আমাদের দেশ বৃহত্তম ‘গণতান্ত্রিক’ দেশ। এ দেশে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার। সংবিধান সেই অধিকার রক্ষায় সদা সতর্ক। এখানে লৌহযবনিকার অন্তরালে মানুষের কন্ঠ রুদ্ধ করা হয় না। এ-দেশের মানুষ খাঁচার পাখি নয়, বনের পাখির মতই মুক্ত। এদেশে সর্বোচ্চ পদাধিকারী রাষ্ট্রপতির আর ওড়িষ্যার কালাহান্ডির মানুষগুলো একি অধিকার ভোগ করে, চুলচেরা সমান অধিকার।

এই ধরনের প্রতিটি কথাকে বর্বর রসিকতা বলেই মনে হয় যখন দেখি, কালাহান্ডির মানুষগুলো দিনের পর দিন ক্ষুধার আগুনে জ্বলতে জ্বলতে প্রতিবাদহীনভাবে মৃত্যুকে মেনে নিল, আর তারই সঙ্গে মৃত্যু ঘটল একটি গণতান্ত্রিক দেশের মানুষদের বেঁচে থাকার অধিকারের এ-সব আপনজন হারা বহু মানুষের হৃদয়কে দুমড়ে-মুচড়ে রক্তাক্ত করে। এই রক্তাক্ত হৃদয়গুলোই দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে, যখন দেখে শোষকশ্রেণীর কৃপায় গদীতে বসা কতকগুলো রাজনীতিক ওই একই সময় রাষ্ট্রপতির গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করতে করতে ভারতবর্ষকে ‘সুমহান গণতন্ত্রের দেশ’ ‘সর্ব বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ’ ইত্যাদি বলে কদর্য বর্বর রসিকতা করছে।

প্রতিটি গণতান্ত্রিক অধিকারই বিড়লা, আম্বানিদের সঙ্গে
সঙ্গে দেওয়া হয়েছে রাস্তার ভিখারীটিকে পর্যন্ত। পার্থক্য
শুধু রাষ্ট্রশক্তির অকরুণ সহযোগিতায় বিড়লা, আম্বানিদের
অধিকারের হাত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। ওদের নিয়ে
ব্যস্ত থাকতে গিয়ে ভিখারীর অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা
করতেই শুধু ভুলে গেছে রাষ্ট্রশক্তি- এই যা।

১৬ সেপ্টেম্বর ৯১ আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম গোষ্ঠীয় প্রকাশিত একটা খবরের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। খবরটাকে ছোট্ট করে নিলে দাঁড়ায় এই- পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের এক বড় কর্তার বাগান আছে ঝাড়গ্রামের জিতুশোল মৌজায়। সেই বাগান থেকে তিনটি আমগাছের চারা চুরি যাওয়ায় রাজ্য পুলিশবাহিনী তান্ডব চালিয়েছে ওই অঞ্চলে। পুলিশের নৃশংস অত্যাচারে জিতুশোল মৌজার তিনশো গ্রামবাসী জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছেন। একটিও বয়স্ক পুরুষ নেই গ্রামে। তবু গ্রামবাসীদের ওপর চলেছে পুলিশের ভীতিপ্রদর্শন। অনেককেই থানা-লকআপে আটক রেখে দিনের পর দিন পেটান হচ্ছে। আর পুলিশের বড়কর্তার বাগান পাহারা দিতে রাজ্যের জনগণের টাকায় পালিত পুলিশ একটি স্থায়ী চৌকি বসিয়েছে।

একবার উত্তেজিত মাথাকে ঠান্ডা করে ভাবুন তো- একটি গরীব লোকের বাগান থেকে তিনটে আমগাছের চারা চুরি গেলে থানায় রিপোর্ট লেখাতে গেলে পুলিশ তার সঙ্গে কি ব্যবহার করবে? আমচারা চোর ধরে দেবার বেয়াদপী আবদার শুনে থানার মেজবাবু হয় বেজায় রসিকতা ভেবে অট্টহাঁসিতে ফেটে পড়বেন, ,নতুবা বেয়াদপটাকে এক দাবড়ানীতে থানা-ছুট করতে বাধ্য করবেন।

কিন্তু রাজ্য-পুলিশের বড়কর্তার বাগান থেকে মাত্র তিনটি আমচারা চুরি যেতেই গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় অতন্দ্র-প্রহরী পুলিশবাহিনী পাগলা-কুকুরের মতই ঝাঁপিয়ে পড়লো জিতুশোলের মানুষগুলোর ওপর। পুলিশী অত্যাচারে তিনশো মানুষ জঙ্গলের রাজত্ব থেকে বাঁচতে জঙ্গলে আশ্রয় নিল। ধরে নিলাম, ওই গ্রামবাসীদের মধ্যেই রয়েছে এক, দুই বা তিনজন আমচারা চোর। ধরে নিলাম, পুলিশ তাদের ধরেো ফেলল। ফেলুক, খুব ভাল কথা। তারপর পুলিশের কর্তব্য চোরটিকে বা চোরদের বিচার বিভাগের হাতে তুলে দেওয়া। অপরাধ প্রমাণে শাস্তি যা দেবার তা দেবে বিচার বিভাগ। ওই বিচারাধীন চোর বা চোরদের পেটাই করার কোনও অধিকার আমাদের দেশের গণতন্ত্রে তো পুলিশদের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি।

জিতুশোল মৌজার এক দুই বা তিনজন সম্ভাব্য অপরাধীর ওপর পুলিশী অত্যাচার নেমে আসেনি, পুলিশবাহিনী বর্বর গুন্ডামী চালিয়েছিল তামাম গ্রামবাসীদের ওপর। গ্রামবাসীদের একটিই অপরাধ বড় কর্তার বাগান এলাকায় তাদের বাস।

আইন ভাঙ্গা অপরাধ। আইনের রক্ষকদের আইন ভাঙ্গা আরও বড় অপরাধ। পুলিশের ইউনিফর্ম পরা ওইসব বর্বর গুন্ডাদের বিরুদ্ধে আইন আদৌ কঠিন হতে পারবে? তা যদি না পারে তবে অত্যাচারিত মানুষগুলো, যুক্তিবাদী মানুষগুলো, অনপুংশক মানুষগুলো কি করে বিশ্বাস করবে- আমাদের দেশের গণতন্ত্রে রাজ্য-পুলিশের বড়কর্তারও একজন দরিদ্র গ্রামবাসীর সমান গণতান্ত্রিক অধিকার?

পুলিশের সামান্য বড়কর্তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের অধিকারের পার্থক্য যদি এমন আসমান-জমিন হয়, তবে মন্ত্রী-টন্ত্রীদের সঙ্গে এবং মন্ত্রী বানাবার মালিক অর্থকুবেরদের সঙ্গে গরীব মানুষগুলোর গণতান্ত্রিক অধিকারের পার্থক্য যে সীমাহীন হবে, এই তো প্রকৃত সত্য।

এ-দেশে অনেক বিত্তাবানেরাই, অনেক জোতদারেরাই নিজস্ব গণতন্ত্রের হাতকে আরও বেশি দীর্ঘ করতে বাহিনী পোষে। এইসব বাহিনী বা সেনাবাহিনীর নামও নানা বিচিত্র সংগঠিত হিংস্র সেনাভিনী। সেইসব বাহিনীর হাতে নিত্যই নিপীড়িত, খেটে খাওয়া মানুষদের গণতান্ত্রিক অধিকার লাঞ্ছিত হচ্ছে। সামান্য ইচ্ছায় এরা গ্রামকে গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়, লুটে নেয় মহিলাদের লজ্জা। আর নির্লজ্জের মত সরকার দেখেও অন্ধ হয়ে থাকে। এই উগ্রপন্থী নরখাদকদের কঠোর হাতে দমন করতে কখনোই তো এগিয়ে আসে না সরকার? কোন গণতান্ত্রিক অধিকারে এই সব সেনাবাহিনী পুষে চলেছে হুজুরের দল? নিপীড়িত মানুষদের দাবিকে দাবিয়ে রাখতে ওদের সেনাবাহিনী পোষা যদি গণতান্ত্রিক ও উগ্রপন্থা না হয়, তবে অত্যাচারিত মানুষদের অধিকার রক্ষার জন্য সেনা গঠন অগণতান্ত্রিক ও উগ্রপন্থা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।

আমাদের দেশের গণতন্ত্র-বীরভোগ্যা’র গণতন্ত্র। যার যত বেশি ক্ষমতা, যত বেশি অর্থ, যত বেশি শক্তি, তার তত বেশি বেশি গণতন্ত্র। শোষকদের অর্থে গদীতে আসীন হয়ে শোষক ও শোষিতদের সমান গণতান্ত্রিক অধিকার বিলান যায় না। শাসক ও শোষকরা শুধু এই অধিকারের সীমা ভঙ্গই করে পরম অবহেলে; আর শোষিতদের অধিকার বার বার লাঞ্ছিত হয়, লুন্ঠিত হয়- এ অতি নির্মম সত্য। আপনার দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন; তাহলেই দিনের আলোর মতন পরিষ্কার হয়ে যাবে ‘গণতন্ত্র’ আছে দেশের সংবিধানে ও বইয়ের পাতায়, গরীবদের জীবনে নয়।

যে দেশের মানুষের দু’বেলা পেট ভরে খাওয়ার অধিকার
নেই, বেঁচে থাকার অধিকার নেই, চিকিৎসার সুযোগ সুবিধে
গ্রহণের অধিকার নেই, শিক্ষালাভের সুযোগ সুবিধে গ্রহণের
অধিকার নেই সেখানে বিড়লা, আম্বানি, রাষ্ট্রপতি,
প্রধানমন্ত্রী আর গরীব মানুষগুলোর সমান গণতান্ত্রিক
অধিকারের কথা যারা বলে তারা শয়তানেরই দোসর- এটুকু
নির্ধিদায় বলা যায়।

গণতন্ত্রে মানে কি শুধুই ভোট দেওয়ার অধিকার? সেটাই বা ক’জনের আছে? ছাপ্পা ভোট, বুথ দখল, চতুর রিগিং সেই অধিকারে তো অনেক দিনই থাবা বসিয়েছে।

তারপরও যদি ভোট দেওয়ার অধিকারের প্রসঙ্গ টেনে কেউ বলেন এই দেশের মানুষই কখনো ইন্দিরাকে তুলেছেন, কখনো নামিয়েছেন, কখনো রাজীবকে সিংহাসনে বসিয়েছেন, কখনো বা ছুঁড়ে দেলেছেন, কখনো এনেছেন ভি.পি.-কে, কখনো বা পি.ভি-কে; তাঁদের আবারও মনে করিয়ে দেব পরম সত্যটি, অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে বলব কথাটি- মন্ত্রী যায় মন্ত্রী আসে এদের বহু অমিলের মধ্যে একটাই শুধু মিল- এঁরা প্রত্যেকেই শোষকশ্রেণীর কৃপাধন্য, পরম সেবক। এরা শোষকদের শোষণ বজায় রাখার ব্যবস্থা করে দেবার বিনিময়ে আখের গোছান।

আর একটি ঘটনার দিকে আপনার দৃষ্টিকে একটু ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।

১৪ আগস্ট ৯১ আনন্দবাজারে তিনটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, যাদের শুরু একই রকম হলেও পরিণতি ভিন্নতর। সংবাদ একঃ সৌদি আরবের এক বৃদ্ধ এক নাবালিকাকে বিয়ে করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে। আদালত ওই বিচারাধীন আসামীকে পনের দিন পুলিশ হাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। সংবাদ দুইঃ ওড়িশার জনতা দলের বিধায়ক তথাগত শতপথী একটি নাবালিকাকে ফুসলিয়ে ভুবনেশ্বর থেকে পুরী নিয়ে যান এবং নাবালিকা অপহরণের অভিযোগে পুলিশ তথাগতকে গ্রেপ্তার করে। ওড়িশার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী জনতা দলের শ্রীবিজু পট্টনায়কের হস্তক্ষেপে তাঁর দলের বিধায়ক তথাগতর উপর থেকে সমস্ত অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়। তথাগত অবশ্য গর্বের সঙ্গে স্বীকার করেছেন এমন মেয়ে ফুসলান তাঁর জীবনে এই প্রথম নয়। সংবাদ তিনঃ ত্রিপুরার মন্ত্রী জহর সাহা স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও এক অবিবাহিত মহিলার সঙ্গে অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকার সময় মহিলাটির পাড়ার লোকেদের হাতে ধরা পড়েন। জহর সাহাকে মন্ত্রীসভা থেকে বরখাস্ত করলেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী সুধীররঞ্জন মজুমদার। জহর ঘোষণা করলেন, তাঁকে মন্ত্রীসভায় ফিরিয়ে না নিলে মুখ্যমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রীদের দুর্নীতি সম্পর্কিত প্রামাণ্য দলিল তুলে দেবেন সংবাদপত্রের হাতে। শঙ্কিত ও জহর ভয়ে কম্পিত মুখ্যমন্ত্রী ওই দিনের সংবাদে জহর সাহাকে ‘ধোয়া তুলসী পাতা’ বলে ঘোষণা করে ইঙ্গিত দিয়েছেন জহরকে মন্ত্রীসভায় ফিরিয়ে নেবেন।

আরবের শেখ, তথাগত শতপথী ও জহর সাহার খবর পড়ে যদি ভারতের কোনও ভবিষ্যৎ নাগরিক তার শিক্ষককে প্রশ্ন করে বসে- ভারতবর্ষ কেমন গণতন্ত্রের দেশ, দুর্নীতিপরায়ণ লম্পটরা রাজনীতিক হওয়ার সুবাদে আইনকে লাথি কসিয়ে ফুটবল খেলে আর খুঁটির অভাবে তারচেয়ে লঘু অপরাধে জেলে পচে বুড়ো শেখ? কি জবাব দেবেন শিক্ষক? সত্যি কথাটুকু বলতে গেলে যে দরাজ বুকের পাটা প্রয়োজন তা এই চাটুকার ধান্দাবাজ ও ক্লীবে ছেয়ে ফেলা দেশে কতজনের আছে? শিক্ষকরা আজ যদি সত্যির থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকে, ছাত্ররা যারা দেশের ভবিষ্যৎ- তারা কি শিখবে?

জানি- দুর্নীতি যেখানে অসীম, দলবাজী যেখানে চূড়ান্ত, অন্যায়ের সঙ্গে আপোস যেখানে বেঁচে থাকার শর্ত- সে দেশে সত্যি বলাটা, সত্যি শেখানোটা চূড়ান্ত অপরাধ, ‘উগ্রপন্থী’ ‘দেশদ্রোহী’ বলে দেগে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। তবু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে দায়িত্ব, নতুন প্রজন্মের মানুষ্য গড়ার দায়িত্ব।