রেভারেন্ড পি ও বডিং-এর লেখা থেকে ব্রিটিশ আমলের সাঁওতাল পরগনার এক সহকারী কমিশনারের কথা জানতে পারি, যিনি অদ্ভুত কৌশলে অনেক ঘোষিত ডাইনির জীবন বাঁচিয়েছিলেন। ঘটনাটা ঘটাতেন অনেকটা সীতার অগ্নি পরীক্ষার ধাঁচে। সহকারী কমিশনার সাহেব ব্যাটারি চালিত বিদ্যুৎ সৃষ্টির একটি জাদু-দন্ড তৈরি করিয়েছিলেন। কাউকে ডাইনি ঘোষণা করা হয়েছে খবর পেলেই জাদু-দন্ডটি নিয়ে সেই গ্রামে হাজির হয়ে যেতেন। যে জানগুরু বা জানগুরুরা ডাইনি ঘোষণা করেছে তাদের হাজির করতেন আদিবাসীদের সামনে। আনা হতো ঘোষিত ডাইনিকেও। সাহেব এবার জনসমক্ষে জানাতেন এই আশ্চর্য দন্ড কোনও মিথ্যাচারী স্পর্শ করলে তার শরীরে আকাশের বজ্র এসে আঘাত করবে। মৃত্যু না হলেও অনুভব করবে মৃত্যু যন্ত্রণা। সত্যভাষীদের এই দন্ড স্পর্শে কোনও বিপদ ঘটবে না। তারপর সাহেব জানগুরুদের দিয়ে ঘোষণা করাতেন কে ডাইনি। ঘোষণার পর জানগুরুরা দন্ড ছুঁতেন। সাহেব দন্ডে প্রবাহিত করতেন বিদ্যুৎ। জানগুরুরা বিদ্যুৎ তরঙ্গের আঘাতের আকস্মিকতায়, তড়িতাহত বিষয়ে অজ্ঞতায় ভীত আতঙ্কিত হয়ে আর্তনাদ করে উঠতেন। এবার ঘোষিত ডাইনিকে ডেকে জিজ্ঞেস করতেন, “তুমি কি ডাইনী?” মেয়েটি জানাতেন, “না”, এবার মেয়েটিকেও দন্ড স্পর্শ করতে হতো। সাহেব এবার দন্ডে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করতেন না। আদিবাসী সমাজ এমন একটা অসাধারণ প্রমাণ পেয়ে বিশ্বাস করে নিতেন, মেয়েটি নির্দোষ। জানগুরুরা মেয়েটির প্রতি কোনও আক্রোশ মেটাতে ডাইনি বলে ঘোষণা করেছিল।

সাহেব নাকি প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই কৌশল প্রয়োগ করে ঘোষিত ডাইনিদের প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

এবারের ঘটনাস্থল নদীয়া জেলার বেথুয়াডহরী। সময় ৮৯-র জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহ। গিয়েছিলাম বেথুয়াডহরী বিজ্ঞান পরিষদ আয়োজিত একটি বিজ্ঞান মেলায় বিজ্ঞান শিক্ষণ শিবির পরিচালনা করতে। খবর পেলাম বেথুয়াডহরীর উপকন্ঠে এক সাঁওতাল পল্লীতে এক রমণীকে ‘ডাইনি’ ঘোষণা করা হয়েছে। এই নিয়ে গ্রামে যথেষ্ট উত্তেজনা রয়েছে। বিজ্ঞান পরিষদের সক্রিয় তরুণের সংখ্যা প্রচুর। তাঁরা ওই গ্রামের কয়েকজন মাতাব্বরকে হাজির করলেন আমার কাছে। ওঁদের কাছে আমার পরিচয় দিয়েছিলেন কলকাতার বড় গুণীন হিসেবে। কথা বলে জানলাম, গত ছয় মাসে ওদের পল্লীর সাত জন মারা গেছেন। ডাইনিই নাকি ওদের খেয়েছে। এক জানগুরুর কাছে ওরা গিয়েছিলেন গাঁয়ের মাঝিকে নিয়ে। জানগুরুকে তেল-সিঁদুর দিতে শালপাতায় তেল ছিটিয়ে, ধূনো জ্বেলে, শাঁখ ঘণ্টা বাজিয়ে মন্ত্র পড়ে শেষে শালপাতা দেখে জানিয়েছেন মৃত্যুর কারণ ডাইনি। যার বউকে ডাইনি ঘোষণা করা হয়েছিল তিনিও এসেছিলেন। ওঁদের বললাম, “আমি কাল দুপুরে যাব, তোমাদের গাঁয়ের সকলকে হাজির থাকতে বোলো।”

পরের দিন গেলাম। সঙ্গী বিজ্ঞান পরিষদের বহু তরুণ, আমার পুত্র পিনাকী ও স্ত্রী সীমা। আমরা ঘুরে ঘুরে ওদের ছোট্ট গ্রাম দেখছিলাম। পরিচ্ছন্ন গ্রাম।। গ্রামের মানুষ ভিড় করে এলেন। একটা খাটিয়া পেতে দিলেন পরম যত্নে। ওঁদের সঙ্গে গল্প করলাম। ওঁদের গান গাইতে অনুরোধ করলাম। গান শুনলাম, মাদলের তালে তালে। এবার শুরু করলাম যে জন্য আসা, সে কাজের প্রস্তুতি। একটা মাটির পাত্র দিতে বললাম। পাত্র এলো। পাত্রের উপর স্তূপ করলাম আখের শুকনো ছিবড়ে। একটা ছোট্ট বাটিতে করে জল দিতে বললাম, জল এলো। এবার একটা আতা পাতা ছিঁড়ে বিড়বিড়; করতে করতে গ্রামের চারপাশটা ঘুরলাম, আর মাঝে মাঝে আরা পাতায় জল তুলে মাটিতে ছেটাতে লাগলাম। ঘোরা শেষ হতে এসে বসলাম মাটির সরার কাছে। পাশে রাখলাম জলের বাটিটা। জানালাম সত্যের অগ্নি-পরীক্ষা নেব। কিছুক্ষণ ‘অং-বং’ মন্ত্র পড়ে বললাম, “এ গ্রামের যে কতজন গত ছ-মাসে মারা গেছেন, তাঁদের একজনকে যদি ‘ডাইনি’তে খেয়ে থাকে তবে মন্ত্র শক্তিতে এই মাটির পাত্রে আগুন জ্বলে উঠবে।”

বাটির জল নিয়ে আখের শুকনো ছিবড়ের উপর ফেললাম, আগুন জ্বলল না। গ্রামের মানুষগুলোর মধ্যে সামান্যতম উত্তেজনা লক্ষ করলাম না। বুঝলাম, আগুন না জ্বলাটাই স্বাভাবিক ঘটনা বলে ওরা ধরে নিয়েছে।

এবার বললাম, “গত ছ-মাসে যারা মারা গেছেন তাঁদের কাউকেই যদি ডাইনি না খেয়ে থাকে, ঠিকমত ওষুধ না খাওয়ায় মারা গিয়ে থাকে, তবে জল ঢাললেও আগুন জ্বলবে।”

আতা পাতায় জল তুলে ছিবড়েতে ঢালতেই আগুন জ্বলে উঠলো। এমন একটা অদ্ভুত ঘটনা দেখে বাচ্চা-বুড়ো, পুরুষ-মহিলা সকলেই উত্তেজনায় সোরগোল তুললেন।

শেষ পর্যন্ত কিন্তু ওই পল্লীর সাঁওতালরা বিশ্বাস করেছিলেন, জানগুরুর ক্ষমতা নেই। জানগুরুর জড়িবুটিতে তাই রোগ সারেনি। ব্যর্থতা ঢাকতে একটা নিরীহ মানুষকে ডাইনি বলেছিল।

জানি, যে পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে সেদিন একজন ঘোষিত ডাইনিকে বাঁচিয়েছিলাম, সে রকমভাবে একজনকে শুধু বাঁচানো যেতে পারে মাত্র, কিন্তু এর দ্বারা আদিবাসী সমাজ থেকে ‘ডাইনি’ ও ‘জানগুরু’দের অলৌকিক অশুভ ও শুভ ক্ষমতা বিষয়ে গড়ে ওঠা অন্ধ বিশ্বাস দূর হবে না।

আদিবাসীদের মধ্য থেকে কুসংস্কারের অন্ধকার দূর করা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার, এ বিষয়ে আগেই আলোচনা করেছি। তবু একটি হত্যা রোধ করতে তাৎক্ষণিক আর কোনও উপায় আমার জানা ছিল না।

যেভাবে আগুন জ্বালিয়েছিলাম, তার মধ্যে যে কোনও অতিপ্রাকৃতিক ব্যাপার না, এটা নিশ্চয়ই নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বিজ্ঞান পরিষদের ছেলেদের সাহায্যে দুটি জিনিস সংগ্রহ করেছিলাম- পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও গ্লিসারিন। সবার দৃষ্টির আড়ালে আখের ছোবড়ায় ফেলে দিয়েছিলাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট। গ্রাম ঘোরার সময় বাটির পুরো জলটাই ছিটিয়ে বা ফেলে শেষ করে দিয়েছিলাম। হাতের কৌশলে, সবার নজর এড়িয়ে বাটিতে ঢেলে দিয়েছিলাম গ্লিসারিন।

প্রথম দফায় গ্লিসারিন ঢেলে ছিলাম ছিবড়ের সেই জায়গাগুলোতে, যেখানে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট নেই। দ্বিতীয় দফায় গ্লিসারিন ঢেলেছিলাম পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের গুঁড়োর উপর। পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট গ্লিসারিনের সংস্পর্শে এসে তাকে অক্সিডাইজ করেছে। অক্সিজেনের ফিজিক্যাল পরিবর্তনের ফলে ওই রাসায়নিকের উত্তাপ বেড়ে গিয়ে এক সময় আগুন জ্বলে উঠেছে।

যেখানে গ্রামবাসীরা ঘোষিত ডাইনিকে গ্রাম ছাড়া করেছে অথবা ‘এখুনি’ হত্যা করবেন না মনে হচ্ছে, সেখানে গ্রামবাসীদের অন্যভাবে সত্যকে বোঝান যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে একটা ঘটনা তুলে দিচ্ছি।

এবারের ঘটনাস্থল মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘী ব্লকের চাঁদপাড়ার সাঁওতাল পল্লী। সালটা ১৯৫৮। ঈশ্বর সোরেন বছর কুড়ির এক তরুণ, কিছুদিন ধরে কাশতে কাশতে রক্ত বের করে ফেলেছিল মুখ থেকে। শরীরও শীর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। এমনটা কেন হচ্ছে? ঈশ্বরের বাবা ছোট সোরেন জানগুরুর জড়িবুটি খাওয়াচ্ছিল কিন্তু তাতে কোন কাজ হচ্ছিল না। জানগুরু শেষে জানাল ঈশ্বরকে ডান খাচ্ছে। ডান কে তাও জানাল। ঈশ্বরের বিমাতা চুরকীই ঈশ্বরকে খাচ্ছে।

চুরকীকে ডাইনি ঘোষণা করায় প্রাণ বাঁচাতে চুরকী বাপের বাড়ি পালিয়ে যায়। বাপের বাড়ি কাছেই পশুই গ্রামে।

মনিগ্রাম বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রে ঈশ্বর লেখাপড়া শিখতে আসতেন। শিক্ষক কমলারঞ্জন প্রামাণিকের সন্দেহ হল ঈশ্বরের টি বি রোগ হয়েছে। কমলারঞ্জন গ্রামের মানুষদের বোঝালেন ঈশ্বরের এক ধরনের অসুখ হয়েছে। এই অসুখে এমনিভাবেই মুখ দিয়ে রক্ত পড়ে। চুরকী যে ঈশ্বরকে খাচ্ছে এ কথা কেউ প্রমাণ করতে পারবে? গ্রামের অনেকেই যদি প্রত্যক্ষদর্শী বলে দাবি করে জানিয়েছিলেন তাঁরা দেখেছেন চুরকী ডাইনি। কিন্তু কি দেখেছে, যাতে ডাইনি বলে জানতে পেরেছে- কমলারঞ্জনের এই প্রশ্নে অনেকে অস্বস্তিতে পড়েছেন। শেষ পর্যন্ত কমলারঞ্জন ঈশ্বর ও ছোট সোরেনের সমর্থন পেয়ে অন্যদের রাজি করাতে সমর্থ হয়েছিলেন। বহরমপুর সদর হাসপাতালে বুকের ছবি তুলে চিকিৎসক জানালেন টি বি হয়েছে। চিকিৎসক কমলারঞ্জনের কাছে পূর্ব-সমস্যার কথা শুনে ঈশ্বরকে বোঝালেন, কেন এই রোগ হয়েছে, কিভাবে চিকিৎসা করতে হবে। চিকিৎসা শুরু হল। পরবর্তীকালে কমলারঞ্জন ঈশ্বরকে হাজির করলেন গ্রামের মানুষদের সামনে। ঈশ্বর জানালেন চিকিৎসকের মতামত। মানুষগুলো কিন্তু যুক্তি মেনে নিলেন। মেনে নিলেন চুরকী ডাইনি নয়। ছোট সোরেন চুরকীর গ্রামবাসীদের ৬০ টাকা জরিমানা দিয়ে চুরকীকে ফিরিয়ে আনেন। তিন ছেলে এক মেয়ে নিয়ে চুরকীর এখন ভরা সংসার।