হিস্টিরিয়া ছাড়া ম্যানিয়াক ডিপ্রেসিভ রোগীরাও অনেক সময় নিজেদের মধ্যে ঈশ্বরের সত্তার প্রকাশ ঘটেছে বলে বিশ্বাস করে অদ্ভুত সব কান্ডকারখানা করতে থাকেন, যা স্বাভাবিক অবস্থায় সম্ভব নয়। ম্যানিয়াক ডিপ্রেসিভ রোগীরাও বেশির ভাগই অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত এবং কুসংস্কারেও ধর্মীয় বিশ্বাসে আচ্ছন্ন। আক্রান্তদের বেশির ভাগই মহিলা এবং বিবাহিতা। পারিবারিক জীবনে এরা অনেক সময়ই অসুখী এবং দায়িত্বভারে জর্জরিত। এবং তার দরুন মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত। বছর তিরিশ আগের ঘটনা। খড়্গপুরের চিন্তামণি বাড়ি বাড়ি বাসন মাজার কাজ করত। যখনকার ঘটনা বলছি তখন চিন্তামণি তিনটি ছেলেমেয়ের মা। স্বামী রেল ওয়াগান ভেঙ্গে মাঝে-মধ্যে নানা কারণে জেলে ঘুরে আসতে হয়। চিন্তামণির শ্বশুর-শাশুড়ি স্বামীর উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য চিন্তামণিকেই দোষ দেয়। স্বামী মাঝে-মধ্যে নেশার টাকার জন্য চিন্তামণিকে প্রচণ্ড প্রহার করে। এক সময় স্বামী কয়েক মাস জেলের লপসি খেয়ে ফিরে এসে চিন্তামণির চরিত্র নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে কয়েকটা দিন ওর ওপর শারীরিক ও মানসিকভাবে অকথ্য অত্যাচার চালাল। একদিন রাতে হঠাৎ স্বামীর তর্জন-গর্জন শুরু হতেই চিন্তামণি ততোধিক গর্জন করে তার স্বামীকে আদেশ করল, সাষ্টাঙ্গে তাকে প্রণাম করতে। আদেশ শুনে স্বামী তাকে প্রহার করতে যেতেই চিন্তামণি পাগলের মত মাথা দোলাতে দোলাতে দিগম্বরী হয়ে স্বামীর দুগালে প্রচণ্ড কয়েকটি চড় কষিয়ে বলল, ‘জানিস আমি কে? আমি মা-কালী।’

চিন্তামণির এই ম্যানিয়াক ডিপ্রেসিভ রোগ অনেকের চোখেই ছিল নেহাতই ঈশ্বরের লীলা। জনৈক রেলওয়ে হাসপাতালের চিকিৎসক চিন্তামণির স্বামীকে বলেছিলেন, অসুস্থ চিন্তামণির চিকিৎসা করাতে। বুঝিয়েছিলেন এটা একটা পাগলামো ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু চিন্তামণির স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি কেউই চিকিৎসকের সাহায্য নিতে রাজি হয়নি। রাজি না হওয়ার একটা অর্থনৈতিক কারণও বোধহয় ছিল। ভক্তদের কাছ থেকে রোজগারপাতি খুব একটা কম হচ্ছিল না। স্কিজোফ্রিনিয়া রোগীদের মধ্যে ভর জিনিসটা অনেক সময় দেখা দেয়।স্কিজোফ্রিনিয়া রোগীরা অতি আবেগপ্রবণ, তা সে শিক্ষিত বা অশিক্ষিত যে শ্রেণীর হোক না কেন। এই আবেগপ্রবণ মনে ঈশ্বর বিশ্বাস অনেক সময় এমনই প্রভাব ফেলে যে রোগী মনে করতে থাকেন ঈশ্বর বোধহয় তাঁর সঙ্গে কথা বলছেন, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। স্কিজোফ্রিনিয়া এই ধরনের ভুল দেখায় বা ভুল শোনায়। এই ভুল থেকেই তাঁরা নিজের সত্তার মধ্যে ঈশ্বরের সত্তাকে অনুভব করে।

আমাদের দেশে ভরে পাওয়া রোগীর চেয়ে ভরের অভিনয় করা অবতারদের সংখ্যা অনেক বেশি। এইসব অবতার মাতাজী বাবাজীদের বেশির ভাগই হিস্টিরিয়া, ম্যানিয়াক ডিপ্রেসিভ বা স্কিজোফ্রিনিয়া রোগের শিকার নয়। এরা মানুষের অজ্ঞতার ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পকেট কাটে। সোজা কথায় এরা রোগী নয়, এরা অপরাধী প্রতারক।