তৃতীয় অধ্যায়ঃ

কর্ম-যোগ

শ্লোকঃ ০১

অর্জুন উবাচ

জ্যায়সী চেৎ কর্মণস্তে মতা বুদ্ধির্জনার্দন।

তৎ কিং কর্মণি ঘোরে মাং নিয়োজয়সি কেশব ।। ০১ ।।

অর্জুনঃ উবাচ- অর্জুন বললেন; জ্যায়সী- শ্রেয়তর; চেৎ- যদি; কর্মণঃ- সকাম কর্ম অপেক্ষা; তে- তোমার; মতা- মতে; বুদ্ধিঃ- বুদ্ধি; জনার্দন- হে শ্রীকৃষ্ণ; তৎ- তা হলে; কিম- কেন; কর্মণি- কর্মে; ঘোরে- ভয়ানক; মাম- আমাকে; নিয়োজয়সি- নিযুক্ত করছো; কেশব- হে শ্রীকৃষ্ণ।

গীতার গান

অর্জুন কহিলেনঃ

যদি বুদ্ধিযোগ শ্রেষ্ঠ ওহে জনার্দন।

ঘোর যুদ্ধে নিয়োযিত কর কি কারণ।।

অনুবাদঃ অর্জুন বললেন- হে জনার্দন। হে কেশব। যদি তোমার মতে কর্ম অপেক্ষা ভক্তি-বিষয়িনী বুদ্ধি শ্রেয়তর হয়, তা হলে এই ভয়ানক যুদ্ধে নিযুক্ত হওয়ার জন্য কেন আমাকে প্ররোচিত করছো?

তাৎপর্যঃ পূর্ববর্তী অধ্যায়ে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর প্রিয় সখা অর্জুনকে জড় জগতের দুঃখার্ণব থেকে উদ্ধার করবার জন্য আত্মার স্বরূপ বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন এবং সেই সঙ্গে তিনি আত্মার স্বরূপ উপলব্ধি করার পন্থাও বর্ণনা করেছেন- সেই পথ হতে বুদ্ধিযোগ অর্থাৎ কৃষ্ণভাবনা। কখনো কখনো এই বুদ্ধিযোগের কদর্থ করে একদল নিষ্কর্মা লোক কর্ম-বিমুখতার আশ্রয় গ্রহণ করে। কৃষ্ণভাবনার নাম করে তারা নির্জনে বসে কেবল হরি নাম জপ করেই কৃষ্ণভাবনাময় হয়ে ওঠার দুরাশা করে। কিন্তু যথাযথভাবে ভগবৎ-তত্ত্বজ্ঞানের শিক্ষালাভ না করে নির্জনে বসে কৃষ্ণনাম জপ করে নিরীহ, অজ্ঞ লোকের সস্তা বাহবা পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু তাতে কোন লাভ হয় না। অর্জুনও প্রথমে বুদ্ধিযোগ বা ভক্তিযোগকে কর্মজীবন থেকে অবসর নেবার নামান্তর বলে বিবেচনা করেছিলাম এবং মনে করেছিলেন, নির্জন অরণ্যে কৃচ্ছ্রসাধনা ও তপশ্চর্যার জীবনযাপন করবেন। পক্ষান্তরে, তিনি কৃষ্ণভাবনার অযুহাত দেখিয়ে সুকৌশলে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ থেকে নিরস্ত্র হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিষ্ঠাবান শিষ্যের মতো যখন তিনি তাঁর গুরুদেব ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে তাঁর কর্তব্য সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন, তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই তৃতীয় অধ্যায়ে তাঁকে কর্মযোগ বা কৃষ্ণভাবনাময় কর্ম সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করে শোনান।

শ্লোকঃ ০২

ব্যামিশ্রেণেব বাক্যেন বুদ্ধিং মোহয়সীব মে।

তদেকং বদ নিশ্চিত্য যেন শ্রেয়োহহমাপ্নুয়াম ।। ০২ ।।

ব্যামিশ্রেণ- দ্ব্যর্থবোধক; ইব- যেন; বাক্যেন- বাক্যের দ্বারা; বুদ্ধিম- বুদ্ধি; মোহয়সি- মোহিত করছো; ইব- মতো; মে- আমার; তৎ- অতএব; একম- একমাত্র; বদ- দয়া করে বল; নিশ্চিত্য- নিশ্চিতভাবে; যেন- যার দ্বারা; শ্রেয়ঃ- প্রকৃত কল্যাণ; অহম- আমি; আপ্নুয়াম- লাভ করতে পারি।

গীতার গান

দ্ব্যর্থক কথায় বুদ্ধি মোহিত যে হয়।

নিশ্চিত যা হয় কহ শ্রেয় উপজয়।।

অনুবাদঃ তুমি যেন দ্ব্যর্থবোধক বাক্যের দ্বারা আমার বুদ্ধি বিভ্রান্ত করছো। তাই, দয়া করে আমাকে নিশ্চিতভাবে বল কোনটি আমার পক্ষে সবচেয়ে শ্রেয়স্কর।

তাৎপর্যঃ ভগবদগীতার ভূমিকাস্বরূপ পূর্ববর্তী অধ্যায়ে সাংখ্য-যোগ, বুদ্ধিযোগ, ইন্দ্রিয়-সংযম, নিষ্কাম কর্ম, কনিষ্ঠ ভক্তের স্থিতি আদি বিভিন্ন পন্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেগুলি সবই অসম্বন্ধভাবে পরিবেশিত হয়েছিল। কর্মদ্যোগ গ্রহণ এবং উপলব্ধির জন্য যথাযথ পন্থা-প্রণালী সম্পর্কিত বিশেষভাবে সুবিন্যস্ত নির্দেশাবলী একান্ত প্রয়োজন। সুতরাং, ভগবানেরই ইচ্ছার ফলে অর্জুন সাধারণ মানুষের মতো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাঁকে নানা রকম প্রশ্ন করেছেন, যাতে সাধারণ মোহাচ্ছন্ন মানুষেরাও ভগবানের উপদেশাত্মক বাণীর যথাযথ অর্থ উপলব্ধি করতে পারে। ভগবৎ-তত্ত্বের যথার্থ অর্থ না বুঝতে পেরে অর্জুন বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। কুতার্কিকদের মতো কথার জাল বিস্তার করে ভগবান অর্জুনকে বিভ্রান্ত করতে চাননি। নিষ্ক্রিয়তা অথবা সক্রিয় সেবা- কোনভাবেই অর্জুন কৃষ্ণভাবনাময় পথ সুগম করে তোলার উদ্দেশ্যে ভগবানের অনুপ্রেরণায় অর্জুন নানা রকম প্রশ্নের অবতারণা করেছেন, যাতে ভগবদগীতার রহস্য উপলব্ধি করার জন্য যারা গভীরভাবে আগ্রহী, তাঁদের সুবিধা হয়।

শ্লোকঃ ৩

শ্রীভগবানুবাচ

লোকেহস্মিন দ্বিবিধা নিষ্ঠা পুরা প্রোক্তা ময়ানঘ।

জ্ঞানযোগেন সাংখ্যানাং কর্মযোগেন যোগিনাম ।। ৩।।

শ্রীভগবান উবাচ- পরমেশ্বর ভগবান বললেন; লোকে- জগতে; অস্মিন- এই; দ্বিবিধা- দুই প্রকার; নিষ্ঠা- নিষ্ঠা; পুরা- ইতিপূর্বে; প্রোক্তা- উক্ত হয়েছে; ময়া- আমার দ্বারা; অনঘ- হে নিষ্পাপ; জ্ঞানযোগেন- জ্ঞানযোগের দ্বারা; সাংখ্যানাম- অভিজ্ঞতালব্ধ দার্শনিকদের; কর্মযোগেন- ভগবানে অর্পিত নিষ্কাম কর্মযোগের দ্বারা; যোগিনাম- ভক্তদের।

গীতার গান

শ্রীভগবান কহিলেনঃ

দ্বিবিধ লোকের নিষ্ঠা বলেছি তোমারে।

সাংখ্য আর জ্ঞানযোগ যোগ্য অধিকারে।।

অনুবাদঃ পরমেশ্বর ভগবান বললেন- হে নিষ্পাপ অর্জুন! আমি ইতিপূর্বে ব্যাখ্যা করেছি যে, দুই প্রকার মানুষ আত্ম-উপলব্ধি করতে চেষ্টা করে। কিছু লোক অভিজ্ঞতালব্ধ দার্শনিক জ্ঞানের আলোচনার মাধ্যমে নিজেকে জানতে চান এবং অন্যেরা আবার তা ভক্তির মাধ্যমে জানতে চান।

তাৎপর্যঃ দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৩৯তম শ্লোকে ভগবান সাংখ্য-যোগ ও কর্মযোগ বা বুদ্ধুযোগ- এই দুটি পন্থার ব্যাখ্যা করেছেন। এই শ্লোকে ভগবান তারই বিশাদ ব্যাখ্যা করেছেন। সাংখ্য-যোগ চেতন ও জড়ের প্রকৃতির বিশ্লেষণমূলক বিষয়বস্তু। যে সমস্ত মানুষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দার্শনিক তত্ত্বের মাধ্যমে জ্ঞান আহরণ করতে চায়, তাদের বিষয়বস্তু হচ্ছে এই সাংখ্য-যোগ। অন্য পন্থাটি হচ্ছে কৃষ্ণভাবনা বা বুদ্ধিযোগ, যা দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৬১তম শ্লোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ভগবান ৩৯তম শ্লোকেও ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই বুদ্ধিযোগ বা কৃষ্ণভাবনা অনুশীলন  করলে অতি সহজেই কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায় এবং অধিকন্তু এই পন্থায় কোন দোষ-ত্রুটি নেই। ৬১তম শ্লোকে ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করাই হচ্ছে বুদ্ধিযোগ এবং তার ফলে দুর্দমনীয় ইন্দ্রিয়গুলি অতি সহজেই সংযত হয়।, তাই, এই দুটি যোগই ধর্ম ও দর্শনরূপে একে অপরের উপর নির্ভরশীল। দর্শনবিহীন ধর্ম হচ্ছে ভাবপ্রবণতা বা অন্ধ গোঁড়ামি, আর ধর্ম বিহীন দর্শন হচ্ছে মানসিক জল্পনা-কল্পনা। অন্তিম লক্ষ্য হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, কারণ যে সমস্ত দার্শনিকেরা বা জ্ঞানীরা গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে পরম সত্যকে জানবার সাধনা করছেন, তাঁরাও অবশেষে কৃষ্ণভাবনায় এসে উপনীত হন। ভগবদগীতায়ও এই কথা বলা হয়েছে। সমগ্র পন্থাটি হচ্ছে পরমাত্মার সঙ্গে সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে আত্মার স্থিতি হৃদয়ঙ্গম করা। পরোক্ষ পন্থাটি হচ্ছে দার্শনিক জল্পনা-কল্পনা, যার দ্বারা ক্রমান্বয়ে সে কৃষ্ণভাবনামৃতের স্তরে উপনীত হতে পারে; আর অন্য পন্থাটি হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে পরম সত্য, পরমেশ্বর বলে উপলব্ধি করে তাঁর সঙ্গে আমাদের সনাতন সম্পর্কের প্রতিষ্ঠা করা। এই দুটির মধ্যে কৃষ্ণভাবনার পন্থাই শ্রেয়, কেন না এই পন্থা দার্শনিক জল্পনা-কল্পনার মাধ্যমে ইন্দ্রিয়গুলির শুদ্ধিকরণের উপর নির্ভরশীল নয়। কৃষ্ণভাবনামৃত স্বয়ং শুদ্ধিকরণের পন্থা এবং কৃষ্ণভাবনার অমৃত প্রবাহ স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে অন্তরকে কলুষমুক্ত করে। ভক্তি নিবেদনের প্রত্যক্ষ পন্থারূপে এই পথ সহজ ও উচ্চস্তরের।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x