সম্প্রতি ভূতে পাওয়া একটি পুরো পরিবার এসেছিলেন আমাদের কাছে। গৃহকর্তা ইনমিক্সে এম-এ, মফস্বল শহরের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। বয়স পঞ্চান্নর আশে-পাশে। গৃহকর্তী বাংলা সাহিত্যের ডক্টরেট। কলকাতার একটি মহিলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। দুই ছেলে। বড় করেন চাকরী করেন। ছোট এখনো চাকরীতে ঢোকেনি। বেশ কিছু ভাষা জানেন। একাধিকবার বিদেশ গিয়েছেন। এঁরা প্রত্যেকেই ভূতের (?) খপ্পরে পড়ে এমনই নাজেহাল অবস্থায় পড়েছিলেন যে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। ১৯৮৭-র ৭ মে আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দেন। বিজ্ঞাপনের বক্তব্য ছিল- এক অশরীরী আত্মার দ্বারা আমাদের পারিবারিক শান্তি সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। কোন সহৃদয় ব্যক্তি এই বিপদ থেকে উদ্ধার করলে আমরা চিরকৃতজ্ঞ থাকবো।

বিজ্ঞাপনটি দেখে আমাদের সংগঠনের জনৈক সদস্য নেহাতই কৌতূহলের বশে একটি চিঠি লিখে জানায়- বিস্তৃতভাবে ঘটনাটি জানান। হয়তো সাহায্য করা সম্ভব হবে।

ইনল্যান্ডে উত্তর এলো। পত্র-লেখিকা ও তাঁর পরিবারের সকলেরই নাম প্রকাশে অসুবিধে থাকায় আমরা আমাদের বোঝার সুবিধের জন্য ধরে নিলাম পত্র-লেখিকার নাম মঞ্জু, বড় ছেলে চন্দ্র, ছোট ছেলে নীলাদ্রী, স্বামী অমরেন্দ্র।

মঞ্জু দেবী জানালেন- ‘প্ল্যানচেট’ নামে একটা বই পড়ে ১৯৮৪ সনের ২৫, আগস্ট শনিবার তিনি, স্বামী ও দুই ছেলে প্ল্যানচেট করতে বসেন। প্রথমে একটি বৃত্ত এঁকে রেখার বাইরের দিকে A থেকে Z পর্যন্ত এবং রেখার ভিতরের দিকে ১ থেকে ৯ এবং ০ লিখে বৃত্তের কেন্দ্রে ধূপদনীতে ধূপ জ্বেলে সবাই মিলে ধূপদানীকে ছুঁয়ে থেকে এক মনে কোনও আত্মার কথা ভাবতে শুরু করতেন। এক সময় দেখা যেত ধূপদানীটা চলতে শুরু করেছে এবং একটি অক্ষরের কাছে যাচ্ছে। অক্ষরগুলো পর পর সাজালে তৈরি হচ্ছে শব্দ। শব্দ সাজিয়ে বাক্য। একটি বাক্য হতে এত দীর্ঘ সময় লেগেছিল যে ধৈর্য রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

তাই প্ল্যানচেট বইয়ের নির্দেশমতো একদিন ওঁরা বসলেন রাইটিং প্যাড ও কলম নিয়ে। প্রথম কলম ধরেছিলেন মঞ্জু দেবী। প্রথম দিন বেশ কিছুক্ষণ বসার পর স্ক সময় হাতের কলম একটু একটু করে কাঁপতে শুরু করল। মঞ্জু দেবীই প্রশ্ন করলেন, আপনি কে? উত্তরে লেখা হল রবীন্দ্রনাথ। আরও কিছু প্রশ্নোত্তরের পর একে একে প্রত্যেকেই কলম ধরেন। প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই বিভিন্ন আত্মারা এসে রাইটিং প্যাডে লিখে তাদের উপস্থিতির কথা জানিয়ে যায়। আত্মা আনার জন্য বেশ কিছুক্ষণ গভীরভাবে চিন্তা করতে হত বটে, কিন্তু একবার আত্মা এসে গেলে হুড়মুড় করে লেখা বের হত। প্রথম দিন ভোর পর্যন্ত কলম চলতে থাকে তারপর থেকে প্রতিদিনই গভীর রাত পর্যন্ত চলতো আত্মা আনার খেলা। এ এক অদ্ভুত নেশা।

এমনি ভাবে যখন আত্মা আনার ব্যাপার প্রচণ্ড নেশার  মত পেয়ে বসেছে সেই সময় ৮৫-র জানুয়ারীর এক রাতে ছোট ছেলে নীলাদ্রী নিজের ভিতর বিভিন্ন আত্মার কথা শুনতে পান। ৮৫-র ৫ মার্চ থেকে মঞ্জু দেবীও একটি আত্মার কথা শুনতে পান। আত্মাটি নিজেকে তাঁর গুরদেব বলে পরিচয় দেয়। সেই আত্মার বিভিন্ন কথা ওপ নির্দেশ আজ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি মুহূর্তেই শুনতে পাচ্ছেন মঞ্জু দেবী, সেই সঙ্গে আত্মার স্পষ্ট স্পর্শও অনুভব করছেন, আত্মাটি তাঁর সঙ্গে চূড়ান্ত অশ্লীলতাও করছে। মঞ্জু দেবী এক অতি বিখ্যাত ধর্মগুরুর শিষ্যা। গুরুদেব মারা যান ১৯৮৪-র ২১ এপ্রিল। মঞ্জু দেবী আমাদের সদস্যটিকে চিঠিটি লিখেছিলেন ২ জুলাই ৮৭।

চিঠিটি আমার কাছে সদস্যই নিয়ে আসে। আমাকে অনুরোধ করে এই বিষয়ে কিছু করতে।

আমার কথা মতে ১৯ জুলাই রবিবার সন্ধ্যায় পরিবারের সকলকে নিয়ে মঞ্জু দেবীকে আসতে অনুরোধ করেন সদস্যটি।

এলেন মঞ্জু দেবী ও তাঁর স্বামী। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম প্ল্যানচেটের আসরে চারজনের কলমেই কোনও না কোনও সময় বিভিন্ন আত্মারা এসেছেন। আত্মাদের মধ্যে নেপোলিয়ান, রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপীয়ার, আলেকজান্ডার থেকে স্বরূপানন্দ অনেকেই এসেছেন, মঞ্জু দেবীর স্বামীর সঙ্গে বা বড় ছেলের চন্দ্রর সঙ্গে কোনদিনই কোন আত্মাই কথা বলেনি। অর্থাৎ তাঁরা আত্মার কথা শুনতে পাননি। আত্মার কথা শুনতে পাচ্ছেন মঞ্জু দেবী ও তাঁর ছোট ছেলে নীলাদ্রী, আত্মার স্পর্শ পেয়েছেন শুধু মঞ্জু দেবী। বড়ই অশ্লীল সে স্পর্শ।

পরের দিনই আমার সঙ্গে দুই ছেলে দেখা করলেন। কথা বললাম। সকলের সঙ্গে কথা বলার পর বুঝলাম, চার জনই ‘প্ল্যানচেট’ বইটা পড়ে প্ল্যানচেটের সাহায্যে সত্যিই মৃতের আত্মাকে টেনে আনা সম্ভব এ কথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। তারই ফলে অবচেতন মন সচেতন মনের অজ্ঞাতে চারজনকে  দিয়েই বিভিন্ন মৃতের নাম ও নানা কথা লিখিয়েছে। ছোট ছেলে নীলাদ্রী সবচেয়ে বেশিবার মিডিয়াম হিসেবে কলম ধরার জন্য প্ল্যানচেট নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করতে শুরু করেন- আমার হাত দিয়ে কেন আত্মাদের লেখা বের হচ্ছে? এই রহস্যের সমাধানের চেষ্টা করতে গিয়ে বার বারই চিন্তাগুলো এক সময় তালগোল পাকিয়ে গেছে। রহস্যের জাল খোলেনি। বুদ্ধিমান নীলাদ্রী নিজেই নিজের অজান্তে স্কিটসোফ্রেনিয়ার রোগী হয়ে পড়েছেন। ফলে শ্রবণানুভূতির অলীক বিশ্বাসের শিকার হয়ে অলীক সব কথাবার্তা শুনতে শুরু করেছেন।

মঞ্জু দেবী সাহিত্যে ডক্টরেট, ভক্তিমতী আবেগপ্রবণ মহিলা। দীক্ষা নেওয়ার পরবর্তীকালে কিছু কিছু নারীর প্রতি গুরুদেবের আসক্তির কথা শুনেছিলেন। গুরুদেব ছিলেন অতি সুদর্শন। মঞ্জু দেবীও এককালে সুন্দরী ছিলেন। প্ল্যানচেটের আসরে ধূপদানীর চলা দেখে মঞ্জু দেবী ধরে নিয়েছিলেন, দেহাতীত আত্মাই এমনটা ঘটাচ্ছে। এক সময় ধূপদানী ছেড়ে কলমের ডগাতেও বিভিন্ন আত্মাকে বিচরণ করতে দেখেছেন। গুরুদেবের আত্মা হাজির হতে দেখেই অনেক গোলমাল দেখা দিয়েছে। গুরুদেবের নারী আসক্তির যেসব কাহিনী শুনেছিলেন, বিশ্বাস করেছিলেন, সেই বিশ্বাস থেকেই এক সময় মঞ্জু দেবীর মনে হয়েছিল- গুরুদেবের আত্মা আমার আহ্বানে হাজির হওয়ার পর আমার প্রতি আকর্ষিত হয়ে পড়বেন না তো? তাঁর নারী পিপাসা মিটে না থাকলে এমন সুযোগ কি ছেড়ে দেবেন? আমাকেই ভোগ করতে চাইবেন না তো?

এইসব চিন্তাই এক সময় স্থীর বিশ্বাস হয়ে গেড়ে বসেছে- গুরুদেবের এই সুযোগ নিজের কদর্য ইচ্ছেগুলোকে চরিতার্থ করে চলেছেন, আমার শরীরকে ভোগ করে চলেছেন।

প্ল্যানচেটের আসরে অংশ নেওয়ার অতি আবেগপ্রবণতা ও বিশ্বাস থেকেই এক সময় মঞ্জু দেবীর মধ্যে এসেছে শ্রবণানুভূতি ও স্পর্শানুভূতির অলীক বিশ্বাস।

২৬ জুলাই মঞ্জু দেবী ও ছোট ছেলেকে আসতে বললাম। ওঁরা এলেন। ওঁরা যেমন ভাবে কাগজ-কলম নিয়ে প্ল্যানচেটের আসরে বসতেন তেমনি ভাবেই একটা আসর বসালাম। দুজনের অনুমতি নিয়ে সেদিনের আসরে ছিলেন একজন সাংবাদিক, একজন চিত্র-সাংবাদিক ও আমাদের সমিতির দুই সদস্য।

আসর বসার আগে মঞ্জু দেবী ও নীলাদ্রীর সঙ্গে আলাদা আলাদা ভাবে কিছু কথা বললাম। টেবিলে বসলেন মঞ্জু দেবী ও নীলাদ্রী। রাইটিং প্যাড আর কলম এলো। তিনটে ধূপকাঠি জ্বালানো হল। মঞ্জু দেবীর কথামত নীলাদ্রী কলম ধরলেন। মিনিট দুয়েক পরেই দেখা গেল নীলাদ্রীর হাত ও কলম কাঁপছে। মঞ্জু দেবী বললেন- উনি এসে গেছেন। তারপর তিনিই প্রশ্ন করলেন- আপনি কে?

কলম লিখল- গুরুদেবের নাম।

এরপর মঞ্জু দেবী অনেক প্রশ্নই করলেন, যেমন- “আপনি আমাকে ছাড়ছেন না কেন?” “প্রবীর বাবু বলেছেন, আপনি তাঁকে কথা দিয়েছেন আমাকে ছেড়ে যাবেন। কথা রাখছেন না কেন?” ইত্যাদি।

নীলাদ্রীর কলমের গতি বেশ দ্রুততর। গুরুদেবের আত্মা এক সময় লিখল মঞ্জু দেবীকে সে ছেড়ে যাচ্ছে। তারপর ইংরেজিতে লিখল- ‘লিভ দ্য পেন’। কলম ছাড়ার আদেশে কলম ছাড়লেন নীলাদ্রী।

মঞ্জু দেবী খুঁৎ খুঁৎ করতে লাগলেন। দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে তিনি যে আত্মাটিকে তাড়াতে আঠারো হাজার টাকার ওপর খরচ করেও কৃতকার্য হননি, সে কিনা এত দ্রুত এক কথায় চলে যেতে চাইছে।

মঞ্জু দেবী তাঁর সন্দেহের কথাটি স্বভাবতঃই প্রকাশ করলেন। বললেন, আপনি ওকে সম্মোহন করে লিখতে বাধ্য করছেন না তো?

মা’য়ের এমনতর কথা নীলাদ্রীর ইগোতে আঘাত করল। নীলাদ্রী খুবই ক্ষুব্ধ হলেন। কিছু তপ্ত কথা বলে ক্ষিপ্ত নীলাদ্রী ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। মঞ্জু দেবীর মস্তিষ্ক কোষে আত্মা ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা পুরোপুরি গেঁথে দেওয়ার জন্য নীলাদ্রীকে ঠান্ডা করে আবার এনে তথাকথিত প্ল্যানচেটের আসরে বসালাম। আমাদের অনুরোধে নীলাদ্রী কলমও ধরলেন। এবার মঞ্জু দেবী আত্মার উপস্থিতির যথার্থতা সম্পর্কে সন্দেহ মুক্ত হতে এমন অনেক প্রশ্ন করলেন, যেসব প্রশ্নের উত্তর আমার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। কলমের উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন মঞ্জু। বিশ্বাস করলেন এ সব সত্যিই আত্মারই লেখা। গুরুদেবের আত্মাই কথা দিচ্ছেন, মঞ্জু দেবীর পরিবারকে আর বিরক্ত করবেন না।

মৃতের আত্মার কোন অস্তিত্ব না থাকাও স্বত্বেও  অবচেতন মনের যে বিশ্বাস সচেতন মনকে চালিত করে অলীক কিছু লিখিয়েছে, অলীক কিছু শুনিয়েছে, অলীক কিছুর স্পর্শ অনুভব করিয়েছে, আমি আমার কথাবার্তা এবং ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সেই অবচেতন মনে এই বিশ্বাস গড়ে তুলতে বা ধারণা সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছিলাম যে, গুরুদেবের আত্মা আজই তাঁদের ছেড়ে চলে যাবেন।

গত দু’দিন আমার সঙ্গে গুরুদেবের আত্মার এই বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। ফলে নীলাদ্রীর মস্তিষ্ক কোষে আমার দ্বারা সঞ্চারিত দৃঢ় ধারণাই নীলাদ্রীকে দিয়ে লিখিয়েছে- ‘হ্যাঁ, বেশ চলে যাব – এই সব কথাগুলো।

সচেতন মনের ওপর অচেতন মনের প্রভাবের জন্য যে লেখাগুলো এতদিন আত্মা এসেছে বিশ্বাসে লেখা হয়েছে, যে কথাগুলো এতোদিন আত্মা বলছে বিশ্বাসে শোনা গেছে, সেই সচেতন মনের উপর অবচেতন মনের প্রভাবকে কাজে লাগানোর ফলেই আজকের নীলাদ্রী আত্মার বিদায় নেওয়ার কথা লিখলেন।

অবচেতন মনের প্রভাবের একটা পরীক্ষা হয়েই যাক

সচেতন মনের ওপর অবচেতন মনের প্রভাব হাতে কলমে পরীক্ষা করতে চাইলে আসুন আমার সঙ্গে। একটা সাদা খাতা যোগার করে ফেলুন। খাতাটা বাঁধানো হলে ভাল হয়। খাতা না পেলে একটা সাদা কাগজ নিয়েই না হয় আমরা কাজটা শুরু করি। এবার একটা কলম, একটা আংটি ও সুতো। খাতায় বা কাগজে ইঞ্চি চারেক ব্যাসের একটা মোটামুটি বৃত্ত এঁকে ফেলুন। ব্যাস অবশ্য চারের বদলে দুই বা ছয় ইঞ্চি হলেও ক্ষতি বৃদ্ধি নেই। এবার গোটা বৃত্ত জুড়ে পরিধি ছুঁয়ে এঁকে ফেলুন একটা যোগ চিহ্ন বা ক্রস চিহ্ন। সরল রেখা দুটির নাম দেওয়া যাক A B ও C D। এখন আসুন, আমরা আংটিতে বেঁধে ফেলি সুতো। আংটিটায় কোন পাথর বসানো থাকলে সুতো আমরা বাঁধবো পাথরের বিপরীত দিকে।

 

অবচেতন মনের পরীক্ষা

এবার আমরা বৃত্ত আঁকা খাতা বা কাজগটা টেবিলে পেতে নিজেরা চেয়ার টেনে বসে পড়ি আসুন। কনুইটা টেবিলে রেখে তর্জনী ও বুড়ো আঙ্গুলের সাহায্যে আংটি বাঁধা সুতোটাকে এমনভাবে ধরুন যাতে আংটিটা ঝুলে থাকে যোগ চিহ্নের কেন্দ্রে।

এবার শুরু হবে আসল মজা। আর মজাটা জমাতে প্ল্যানচেটের আসরের মতই চাই একটা শান্ত পরিবেশ। এমন শান্ত পরিবেশ পেতে প্রথম দিন শুধু আপনি একাই বসুন না একটা ঘরে, দরজা বন্ধ করে।

আপনি গভীরভাবে ভাবতে থাকুন আংটিটা A B রেখা ধরে A ও B-র দিকে দোল খাচ্ছে। ভাবতে থাকুন, গভীর ভাবে ভাবতে থাকুন। ভাবনার সঙ্গে একাত্ম হতে প্রয়োজনে দৃষ্টিকে A B সরলরেখা ধরে A ও B  লেখার দিকে নিয়ে যান, মনে মনে বলতে থাকুন- আংটিটা A B ধরে দুলছে, পেন্ডুলামের মত দুলছে। না বেশিক্ষণ আপনাকে ভাবতে হবে না। দু-চার মিনিটের মধ্যেই দেখতে পাবেন স্থির আংটি গতি পাচ্ছে, A B রেখা ধরে আংটি পেন্ডুলামের মত দুলে চলেছে।

আপনি এক সময় ভাবতে শুরু করুন- আংটি আবার স্থির হয়ে যাচ্ছে, আবার গতি হারিয়ে স্থির হয়ে যাচ্ছে, স্থির হয়ে যাচ্ছে, দেখতে পাবেন আংটি স্থির হয়ে যাবে।

এবার আপনার চিন্তাকে নিয়ে আসুন C D রেখা বরাবর। গভীর ভাবে ভাবতে থাকুন আংটিটা C D রেখা বরাবর পেন্ডুলামের মত দুলছে, আংটিটা C D রেখা বরাবর দুলছে, আংটিটা C D  রেখা বরাবর দুলছে। এক সময় আংটিটা দুলতে থাকবে এবং C D রেখা বরাবরই দুলতে থাকবে।

আবার ভাবতে থাকুন- আংটিটা গতি হারিয়ে স্থির হয়ে যাচ্ছে। ভাবতেই থাকুন, দেখবেন, আপনার ভাবনাকে মর্যাদা দিয়ে আংটি দাঁড়িয়ে পড়েছে।

এবার ভাবতে থাকুন তো, আংটিটা ঘড়ির কাঁটার গতির দিকে অর্থাৎ ক্লক-ওয়াইজ ঘুরছে। একমনে ভাবতে থাকুন। দেখবেন আংটি গোল করে ঘুরে চলেছে ডান থেকে বাঁয়ে।

ভাবুন, আংটি ঘোরা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়েছে, দাঁড়িয়ে পড়েছে, দাঁড়িয়ে পড়েছে। আংটি দাঁড়াবে।

এবার ভাবতে থাকুন আংটি ঘড়ির কাঁটার বিপরীত গতিতে ঘুরছে, অ্যান্টি-ক্লক-ওয়াইজ ঘুরছে, বাঁ থেকে ডাইনে ঘুরছে। এক মনে ভাবতে থাকুন। দেখবেন আংটি আবার গতি পাচ্ছে, ঘুরছে, বাঁ থেকে ডাইনেই।

আপনি এবার দু-আঙ্গুলে ধরা সুতো ছেড়ে ভাবুন তো- আপনি কি সুতো নেড়ে আংটিকে চালিয়েছেন? উত্তর পাবেন- না তো। তবে আংটিটা আপনার চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছুরছিল কেন?

ঘুরছিল, কারণ আপনার অবচেতন মনই আপনাকে দিয়ে ঘোরাচ্ছিল। আপনিই সুতো নেড়ে আংটিটাকে চালিয়েছেন। কিন্তু সচেতন ভাবে যেহেতু চালাননি, অর্থাৎ চালানোর ব্যাপারটা ঘটেছে আপনার সচেতন মনের সম্পূর্ণ অজান্তে, তাই সুতো যে আপনিই নেড়েছেন, সেটা আপনি নিজেই বুঝতে পারেননি।

এই একই কারণে বৃত্ত ঘিরে A থেকে Z লিখে ধূপদানী ছুঁয়ে যদি মনে মনে কোনও বিদেহী আত্মাকে আহ্বান জানাতে থাকি এবং যদি গভীরভাবে বিশ্বাস পোষণ করি যে আত্মা এলে প্রমাণ স্বরূপ ধূপদানী চলতে থাকবে, তাহলে দেখবো ধূপদানী এক সময় গতি পাবে।

উত্তমকুমারের মৃত্যুদিনে  প্ল্যানচেটের আসর পেতে তাতে বসিয়ে দিন কোনও আবেগপ্রবণ আত্মা বিশ্বাসী মানুষকে। দেখবেন এক সময় তার হাতের ছোঁয়া পাওয়া ধূপদানী ধাবিত হবে ‘U’ শব্দের দিকে।

আবার কোন জীবিত মানুষকে মৃত বলে বিশ্বাস তৈরি করে কাউকে মিডিয়াম হিসেবে বসিয়ে দিন। দেখবেন এ ক্ষেত্রেও একইভাবে ধূপদানী গতি পাবে। বাস্তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধূপদানী ছুঁয়ে থাকা মানুষটির অবচেতন মন, কোনও বিদেহী আত্মা নয়। আর এই অবচেতন মনকে চালায় বিশ্বাস, সংস্কার, আকুতি, আকাঙ্ক্ষা, একান্ত ইচ্ছা ইত্যাদি।

অবশ্য কোন কোন ক্ষেত্রে কেউ কেউ নিজেকে ভাল মিডিয়াম হিসেবে জাহির করতে ধূপদানী ঠেলে থাকে অতি সচেতন ভাবেই। অর্থাৎ, সচেতনভাবেই তারা প্রতারক।

 

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x