মজগ ধোলাই প্রসঙ্গে
রাজনীতিকদের জ্যোতিষ ও রাজনীতি

তাবৎ ভারতবাসীদের চেতনাকে প্রভাবিত করার মত একটি ঘটনা ঘটল ২১ জুন ৯১। ভারতের নবম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরসিমহা রাও ওই দিন শপথ নিলেন পাঁজিপুঁথি দেখে রাহুর অশুভ দৃষ্টি এড়াতে ১২টা ৫৩ মিনিটে।

পি. ভি নরসিমহা রাও সুপণ্ডিত, দার্শনিক, সাহিত্যিক, বহুভাষাবিদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের সর্বোচ্চ পদাধিকারী, রাষ্ট্রের কান্ডারী। এমন একজন বিশাল মাপের মানুষ জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি যখন অগাধ আস্থা পোষণ করেন, তখন সাধারণ মানুষেরো জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি আস্থা বাড়ে। জ্যোতিষশাস্ত্রের অভ্রান্ততা বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্থ বহু মানুষই এরপর শাস্ত্রটিকে অস্বীকার করাটা কিঞ্চিৎ মূঢ়তা বলেই মনে করতেই পারেন। অসাধারণ মানুষের বিশ্বাস সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রভাবিত হলে সাধারণ মানুষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে জন্মকালেই তাদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। জীবনের প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত আগে থেকেই ঠিক হয়ে রয়েছে। এ অমোঘ, অব্যর্থ।

নির্ধারিত কথার অর্থ- যা ঠিক হয়েই রয়েছে; যার পরিবর্তন সম্ভব নয়। জ্যোতিষীরা দাবি করেন, জ্যোতিষশাস্ত্র এমন একটি শাস্ত্র যে শাস্ত্র নির্ধারিত পথে বিচার করে একজন মানুষের পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য গণনা করা যায়।

মজাটা হল এই, সাধারণ মানুষ যখন শ্রীনরসিমহা রাওয়ের জ্যোতিষ পরামর্শ মেনে শপথ গ্রহণ করার ঘোষণায় শ্রীরাওকে জ্যোতিষশাস্ত্রে পরম শ্রদ্ধাবান ও বিশ্বাসী বলে মনে করছেন, তখন শ্রীনরসিমহা রাও কিন্তু জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর সামান্যতম আস্থা প্রকাশ করে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে বসে থাকেননি। শ্রীশরদ পাওয়ারকে প্রধানমন্ত্রী পদের প্রতিযোগিতায় পরাজিত করার জন্য বিড়লা, হিন্দুজা, আম্বানিদের মত বিশাল শিল্পপতিদের দোরে দোরে ঘুরেছেন। নিজের দলের সাংসদদের সমর্থন আদায় করতে নাকি প্রত্যেক সমর্থক সাংসদকে ৫০ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পিছু হটেছেন শ্রীশরদ পাওয়ারের শিবির, যাতে সামিল হয়েছিলেন কির্লোস্কার, বাজাজ, নুসলি ওয়াদিয়া, গুলাবচাঁদ প্রমুখ শিল্পগোষ্ঠী। শ্রীনরসিমহার পক্ষে সিংহভাগ সাংসদদের সমর্থন নিশ্চিত করতে শ্রীনরসিমহার সমর্থক শিল্পগোষ্ঠিই নাকি অর্থ জুগিয়েছেন। এ-সবই এই বইটির পাঠকদের কাছে পুরোন খবর হয়ে গেছে। কারণ এই খবর তামাম ভারতবর্ষের বহু পত্র-পত্রিকাতেই বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল ৯১-এর ২০, ২১, ২২ জুন। শ্রীনরসিমহা সত্যিই যদি জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করতেন, তবে নিশ্চয়ই তাঁর নিত্যকার দুপুরের ভাত-ঘুমকে নির্বাসনে পাঠিয়ে শ্রীশরদকে রুখতে শিল্পপতিদের কাছে হত্যে দিয়ে পড়তেন না, পাওয়ার দখলের জন্য প্রাণকে বাজি রেখে লড়াই চালাতেন না। জ্যোতিষশাস্ত্রকে বিশ্বাস করে, ভাগ্যকে বিশ্বাস করে শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার রুটিনই বজায় রাখতেন। ভাগ্য যখন পূর্বনির্ধারিত, তখন যে কোনও প্রচেষ্টাই তো অর্থহীন। প্রধানমন্ত্রী হওয়া যদি ভাগ্যে নির্ধারিত, তখন যে কোনও প্রচেষ্টাই তো অর্থহীন। প্রধানমন্ত্রী হওয়া যদি ভাগ্যে নির্ধারিতই থাকে, তবে কে তাকে খন্ডাবে? এতো অমোঘ অব্যর্থ। আর ভাগ্যে যদি প্রধানমন্ত্রী হওয়া লেখা না থাকে, তবে কোনও চেষ্টাতেই তা হবে না। প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে বঞ্ছিত হলে সে বঞ্ছনার কারণ অবশ্যই ভাগ্য; যে ভাগ্য জন্মকালীন গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান অনুযায়ী নির্ধারিত হয়ে গেছে।

মহা-বিস্ময় জাগে যখন দেখি সুপণ্ডিত, ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ শ্রীনরসিমহা রাও কথা ও কাজে দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছেন। সমস্ত প্রচার মাধ্যমগুলোর সাহায্যে জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি, নিজের ভাগ্যের লিখনের প্রতি সামান্যতম বিশ্বাস বা শ্রদ্ধা না রেখে নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিতে সংগ্রাম চালিয়েছেন।

কেন এই দ্বিচারিতা? তবে কি ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ শ্রীরাও চান তাঁর শাসনকালে বঞ্ছিত মানুষগুলো তাদের প্রতিটি বঞ্ছনার জন্য নিজ-ভাগ্যকেই দায়ী করুক? তাই কি ডংকা বাজিয়ে জ্যোতিষবিশ্বাসের পক্ষে তাঁর প্রচার? তাঁর এই স্ববিরোধী চরিত্রের কথা দেশবাসীরা যদি তোলে তিনি রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁদের উদ্দেশ্যে কি বলবেন? তখন কি উপদেশ দেবেন, “হে দরিদ্র-ভারতবাসী, হে মূর্খ-ভারতবাসী, আমি যা বলি তাই কর, যা করি তা কর না।“

যে শিল্পপতি, ধনীদের দেওয়া সহস্র কোটি টাকা ব্যয় করে শ্রীরাওয়ের দল ক্ষমতায় এসেছে, যে শিল্পপতিদের পছন্দের মানুষ হিসেবে শ্রীরাও নেতা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও কিছু করার চিন্তা নিশ্চয়ই শ্রীরাও এবং তাঁর দলের সরকারের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। ১৯৯০-এর নভেম্বরে চন্দ্রশেখর যখন প্রধানমন্ত্রী হন এবারের চেয়েও বেশি টাকার খেল হয়েছিল। সে-বারও কিংমেকার শিল্পগোষ্ঠীরাই চন্দ্রশেখরকে পছন্দ করেছিলেন বলেই চন্দ্রশেখর প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছিলেন। শিল্পপতিরা নিশ্চয়ই তাঁদেরই কৃপা করবে, তাঁদের পিছনেই অর্থ ঢালবে, শাসনক্ষমতায় বসাবে, যারা শিল্পপতিদের একান্তই বিশ্বস্ত। অতএব এইসব শাসকগোষ্ঠী ধনকুবেরদের যে বিরোধীতা করতে পারে না, করার সাধ্য নেই এ-কথা অতি স্পষ্টভাবে বুঝে নিতে হবে।

সংসদীয় নির্বাচনে কোনও রাজনৈতিক দল শাসনক্ষমতা দখলের দিকে এগোতে চাইলে, লোকসভায় বা বিধানসভায় উল্লেখযোগ্য আসন পেয়ে দাপট বজায় রাখতে চাইলে সেই রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে বিপুল অর্থ ঢালতেই হবে। বর্তমানে নির্বাচন মানেই এক রাজসূয় যজ্ঞ। বিশাল প্রচার ব্যয়, রিগিং, বুথদখল, ছাপ্পা ভোট এ-সব নিয়েই এখনকার নির্বাচন। এ এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরজন্য অস্ত্র সংগ্রহ ও মাসলম্যানদের পিছনেও বইয়ে

 দিয়ে হয় অর্থের স্রোত। এই শত-সহস্র কোটি টাকা গরীব খেটে খাওয়া মানুষদের এক-টাকা দু-টাকা বা পাঁচ-টাকা চাঁদায় তোলা যায় না। তোলা হয়ও না। নির্বাচনী ব্যয়ের শতকরা ৯৯ ভাগেরও বেশি টাকা যোগায় ধনকুবেররা। বিনিময়ে তারা এইসব দলগুলোর কাছ থেকে পায় স্বস্তিতে শোষণ চালাবার গ্যারান্টি। বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পায় স্বস্তিতে শোষণ চালাবার গ্যারান্টি। বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো কৌশল হিসেবে খেটে খাওয়া মানুষদের কাছ থেকে নির্বাচনী তহবিলের জন্য চাঁদা আদায় করে দেখাতে চায় “মোরা তোমাদেরই লোক।“

এইসব রাজনৈতিক দলের নেতারা যখন মাঠে ময়দানে, পত্র-পত্রিকায়, বেতারে, দূরদর্শনে, গরীবি হটানোর কথা বলেন, শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের কথা বলেন, মেহনতি মানুষের হাতিয়ার বলে নিজেদের ঘোষণা করেন, তখন কিন্তু এইসব তর্জন গর্জনে শোষকশ্রেণীর  সুখনিদ্রায় সামান্যতম ব্যঘাত ঘটে না। শোষকশ্রেণী জানে তাদের কৃপাধন্য, তাদের পছন্দের রাজনৈতিক দল ও নেতাদের এইসব বজ্রনির্ঘোষ স্রেফ ছেলে ভুলোন ছড়া; সংখ্যাগুরু শোষিত মানুষকে ভুলিয়ে রাখার এ এক কৌশল। হুজুরের দল চায় এ-ভাবেই তাদের ক্রীড়নক রাজনৈতিক দলগুলো শোষিতদের অপমানজনের মুখোশ পরে শোষিতদের বিভ্রান্ত করুক, যাতে তাদের সম্মিলিত ক্ষোভ দানা বেঁধে বিস্ফোরিত হতে না পারে। এই সমাজ-ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে শোষণ কায়েম রাখার স্বার্থেই শোষণকারীদের দালাল রাজনৈতিক দলগুলো শোষিত সাধারণ মানুষদের মগজ ধোলাই করে নানা ভাবে।

বর্তমানে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে শোষকশ্রেণীর দালালির অধিকার লাভের প্রতিযোগিতা।

ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই চায় মানুষ অদৃষ্টবাদী হোক, বিশ্বাস করুক পূর্বজন্মের কর্মফলে, ঘুরপাক খাক নানা সংস্কারের অন্ধকারে। এমন বিশ্বাসগুলো শোষিত মানুষগুলোর মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারলে শোষিত মানুষ তাদের প্রতিটি বঞ্ছনার জন্য দায়ী করবে নিজের ভাগ্যকে, কর্মফলকে, ঈশ্বরের কৃপা না পাওয়াকে। শোষিত মানুষগুলোর চিন্তা চেতনা যদি স্বচ্ছতা পায়, ওরা যদি অন্ধ-সংস্কার ও বিশ্বাসের দেওয়াল ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে, তবে তো ওদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে প্রতিটি বঞ্ছনার পিছনেই রয়েছে এই সমাজেরই কিছু মানুষ, এই সমাজেরই কিছু নিয়ম-কানুন ব্যবস্থা বা অব্যবস্থা, দুর্নীতি ও শোষণ। শোষিত মানুষ যদি বুঝতেই পারে তাদের বঞ্ছনার কারণের মূলে ভাগ্য, কর্মফল বা ঈশ্বরের কৃপাহীনতা দায়ী নয়, দায়ী সমাজের বর্তমান ব্যবস্থা, তখন তাঁরা বঞ্ছনামুক্ত হতে একদিন নিশ্চয়ই এই সমাজ ব্যবস্থা, তখন তাঁরা বঞ্ছনামুক্ত হতে একদিন নিশ্চয়ই এই সমাজ ব্যবস্থাকেই পাল্টাতে চাইবে। সমাজের মূল ধরে টান দেবে। এতে শোষকশ্রেণী ও তাদের কৃপাধন্য দালালদের অস্তিত্বই যে বিপন্ন হয়ে পড়বে। এটা খুব ভালোমত জানে এবং বোঝে বলেই শোষকশ্রেণী ও তাদের দালালদের নানা পরিকল্পনা প্রতিনিয়তই চলছে। চলছে নানা ভাবে মগজ ধোলাইয়ের পদ্ধতি।

শোষণ ব্যবস্থাকে কায়েম রাখতেই মগজ ধোলাই চলছে

সময় এগোচ্ছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মন থেকে খসে পড়ছে অনেক সংস্কার, অনেক মূল্যবোধ। মানুষ অনেক পুরোন ধ্যান-ধারণা বিদায় দিচ্ছে। মানুষের এই অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধনীরাও শোষণের নানা নতুন নতুন কৌশল বের করছে, বের করছে গরীব মানুষগুলোর মগজ ধোলাইয়ের নানা প্যাঁচ-পায়জার। এইসব কূট কৌশল যেমন ধনীদের ভাড়া করা কিছু বুদ্ধিমানদের কাছে সে-সব ধরাও পড়ে যাচ্ছে। এইসব বিক্রি না হওয়া বুদ্ধিমানদের কেউ কেউ এগিয়ে আসছেন বঞ্ছিত মানুষদের ঘুম ভাঙ্গাতে। তাঁদের চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গড়ে উঠছে নানা সংগঠন, নানা গোষ্ঠি। এইসব সংগঠন ও গোষ্ঠি বঞ্ছিতদের ধোলাই করা মগজ আবার ধোলাই করে ঢুকিয়ে দিচ্ছে চিন্তা, জাগিয়ে তুলছে নতুন চেতনা, গড়ে উঠছে নতুন সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিবেশ।

হুজুরের দল অবশ্যই এই অবস্থায় হাত-পা গুটিয়ে বসে থেকে এক সময় বঞ্ছিত মানুষগুলোর সোচ্চার দাবী ও ক্ষোভকে সম্মান জানিয়ে রাজ্য-পাট ছেড়ে দিয়ে সন্ন্যাস নেয় না। ওরা অবশ্যই প্রতিরোধ গড়ে তোলে, প্রতিআক্রমণ চালায়। শোষকরা ভালমতই জানে সংখ্যাগুরু শোষিত মানুষদের পায়ের তলায় দাবিয়ে রেখে দাবিয়ে চলার মত পুলিশ ও সেনা রাষ্ট্র-শক্তির নেই। তাই নানা কৌশলে চেষ্টা করে শোষিত ক্ষুব্ধ মানুষগুলোকে দমিয়ে রাখতে বিভিন্ন পন্থা ও কৌশলের সাহায্য নিতে।

নির্বাচন নির্ভর রাজনৈতিক দলগুলোকে রাষ্ট্র-ক্ষমতা দখলের লড়াইতে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়, তার পুরোটা যেহেতু ধনী হুজুরের দলই জোগায় তাই রাষ্ট্র-ক্ষমতা দখলকারী রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্রশক্তি হয়ে দাঁড়ায় ধনীদের বিশ্বস্ত যো-হুজুরের দল।

এরই সঙ্গে হুজুরের দল আরও অনেক বুদ্ধিজীবীর বিবেক কিনতে বাজারে নেমে পড়ে। টপাটপ বিক্রিও হয়ে যায় অনেকেই। শোষিত মানুষগুলোর মগজ ধোলাই করতে হুজুরের দল নামিয়ে দেয় রাষ্ট্রশক্তি, রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবীদের। নেমে পড়ে সরকারী ও ধনী মালিকানাধীন প্রচার-মাধ্যম, পত্র-পত্রিকা ইত্যাদি। মগজ ধোলাই করা হতে থাকে প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন ভাবে। পাশাপাশি তথাকথিত ধর্মীয় চেতনা জনমানসে বাড়াবার চেষ্টা চলতে থাকে। প্রয়োজনে জাত-পাত ও সাম্প্রদায়িক নানা চিন্তাকে উসকে দেওয়ার নানা কৌশলও টপাটপ বের করতে থাকে হুজুরের উচ্ছিষ্টভোগী পরামর্শদাতা ও দালালের দল। ভক্তিরসের বান ডাকান হতে থাকে নানা ভাবে। অদৃষ্টবাদ, অলৌকিকত্বের রমরমা বাজার তৈরি করতে সূক্ষ্ম বুদ্ধির কৌশলেই কাজ হয়। অদৃষ্টবাদ, অলৌকিকত্বের রমরমা বাজার তৈরি করতে সূক্ষ্ম বুদ্ধির কৌশলেই কাজ হয়। জ্যোতিষ ও প্যারাসাইকোলজিস্ট নামধারী প্রবঞ্ছকের দল রাষ্ট্রশক্তির আসকারায় তাঁদের উদ্ভট সব চিন্তা সাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে নিজেদের আখের গোছাবার পাশাপাশি সাধারণ মানুষদের মগজ ধোলাই করে ধনীক শ্রণীর স্বার্থ রক্ষা করে। প্রতিটি ক্লাব, গণসংগঠন, লাইব্রেরী, স্কুল, কলেজকে কুক্ষিগত করে নিজেদের ইচ্ছেমত সাংস্কৃতিক চেতনা মাথায় ঢোকাতে কখনো রাজনৈতিক দলগুলোকে কাজে লাগায় উজুরের দল। কুক্ষিগত করার জন্য লোভ, ভয়, বলপ্রয়োগ ইত্যাদিকে পাথেয় করে রাজনীতি পেশার মানুষগুলো। কখনো বা সাহায্যের বদান্যতায় সংস্থাগুলোর ইচ্ছেমত চলার ক্ষমতাকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়। আবার কখনো বা ওইসব সংস্থার নেতাদের বিবেক কিনেই সংস্থাকে পকেটে পুরে ফেলে হুজুরের দল। কখনো নিজেদের বিশ্বস্ত লোকদের দিয়ে ওই ধরনের সাজান আন্দোলন শুরু করা হয়; আন্দোলনে সামিল মানুষদের বিভ্রান্ত ও লক্ষ্যভ্রষ্ট করার চেষ্টায়। এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রশক্তি আন্দোলনকারীদের দেশের সাধারণ মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে জাতীয়তাবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী, উগ্রপন্থী, ইত্যাদি ছাপ মেরে দেয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সরকারী, বেসরকারী প্রচার মাধ্যমগুলোর নিরবচ্ছিন্ন প্রচারে শোষিত মানুষদের এই প্রতিরোধের বিরুদ্ধে দেশের শোষিত মানুষেরাই বিরূপ মনোভাব পোষণ করে। কখনো বা সওদা হতে না চাওয়া উন্নত শির, বিপদজনক নেতার চরিত্র-হননের নানা প্রচেষ্টা চালান হয় সাজান আন্দোলনকারীদের সাহায্যে। কখনো বা নেতাকে ঠান্ডা মাথায় খুন করে গুলিবিনিময়ের আষাঢ়ে গল্প ফাঁদা হয়। অথবা গল্প ফাঁদা হয় পতিতাপল্লী রেইড করতে গিয়ে ধরাপড়া নেতার গুলি বিনিময় এবং মৃত্যুর।

এই যে কথাগুলো লিখেছি, এর একটা কথাও কল্পনাপ্রসূত নয়। যখনই কোনও দরিদ্র শোষিত জনগোষ্ঠি ঘুম থেকে জেগে উঠেছে, প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে, আঘাত হেনেছে হুজুরদের দুর্গে, তখনই সেই আন্দোলনকে ধ্বংস করতে শোষকশ্রেণী ও তার সেবক রাষ্ট্রশক্তি এই পদ্ধতিগুলোকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রয়োগ করে চলেছে।

যারা শোষণ করছে, তারা চায়, যাদের শোষণ করছি তাঁদের এমন নানা নেশায় ভুলিয়ে রাখব, মাতিয়ে রাখব যে তারা নিজেরা নিজেদের নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকবে যে তারা আমাদের বিরুদ্ধে কোন দিনই সম্মিলিত শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

আন্দোলনকে জয়ী দেখতে চাইলে হুজুরের দল ও তাদের রক্ষার দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রশক্তি বা সরকার আন্দোলন ধ্বংস করতে কি কি কৌশল গ্রহণ করে থাকে সে বিষয়ে আমাদের একটা স্পষ্ট ধারণা থাকা একান্তই প্রয়োজনীয়। সম্ভাব্য আক্রমণ বিষয়ে অবহিত থাকলে সেই আক্রমণ প্রতিহত করা এবং পাল্টা আক্রমণ চালান সহজতর হয়।

শোষকশ্রেণী বা রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন যারা চালাবেন তাঁদের এটা অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন প্রতিটি আন্দোলনের গতি-প্রকৃতির ওপর যথেষ্ট নজর রাখে রাষ্ট্রশক্তি বা সরকার। সরকারের গোয়েন্দা দপ্তরের রয়েছে বহু বিভাগ। আমাদের সরকারের ইন্টেলিজেন্ট ডিপার্টমেন্টেরই রয়েছে তিরিশের ওপর বিভাগ বা সেল। ছাত্র, রাজনৈতিকদল, ডাকাত অপরাধ, নকশাল সংগঠন ইত্যাদি প্রত্যেকটা বিভাগের জন্যে রয়েছে সেল। গোয়েন্দারা এইসব সংগঠনগুলোর ওপর নজর রাখেন। এ-ছাড়াও গোয়েন্দাদপ্তরের ও বিভিন্ন থানারই রয়েছে নিজস্ব ইনফর্মার। এই ইনফর্মাররা প্রতিটি সেলেই তথ্য যোগাচ্ছে অর্থের বিনিময়ে। এরা সরকারী চাকরি করে না। এদের আত্মপরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে এক একজন বড় পুলিশ অফিসারদের হাতে থাকে সরকারী খরচে নিজস্ব বিশ্বস্ত ইনফর্মার। এরা কোথায় নেই? কোনও সংগঠন সরকারের পক্ষে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে, সন্দেহ করলেই তাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় ইনফর্মার। এ-ছাড়া গোয়েন্দারাও নজরে রাখেন। সুতরাং বহু আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি বিষয়েই সরকার ও শোষকশ্রেণী সব সময়ই ওয়াকিবহাল। বিভিন্ন আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি বুঝে তাকে রুখতে সরকার হাজির করে নানা কৌশল।

এর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য কৌশল হল, সাধারণ মানুষের চিন্তাধারাকে নিজের প্রয়োজনীয় খাতে বইয়ে নিয়ে যাওয়া।

মানুষের চিন্তাধারাকে কোনও একটা বিশেষ খাতে বওয়াতে, চিন্তায় কোনও বিশ্বাসকে স্থায়ীভাবে গাঁথতে যে পদ্ধতিটি এখনও সবচেয়ে বেশি সফল বলে স্বীকৃত, তা হল অসীম ধৈর্যের সঙ্গে সুযোগ পেলেই মিথ্যাকেও বার বার নানা ভাবে বিশ্বাসযোগ্য কর পরিবেশন করতে থাকা। কোনও একটি মিথ্যে বিশ্বাসকে মানুষের মাথায় সত্যি বলে ঢোকাতে হলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রচার কর ওই বিশ্বাসকে তোমার এবং বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির রয়েছে অগাধ আস্থা ও অচল ভক্তি। সফল রাজনীতিকদের এসব বিষয় জানতে হয়, নইলে শিল্পপতিদের কাছে কলকে পাওয়া যায় না। ওরা ধৈর্য ধরে সুযোগ বুঝে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে জনসাধারণকে মাঝে মধ্যেই জানাতে থাকে ওদের জ্যোতিষ-বিশ্বাস ও জ্যোতিষ নির্ভরতার কথা, ঈশ্বর বিশ্বাস ও অলৌকিক ক্ষমতাবান ধর্মগুরুদের প্রতি বিশুদ্ধ ভক্তির কথা। এতে কিছু কিছু ধর্মীয় সম্প্রদায় ও ধর্মগুরুর শিষ্যদের ভোট প্রভাবিত হয়, জনসাধারণের মধ্যে জ্যোতিষ ও ভাগ্য-নির্ভরতা বাড়তে থাকে। কর্মফলে বিশ্বাস, ঈশ্বরনির্ভরতা, গুরুনির্ভরতা ইত্যাদি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আত্মবিশ্বাস হ্রাস পেতে থাকে। আত্মবিশ্বাসহীন মানুষ আত্মনিবেদন করতে জানে, আত্মসমর্পণ করার মধ্য দিয়ে দুঃখ ও বঞ্ছনাকে ভুলতে জানে কিন্তু লড়াকু হতে জানে না। যে লড়াকু নয়, তাকে আবার ভয় কি?

মার্কসবাদের সঙ্গে অপরীক্ষিত এবং শুধুমাত্র বিশ্বাসশাস্ত্রের চূড়ান্ত বিবাদ থাকলেও কিছু কিছু মার্কসবাদী মন্ত্রী কিন্তু জ্যোতিষীদের সম্মেলনে শুভেচ্ছা বাণী-টাণীও পাঠান। মেহনতি মানুষের বন্ধু ওইসব মার্কসবাদী দলগুলো তাদের দলের মন্ত্রীদের এমন মার্কস-বাদ-ই কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার ফতোয়া জারি করেন না কেন? কেন এমন অদ্ভুত আচরণ? ওইসব কার্যকলাপ কি শুধুই মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত ব্যক্তিগত চ্যুতি বা নীতিভ্রষ্টতার নিদর্শন? না কি ক্ষমতায় শাঁসে জলে থাকার পরিণতিতে সাধারণ মানুষের চেতনাকে অদৃষ্টবাদী করে তোলার কূট কৌশল?

একটু তলিয়ে দেখলেই দেখতে পাবেন ওইসব তথাকথিত অদৃষ্ট অদৃষ্টবাদে বিশ্বাসী রাজনৈতিক নেতারা প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ অদৃষ্টবাদ বিরোধী চরমবাস্তববাদী। ‘’ভাগ্যে যা লেখা আছে তাই হবেই’, বলে কোনও রাজনৈতিক নেতা বা দলই নির্বাচনের লড়াইতে হাত গুটিয়ে বসে থাকে না।

মিটিং, মিছিল, প্রচারের বিশাল ব্যয়, কর্মী, পেশীশক্তি, আগ্নেয়াস্ত্র যোগাড়, বোমের স্টক, জালিয়াতির নব-নব কৌশলকে কাজে লাগানোর প্রয়াস, বুথ দখল ইত্যাদি সকল বিষয়েই বিরোধী প্রার্থীকে টেক্কা দিয়েই জেতার চেষ্টা করে।

পরিবেশ নিয়ে মগজ ধোলাই

একটি মিথ্যেকে বার বার সাজিয়ে গুছিয়ে প্রচার করতে করতে এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি করা যায়, যার ফলে মিথ্যেটাই মানুষের বিশ্বাসে সত্যি হিসেবে জ্বল জ্বল করে। এই সত্যটাকেই মাথায় রেখে তাবৎ রাজনীতিকরা পরিবেশ দূষণ নিয়ে প্রচারে নেমেছেন। কত টাকা বাড়ছে সেমিনারে, ওয়ার্কশপে, গাছ বিলি করতে, গাছ পুঁততে, কত লক্ষ মিটার দুর্মূল্য ফিল্প, কত টন নিউজপ্রিন্ট খরচ হয়েছে তার হিসেব রাখা ভার। কিন্তু প্রতিনিয়ত প্রচারে ফল পাওয়া গেছে দারুণ। এখন পরিবেশ বলতে তামাম দেশবাসীর মাথায় শুধু ভেসে ওঠে প্রাকৃতিক পরিবেশের ছবি। কিন্তু পরিবেশ বলতে কি শুধুই প্রাকৃতিক পরিবেশ? মানূষের ওপর শুধুই কি প্রাকৃতিক পরিবেশই প্রভাব ফেলে?

যারা পরিবেশ বলতে শুধুই প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা সাধারণ মানুষের মাথায় ঢোকাতে চাইছে, তারা ভালমতই জানে ‘আর্থ-সামাজিক ও সমাজ-সাংস্কৃতিক’ নামের দুটি বিশাল প্রভাবশালী পরিবেশের কথা, মানবজীবনে যাদের প্রভাব বহু ক্ষেত্রেই প্রাকৃতিক পরিবেশের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। সমাজ- সাংস্কৃতিক পরিবেশের বিপুল প্রভাবের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ রাশিয়া সমেত পূর্ব-ইউরোপের দেশগুলো থেকে মার্কসবাদের বিদায়। ওইসব মার্কসবাদী দেশে দীর্ঘ দিন ধরে নানা ভাবে পাচার করা হয়েছে মার্কিন সংস্কৃতি, উত্তেজক মার্কিন সংস্কৃতি, ভোগসর্বস্ব মার্কিন সংস্কৃতি। মার্কসবাদী দেশগুলোর সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ভেসে আসা উদ্দাম মার্কিন সংস্কৃতি মানুষগুলোকে মানসিকভাবে নেশাগ্রস্থ করেছে, ক্ষুধার্ত করেছে। আর তাইতেই একের পর এক ধস নেমেছে।

‘সংস্কৃতি’ মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। ‘সংস্কৃতি’ প্রগতির ধারক। মানবতাবাদী জীবনবোধের উপাদানই হল সংস্কৃতি। যে ‘সংস্কৃতি’ এই সব ধারার বিপরীতগামী তা ‘অসংস্কৃতি’। ভারতবর্ষের সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে, দূরদর্শনে, যাত্রায়, নাটকে সর্বত্র এক অসংস্কৃতির ঢল নেমেছে। কারণ এইসব সৃষ্টির পিছনে মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোন প্রয়াস নেই। বরং রয়েছে ভোগসর্বস্ববাদ, অবাধ যৌনতা, হত্যা-হানাহানি-ধর্ষণ, দুজ্ঞেয়বাদ, অদৃষ্টবাদ, ঠাকুর দেবতার রমরমা, ধর্মীয় সংস্কার সৃষ্টি ইত্যাদির মধ্য দিয়ে মানুষকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলে বৃহত্তর শোষিত জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রাখার প্রয়াস।

কোনও কোনও সমাজ সচেতন গোষ্ঠি কোনও কোনও জায়গায় শোষিত মানুষদের যখন বোঝাচ্ছে তাদের বঞ্ছনার কারণগুলো আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র বা স্বর্গের দেবতা নয়, বঞ্ছনার কারণ এই সমাজব্যবস্থা, যখন এই অসাংস্কৃতিক প্রভাব মুক্ত করতে সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে চাইছে তখন বাংলা ভাষার জনপ্রিয়তম সাহিত্য পত্রিকায় দুই ঔপন্যাসিকের কলম ঝলসে উঠল ওইসব সমাজ সচেতন যুক্তিবাদী গোষ্ঠির বিরুদ্ধে। কলমচিরা জ্যোতিষশাস্ত্রের পক্ষে, অলৌকিক ক্ষমতাবানদের পক্ষে সোচ্চার হবেন।

যারা সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিবেশকে ধর্তব্যের মধ্যে আনতেই নারাজ, তাঁরা কি বলবেন। দেশ জুড়ে এই যে ধর্ম নিয়ে উন্মাদা, হানাহানি এ-সব কোন পরিবেশের ফল?

ধর্ম নিয়ে এমন উন্মত্ততা তো একদিনে গাছের পাকা ফলটির মত টুপ করে এসে পড়েনি। সাম্প্রদায়িক দল বলে আজ যাদের গাল পাড়ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সেই সাম্প্রদায়িক দলটি তো হঠাৎ করে উজ্জীবিত হয়ে ওঠেনি। ভারতবর্ষের মাটিতে ধর্মের চাষ, ধর্মের ফসল উৎপাদন ও ধর্মব্যবসা দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে বারোয়ারী দুর্গাপুজো, কালীপুজো, জগদ্ধাত্রীপুজোর রমরমা বেড়েছে। অনেক মার্কসবাদী দলের নির্দেশে পুজো কমিটিতে ঢুকে জনসাধারণের মধ্যে কাজ করতে নেমে পড়েছেন। এই নতুন শক্তির আগমনে পুজোর বাজেট বেড়েছে চড়চড় শীতলার দোকান খুলেছে। রাজনীতিকরা পুজো উদ্বোধন, জ্যোতিষ-মহাসম্মেলন উদ্বোধনে হাজির থেকে পোঁতা বিষবৃক্ষের বীজে সার ঢেলেছেন, জলসিঞ্চন করেছেন, বাবা ‘তারকনাথ’, ‘সন্তোষী মা’ ছবির কৃপায় পাড়ায় পাড়ায় যুবক-যুবতীদের উদাত্ত অংশগ্রহণে মাইক, আলো, দেবদারুপাতা ও বাঁক-শোভিত চত্তরের সংখ্যা বেড়েছে। বাঁক কাঁধে শ্লীল, অশ্লীল, স্লোগান দিতে দিতে যুবক-যুবতীরা ছুটে চলে তারকেশ্বরে। ‘জয় সন্তোষী মা’ ছবির কৃপায় মা স্নতোষীর জাঁক-জমক বাড়ে। দূরদর্শনে ‘রামায়ণ’ ‘মহাভারত’ দেশবাসীকে ভাবাবেগ ও ভক্তিরসের তীব্র নেশায় বুঁদ করে রাখে। ‘সতী মন্দির’ রাজস্থানের ব্যাপার, পশ্চিমবাংলার মাটিতে বসবাসকারী রাজস্থানী ভোটারের সংখ্যা এতই নগণ্য যে তারা নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারবে না। এই অংক মাথায় রেখে ভোটারদের কাছে প্রগতিশীল ইমেজ তৈরি করতে তাবড় রাজনীতিকরা ঘোষণা করেন, মৃতকে নিয়ে স্মৃতি-সৌধ হতে পারে, কিন্তু মৃতকে পুজো? এ তো কুসংস্কার। এই কুসংস্কারের আবর্জনা আমরা পশ্চিম বাংলায় জমতে দেব না। এই রাজনীতিকরাই আবার রামকৃষ্ণ, রামঠাকুর, অনুকূলচন্দ্র, লোকনাথের পুজো নিয়ে নীরব থেকে পরোক্ষ মদত দিয়েছেন। এইসব মৃত ধর্মীয় নেতাদের ভক্ত-সংখ্যা বিশাল এবং তাদের ভোটাধিকার আছে বলেই কি এইসব রাজনীতিকদের প্রগতিশীল বুলির ফানুস চুপসে যায়?

“আত্মা অবিনশ্বর” এই যুক্তিহীন বিশ্বাস যতদিন মানুষের মনে থাকবে ততদিন সতী-মন্দির সহ নানা মৃত বাবাজী মাতাজীদের মন্দিরও থাকবে তাঁদের আশীর্বাদ লাভের আশায়। বিভিন্ন ধর্ম-বিশ্বাসে বলা হয়েছে ‘আত্মা মানে ‘চিন্তা’ ‘চেতনা’ ‘চৈতন্য’ বা ‘মন’। শরীরবিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে আমরা এও জেনেছি ‘চিন্তা’ ‘চৈতন্য’ ‘চেতনা’ বা ‘মন’ হল মস্তিষ্ক স্নায়ুকোষের কাজকর্মের ফল। মানুষ মারা গেলে তার মস্তিষ্ক স্নায়ুকোষগুলোও মারা যায়। তারপর এক সময় মস্তিষ্ক স্নায়ুকোষগুলোর অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যায় সমাধির মাটির তলায়, আগুনে পুড়ে, পচে অথবা কোনও প্রাণীর পাকযন্ত্রে হজম হয়ে। মস্তিষ্ক স্নায়ুকোষগুলোর অস্তিত্বই যখন থাকে না তখন সেই অস্তিত্বহীন স্নায়ুকোষের কাজকর্মের ফল হিসেবে ‘চিন্তা’ ‘চেতনা’ ‘চৈতন্য’ বা ‘মন’ -এর অস্তিত্বও যে আর থাকতে পারে না, এই সাধারণ যুক্তির কথাটুকু বুদ্ধিজীবী রাজনীতিকদের অজানা থাকার কথা নয়। ধরে নিলাম শিক্ষার সুযোগ না পাওয়া, অশিক্ষিত সমাজবিরোধী মাফিয়া নেতা এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন কিছু শক্তিমান রাজনীতিক আছেন যারা শক্তিপ্রয়োগের বিষয় যতটা বোঝেন, ‘চিন্তা’ ‘চেতনা’ ‘মন’ ইত্যাদির কথা ততটাই বোঝেন  না। কিন্তু এর বাইরে যে সংখ্যাগুরু বুদ্ধিমান, শিক্ষিত ধুরন্ধর রাজনীতিবিদরা রয়েছেন তাঁদেরকেও মাথা-মোটা ভাবলে ভুলই করা হবে। সব-গুলো মাথা-মোটার পেছনে অর্থ ব্যয় করে তাদের নির্বাচন জিতিয়ে আনলেই বা লাভ কি? ওইসব মাথা-মোটারা কি দেশের দরিদ্র শোষিত মানুষদের মগজ ধোলাই করে বঞ্ছনার থেকে উঠে আসার সম্ভাবনাময় প্রতিবাদের কন্ঠকে রোধ করতে পারবে? পারবে না। তাহলে তো রাতারাতি শোষকশ্রেণীর গণেশ উল্টোবে, ধুরন্ধর এইসব ধনীর দালাল রাজনীতিকরা ‘চিন্তা’ ‘চেতনা’ ‘মন’ ‘আত্মা’ ‘অদৃষ্টবাদ’ ‘কর্মফল’ ইত্যাদি খুব ভালমতই বোঝেন। বোঝেন বলেই জানেন, দরিদ্র মানুষগুলোর চেতনা কতদূর পর্যন্ত এগোতে দেওয়া নিরাপদ। ওইসব রাজনীতিক ও তাদের দলের বুদ্ধিজীবিরা ভালমতই জানেন ‘আত্মা অবিনশ্বর’ এই ভ্রান্ত চিন্তা মানুষের মাথায় বদ্ধমুল করতে পারলে সেই সূত্র ধরেই গরীবদের মাথায় ঢোকান যায়, ‘এই জন্মে এই যে এতো কষ্ট পাচ্ছি, এসব গত জন্মের কোনও পাপের ফল, এজন্মে দেব-দ্বিজে ভক্তি রেখে, রাজপদে (বর্তমানে রাজনীতিকদের পায়ে) ভক্তি রেখে, কোনও হিংসার আশ্রয় না নিয়ে ঈশ্বরের দেওয়া এই জীবনের দুঃখগুলোকে মেনে নিয়ে সুশীল হয়ে চললে আগামী জন্মে ভাল ফল পাব।’

শিল্পপতিদের মালিকানাধীন বিশাল বিশাল ঝাঁ-চকচকে কাগজগুলোতে বিশাল বিশাল মাইনেয় বিশাল বিশাল লেখক পোষা হচ্ছে। পত্রিকার মালিক নিত্য রুটিন মাফিক পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদকের সঙ্গে মিটিং করছেন, বুঝিয়ে দিচ্ছেন পেপার পলিশি। আর সেই পেপার পলিশিকে মাথায় রেখেই কলম চালাচ্ছেন, কলম চালাতে হচ্ছে মাইনে করা তা-বড় লেখকদের।

পেপার পলিসি কি? পত্রিকার মালিকগোষ্ঠির স্বার্থরক্ষার কৌশলই, পত্রিকার কৌশল। পত্রিকার মালিকের স্বার্থ কখনো ব্যক্তিগত, যেখানে আর এক জনগোষ্ঠির তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী। আবার কখনো শ্রেণীগত, যেখানে সামগ্রিকভাবেই ধনীকশ্রেণীর স্বার্থ মিলেমিশে আছে। পত্রিকার মালিক এই দুই ধরনের স্বার্থেই তাঁর মাইনে করা লেখকদের কাজে লাগিয়ে পাঠক-পাঠিকাদের মগজ ধোলাই করে।

এ-যুগের সাংস্কৃতিক পরিবেশ এমনই হাজারো উপায়ে হাজারো ফন্দিতে মুঠোবন্দী করে রেখেছে হুজুরের দল, হুজুর-মজুর সম্পর্ককে বজায় রাখতেই। দেশের সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিবেশের এই বিশাল দূষণ নিয়ে, পচন নিয়ে নীরব কেন সেসব রাজনৈতিক দল যারা গরীবি হটাতে চায়, যারা শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রামের হাতিয়ার? যারা দেশপ্রেমী জাতীয়তাবাদী? ওদের নীরবতার একটাই অর্থ- ওরা চায় এই সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিবেশ বজায় রাখতে,  তাই তো পরিবেশ বলতে শুধুমাত্র ‘প্রাকৃতিক প্রিবেশ’র কথা আমাদের মাথায় ঢোকাতে দীর্ঘস্থায়ী লাগাতার প্রচার চালিয়েই যাচ্ছে।

দেশপ্রেম নিয়ে ভুল ধারণা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে

সিনেমায়, যাত্রায়, নাটকে, গল্পে-উপন্যাসে যখনই দেশ প্রেমের প্রসঙ্গ এসেছে, সাধারণ মানুষের মগজ ধোলাই করতে বার বার বোঝান হয়েছে, দেশ মানে ‘ধরতি’, ‘দেশের মাটি’ ‘দেশের নদী-পাহার’। দেশের মাটিকেই এক খাবলা তুলে নিয়ে শপথ নিচ্ছে দেশপ্রেমিকরা এবং তার জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিয়ে দিচ্ছে।

বার বার প্রচারে যে কথাটা আমাদের মাথায় ঢোকানো হয়েছে এবং হচ্ছে, তা তো বাস্তব সত্য নয়। ‘দেশপ্রেম’ মানে কখনোই দেশে মাটিকে ভালোবাসা হতে পারে না।

দেশপ্রেম মানে ‘দেশবাসীর প্রতি প্রেম’। কিন্তু তামাম দেশবাসীকে তো এক সঙ্গে প্রেম বিলোন যায় না। হুজুরের দলকে বিলোলে মজুরের দলকে অপ্রেম বিলোতে হয়, আর মজুরের দলকে প্রেম বিলোন মানেই হুজুরের দলকে অপ্রেম।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘আত্মপরিচয়’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, “দেশ মানুষের সৃষ্টি। দেশ মৃন্ময় নয়, সে চিন্ময়। মানুষ যদি প্রকাশমান হয় তবে দেশ প্রকাশিত। সুজলা সুফলা মলয়জশীতলা ভূমির কথা যতই উচ্চকন্ঠে রটান ততই জবাবদিহির দায় বাড়বে, প্রশ্ন উঠবে প্রাকৃতিক দেশ তো উপাদান মাত্র, তা নিয়ে মানবিক সম্পদ কতটা গড়ে তোলা হল। মানুষের হাতে দেশের জল যদি শুকিয়ে যায়, ফল যদি যায় মরে, মলয়জ যদি বিষিয়ে ওঠে মারীবীজে, শস্যের জমি যদি হয় বন্ধ্যা, তবে কাব্য কথায় দেশের লজ্জা চাপা পড়বে না। দেশ মাটিতে তৈরি নয়, দেশ মানুষে তৈরি।”

এক শতাব্দী আগে রবীন্দ্রনাথ যে পরম সত্যটি অনুভব করেছিলেন, উপলব্ধি করেছিলেন, সেই উপলব্ধি ও অনুভবে এখনও যদি বুদ্ধিজীবীরা পৌঁছতে না পেরে থাকেন, তবে এইসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের হয় নির্বোধ অথবা অতি বুদ্ধিজীবী অর্থাৎ ‘ধান্দাবাজ’ বলতে হয়।

আজ দেশপ্রেম বলতে দেশের মাটিকে দেশের ভূখন্ডের চৌহদ্দিকে চিহ্নিত করাটাই প্রচলিত সংস্কার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই দেশপ্রেমের প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করে যখন কোনও মানবগোষ্ঠি হুজুরের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তাদের শোষণের থাবা থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তখন মগজ ধোলাইয়ের কল্যাণে অমনি চারদিক থেকে নিপীরিত মানুষগুলোই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের সুরে সুর মিলিয়ে ‘গেল গেল’ রব তুলে ছুটে আসে, এবং যা নয় তাই বলে গাল পাড়তে থাকে। এরপর ওইসব আন্দোলনকারীদের ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে পারলে কাজ অর্ধেক হাসিল। আমাদের সমাজে প্রকৃত দেশপ্রেমের কোনও ঐতিহ্য নেই, আর সেই ঐতিহ্য যাতে গড়ে উঠতে না পারে সেজন্য তথাকথিত দেশপ্রেমীরা সদা-সতর্ক, সদা-তৎপর। এ-দেশের ঐতিহ্যে দেশপ্রেমিক বলতে চিত্রিত রাণাপ্রতাপ, শিবাজী থেকে শুরু করে ঝান্সির রাণী, বারো ভুঁইয়ার মত ভিড় করে আসা বহু চরিত্র। এঁদের ব্যক্তিস্বার্থের দ্বন্দ্বকেই বিকৃত ভাবে আমাদের সামনে বার বার হাজির করা হয়েছে ও হচ্ছে দেশপ্রেমের নিদর্শন হিসেবে। ধনীকশ্রেণীর অর্থপুষ্ট, ধনীক শ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী রাজনীতিকদেরই ‘ভারতরত্ন’ বলে ভূষিত করার ঐতিহ্যই আমরা বহন করে চলেছি। হুজুরের প্রতি প্রেমময় এইসব ভারতরত্নরা যদি দেশপ্রেমিক হন, তাহলে দেশদ্রোহী কারা? এই ঐতিহ্য অনুসারী হিসবে আমরা তাই নিপীড়িতদের স্বার্থরক্ষাকারীদেরই ‘দেশদ্রোহী’ বলে চিহ্নিত করেই চলেছি।

‘দেশ মাটিতে তৈরি নয়, দেশ মানুষে তৈরি’ -এই সত্যকে মাথায় রেখেই আমাদের ‘দেশপ্রেমী’ও ‘দেশদ্রোহী’ শব্দগুলোর সংজ্ঞা খুঁজতে হবে।
বিচ্ছিন্নতাবাদ নিয়ে গোলপাকান চিন্তা

‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ শব্দটির সঙ্গে এখন আমরা বড় বেশি রকম ভাবেই পরিচিত হয়ে উঠেছি ব্যাপক ও লাগাতার প্রচারের দৌলতে। আমরা অনেকেই এই প্রচারের আবর্তে প্রভাবিত হয়ে ভাবতে শুরু করেছি ‘বিচ্ছিন্নতা’ এক ধরনের নৈরাশ্যতাড়িত অভিব্যক্তি। ‘বিচ্ছিন্নতা’র এই নেতিবাচক আবেদন আমাদের চিন্তাকে প্রভাবিত করায় আমরা ‘বিচ্ছিন্নতা’ বা ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ শব্দগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গে অবচেতন ও সচেতন ভাবে কিছুটা বিরক্ত ও বিরূপ হয়ে উঠি। সরকার যে ‘জনগোষ্ঠি’ বা আন্দোলনকারীদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বলে ঘোষণা করে, তাদের সম্বন্ধেও আমরা যথেষ্ট বিরূপ ধারণা পোষণ করতে শুরু করি। আমরা ভাবতে থাকি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আমাদের দেশ-মাতৃকার অঙ্গহানী ঘটাতে চাইছে। এ-ভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আরও বেশি বেশ হতে থাকলে আমাদের দেশের তো অস্তিত্বই থাকবে না। ‘দেশকে আমরা টুকরো হতে দেব না’ -এই মানসিকতাই তখন আমাদের মধ্যে প্রবল হয়ে ওঠে।

‘বিচ্ছিন্নতা’ কি? সকলের থেকে স্বতন্ত্র, সকলের থেকে আলাদা, সকলের সঙ্গে না মানিয়ে নিতে পারা।

কোনও অসুস্থ সমাজ ব্যবস্থায় সুস্থ ব্যক্তিত্ববোধ সম্পন্ন মানুষ ‘বিচ্ছিন্ন’ হতে বাধ্য।

পৃথিবীর ইতিহাসে গ্যালিলিও, প্যারাসেলসাস, ব্রুনো, বিদ্যাসাগর-এর মতন অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের আগমনের কথা লেখা আছে, যারা প্রত্যেকেই সমাজে ছিলেন একাকী। এইসব বিদ্রোহী মানুষগুলো প্রথমত চিন্তার স্ববিরত্বকে চূর্ণ করতে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন সেই সময়কার সমাজের বৃহত্তর মানবগোষ্ঠি থেকে। সে-কালের বিচ্ছিন্ন মানুষদের সঠিক মূল্যায়ন করার ক্ষমতা ছিল না সে-সময়কার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানবগোষ্ঠির। আজ সেই সব বিচ্ছিন্ন মানুষরাই এ-যুগের মানুষদের কাছে আদর্শ ও প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন।

যে বিচ্ছিন্নতার অর্থ শোষণের অবসানমুখী সংগ্রাম, শোষণমুক্ত সমাজ থেকে বিযুক্ত হওয়ার তীব্র আকুতি, সুস্থ আত্মবিকাশের চেতনা, সে বিচ্ছিন্নতা অবশ্যই মনুষ্যত্বের কাম্য, সভ্যতার কাম্য।

যে সমাজ আগাপাছতলা ডুবে আছে দুরনীতির পঙ্কিলতায়, সে সমাজে শাসন ক্ষমতায় বসতে রাজনৈতিক দলগুলোকে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে ঘুরতে হয় ধনকুবেরদের দোরে দোরে, যে সমাজে বৈষম্য ও শোষণ লাগাম-ছাড়া, সেই সমাজ থেকে কোনও জনগোষ্ঠী যদি বেড়িয়ে যেতে চায়, তবে তাদের সেই উচ্চশির স্পর্ধিত সংগ্রামকে অভিনন্দন জানানোই প্রতিটি বঞ্ছিত মানুষের একমাত্র অভিব্যক্তি হওয়া উচিৎ। কিন্তু সেই ‘উচিৎ’টাই ঘটছে না শাসকশ্রেণীর সুনিপণ মগজ ধোলাইয়ের কল্যাণে।

শক্তিমান বহু সাহিত্যিকের কলমে এমন বহু চরিত্র উঠে এসেছে যারা ‘স্যাডিস্ট’ ধ্বংসকামী, বিকারগ্রস্থ, নৈরাশ্যতাড়িত, অসুস্থ, বিচ্ছিন্নতার শিকার এক মানসিক রোগী। এদের কেউ কেউ যৌন উশৃঙ্খলার পক্ষে যুক্তি হাজির করে ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে। আর এইসব সাহিত্যিকদের সৃষ্ট ওইসব চরিত্রগুলো দু-মলাটের বাইরে দূরদর্শনের ও সিনেমার পর্দাতে হাজির হয়ে আমাদের চেতনাকে প্রভাবিত করেছে। ফলে আমরা একটা ধারণা পোষণ করতে শুরু করেছি ‘বিচ্ছিন্নতা’ একটা সামাজিক ব্যধি। আমরা ভুলে থেকেছি ব্যাধিগ্রস্থ সমাজের বিরুদ্ধে আদর্শবাদী তরুণদের স্বাভাবিক প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং সংগ্রামও ‘বিচ্ছিন্নতা’।

কোনও জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশ যখন তাদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে অথবা শোষনযুক্ত সমাজ থেকে বিযুক্ত হতে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন সেই জন-জাগরণকে সামাল দেওয়ার সাধ্য রাষ্ট্রশক্তির থাকে না।

যে আন্দোলনে শরীক হয়েছে একটি জনগোষ্ঠীর প্রায় প্রতিটি পরিবার, সেই আন্দোলনকে শেষ করতে হলে সেই জনগোষ্ঠীর প্রতিটি পরিবারকেই শেষ করতে হয়। যা সীমিত সেনা ও পুলিশের সাহায্যে সম্ভব নয়।

ওই জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে ধ্বংসের আগুনে প্রতিবাদী প্রতিটি পরিবারকে শেষ করে দিয়ে শ্মশানের স্তব্ধতা আনাও এ-যুগে সম্ভব নয়। আধুনিকতম যোগাযোগের কল্যাণে পৃথিবী অনেক ছোট হয়ে গেছে। এইভাবে একটি জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে গেলে পৃথিবীর বহু প্রান্ত থেকেই এমন নৃশংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চারে প্রতিবাদের ঝড় উঠবেই। আর তাই পৃথিবীর বহু দেশেই বিভিন্ন গোষ্ঠির জনজাগরণের কাছে পিছু হটতে হয়েছে শাসক ও শোষকশ্রেণীকে।

এই বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণে পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে আছে বহু দৃষ্টান্ত। আমাদের খুব কাছের দেশ শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও দেখতে পাচ্ছি সংগ্রামী তামিল জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে পুলিশ, সেনা এমন কি প্রতিবেশীদেশ ভারতের সেনা নামিয়ে সমস্ত রকম ভাবে দমননীতি চালিয়েও দমন করতে পারেনি তামিল জনগোষ্ঠীর সংগ্রামকে।

আমাদের দেশেও এমন উদাহরণ বিরল নয়। হাতের কাছেই দুটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত পাঞ্জাব ও কাশ্মীর, সেখানে জনসমষ্টির সিংহভাগের আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন থাকায় আন্দোলন ধ্বংস করতে গিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও সরকার এমন নিদারুণভাবে বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ ওসব জায়গায় আন্দোলন ধ্বংস করতে হলে প্রায় সমগ্র জনসমষ্টিকেই ধ্বংস করতে হয়; যা অসম্ভব। অসম ও অন্ধ্রে একইভাবে যত বেশি বেশি করে স্থানীয় মানুষরা আন্দোলনের সমর্থনে এগিয়ে আসছেন ততই এই আন্দোলন ধ্বংস করা সরকারের পক্ষে অর্থাৎ রাষ্ট্রশক্তির পক্ষে কঠিন কাজ হয়ে উঠছে।

শ্রীলঙ্কা, পাঞ্জাব, কাশ্মীর, অসম বা অন্ধ্রের আন্দোলনকে সমর্থন বা অসমর্থন করা এটা উদাহরণ টেনে আনার উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য- আন্দোলনকারীদের সামনে দৃষ্টান্ত টেনে এনে বোঝার ব্যাপারটা সহজতর করা। সঙ্গে সঙ্গে একথা মনে রাখাটাও প্রয়োজনীয়, বিচ্ছিন্নতার সুস্থ ও বলিষ্ঠ প্রকাশ শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের প্রয়াসে। যখন কোনও জনগোষ্ঠীর যুক্তিবাদী চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হবে আদর্শ-উব্দুদ্ধ শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের চেতনা, তখন রাষ্ট্রশক্তি ওই জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দেশবাসীকে ক্ষেপিয়ে তুলতে জনগোষ্ঠীর বুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী লেবেল লাগাবে। ‘বিচ্ছিন্নবাদী’ শব্দটা ‘নাস্তিক’ শব্দের মতই এমনই এক নেগেটিভ এ্যাপ্রোচ বা নেতিবাচক আবেদনে ভরা দীর্ঘ প্রচারের দৌলতে। ভাবুন তো, একটা শোষণযুক্ত সমাজ থেকে বেরিয়ে গিয়ে জনগোষ্ঠী শোষণ মুক্ত সমাজ গড়তে চাইবে, নিজেদের শাসন কায়েম করতে চাইবে, তারা তো দেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতেই বাধ্য। যে সমাজে শোষক ও শোষিতদের সহবস্থান বিরাজ করছে, সে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তবেই কোনও জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে পারে শোষনমুক্ত সমাজ। একটি শোষণমুক্ত জনগোষ্ঠি বহুকে প্রভাবিত করতে পারবে এই পরম সত্যটি মাথায় রেখেই জনগোষ্ঠীকে তাঁবেতে রাখতে সচেষ্ট বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আক্রমণকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ রাষ্ট্রশক্তি এমন ভাবে প্রচার চালাতে থাকে যে সাধারণ মানুষ দেশ বলতে, দেশের বৃহত্তম নিপীড়িত জনসাধারণ, এই সত্যটি ভুলে গিয়ে দেশকে একটা ভূখন্ড একটা ম্যাপ ভেবে ফেলে। ফলে শোষণযুক্ত সমাজব্যবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চাওয়া রক্তাক্ত শোষিত মানুষগুলোর সংগ্রামকে অভিনন্দিত করার পরিবর্তে,  নীতিগতভাবে সমর্থন জানাবার পরিবর্তে,আমরা শোষিত মানুষরাও ভুল করে অঙ্গহাণীর ব্যথা অনুভব করি। শোষক শ্রেণীর খপ্পর থেকে কিছু মানুষ যে অন্তত মুক্তি পেয়েছে, ম্যাপের ওই বিচ্ছিন্ন অংশটা কিছু কিছু মুক্তিকামী মানুষদের জয়েরই প্রতীক যা আরও অনেক নিপীরিত মানুষকে উদ্বুদ্ধ করবে, এ-কথা ভুলিয়ে রাখতেই রাষ্ট্রশক্তি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে জুড়ে দিতে সচেষ্ট একটা নেতিবাচক আবেদন।

বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে আদর্শ ও পরিষ্কার স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হয়েই গড়ে ওঠে বিপ্লবী চেতনা। পরিষ্কার স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলাই যুক্তির কাজ, যুক্তিবাদী আন্দোলনের কাজ।

যুক্তিবাদী আন্দোলন, কুসংস্কার মুক্তির আন্দোলন আপাত-নিরীহ এক আন্দোলন, যার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক অসাধারণ শক্তিশালী গণ-অভ্যুত্থানের বীজ, ঠাসা রয়েছে শোষণমুক্তির বিস্ফোরক বারুদ।
গোল পাকাতে জাতীয়তাবাদ নিয়ে গোল-গোল কথা

‘দেশপ্রেম’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দ দুটির ব্যাপক ও বহুল অপব্যাখ্যায় সাধারণ মানুষ এতোটাই প্রভাবিত যে এই শব্দ দুটিই আজ শোষক ও শাসকশ্রেণীর শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কখনো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালনের ব্যর্থতা ঢাকতে, কখনো তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কটের অনিবার্য ফল হিসেবে বঞ্ছিত, নিপীড়িত মানুষদের মধ্যে ধূমায়িত ক্ষোভে একগাদা ঠান্ডা জল ঢালতে হঠাৎই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জুজু দেখান হতে থাকে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র আমাদের সীমান্তে তৎপর হয়ে উঠেছে, আমাদের দেশে নানা নাশকতা মূলক কাজ করে বেড়াচ্ছে ওদের দেশের গেরিলা সেনারা। আর দুই প্রতিবেশী দেশের শাসক ও শোষকগোষ্ঠীর একই সমস্যা হলে তো কথাই নেই, দুই সরকার গোপন সমঝোতায় নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়ে বেতারে দূরদর্শনে দেশপ্রেমের গানের বন্যা বইয়ে দিয়ে এমন গণউন্মাদনার সৃষ্টি করে যে, ভিখারীও একদিন উপোস করে থেকে তার একদিনের ভিক্ষে করে পাওয়া অর্থ যুদ্ধখাতে তুলে দেয়, সদ্য বিবাহিতা গা থেকে খুলে দেয় গয়না। দরিদ্র মানুষগুলো আরও বেশি দারিদ্রতার পাঁকে ডুবতে ডুবতে স্বপ্ন দেখে তাদের দেশের সেনারা অন্য দেশের লোকদের কিভাবে গুলিগোলায় ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। গরীব মানুষগুলো দেশের স্বার্থে ভুলে যায় ব্যক্তিগত পাওয়া না পাওয়ার ক্ষোভ বঞ্ছনার তীব্র জ্বালা।

গরীব দেশগুলো যখন একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়ে, সীমান্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, তখন লাভ হয় কাদের? ক্ষতিই বা কাদের? লাভ বিদেশী অস্ত্র ব্যবসায়ীদের, লাভ দেশী অস্ত্র-দালালদের, লাভ শাসক ও শোষকের, বহু সঙ্কটময় মুহূর্তে মানুষের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায় বলে লোকসান পুরোটাই সাধারণ মানুষের। অনেক আন্দোলন, অনেক অবরোধ, অনেক ক্ষোভ যুদ্ধের আগুনে পুড়ে খাঁক হয়ে যায়। যুদ্ধের সময় যদি আন্দোলন চালাতে যান, শাসককুল আপনার সামনে পিছনে ‘পশ্চিমবাহিনীর’ অর্থাৎ শত্রুদের গুপ্তচর বলে ছাপ মেরে দেবে। আর জাতীয়তাবাদের গণ-উন্মাদনার জোয়ারে শোষিত মানুষই সেই কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করে নেবে, বিরোধীতা করবে আপনাদের আন্দোলনের।

‘জাতীয়বাদ’ শব্দটার বাস্তবিকই অর্থ কি? আসলে ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দের কোনও অর্থই হয় না, অর্থ হতেই পারে না। ‘জাতি’ কথার অভিধানগত অর্থ সমলক্ষণ অনুযায়ী বিভাগ। যেমন মানবজাতি, উদ্ভিদজাতি, পশুজাতি, নারীজাতি, পুরুষজাতি, আবার ধর্মের অন্তর্গত মানবসমষ্টিও জাতি। যেমন হিন্দুজাতি, মুসলমানজাতি, খৃষ্টানজাতি। আবার সামাজিক বিভাগজাত মানবসমষ্টিও জাতি। যেমন ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য, চন্ডাল। এমনিভাবে জাতি-বিভাগ নিয়ে আলোচনা প্রায় অসীম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

‘জাতীয়’ কথার অর্থ জাতি সম্বন্ধীয়। ‘বোধ’ কথার অর্থ উপলব্ধি, অনুভব।

তাহলে আমরা ‘জাতীয়তাবাদ’ কথাটির অর্থ হিসেবে পেলাম ‘জাতি সম্বন্ধীয় উপলব্ধি’। কিন্তু কোন জাতি সম্বন্ধীয় উপলব্ধি? মযে কোনও জাতি সম্বন্ধীয় উপলব্ধিই হতে পারে।

শাসকশ্রেনী ও রাজনীতিকরা অথবা তাদের স্নেহধন্য কলমচীরা ‘জাতীয়তাবাদী’ বলতে ভারতবর্ষের প্রতি ভালবাসা বলে ব্যাখ্যা চাপাতে চেয়েছেন। ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ ও ‘বিশ্বহিন্দু পরিষদ’ ‘জাতীয়তাবাদী’ শব্দটিকে ব্যবহার করে হিন্দুজাতীয়তাবোধ জাগ্রত করতে চাইছে, হিন্দু জাতীয়তাবোধের গণউন্মাদনা সৃষ্টি করতে চাইছে। এই বিষয়ে ওরা যে বিশাল সাফল্য পেয়েছে, সাম্প্রতিক সংসদীয় নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির সাফল্য তারই প্রমাণ। ‘আমরা বাঙ্গালী’ আবার ‘জাতীয়তাবাদী’ শব্দটিকে প্রয়োগ করে বাঙ্গালীদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সুড়সুড়ি দিয়ে বাঙ্গালীত্ব জাগাবার চেষ্টা করছে।

শাসনশ্রেণী জাতীয়তাবাদের ধ্যানধারনা সাধারণের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে ধনীজাতীয় মানুষ ও গরীবজাতীয় মানুষদের সহবস্থানের কথা বোঝায়।

ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে প্রত্যেককে দেশের জন্য, জাতির জন্য একতাবদ্ধ হওয়ার পক্ষে হাওয়া তোলে। এমন ব্যাপক প্রচারে নিপীড়িত দরিদ্র মানুষগুলো তাদের শোষকদের চিনতে ভুলে যায়, তাদের শত্রু চিনতে ভুলে যায়। ভুলে যায় তাদের কারো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে শোষণ করছে, গিলে খাওয়ার চেষ্টা করছে।

‘জাতীয়তাবোধ’ বলতে যদি মানবজাতি সম্বন্ধীয় উপলব্ধিকে আমরা বুঝি, এবং ‘জাতীয়তাবাদ’ বলতে যদি মানবজাতি সম্বন্ধীয় মতবাদকে বুঝি তাহলেও সেই একই সমস্যা থেকেই যায়। এই জাতীয় কোনও মতবাদ দ্বারা সম্পূর্ণ মানবজাতীর মঙ্গল অসম্ভব। মানবজাতির মধ্যেকার শোষকশ্রেণীর মঙ্গল মানেই শোষিত শ্রেণীর অমঙ্গল। আর শোষিত শ্রেণীর মঙ্গল মানেই শোষকশ্রেণীর অমঙ্গল। দুই শ্রেণীর মঙ্গল যেহেতু একই সঙ্গে সম্ভব নয়, তাই দুই শ্রেণীর সহবস্থান মানবজাতির মঙ্গলচিন্তাও অতি অবান্তর। শোষিত শ্রেণীর মাথার থেকে শোষিত শ্রেণীর চেতনা দূর করতেই এই ধরনের জগাখিচুড়ির মতবাদ গেলানোর নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রশক্তি।

 

ধর্ম-নিরপেক্ষতা নিয়ে যে ভুল ধারণা চাপানর চেষ্টা চলছে নিরন্তর

সম্প্রতি ধর্ম-নিরপেক্ষতা নিয়ে দেশজুড়ে অনেক হৈচৈ হচ্ছে। প্রচুর আলোচনা, প্রচুর লেখালেখি হচ্ছে। শহরে হোডিং পড়েছে, পোস্টার পড়েছে। এই হোডিং পোস্টারে শহর কলকাতাও ঝলমল করছে। এইসব আলোচনা, লেখালেখি ও হোডিং-পোস্টার পড়ে সাধারণ মানুষ ধর্ম-নিরপেক্ষতা শব্দের সঙ্গে দারুণভাবে পরিচিত হয়েছে। জেনেছে ;ধর্ম-নিরপেক্ষতা’ কথার অর্থ ‘সব ধর্মের সমান অধিকার।‘

বিপুল সরকারী অর্থব্যয়ে ধর্ম-নিরপেক্ষতা শব্দের এই যে ব্যাখ্যা সর্বত্র হাজির করা হচ্ছে এবং এরই সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে আমাদের দেশের মন্ত্রী, আমলা ও রাজনীতিকরা মন্দিরে মন্দিরে পূজো দিয়ে বেড়াচ্ছেন, গুরুদোয়ারায় নতজানু হচ্ছেন, গীর্জায় শ্রদ্ধা জানিয়ে আসছেন, দেওয়ালি, ঈদ, বড়দিন ইত্যাদিতে রাষ্ট্রনায়করা বেতার দূরদর্শন মারফৎ শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে অর্থ সাহায্য দিলে আয়কর থেকে রেহাইয়ের ব্যবস্থাও করে দিচ্ছেন।

সাধারণের ভাল লাগছে- ‘সব ধর্মের সমান অধিকার’ মেনে নিয়ে মন্ত্রী, আমলা, রাজনীতিকদের সমস্ত ধর্মের কাছে নতজানু হতে দেখে। উদার হৃদয়ের মানুষ হিসেবে নিজেদের ভাবতে ভাল লাগছে জনসাধারণের- হু হু বাবা, আমাদের দেশ ধর্মনিরপেক্ষ, এখানে সব ধর্মই সমান অধিকার ও শ্রদ্ধা পায় মন্ত্রীর আমলার। মন্ত্রীরা এরই মাঝে বুঝিয়ে দেন, সমস্ত ধর্মের সমান অধিকার বজায় রাখতে, দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার মশাল জ্বালিয়ে রাখতে রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা রাখতে হবে।

‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটিকে নিয়ে কি নিদারুণভাবে অপব্যাখ্যা করে সাধারণ মানুষের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে, ভাবা যায় না?

‘নিরপেক্ষ’ শব্দের অর্থ কোনও পক্ষে নয়। ‘ধর্ম-নিরপেক্ষ’
শব্দের অর্থ, কোনও ধর্মের পক্ষে নয়। অর্থাৎ সমস্ত ধর্মের
সঙ্গে সম্পর্কজনিত। ‘Secularism’ শব্দের অভিধানিক
অর্থ- একটি মতবাদ, যা মনে করে, রাষ্ট্রনীতি, শিক্ষা
প্রভৃতি ধর্মীয় শাসন থেকে মুক্ত থাকা উচিৎ।

একি! এদেশে ধর্ম-নিরপেক্ষতার নামে আমরা কি দেখছি? সেকুলার রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও এদেশে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয়। কোনও প্রকল্পের উদ্বোধন বা শিলাবিন্যাস হয় মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে প্রদীপ জ্বালিয়ে, পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে, নারকোল ফাটিয়ে।

সেকুলার রাষ্ট্রে ধর্ম কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচরণের ব্যাপার হতে পারে। রাষ্ট্রীয় জীবনে বা রাষ্ট্রীয় নীতিতে এই ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস যেন প্রকাশ্যেনা এসে পড়ে, এ-বিষয়ে অতি সতর্ক থাকা সেকুলার বা ধর্ম-নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের কর্তব্য। কিন্তু ভারতবর্ষে মন্ত্রী, রাজনীতিক ও আমলারা প্রকাশ্যেই বিশেষ রাষ্ট্রের কর্তব্য। কিন্তু ভারতবর্ষে মন্ত্রী, রাজনীতিক ও আমলারা প্রকাশ্যেই বিশেষ সম্প্রদায়ের ধর্মাচার পালন করেন। প্রয়োজনে এইসব রাজনীতিকরা সব ধর্মকেই সমান প্রশ্রয় দেয়। ফলে এইসব রাজনীতিকরাই যখন ধর্ম-নিরপেক্ষকতার বড় বড় বুলি কপচায় ও রাজনীতি থেকে ধর্মকে পৃথক করার কথা বলে তখন এদের দ্বিচারী ধান্দাবাজ চরিত্রই প্রকাশ পায়।

 

গণতন্ত্র যেখানে বর্বর রসিকতা

আমাদের দেশ বৃহত্তম ‘গণতান্ত্রিক’ দেশ। এ দেশে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার। সংবিধান সেই অধিকার রক্ষায় সদা সতর্ক। এখানে লৌহযবনিকার অন্তরালে মানুষের কন্ঠ রুদ্ধ করা হয় না। এ-দেশের মানুষ খাঁচার পাখি নয়, বনের পাখির মতই মুক্ত। এদেশে সর্বোচ্চ পদাধিকারী রাষ্ট্রপতির আর ওড়িষ্যার কালাহান্ডির মানুষগুলো একি অধিকার ভোগ করে, চুলচেরা সমান অধিকার।

এই ধরনের প্রতিটি কথাকে বর্বর রসিকতা বলেই মনে হয় যখন দেখি, কালাহান্ডির মানুষগুলো দিনের পর দিন ক্ষুধার আগুনে জ্বলতে জ্বলতে প্রতিবাদহীনভাবে মৃত্যুকে মেনে নিল, আর তারই সঙ্গে মৃত্যু ঘটল একটি গণতান্ত্রিক দেশের মানুষদের বেঁচে থাকার অধিকারের এ-সব আপনজন হারা বহু মানুষের হৃদয়কে দুমড়ে-মুচড়ে রক্তাক্ত করে। এই রক্তাক্ত হৃদয়গুলোই দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে, যখন দেখে শোষকশ্রেণীর কৃপায় গদীতে বসা কতকগুলো রাজনীতিক ওই একই সময় রাষ্ট্রপতির গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করতে করতে ভারতবর্ষকে ‘সুমহান গণতন্ত্রের দেশ’ ‘সর্ব বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ’ ইত্যাদি বলে কদর্য বর্বর রসিকতা করছে।

প্রতিটি গণতান্ত্রিক অধিকারই বিড়লা, আম্বানিদের সঙ্গে
সঙ্গে দেওয়া হয়েছে রাস্তার ভিখারীটিকে পর্যন্ত। পার্থক্য
শুধু রাষ্ট্রশক্তির অকরুণ সহযোগিতায় বিড়লা, আম্বানিদের
অধিকারের হাত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। ওদের নিয়ে
ব্যস্ত থাকতে গিয়ে ভিখারীর অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা
করতেই শুধু ভুলে গেছে রাষ্ট্রশক্তি- এই যা।

১৬ সেপ্টেম্বর ৯১ আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম গোষ্ঠীয় প্রকাশিত একটা খবরের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। খবরটাকে ছোট্ট করে নিলে দাঁড়ায় এই- পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের এক বড় কর্তার বাগান আছে ঝাড়গ্রামের জিতুশোল মৌজায়। সেই বাগান থেকে তিনটি আমগাছের চারা চুরি যাওয়ায় রাজ্য পুলিশবাহিনী তান্ডব চালিয়েছে ওই অঞ্চলে। পুলিশের নৃশংস অত্যাচারে জিতুশোল মৌজার তিনশো গ্রামবাসী জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছেন। একটিও বয়স্ক পুরুষ নেই গ্রামে। তবু গ্রামবাসীদের ওপর চলেছে পুলিশের ভীতিপ্রদর্শন। অনেককেই থানা-লকআপে আটক রেখে দিনের পর দিন পেটান হচ্ছে। আর পুলিশের বড়কর্তার বাগান পাহারা দিতে রাজ্যের জনগণের টাকায় পালিত পুলিশ একটি স্থায়ী চৌকি বসিয়েছে।

একবার উত্তেজিত মাথাকে ঠান্ডা করে ভাবুন তো- একটি গরীব লোকের বাগান থেকে তিনটে আমগাছের চারা চুরি গেলে থানায় রিপোর্ট লেখাতে গেলে পুলিশ তার সঙ্গে কি ব্যবহার করবে? আমচারা চোর ধরে দেবার বেয়াদপী আবদার শুনে থানার মেজবাবু হয় বেজায় রসিকতা ভেবে অট্টহাঁসিতে ফেটে পড়বেন, ,নতুবা বেয়াদপটাকে এক দাবড়ানীতে থানা-ছুট করতে বাধ্য করবেন।

কিন্তু রাজ্য-পুলিশের বড়কর্তার বাগান থেকে মাত্র তিনটি আমচারা চুরি যেতেই গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় অতন্দ্র-প্রহরী পুলিশবাহিনী পাগলা-কুকুরের মতই ঝাঁপিয়ে পড়লো জিতুশোলের মানুষগুলোর ওপর। পুলিশী অত্যাচারে তিনশো মানুষ জঙ্গলের রাজত্ব থেকে বাঁচতে জঙ্গলে আশ্রয় নিল। ধরে নিলাম, ওই গ্রামবাসীদের মধ্যেই রয়েছে এক, দুই বা তিনজন আমচারা চোর। ধরে নিলাম, পুলিশ তাদের ধরেো ফেলল। ফেলুক, খুব ভাল কথা। তারপর পুলিশের কর্তব্য চোরটিকে বা চোরদের বিচার বিভাগের হাতে তুলে দেওয়া। অপরাধ প্রমাণে শাস্তি যা দেবার তা দেবে বিচার বিভাগ। ওই বিচারাধীন চোর বা চোরদের পেটাই করার কোনও অধিকার আমাদের দেশের গণতন্ত্রে তো পুলিশদের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি।

জিতুশোল মৌজার এক দুই বা তিনজন সম্ভাব্য অপরাধীর ওপর পুলিশী অত্যাচার নেমে আসেনি, পুলিশবাহিনী বর্বর গুন্ডামী চালিয়েছিল তামাম গ্রামবাসীদের ওপর। গ্রামবাসীদের একটিই অপরাধ বড় কর্তার বাগান এলাকায় তাদের বাস।

আইন ভাঙ্গা অপরাধ। আইনের রক্ষকদের আইন ভাঙ্গা আরও বড় অপরাধ। পুলিশের ইউনিফর্ম পরা ওইসব বর্বর গুন্ডাদের বিরুদ্ধে আইন আদৌ কঠিন হতে পারবে? তা যদি না পারে তবে অত্যাচারিত মানুষগুলো, যুক্তিবাদী মানুষগুলো, অনপুংশক মানুষগুলো কি করে বিশ্বাস করবে- আমাদের দেশের গণতন্ত্রে রাজ্য-পুলিশের বড়কর্তারও একজন দরিদ্র গ্রামবাসীর সমান গণতান্ত্রিক অধিকার?

পুলিশের সামান্য বড়কর্তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের অধিকারের পার্থক্য যদি এমন আসমান-জমিন হয়, তবে মন্ত্রী-টন্ত্রীদের সঙ্গে এবং মন্ত্রী বানাবার মালিক অর্থকুবেরদের সঙ্গে গরীব মানুষগুলোর গণতান্ত্রিক অধিকারের পার্থক্য যে সীমাহীন হবে, এই তো প্রকৃত সত্য।

এ-দেশে অনেক বিত্তাবানেরাই, অনেক জোতদারেরাই নিজস্ব গণতন্ত্রের হাতকে আরও বেশি দীর্ঘ করতে বাহিনী পোষে। এইসব বাহিনী বা সেনাবাহিনীর নামও নানা বিচিত্র সংগঠিত হিংস্র সেনাভিনী। সেইসব বাহিনীর হাতে নিত্যই নিপীড়িত, খেটে খাওয়া মানুষদের গণতান্ত্রিক অধিকার লাঞ্ছিত হচ্ছে। সামান্য ইচ্ছায় এরা গ্রামকে গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়, লুটে নেয় মহিলাদের লজ্জা। আর নির্লজ্জের মত সরকার দেখেও অন্ধ হয়ে থাকে। এই উগ্রপন্থী নরখাদকদের কঠোর হাতে দমন করতে কখনোই তো এগিয়ে আসে না সরকার? কোন গণতান্ত্রিক অধিকারে এই সব সেনাবাহিনী পুষে চলেছে হুজুরের দল? নিপীড়িত মানুষদের দাবিকে দাবিয়ে রাখতে ওদের সেনাবাহিনী পোষা যদি গণতান্ত্রিক ও উগ্রপন্থা না হয়, তবে অত্যাচারিত মানুষদের অধিকার রক্ষার জন্য সেনা গঠন অগণতান্ত্রিক ও উগ্রপন্থা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।

আমাদের দেশের গণতন্ত্র-বীরভোগ্যা’র গণতন্ত্র। যার যত বেশি ক্ষমতা, যত বেশি অর্থ, যত বেশি শক্তি, তার তত বেশি বেশি গণতন্ত্র। শোষকদের অর্থে গদীতে আসীন হয়ে শোষক ও শোষিতদের সমান গণতান্ত্রিক অধিকার বিলান যায় না। শাসক ও শোষকরা শুধু এই অধিকারের সীমা ভঙ্গই করে পরম অবহেলে; আর শোষিতদের অধিকার বার বার লাঞ্ছিত হয়, লুন্ঠিত হয়- এ অতি নির্মম সত্য। আপনার দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন; তাহলেই দিনের আলোর মতন পরিষ্কার হয়ে যাবে ‘গণতন্ত্র’ আছে দেশের সংবিধানে ও বইয়ের পাতায়, গরীবদের জীবনে নয়।

যে দেশের মানুষের দু’বেলা পেট ভরে খাওয়ার অধিকার
নেই, বেঁচে থাকার অধিকার নেই, চিকিৎসার সুযোগ সুবিধে
গ্রহণের অধিকার নেই, শিক্ষালাভের সুযোগ সুবিধে গ্রহণের
অধিকার নেই সেখানে বিড়লা, আম্বানি, রাষ্ট্রপতি,
প্রধানমন্ত্রী আর গরীব মানুষগুলোর সমান গণতান্ত্রিক
অধিকারের কথা যারা বলে তারা শয়তানেরই দোসর- এটুকু
নির্ধিদায় বলা যায়।

গণতন্ত্রে মানে কি শুধুই ভোট দেওয়ার অধিকার? সেটাই বা ক’জনের আছে? ছাপ্পা ভোট, বুথ দখল, চতুর রিগিং সেই অধিকারে তো অনেক দিনই থাবা বসিয়েছে।

তারপরও যদি ভোট দেওয়ার অধিকারের প্রসঙ্গ টেনে কেউ বলেন এই দেশের মানুষই কখনো ইন্দিরাকে তুলেছেন, কখনো নামিয়েছেন, কখনো রাজীবকে সিংহাসনে বসিয়েছেন, কখনো বা ছুঁড়ে দেলেছেন, কখনো এনেছেন ভি.পি.-কে, কখনো বা পি.ভি-কে; তাঁদের আবারও মনে করিয়ে দেব পরম সত্যটি, অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে বলব কথাটি- মন্ত্রী যায় মন্ত্রী আসে এদের বহু অমিলের মধ্যে একটাই শুধু মিল- এঁরা প্রত্যেকেই শোষকশ্রেণীর কৃপাধন্য, পরম সেবক। এরা শোষকদের শোষণ বজায় রাখার ব্যবস্থা করে দেবার বিনিময়ে আখের গোছান।

আর একটি ঘটনার দিকে আপনার দৃষ্টিকে একটু ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।

১৪ আগস্ট ৯১ আনন্দবাজারে তিনটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, যাদের শুরু একই রকম হলেও পরিণতি ভিন্নতর। সংবাদ একঃ সৌদি আরবের এক বৃদ্ধ এক নাবালিকাকে বিয়ে করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে। আদালত ওই বিচারাধীন আসামীকে পনের দিন পুলিশ হাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। সংবাদ দুইঃ ওড়িশার জনতা দলের বিধায়ক তথাগত শতপথী একটি নাবালিকাকে ফুসলিয়ে ভুবনেশ্বর থেকে পুরী নিয়ে যান এবং নাবালিকা অপহরণের অভিযোগে পুলিশ তথাগতকে গ্রেপ্তার করে। ওড়িশার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী জনতা দলের শ্রীবিজু পট্টনায়কের হস্তক্ষেপে তাঁর দলের বিধায়ক তথাগতর উপর থেকে সমস্ত অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়। তথাগত অবশ্য গর্বের সঙ্গে স্বীকার করেছেন এমন মেয়ে ফুসলান তাঁর জীবনে এই প্রথম নয়। সংবাদ তিনঃ ত্রিপুরার মন্ত্রী জহর সাহা স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও এক অবিবাহিত মহিলার সঙ্গে অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকার সময় মহিলাটির পাড়ার লোকেদের হাতে ধরা পড়েন। জহর সাহাকে মন্ত্রীসভা থেকে বরখাস্ত করলেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী সুধীররঞ্জন মজুমদার। জহর ঘোষণা করলেন, তাঁকে মন্ত্রীসভায় ফিরিয়ে না নিলে মুখ্যমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রীদের দুর্নীতি সম্পর্কিত প্রামাণ্য দলিল তুলে দেবেন সংবাদপত্রের হাতে। শঙ্কিত ও জহর ভয়ে কম্পিত মুখ্যমন্ত্রী ওই দিনের সংবাদে জহর সাহাকে ‘ধোয়া তুলসী পাতা’ বলে ঘোষণা করে ইঙ্গিত দিয়েছেন জহরকে মন্ত্রীসভায় ফিরিয়ে নেবেন।

আরবের শেখ, তথাগত শতপথী ও জহর সাহার খবর পড়ে যদি ভারতের কোনও ভবিষ্যৎ নাগরিক তার শিক্ষককে প্রশ্ন করে বসে- ভারতবর্ষ কেমন গণতন্ত্রের দেশ, দুর্নীতিপরায়ণ লম্পটরা রাজনীতিক হওয়ার সুবাদে আইনকে লাথি কসিয়ে ফুটবল খেলে আর খুঁটির অভাবে তারচেয়ে লঘু অপরাধে জেলে পচে বুড়ো শেখ? কি জবাব দেবেন শিক্ষক? সত্যি কথাটুকু বলতে গেলে যে দরাজ বুকের পাটা প্রয়োজন তা এই চাটুকার ধান্দাবাজ ও ক্লীবে ছেয়ে ফেলা দেশে কতজনের আছে? শিক্ষকরা আজ যদি সত্যির থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকে, ছাত্ররা যারা দেশের ভবিষ্যৎ- তারা কি শিখবে?

জানি- দুর্নীতি যেখানে অসীম, দলবাজী যেখানে চূড়ান্ত, অন্যায়ের সঙ্গে আপোস যেখানে বেঁচে থাকার শর্ত- সে দেশে সত্যি বলাটা, সত্যি শেখানোটা চূড়ান্ত অপরাধ, ‘উগ্রপন্থী’ ‘দেশদ্রোহী’ বলে দেগে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। তবু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে দায়িত্ব, নতুন প্রজন্মের মানুষ্য গড়ার দায়িত্ব।

জনসেবা নিয়ে স্বচ্ছতা থাকা অতি প্রয়োজনীয়

গত কয়েক বছরে যুক্তিবাদী আন্দোলন সাধারণ মানুষের ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর অংশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষকে কুযুক্তির গারদ ভেংগতে স্বচ্ছ চিন্তার জগতে নিয়ে আসতে যুক্তিবাদী আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে এগিয়ে এসেছে বহু বিজ্ঞান ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, নাট্য গোষ্ঠী, লিটিল ম্যাগাজিন প্রমুখ গণসংগঠন। কাজ-কর্মে এরা অনেকেই খুবই আন্তরিক। কুসংস্কার মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে এদের অনেকেই আরও নানা ধরনের সমাজ কল্যাণমূলক, সমাজসংস্কারমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত। সাক্ষরতা অভিযান, বুজদান, চক্ষুদান, মরণোত্তর দেহদান, কৃষিজমি পরীক্ষা, হাসপাতালে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসার সুব্যবস্থার দাবী তোলা, জলা বাঁচাও, বৃক্ষরোপণ, বিনামূল্যে চিকিৎসাকেন্দ্র, ফ্রি কোচিং সেন্টার, ফ্রি রিডিংরুম এমনই আরও বহুতর সেবামূলক কাজের মধ্য দিয়ে অনেক মানুষের ভালোবাসা ও শুভেচ্ছাও এইসব সংস্থার পাথেয় হয়েছে। ফলে এরা সার্থক গণসংগঠন হয়ে উঠেছে।

জনকল্যাণমূলক কাজেব মধ্য দিয়ে জনচিত্ত জয় করার পদ্ধতিটি আরো সফল ভাবে কাজে লাগিয়েছেন বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। মাদার টেরিজা, রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম সংঘ, মোআমার- অল- আলক – আল-ইসলামী প্রমুখ বহু ধর্মী প্রতিষ্ঠান নানা ধরনের জনকল্যানমূলক কাজের সঙ্গে নিজেদের জড়িত রেখেছে। হাসপাতাল, অনাথ আশ্রম, বন্যায় বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তদের সেবা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মশালা এমনি নানা ধরনের জনকল্যানমূলক কাজকর্মের প্রলেপে সাধারণেব মন জয় কবে তাদের আবেগ সিক্ত, কৃতার্থ হৃদয়ে রহস্যবাদ, দুর্জ্যেয়বাদ, ধর্মীয় কুসংস্কার, অদৃষ্টবাদ, কর্মফল ও রকমারি ভাববাদী চিন্তাও ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আবেগ সিক্ত, ঋণী, কৃতার্থ মগজ তাৎক্ষণিক লাভ-ক্ষতির অঙ্ক কষে এদের নিপীড়িত মানুষদের বন্ধু হিসেবেই ধরে নিচ্ছে। নিপীড়িত, শোষিত মানুষগুলো এইসব প্রতিষ্ঠানকর্মীদের সেবাব সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করছেন এইসব ভালো-লাগা মানুষগুলোর চিন্তাও।

ভাববাদী শিবিবের এই ধবনের মগজ ধোলাই কৌশল থেকে শিক্ষা নিয়ে যুক্তিবাদী আন্দোলনের কর্মীদেরও প্রয়োজনে জনচিত্ত জয়ের জন্য নানা জনকল্যানমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত হতে হবে পাল্টা মগজ ধোলাই করতে। যাঁরা যুক্তিবাদী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সাধারণ মানুষের চেতনা মুক্তি এবং সেই পথ ধরে সার্বিক শোষণ মুক্তিব স্বপ্ন দেখছেন তাদের কিন্তু একটা বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে—উপলক্ষ্য যেন লক্ষ্যকে ছাড়িয়ে না যায়। কুসংস্কার মুক্তির লক্ষ্যে পৌঁছতে জনকল্যানমূলক কাজকর্ম যে শুধু মাত্র উপলক্ষ্যই হতে পারে, এই বিষয়ে অতি সচেতনতার প্রয়োজন। স্পষ্টতই মনে রাখতে হবে পরম সত্যটি–সেবায় আর যাই করা যাক, সমাজ ব্যবস্থা পাল্টান যায় না, শোষণমুক্তি ঘটতে পারে না। শোষণমুক্তি ঘটতে পাবে শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের সমাজ সচেতনতা বোধ থেকে। সাধারণ মানুষের বৃহত্তর অংশ যেদিন বুঝতে শিখবে তাদের বঞ্চনার কারণ অদৃষ্ট নির্ধারিত নয়, পূর্বজন্মের কর্মফল নয়, ঈশ্বরজাতীয় কোনও কিছুর অভিশাপ নয়, বঞ্চনার কারণ শোষকশ্রেণী, সে-দিন তাদের নিজেদের স্বার্থেই, বাঁচার তাগিদেই বঞ্চনামুক্তির জন্য পাথর না পরে, পুজো না দিয়ে আঘাত হানবে শোষকশ্রেণীর দুর্গে।

কিন্তু এই আঘাত হানার প্রসঙ্গে তখনই আসবে যখন শোষিতশ্রেণীর ঘুম ভাঙ্গবে, তারা বঞ্চনার কারণগুলো বুঝতে পারবে। গরীবদের ক্ষোভকে ভুলিয়ে রাখার জন্যই ধনীব অর্থে চলছে ‘দরিদ্র-নারায়ণ সেবা’। দরিদ্র নারায়ণের সেবা যাদের চিরন্তন লক্ষ্য, তাদেব সেবা বিলোবার জন্য দরিদ্র-নারায়ণের সরবরাহও যে চিরন্তন হওয়া প্রয়োজন-এই সত্যটুকু আমাদের ভুললে চলবে না। এই সেবামূলক কাজে তাৎক্ষনিক লাভ গরীবদের হলেও ভবিষ্যতের জন্য পড়ে রইল অনন্ত বর্ণনাময় জীবন।

জনসেবামূলক কাজের সঙ্গে শোষণমুক্তির সংগ্রামের সম্পর্কটা বুঝতে হবে। বুঝতে হবে, যুক্তিবাদী আন্দোলনের, শোষণমুক্তির সংগ্রামের সম্পর্কটা। যাঁরা বুঝতে চাইবেন না, বুঝতে পারবেন না, তাঁরা যুক্তিবাদী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন না। কিছুতেই পারা সম্ভব নয়। এইভাবে যুক্তিবাদী আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর অংশে নিশ্চয়ই ছড়িয়ে যেতে দেবে না রাষ্ট্রশক্তি । কাৰণ রাষ্ট্রশক্তি সাধারণ মানুষের চেতনাকে ততদূর পর্যন্তই এগিয়ে নিয়ে যেতে দেবে, যতদূর পর্যন্ত এগোলে তাদের কোনও বিপদের সম্ভাবনা নেই। যখনই বিপদের গন্ধ পাবে, তখনই নানাভাবে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করবে। কখনও সংস্থাকে আর্থিক সাহায্যে মুড়িয়ে দিয়ে লেজুড় করতে চাইবে, কখনও সংস্থা দখল করতে চাইবে নিজের পেটোয়া দালালদের নিয়ে, কখনও ব্যক্তিগতভাবে নেতাদের পাওয়া দেওয়ার রাজনৈতিক চালেই কিনে নিয়ে সংস্থাকে পকেটে পুরতে চাইবে, কখনও সংস্থাকে জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে লাগাতারভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে, কখনও সংস্থার সুনাম জনমানসে মলিন করতে সংস্থা-প্রধানের চরিত্র হননের চেষ্টা করা হবে, কখনও বা সংস্থাগুলোকে উৎসাহিত করা হবে সমাজসংস্কারমূলক, জনসেবামূলক কাজকর্মের সঙ্গে জড়িত হওয়ার জন্য । শেষ পদ্ধতিটি আপাত নিরীহ হলেও মগজ ধোলাইয়ের পক্ষে শাসকশ্রেণীর পক্ষে খুবই কার্যকর অস্ত্র। সেবামূলক বা সমাজসংস্কারমূলক কাজকর্ম যেমন বৃক্ষরোপণ, পরিবেশ দূষণ, রক্তদান, মরণোত্তর দেহদান, চক্ষুদান, সাক্ষরতা অভিযান ইত্যাদির পক্ষে দীর্ঘমেয়াদী ব্যাপক প্রচার চালান। যে সব ব্যক্তি ও সংস্থা এ-সব কাজে এগিয়ে আসে বার বার তাদের মুখ ভেসে ওঠে দূরদর্শনে, গলা ভেসে ওঠে বেতারে। এগিয়ে আনা হয় আরো সব প্রচার মাধ্যমকে। মন্ত্রীরা বার বার হাজি হতে থাকেন এইসব সংস্থার অনুষ্ঠানগুলোতে। মন্ত্রীর সহচার্য, বেতার দূরদর্শনে প্রচার, সব মিলিয়ে একটা ক্রেজ। একটু একটু করে আরো বেশি বেশি সংস্থা সমাজসেবা, সমাজসংস্কারের কাজে এগিয়ে আসতে থাকেন। অনেকেই আরও বেশি বেশি করে অনুভব করতে থাকেন এই ধরনের কাজ কর্মে এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা ।

আসুন আমরা ফিরে যাই ‘ইয়ং বেঙ্গল’দের সময়ে। ইয়ং বেঙ্গলরা প্রচুর ঝুঁকি নিয়ে ভয়ংকর সব স্পর্শকাতর বিষয়ের বিরুদ্ধে সমাজসংস্কারে ঝুঁকেছিলেন। সতীদাহ, বিধবাবিবাহ, বাল্য বিবাহ, জাত-পাত ইত্যাদির বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। গরুর মাংস প্রকাশ্যে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু এর কোনোটাই যে সমাজ-অগ্রগতির সূচক নয় তার জ্বলন্ত উদাহরণ ভারতের মুসলমানরা। মুসলমান সমাজে সতীদাহ প্রথা চিরাকলই অনুপস্থিত, বিধবা বিবাহ প্রচলিত, কনের পূর্ণ সম্মাতিতে বিয়ে হতে হয় বলে একটা চুক্তি সম্পাদনের ব্যাপার রয়েছে, অপ্রাপ্তবয়স্কার বিয়ে ইসলামী মতে হতে পারে না, অর্থাৎ মুসলমান সমাজে বাল্যবিবাহ হতে পাবে না। কিন্তু ভারতবর্ষের মুসলমান সমাজে অপ্রাপ্তবয়স্কার বিয়ে হয়, এবং এটা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র হিন্দু প্রতিবেশীদের প্রভাবে। মুসলমানরা গরুর মাংসই গ্রহণ করে। অর্থাৎ, যে কয়টি বিষয় ঘিরে গত শতকে বাংলার রেনেসাঁ যুগে সমাজসংস্কারের আন্দোলন গড়ার চেষ্টা হয়েছিল তার প্রায় সব কটি সংস্কারেরই ঊর্ধ্বে ছিল বাংলার মুসলিম সমাজ। কিন্তু তাতে বাংলাব মুসলমান সমাজের শোষণমুক্তি ঘটেছিল কী? না, ঘটেনি। বাংলার মুসলমানদের সংখ্যাগুরু অংশই ছিলেন হিন্দু সংখ্যাগুরু অংশের চেয়েও তুলনামূলকভাবে বেশি শোষিত।

সমাজসংস্কার ও সমাজসেবার মাধ্যমে সমাজের শোষণ মুক্তি ঘটেছে—এমন একটি দৃষ্টান্তও আজ পর্যন্ত কোনও ঐতিহাসিকের জ্ঞানের ভাণ্ডারে নেই। হাজারটা রামকৃষ্ণ মিশন, হাজারটা ভারত সেবাশ্রম সংঘ, হাজার মাদার টেরিজা ভারতের শোষিত জনতার শোষণমুক্তি ঘটাতে পারবে না ।

এই কথাটাও স্পষ্ট করে বলি-সমাজসেবা নিশ্চয়ই ভালো, কিন্তু সমাজ সেবার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে সাধারণ মানুষের চিন্তায় চেতনায় রহস্যবাদ, অদৃষ্টবাদ, কর্মফল, জন্মান্তরবাদ, ধর্মীয় কুসংস্কার ইত্যাদি ঢুকিয়ে দিচ্ছে, তাকে রুখতে আমরাও কী পারছি, সমাজ সেবার মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের চেতনায় স্বচ্ছতা আনতে? যদি পারি, তবেই আমাদের স্বার্থকতা, নতুবা আমরা সমাজসেবার আবর্তে শাসক ও শোষকশ্রেণীর সুতোর নাড়াতে পুতুল নাচই নেচে যাব।

যুক্তিবাদের আগ্রাসন প্রতিরোধে কাগুজে যুক্তিবাদীর সৃষ্টি

বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সাধারণ মানুষের মধ্যে যুক্তিবাদী চিন্তাধারার প্রসার প্রতিরোধের চেষ্টা ধনীকশ্রেণী ও তাদের অর্থে গদীতে বসা সরকার কবে চলেছে এবং করে চলবে। এই প্রতিরোধ একই ভাবে করা হবে না । প্রতিরোধ কখনও হবে অহিংস ভাবে, কখনও সহিংস ভাবে। অহিংস প্রতিবোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা মগজ ধোলাইয়ের। কখনও মগজ ধোলাই করা হবে শোষিত মানুষদেব, কখনও মগজ ধোলাই করা হবে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কর্মীদের।

মগজ ধোলাই করতে শাসকশ্রেণী স্বভাবতই নির্ভর করে উন্নততর মগজদের বুদ্ধিজীবীদেব। নানাভাবে পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতির মধ্যে দিয়ে বুদ্ধিজীবীদের গ্রাস করে ফেলে রাষ্ট্রশক্তি ও ধনীকশ্রেণী। এই পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি কত রকমভাবেই হয়ে থাকে। কেউ সরকারি জমি চাইতেই পেয়ে গিয়ে কৃতার্থ হয়ে পড়েন। কেউ পান সরকারি ফ্ল্যাট। কেউ পদ। সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে কারু বা মেরুদণ্ড কাদার মতই নরম হয়ে যায়। কেউ বা বিশাল পত্রিকা-গোষ্ঠির মালিকের ‘পেপার পলিসি’ সার্থক করে তোলার বিনিময়ে গাড়ি, ফ্ল্যাট, মাঝে-মধ্যে বিদেশ ভ্রমণের মধ্যে স্টাটাই বজায় রাখেন। কেউবা পত্রিকা মালিক গোষ্ঠি বা সরকারের দেওয়া পুরস্কারের কাছে বাঁধা রাখেন নিজের বিবেক। কেউ দূরদর্শনে সিরিয়াল পাশ করাতে রাজনীতিকদের কাছে বিক্রী করেছেন আদর্শ। এমনি কতভাবেই বুদ্ধিজীবীদের বিবেক পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলছে শাসক ও শোষকশ্রেণী ।

যুক্তিবাদী চিন্তার প্রসারকে অহিংসভাবে প্রতিরোধ করতে, সাধারণ মানুষের ও যুক্তিবাদী আন্দোলন কর্মীদের, সাংস্কৃতিক আন্দোলন কর্মীদের মগজ ধোলাই করতে শাসকশ্রেণী কাজে লাগায় তাদের নিজস্ব প্রচার মাধ্যমগুলোকে এবং ধনীকশ্রেণীর স্বার্থরক্ষাকারী পত্র-পত্রিকাগুলোকে। এই প্রচার মাধ্যমগুলোর প্রধান চালিকাশক্তি ধনীকশ্রেণীর ও রাষ্ট্রশক্তির পেটোয়া বুদ্ধিজীবীরা। এইসব শক্তিমান লেখক, নাট্যকার, চলচ্চিত্রকার প্রমুখেরা মগজ ধোলাই করেন নানা শ্রেণীর মানুষদের কথা মাথায় রেখে নানাভাবে। গল্পে, উপন্যাসে, কবিতায়, নাটকে চলচ্চিত্রে, দূরদর্শনে, যাত্রায়, এঁরা হাজির করছেন অলৌকিক ঘটনার ছড়াছড়ি, অদৃষ্টবাদ, ভক্তিরসের প্লাবন। আবার দেশের যুবশক্তির মাথা খেতে হাজির করছেন রগরগে উত্তেজনা, অপরাধমূলক কাজকর্ম, যৌনতা, নেশা, খুন-খারাপি, ভোগ সর্বস্ব চিন্তাধারা, ক্যারিয়ারিস্ট চিন্তাধারা । ফলে যা হবার তাই হচ্ছে দরিদ্র বঞ্চিত মানুষগুলো যুক্তিবাদী লেখাপত্তরের চেয়ে এসব খাচ্ছে ভাল। বলতে গেলে গোগ্রাসে গিলছে। যুবসমাজও এইসব উত্তেজক বস্তু খেয়ে মানসিকভাবে ক্ষুধার্থ হয়ে উঠছে, জেগে উঠছে ভোগসর্বস্ব স্বার্থপর দৈত্যটা। ফলে শ্রেণীস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করছে ওরা ।

যুক্তিবাদ আন্দোলকর্মী ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন কর্মীদের কাজকর্ম রুখতে যা করা হচ্ছে, তা হলো— অন্তর্ঘাত। কীভাবে ঘটছে এই অন্তর্ঘাত ? আন্দোলনে অন্তর্ঘাত চালাতে সক্ষম পেটোয়া বুদ্ধিজীবীরা ক্ষুরধার কলম ধরেন সংস্কারমুক্তি, বিচ্ছিন্নতাবাদ, যুক্তিবাদ, চার্বাক দর্শন, বস্তুবাদ প্রসঙ্গ, সাম্প্রদায়িকতার উৎস, নাস্তিকতা, যুক্তিবাদের আলোকে ভাববাদ ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে। বইয়ের নাম, বিষয়বস্তুর টানেই রাষ্ট্রযন্ত্রের পেটোয়া লেখক, বহু সাংস্কৃতিক আন্দোলনকর্মী ও যুক্তিবাদী আন্দোলন কর্মীর মন জয় করে তাদের চেতনার অন্দরে ঢুকে পড়েন ট্রয়ের ঘোড়ার মতই। তারপর এইসব সাংস্কৃতিক আন্দোলনের আপনজন বুদ্ধিজীবীরা অন্তর্ঘাত শুরু করেন আন্দোলন কর্মীদের মাথায় অনবরত ভ্রান্ত চিন্তা ও অসচ্ছ চিন্তা ঢুকিয়ে। রাজনৈতিক দল, রাজনীতিক ও বড় বড় পত্র-পত্রিকা এইসব ভারি ভারি প্রবন্ধ লিখিয়েদের বিষয়ে লাগাতারভাবে সুক্ষ্ম ধারণা সাধারণের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে থাকে—ওঁরা চিন্তাবিদ, ওঁরা বিশিষ্ট, ওঁরা অসাধারণ পণ্ডিত, ওঁরা প্রগতিশীল। প্রগতিশীলতার সিলমোহরে দেগে দেওয়া ওই সব বুদ্ধি বেচে খাওয়া মানুষগুলো কী প্রসব করেন ? তারই একটি সাম্প্রতিকতম উদাহরণ দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘প্রতিরোধ’। কার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ? অন্ধতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। বইটির ‘টাইটেল পেজ’-এ ছাপা আছে— “অন্ধতা ও অযুক্তির বিরুদ্ধে রামমোহন থেকে সত্যেন্দ্রনাথ বসু”। সম্পাদকীয়তে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় এক জায়গায় লিখছেন, “অন্ধকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বঙ্গমনীষার ইতিহাসে একের পর এক মানুষের আবির্ভাব ; তাঁদের যে-অভিযান তা যেমনই দুঃসাহসিক তেমনই প্রখর প্রতিভার পরিচয়। রামমোহন রায় থেকে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর রচনাবলির দিকে দৃষ্টি আবদ্ধ বাখুন। বুকের বল ফেরত পাবেন। এই সব দীপ্ত মেধাবীরা কিন্তু প্লেটোর ঐ অসুর দলে পড়েন। ধর্মান্ধতার ঊর্ণজাল ছিন্নভিন্ন করে অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর মশাল জ্বেলে, যুক্তিনিষ্ঠ নির্মল চিন্তার হাতিয়ার হাতে বিজ্ঞানের সমর্থনে এঁরা এগিয়ে এসেছিলেন।”

ধর্মান্ধতার ঊর্ণজাল কে ছিন্ন করেছিলেন ? রামমোহন রায় ? সত্যেন্দ্রনাথ বসু ? । রামমোহন রায় তো স্বয়ং এক ধর্মমতের স্রষ্টা। ব্রাহ্মধর্ম প্রতিষ্ঠা করে নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মন্দির ও দেবমূর্তি ভাঙে কালের করাল গ্রাসে। অথবা নিশ্চিহ্ন হয় কেউ নিশ্চিহ্ন করে দিলে। নিরাকার ঈশ্বরকে ওভাবে মুছে ফেলা যায় না। এমনই এক ঈশ্বর-চিন্তা জনমানসে প্রথিত করতে চেয়েছিলেন রামমোহন, যেখানে ঈশ্বর থাকবেন অনেক নিরাপদে ৷

রামমোহন রায়ের রচনাটির আগে যে সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচয় দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় দিয়েছেন তাতে রামমোহন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “বিশ্বের সর্বত্র স্বাধীনতাকামী ও সাধারণতন্ত্রী আন্দোলনের প্রতি তাঁর ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন।”

বাস্তব সত্য যে অন্য কথা বলে। বামবুদ্ধিজীবী হিসেবে আই. এস. আই. ছাপ মারা সুপণ্ডিত দেবীপ্রসাদবাবু কী অস্বীকার করতে পারবেন যে নিচের তথ্যগুলো ভুল ” বা মিথ্যে ?

রামমোহন ইংরেজ শাসকদের প্রভু হিসেবে মেনে নিয়ে দেশীয় উচ্চবর্ণদের উদ্দেশ্যে যে উপদেশ বার বার বারিধারার মতই বর্ষণ করেছেন এবং তাঁর কাজকর্মে যে চিন্তাধারা অতিস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে তা হলো এই-

(১) ইংরেজদের শ্রেষ্ঠত্ব ও অভিভাবকত্ব মেনে নাও ।

(২) বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতবাসীদের কাছে ঈশ্বরের অপার করুণার মতোই এসে পড়েছে।

(৩) ইংরেজদের সাম্রাজ্য রক্ষায় সব রকমে সাহায্য কর ।

(৪) ইংরেজদের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহ করে তাদের ঘৃণা কর। ওই বিদ্রোহীদের নির্মূল করতে ইংরেজদের সর্বাত্মক সাহায্যে এগিয়ে এসো।

(৫) সভা-সমিতি গড়ে সেগুলোর মাধ্যমে ইংরেজদের জয়গান কর। ইংরেজদের প্রতি অনুগত্য প্রকাশ কর ।

(৬) সংবাদপত্রের মাধ্যমে ইংরেজ শাসনের সুফল বিষয়ে দেশবাসীকে অবহিত কর ।

(৭) ইংরেজদের কাঁচামাল রপ্তানী এবং ব্রিটীশ সাম্রাজ্য থেকে তৈরি জিনিস আমদানীর ব্রিটিশ নীতিকে সমর্থন কর।

রামমোহনীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ দেবীপ্রসাদ ‘ইংরেজ’ শব্দের পরিবর্তে ‘শাসক’ শব্দটি রামমোহনের নীতিবাক্যগুলোতে বসিয়ে নিয়ে গ্রহণ করেছেন বলেই কী অন্ধতা ও অযুক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামরত মানুষদের মস্তক চর্বণের জন্যেই তাঁর এই মিথ্যাচারিতা ? আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু যে পরম ঈশ্বরভক্ত এবং অলৌকিক ক্ষমতায় অগাধ বিশ্বাসী ছিলেন, তা আচার্যদেবের সামান্য হালফিল জানা মানুষদের যেখানে অজানা নয়, সেখানে দেবীপ্রসাদবাবুর মত এমন সুপণ্ডিতের তো অজানা থাকার কথা নয় ? সম্পাদক হিসেবে দেবীবাবু কী তবে না জেনেশুনেই শুধুমাত্র সুন্দর কিছু শব্দবিন্যাসের তাগিদেই সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে অন্ধকার ও অযুক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামী বঙ্গমণীষা বলে অবহিত করলেন ? সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে যদি অন্ধকার ও অযুক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামী চবি বলে দেবীপ্রসাদবাবুর মনে হয়ে থাকে, তবে দেবীবাবু নিশ্চয়ই অন্ধকার ও অযুক্তির ধারক-বাহক হিসেবে অবহিত করবেন সেইসব মানুষদের, যাঁরা অন্ধভাবে ঈশ্বর ও অলৌকিকতাকে মেনে নিতে নারাজ; যাঁরা অন্ধবিশ্বাস ও অযুক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন !

‘প্রতিরোধ’-এ এমন আরো অনেকের রচনাই স্থান করে নিয়েছে যাঁরা রামমোহনীয় চিন্তায় উদ্বুদ্ধ, যুক্তিহীন চিন্তার দ্বারা পরিচালিত। এরপর ‘প্রতিরোধ’ কাদের প্রতিবোধের জন্য প্রকাশিত, তা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না।

দেবীপ্রসাদের মত “ট্রয়ের ঘোড়া’ শুধুমাত্র অন্তর্ঘাত চালিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে না, এরা অশ্বমেধের দিগবিজয়ী ঘোড়ার ভূমিকাও পালন করে একের পর এক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দুর্গে ধ্বস নামিয়ে। এইসব অশ্বমেধের ঘোড়াদের অগ্রগতি রোধ করতে হবে সাংস্কৃতিক কর্মীদেরই, যুক্তিবাদী আন্দোলনকর্মীদেরই।

যুক্তিবাদী আন্দোলন যখন বাস্তবিকই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বহু থেকে বহুতর মানুষদের মধ্যে শহরে গ্রামে সর্বত্র, ঠিক তখনই সরকারী অর্থানুকূল্যে প্রকাশিত হলো এই ‘প্রতিরোধ’। প্রকাশক কারা ? আমেরিকার CSICOP নামক একটি সংস্থার ভারতের এজেন্সি নেওযা একটি স্ব-ঘোষিত যুক্তিবাদী সমাজসচেতন মাসিক পত্রিকা- গোষ্ঠি। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অত্যাচারিত দরিদ্র মানুষগুলোর চেতনাকে ঠেকিয়ে রাখতে আমেরিকার ধনীকশ্রেণী মেকি বিজ্ঞান-আন্দোলন গড়ে তুলতে তৈরি করেছে ‘কমিটি ফর সাইন্টিফিক ইনভেস্টিগেশন অফ ক্লেমস অফ দ্য প্যারানরমাল’ সংক্ষেপে ‘CSICOP’ নামের একটি সংস্থা। সেই কুখ্যাত সংস্থার দালালদের ওপর বিজ্ঞান আন্দোলনকর্মীদের ভরসা রাখা আর চোরেদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া নাইটগার্ডদের ওপর পল্লীবাসীর ভরসা রাখা একই ব্যাপার। সুন্দর পৃথিবীকে অসুন্দর কথারও উৎস মানুষ— তা ওই প্রত্রিকার কাজকর্মেই প্রকট।

এদেশের রাজনীতিতে আমরা তথাকথিত মগজবানদের আরো হাস্যকর ও লঘু আচরণ দেখলাম ‘৯১-এর গোড়ায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এগিয়ে এলেন অন্ধতা ও অযুক্তিবিরোধী একটি তথ্যচিত্র করতে। গরীব মানুষদের জন্য গরীব মানুষদের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি করা হলো ‘আলোর উৎস সন্ধানে’। বিপুল অর্থ ব্যযে তৈরি এই তথ্যচিত্রের সাহায্যে কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষকে আলো দেখাবার ভার তুলে দেওয়া হলো এক গ্রহরত্নধারী তথাকথিত মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী অভিনেতা কাম চিত্র-পরিচালককে। অযুক্তি ও অন্ধকারে ডুবে থাকা এমন এক পরিচালক আলো দেখাবেন ? এও কি বিশ্বাসযোগ্য? যিনি অস্বচ্ছ চিন্তায় ডুবে আছেন, তিনি সাধারণ মানুষকে দেবেন স্বচ্ছ চিন্তার দিশা ? দেশের কী করুণ অবস্থা ভাবুন। অন্ধ পথ দেখাচ্ছে অন্ধকে । আরো মজার ব্যাপার দেখুন ; ওই পরিচালক তথ্যচিত্রটিতে হাজির করলেন কাঁদের ? বুদ্ধির ব্যাপারী দেবীপ্রসাদবাবুকে এবং ভূত-ভগবানে পরম বিশ্বাসী এক যুক্তিবাদীর ভেখধারী জাদুকরকে। আরো লক্ষ্যণীয়  CSICOP-র দালাল পত্রিকাগোষ্ঠি দেবীবাবুর মতই ওই জাদুকরের অনেক লেখা তাদের পত্রিকায় প্রকাশ করে তাকে যুক্তিবাদী হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে ও যুক্তিবাদী আন্দোলনকারীদের সামনে হাজির করতে চেয়েছে। আমরা কী তবে ধরে নেব এদের সকলের অবস্থান বেড়ার একই দিকে? অথবা এইসব বুদ্ধিজীবীদের পকেটে পুরতেই সংগ্রামের হাতিয়ার সরকার পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি করলেন ? না কী এ-সবই স্বজনপোষণের বিস্ময় ফল ? কিংবা সুচিন্তিতভাবে যুক্তিবাদী আন্দোলনকর্মীদেব চিন্তা-চেতনাকে গুলিয়ে দিতেই বেড়ার একই দিকে অবস্থান করা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে ?

কথায় ও কাজে সরকারকে এক ও অভিন্ন দেখতে
চাওয়াটা একজন ভারতীয় নাগরিকের পক্ষে নিশ্চয়ই
অন্যায় নয়? মুখোশ ছিঁড়তে চাওয়াটা নিশ্চয়ই বেয়াদপী
নয় ?
 
যুক্তিবাদবিরোধী অমোঘ অস্ত্র ‘ধর্ম’

যুক্তিবাদবিরোধীতার প্রকৃত উৎস কোথায়—এই বিষয়ে আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট ধারণা না থাকলে আন্দোলন ব্যর্থ হতে বাধ্য। যুক্তিবাদ আন্দোলনের পক্ষে জয় ছিনিয়ে আনতে হলে কে প্রধান শত্রু, কোন কোন শক্তি তার সহায়ক, কী তার শক্তিশালীতম অস্ত্র এ-সব বিষয়ে পরিষ্কার, স্পষ্টভাবে জানতে হবে।

যুক্তিবাদবিরোধিতার প্রধান উৎস অবশ্যই শোষকশ্রেণী। তার সহায়ক শক্তি বহু । শোষকশ্রেণীর কৃপাধন্য হওয়ার মত মানুষের অভাব নেই এই সমাজে। তবে কৃপা পাওয়ার জন্য কিছু ক্ষমতা চাই বই কী, তা সে বুদ্ধিবলই হোক, কী বাহুবলই হোক । প্রধান সহায়ক শক্তি অবশ্যই রাষ্ট্রক্ষমতা, সরকার—যারা শোষকদের অর্থে নির্বাচন জিতে এসে গদীতে বসে মুখে গবীব-দরদী এবং কাজে ধনীক-তোষণের ভূমিকা গ্রহণ করে। শত্রু শিবিরের অমোঘ অস্ত্রটির নাম ধর্ম, প্রতিষ্ঠানিক ধর্ম। হিন্দু, ইসলাম খ্রিস্ট, বৌদ্ধ, শিখ, পার্শী ইত্যাদি ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে দাঁড়িয়ে আছে ধর্মীয় বিশ্বাসীদের প্রতিষ্ঠানিক রূপ বা সংগঠনিক রূপ। ‘প্রতিষ্ঠানিক ধর্ম হলো এইসব ধর্মীয় বিশ্বাসীদের প্রতিষ্ঠানিক রূপের ভিত্তিমূল। এই প্রতিষ্ঠানিক ধর্ম বা তথাকথিত ধর্ম অবশ্যই যুক্তিবিরোধী, প্রগতির প্রতিবন্ধক, জ্ঞান ও মুক্তচিন্তার অন্তরায়, পুরুষকার বিরোধী, কুসংস্কারের স্রষ্টা এবং তাই শোষকশ্রেণীর শ্রেষ্ঠতম হাতিয়ার ।

(ঈশ্বর, পরমপিতা, পরদ বা ওই জাতীয় চিন্তার ধারক-বাহক তথাকথিত ধর্ম যে আক্ষরিক অর্থেই যুক্তিবিরোধী, প্রগতির অন্তরায়, জ্ঞান ও মুক্তচিন্তার প্রতিবন্ধক, পুরুষকার বিরোধী, কুসংস্কারের স্রষ্টা- এ বিষয়ে যে বিস্তৃত আলোচনা ও তথ্যপ্রমাণ হাজির করা প্রয়োজন, তা সবই নিয়ে হাজির হবার ইচ্ছে রইল চতুর্থ খণ্ডে। ‘কিছু কথা’ এমনিতেই কলেবর বৃদ্ধির ফলে ‘কিছু বেশি-কথা” হয়ে যাচ্ছে, সুতরাং একটা গোটা বই লেখার মত তথ্য এখানে হাজির করি কী করে ?)

‘ধর্ম’ ক্যানসারের চেয়েও মারক, পারমাণবিক বোমার
চেয়েও ধ্বংসকারী। শোষকশ্রেণীর শ্রেষ্ঠতম এই
হাতিয়ারকে ধ্বংস করতে না পারলে চেতনা-মুক্তির যুদ্ধ
জয় অধরাই থেকে যাবে-এই পরম সত্য প্রতিটি
চেতনা-মুক্তির আন্দোলনকারীকে বুঝতেই হবে।

মানব সমাজের প্রগতির দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মের এক বিপজ্জনক দিক হলো ধর্মের ভিত্তিতে মানবসমাজ বহু গোষ্ঠিতে বিভক্ত। ফলে শোষিত মানুষগুলোও আর এককাট্টা থাকে না, বহু ভাগে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই গোষ্ঠি-ভাগের সুযোগ নেয় শঠ রাজনীতিকরা। শঠ রাজনীতিকরা ও রাজনৈতিক দলগুলো নিজ স্বার্থেই ধর্মান্ধতার অবসান চায় না। চাইতে পারে না। তারা নিপীড়িত মানুষদের বিক্ষোভ থেকে বাঁচতে অথবা ভোট কুড়োবার স্বার্থে বঞ্চিত মানুষগুলোকে ‘মুরগী লড়াই’তে নামায়। নিপুণ কুশলী প্রচারের ব্যাপকতায় সাধারণ মানুষ ভুলে যায়, যে কোনও ধর্মের যে কোনও জাতপাতের কালোবাজারীর একটাই পরিচয় হওয়া উচিত-কালোবাজারী, শোষক। যে কোনও ধর্মের যে কোনও জাতপাতের দরিদ্র শ্রমিক-কৃষকদের একটিই পরিচয়-দরিদ্র, শোষিত। দরিদ্র নিপীড়িত মানুষগুলো যখন নিজেদের মধ্যে জাতপাত বা ধর্ম নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন লাভের ক্ষীরটুকু জমা হয় শাসক ও শোষকের ঘরেই। গরীব মানুষদের বিরুদ্ধে গরীব মানুষদের লড়িয়ে দেবার জন্যে ধর্মের বিপুল প্রভাবের কথা মনে রেখেই শোষকশ্রেণী ধর্ম নামক অস্ত্রটিকে আরো শক্তিশালী করার গবেষণায় রত ।

ধর্মবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে যে পূর্বজন্ম, কর্মফল, ঈশ্বরবিশ্বাস, ঈশ্বর- নির্ভরতা, অলৌকিক বিশ্বাস গড়ে উঠেছে তারই ফলে ধর্মবিশ্বাসী বঞ্চিত মানুষগুলো তাদের বঞ্চনার কারণ হিসেবে আসল খল নায়কদের দায়ী না কবে দায়ী করেছে কল্পনার ভগবানের অভিশাপকে, পূর্বজন্মের কর্মফলকে। দুঃখে, অপমানে, সব হারাবার যন্ত্রণায়, ক্ষুব্ধতায় খান খান হতে গিয়েও ভেঙে না পড়ে পরমপিতা জাতীয় কারো চরণে সব ক্ষোভ, সব দুঃখ-যন্ত্রণা ঢেলে দিয়ে প্রার্থনা করেছে—মোরে সহিবারে দাও শক্তি। ধর্মের সমর্থক অনেকেই বলেন- পরমপিতা জাতীয় কারো কাছে আত্মসমর্পণের মধ্যে রয়েছে অপার শান্তি, সহা করার শক্তি।

পুরুষকারহীন মানুষই জীবনের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত থেকে
মুক্তি পাবার আশায় পরমপিতা জাতীয়ের কারও কাছে
আত্মসমর্পণ করে পরিত্রাণ পেতে চায়। আপসপন্থী মানুষই
শান্তি খোঁজে
আত্মসমর্পণে। কাদা-নরম মেরুদণ্ডী মানুষই নিজ শক্তিতে
প্রতিরোধ না গড়ে আঘাত
সহ্য করার শক্তি খোঁজে পরের শ্রীচরণে।

ধর্মের সমর্থক অনেকে এ-কথাও বলেন—ধর্মই সমাজকে ধারণ করে বয়েছে, সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রেখে চলেছে।

প্রাচীনকালে যখন রাজনৈতিক সংহতি, আইনের শাসন ছিল দুর্বল, তখন ধর্ম দিযে সমাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার চেষ্টা হয়েছে, হয়ত বা তার কিছু প্রয়োজনও ছিল। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখতে পাচ্ছি আইনের শাসন না থাকলে সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষাও অসম্ভব হয়ে পড়ে— তা সে দেশের মানুষ যতই ধর্মভীরু হোক না কেন।

এই প্রসঙ্গে একটি ছোট্ট উদাহরণ টানছি। ১৯৮৮ সালে আমাদের দেশের ১০০জন অপারাধীর ওপর একটা অনুসন্ধান চালিয়েছিল ‘ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি’। বিভিন্ন ধরনের এই অপরাধীই বিশ্বাস করত ঈশ্বরের অস্তিত্বে, বিশ্বাস করত পাপ- পূর্ণে। বিশ্বাস করত পাপের ফল নরক-যন্ত্রণা। এই বিশ্বাস কিন্তু অপারাধীদের অপরাধ থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি ।

যে দেশে সর্বোচ্চ পদ থেকে সর্বনিম্ন পদে সাবলীলভাবে বয়ে চলেছে দুর্নীতির স্রোত; যে দেশে হত্যাকারী, নারী-ধর্ষক, গুণ্ডা, ছিনতাইবাজ, চোর-চোট্টা-চিটিংবাজ রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকলে সাত খুন মাপ হয়ে যায়; যে দেশে গুণ্ডা- বদমাইশ পকেটে না থাকলে ৰাজনীতি করা যায় না, সে দেশের মানুষ দু-বেলা ঠাকুর প্রণাম সেজে, নমাজ পড়েও দূর্নীতি চালিয়ে যাবেই। এতক্ষণ উদাহরণ হিসেবে যে ধর্মপ্রাণ ভারতবর্ষের কথা বললাম, এটা বুঝতে নিশ্চয়ই সামান্যতম অসুবিধা হয়নি সমাজসচেতন পাঠক-পাঠিকাদের ।

প্রগতিবিরোধী চিন্তা এবং কুসংস্কারের উৎস ধর্ম, অধ্যাত্মচিন্তা। তাই কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গড়তে গেলে ধর্মকে আঘাত দিতেই হবে। ধর্মকে আঘাত না দিয়ে যাঁরা কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেন, শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেন, তাঁরা হয় কল্পনাবিলাসী, নতুবা হুজুর শ্রেণীর চতুর দালাল ; শোষিত মানুষের আপনজন সেজে তাদের বিভ্রান্ত করে হুজুর-মজুর সম্পর্ককে বজায় রাখতে সচেষ্ট। এ তো বিষবৃক্ষের গোড়াকে বাঁচিয়ে রেখে আগা কাটতে কাঁচি চালান। এই সত্যকে ভুললে তো চলবে না-শোষণমুক্ত সমাজ গড়ারই একটি পর্যায়, একটি ধাপ শোষিত মানুষদের কুসংস্কারমুক্তি, শোষিত মানুষদের চেতনা- মুক্তি, যার আর এক নাম-সংস্কৃতিক বিপ্লব ।

যে সব সংস্থা ও ব্যক্তি মানুষকে কুসংস্কারমুক্ত করতে, মানুষের ঘুম ভাঙাতে গান বাঁধছে, নাটক নিয়ে হাজির হচ্ছে, সভা কবে বক্তব্য রাখছে, হাতে-কলমে ঘটিয়ে দেখাচ্ছে বাবাজী-মাতাজীদের নানা অলৌকিক কাণ্ডকারখানা, ফাঁস করছে ওঝা গুণীনদের নানা কারসাজি- তাঁরা অবশ্যই খুব ভাল কাজ করছেন। অবশ্যই এর প্রয়োজন আছে। কিন্তু কুসংস্কারের গোড়া ধরে টান দিতে হলে যে তথাকথিত ধর্মের প্রকৃত স্বরূপ শ্রমজীবী বঞ্চিত মানুষদের সামনে তুলে ধরতে হবে একথাও মনে রাখতে হবে। সঠিক রণকৌশলের স্বার্থে তত্ত্বগতভাবে ধর্ম বিষয়ে জেনে নিতে হবে। তারপর ঠিক করতে হবে রণনীতি। কোথায়, কখন, কী পরিস্থিতে তথাকথিত ধর্মকে কতটা আঘাত হানব, কাদেরকে কেমনভাবে বোঝালে তথাকথিত ধর্মের স্বরূপ ফলপ্রশূ হবে সেটা নিতান্তই কৌশলগত প্রশ্ন। সে প্রসঙ্গ নিয়েও আপাতত বিস্তৃত আলোচনায় যাচ্ছি না ; তুলে রাখলাম পরবর্তী খণ্ডের জন্য। কারণ এই খণ্ডের মূল আলোচ্য বিষয় ধর্ম ।

আমরা বঞ্চিত মানুষের দীর্ঘদিনের বহু অন্ধ সংস্কার, বহু স্পর্শকাতর সংস্কার নিয়ে বোঝাতে গিয়ে উপলব্ধি করেছি ওঁরা বোঝার চেষ্টা করেন, ওঁরা ঝোঝেন, ওঁরা বিষয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করে সংস্কার মুক্তির লড়াইতে আমাদের সঙ্গে এগিয়ে আসেন, আমাদের নেতৃত্ব দেন। ওঁরা দেশী-বিদেশী পুঁথি পড়ে, ভাল বলতে কইতে বা লিখতে পারার সুবাদের ছাত্রনেতা থেকে জননেতা হননি, ওঁরা বুদ্ধি-বেচা ও ডিগবাজি খাওযা শেখেন নি। ওঁরা লড়াই করতে করতে লড়াকু হয়েছেন, ওরা জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শিক্ষা নিয়েছেন। ওরা জানতে বুঝতে শিখতে অনেক বেশি আগ্রহী, অনেক বেশি আন্তরিক। মধ্যবিত্তসুলভ মানসিকতা নিয়ে ‘সব জানি’, ‘সব বুঝি’ করে ‘কুয়োর ব্যাঙ’ হয়ে থাকতে নারাজ। সংগ্রাম যখনই ময়দানে নেমে আসে, নেমে আসে রান্নাঘরে বেয়োনেটের ফলা তখন মধ্যবিত্ত নেতাদের সীমাবদ্ধতা পঁচা ঘায়ের মতই ফুটে ওঠে। বঞ্চনার শিকার শ্রমিক-কৃষক লড়াকুরাই তখন নিজেদের অভিজ্ঞতার মূল্যে সঠিক পথ নির্দেশ করেন। তাঁরা নেতৃত্বে চলে আসেন। তাঁরা ইতিহাস ঘেঁটে নজির খোঁজেন না, তাঁরা নজির তৈরি করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ওঁদের হাতে নেতৃত্ব চলে যেতে থাকলে সবচেয়ে মুশকিল হয় শাসক শোসকশ্রেণীর। ওঁদের নেতাদের কেনা যায় না মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে বেরিয়ে আসা নেতাদের মত। এখানেই শাসক-শোষকদের মুশকিল ।

আজ আমাদের সমিতির বহু শাখা সংগঠন ও সহযোগী সংস্থার নেতৃত্বে শ্রমিক কৃষক-শ্রেণীর বঞ্চিত বহু মানুষ এগিয়ে এসেছেন। ওঁদের লড়াইয়ের সাথী হিসেবে পেয়েছি, ওঁদের অন্ধ বিশ্বাস ভেঙে দেওয়ার ফলেই। সুতরাং যাঁরা মনে করেন বঞ্চিত মানুষদের ধর্মীয় ধারণাকে আঘাত করলে আমরা বঞ্চিত মানুষদের থেকে বিছিন্ন হয়ে যাব, তাঁরা এ-কথা বলেন হয় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অভাব থেকে, নতুবা তাঁরা কুসংস্কারমুক্তির আন্দোলন- আন্দোলন খেলা খেলতে চান এবং বাঁচিয়ে রাখতে চান কুসংস্কারের গোড়াটিকেই।

আমরা মনে করি, ধর্ম মানে শনি, শীতলার পুজো বা দরগার সিন্নি নয়। আগুনের ধর্ম যেমন ‘দহন’, তলোয়ারের ধর্ম যেমন ‘তীক্ষ্ণতা’, মানুষের ধর্ম তেমনই মনুষ্যত্বের চরম বিকাশ। তাই মন্দিরে পুজো না করে, মসজিদে নামাজ না পড়ে, গীর্জা প্ৰাৰ্থনা না করেও মানুষের প্রগতিকামী, মনুষ্যত্বের বিকাশকামী যুক্তবাদীরাই প্রকৃত ধার্মিক। এই স্বচ্ছতা নিয়ে নিজ স্বার্থেই শ্রমজীবী শোষিত মানুষদের আজ তথাকথিত ধর্ম ও সেই ধর্ম থেকে সৃষ্ট ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার সময় হয়েছে।

যুক্তিবাদী আন্দোলন নিয়ে প্রহসন কত দিন চলবে ?

কয়েক বছর আগে কিছু বিজ্ঞান ক্লাব, বিজ্ঞান সংস্থা ব্যাপক ভাবে মানুষের মধ্যে বিজ্ঞান- মনস্কতা গড়ে তুলতে গড়ে তুলেছিল একটি সমন্বয় কেন্দ্র, ‘গণবিজ্ঞান সমন্বয় কেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ’। কিন্তু তারপর এই সমন্বয় কেন্দ্রের নেতাদের কার্য-কলাপ রহস্যময় কোনও কারণে লক্ষ্যচ্যুত হলো। অসুস্থ সমাজ ব্যবস্থায় সুস্থ মানুষগুলো বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য- এই সত্য ভুলে থেকে সমাজের অসুস্থতার মধ্যেই দলে ভারি হওয়াকেই নিজেদের লক্ষ্য হিসেবে স্থির করল। তারই সূত্র ধরে গণবিজ্ঞান সমন্বয়কেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ ২৫. ৩. ৯০ এক সার্কুলার জারি করেছেন, স্মারক নং ৮। ওই সার্কুলারটি পাঠান হয়েছে বেশ কিছু সাইন্স ক্লাবকে। সার্কুলারের শুরুতেই বলা হয়েছে কুসংস্কার ও অলৌকিকতার বিরুদ্ধে গণবিজ্ঞান আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ‘গণবিজ্ঞান সমন্বয়কেন্দ্ৰ এই বিষয়ে এতদিনকার কাজের মূল্যায়ন করার চেষ্টা করে কিছু সিদ্ধান্ত পৌঁচেছে।

কী সেই সিদ্ধান্ত ? তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কিছুটা এখানে তুলে দিলাম : “আন্দোলনের ক্ষেত্রে কুসংস্কারকে অন্ততঃ দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা অবশ্যই প্রয়োজন যথা, জীবনযাত্রা নির্বাহের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিকারক ও তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিকারক নয়। তাৎক্ষণিকভাবে যে-সব কুসংস্কার ক্ষতিকারক নয় সেগুলো মূলতঃ বস্তুনিরপেক্ষ-বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে আছে এর অনুশীলনমুখীতার চাইতে এগুলির তত্বমুখীনতা অপেক্ষাকৃত বেশী। কখনই বলা যায় না যে এগুলির বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হবে না। অবশ্যই করতে হবে, কিন্তু যেহেতু এগুলির বিরুদ্ধে আন্দোলন ও তার সাফল্য সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে তথা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যাপক মানোন্নয়নের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত সেহেতু এ আন্দোলন এক দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। পক্ষান্তরে তাৎক্ষণিক ভাবে ক্ষতিকারক কুসংস্কার সমূহ প্রধানতঃ মানুষের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক জীবনের উপর প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবশীল। বলতে বাধা নেই এগুলির বিরুদ্ধে আন্দোলন পূর্বোক্ত শ্রেণীর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন অপেক্ষা জরুরী। দ্বিতীয়ত : এই আন্দোলন সমাজে ব্যাপকভাবে বিকাশলাভ না করলে পূর্বোক্ত আন্দোলনও শক্তিশালী হতে পারে না।”

গণবিজ্ঞান-সমন্বয়কেন্দ্র তাদের নবমূল্যায়নে কী কী সিদ্ধান্তে পৌঁছল একটু দেখা যাক।

১। কুসংস্কার অবশ্যই দুই প্রকার। এক : তাৎক্ষণিক ক্ষতিকারক নয় যেমন অদৃষ্টবাদ, কর্মফলে বিশ্বাস, অলৌকিকত্বে বিশ্বাস, ঈশ্বর বিশ্বাস ইত্যাদি সংক্রান্ত কুসংস্কার। দুই : তাৎক্ষণিক ক্ষতিকারক যেমন স্বাস্থ্য বিষয়ক কুসংস্কার ।

২। স্বাস্থ্যবিষয়ক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই বেশি জবুরী।

৩। অদৃষ্টবাদ, কর্মফলে বিশ্বাস, অলৌকিত্বে বিশ্বাস, ভূত বা ঈশ্বর বিশ্বাসজাতীয় কুসংস্কার দূর করা যেহেতু দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার, তাই বঞ্চিত মানুষদের কুসংস্কারমুক্ত করার আন্দোলনের এখন প্রযোজন নেই।

৪। সমাজের বহু মানুষের মধ্যে অদৃষ্টবাদ, কর্মফল, ঈশ্বরবাদ, অলৌকিকবিরোধী কুসংস্কার-মুক্তির আন্দোলন ছড়িয়ে না পড়লে আন্দোলন শক্তিশালী হতে পারবে না ; এই পরিপ্রেক্ষিতে এখন অলৌকিক-বিশ্বাসজাতীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রয়োজন নেই।

৫। আগে অলৌকিকতা বিরোধী, ঈশ্বরতত্ব, অদৃষ্টবাদ-বিরোধী ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে তুলে ভুল পথ নেওয়া হয়েছিল ।

গণবিজ্ঞান-সমন্বয়কেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ-ব দ্বিতীয় সম্মেলনে (৬-৭ অক্টোবর ১৯৯১) সম্পাদকের যে ছাপান বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, “আজকের দিনে কোন পদ্ধতি রীতিনীতি বা ধারণাকে কুসংস্কার বললেও মনে রাখা প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কুসংস্কারটির জন্মলগ্নে অবশ্যই থাকবে এক অনুকূল সামাজিক পরিস্থিতি, হতে পারে তা অবৈজ্ঞানিক। এই সামাজিক পরিস্থিতি থেকে আজকের সামাজিক পরিস্থিতির পার্থক্য মৌলিক। আজকের সমাজেব সব কিছুরই ধারক রক্ষক সংগঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা যা অতীতে ছিল না। অতএব আজকের দিনে সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে হবে।”

বাঃ, বাঃ, সত্যিই বড় বিচিত্র এই প্রস্তাব। এত ঢাকঢোল পিটিয়ে বিজ্ঞান-আন্দোলন করতে নেমে শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের নেতারা আবিষ্কার করলেন, কুসংস্কারমুক্তিব জন্য, বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষ গড়াব জন্য আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজন আমাদের আজকের সমাজে ‘শূন্য’। শোষিত মানুষদের চেতনাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য আমাদের দাবী রাখতে হবে শোষকশ্রেণীর তল্পিবাহক রাষ্ট্রব্যবস্থা অর্থাৎ সরকারের কাছে। আমরা তেমন জোরালোভাবে দাবী রাখতে পারলে সরকার শোষিত মানুষগুলো হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে খোল করতাল বাজিয়ে শোষকদের সঙ্গে নিয়ে বানপ্রস্থে চলে যাবে।

এ কথা ভুলে থাকার কোনও অবকাশ নেই, যাঁরা নতুন সমাজ গড়াব স্বপ্ন দেখেন, সেই সমাজের উপযুক্ত মানুষ গড়ার দায়িত্বও তাঁদেবই। আদর্শ সমাজ গড়তে আদর্শ মানুষ গড়া দরকার। নতুবা যে আদর্শের জন্য বহু ত্যাগেব সংগ্রাম, তাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। একদিন সংগ্রামী মানুষগুলোই ক্ষমতার অপব্যবহারে রপ্ত হয়ে উঠবে। শুরু হবে নয়া শোষণ। তখন মনে হবে এত রক্তক্ষয়ের পর যা হলো সে তো শুধুই ক্ষমতার হস্তান্তর, মহত্তর আদর্শ-সমাজ গড়ে উঠল কই ?

গণবিজ্ঞান-সমন্বয়কেন্দ্রের সম্পাদকের ঘোষিত সিদ্ধান্তগুলোতে সমাজ সম্পর্কে যে চূড়ান্ত অজ্ঞতা ও আনাড়িপনা ফুটে উঠেছে, তা কী না বোঝার মূর্খতা থেকে ? না কি গুলিয়ে দেবার শয়তানি ? এই সিদ্ধান্তগুলো যে শোষক ও রাষ্ট্রক্ষমতার স্বার্থ রক্ষাকারী এবং শোষিত মানুষদের শোষণমুক্তির চিন্তা ধারার বিরোধী এটুকু বুঝে নেওয়া যেহেতু শয়তান ও উন্মাদ ছাড়া আর কারও পক্ষেই সামান্যতম কঠিন নয়, তাই এই বিষয় নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনায় যাওয়া একান্তই অপ্রয়োজনীয় বিবেচনায় বিরত বইলাম। গণবিজ্ঞান-সমন্বয়কেন্দ্রের নেতারা অনেকের দ্বারা নিশ্চয়ই অভিনন্দিত হয়েছেন বছরের সেরা ডিগবাজি খেয়ে ভারতীয় রেকর্ড দখল করে। একটি বিনীত অনুরোধ জানাই বৰ্ষশ্রেষ্ঠ চুকী প্রতিযোগিতায় সম্পাদক সিদ্ধান্তটি পাঠান, পুরস্কার অবধারিত। তিন নম্বর সিদ্ধান্তটি কী অসাধারণ রসিকতার নিদর্শন বলুন তো—কুসংস্কার দূর করা যেহেতু দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার, তাই এই প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত সবার আগের বদলে সবার পরে।

যাঁরা গণবিজ্ঞান-সমন্বয়কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তকে একটি বিছিন্ন ঘটনা বলে মনে করছেন, তাঁদের আরো একটু সতর্ক ও সচেষ্ট হতে অনুরোধ করব। তাহলেই দেখতে পাবেন সবের মধ্যেই এক যোগসূত্র। এই সমন্বয় কেন্দ্র সেই CSICOP র দালাল পত্রিকাগোষ্ঠির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেই কাজে নেমেছে।

ভাবতে খুবই ভাল লাগছে যুক্তিবাদী আন্দোলন, সাংস্কৃতিক পরিবেশ পাল্টে দেওয়ার আন্দোলন সত্যিই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীকেই আন্দোলিত করেছে। গ্রামগঞ্জের নিপীড়িত মানুষরা যেভাবে আন্দোলনের শরিক হচ্ছে, নেতৃত্ব দিচ্ছে, এবং যে দ্রুততার সঙ্গে এই আন্দোলন ব্যাপকতা পাচ্ছে অতে আন্দোলিত হুজুর শ্রেণী ও তাদের তল্পিবাহকরাও। হুজুরদের থাবার ভেতর যেসব পত্র পত্রিকা ও প্রচার মাধ্যম রয়েছে তার সবগুলোকেই কাজে লাগানো হয়েছে আন্দোলন রুখতে, সংস্কারের শিকল ভাঙার অভিযান রুখতে, নতুন সাংস্কৃতিক পরিবেশকে রুখতে। এই সমস্ত পত্রপত্রিকা ও প্রচার মাধ্যম ‘মুক্তচিন্তা’, ‘গণতন্ত্র’, এবং ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’-এর কোনটিতেই বিশ্বাস করে না। এবং বিশ্বাস করে না বলেই এ তিনটি শব্দই তারা বেশি করে বলে।

আমাদের দেশের হুজুরের দল ও তাদের অর্থপুষ্টরা সাধারণ মানুষের চেতনা-মুক্তির এই আন্দোলনে দেখতে পেয়েছে অশনি সংকেত। তাইতেই তারা সাধারণ মানুষদের চিন্তাকে নিজেদের পছন্দ মত ছাঁচে ঢালতে চাইছে। চাইছে বিভিন্নভাবে আক্রমণে আক্রমণে দানা বেঁধে ওঠা আন্দোলনকে ধ্বংস করতে। চাইছে মেকি বিজ্ঞান আন্দোলন গড়ে তুলে বিজ্ঞান আন্দোলনকর্মীদের বিভ্রান্ত করে আন্দোলনের পাল থেকে হাওয়া কেড়ে নিতে। আর তাই নানাভাবে কাজে নেমে পড়েছে আমাদের রাষ্ট্রশক্তি, ধনকুবের গোষ্ঠি, নানা প্রচার মাধ্যম এবং বিদেশী রাষ্ট্রশক্তি। আমাদের মত শোষণযুক্ত একটা বিশাল দেশের পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক হতে বাধ্য। তাই ভারতের আভ্যন্তরীন ব্যাপার ভেবে বসে থাকতে রাজি নয় পৃথিবীর কিছু কিছু মোড়ল দেশ।

এইসব ধারণা যে কোনও সন্দেহপ্রবণ মানুষের চিন্তার ফসল নয়, তারই উদাহরণ ছড়িয়ে আছে আপনার আমার দৃষ্টির সামনেই। একটু সজাগ থাকুন, অনেক-অনেক উদাহরণ নজরে পড়বে ।

C.SI.CO.P.র দোসর আমেরিকার The Nature পত্রিকার সক্রিয় সহযোগিতায় ভারতবর্ষে পৃথিবীর সর্বকালের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান জাঠা বা Science mission অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই বিজ্ঞান জাঠা বিষয়ে পৃথিবীব্যাপী প্রচারের দায়িত্বও গ্রহণ করেছে ‘নেচার’ পত্রিকা। এই বিজ্ঞান জাঠার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রস্তুতি কমিটির আহ্বানে ১৬ নভেম্বর ‘৯১ কিছু সাইন্স ক্লাবকে নিয়ে এক কনভেনশন অনুষ্ঠিত হলো কলকাতার বিড়লার শিল্প ও কারিগরী সংগ্রহশালায়। স্বপ্নময় প্রাসাদে এয়ারকণ্ডিশনের মিঠে ঠাণ্ডা খেতে খেতে রাজ্য সরকারের একটি অতি স্নেহধন্য বিজ্ঞান আন্দোলনকারী সংস্থার কিছু নেতা ও গণবিজ্ঞান সমন্বয় কেন্দ্রের কিছু নেতা বিজ্ঞান আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা ও ২০ কোটি টাকা বাজেটের সর্বকালের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান জাঠার মহৎ তাৎপর্য বুঝিয়ে বললেন। রাজ্য প্রস্তুতি কমিটির নেতারা জাঠা কমিটির একটি তালিকা পেশ করলেন ও পাশ করালেন। সভাপতি করা হলো এক বিজ্ঞান পেশার অধ্যাত্মবাদে পরম বিশ্বাসীকে, যিনি একই সঙ্গে ধর্মগুরুর জন্মদিনে প্রণাম জানিয়ে বক্তৃতা দেন, গীতা, ভগবৎ পাঠের আসর মাতিয়ে রাখেন এবং বিজ্ঞান আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। কার্য-নির্বাহী সভাপতি করা হয়েছে এমন এক ব্যক্তিকে, যিনি, দুর্গা পুজো কমিটির সভাপতির আসনেও জাঁকিয়ে বসেন। সম্পাদক করা হলো বিড়লা শিল্প ও কারিগরী সংগ্রহশালার জনৈক প্রাক্তন ডিরেকটরকে। ইতিপূর্বে উনি বিজ্ঞান আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবার মত সময় দিতে পারেন নি বিড়লার চাপান গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে। চাকরি থেকে অবসর নেবার পর উনি নাকি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এবার থেকে বিজ্ঞান আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবেন। জানি না, তাঁর এমন এক জনদরদী অসাধারণ সিদ্ধান্তের জন্যই প্রস্তুতি কমিটি তাঁর হাতে সম্পাদকের দায়িত্ব অর্পণ করে কৃতার্থ হয়েছিলেন কিনা ; না, বিড়লা গোষ্ঠির নির্দেশেই সম্পাদকের দায়িত্ব তুলে দিতে বাধ্য হয়েছেন ? এমনটা ভাবার পেছনে অবশ্যই যুক্তি আছে। কারণ, ১৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত কনভেনশনের সভাপতি ডাঃ জ্ঞানব্রত শীল আমাকে সে রাতেই জানিয়েছিলেন জাঠার টাকার একটা মোটা অংশ জোগাচ্ছেন বিড়লা, টাটারা। (আশা রাখি ডাঃ শীল ভবিষ্যতে কারো চাপে পড়ে এমন কথা বলবেন না- “যা বলেছি, তা বলিনি । ” তেমন চাপে যদিও বা বলেন, অবশ্যই প্রমাণ করতে সক্ষম হবো-তিনি একথা বলেছিলেনই)। অবশ্য এ-সব টাকা নাকি ওঁরা যোগাচ্ছেন যথেষ্ট গোপনীয়তার সঙ্গে। নির্বাচনসর্বস্য রাজনৈতিকদলগুলোর নির্বাচনী তহবিলের কায়দায় জনগণের কাছ থেকে অবশ্য দু-পাঁচ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হবে দেখাতে-মোরা তোমাদেরই লোক, বড়লোকদের দালাল নই।” সভাপতি ও সম্পাদক-পদ ছাড়া বাকি পদগুলোর সাম্রাজ্য প্রায় সমান দুভাগে ভাগ করে নিয়েছেন গণবিজ্ঞান – সমন্বয কেন্দ্রের কিছু নেতা এবং রাজ্য সরকারের অতি স্নেনধন্য বিজ্ঞান সংস্থার নেতারা। তবে ওই সংস্থার নেতারা সকলে এবার ওই সংস্থার নাম করে কমিটিতে ঢোকেন নি, ঢুকেছেন অন্যান্য সংস্থার নাম করে। এমনটা করার কারণ প্রথম বিজ্ঞান জাঠার দায়িত্ব গতবার ওই স্নেহধন্য সংস্থাটি পেয়েছিল। এবং ওদের বিরুদ্ধে ভারতের একাধিক প্রদেশের বিজ্ঞান—প্রতিনিধিরা এমন কী পশ্চিমবাংলার কিছু বিজ্ঞান ক্লাবও বহু অনিয়ম ও দাদাগিরির অভিযোগ এনেছিলেন দ্বিতীয় বিজ্ঞান-জাঠা বিষয়ক কনভেনশনে

একবার সুস্থ মাথায় যুক্তি দিয়ে ভাবুন তো, বাস্তবিকই কী এমন ঘটতে পারে, বিড়লা টাটার মত ধনীক গোষ্ঠি ও ধনীক গোষ্ঠির অর্থে নির্বাচনে জিতে শাসন ক্ষমতায় বসা সরকার এবং আমেরিকার সুবিখ্যাত পত্রিকাগোষ্ঠি বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিজ্ঞান-জাঠার মধ্য দিয়ে শোষিত জনগণের ঘুম ভাঙাবার গান শোনাবেন, সংস্কারমুক্তি ঘটাবেন, জাতপাতের পাঁচিল ভেঙে ফেলবেন, বোঝাবেন; “তোমাদের বঞ্চনার কারণ অদৃষ্ট নয়, পূর্বজন্মের কর্মফল নয়, ঈশ্বরের কোপ নয়, একদল অতিস্বার্থপর লোভি, দুর্নীতিপরায়ণ মানুষের শোষণের কারণেই তোমাদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বঞ্চনা, বঞ্চনা, এবং বঞ্চনা ।”

হুজুরের দল ও তাঁদেব তল্পিবাহকরা কী বাস্তবিকই পাগল হয়ে গেছে যে, নিজ অর্থ ব্যয়ে বঞ্চিত মানুষদের বিজ্ঞানমনষ্ক ও যুক্তিবাদী করে নিজেদের কবর নিজেরা খুঁড়বে ?

উত্তর : না, না এবং না।

বিজ্ঞান-জাঠার অর্থ বিনিয়োগকারীরা চাইছেন ব্যাপক
প্রচারের ঝড় তুলে, যুক্তিবাদী আন্দোলন ও বিজ্ঞান
আন্দোলনের যে মূললক্ষ্য বিজ্ঞানমনষ্ক, যুক্তিবাদী মানুষ
গড়ার আন্দোলন, সেই লক্ষ্যকে বিপথে পরিচালিত করতে
ব্যাপক পাল্টা প্রচার রাখবেন, “বিজ্ঞান আন্দোলনের মূল
লক্ষ্য বিজ্ঞানের সবচেয়ে বেশি সুযোগ সুবিধে সাধারণের
মধ্যে পৌঁছে দেওয়া।”

জাঠার চালিকাশক্তি চাইছে, আন্দোলনকর্মীদের একটা বিশাল অংশকে জনসেবার কাজে আটকে রেখে আন্দোলনকে ব্যহত করতে। বিজ্ঞান-জাঠা কুসংস্কার-বিরোধিতায় নামবে কুসংস্কারকে জিইয়ে রাখার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই। অদৃষ্টবাদ, আত্মা, পূর্বজন্ম, প্রতিষ্ঠানিক ধর্ম, ইত্যাদি শোষক দলের শ্রেষ্ঠ হাতিযারগুলোর বিরুদ্ধে ‘জাঠার মাঠা খাওয়া’ নেতারা কখনই সামান্যতম আঘাত হানার চেষ্টা করবে না, করতে পারে না, যেমন হুজুরের অর্থে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া রাজনৈতিক দলগুলি প্রকৃত অর্থে কখনই হুজুরের স্বার্থবিরোধী কোনও কাজ করতে পারে না। যা পারে, সেটা হলো, শোষিত মানুষদের বিভ্রান্ত করতে, শোষিত মানুষদের বন্ধুর অভিনয় করতে। বিজ্ঞান- জাঠাও এর বাড়তি কিছুই করতে পারবে না। ওদের কুসংস্কারবিরোধীতা সীমাবদ্ধ থাকবে গুটিকতক ম্যাজিক ও অলৌকিক রহস্য ফাঁসের মধ্যেই। এই কলমচীর প্রতিটি কথার সত্যতা আপনারা মিলিয়ে নেবেন আপনাদের অভিজ্ঞতার নিরিখে। জানি এ- লেখা বিজ্ঞান-জাঠার ঠিকা পাওয়া নেতারা অনেকেই পড়বেন বার বার পড়বেন, ওঁদের বুদ্ধিজীবীরা আবার মানুষের মগজ ধোলাই করে নিজেদের কার্যক্রমের মহত্বতা সাধারণকে বোঝাতে সচেষ্ট হবেন। কিন্তু যুক্তির কূট কচকচালি যতই সৃষ্টি করার চেষ্টা করুন, বাস্তবে শাসক, শোষক ও বিদেশী শক্তির সক্রিয় সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন কখনই তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হতে পারে না, হবে না। পরিচালিত হবে অবশ্যই তাদেরই স্বার্থ রক্ষার্থে।

বিশাল অর্থ ও বিশাল প্রচারের সাহায্য নিয়ে বিজ্ঞান-জাঠার ঝড় তুলে এইসব বিজ্ঞান আন্দোলনের মুখোশধারী বিশ্বাসঘাতক মিরজাফরের দল শোষিত মানুষদের চেতনা-মুক্তির গতিকে হয়তো সামান্য সময়ের জন্য স্তিমিত করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয় আমাদের হবেই; জয় শোষিত মানুষদের হবেই। সেদিনের বিজ্ঞান-জাঠা কনভেনশনে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান আন্দোলনের নেতা বিপ্লব বসু দ্বিধাহীন ভাষায় জাঠায় টাকার উৎস জানতে চেয়ে বলেছিলেন, “টাকা খরচ না করলে আজকাল স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মী জোটে না।” অর্থের বিনিময়ে কর্মী হয়তো জোটে, কিন্তু এইসব ভাড়াটে সেনা দিয়ে আদর্শ-সচেতন মানুষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-জেতা যায় না ।

নিপীড়িত ভারতবাসীদের দিকে দিকে জেগে ওঠাব খবরে শোষক ও শাসকরাও আজ উদ্বেল। তাই বিপুল অর্থের বিনিময়ে নেতা কিনতে নেমে পড়েছে। বিক্রি হয়ে যাওয়া এইসব নেতাদের প্রত্যেককেই কলটেপা পুতুলের মতই ব্যবহার করা শুরু করেছে ধনকুবের গোষ্ঠি ও রাষ্ট্রশক্তি। একদা সংগ্রামী এইসব নেতাদের কৃতদাসের হাটে বিক্রি হতে দেখে হৃদয় ব্যথিত হয়। এঁদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য যাঁরা অনুরোধ জানান, তাদের জানাই এমন মুখোশধারী বন্ধুদের নিয়ে আন্দোলন গড়তে চাইলে আন্দোলন ধ্বংসের জন্য শত্রুর প্রয়োজন হয় না ।

এমন অবক্ষয়, এমন দুর্নীতি, এমন নিলামের হাটে বিবেক কেনা-বেচা দেখার পরও আমরা ভবিষ্যতের উজ্জ্বল স্বপ্ন দেখতে ভালবাসি। আমরা স্বপ্ন দেখি তরতাজা আদর্শবাদী জীবন-পণ করা সাংস্কৃতিক আন্দোলনকর্মীরা গোত্রান্তরিত তৃণভোজি এইসব নেতাদের হাত থেকে নেতৃত্ব ছিনিয়ে নিয়ে সংগঠনকে আবার করে তুলবে বঞ্চিত মানুষদের সংগ্রামের সাথী ।

জানি এত দীর্ঘ আলোচনার পরও কিছু কিছু সাংস্কৃতিক আন্দোলন কর্মীদের মনে হবে যে সব বিজ্ঞান ক্লাব ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি, চ্যুতি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হলো, তাদের ভালো কী কিছুই নেই ? সবই খারাপ ? তারাও তো সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যে সমাজের জন্যে কিছু না কিছু করছে, তবে কেন তাদের সঙ্গে যৌথভাবে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে না ?

ধর্মশালা, দাতব্য চিকিৎসালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান— এমনি কত প্রতিষ্ঠানই তো চালায় অনেক ভেজালদার, মুনাফাখোর শোষকরা। সমাজের জন্য ওরাও তো কিছু করেছে। তাই বলে আপনি আমি কী ওদের সঙ্গে নিয়ে ওদেরই বিরুদ্ধে (ওরাই শোষণের স্বার্থে সংস্কারগুলো চাপিয়ে রেখেছে) সংগ্রামে নামার কথা চিন্তা করব পাগলের মত ? একই কারণে রাষ্ট্রশক্তির দালাল মুখোশধারী এই সব আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিযে সংগ্রামের চিন্তা একেবারেই পাগলামী। এইসব মুখোশধারীরা অলৌকিক ক্ষমতার দাবীদার বা জ্যোতিষীদের চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতিকর। কারণ অন্তর্ঘাতের জন্যেই এইসব বিক্রি হযে যাওয়া নেতারা তাদের সংস্থাগুলোকে কাজে লাগায়। নিরপেক্ষতার নামাবলী চাপিয়ে যাঁরা শোষকশ্রেণীর মুখোশধারী দালালদের এবং শোষিত শ্রেণীর সংস্কারমুক্তি আন্দোলনে সংগ্রামরতদের একই পর্যায়ে ফেলেন, তাঁরা প্রকারান্তরে ওইসব দালালদেরই উৎসাহিত করেন। দালালরা উল্লসিত হয় এই ভেবে, কী অনায়াসে পঙ্গু করে দিয়েছি কিছু সম্ভাব্য সংস্কার-মুক্তির যোদ্ধাকে। ওইসব সংস্থার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সে- দিনই সংগ্রামে নামা সম্ভব যে-দিন ওরা হুজুরের শিবির পরিত্যাগ করবে। আর এ- সবই নেতৃত্ব বদলের আগে কখনই সম্ভব নয়—মানুষের বক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘ কী কখনইও মানুষ মারা ছাড়ে, না মরা পর্যন্ত? ওইসব শোষকদের দালালদের সঙ্গে যাঁরা শোষিত মানুষদের জন্য মিলিজুলি আন্দোলন চালাতে বলেন, তাঁদের অনেকেরই অজানা, ওইসব দালালরাই ধনতন্ত্রের স্পর্ধিত পদচারণার প্রধান ভিত্তিমূল। অনেকে জানেন, তবু বলেন—আন্দোলনে ক্যানসারের বীজ ঢোকাতেই এমনটা বলেন।

আর একটা দিকে আপনাদের মনযোগ আকর্ষণ করতে চাইছি। হুজুরের দল ও তাদের সহায়ক শক্তি মেকি আন্দোলন গড়ে তুলে সাধারণ মানুষদের বিভ্রান্ত করার প্রয়াসের পাশাপাশি যুক্তিবাদী আন্দোলনের নেতৃত্বকেও নানাভাবে আঘাত হানতে সচেষ্ট হয়েছে। সেই আঘাত অতি পরিকল্পিত। স্লো-পয়জনের মতই নেতার মৃত্যু ঘটাতে ধীরে অথচ নিশ্চিতভাবে কার্যকর। গত দেড় বছর ধবে একটা ঘটনার প্রতি অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে, সেটা হলো বেশ কিছু সুপরিচিত ও জনপ্রিয় ও পত্র-পত্রিকায় গল্পে, উপন্যাসে, ধারবাহিক উপন্যাসে এমন একটি করে চরিত্র আমদানী করা হয়েছে এবং হচ্ছে, যেখানে চরিত্রটি আমাকে লক্ষ্য করেই সৃষ্টি বলে অনেক পাঠক-পাঠিকাই অনুমান করছেন এবং সন্দেহ প্রকাশ করছেন। এমনটা হলে আমার এবং আমাদের সমিতির ভাললাগারই কথা, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভালভাগছেও। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভালোলাগার পরিবর্তে শঙ্কার উদয় হচ্ছে, কারণ সে-সব ক্ষেত্রে চরিত্রটিকে করা হচ্ছে একজন যুক্তিহীন, অক্ষম যুক্তির, বোকা, হাসির খোরাক হিসেবে ; সেই সঙ্গে নানাভাবে চরিত্রহননের চেষ্টা তো আছেই। শঙ্ককার কারণ, এই পরিকল্পিত প্রয়াশের পিছনে রযেছে যুক্তিবাদী আন্দোলন সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করাব অতি চতুর প্রয়াশ, সাধারণ মানুষকে আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা। শোষণ ব্যবস্থা কায়েম রাখতে, জনজাগরণ রুখতে জনআন্দোলনের নেতাদের প্রতি মনকে বিষিয়ে তোলার জন্য লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং প্রচার যন্ত্রগুলোকে কাজে লাগানর এই ব্যাপক ও নীরব প্রয়াশকেই বলা হয় ‘অপারেশন আমেরিকান স্টাইল’। যথেষ্ট কার্যকর এই স্টাইলেই আক্রমণ হানা শুরু হয়েছে আন্দোলন রুখতে ।

সম্প্রতি একটি মফস্বল শহরের এক ‘গল্পপাঠের মেলা’য় জনৈক প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিত এক লেখক তার স্বরচিত একটি গল্প পড়তে গিয়ে শ্রোতাদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে বানের জলে খড় খুটোর মতই ভেসে যান। শ্রোতাদের ক্ষোভের কারণ, গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্রটির সঙ্গে আমার এমন কিছু স্কুল মিল রাখা হয়েছে যাতে চরিত্রটি আমাকে চিন্তা করেই আঁকা বলে অনেকেই মনে করবেন এবং লেখক, চরিত্রটির চরিত্রহনন করেছেন পাকা খেলুড়ের মতই। ওই লেখক একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকায় অনেকে এমন সন্দেহও প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক দলের নির্দেশেই লেখক এমন একটা গল্প লিখে মফশ্বল শহরের এই গল্প মেলায় সেটি পড়ে জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া দেখতে চেয়েছিলেন। প্রতিক্রিয়া ওরা দেখেছেন, এবং সেটা তাদের পক্ষে মোটেই সুখকর হয়নি, বরং যথেষ্ট শিক্ষা পেয়েছেন। এমনটা ভাবার কারণ, বছরখানেক আগে ওই লেখকের সঙ্গে সম্পর্কিত রাজনৈতিক দলের নিজস্ব দৈনিক পত্রিকার তরফ থেকে চেষ্টা করা হয়েছিল আমার চরিত্রহনন করে জনগণ থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করতে ; সমিতির সাধারণ কর্মীদের থেকে, সাংস্কৃতিক আন্দোলন কর্মীদের থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করতে। আর সেই জন্যে বেশ কয়েকটি দিন প্রচুর গুরুত্ব সহকারে, প্রচুর নিউজপ্রিন্ট খরচ করে তারা চূড়ান্ত মিথ্যাচারিতা বা ‘ইয়েলোজর্নালিজম’ চালিয়ে গিয়েছিল। এ-সবই করা হয়েছিল রাজনৈতিক দলটির মুষ্ঠিমেয় কিছু নেতৃত্বের চাপে। সেবার ওদের সেই নোংরা প্রচেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল সাধারণ মানুষদের সোচ্চার প্রতিবাদের ঝড়ে। একই সঙ্গে তীব্র ভাষায় ক্ষোভ ও ধিক্কার জানিয়েছিলেন ওই রাজনৈতিক দলেরই বহু সুস্থ-চিন্তার কর্মীরা-নেতারা ও দলের সঙ্গে সম্পর্কীত শ্রমিক, কৃষক, সরকারী কর্মচারী ইত্যাদি বিভিন্ন সংগঠন। সে এক ইতিহাস।

হুজুরের দল ও তার উচ্ছিষ্টভোগীরা আমাকে তথ্য যুক্তিবাদী আন্দোলনকে এত বেশি গুরুত্ব দিয়ে আক্রমণ চালান যে এটুকু অবশ্যই বুঝেছি, আমরা সুস্পষ্টভাবে সঠিক পথেই এগুচ্ছি।

এও জানি আন্দোলনকে আঘাত হানা এখানেই বন্ধ হবে
না, হতে পারে না। আঘাত আসবেই, তবে সফদার হাসমি
বা শংকর গুহ নিয়োগীকে হত্যা করে যে ভুল ওরা করেছে,
সে ভুলের ফাঁদে আবার পা ফেলবে না। হয়তো আচমকা
গ্রেপ্তার করা হবে আমাকে। দুরাত্মার কখনও ছলের অভাব
হয় না। এক্ষেত্রেও হবে না। আনিত হবে চুরি, ছেনতাই
রাহাজানী, হত্যা, স্মাগলিং, শ্লীলতাহনী ইত্যাদি নিদেন পক্ষে
গোটাপঞ্চাশেক অভিযোগ— যেমনটি পশ্চিমবাংলার আর
সব রাজনৈতিক বন্দীদের ক্ষেত্রেও আনা হয়েছে ।

কিন্তু যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, এ-ভাবে তাকে কিছুতেই শেষ করা যাবে না। নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এসেছে আজ বহু মানুষ, ধান্ধাহীন নিবেদিত প্রাণ, লড়াকু বহু মানুষ। কারাগারের গারদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তি ধরে মানুষের তীব্র ইচ্ছে। তাই বার বার প্রতিবার আন্দোলনের নেতাদের কারাগরে বন্দী করার শাসক-চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে দেশে দেশে। জনরোষে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছে ওরা। ইতিহাস থেকে এই শিক্ষা যদি রাষ্ট্রশক্তি এখনও না নিয়ে থাকে, তবে চরম মূল্যে আবার সেই শিক্ষা নিতে বাধ্য করবে জনশক্তি।

আন্দোলনে জোয়ার আনতে একটু সচেতনতা, আন্তরিকতা

যুক্তিবাদী আন্দোলনকে যাঁরা জীবনের শ্বাস-প্রশ্বাস করে নিয়েছেন, যাঁদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন বেঁচে থাকার ভাত রুটি, যাঁরা আদর্শের বারুদ ঠেসে শরীরের খোল ভরিয়ে রেখেছে, যাঁরা বঞ্চিত মানুষগুলোর প্রেমে লায়লা কী মজনু প্রেমের মূল্য তো তাঁদের দিতে হবেই। প্রেম করব কিন্তু মূল্য দেব না; এ হয় না, হতে পারে না। সে মানব মানবীর প্রেমই হোক আর দেশপ্রেমই হোক। আদর্শের প্রতি এই প্রেম, বঞ্চিত মানুষদের প্রতি এই প্রেমই আত্মোৎসর্গে অনুপ্রাণিত করে,

আদর্শের বারুদে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দেয়
নিজের শরীরের সঙ্গে সঙ্গে শত্রু শরীরও। এমন আদর্শে
নিবেদিত প্রাণ সারা শরীরে বারুদ ঠাসা মানুষ ইতিহাসের
পাতা থেকে হঠাৎ উঠে আসে না। এরা তৈরি হয়। আদর্শ
এদের তৈরি করে।

এরা আবেগতাড়িত হিষ্টিরিয়াগ্রস্থ অবস্থায় টপ করে প্রাণ দিয়ে ফেলে না। এরা উত্তেজনাহীন, আবেগহীন অবস্থাতেও নিজ আদর্শে অবিচল। আবারও বলি, এমন মানুষ তৈরি হয়েছে আদর্শকে সামনে রেখেই। আত্মোৎসর্গ ব্যাপারটা এইসব আদর্শবাদীদের কাছে দৈনন্দিন আর দশটা কাজকর্মের মত এতই স্বাভাবিক যে, এর মধ্যে তারা কোনও বিশেষ বীরত্ব বা বিশেষ মাত্রা আছে বলে মনে করে না। নিছক কল্পনা থেকে এসব কথা লিখছি না। এসব কথা কলম থেকে উঠে এসেছে বাস্তব অভিজ্ঞতার ফসল হিসেবে। আন্দোলন করব, শাসক শ্রেণী ও রাষ্ট্রক্ষমতাকে আক্রমণ করব, অথচ আক্রান্ত হব না এমন বোকার মত প্রত্যাশা রাখি না। আক্রান্ত হয়েছি, হচ্ছি, হবো !

আজ এক চরম যুগ-সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট বুঝে নেবার প্রয়োজন আছে যুক্তিবাদ নিয়ে আন্দোলন খেলায় সামিল না হয়ে সত্যিকারের গণআন্দোলন গড়ে তুলতে থাকলে আঘাত আসবেই। এই আন্দোলন যাদের স্বার্থকে আঘাত করবে, যাদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলবে, তারা যে আঘাত হানবেই এবং সে ভাঘাত হবে অবশ্যই নিষ্ঠুর ভয়ংকর! এই আন্দোলনে প্রয়োজন ব্যাপক জনসমর্থন। শোষিত জনগণ যে-দিন তাঁদের নিজেদের যুক্তিতে বুঝতে পারবেন কুসংস্কারের সঙ্গে শোষণের সম্পর্কটা, সে-দিন যে গণ-আন্দোলন গড়ে উঠবে, তাতে বর্তমান সমাজ-ব্যবস্থার ভিত্তিমূল পর্যন্ত আন্দোলিত হবে। সেই আন্দোলনকে ধ্বংস করতে হুজুরের তল্পিবাহক সরকার ময়দানে নামবেই নানাভাবে। নামবে অত্যাচার, কুৎসা, চরিত্রহনন, ব্ল্যাক- মেইলিং ইত্যাদি অস্ত্র নিয়ে। আজকাল সরকার আর শত্রুদের বিরুদ্ধে শুধু মাইনে করা সেনা, পুলিশ নামায় না। হাজির করে গোয়েবেলস-এর মিথ্যেকে লজ্জা পাইয়ে দেওয়া নানা ফন্দিফিকির, ষড়যন্ত্র। ফলে আন্দোলনের নেতৃত্বে আপনি এগিয়ে এলে হঠাৎই এক রাতে দেখতেই পাবেন পুলিশ আপনার আস্তানায়। তারপর ভ্যানে তোলা । গুলির শব্দ, আর্তনাদ, সব শেষ। তারউপর, রাত দুপুরে পুলিশের কোনও বড়কর্তা পত্রিকার অফিস ও সংবাদ মাধ্যমগুলোকে ফোনে দারুণ একটা খবর শোনাবেন ; কোন পতিতার ঘরে এক সমাজ বিরোধীর সঙ্গে বাগড়ায় লিপ্ত হয়ে গুলি বিদ্ধ হয়ে আপনার মারা যাওয়ার খবর। অথবা ছড়ান হতে পারে অন্য কোনও গপ্পো যা সাধারণ মানুষ চেটে পুটে খাবেন, সেই সঙ্গে খাওয়া হবে আন্দোলনেরও কিছুটা। ষড়যন্ত্রের শিকাবে কত রকমভাবেই না খেলে বিশাল প্রভাবশালী রাষ্ট্রক্ষমতা। সরকারের একান্ত ইচ্ছেয় সাধুকে চোর বানান কঠিন কী ?

আপনার আমার দাবি জানানোর গণতান্ত্রিক অধিকার, আপনার আমার বেঁচে থাকার গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করতে পুলিশ ও প্রশাসন এগিয়ে আসবে এবং পুলিশ ও প্রশাসনের দেওয়া নিরাপত্তার ঘেরটোপের ওপর নির্ভর করে আমাদের আন্দোলন এগোবে এমন অদ্ভূত চিন্তা করলে এখনই সচেতন হওয়ার প্রয়োজন আছে। আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে বাস্তব সত্যকে বুঝতেই হবে। বুঝতে হবে হুজুবের দলের সঙ্গে হুজুরদেব অর্থে জেতা সরকার-গঠণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক এবং সরকারের সঙ্গে পুলিশ ও সেনার সম্পর্ক। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে যাঁদের জন্য আন্দোলন, যাঁদের নিয়ে আন্দোলন, তাঁরাই আমাদের আন্দোলনের শক্তি। আমরা আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে যখনই আক্রান্ত হয়েছি জনবোধ আক্রমণকারীদের ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। আজ যুক্তিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এমন বহু মানুষ তৈরি হয়েই গেছেন, যাঁরা প্রয়োজনে অবলীলায় নিজের হৃদপিণ্ড পেতে দিতে পারেন শত্রুর গরম সীসায় বিদীর্ণ হতে। দেশপ্রেমই তাঁদের এমন করে গড়েছে।

তবু এরপরও একটা অতি প্রয়োজনীয় কথা বলার থেকেই যায়, সেটা হলো- আন্দোলন এগোয় উত্থান পতনের পথ ধরে, আন্দোলন অনেক উত্থান পতনের সমষ্টি। আন্দোলনের সংকট মুহূর্তে, প্রয়োজনে পিছু হটার মুহূর্তে এই সত্যটা স্মরণে রাখলে লড়াই করার প্রেরণা পাওয়া যায়, উজ্জিবীত হওয়া যায়, হারতে হারতেও হারাকে জেতায় রূপান্তরিত করা যায়।

আন্দোলনে যতই বেশি বেশি করে বঞ্চিত মানুষরা অংশ নেবে ততই আন্দোলন ধ্বংসে আক্রমণ তীব্রতর করবে রাষ্ট্রশক্তি। খেটে খাওয়া মানুষদের বিরুদ্ধে খেটে খাওয়া মানুষদের কাজে লাগাতে উগ্রপন্থী ছাপও মারা হবে লড়াকু আপোষহীন

আন্দোলনকর্মীদের বুকে পিঠে। উগ্রপন্থীদের নির্মূল করার প্রশ্নে ভারতবর্ষের প্রায় সমস্ত

রাজনৈতিক দল ও তাদের পকেটের বুদ্ধিজীবীরাই প্রচণ্ড সোচ্চার। বিপজ্জনক মতৈকের জোয়ারে বলিষ্ঠ সত্যটুকু প্রকাশ করতে ভয় পায় অনেকেই। জেনে-বুঝেও এইসব শঙ্কিত কণ্ঠগুলো যা বলতে পারে না, তা হলো— উগ্রপন্থীরা তো উদ্ধার মতন আকাশ থেকে এসে খসে পড়েনি। অবহেলিত বঞ্চিত মানুষগুলোর অধিকার দাবীর ক্ষেত্র থেকে উঠেছে এই সমস্যা। উগ্রপন্থী মারতে হবে শুনলে জনসাধরণের অর্থে পোষা সরকারী পুলিশ ও সেনাবাহিনীর চোখে মুখে ফুটে ওঠে একটা জিঘাংসা, কিলার ইনস্টিংক্ট। তারপর তারা আন্দোলনকারী জনগোষ্ঠির ওপর যে অত্যাচার চালায় তা নাৎসি অত্যাচারকেও হার মানায়। ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠির যাঁরা মানুষ নন, তাঁদের একথা শুধু কলমে লিখে বোঝান যাবে না ।

এখানে একটি ছোট্ট উদাহরণ টানছি, ৯১-এর অক্টোবর হারাবে মিলিত হয়েছিল কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্র প্রধানেরা। বহু দেশের প্রধানরাই ছিলেন ঋণভিক্ষু। ব্রিটেন ও কানাডা প্রস্তাব আনতে চেয়েছিল- ঋণপ্রার্থী দেশগুলোর মানবাধিকার রক্ষার রেকর্ড দেখে ঋণ দেওয়া হবে। এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছিল ভারত সহ তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সব দেশই। কারণ একটাই— রেকর্ড ঘাটলে দক্ষিণ আফ্রিকায় মানবাধিকার রক্ষিত হচ্ছে না বলে চোখের জলে বুক ভাসান এইসব দেশের ঋণ পাওয়া অসম্ভব হয়ে যায় মানবাধিকারকে অতি বর্বরতার সঙ্গে নিষ্পেষিত করার অপরাধে।

যুক্তিবাদী আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন ও দেবেন তাঁদের তাই সচেতন থাকতে হবে, বুঝতে হবে আন্দোলনের শত্রু-মিত্রকে। আন্দোলনকর্মী ও নেতাদের আন্তরিকতা, তাঁদেব নিপীড়িত মানুষদের প্রতি সমুদ্র-গভীর প্রেমই দিতে পারে আন্দোলনের অসামান্য সাফল্য। এই আস্তবিকতা ও প্রেমের মাঝখানে কখনই আসতে পারে না আপসমুখী কোনও চিন্তা। এই আপসমুখী মানসিকতার দ্বিধাই আপনাকে হিসেবী পা ফেলতে শেখাবে, ক্যারিয়ার গোছাতে শেখাবে। প্রেম কখনও হিসেবি পা ফেলতে শেখায় না।

সাংস্কৃতিক আন্দোলনকর্মী ও বিজ্ঞান আন্দোলনকর্মীদের
সচেতন থাকতেই হবে তাঁদের নেতাদের কাজকর্মের বিষয়ে,
যাতে চ্যুতি ঘটলে নজর না এড়ায় ।

আন্দোলনকে বিপথে চালিত করতে শোষক ও শাসকরা নানাভাবে প্রতিটি সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিজ্ঞান ক্লাব এবং কুসংস্কার-মুক্তির কাজ-কর্মের সঙ্গে জড়িত সংস্থাতে থাবা বসাতে চাইবেই। চাইবেই তাদের মত কবে কুসংস্কার মুক্তির আন্দোলন খেলায় সাংস্কৃতিককর্মীদের মাতিয়ে রাখতে। সাধারণ মানুষের চেতনা রোধ করতে ওর এমনটা করবেই। আর সেইজন্য অতি সরলীকৃত পদ্ধতিটি হলো— সংস্থার নেতাদের চিহ্নিত কর, তাদের কিনে পকেটে পুরে ফেল।

যে নেতা নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছে, তাকে আপনারা আন্দোলনকর্মীরাই চিহ্নিত করুন, বিছিন্ন করুন আন্দোলন থেকে। আপনার আমার যদি লক্ষ্য সম্বন্ধে সঠিক ও স্বচ্ছ ধারণা থাকে, তবেই বুঝতে পারব নেতৃত্ব আমাদের অন্য দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে চাইছে কী না।

কোনও অপছন্দের আন্দোলনকে ধ্বংস করতে রাষ্ট্রশক্তি সেই আন্দোলনে ঢুকিয়ে দেয় ট্রয়ের ঘোড়া। যাদের অন্তর্ঘাতে আন্দোলন ধ্বংস হয়ে যায়। সব দেশের ইতিহাসেই ছড়িয়ে রযেছে এমন বহু উদাহরণ। বহু থেকে একটিকে তুলে দিচ্ছি। নকশালপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যে কোনও কৌশলেই হোক মিশে গিয়েছিল সমাজবিরোধী গোষ্ঠি। আর সমাজবিরোধীদের প্রয়োগ করা হয়েছিল ওই আন্দোলন ধ্বংস করবার কাজে। এ বিবরণ রঞ্জিত গুপ্তেরই দেওয়া, যিনি নকশাল দমনকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে পরিচিত।

নকশালপন্থার সমর্থন বা অসমর্থন আমার এই উদাহরণ টেনে আনার উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য আন্দোলনকারীদের সামনে দৃষ্টান্ত এনে বোঝার ব্যাপারটা আরো ‘জল-ভাত’ করে দেওয়া।

কুসংস্কার-মুক্তি আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যে-সব বিষয়গুলো মাথায় রাখা প্রাথমিকভাবে প্রযোজনীয় সেগুলো হলো :

১। সাংস্কৃতিক জগতে শাসক ও শোষকদের একচেটিয়াপণা বন্ধ করতে হবে। নতুন সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে আমাদেরও সমস্ত রকমভাবে চেষ্টা করতে হবে প্রতিটি গণমাধ্যম ও প্রচার মাধ্যমকে কাজে লাগাতে। যে-সব গণমাধ্যম ও প্রচারমাধ্যম মানুষকে আকর্ষণ করে, তার প্রতিটিকে কাজে লাগিয়েই আমরা আমাদের চিন্তা-চেতনাকে পৌঁছে দেব, প্রতিটি মানুষের মধ্যে। মানুষ যেখানে, সেখানেই আমাদের পৌঁছতে হবে আমাদের চিন্তধারাকে পৌঁছে দেবার স্বার্থেই। পরিস্কারভাবে মাথায় রাখতে হবে, আমরা গণমাধ্যম ও প্রচারমাধ্যমগুলোকে আন্দোলনের স্বার্থে কাজে লাগাব, কিন্তু গণমাধ্যম ও প্রচার মাধ্যমগুলো যেন হুজুর শ্রেণীর স্বার্থে আমাদের কাজে না লাগাতে পারে।

যাঁরা মনে করেন বৃহৎ পত্র-পত্রিকায় না লেখাটাই বুঝি লড়াকু মানসিকতার পরিচয় তারা ভুল করেন, সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের বক্তব্য পৌঁছে দেবার লক্ষ্য থেকেই সরে যান। সাধারণ মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠি মাত্র হয়ে পড়েন। সব সময এমন চিন্তা যে ভুল ধারণা থেকে উঠে আসে, তাও নয়। অনেক তথাকথিত লড়াকু মানুষদের চিনি, যাঁরা বড় পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করাটা প্রতিক্রিয়াশীলতার লক্ষণ বলে সোচ্চারে ঘোষণার পাশাপাশি গোপনে বড় পত্রিকায় ‘লাইন’ করার চেষ্টা করেন স্রেফ নিজের লেখা ছাপাতে। এঁদের অনেকেই নিজের বিবেক বিক্রি করেছেন লেখা ছাপানোর প্রতিশ্রুতি কিনতে। যাঁদের লেখায় ধার নেই, পাঠক-পাঠিকাদের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার আকর্ষণী ক্ষমতা নেই, তাঁরা বিবেক জামিন রাখতে চাইলেও কেনার খদ্দের জোটে না। এই অক্ষমতা থেকেও অনেক সময় আসে বড় প্রচার মাধ্যমগুলোর প্রতি বৈরাগ্য। এ যেন ভিখারীর বৈরাগ্য, নপুংসকের ব্রহ্মচর্য।

বড় পত্রিকায় লেখার সুযোগ পেলে আমরা নিশ্চয়ই নেব। কিন্তু তা বিবেক জামিন রেখে অবশ্যই নয়। সুযোগ নেব আমাদের দর্শন, আমাদের আদর্শকে পৌঁছে দেবার স্বার্থেই। বড় পত্রিকার মধ্য দিয়ে আদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা অবশ্যই আছে, এটুকু মাথায় রেখেই বলছি সাধারণ মানুষের ধোলাই করা মগজকে পাল্টা ধোলাই করার সামান্যতম সুযোগ ছাড়াও উচিত হবে না।

এরই পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব লেখক তৈরি করতে, সম্পাদক তৈরি করতে স্থানীয মানুষদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বাড়াতে, স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে ভাব বিনিময় করতে, তাঁদের ভাববাদ-বিরোধী লেখা-পত্তরের সঙ্গে পরিচিত করাতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলো আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হলে নিশ্চয়ই তারা পারবে ভাববাদ-বিরোধী, কুসংস্কার বিরোধী বুলেটিন, পত্র- পত্রিকা, বই ইত্যাদি প্রকাশ করতে ; তা সে যতই অকিঞ্চিৎকরই হোক না কেন, যত কৃশ কলেবরেই হোক না কেন। এখান থেকেই আমরা জ্বালাব মনুষ্য চেতনায় জ্ঞানের আলো। এখান থেকেই আমরা তৈরি করব আমাদের নিজস্ব ‘রবীন্দ্রনাথ,’ ‘আমাদের নিজস্ব ‘সত্যজিৎ’।

সাধারণ মানুষের কাছে আমাদের লেখাপত্তার, বক্তব্য, নাটক ইত্যাদিকে গ্রহণযোগ্য করতে হলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমাদের কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ বাড়াতে হলে আমাদের লেখাপত্তরকে এতটাই আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে যাতে পাঠক- পাঠিকারা আপন তাগিদে ওইসব লেখাপত্তর পড়তে উৎসাহিত হন। যে মানুষদের সামনে পৌঁছতে চাইছি, যাদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে চাইছি। তাদের ভাললাগা না লাগার খবরও আমাদের রাখতে হবে; বুঝতে হবে তাদের মনস্তত্ব।

রাজনৈতিক শ্লোগানধর্মী নাটক, গল্প, উপন্যাস মানুষকে সাধারণভাবে টানতে পারছে না। পুজো প্যান্ডেলে মার্কসবাদী সাহিত্যের স্টলে রাজনৈতিক দলের কর্মীদের ভিড় যতটা থাকে ক্রেতাদের ভিড় ততটা থাকে না। এর একটাই কারণ, সাধারণ মানুষকে এসব আকর্ষণ করতে পারছে না। এই জাতীয় অনেক বইই ভারি ভারি শব্দে এতই ভারাক্রান্ত যে সাধারণ মানুষ সভয়ে ও-সব লেখাপত্তর এড়িয়ে চলেন

আমরা ‘ছোটি-বাড়ি বাঁতে এর মতন অতি সফল টি.ভি. সিরিয়াল দেখেছি, যেখানে : হাঁচি কাশি টিকটিকির ডাকের মতন নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বক্তব্য এসেছে জমাটি কাহিনীর সঙ্গে। আমরা ‘রজনী’ হিন্দি টিভি সিরিয়ালের প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা অর্জনের ইতিহাসও জানি। রজনীর বিপুল জনপ্রিয়তায় নায়িকা প্রিয়া তন্ডুলকরকে তাঁর পরিচিত মানুষরাও ডাকতে শুরু করেছিলেন রজনী নামে। সেখানেও এসেছে বুজরুকের ভাঙাফোড় করার কাহিনী। জ্ঞান দিচ্ছে বলে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। গ্রহণ করেছে। বিষয়বস্তুর আকর্ষণীয়তাই এগুলোকে সাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছে।

ঢাল তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দাবের গল্প আমরা জানি, আমাদের ভাববাদ-বিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনকর্মীদের অবস্থাও অনেকটা ঢাল তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারের মত। আমাদের না আছে একজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, না একজন বিভূতি বাড়বে। ফলে আমাদের অনেকের হাতেই নিপীড়িত মানুষের কথা বেরিয়ে আসছে শ্লোগান হয়ে। পরমান্ন রাঁধতে গিয়ে আমরা যদি লঙ্গরখানার খিচুড়ি রেঁধে বসি, তাহলে মানুষ মুখে তুলবে কেন ?

শহরে গ্রামে যেদিকেই তাকান দেখতে পাবেন সিনেমা ও ভিডিওর রমরমা ব্যবসা। শহরের বস্তিবাসী থেকে গ্রামের গরীব চাষার প্রধান বিনোদন এই সিনেমা, ভিডিও । ওরা হলে এসে ভুলে যেতে চায় ওদের সমস্ত বঞ্চনার কথা, দৈনন্দিন দুঃখ দারিদ্রের কথা। ওরা আসে সব কিছু ভুলে কিছুক্ষণের আনন্দে ডুবে থাকতে। হতদরিদ্র মানুষগুলোকে নিয়ে তোলা সিনেমা তাই গরীব মানুষদের তেমন টানে না।

‘রজনী’তে গরীবদের নিয়ে অনাকর্ষণীয় কোনও প্যানপ্যানানি ছিল না, ছিল সমাজের নানা সমস্যা এবং সেইসব সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করে মোকাবিলা করার শিক্ষা ৷

‘ছোটি বড়ি বাঁতে’ তে পাজি— পুথি- মঘা-এ্যহস্পর্শ-বারবেলা মান্য করা, বৃহস্পতিবার ও শনিবার ক্ষৌরকর্ম না করা, পিছু ডাক, হাঁচি, টিকটিকির ডাক ইত্যাদি মেনে চলাকে হাসির খোরাক করা হয়েছে এবং দর্শকরা তা দারুণভাবে উপভোগ করেছে। এই সিরিয়ালের চরিত্রগুলো কিন্তু শোষিত মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করেনি । কিন্তু সিরিয়াল থেকে উঠে এসেছিল আমাদেরই কথা। এই ধরনের কুসংস্কার মেনে চলাটা নেহাৎই হাসির খোরাক হওয়া— এই প্রচার লাগাতারভাবে চালাতে পারলে এই সব কুসংস্কার না মানাটাই বহু মানুষের ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’ হয়ে দাঁড়াত।

আমার এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে গল্পে উপন্যাসে নাটকে গরীব অত্যাচারিত মানুষদের চরিত্রগুলোকে নিয়ে আসা নিয়ে সামান্যতম বিরোধীতা করছি না। এইসব চরিত্র-চিত্রণ করতে গিয়ে বিষয়বস্তু আকর্ষণ হারালে আমাদের উদ্দেশ্য সাধিত হবে না— এই সত্যটুকুর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে চাইছি শুধু। বলতে চাইছি- লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকলে নানা আকর্ষণীয় ভাবেই হাজিব করা যেতে পারে আমাদের বক্তব্য।

২। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রচার ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের দেশের জনসমষ্টির সিংহভাগই বই পড়ার মত লেখা-পড়ার সুযোগলাভে অক্ষম। এদের কাছে আমরা আমাদের লেখাপত্তর নিয়ে হাজির হতে পারব না। আমরা সাধারণ মানুষের চেতনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াব জন্য শুধুমাত্র আমাদের লেখাপত্তরের ওপর নির্ভর করলে দেশের বৃহত্তর জনসমষ্টি পিছিয়েই থেকে যাবে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলে আদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে আমবা কাজে লাগাতে পারি নাটক, যাত্রা, গান, এবং ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ শিরোনামে বিভিন্ন অলৌকিক ক্ষমতার রহস্য ফাঁস করে।

আমরা সকলের কাছেই হাজির হবো। যেখানেই মানুষ, সেখানেই হাজির হবো। যে সংস্থাই আমন্ত্রণ জানাক, আমরা যাব- তা সে দক্ষিণ, অতিদক্ষিণ, বাম, অতিবাম – যেই ডাকুক না কেন। যুক্তিবাদ প্রসারে ব্রতী সংস্থাগুলোর একটু জরুরী কাজ হবে তাদের এলাকার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও ক্লাবগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সহায়তায় নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জন-চেতনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা এবং একই সঙ্গে এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আরো নতুন নতুন মানুষকে এই আন্দোলনের শরিক করা, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা।

৩। ভাববাদী বইপত্তরের তুলনায় ভাববাদ-বিরোধী বা যুক্তিবাদী বই পত্তরের সংখ্যা অতি নগণ্য। ভাববাদী মানসিকতা ঠেকাতে ও যুক্তিবাদী চেতনা বাড়াতে সাধারণ মানুষের মধ্যে হাজির করতে হবে যত বেশি কবে সম্ভব যুক্তিবাদী বইপত্তর। এই দায়িত্ব পালন করতে হবে আপনাকে আমাকে প্রতিটি দেশপ্রেমিককে। আসুন আমরা আজই কেন প্রতিজ্ঞা করি না— শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে যে সংস্কার-মুক্তির প্রয়োজন তারই স্বার্থে আমরা বেঁচে থাকার জন্যেই প্রয়োজন ভেবে সংস্কার-মুক্তির বই কিনব, বই পড়ব, বই পড়াব এবং বই উপহার দেব।

৪। যুক্তিবাদী আন্দোলনে সামিল সংস্থা ও গণসংগঠনগুলোর একান্ত কর্তব্য হওয়া উচিত কর্মীদের তৈরি করে তোলার জন্য নিরন্তর ‘স্টাডি ক্লাস’ করা। কীভাবে স্টাডি ক্লাসগুলো চালাতে হবে, এই নিয়ে দ্বিতীয় খণ্ডে আলোচনা করেছি বলে আবার বিস্তৃত আলোচনায় গেলাম না।

৫। কোনও সাংস্কৃতিক বা যুক্তিবাদী সংস্থা কোনও ধরনের কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হলে বা কোনওভাবে আক্রান্ত হলে তাঁরা সমমনোভাবাপন্ন মানুষ ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করে তাদের পরামর্শ, সাহায্য ও সহযোগিতা গ্রহণ করুন। একইভাবে কোনও আক্রান্ত সংস্থা যোগাযোগ করলে সমস্ত রকমভাবে আপনারা প্রত্যেকে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই-এ জয় ছিনিয়ে নিয়ে আসুন । যদি সংস্কারের শেকল ভাঙতে গিয়ে আক্রান্ত হন— অঙ্গীকারবদ্ধ রইলাম আমাদের সমিতি তার সমস্ত শাখা সংগঠন ও সহযোগী সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে আপনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়বে ।

৬। গণ-সংগঠণগুলোর কর্মীদের এমনভাবে তৈরি করতে হবে, এবং এমন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এগুতে হবে যাতে নেতৃত্বের চ্যূতি, ভ্রান্তি বা বিপথগামীতার ক্ষেত্রে সদস্যরা নেতাদের সমালোচনা করতে পিছ-পা না হয় ।

৭। সমালোচনা যিনিই করবেন তাঁকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে সমালোচনার লক্ষ্য যেন হয় সংগঠনের উন্নতি এবং আন্দোলনের শ্রীবৃদ্ধি ।

সমালোচনা হবে খোলাখুলি এবং অবশ্যই সংগঠনের মধ্যে। কোনও বিষয়ে আলোচনায় মতপার্থক্য অবশ্যই থাকতে পারে। শেষ পর্যন্ত সংগঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের মতামতই প্রত্যেককে মেনে চলতে হবে সংগঠনের স্বার্থে। সংগঠনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই শুধু নিজস্ব মতামত থাকতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর সংগঠনের বাইরে কেউ এই বিষয়ে সমালোচনা করলে সেটা সংগঠন-বিরোধী কাজ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত। সংগঠনের বাইরে সামালোচনাকারীকে প্রয়োজনে সংগঠনের স্বার্থেই সংগঠন থেকে বের করে দিতে হবে, তা সেই সমালোচক সংগঠনের যত উচ্চ-পদাধিকারীই হোন না কেন ।

মধ্যবিত্তসুলভ মানসিকতার দরুণ অনেক সময়ই সমালোচনা হয়ে পড়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন ; কখনও সমালোচনা উঠে আসে ব্যক্তিত্বের সংঘাত থেকে, কখনও ঈর্ষাপরায়ণতা থেকে। সমালোচনা হওয়া উচিত সংগঠনের স্বার্থে ইতিবাচক। শুধুমাত্র নেতিবাচক বা নাকচ করে দেবার সমালোচনা অর্থহীন হয়ে পড়ে, যদি না পরবর্তী পথনির্দেশ দেওয়া হয়। দায়িত্বজ্ঞানহীন সমালোচনা সংস্থায় বিশৃঙ্খলাই শুধু টেনে আনতে পারে।

৮। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বিষয়ে স্পষ্ট স্বচ্ছ ধারণা থাকলে কোনও শক্তির সাধ্য নেই মগজ ধোলাই করে বিপথে চালিত করে। সংগঠনের প্রয়োজনেই নেতৃত্বের অবশ্য কর্তব্য আন্দোলনকর্মীদের ধাপে ধাপে শিক্ষিত, নিবেদিতপ্রাণ করে তুলে প্রত্যেককে এক একজন সংগঠক, সংগ্রামী করে তোলা। তাঁদের দৃঢ় মতাদর্শগত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া। মতাদর্শগত ভিতই উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যের দিকে আন্দোলনকর্মীদের চালিত করবে ।

৯। সংগঠন যাঁদের নিয়ে গড়ে উঠবে তাঁরাই সংগঠনকর্মী বা আন্দোলনকর্মী। আর নেতা তিনি, যিনি নিজে যে কোনও ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং আন্দোলনকর্মীদের বিশ্লেষণ-পরবর্তী করণীয় বিষয়ে সঠিক নির্দেশ দিতে সক্ষম। এরই পাশাপাশি নেতাকে হতে হবে সৎ, আবেগহীন, আত্মবিশ্বাসী, বিনয়ী, জনসাধারণের সঙ্গে আন্তরিকভাবে মিশতে সক্ষম, আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বিষয়ে সচেতন ও কৌশলগত দিক বিষয়ে ওয়াকিবহাল।

ভারি ভারি নাম বা বড় বড় ডিগ্রী দেখে নেতা বাছবেন না। নেতা বাছুন কাজে মানুষ বিচার করে। যে যত বেশি দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবে, যত বেশি আন্তরিক হবে, ততই সে অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্যে দিয়েই নেতৃত্বের গুণগুলোকে অতি স্বাভাবিকভাবেই অর্জন কবে নেবে।

১০। আন্দোলনকর্মীদের মধ্যে অনেক সময়ই এই জিজ্ঞাসা দেখা দিতে পারে— আমাদের আন্দোলনকে আঘাত করতে যদি রাষ্ট্রশক্তিই হাজির হয, তবে কী আমরা আন্দোলনকে শেষ জয় এনে দিতে পারব ? অথবা কখনও যদি এমন প্রশ্ন হাজিব হয়, গোটা ভারত বা গোটা পৃথিবীর মানুষ কুসংস্কারমুক্ত হয়ে তাদের শোষণের পদ্ধতিগুলো ধরে ফেলে বর্তমান সমাজ-কাঠামোটাই পাল্টে দিতে লড়াইয়ে সামিল হবে, অধিকার ছিনিয়ে নিতে সোচ্চার হবে– এ এক অবাস্তব কল্পনা নয় তো? তখন প্রশ্নকর্তাদের দৃষ্টির কুয়াশা কাটিয়ে আলো দেখাতে দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরুন আমাদেরই দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠির সংগ্রামী ইতিহাস। বুঝিয়ে দিন আন্দোলনের শরিক যেখানে কোনও জনগোষ্ঠির বৃহত্তর অংশ, সেখানে আন্দোলন শেষ করার সাধ্য পৃথিবীব কোনও রাষ্ট্রশক্তিরই নেই। একটি অঞ্চলের জনগোষ্ঠিকে যুক্তিবাদী চেতনার আলোকে আলোকিত করা নিশ্চয়ই অসম্ভব কোনও কাজ নয়। কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করুন ; আন্দোলনকর্মীরা উদ্দীপ্ত হলে জনগণকে সচেতন করা, সংগঠিত করার কাজটা অতি সহজ হয়ে যায়।’

১১। সাধারণ ভাবে ধর্ম ধর্মনিরপেক্ষতা, দেশপ্রেম, বিছিন্নতাবাদ, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিষয়ে যে সব ধ্যান ধারণা শোষকশ্রেণী তাদের তাঁবেদার রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও প্রচার মাধ্যমগুলোর সাহায্যে প্রচার করে চলেছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা যুক্তি হাজির করুন। ওদের যুক্তিকে সুযোগ পেলেই আক্রমণ চালিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক চিন্তাগুলো পৌঁছে দেবার চেষ্টা করুন। এতদিনকার কুযুক্তির বিরুদ্ধে কোনও সুযুক্তি হাজির হয়নি বলেই সাধারণ মানুষ মগজ ধোলাইয়ের শিকার হয়েছেন। সুযুক্তি পেলে সাধারণ মানুষ তা অবশ্যই গ্রহণ করেন, আমাদের সমিতির অভিজ্ঞতা তাই বলে।

১২। শুধু নাকচ বা বর্জনের ওপর কোনও কিছুর স্থায়ী ভিত গড়ে উঠতে পারে না। বর্তমান সমাজের নেতিবাচক দিকগুলোর নিশ্চয়ই সমালোচনা করতে হবে, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে, জনমত গড়তে হবে। কিন্তু তারই পাশাপাশি ইতিবাচক, গঠনমূলক পথও দেখাতে হবে।

আমাদের অশ্রদ্ধা পুরনো সবকিছুর প্রতি নয়, আমাদের
অশ্রদ্ধা যুক্তিহীনতার প্রতি। আমাদের শ্রদ্ধা যা নতুন তার
প্রতি নয়, আমাদের শ্রদ্ধা যুক্তির প্রতি।

১৩। যুক্তিবাদী আন্দোলন সঠিক পথে চললে যাদের স্বার্থে এই আন্দোলন আঘাত করবে তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। তারা প্রত্যাঘাত হানবেই। এই প্রত্যাঘাত বোঝার সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষ। তারই পাশাপাশি একথাও মনে রাখতে হবে সংগঠন যদি বাস্তবিকই সংগ্রামী মানুষদের নেতৃত্ব দিতে যায়, তবে সেই সংগঠনের অনেক কিছুর ক্ষেত্রে অবশ্যই গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।

গোপন সংগঠন সম্পর্কে একটা অদ্ভুত ধারণা সাধারণের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন সংগঠনের কয়েকজন নেতা আত্মগোপন করলেই বুঝি ‘গোপন সংগঠন’ হয়। গোপন সংগঠন চোরের মতন লুকিয়ে লুকিয়েও করতে হয় না । সংগঠনের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য এ-সব কোনও কিছুরই প্রয়োজন হয় না। বরং সাধারণভাবে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীরা আত্মগোপন করলে সাধারণ কর্মীদের থেকে তাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আর আত্মগোপনকারী নেতা গণ-সংগঠনের কাজ চালাতে গেলে ধরা পড়বেনই। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবী, সংবাদিক, সাহিত্যিক ইত্যাদি বহু পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য একদল কর্মী তৈরি করতে হবে। এঁরা বিভিন্ন পেশার মানুষ হতে পারেন, এঁদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে প্রতিটি লড়াইতে জনসমর্থন পাওয়া সহজতর হবে ।

১৪। গণ-সংগঠন সর্বস্ব আন্দোলনের ক্ষেত্রে যে-সব অসুবিধে দেখা দিতে পাৱে, সেগুলো নিয়েও অবশ্যই সচেতন থাকা প্রয়োজন :

ক) আন্দোলন তীব্রতর হলে শোষক ও শাসকশ্রেণী সমস্ত গণ-সংগঠনগুলোকেই চরবৃত্তির কাজে লাগাতে চেষ্টা করে। গণ-সংগঠনের নেতাদেব লোভ, ভয়, ইত্যাদির দ্বারা কিনে ফেলার চেষ্টা চলে।

খ) গণ-সংগঠনের অনেক নেতৃত্বই কম ত্যাগ ও কম ঝুঁকি নিয়ে বেশি রকম আত্মপ্রচারে উৎসাহী হয়ে পড়ে ।

গ) সরকারী-বেসরকারী সাহায্য ও প্রচারের মোহে বাঁধা পড়ে অনেক নেতৃত্বই কথায় ও কাজে দুই মেরুতে অবস্থান করতে শুরু করেন। নেতা বিক্রী হয়ে যাওয়ায় সংগঠন ভুল পথে চালিত হতে থাকে, প্রকৃত আন্দোলনের শত্রুতা করতে থাকে।

ঘ) গণ-সংগঠনের নেতারা অনেক সময় যুক্তিবাদী আন্দোলনের আদর্শগত দিকটা আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ না করে কিছুটা হুজুগেও যুক্তিবাদী আন্দোলনের শরিক হতে এগিয়ে আসতে পারে। আর হুজুগে আন্দোলনে ঢুকে পড়া গণ-সংগঠনের নেতারা যা খুশি তাই করে ফেলতে পারে।

১৫। আন্দোলনের স্বার্থে সমমনোভাবাপন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিজ্ঞান ক্লাব, যুক্তিবাদী আনেদালনে সামিল সংস্থাগুলোর উচিত নিজেদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা। সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধিত হলে প্রতিটি আক্রমণের, প্রতিটি সমস্যার মোকাবিলায় সমস্ত সংগঠন একত্রিত হতে পারবে অতি দ্রুত। সকলে কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে লড়লে লড়াই জেতা, সমস্যা ডিঙিয়ে যাওয়া সহজতর হয়।

ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি বহু সংগঠনের সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। আরও বেশি বেশি করে সংগঠন এগিয়ে এলে প্রত্যেকের কাছেই উদ্দেশ্য পৌঁছন সহজতর হবে।

কোনও সংগঠনের স্বাধীনতায় হাত না দিয়েই যুক্তিবাদ প্রসার, কুসংস্কার-মুক্তি, মরণোত্তর দেহদান, স্বাক্ষরদান, প্রগতিশীল নাটক, গান এবং আরো কিছু ‘কমন’ কর্মসূচীর ভিত্তিতে আমরা একত্রিত হয়েছি। আমাদের সম্মিলিত ও পরিকল্পিত প্রয়াসই এমন একটা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে, যাতে বর্তমান সমাজের মূল কাঠামোই আন্দোলিত হতে পারে, নাড়া খেতে পারে। আর তারপর আন্দোলনে সামিল জনগণই সৃষ্টি করবে এক নতুন ইতিহাস, জাগরণের ইতিহাস ।

১৬। যুক্তিবাদী আন্দোলনকে জোরদার করতে আসুন না কেন, প্রতিটি যুক্তিবাদী আন্দোলন প্রসারকামী মানুষ ও সংস্থা বছবের একটি দিনকে, ১ মার্চ দিনটিকে ‘যুক্তিবাদী দিবস’ হিসেবে পালন করে যুক্তিবাদী আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত করি। এই দিনটিতে আমরা প্রতেকে অন্ততঃ সংস্কার মুক্তির সহায়ক, যুক্তি নির্ভর কিছু লিখি, কিছু পড়ি, অথবা কিছু আলোচনা করি। সাংস্কৃতিক আন্দেলনে অগ্রনী সংস্থাগুলো ওই দিনটিতে নানা ধরণের কার্যক্রম গ্রহণ করে নিশ্চয়ই যুক্তিবাদী আন্দোলনে প্রচন্ড গতি সঞ্চার করতে পারি। ‘৯২-এর ১ মার্চ ভারত ও বাংলাদেশের এক হাজারটির ওপর সংস্থা ‘যুক্তিবাদী দিবস’ পালন করবে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের যুক্তিবাদী মানুষও ওই দিনটি ‘যুক্তিবাদী দিবস’ হিসেবে পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আপনি আমিই পারি ১ মার্চকে আক্ষরিক অর্থে ‘আন্তর্জাতিক যুক্তিবাদী দিবস’ করে তুলতে।

আমি অতি-সচেতনভাবেই মনে করি, এ-দেশের বর্তমান সমাজের হুজুর-মজুর সম্পর্কযুক্ত ব্যবস্থাই আমাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা। আর এই শোষক-শোষিতের সামাজিক কাঠামো টিকে রয়েছে মানুষের অন্ধ-বিশ্বাস, কুসংস্কার ও অসংস্কৃতির এক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করে, তাকে পরিপুষ্ট করে। সমাজ-বিজ্ঞান ও বাস্তব-ঐতিহাসিক পরিস্থিতি নিয়ে সুগভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এই সত্যটি অবশ্যই বেরিয়ে আসে — অন্ধ বিশ্বাসজাত কুসংস্কার ও অসংস্কৃতির পরিমণ্ডল অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে এদেশের আর্থিক কাঠামো এবং শোষক-শোষিতের শ্রেণীবিন্যাসের সঙ্গে, এবং এরা পরস্পর পরস্পরের পরিপূরকও বটে। অর্থাৎ এ-দেশের আর্থিক কাঠামোকে নিম্নস্থ কাঠামো বা ভিত্তি-কাঠামো

(infrastructure) আর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকে উপরি কাঠামো (superstructure) বলে ভাবলে ভুলই ভাবা হবে। অন্ধ-বিশ্বাস ও কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে উঠে আসা ভ্রান্ত-চেতনাপ্রসূত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো এ-দেশে অবশ্যই ভিত্তি-কাঠামোর সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকার প্রসঙ্গ ‘অলৌকিক নয, লৌকিক’ বইটির তিনটি খণ্ডেই ঘুরে-ফিরে বারবার এসেছে ; এত যুক্তি হাজির হয়েছে যে আবাব নতুন করে এই বক্তব্যের সমর্থনে যুক্তি হাজির করার অর্থ হয়ে দাঁড়ায়—পাঠক-পাঠিকাদের বোধশক্তির প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করা। এই তিন খণ্ড আলোচনার শেষে নিশ্চয়ই এখন আমরা সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি –

হুজুর-মজুর সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে নতুন সমাজ গঠনের
আগে এবং পরে এ-দেশে সাংস্কৃতিক বিপ্লব একইভাবে
প্রয়োজনীয়: প্রগতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং ধরে
রাখতেই এর প্রয়োজন ।

কোনও কোনও পাঠক-পাঠিকার মনে হতে পারে ‘কিছু কথা’ শিরোনামে লেখা ভূমিকাটিতে ‘মগজ ধোলাই’ প্রসঙ্গ নিয়ে এত বিস্তৃত আলোচনা কতটা প্রাসঙ্গিক ? যুক্তিবাদী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবার তাত্ত্বিক ও প্রয়োগ-কৌশল নিযে আলোচনাকে টেনে আনাই বা কতটা সঙ্গত হয়েছে ? শ্রদ্ধেয় পাঠক-পাঠিকাদের কারো কাছে এমন আলোচনা ধৈর্য-চ্যুতি ঘটিয়ে থাকলে আস্তবিকতার সঙ্গে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি; সেই সঙ্গে কৈফিয়ৎ হিসেবে জানাচ্ছি, ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ বইটিকে শুধুমাত্র অলৌকিক বহস্য-জাল ছিন্ন করার তথ্যে ঠাসা বই করতে চাইনি। আমার চাওয়াটা এর চেয়ে আরও কিছু বেশি। তাই যুক্তিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলাব স্বার্থে যে বিষয়গুলো নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করা একান্ত প্রয়োজন মনে করেছি, যে বিষয়গুলো নিয়ে স্পষ্ট ও স্বচ্ছ ধারণা থাকা একান্তই আবশ্যক বিবেচনা করেছি, সে-সব বিষয়ের অনেক কিছুই ‘কিছু কথা’য় এনেছি; বাকি আনব পরবর্তী খণ্ডেও। প্রথম খণ্ডের ‘কিছু কথা’ দিয়ে যে সচেতন পরিক্রমা শুরু করেছি, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ডের ‘কিছু কথা’ তাব সঙ্গে একান্তভাবেই সম্পর্কযুক্ত।

আমার লেখা থেকে তাত্ত্বিক ও প্রযোগের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সহযোদ্ধারা উপকৃত হলে আমিই হবো পৃথিবীর সুখীতম মানুষ ।

আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই এ-দেশ ও এ-দেশের বাইবের সহযোদ্ধা ও সহমতের সাথীদের। কৃতজ্ঞতা জানাই তাঁদের উদ্দেশ্যেও, যাদের প্রতিটি যোগাযোগ, প্রতিটি উষ্ণ অভিনন্দন, প্রতিটি গঠনমূলক সমালোচনা, প্রতিটি উপদেশ, প্রতিটি সাহায্য ও সহযোগিতা আমাকে ও সমিতিকে এগিয়ে যেতে প্রেরণা দিয়েছে, সাহস জুগিয়েছে, গতিশীল রেখেছে।

ক্ষমাপ্রার্থী তাঁদের কাছে, যাঁদের কাছ থেকে নিয়েছিই শুধু, কিন্তু দিতে পারিনি চিঠির উত্তরটুকুও। পত্র-লেখক-লেখিকাদের কাছে বিনীত অনুরোধ- চিঠির সঙ্গে অনুগ্রহ কবে একটি জবাবী খামও পাঠাবেন।

এমন কিছু চিঠির উত্তর দিতে পারিনি, যার উত্তরে বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজন ছিল, যা চিঠির স্বল্প পরিসরে সম্ভব ছিল না। পরবর্তী খণ্ডে সে-সব উত্তর নিয়ে নিশ্চয়ই হাজির হবো।

সংগ্রামেব সাথী, প্রেরণার উৎস প্রত্যেককে জানাই সংগ্রামী অভিনন্দন।

যুক্তিবাদী আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন জয়যুক্ত হবেই ।

প্রবীর ঘোষ

৭২/৮ দেবীনিবাস বোড

কলকাতা-৭০० ০৭৪