বেশিদিনের কথা নয়। পঞ্চাশ বছর আগেও কলকাতা আর তার আশেপাশে সন্ধ্যার পর শ্যাওড়া কি তেঁতুল গাছের তলা দিয়ে যেতে গা ছমছম করত। মাঝে-মধ্যে নাকি সেসব জায়গায় অদ্ভুত সব ভূতদের দেখা পাওয়া যেত। এক সময় কলকাতায় ভূতুরে বাড়িও কম ছিল না। এককালে খাস কলকাতাতেই বাঁকি দেখা যেত সাহেব ভূত ভূতুরে ঘোড়ায় চেপে জ্যোৎস্নার ভিতর দিয়ে টগবগিয়ে চলে যাচ্ছে। কলকাতার বহু বনেদী বাড়ির জলসা ঘরে বেলোয়ারী কাঁচের টুং-টাং আওয়াজের সঙ্গে ঘুঙ্গুরের বোল তুলত কোন বিদেহী বাঈজী। বহু পাষাণ প্রাসাদেই ঘুরে বেড়াত ক্ষুধিত আত্মা।

আজ সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও নেই। আগের সেই রহস্যময় কলকাতা আজ  বড় বেশি শুষ্কং কাষ্ঠং হয়ে পড়েছে। কলকাতা আজ এতো বেশি মুখর হয়ে উঠেছে যে আজকাল সেইসব ভূতদের আর দেখাই পাওয়া যায় না। জানিনা কলকাতা থেকে উদ্বাস্তু হওয়া ভূতদের কোথায় পুনর্বাসন হয়েছে আজ? শহর কলকাতা যখন ভূতদের বিরহে নেহাতই কাঠ-কাঠ, এমনই সময় ১৯৮২-র ২১ এপ্রিল আনন্দবাজার দারুণ এক স্কুপ নিউজ ছাড়ল। সকালে আনন্দবাজার হাতে পেতেই বাড়িতে, চায়ের আড্ডায়, পাড়ার মোড়ে, স্কুল-কলেজে, অফিস-পাড়ায়, হৈ হৈ পড়ে গেল- আলিপুরে পুলিশ ভুত পাওয়া গেছে। প্রথম পাতায় চার কলম জুড়ে দারুণ গুরুত্বের সঙ্গে খবরটা প্রকাশ করেছে আনন্দবাজার –

গভীর রাতে ট্যাকসির এক নিরুপদ্রব সওয়ার

“স্টাফ রিপোর্টারঃ এক পুলিশ অফিসারকে নিয়ে পুলিশ মহল তোলপাড়। হাজার মাথা ঘামিয়েও তার রহস্যের কিনারা করতে পারছেন না গোয়েন্দারা। সম্প্রতি জয়েকজন ট্যাক্সিচালক পুলিশকে জানিয়েছেনঃ আলিপুর চিড়িয়াখানার কাছে পেট্রোল-পাম্পের সামনে থেকে রাত একটা থেকে দুটোর মধ্যে খাকি পোশাকের এক পুলিশ হাত দেখিয়ে ট্যাকসি থামাচ্ছেন। গাড়ির পিছনের সিটে বসেই তিনি ফিসফিসিয়ে ড্রাইভারকে বলছেনঃ ‘কোই ডর নেহি।’ তারপর কিছুদূরে রেসকোর্সের কাছে বাঁক নেবার জন্য গতি সামান্য কমাতেই খুট করে শোনা যাচ্ছে দরজা খোলার শব্দ। ঘাড় ঘুরিয়ে ড্রাইভার দেখছেন কেউ নেই। ওই ‘অফিসার’ মিলিয়ে যাচ্ছেন অন্ধকারে। প্রথমে এ ধরনের অভিযোগে তেমন আমল না দিলেও সংশ্লিষ্ট থানায় পরপর দু’তিনজন ট্যাকসি চালক এসে একই কথা বলায় পুলিশ খোঁজ খবর নিতে শুরু করে। নানাভাবে নানা দিক থেকে শুরু হয় রহস্যের জট খোলার। সন্তোষজনক কোনও সিদ্ধান্তে তাঁরা পৌঁছাতে পারেন নি এখনো। যে সব অভিযোগ থানায় এসেছে তা খুঁটিয়ে দেখা যাচ্ছে। ওই ‘পুলিশ অফিসারটির’ কোনও ক্ষতিকারক প্রবণতা নেই। পরপর একই জায়গা থেকে তিনি ট্যাকসি থামিয়ে একইভাবে হঠাৎ নেমে পড়ছেন ট্যাকসি থেকে। তাঁর চেহারার যা বর্ণনা মিলছে তাতে দেখা যাচ্ছে তিনি লম্বা-চওড়া সুপুরুষ। অতঃপর মাটির পৃথিবী ছেড়ে তাঁদের তদন্ত এগিয়েছে অন্য জগতে। পুরানো অফিসারদের একজন নথি ঘেঁটে বের করেছেনঃ চুয়াত্তর সালে ঠিক ওইখানেই এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন সশস্ত্র এক পুলিশ ইন্সপেক্টর। বর্ণনার সঙ্গে তাঁর চেহারার অবিকল মিল। গভীর রাতে লাইটপোস্টের সঙ্গে মুখোমুখি ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী ওই ইন্সপেক্টর মারা যান। তিনি থাকতেন বডি-গার্ডস লাইনে। পড়তেন খাকি পোশাক। নিঃসন্তান ওই ইন্সপেক্টরের স্ত্রীও ছিলেন এক সাব-ইন্সপেক্ট্রেস। তাঁর মৃত্যুর বছর খানেক পরে তাঁর স্ত্রীও মারা যান। গোয়েন্দা অফিসাররা এখন শান্তি-স্বস্ত্যয়নের কথা ভাবছেন।”

চোর ভূত, ডাকাত ভূত, প্রেমিক ভুত, নর্তকী ভূত, সাহেব ভূত, কুকুর ভূত, বন্ধু ভূত এ সবের অনেক গপ্পো পড়েছি ও শুনেছি। কিন্তু পুলিশ ভূত নিয়ে খবর কাগজের ঢাউস খবর বাস্তবিকই ফ্যান্টস্টিক! একটা প্রথম শ্রেণীর পত্রিকায় পরিবেশিত খবর মানেই সত্যির গ্যারান্টি!

অনেকেই বললেন, “আত্মা যে অমর, ভূতের অস্তিত্ব যে বাস্তবিকই আছে আনন্দবাজার তা হাতে-নাতে প্রমাণ করে দিল।”

রাস্তায়-ঘাটে অফিস কাছারিতে আমাকেও কম প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হল না- “এবারও কি বলবেন, ভূত বলে কিছু নেই? আনন্দবাজারের কথা মিথ্যে প্রমাণ করতে পারবেন?”

বাড়িতে স্ত্রীর হাত থেকে রেহাই নেই। বাইরে সেও নাকি আমার জন্য অপদস্ত হচ্ছে, আর আমি নাকি নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছি। এক প্রবীণ ও বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী নাকি সীমাকে খোঁচা দিয়ে বলেছেন, “কি হে, তোমার কর্তা এখন কি বলেন? ভূত আছে তো? নাকি খবরটাকেই মুখের জোরে অস্বীকার করতে চান?”

সেখানে উপস্থিত সীমার কিছু বান্ধবীও ওই সঙ্গীত শিল্পীকে সমর্থন করে এই বিষয়ে আমাকে মুখ খুলতে বলেছেন।

আনন্দবাজারে প্রকাশিত খবরটিকে বিশ্বাস করলে বিজ্ঞানকেই অবিশ্বাস করতে হয়। কিন্তু প্রকাশিত খবরটি যে সাধারণের মধ্যে অসাধারণ বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে- এই সত্যটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই।

এক্ষেত্রে অনুসন্ধান, পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে অনুসন্ধানে না এসে শুধুমাত্র লেখার অক্ষরকে বিশ্বাস করলে অনেক আদ্যন্ত মিথ্যেকে নির্ভেজাল সত্য বলে বিশ্বাস করতে হয়।

সত্যি ভূতের ও সত্যি অলৌকিক ঘটনার কলপ কাহিনী প্রতিনিয়ত ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়েই চলেছে এবং যতদিন পাঠক-পাঠিকারা এই ধরণের অলৌকিক কিছুর খবর তীব্র আগ্রহ নিয়ে পড়বেন, ততদিন পত্র-পত্রিকাগুলোও পাঠক-পাঠিকারা ‘যে খবর খান’ সে ধরনের খবরই ছেপে যাবেন আর্থিক লাভের আশায়। অথচ আজ পর্যন্ত একটি অলৌকিক ঘটনা বা আত্মার অস্তিত্ব কোনও ধর্মগুরু, প্যারাসাইকোলজিস্ট বা কোনও পত্র-পত্রিকা বিজ্ঞানের দরবারে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধরা পড়েছে ফাঁক আর ফাঁকি।

***                ***             ***               ***

ভূতের বিষয়ে সঠিক খবর পাওয়ার আশায় প্রথমেই যোগাযোগ করলাম সে সময়কার কলকাতার পুলিশের ট্র্যাফিক বিভাগের তথ্যটি পুলিশ কমিশনার শ্রী শিবনাথ রায়ের সঙ্গে। সহযোগিতাপূর্ণ ব্যবহার পেলাম তাঁর কাছে।

প্রকাশিত পুলিশ খবরটার সম্বন্ধে তিনি কিছু খবর রাখেন কি না জিজ্ঞেস করতেই বললেন- “হ্যাঁ, পত্রিকায় খবরটা পড়েছি বটে, তবে ওই পর্যন্তই -“

“সে কি!” আমি আঁতকে ওঠার ভান করি, এই ব্যাপারে পুলিশ মহল তোলপাড়। পরপর কয়েকজন ট্যাক্সিচালক নাকি সংশ্লিষ্ট থানায় এসে ভূত সম্বন্ধে অভিযোগও করে গেছে -“

” না মশাই, আলিপুর থানা কেন, কোন থানাতেই এই ধরনের রিপোর্ট বা ডাইরীর খবর আমাদের কাছে নেই।”

“এই বিষয়ে আপনার নিজস্ব কোন মতামত…”

“এই বিষয়ে কি আর বলব? বলতে পারি, খবরটা শুধু পত্রিকায় দেখেছি। আমাদের কাছে ভূতের কোন খবর নেই। এই বিষয়ে আরও খবর পেতে আপনি বরং সরাসরি, আলিপুর পুলিশ স্টেশনে যোগাযোগ করুন।”

যোগাযোগ করলাম আলিপুর পুলিশ স্টেশনের সঙ্গে।

উনত্রিশে জুনের দুপুর। অফিসার ইনচার্জ শ্রী তারেক গাংগুলী সে সময়ে উপস্থিত ছিলেন না থানায়। কোন কাজে বেরিয়ে ছিলেন। ডিউটি অফিসার এ. এস. আই. শ্রী পি.কে. নাগের সঙ্গে কথা হল। যথেষ্ট সহযোগিতা করলেন তিনি।

শ্রী নাগ জানালেন, “না মশাই, এ যাবৎ এই থানায় কোন ট্যাক্সি-ড্রাইভার এই ধরনের কোন ধরনের ডাইরি তো দূরের কথা কোন রিপোর্টও করেনি। পত্রিকা বিশেষ করে যে জায়গাটার কথা বলেছে সেখানে আমাদের পুলিশ কনস্টেবল সারারাত পাহারা দেয়। তারাও ভূত নিয়ে কোন দিন কোন রিপোর্ট করেনি।”

হায়! ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো আমার বুক ঠেলে। শেষ পর্যন্ত এমন একটা রোমাঞ্চকর ভূতুরে ব্যাপার নেহাৎই মাঠে মারা যাবে?

শেষ চেষ্টা হিসেবে জলে ডোবার আগে খড়কুটো ধরার মত ধরলাম কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তরের ডেপুটি কমিশনার নম্বর ওয়ান শ্রী সুবিমল দাশগুপ্তকে। স্মার্ট চেহারার অসাধারণ ঝকঝকে চোখের অধিকারী সুবিমলবাবুকে পুলিশ ভূতের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনাদের গোয়েন্দারা নাকি হাজার শান্তি-স্বস্ত্যয়নের কথা ভাবছেন?”

সপ্রতিভ কন্ঠে শ্রী দাশগুপ্ত উত্তর দিলেন, “ওই মিথের ব্যাপারটা পুরোপুরি মিথ্যে। এমন কোন ঘটনাই আদপে ঘটেনি, সুতরাং আমাদের দপ্তরের মাথা ঘামাবারও কোন প্রশ্নই ওঠে না।”

এরপর যোগাযোগ করি ট্যাক্সি-ড্রাইভারস ইউনিয়নের সঙ্গে। সাধারণ সম্পাদক শিশির রায় জানান, তাঁরা অনেকেই ঘটনাটা শুনেছেন, কিন্তু কেউই প্রত্যক্ষদর্শী নন। অনেকে অবশ্য ওই পথ বর্জন করে চলেছেন।

আমার কাছে যেটা বিস্ময়কর মনে হয়েছে সেটা হল, এমন একটা বিদঘুটে মিথ্যে খবর আনন্দবাজারের মত নামী-দামী পত্রিকা এত গুরুত্ব দিয়ে প্রথম পৃষ্ঠাতেই  ছাপাল কি করে? অদ্ভুতুরে খবরটি দেখে বার্তা-সম্পাদক বা সম্পাদকের কারোও কি একবারের জন্যেও মনে হয়নি, খবরটির সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজন আছে”

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x