্থের মধ্যে বিদ্যুৎ সর্বাপেক্ষা চমকপ্রদ এবং ব্যাপক ব্যবহার্য  পদার্থ। শহরে, বন্দরে, পল্লীতে, নদীতে সর্বত্র- কোন না কোন রূপে এর ব্যবহার চলছে অহর্নিশ। রায় সাহেবের “চল বিদ্যুৎ” নামক বইখানা আমাকে প্রেরণা দিল নিজ হাতে বিদ্যুৎ তৈরি করবার এবং সে জন্য আমি সচেষ্ট হলাম।

১১/৬/৮১ বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল প্রণালী দুটি- রাসায়নিক ও যান্ত্রিক। রাসায়নিক বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা সহজ, কিন্তু ইহাতে বিদ্যুৎ হয়- পরিমাণে অল্প ও ক্ষণস্থায়ী। আর যান্ত্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে হাঙ্গামা অনেক। কিন্তু এতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ হয়- পরিমাণে বেশি এবং দীর্ঘস্থায়ী।

প্রথমে আমি রাসায়নিক বিদ্যুৎ তৈরীর জন্য মনোযোগী হলাম। তামা, দস্তা ও সালফিউরিক সংগ্রহ করলাম। সাত ভাগ পানি ও এক ভাগ এসিড মিশিয়ে একটি গ্লাসে রেখে তন্মধ্যে ডুবালাম একটি তামা ও একটি দস্তার দন্ড। ফুট খানেক লম্বা দুটি তামার তারের দুপ্রান্ত যুক্ত করলাম তামা ও দস্তার দন্ডের মাথার সঙ্গে এবং অপর দুপ্রান্ত যোগ করলাম- একটি টর্চের ব্যাটারীর- ধণাত্মক ও ঋণাত্মক প্রান্তে। এতে  বাল্বটি জ্বলে উঠল। কিন্তু আলো হল অতিক্ষন ও লালচে এবং থাকল দু এক মিনিট মাত্র।

যান্ত্রিক উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদক যন্ত্রটিকে বলা হয় “ডাইনামো”। উহা তৈয়ারে হাঙ্গামা থাকলে ও মোটামুটি সহজ। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল সূত্রটি হল- চুম্বকের বলরেখা বা বলক্ষেত্রের মধ্যে কোন বেষ্টনী বা কয়েল ঘুরালে কয়েলের তারে বিদ্যুৎ জন্মে। কয়েলের তারের প্যাচের সংখ্যা ও ঘূর্ণনের মাত্রা যত বাড়ানো যায়, তারের বিদ্যুতের পরিমাণ তত বাড়ে।

লোহাকে চুম্বকে পরিণত করা কঠিন কাজ নয়। চুম্বক অনেক বানিয়েছি ও তদ্বারা কম্পাস (দিগদর্শন যন্ত্র) তৈরি করেছি। কয়েল তৈরীতেও তেমন কোন হাঙ্গামা নেই। প্রধান সমস্যা হল কয়েলটাকে ঘুরানো নিয়ে। তা হাতের বা পায়ের সাহায্যেও ঘুরানো চলে। আমি সেলাইয়ের মেশিনের ন্যায় পায়ে চালানো একটা ডাইনামো যন্ত্র বানাবার পরিকল্পনা করলাম। বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্দেশ্য আমার এই নয় যে, ওর দ্বারা বাতি জ্বালিয়ে বাড়ি আলোকিত করব বা পাখা চালিয়ে বাতাস খাব। আমার উদ্দেশ্য হল নিজ হাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কৌতূহল নিবৃত্তি করা।

আর্মেচার ও চুম্বক বানাবার জন্য লোহা এবং কমিউটেটর বানাবার জন্য পিতল সংগ্রহ করলাম। কিন্তু কয়েল বা বেষ্টনীর জন্য তামার তার সংগ্রহে পেলাম বাধা। অনেক খোঁজ করেও বরিশালে ১০০ ফুটের বেশি তামার তার পেলাম না। বেষ্টনীর তার ইনসুলেট করার জন্য পীচ ও আলকাতরা কিনে নিলাম। লোহা ও পিতল- কাটা ও ফুটো করার জন্য ছেনী ও ক্যাছলা সংগ্রহ করে কাজ শুরু করলাম।

কোন লৌহ দন্ডের উপর ইনসুলেট (কোন অপরিচালক পদার্থের দ্বারা তার আবৃত করা) করা তামার তার জড়িয়ে ঐ তারে বিদ্যুৎ প্রবাহ চালালে লৌহ দন্ডটি চুম্বকে পরিণত হয় এবং ওটাকে বাঁকিয়ে (ঘোড়ার পায়ের নালের মত) প্রান্তদ্বয় কাছাকাছি আনলে, প্রান্তদ্বয়ের ফাঁকে চুম্বকের বলক্ষেত্র তৈরী হয়। ঐ বলক্ষেত্রে রেখে কয়েল বা আর্মেচার ঘুরালে আর্মেচারের তারে বিদ্যুৎ সৃষ্টি হয়।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x