কবিতা কি ছেড়ে যাচ্ছে তাকে? বেশ কয়েক মাস হাসান কবিতা লিখতে গিয়ে শুধুই কাটাকুটি করে, ভেতরে কিছুই রূপায়িত হয় না, সেগুলো বাস্তবায়িত করতে গেলে দেখে শুধুই জীর্ণতা; সে পাতার পর পাতা ছিঁড়ে ফেলতে থাকে, ছেঁড়ার শব্দটা বিস্ফোরণের মতো মনে হয়, যেনো সব কিছু কেঁপে উঠছে, শেষে ছিঁড়ে না ফেলে রেখে দেয়–এই আক্রান্ত পাতাগুলো আমার এ-সময়ের ইতিহাস আমার জীবনী; কবিতা লিখতে না পেরে বাঙলা কবিতার সীমাবদ্ধতা পদ্যতা গদ্যতা সম্পর্কে একটি প্রবন্ধের খসড়া তৈরি করে সে, কিন্তু প্ৰবন্ধটি কখনো লিখে ওঠে না; তার ক্ষুধা জাগে এমন একটি বই পড়তে, যা সমাজ নয় জীবন নয় রাজনীতি নয় নৈতিকতা নয়। দুঃখ নয় সুখ নয়, যা শুধুই সাহিত্য শুধুই শিল্পকলা; এমন একটি বইয়ের জন্যে সে বইয়ের দোকানে দোকানো যেতে থাকে, কোনো ভাষায়ই এমন কোনো বই নেই, যা বিশুদ্ধ এবং যা সে পড়তে পারে। ভাষার মধ্যেই কি রয়েছে কোনো অবিশুদ্ধতা, ভাষাই কি বিশুদ্ধতার বিরোধী? অনির্বাচন নিঃশব্দতাই শুধু বিশুদ্ধ? বাস্তবায়ন অবিশুদ্ধ? সে কি পড়বে। নিঃশব্দতাকে? না কি জীবনই অবিশুদ্ধ? জীবনের কোনো উপস্থাপনের পক্ষে বিশুদ্ধ হওয়া অসম্ভব? মুদ্রিত কিছুই পড়ার যোগ্য নয়, কিছুই বিশুদ্ধ নয়- সবই জীবনের রক্তে মাংসে পুঁজে ক্লেদে বোঝাই; তাকে এসব থেকে দূরে থাকতে হবে, সে এমন কিছু চায় যা বিশুদ্ধ শিল্পকলা। তার ইচ্ছে হয় বিশুদ্ধ গণিত পড়তে, কিন্তু হায়, গণিত তার জগতের বাইরে, সে ওই বিশুদ্ধতার বাইরে।

তার মনে দিনের পর দিন উড়তে ভাসতে কাঁপতে জ্বলতে থাকে ছেঁড়াছেঁড়া ভাবনা। এগুলো কী উড়ছে? কী ভাসছে? কী কাঁপছে? কী জ্বলছে? কী দেখা দিচ্ছে তার ভেতর থেকে? কখনো তার মনে হয় চমৎকার, কখনো মনে হয় দুঃস্বপ্নের উড়ন্ত এলোমেলো তত্ত্বজাল, যা আকাশ ভরে উড়ছে। তার ভেতরটা কি সুস্থ নেই? তার ভেতরে একটি ন্যাংটো পাগল মনের সুখে গান গাইছে? বাইরে তো সে বেশ আছে; প্রচুর অ্যাড সংগ্ৰহ ক’রে ফেলছে। অ্যান্ড ২০০০-এর জন্যে, তার ফোনে এখন কাজ হয়, সে এখন দায়িত্বশীল প্রাজ্ঞ ব্যবস্থাপক, পরামর্শ দিচ্ছে সে বিজ্ঞের মতো; কিন্তু তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে এ কী দুঃস্বপ্নগ্ৰস্ত অসহ্য ঝরনাধারা বিষাক্ত অমৃতস্রোত? না, সে আয়নায় নিজের সুখ চিনতে পারে, অচেনা মনে হয় না; আয়নায় নিজের মুখ দেখে সালাম দেয় না; না, তার মগজটি এলোমেলো হয়ে যায় নি; নিজের নাম তার মনে আছে, এমন কি পিতার নামটিও সে মনে করতে পারে। সে কি এগুলো লিখে ফেলবে? যখন কবিতা আসছে না, এগুলো কি তখনকার কবিতা? এগুলো লিখে ফেলা কি ঠিক হবে? বাঙলার কৃষকসমাজ কি এগুলো মেনে নেবে? কৃষকরা তো সব সময় পবিত্র জিনিশ চায়, মহৎ জিনিশ চায়, এগুলো তো তেমন পবিত্র নয় মহৎ নয়।

তার মনে যা আসে তাই একটি দুটি বাক্যে লিখে রাখতে শুরু করে সে।

এক সুন্দর পাগলামো তাকে পেয়ে বসে। টুকরো টুকরো বাক্য, ছেঁড়াছেঁড়া কথা তাকে না জানিয়েই ভেতর থেকে উঠে আসছে, না ভেবেই সে লিখে ফেলছে, প’ড়ে দেখছে না কী লিখছে। এগুলোর কী নাম দেয়া যায়? ‘ছেঁড়াছেঁড়া দুঃস্বপ্ন’? ‘শিল্পকলার পরাদর্শন’? ‘কবির মত্ত নন্দনতত্ত্ব’? ‘হাসান রশিদের উন্মত্ততাসমগ্র’? কী নাম দেয়া যায়?

সে এগুলোর নাম দেয় ‘স্বতঃস্ফুর্ত ঝরনাধারা’। এগুলোর জন্যে একদিন সে নিন্দিত হবে নিশ্চয়ই; আদিগন্ত মূর্খ পিউবিক হেয়ার ড্রেসারগুলো— তিন অক্ষরের পিএইচডিগুলো একদিন বড়ো বড়ো অক্ষরে লিখতে থাকবে হাসান রশিদ জীবনবিরোধী ছিলেন, কবি আব্বদুল আল্লির মতো তিনি জীবনমুখি ছিলেন না; হাসান রশিদ তাই নিন্দারযোগ্য।

শিল্পকলা হচ্ছে রক্তমাংসের বিপরীত; রক্তমাংস অশুদ্ধ শিল্পকলা বিশুদ্ধ।

তারাই প্রকৃত শহিদ, মৃত্যুবরণ করে যারা শিল্পকলার জন্যে, তারাই শুধু সৎ কারণে শহিদ হয় এবং বুঝতে পারে কেনো শহিদ হলো; অন্য শহিদেরা বুঝতে পারে না তারা কেনো মৃত্যুকে বেছে নিলো।

যা রক্তমাংস থেকে যতো দূরবতী তা ততো বেশি শিল্পকলা।

রক্তমাংস ও শিল্পকলার সহাবস্থান অসম্ভব, শুদ্ধতা ও অশুদ্ধতা একসাথে থাকতে পারে না। শিল্পকলা শুদ্ধ, রক্তমাংস অশুদ্ধ।

মানুষের পক্ষে শিল্প সৃষ্টি অসম্ভব, মানুষ শিল্পকলার নামে সৃষ্টি করে ভিন্ন ধরনের রক্তমাংস।

রক্তমাংসের পর আবার রক্তমাংস হাস্যকর।

সঙ্গম ও শিল্পসৃষ্টি সম্পূর্ণ বিপরীত; সঙ্গম সৃষ্টি করে নশ্বরতা, শিল্পকলা সৃষ্টি করে অবিনশ্বরতা।

শিল্পীকে হতে হবে নপুংসক, মাংসের শত্রু।

জনগণ শিল্পকলার বিপরীত; জনগণ হচ্ছে মাংস, লিঙ্গ, ক্ষুধা।

জনগণ এক টুকরো বাসি মাংস চায়, ‘অর্কেস্ট্রা’ চায়না, ‘অবসরের গান’ চায় না; তাই ‘অর্কেস্ট্র’ আর ‘অবসরের গান’ কবিতা বা শিল্পকলা।

মানুষের উৎপত্তি কদৰ্য ক্রীড়া থেকে, শিল্পকলার উৎপত্তি শুদ্ধতা থেকে।

সবচেয়ে ঘূণ্য হচ্ছে কাম, পবিত্র হচ্ছে কবিতা, যাতে কোনো রক্তমাংস নেই।

কাম কদৰ্য, শিল্পকলা শুদ্ধ।

লিঙ্গহীন পুরুষ আর লিঙ্গহীন নারী শিল্পকলার কাছাকাছি।

কবিকে হ’তে হবে ব্যাকরণবিদ, ব্যাকরণবিদ নয় ব’লে বাঙলার কবিরা কবি নয়, কবিয়াল।

উপন্যাস রক্তমাংস, তাই উপন্যাস শিল্পকলা নয়।

চিত্রকলা, চলচ্চিত্র শিল্পকলা নয়; ওগুলো জনগণ চোখ দিয়ে দেখে কামে লিপ্ত হয়, ওগুলোতে কোনো কল্পনা নেই।

সঙ্গীত স্থূলদের শিল্পকলা।

মানুষ আজো কোনো বিশুদ্ধ বই লিখতে পারে নি; কোনোদিন পারবে না, যেহেতু মানুষ রক্তমাংস, অর্থাৎ অশুদ্ধ।

এমন কয়েক শো উক্তি সে লেখে। কয়েক মাসে।

স্বতঃস্ফুর্ত ঝরনাধারাও শুকিয়ে আসছে, তার ইচ্ছে হয় একটি বিশুদ্ধ উপন্যাস লিখতে–বিশুদ্ধ উপন্যাস, উপন্যাসের ইতিহাসে প্রথম ও শেষ বিশুদ্ধ উপন্যাস। বাঙলা উপন্যাস হচ্ছে শিশুদের জন্যে লেখা রূপকথা, পচা রক্ত পচা মাংসে ভরপুর; তাই এগুলো শিল্পকলা নয়; বঙ্কিম, শরৎ, তারাশঙ্কর, মানিক, বিভূতি শিল্পকলা নয়, স্থূলতা। কিন্তু বিশুদ্ধ উপন্যাস কী হ’তে পারে? যে-উপন্যাস বাস্তবতা থেকে যতো দূরবর্তী সেটি ততো বিশুদ্ধ উপন্যাস? বাস্তবতা হচ্ছে অবিশুদ্ধতা, বিশুদ্ধ উপন্যাসের কাজ বাস্তবতাকে ভেঙেচুরে নতুন শৈল্পিক বাস্তবতা সৃষ্টি করা, যা উঠে আসবে লেখকের মনোলোক থেকে। বিশুদ্ধ উপন্যাস দাঁড়িয়ে থাকবে কার ওপর? কাহিনীর ওপর নয়, চরিত্রের ওপর নয়, সমাজের ওপর নয়, নৈতিকতার ওপর নয়, সুখদুঃখ আশা আকাঙ্ক্ষার ওপর নয়; বিশুদ্ধ উপন্যাস দাঁড়িয়ে থাকবে শুধু নিজের শিল্পশুদ্ধতার ওপর। বিশুদ্ধ উপন্যাস পাঠকের জন্যে নয়, লেখকের জন্যে। পাঠক আফিম চায়, বিশুদ্ধ উপন্যাস আফিমের বিপরীত। হাসান আবার কয়েকটি তথাকথিত প্রধান বাঙলা উপন্যাস পড়ে, হো হো ক’রে হাসে। তারা বাস্তবতার পুজো করতে গিয়ে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছেন বাস্তবতাকে; কী ক’রে তারা ভাঙবেন বাস্তবতাকে, যেখানে বাস্তবতা তাদের পিতার মতো দাঁড়িয়ে আছেন তাদের সামনে? পিতার সামনে ভয় পাচ্ছেন তারা, কাঁপছেন পাঠশালার ছাত্রের মতো। বিশুদ্ধ উপন্যাস হবে বাস্তবতার বিপরীত, কবিতারই ভিন্নরূপ। হাসান একটি বিশুদ্ধ উপন্যাস লেখা শুরু করে; প্রথম পঁচিশ পাতা জুড়ে সে যা লেখে তাতে কোনো চরিত্র নেই, কোনো ঘটনা নেই, সংলাপ নেই; কিন্তু তারপরই সে দেখে উপন্যাসে তার অগোচরে রক্তমাংস ঢুকে গেছে, উপন্যাস অশুদ্ধ হয়ে গেছে; সে পাতাগুলো ছিঁড়ে বাস্কেটে ফেলে দেয়; এবং আবার লেখা শুরু করে, একটা সবুজ মাঠের ওপর দিয়ে জোয়ারের জল বয়ে চলেছে, বৃষ্টি হচ্ছে, কয়েকটি কইমাছ গড়িয়ে গড়িয়ে চলছে ঘাসের ওপর দিয়ে, একটি বালক ওই দৃশ্য দেখে দাঁড়িয়ে আছে বৃষ্টির মধ্যে—এ-বর্ণনা লিখতে লিখতে সে দেখে দুশো পাতা, আর কয়েক মাস, পেরিয়ে গেছে সে। তখন কবিতা এসে কড়া নাড়ে; সে উপন্যাসের কথা ভুলে যায়, কবিতা লিখতে শুরু করে।

কবিতা এবং কাব্যগ্রন্থ, নিঃসঙ্গতা এবং আশ্চর্য সুখ ও অসুখের ভেতর দিয়ে কেটে যায়। তার জীবনের দুটি বছর- অতিশয় দীর্ঘ, চল্লিশ হয়ে ওঠে হাসান। বিচ্ছিন্ন, বিচ্ছিন্ন, একলা, একলা, নিঃসঙ্গ, নিঃসঙ্গতম থাকতে হবে আমাকে; কেঁপে উঠলে চলবে না। কোনো মানবিক কাতরতায়; কাম নয় প্রেম নয়, শুধু অপূর্ব অন্তরঙ্গ নিঃসঙ্গতা ও কবিতা, আর তুচ্ছ জীবিকার মধ্যে অতিবাহিত হবে; কাউকে ডাকবো না, কারো জন্যে ভেতর থেকে ডাক উঠবে না, সাড়া দেবো না কারো ডাকে, ভেতর থেকে সাড়া জাগাবে না, শুধু কবিতার ভেতর দিয়ে সৃষ্টি আর ধ্বংস ক’রে চলবো নিজেকে, শুধু সৃষ্টি আর ধ্বংসের শিল্পকলা-এ-বোধের ভেতর দিয়ে কাটিয়ে দেয় সে নিজেকে। তার কল্পলোক, বাল্যকাল থেকেই, স্থির হয়ে আছে একটি বিশাল নিবিড় আকাশছোঁয়া বৃক্ষ, হয়তো বট হয়তো তমাল হয়তো এমন বৃক্ষ যা সে কখনো দেখে নি। শুধু সেটির স্বপ্ন দেখেছে, যার মূলে যার ছায়ায় চোখ বন্ধ ক’রে অন্ধ হয়ে নগ্ন লক্ষ লক্ষ বছর ব’সে থাকার সাধ জাগতো তার, এ দু-বছর কল্পনায় সে দিনের পর দিন রাতের পর রাত নগ্ন ব’সে থেকেছে সেই নিবিড় বৃক্ষের মূলে। অ্যান্ড ২০০০–এ সে কারো সাথে টেলিফোনে কথা বলেছে, বা কোনো তরুণ স্ক্রিপ্ট লেখককে পরামর্শ দিয়েছে, বারে কোনো বন্ধুর সাথে বিয়ার খেয়েছে আট দশ ক্যান, ফরাশি মদ খেয়েছে, তখনও তার মনে হয়েছে সে নগ্ন ব’সে আছে কোনো আকাশঢাকা বােধিবৃক্ষের মূলদেশে, তার কোনো চোখ নেই, অন্ধ সে, কিন্তু দেখছে সব কিছু। প্রচুর মাংসের মধ্যে থেকেছি। আমি, আর রক্তমাংসের মধ্যে থাকবো না, মাংসে ঘেন্না ধ’রে গেছে, মাংস নোংরা, মাংস ক্লান্তিকর, মাংস গলিত, লালাক্তি- যখনই কোনো সুন্দর মাংসের অবয়ব তাকে ডেকেছে, মনে মনে সে আবৃত্তি করেছে। এ-শ্লোক, দূরে থেকেছে মাংস থেকে। কিন্তু চল্লিশ পেরিয়ে একচল্লিশে পড়ার পর একটি অপূর্ব অবয়ব তাকে আলোড়িত ক’রে তোলে।

আলোড়ন, সমগ্র সমুদ্রের উদ্বেলন, সূর্যের ভেঙে ভেঙে পড়া।

এ-তরুণী কি আলোড়িত করছে আমাকে? হাসান নিজেকে জিজ্ঞেস করে।

না, আলোড়িত হচ্ছি না, আলোড়িত হওয়ার মতো শক্তি নেই। আমার, তরুণী আমার রক্তের ভেতর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে যেন মেঘ আকাশে; যেমন আঠারো তলায় হঠাৎ ঢুকে পড়ে প্রজাপতি।

তরুণী ধীর বাতাস, বয়ে যাচ্ছে আমার ত্বকের ভেতর দিয়ে।

তরুণী ঝরনাধারার মতো ঝরে পড়ছে আমার নগ্ন দেহের ওপর।

তরুণী অনেকটা আমার জলবায়ু, নিশ্বাস নিতে পারছি সহজে।

প্রেম? আবার প্রেম? আবার সেই গরলা? না, না, না।

অমৃত? আবার অমৃত? আবার সেই বিষকরবী? না, না, না।

আমি এক চল্লিশ। আমি বয়স্ক। আমার থেকে একুশ বছর ছোটো।

ওই তরুণী? বিশ। আবার অমৃত? আবার গরল?

একটি বিজ্ঞাপনের মডেল হতে এসে তরুণীটি একদিন ঢুকে পড়ে তার কক্ষে, ভুলে নয়, খুব সচেতনভাবে, যেনো তার ভেতরে ঢোকার জন্যে। বহু দিন পর বাতাস বয়, পাথরে গজিয়ে ওঠে ঘাস; সে আর চোখ বন্ধ ক’রে অন্ধ হয়ে কোনো আদিম বৃক্ষের মূলে বসে থাকতে পারে না।

তরুণীটিকে বসতে বলতে না বলতেই ফোন বেজে ওঠে আলাউদিনের; সে বলে, দোস্ত, খবর শোনছি না, জবর খবর?

হাসান বলে, না, কোনো জবর খবর তো শুনি নি।

আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত, রাকিব সুলতাইনাটা বউরে ডিভোর্স করছে, আবার বিয়া করছে।

হাসান বলে, রহিমা বানু না হালিমা বানু নামের মেয়েটির জন্যে?

আলাউদ্দিন বলে, হ, দোস্ত, রাকিব নিজের কাগজে রহিমার বুক আর মাজার খিধার কবিতা ছাপাইয়া তারে কবি বানাইতে আছিল আর প্রেম করতে আছিল; গতকাইল তারা বিয়া কইর‍্যা ফালাইছে।

হাসান বলে, রাকিবের না পাঁচ ছটি ছেলেমেয়ে আছে?

আলাউদ্দিন বলে, হ, রাকিবের কামই ত বউর প্যাট বছর ভাইর‍্যা ফুলাই রাখন, রহিমা বানুর প্যাটও তিন চাইর মাস ধইরা ফোলছে, বছর বছর ফোলবো।

হাসান জিজ্ঞেস করে, রাকিবের স্ত্রীর কী অবস্থা এখন?

আলাউদ্দিন বলে, তার স্ত্রী পোলাপান লইয়া বাপের বাড়ি চইল্যা গ্যাছে, বহুত মারামারি হইছে।

হাসান বলে, মানুষ যে কোনো বিয়ে করে!

আলাউদ্দিন বলে, আমিও সেইটাই ভাবি, দোস্ত তুমিই ভাল আছো, বিয়াটিয়া করো নাই, তোমার প্রব্লেম নাই।

প্ৰব্লেম! কাকে বলে? হ্যাঁ, আমার প্রব্লেম নেই, আহা, প্রব্রেম।

হাসান বলে, তুমি তো বিয়ে ক’রে ভালো আছো।

আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত, আমিও ভাল নাই।

হাসান জিজ্ঞেস করে, কেনো?

আলাউদ্দিন বলে, আমার বউটার লগেও আমার ভাল চলতেছে না কয় বছর। ধইর‍্যাই, সেইজন্যেই তা তিনি মাঝেমইধ্যে দিল্লি দার্জিলিং চইল্যা যান, ভাইগ্যা ভাল কবিতা ছাইর‍্যা টাকা করছিলাম। আমি গার্মেন্টসের মাইয়াগুলি লইয়া থাকি, এইটাই আমি বেশি এনজয় করি। বাউরে এনজয় করার আর কিছু নাই।

হাসান বলে, মানুষের পক্ষে সম্ভবত ভালো থাকা সম্ভব নয়।

আলাউদ্দিন বলে, মানুষ কোনো কালে ভাল আছিল না, আমিও ভাল নাই, আমিও ভাল থাকুম না।

হাসান জিজ্ঞেস করে, তুমিও কি ডিভোর্সে যাবে?

আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত, ডিভোর্সটা আমি করতে চাই না। পোলাপানগুলির অসুবিধা হইবো, আর আমার বউটা চাকরানির কামও পাইবো না, তিনি আবার এসি ছারা ঘুমাইতে পারেন না, এসি ছারা গাড়িতে উঠতে পারেন না। বউটারে চিৎ করতে আমার ভাল্লাগে না, তয় ডিভোর্সও করতে পারুম না।

হাসান জিজ্ঞেস করে, কেনো পারবে না?

বউ চাকরানীর মত রাস্তায় হাটবো, ব্যাজার হইয়া থাকবো, মাইনষে কইবো এইটা আলাউদিনের বউ আছিলো, এইটা আমার ভাল্লাগবো না।

হাসান বলে, তুমি তোমার বউকে ভালোবাসো।

আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত, ভালোবাসাটাসা কিছু না, তার প্যাট থিকা আমার পোলাপানিগুলি বাইর হইছে, ত, এইটা আর কি।

হাসান টেলিফোন রেখে দিলে তরুণীটি হেসে বলে, আমি খুব চমৎকার সময় এসেছি আপনার সাথে দেখা করতে।

হাসান বলে, হ্যাঁ, খুবই চমৎকার সময়; যখন ভূমিকম্প হচ্ছে তখন দরোজায় প্রিয় কলিংবেলের শব্দের মতো।

তরুণী বলে, আমার নাম মেঘা, আমি মাঝেমাঝে মডেলিং করি।

হাসান বলে, চুল আর মুখ আর ঠোঁট দেখেই বুঝেছি।

মেঘা বলে, আজ এসেছি আপনার সাথে দেখা করতে, আপনার কবিতা আমার ভালো লাগে, আপনাকেও ভালো লাগছে।

হাসান বলে, অনুরাগিণীদের থেকে আমি আজকাল দূরে থাকি, অনুরাগে আমি ভয় পাই; চুল আর মুখ আর ঠোঁট থেকে আমি দূরে থাকতে চাই।

মেঘা বলে, আমাকে দেখে কি আপনার ভয় লাগছে?

হাসান বলে, কেমন লাগছে সেটা কি আমি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করবো?

মেঘা বলে, আমি স্পষ্টভাবেই শুনতে চাই।

হাসান বলে, অনেক দিন পর আমার অন্য রকম অনুভূতি হচ্ছে।

মেঘা বলে, সেটা কী? হাসান বলে, তোমাকে আমার জড়িয়ে ধ’রে চুমো খেতে ইচ্ছে করছে।

মেঘা বলে, এই আমি, আমাকে জড়িয়ে ধরুন, চুমো খান।

হাসান উঠে মেঘাকে জড়িয়ে ধরে, দীর্ঘ সময় ধ’রে চুমো খায়; মেঘাও জড়িয়ে ধরে হাসানকে, চুমো খায়।

হাসান বলে, মেঘা, তোমাকে আমি জড়িয়ে ধরেছি, চুমো খেয়েছি, কিন্তু আমি তোমার প্রেমে পড়ি নি, আর হয়তো আমি প্রেমে পড়বো না।

মেঘা বলে, আমি আপনার প্রেমে পড়েছি; চুমো খেতে খেতে আমি প্রেমে পড়েছি, আমি গ’লে গেছি, আমি এমন স্বপ্নেই ছিলাম।

হাসান বলে, তোমার জীবনে আজ বিপর্যয়ের সূত্রপাত হলো; তোমার জীবন আর আগের মতো থাকবে না।

মেঘা বলে, বিপর্যয় কেনো?

হাসান বলে, আমাকে নিয়ে তুমি সুখ পাবে না।

মেঘা বলে, তা কেউ জানে না।

হাসান জিজ্ঞেস করে, তোমার বয়স কতো?

মেঘা বলে, বিশ।

হাসান বলে, আমার একচল্লিশ।

মেঘা বলে, আমার থেকে আপনি একুশ বছরের ছোটো, এটাই আমার পছন্দ।

হাসান জিজ্ঞেস করে, কেনো?

মেঘা বলে, কোলে নিতে পারবো, আবার পায়ের নিচে বসাতে পারবো; পিতা বলতে পারবো আবার পুত্র বলতে পারবো।

হাসান বলে, একটি নারীর সাথে আমার সম্পর্ক ছিলো, দশ বছর ধ’রে।

মেঘা বলে, তাতে কিছু আসে যায় না।

হাসান বলে, তুমি নিশ্চয়ই এমন একটি পুরুষ চাও, যার কামের অভিজ্ঞতা নেই, যে সচ্চরিত্র, তুমিই যার প্রথম নারী। একদিন সে হবে তোমার পবিত্র কবিনে সইকরা কবুল কবুল হাজব্যান্ড, যে তোমার জন্যে শাড়ি কিনে আনবে, ধনে পাতা আর কইমাছ কিনে আনবে।

মেঘা বলে, কী ক’রে জানলেন আমি আমন পুরুষ চাই, ধনে পাতা আর কইমাছ?

হাসান বলে, এটাই তো চায় মেয়েরা; তাদের শরীর এই চায়।

মেঘা হেসে বলে, অভিজ্ঞতাহীন পুরুষ এখন পাওয়া যায়? শুনেছি নপুংসকেরাই শুধু অনভিজ্ঞ; আর হাজব্যান্ড নিয়ে আমি ভাবি না।

হাসান বলে, কয়েক দিন পরই ভাবতে শুরু করবে–হাজব্যান্ড, হাজব্যান্ড–এটার বাঙলাটা যেনো কী?

মেঘা বলে, এটা আপনার ভুল ধারণা; হাজব্যান্ড আর স্বামী একটাকে নিয়েও আমি ভাবি না।

হাসান বলে, আমাদের পতিতারাও খদ্দেরকে ওপরে চড়িয়ে মনে করতে থাকে ভদ্রলোকটি তার হাজব্যান্ড;–সে সতী, সে পবিত্র ধর্মকর্ম করছে।

মেঘা বলে, আমি পতিতা নাই, সতীও হ’তে চাই না।

হাসান জিজ্ঞেস করে, তোমার কি অভিজ্ঞতা আছে?

মেঘা বলে, একটু আগে অভিজ্ঞতা হয়েছে, আমার ভালো লেগেছে।

হাসান জিজ্ঞেস করে, তুমি কি আরো অভিজ্ঞতা চাও?

মেঘা বলে, আপনার সাথে যে-কোনো অভিজ্ঞতায়ই আমি সুখ পাবো, আপনার সাথে সব অভিজ্ঞতার জন্যেই আমি এখন থেকে প্ৰস্তৃত; আমার মন আমার শরীর প্রস্তুত, সব অভিজ্ঞতা আমার ভালো লাগবে।

হাসান জিজ্ঞেস করে, এখনই যদি আমি তোমাকে আমার শয্যাকক্ষে নিয়ে যেতে চাই, তুমি যাবে?

মেঘা হাসানের মুখের দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে বলে, যাবো।

হাসান একটি কবিতার বই বের ক’রে উপহার দেয় মেঘাকে- ‘মেঘাকে, ভালোবাসা নয়, বিপর্যয়, দুর্ঘটনা, অপার অভিজ্ঞতা’।

মেঘা বলে, এটা আমার পাওয়া মধুরতম উপহার, চিরকাল থাকবে।

হাসান বলে, চিরকাল ব’লে কিছু নেই, চিরকাল ভুল ধারণা।

মেঘা বলে, আছে, আমি জানি আছে।

হাসান বলে, আজ থেকে আমাদের দুর্ঘটনার সূচনা হলো।

মেঘা বলে, আমাদের দুর্ঘটনা যেনো দীর্ঘ হয়।

হাসান বলে, আমি এক দশক দুর্ঘটনায় ছিলাম, হয়তো আরেক দশক দুর্ঘটনায় থাকবো, তারপর হয়তো আমি থাকবো না।

মেঘা বলে, আমাদের বাসার সবাই আপনার অনুরাগী, আমার ভাইবোনেরা, এমনকি আব্বাও। বিকেলে আপনি আমাদের বাসায় আসবেন, আমার নিমন্ত্রণ।

একটি ভয়াবহ দুৰ্ঘটনায় অংশ নেয়ার জন্যে তাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে কেউ, বলছে তুমি লাফিয়ে পড়ো অগ্নিগিরিতে, গভীর গর্তে, সেখান থেকে তুমি আর উঠে আসতে পারবে না, এমন মনে হয় হাসানের। ভাইবোন, বাসা, আব্বা এসব হচ্ছে দাউদাউ আগুন; এসব থেকে সে দূরে আছে, অনেক দিন তার মনে পড়ে নি যে তার ভাইবোন আছে, একটি মা ও বাবা আছে— বাবাটির যেনো কী নাম?- মেঘার কথা শুনে তার তীব্র ভয় লাগে। এসব কি তার আছে? এসব তার থাকা দরকার? তার তো আছে শুধু শিল্পকলা। মা, বাবা, ভাইবোন তার কে? মা, বাবা, ভাইবোন শিল্পকলা নয়, তার কেউ নয়; সে তাদের কেউ নয়।

হাসান বলে, ভাইবোন, আব্বা, বাসা এসব শব্দের অর্থ আমি জানি না, মেঘা ৷ এসব শব্দের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই; এগুলোকে আমার খুবই অচেনা মনে হয়, যেনো এই আমি প্রথম শুনলাম।

মেঘা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, আপনার কি ভাইবোন, আম্মা, আব্বা নেই?

হাসান বলে, একটি নারীর কথা আমার মনে পড়ে, তার মুখ আমি মনে করতে পারি না, তাঁর জরায়ুতে আমি বিকশিত হয়েছিলাম, তিনি প্রসব করেছিলেন আমাকে, তিনি আদর করতেন আমাকে, আমার জন্যে হয়তো তার বুক ভেঙে আছে, তাকে দেখতে ইচ্ছে করে, তাঁর মুখটি আমি মনে করতে পারি না।

মেঘা ভয় পেয়ে বলে, কী যে বলেন। আপনি, কী যে বলেন।

হাসান জিজ্ঞেস করে, তুমি কি জানো তার মুখটি কেমন?

মেঘা বিব্রত হয়, কিন্তু একটু সময় নিয়ে বলে, আমি জানি আপনার মায়ের মুখটি কেমন।

হাসান জিজ্ঞেস করে, আমার মায়ের মুখটি কেমন?

মেঘা বলে, তার মুখটি দিঘির মতো, সারাক্ষণ টলমল করছে, যার চারপাশে অনেক গাছ, অনেক ছায়া, গভীর ছায়া, রাতে চাঁদের আলোতে ভরে যায়, যখন চাঁদ থাকে না তখন জোনাকি জ্বলে।

কাকে বলে, জোনাকি কাকে বলে?

মেঘা বলে, এসবই আমি আপনাকে ধীরেধীরে চিনিয়ে দেবো।

হাসান বলে, এসব আমার চিনতে ইচ্ছে করে না।

মেঘা বলে, আপনাকে অবশ্যই চিনতে হবে এসব।

হাসান বলে, তুমি আর এসো না; এসব আমি চিনতে চাই না।

মেঘা বলে, তাহলে আমি আজ যাবো না, আপনার সাথে থাকবো, যাতে আর আসতে না হয়।

হাসান বলে, একটি নারীর সাথে আমি দশ বছর সঙ্গম করেছি, জানি না তাকে প্রেম বলে কি না।

মেঘা বলে, তাতে কিছু যায় আসে না।

হাসান জিজ্ঞেস করে, আমাকে তোমার নষ্ট মানুষ মনে হয় না?

মেঘা বলে, না; সৎ মানুষ মনে হয়।

হাসান বলে, আমি আর সঙ্গম করতে চাই না, আমি আর প্রেমে পড়তে চাই না; আমি নপুংসক হয়ে যেতে চাই, অপ্রেমিক হয়ে যেতে চাই। তিন বছর ধ’রে তাই আমি নারী থেকে, ঠোঁট থেকে, স্তন থেকে দূরে আছি; কবিতা ছাড়া আমার আর কিছু নেই।

মেঘা বলে, আপনি আমার থেকে দূরে থাকতে পারবেন না।

হাসান বলে, মেঘা, তুমি যাও, আর এসো না।

মেঘা বলে, আমি এসেছি।

হাসান বলে, মেঘা, আমি জানি তোমার অপূর্ব স্তন রয়েছে ঠোঁট রয়েছে নদী রয়েছে, কিন্তু আমি ওই অপূর্বদের কাছে যেতে পারবো না।

মেঘা বলে, আমি এসেছি, আমি অপূর্ব।

হাসান একটি সিগারেট ধরায়, টয়লেটে যায়, টয়লেটে গিয়ে আয়নায় নিজের মুখটি দেখে; সে স্বস্তি পায় যে নিজের মুখটি সে চিনতে পারছে, মুখটিকে তার ভালো লাগছে, টয়লেটে ঢোকার আগে আর মনে হচ্ছিলো নিজের মুখ সে চিনতে পারবে না, কুৎসিত দেখাবে, সে চিনতে পারছে, মুখটিকে ভালো লাগছে; তার একটি শিশ্ন রয়েছে, সেটি সে ধ’রে দেখে, তারও প্রাণ রয়েছে। হাসানের বসতে ইচ্ছে করে; একটি চেয়ার থাকলে বেশ হতো, তার মনে হয়, জীবন থেকে সব ধরনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসার জন্যে টয়লেট শ্ৰেষ্ঠস্থান; সে কমোডের ওপর বসে এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে সিগারেটে টান দিতে দিতে নিজেকে জিজ্ঞেস করে, হাসান, তুমি কি সত্যিই চাও এ-মেয়ে এ-বিশ বছর আর না আসুক? তুমি কি তার দীর্ঘ কালো চুল দেখতে চাও না? তুমি কি ওই মসৃণতায় ডুবে যেতে চাও না? তুমি কি তাকে জড়িয়ে ধ’রে চুমো খেতে চাও না? তুমি কি তার নিশ্বাসে সুস্থ হ’তে চাও না?

সে কি চিরকাল বসে থাকবে টয়লেটে? বেরোবে না? সে বেরিয়ে আসে।

মেঘা জিজ্ঞেস করে, টয়লেটে ব’সে কি আপনি কবিতা লেখেন?

হাসান বলে, হ্যাঁ, লিখি।

মেঘা জিজ্ঞেস করে, আজ কী কবিতা লিখলেন?

হাসান বলে, আমার পরিণামের কবিতা।

মেঘা বলে, আমি আজ যাচ্ছি, কিন্তু আমি এসেছি, আপনাকে দেখে মনে হয় আমার আসার জন্যে আপনি জন্মজন্ম ধ’রে অপেক্ষা করছিলেন, আপনি আমার অভাবে ছিলেন। আমি এসেছি, আপনার আর কোনো অভাব নেই।

হেসে বেরিয়ে যায় মেঘা; হাসানের মনে হয় জন্মজন্মান্তর ধ’রে সে শূন্যতার মধ্যে আছে, অতল অনন্ত অগাধ অন্ধকার শূন্যতার মধ্যে সে অনন্ত শূন্যতা হয়ে আছে। এটাই বেশ, সে এভাবেই থাকতে চায়; সে কোনো মানবিক পূর্ণতা চায় না, শুধু চায় শিল্পকলার পূর্ণতা। একটি শ্যামলী কী? একটি মেঘা কী? তারা কবিতা নয়, শব্দের অপূর্ব বিন্যাস নয়, ছন্দ নয়, অভাবিত চিত্রকল্প নয়; তারা স্তন, ওষ্ঠ, যোনি, জরায়ু, সংসার, কচুশাখ, ইলশে মাছ, কাঁচামরিচ, ধনে পাতা, রাবার, পিল, রাবারহীনতা, ঋতু, বারো দিনের পর উর্বরতা, শিশু, আবার শিশু, এবং শিশু। আমি কি এই চাই? আমি এটা চাই না, জীবন চাই না, শিল্পকলা চাই।

বেশ রাতে বাসায় ফিরে হাসানের ইচ্ছে হয় স্নান করতে; সে বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার খুলে ঝরনাধারার নিচে নগ্ন নাচতে থাকে, শিশুর মতো, যেনো জোয়ার এসেছে খালেবিলে, সে লাফিয়ে পড়ছে জোয়ারের জলে, নিজেকে সে জিজ্ঞেস করতে থাকে তার আজ এই রাত বারোটায় স্নান করতে ইচ্ছে হলো কেনো? আমি জানি না, আমি জানি না; হাসান নিজেকে বলতে থাকে, হাসান, তুমি আমাকে আজেবাজে প্রশ্ন কোরো না, আমি সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো না, আমি উত্তর জানি না, আমার শাওয়ারের নিচে নগ্ন নাচতে ভালো লাগছে, এই জানি আমি, ভালো লাগলে সারারাত আমি শাওয়ারের নিচে নাচবো।

বেডরুমে কি টেলিফোন বেজে চলছে? না কি জলের শব্দ? জলপ্রপাতের শব্দ? টেলিফোন বাজছে? হ্যাঁ, বাজছে; বাজুক, আমি জোয়ারে ভাসছি, টেলিফোনের কোনো সংবাদ আমি জানি না, জোয়ারের জলে কোনো টেলিফোন নেই, আমি শুধু জলের স্বর শুনতে চাই, জলের ছোঁয়া পেতে চাই। থামছে? আবার বাজছে? বেজে চলছে? অনন্তকাল বেজে চলবে? মধ্যরাতে অ্যাড? বোতলে ভরা হয়ে গেছে নতুন শ্যাম্পু? উৎপাদিত হয়ে গেছে কোনো ২০০% হালাল সাবান? কাল ভোরেই বাজারে আসবে নতুন পিল? ব্যবসা, ব্যবসা, ব্যবসা; ব্যবসায়ী গ্রহটির বেশি সময় নেই; উৎপন্ন হয়ে গেছে, ফেলে রাখা চলে না, এখন বেচতে হবে, দিনরাত বেতে হবে; তাকে বেশি বাজতে দেয়া ঠিক হবে না।

হাসান ভেজা শরীরে, চুল থেকে ঝরঝর ক’রে জোয়ার করছে, বেরিয়ে আসে; টেলিফোন ধ’রে বলে, হ্যাঁলো, হাসান বলছি।

মেঘা বলে, আমি সন্ধ্যে থেকে ফোন ক’রে চলছি, পাগল হয়ে আছি।

হাসান বলে, ফিরতে দেরি হয়েছে, ফেরার ইচ্ছে ছিলো না; আমি হয়তো পাগল হয়ে গেছি।

মেঘা জিজ্ঞেস করে, কেনো দেরি করলেন?

হাসান বলে, পাগল হয়ে গিয়েছিলাম বলে পথ চিনতে পারি নি।

মেঘা বলে, পাগল হয়ে কোথায় গিয়েছিলেন?

হাসান বলে, পান করতে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম সেখানেই ঘুমিয়ে পড়বো।

মেঘা জিজ্ঞেস করে, এখন কী করছিলেন?

হাসান বলে, বাথরুমে শাওয়ারের নিচে নাচছিলাম—পাগল হয়ে।

মেঘা বলে, আপনি নাচতে জানেন?

হাসান বলে, পাগল হ’লে নাচতে জানি।

হাসান মেঝেতে বসে, তার মনে হয় তার ওপর ঝরে পড়ছে ঝরনাধারা, আকাশ থেকে, মেঘমণ্ডল থেকে।

মেঘা বলে, আপনাকে না পেলে আমি সারারাত ফোন ক’রে চলতাম।

হাসান বলে, তুমি কি এখন আসতে পারো?

মেঘা বলে, এই রাত সাড়ে বারোটায়?

হাসান বলে, হ্যাঁ।

মেঘা বলে, আমার আসতে ইচ্ছে করছে, বেরিয়ে পড়োতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু এখন কি আমি আসতে পারি?

হাসান বলে, তাহলে কাল আসবে, আমার সাথে সারারাত থাকবে।

মেঘা বলে, থাকবো।

হাসান জিজ্ঞেস করে, বাসায় অসুবিধা হবে না?

মেঘা বলে, তুচ্ছ বাসাটাসার কথাও আপনি ভাবেন?

হাসান বলে, হঠাৎ মনে হলো, অসুবিধা হ’তে পারে।

মেঘা বলে, আমি সেটা দেখবো, হলে থাকার কথা বলবো।

হাসান বলে, তোমার সাথে সারারাত কথা বলতে ইচ্ছে করছে।

মেঘা বলে, আমারও ইচ্ছে করছে।

হাসান বলে, বলো, অনন্তকাল ধ’রে বলো।

মেঘা বলে, কিন্তু লুকিয়ে আর বেশি কথা বলতে পারছি না।

হাসান বলে, কাল বিকেলে অফিসে এসো।

মেঘা বলে, আমি এসেছি।

মেঘা ফোন রেখে দিয়েছে, এখন আমি কী করতে পারি? কী করার আছে আর? পৃথিবীতে সব কাজ সমাপ্ত হয়ে গেছে, এখন যা আজ আছে সবই পুনরাবৃত্তি, করার অযোগ্য। আমার জীবনপাত্র কি ভ’রে গেছে কানায় কানায়, উপচে পড়ছে? এর পর আছে শুধু ক্লান্তি, আছে শুধু জোয়ারের পর নদী জুড়ে পোড়া কাঠের ছড়াছড়ি? এখন একমাত্র সুখকর কাজ হচ্ছে আত্মহত্যা, ভবিষ্যতের সমস্ত তুচ্ছতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়া? সমগ্র জীবনযাপন করা হয়ে গেছে আমার? কিন্তু আত্মহত্যা নয়, আত্মহত্যা নয়, এখনি আত্মহত্যা নয়। ঘুমোবো? একটি কবিতা চোখের সামনে উড়ছে। কয়েক দিন ধ’রে, না কি সাঁতার কাটছে, সেটিকে ধ’রে ফেলতে চেষ্টা করবো অক্ষরের খাচায়? আরো কয়েক দিন উড়তে দেবো এলোমেলো? উড়ুক, কবিতাটি উড়ুক, জ্যোৎস্নায়, অন্ধকারে উড়ুক, সাঁতার কাটুক, জলে, গভীর জলের ভেতরে; কিন্তু ঘুম? কোথায়? কেনো? কখন? কতো শতাব্দী? অনন্তকাল? হাসানের চোখে পড়ে একটি সংস্কৃত ব্যাকরণের ওপর, ইংরেজিতে লেখা, লিখেছেন এক এডিনবরি অধ্যাপক,–মহান বৈদিক ভারতীয়দের, আহা, আজকাল সংস্কৃত শিখতে হচ্ছে পাষণ্ড বেকনভোজি শাদাদের কাছে; অনেক দিন আগে কিনেছিলো, আজ রাতে–কবিতা নয়, কাব্যতত্ত্ব নয়, তার পড়তে ইচ্ছে করছে সংস্কৃত ব্যাকরণ। হাসান সংস্কৃত ব্যাকরণ পড়তে থাকে, চমৎকার ভাষা সংস্কৃত— মেঘার মতোই। মেঘার মতোই? না, মেঘা। এতো সূত্র দিয়ে বাধা নয়, মেঘা সংস্কৃতকে ছাড়িয়ে গেছে আড়াই হাজার বছর আগেই। মেঘা কি প্রাকৃত? কোনটি? আটত্রিশটির কোনটি? মহারাষ্ট্ৰী? শৌরসেনী? মাগধী? পৈশাচী? কোনটি? মেঘা কি অবহট্‌ঠ? মেঘা কি অবহট্‌ঠ ভেঙে হয়ে উঠছে বাঙলা? কায়া তরুবর পাঞ্চ কি ডাল? প্রাচীন ব্যাকরণ জানা দরকার কবিকে, সব মৃত ভাষার ব্যাকরণ–যদি সে আউল বাউল ঝাউল না হয়, আধুনিক কবি হয়। লাতিন ব্যাকরণ পড়লে কেমন হয়? প্রিস্কি আনের ব্যাকরণ? গ্রিক ব্যাকরণ? থ্রাক্সের ব্যাকরণ? পাণিনির ব্যাকরণ কি পড়ার চেষ্টা করবো একবার? কাত্যায়ন? পতঞ্জলির মহাভাষ্য?

বিকেলে, হাসানের যেটাকে ঠিক সময় মনে হয়েছিলো, তার আগেই মেঘা আসে; মেঘাকে দেখে হাসানের মনে হয় তার কবিতা আজো এতো শিল্পময় হয়ে উঠতে পারে নি; শুধু তার নয়, কোনো কবিতাই এতো শিল্পিত সুন্দর নয়।

মেঘা কি কবিতার থেকে উৎকৃষ্ট? কবিতা কি মেঘারই নিকৃষ্ট অনুকরণ?

মেঘা শিল্পকলার থেকেও স্মিত হেসে বলে, আমি এসেছি।

হাসান বলে, কিন্তু আর কেউ আমার কাছে এমনভাবে কখনো আসে নি।

মেঘা বলে, একমাত্র আমিই জন্মেছি আপনার কাছে আসার জন্যে।

হাসান বলে, তোমার পিতা ও মাতাকে ধন্যবাদ।

মেঘা বলে, আপনার কাছে আসবো ব’লে আমার পিতাকে কোনো কষ্ট করতে হয় নি, তবে মাকে দশটি শেলাই নিতে হয়েছিলো।

হাসান বলে, কবিতাও কখনো এভাবে আসে নি। আসা শব্দটির অর্থ আজ আমি প্রথম অনুভব করছি, আসা শব্দটির অর্থ যেনো কী?

মেঘা বলে, একদিন আমি আপনার কাছে আসবো এজন্যেই আমার আপনার জন্ম হয়েছিলো, আসা শব্দের অর্থ হচ্ছে মেঘার জন্ম।

হাসান বলে, তুমি একটু দেরিতে জন্ম নিয়েছে।

মেঘা বলে, না, ঠিক সময়েই জন্ম নিয়েছি; ঠিক একুশ বছর পরে। আপনি আমার একুশ বছর ছোটো।

হাসান বলে, কাল সারারাত আমি সংস্কৃত ব্যাকরণ পড়েছি, আর আজ দুপুর থেকে একটি পিলের অ্যাডের স্ক্রিপ্ট সংশোধন করছি।

মেঘা হেসে বলে, কোনোটিই আমি খাই নি। হাসান জিজ্ঞেস করে, তুমি কি এক ঠোঙা পিল খেয়ে দেখবে? চমৎকার সুস্বাদু পিল, আমেরিকায় তৈরি।

মেঘা হেসে বলে, দিন, মরিচ, আর লবণ আছে তো?

হাসান বলে, ভেজে খাবে না, না ভর্তা ক’রে খাবে?

মেঘা বলে, ভর্তা ক’রে খেতেই ভালো লাগবে।

মেঘা বলে, আপনি বললে খাবো।

হাসান বলে, তুমি কি পিলটার মডেল হবে?

মেঘা বলে, আজ তো আমি মডেল হতে আসি নি; আজ আমি প্রিয়তমা।

হাসান একটু বিব্রত হয়, এবং বলে, মেঘা, পুঁজিবাদ প্রিয়তমাকেও বিক্রি করে, প্রিয়তমার গ্ৰীবার তিল, গালের টোল, স্তনের উচ্চতা, পাছার প্রশস্ততাও বিক্রি করে; সবই পণ্য; তবে তোমাকে আমি বেচতে চাই নি।

মেঘা বলে, তা আমি জানি।

সন্ধ্যার একটু পর তারা একটি পাঁচতারা হোটেলে যায়।

মেঘা বলে, এ-হোটেলে কখনো ঢুকবো ভাবি নি, এতো ঝলমলে, এতো সুন্দর, এতো অপূর্ব, এতো অচেনা, এটা কি তাজমহল?

হাসান বলে, আমিও কখনো ঢুকবো ভাবি নি, এটাকে এক সময় বিদেশ মনে হতো আমার, পাসপোর্ট ছিলো না।

মেঘা জিজ্ঞেস করে, কখন ভাবলেন?

হাসান বলেন, ভাবি নি; অই স্বাধীনতাটা আমাকে এখানে ঢুকিয়ে দিয়েছে, ধন্যবাদ গরিব স্বাধীনতা, আমি কৃতজ্ঞ, হে গরিব স্বাধীনতা।

মেঘা বলে, এখানে গরিব কই? ছেঁড়া লুঙ্গিপারা ভাইরা কই? এই কার্পেটে তারা হাঁটলে কী সুন্দর দেখাতো।

হাসান বলে, তাদের আমরা দেশ জুড়ে স্বাধীনতা দিয়েছি, এই নিয়েই তাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিত; গরিবরা বস্তিতে সুন্দর, ধনীরা হোটেলে।

মেঘা বলে, তাহলে এখানে আমাকে খুব কুৎসিত দেখাচ্ছে।

হাসান বলে, যেমন পঙ্কে পদ্মকে কুৎসিত দেখায়।

তারা গিয়ে বসে বুফেই রেস্তোরাঁয়।

মেঘা বলে, এমন সুন্দর রেস্তোরাঁ কখনো দেখি নি।

হাসান বলে, এখানে হয়তো ১০১টি বা ৫০০৫টা খাবার আছে, যতো পারো খাও, দাম ৪০০ টাকা, এক টুকরো মাছও ৪০০ আর সব খেলেও ৪০০।

মেঘা বলে, তাহলে আমি সব খাবো।

হাসান জিজ্ঞেস করে, তুমি কি খেতে খুব পছন্দ করো?

মেঘা বলে, না; তবে এতো খাবার দেখে আমি পাগল হয়ে গেছি।

হাসান বলে, প্রকৃত পাগল?

মেঘা বলে, আমাদের রাস্তার পাগলটার মতো পাগল, রেলস্টেশনের পাগলীটার মতো পাগল, আমি আজ পাগলের মতো খাবো, খেয়ে খেয়ে ১০০০ কেজি হয়ে যাবো, যাতে আর না খেতে হয়।

হাসান বলে, খাও, ১০০,০০০ কেজি হও, আদিম ভেনাস হও। আদিম ভেনাসকে আমি ভালোবাসি।

মেঘা চঞ্চল বালিকার মতো প্লেট ভ’রে খাবার আনতে থাকে, কিছুটা খেয়ে আর খেতে পারে না; কিন্তু আরো খাবার পড়ে আছে সারিসারি, চেনা আর অচেনা, সেগুলো সে আনে নি, সেগুলো খেয়ে দেখতে হবে, নতুন প্লেট নিয়ে আবার সেগুলো আনতে যায়, আপ্যায়নকারীরা প্লেটের পর প্লেট নিয়ে যেতে থাকে, মেঘার প্লেটে খাবারের পাহাড় পড়ে থাকে, আনে, এক টুকরো খায়; হাসান একমুঠো ভাত, মাছ, শজি, ফল নেয়, আর নেয় ফরাশি মদ।

হাসান জিজ্ঞেস করে, তুমি কি একটু পান করবে?

মেঘা হাসানের পাত্র থেকে একটু পান ক’রে বলে, খুবই মধুর লাগছে, এমন কিছু আগে কখনো খাই নি।

হাসান বলে, তোমার জন্যে এক পাত্রের কথা বলবো?

মেঘা বলে, না, না; আমি আপনার পাত্রেই মাঝেমাঝে চুমুক দেবো।

হাসান বলে, এই পাত্রটি তো আমার ওষ্ঠ।

মেঘা বলে, আপনার ওষ্ঠ আমার আঙুর।

তারা যখন হাসানের ঘরে গিয়ে ঢোকে তখন বেশ রাত; আলো জ্বালিয়েই হাসান বিস্মিত হয় যে ঘরটিকে আজ বিস্ময়করভাবে সুন্দর দেখাচ্ছে, তার ঘরটি এতো সুন্দর হলো কী ক’রে? এটা তো এতো সুন্দর ছিলো না। মেঝের ধূসর সোনালি ম্যাটে ঘাস গজিয়ে উঠছে সবুজ হয়ে, ঘাসফুল ফুটছে এদিকে সেদিকে, দেয়ালে দেয়ালে শিমুল, দিকে দিকে টলমল পুকুরে দুলছে লালপদ্ম নীলপদ্ম শ্বেতপদ্ম, ওই কোনায় উড়ছে। বসছে ডাকছে একটি দোয়েল।

মেঘা বলে, আপনার ঘরটি এতো সুন্দর!

হাসান হেসে বলে, তুমি হয়তো ভেবেছিলে এটা লালন ফকিরের আখড়ার মতো অলৌকিক দেখাবে।

মেঘা বলে, না, না, অমন ভাবি নি।

হাসান বলে, তবে আগে এটা এমন ছিলো না, আখড়ার মতোই ছিলো, কিছুক্ষণ আগে সুন্দর হয়ে উঠলো।

মেঘা বলে, কিছুক্ষণ আগে?

হাসান বলে, তুমি যেই পা রাখলে অমনি এটি হয়ে উঠলো সুন্দর।

মেঘা বলে, আমার পায়ে এমন যাদু নেই।

হাসান বলে, তুমি যখন আর পা রাখবে না, তখন এটা হয়ে উঠবে মেথরপট্টির থেকেও নোংরা।

মেঘা বলে, শুধু পা নয়, নিজেকেই আমি রাখবো।

হাসান বলে, কোথায়?

মেঘা বলে, এই স্বর্গে।

হাসান নিজের বুকটি দেখিয়ে বলে, তুচ্ছ স্বর্গে নয়, তুমি তোমাকে রেখো এইখানে, এই প্রচণ্ড অপবিত্র নরকে, যেখানে আগুন জ্বলছে জিহোভার ক্রোধের থেকেও তীব্রভাবে।

মেঘা বলে, ওখানেই থাকতে চাই আমি।

হাসান জিজ্ঞেস করে, চা খাবে?

মেঘা বলে, চার কাপ পাঁচ কাপ দশ কাপ চা খেতে ইচ্ছে করছে।

হাসান বলে, খুব অস্থির লাগছে?

মেঘা বলে, প্রথম স্বর্গে গেলে যেমন অস্থির লাগবে।

হাসান বলে, তুমি স্বর্গের স্বপ্নে আছো, আমি আছি নরকের।

মেঘা বলে, আজ থেকে স্বৰ্গকে ছেড়ে দিলাম, নরককে নিলাম।

হাসান বৈদ্যুতিক কেটলিতে পানি গরম করে, মেঘা তার হাত থেকে কেটলি নিয়ে বলে, আমি বানাই।

হাসান বলে, পারো? মেঘা বলে, একটি কাজই আমি ভালো পারি- চা বানাতে।

হাসান চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, এটা তো চা নয়।

মেঘা চমকে উঠে বলে, খুব তেতো হয়েছে, খুব বাজে?

হাসান বলে, এক কাপ তরল রঙিন কবিতা, পড়ার জন্যে নয়, পানের জন্যে। চা খেতে খেতে হাসানের ডান হাতের আঙুলগুলো নিঃশব্দ, ঝরনাধারার মতো বয়ে চলে মেঘার বা হাতের আঙুলগুলোর দিকে, গিয়ে পড়ে আরেক ঝরনাগুচ্ছে- স্নিগ্ধ উষ্ণ অমল কোমল শীতল নিৰ্মল, নিঃশব্দ কলকল ধ্বনি উঠতে থাকে চারপাশের পাহাড় উপত্যকা বনভূমিকে সঙ্গীতে মুখর ক’রে; হাসান উঠে দাঁড়ায়, তার ওষ্ঠ দোয়েলের মতো গিয়ে বসে মেঘার ওষ্ঠে, ভোরের আগের নিঃশব্দ সুরে ভ’রে যেতে থাকে সমস্ত চরাচর; হাসানের মনে হয়। হাজার হাজার বছর পর সে ঢুকছে নিসর্গের ভেতর, সমস্ত নগর রাজধানি দুর্গ বিমানবন্দর চার তারা পাঁচতারা নিওন আলো অ্যাড পেছনে ফেলে ঢুকছে গভীর অরণ্যে, যেখানে পাতার সবুজ ফুলের সুগন্ধ, অরণ্যে, যেখানে গভীরতম ছায়া আর জ্যোৎস্না, অরণ্যে, যেখানে আকাশ ছড়ানো ময়ুরের পেখমের মতো; হাসান তার শরীর থেকে খুলে ফেলে সভ্যতার নোংরা ছেঁড়াফাড়া আবরণ, দাঁড়ায় আদিম পুরুষের মতো নগ্ন পর্বতচূড়োর মতো নগ্ন স্বপ্নের মতো নগ্ন, মেঘা তার দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে, যেনো ঘুমিয়ে পড়ছে, আর জাগবে না; ধীরেধীরে সে মেঘার শরীর থেকে সরিয়ে দিতে থাকে সভ্যতার ছেঁড়া সিল্ক, হাসান দেখতে পায় তার চোখের সামনে আশ্বিনের নদীর মাঝখানে জেগে উঠছে একটি নতুন নগ্ন চর, আদিম সুন্দর অমল পলিময়; আমি এমন সুন্দর কিছু আগে দেখি নি, এমন নদী আগে দেখি নি, আগে দেখি নি এমন সুন্দর বাক, হয়তো চিরকাল অন্ধ ছিলাম, কখনো চাঁদ দেখি নি, এই প্রথম দেখলাম; সরোবর দেখি নি, দেখলাম। এই প্রথম, এমন জলে আগে সাঁতার কাটি নি কখনো, এই প্রথম সাঁতার কাটলাম; আমি ভ’রে যাচ্ছি বাঘের গায়ের গন্ধে ভ’রে যাচ্ছি হরিণীর মাংসের সুগন্ধে, অজস্র জেব্রার রঙে ভ’রে উঠছে জ্যোৎস্নায় মাতাল অরণ্য, দূরে শুনতে পাচ্ছি। মত্তহস্তীর মহান ডাক; হাতি ডেকে চলছে, হাতি ডেকে চলছে, হাতি ডেকে চলছে। বেরিয়ে পড়েছে অরণ্যের সব হাতিরা, সব বাঘেরা, সব হরিণের, সব জেব্রারা; সকলের শরীরে আজ তীব্রতম প্রেম, সকলের হৃদয়ে আজ অনিৰ্বাচনীয় আবেগ।

যখন ঘুম ভাঙে তখন অনেক বেলা;–নগ্ন নদী আর নগ্ন চর জড়িয়ে আছে পরস্পরকে।

হাসান জিজ্ঞেস করে, কেমন আছো?

মেঘা বলে, মনে হচ্ছে আমি নেই, আমি নেই, আমার জন্ম হয় নি।

হাসান জিজ্ঞেস করে, উঠবে?

মেঘা বলে, এরপর যে আর উঠতে হবে সেকথা মনে পড়ে নি।

হাসান বলে, জড়িয়ে থাকবো?

মেঘা বলে, যতো দিন বেঁচে আছি। যতো দিন ম’রে আছি।

হাসান বলে, আজ অ্যাডে যাবো না।

মেঘা বলে, আজ আমি রৌদ্রেও যাবো না।

হাসান বলে, এই প্রথম আমার জীবনে একটি সম্পূর্ণ রাত্রি এলো, এই রাত্রির স্বপ্ন দেখেছি সারাজীবন। তুমি আমাকে রাত্রি দিলে।

মেঘা হেসে বলে, রাত্রি দেয়ার জন্যে আমাকে ধন্যবাদ?

হাসান বিব্রত হয়ে বলে, না, না, ধন্যবাদ নয়, ধন্যবাদ নয়, অন্য কিছু।

মেঘা বলে, স্বপ্ন দেখার আগেই আমার জীবনে এলো অপূর্ব রাত্রি; আপনি আমাকে রাত্রি দিলেন।

হাসান বলে, তার জন্য আমাকে ধন্যবাদ?

মেঘা বলে, না, আমার জীবন।

হাসান বলে, এ-রাত আর কখনো আসবে না।

মেঘা বলে, আসবে, ফিরে ফিরে আসবে; আমরা হয়তো বুঝতে পারবো না ফিরে ফিরে আসছে। এই রাতই।

হাসান উঠে কেটলি চালু করে; মেঘা লাফিয়ে উঠে শাড়ি জড়িয়ে বলে, আমি চা বানাই, এটাই তো আমি ভালো করি।

হাসান বলে, এই অরণ্যে আর শাড়ি কেনো?

মেঘা জিজ্ঞেস করে, পরবো না? হাসান বলে, যখন আমরা এই অরণ্যে তখন কোনো অশ্লীল পোশাক নয়, বস্ত্ৰ হচ্ছে অসভ্যতা অশ্লীলতা।

মেঘা বলে, তাহলে তাই।

হাসান মেঘার স্তন ছুঁয়ে বলে, এখানে এই চাকাচাক লাল দাগ কেনো? মেঘা বলে, সারারাত এক চিতাবাঘের মুখে ছিলাম।

হাসান বলে, চিৎকার করো নি কেনো? উদ্ধার করতাম।

মেঘা বলে, উদ্ধার চাই নি, চেয়েছি চিতাবাঘ আমাকে খেয়ে ফেলুক।

হাসান বলে, খেয়ে ফেলে নি ব’লে দুঃখ হচ্ছে?

মেঘা বলে, চিরকাল তার দাঁতে গাঁথা থাকবো, সে খাবে, আবার খাবে, আমি ফুরোবো না; চাকচাক দাগের অলঙ্কার প’রে থাকবো।

একটি সম্পূর্ণ রাতের পর একটি সম্পূর্ণ দিনও আসে, শুধু তাদের জন্যে, আর কারো নয়, শুধু তাদের জন্যে–একান্ত নিজস্ব ব্যক্তিগত করতলগত দিন; যদিও দিনরাত্রির পার্থক্য বুঝতে পারে না তারা, বোঝার কোনো দরকার হয় না, বোঝার কথা মনে পড়ে না; দিন ও রাত একই জিনিশের দুই রকম উৎসারণ মনে হয় তাদের, একই আলো কখনো অন্ধকার হয়ে দেখা দেয়, একই অন্ধকার কখনো দেখা দেয় আলো হয়ে। ওই সম্পূর্ণ দিনটিও তারা কাটিয়ে দেয় বা অধিকার ক’রে রাখে হাসানের ঘরের গভীর বিজন ছায়াঘন ঝরনামুখর আদিম অরণ্যে; সারাদিন ধ’রে হাতিরা ডাকে- ডাকে, বাঘেরা ডাকে- ডাকে, হরিণের ডাকে- ডাকে; সুন্দর জ্বলজ্বলে চিতার দাঁতে ঝুলতে বুলতে একজন হরিণী হাহাকার করতে থাকে পরম সুখে, ঘাই হরিণীর রক্তের আবেদনে সাড়া দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে জেগে থাকে এক পুরুষহরিণ, ভাসতে থাকে সুখ ও অবসাদের মধ্যে, আনন্দ ও যন্ত্রণার মধ্যে; সম্পূর্ণ দিন ভরে আদিম অন্ধকার, সম্পূর্ণ দিন ভ’রে আদিম উজ্জ্বল জ্যোৎস্না; সম্পূর্ণ দিন ভরে শরীর, সম্পূর্ণ দিন ভ’রে হৃদয়। পাহাড় বেয়ে বেয়ে উঠতে উঠতে পুরুষ এক সময় গড়িয়ে পড়ে প্রবালখচিত উপত্যকায়, ঢুকতে থাকে আদিম গুহায়, বল্লমে সুসজ্জিত, অপরাজেয় অক্লান্ত, এবং মহাক্লান্তিতে বিধ্বস্ত; নারী খুঁজে পায় এক অদ্ভুত আশ্রয়, যা উঠে গেছে আকাশের দিকে, দৃঢ় বলিষ্ঠ উদ্ধত, যার ভীতিকর সৌন্দর্যে তার চিৎকার আনন্দ হয়ে ভেঙে ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে পাহাড়ে পাহাড়ে।

সারাদিন ভরে মাংসের, সারাদিন ভ’রে হৃদয়ের উৎসব।

সন্ধ্যায় মেঘা বলে, এবার যেতে হবে।

হাসান বলে, যাওয়ার দরকার নেই, টেলিফোন ক’রে জানিয়ে দাও তুমি এখানে আছো, এখানে থাকবে।

মেঘা বলে, এখানেই তো থাকবো, তবে আজ যেতে হবে।

হাসান বলে, কেনো?

মেঘা বলে, পুরোপুরি আসার জন্যে।

সন্ধ্যার পর হাসান মেঘাকে এগিয়ে দিয়ে আসে মেঘাদের বাড়ির সামনের পথ পর্যন্ত, রিকশা থেকে নেমে সে হেঁটে হেঁটে বাসায় ফেরে।

একরাশ কবিতা এসেছে মাথার ভেতরে, বহু দিন পর প্রেমের কবিতা; বহু দিন পর কম্পিত কবিতা।

রাতেই খসড়া লেখা হয়ে যায় তিনটি কবিতার।

কবিতা, তুমি এসেছে, এসো।

মধ্যরাতে মেঘা ফোন করে, আমি এখানে ঘুমোতে পারছি না, মনে হয় দোজখে পড়ে আছি।

হাসান জিজ্ঞেস করে, কোথায় ঘুমোতে চাও?

মেঘা বলে, ওই বিজন অরণ্যে, যেখানে আছেন উজ্জ্বল চিতাবাঘ।

হাসান বলে, এর থেকেও বিজন অরণ্যে যাওয়ার কথা ভাবছি। আমি কয়েকদিনের মধ্যেই মধুপুর জঙ্গলে যেতে চাই- অরণ্য, অরণ্য, পৃথিবী জুড়ে শুধুই অরণ্য, আর কিছু নেই অরণ্য ছাড়া, বাঘ ও হরিণ ছাড়া।

মেঘা বলে, আগামীকালই।

হাসান বলে, ইচ্ছে করছে এখনই, কিন্তু ব্যবস্থা করতে হবে, সেখানে আছে একটি অপরূপ কুটির।

মেঘা বলে, আমি তার স্বপ্ন দেখা শুরু করছি।

কয়েক দিন পর মধুপুর অরণ্যে বেড়াতে যায়। তারা, তিন দিনের জন্যে। মেঘা বাসায় ব’লে আসে বান্ধবীদের সাথে বেড়াতে যাচ্ছে সিলেট।

কুটিরে উঠেই হাসান মালিটিকে বলে, আপনি কি সন্ধ্যায় ফুলপাতা এনে দিতে পারবেন?

মালিটি বলে, পারুম ছার, কি ফুল আনুম?

হাসান বলে, এ-বনে যতো সুগন্ধি পাতা আছে ফুল আছে, সব আনবেন, সবুজ পাতা আর রঙিন ফুল।

মালিটি জিজ্ঞেস করে, কতগুলি লাগবো ছার?

হাসান বলে, পাঁচ ঝুড়ি দশ ঝুড়ি, যা পারেন।

লোকটি বলে, সন্ধ্যার আগেই দিয়া যামু ছার।

লোকটি চ’লে গেলে মেঘা জিজ্ঞেস করে, এতো ফুলপাতা দিয়ে কী হবে?

হাসান বলে, শয্যা।

মেঘা বলে, পাতা আর ফুলের শয্যা?

হাসান বলে, পুরোনো ভারতে ফিরে যাবো আজ রাতে।

মেঘা বলে, আমি আরো অতীতে ফিরে যেতে চাই।

সন্ধ্যার পর যখন আকাশে চাঁদ উঠেছে, বনের প্রতিটি পাতায় যখন আটকে আছে ডজন ডজন চাঁদ, পাতার ফুলের শয্যায় তখন খেলা শুরু হয় চিতাবাঘ ও হরিণীর। পাতা আর ফুলের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে তাদের শরীর, পাতার ফুলের গন্ধে ভরে ওঠে তাদের হৃদয়। তারা ক্লান্ত ও অক্লান্ত, তারা অবসাদগ্ৰস্ত ও চিরসজীব, তারা জীবিত ও তারা মৃত।

যখন রাত শেষ হয়ে এসেছে হাসান জিজ্ঞেস করে, তোমার এই বুকে কি কখনো অন্য কেউ ঘুমোবে, মেঘা?

মেঘা বলে, যেখানে একদিন হরিণ ঘুমিয়েছে সেখানে কখনো কোনো শুয়োরের স্থান হবে না।

হাসান বলে, আমি ওখানে চিরকাল ঘুমোতে চাই।

মেঘা বলে, আমি চিরকাল বুকে নিয়ে জেগে থাকতে চাই।

তিনটি দিন তিন মিনিটের মতো কেটে যায় রোগ, জ্যোৎস্না, ছায়া, অন্ধকারে; নখের দাঁতের রক্তিম ক্রিয়াকলাপে; চুম্বনে, চুম্বনে, সঙ্গমে, সঙ্গমে। শরীর সমস্ত মধু ঢেলে দেয় জঙ্গলের প্রতিটি পাতায়, প্রতিটি লোমকূপ চুইয়ে নিরন্তর ঝরতে থাকে চাক ভাঙা মধু; তাদের শরীর গ’লে মধু হয়ে ভোরবেলায় টলমল করতে থাকে সবুজ ঘাসের শিখায়, কচুপাতার মসৃণ করতলে; তাদের আলিঙ্গন, চুম্বন, সঙ্গমের দাগ লেগে থাকে গাছের ওপরের গোলগাল চাঁদের শুভ্ৰ শয্যায়; জ্যোৎস্নাবিহ্বল হয়ে সেটি গ’লে পড়তে থাকে শালের পাতায় পাতায়। মধু ঝরতে থাকে শালের পাতা থেকে, পাখিরা মধু পান ক’রে মুখর ক’রে রাখে বনভূমি; গুঞ্জনে মেতে ওঠে মৌমাছিরা, ফুলে ফুলে এতো মধু তারা আগে কখনো পায় নি।

কেটে গেছে কতো দিন? এক মাস? দেড় মাস? না কি মহাকাল?

একদিন বিকেলে মেঘা অফিসে এসে বলে, একটি চমৎকার সংবাদ আছে।

হাসান হেসে বলে, শুধু চমৎকার তার বেশি নয়?

মেঘা বলে, শ্রেষ্ঠতম সংবাদ।

হাসান জিজ্ঞেস করে, পৃথিবীতে কি নতুন কোনো পণ্য আসছে?

মেঘা বলে, পণ্যের থেকে অনেক বড়ো, স্বপ্ন।

হাসান জিজ্ঞেস করে, কী সেই স্বপ্ন?

মেঘা বলে, আমার ভেতরে এক নতুন কবি জন্ম নিচ্ছেন, কবিতা লিখছেন।

হাসান বলে, কবিগুরু এসে গেছেন? নোবেল প্ৰাইজের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন?

মেঘা বলে, হ্যাঁ, গীতাঞ্জলি অনুবাদ করছেন মনে হয়।

হাসান বলে, চলো, আজ প্রচুর খাবো, কবিকে এখন থেকেই প্রচুর খাওয়ানো দরকার, দেশে সুস্থ কবি চাই।

মেঘা বলে, তারপর?

হাসান বলে, তারপর আমাদের বাসায় ফিরবো।

মেঘা বলে, আমাদের?

হাসান বলে, হ্যাঁ।

বাসায় ফিরে তারা অরণ্যে আদিম হয়ে চায়ের পেয়ালা হাতে মেঝেতে বসে, রক্তিম চা, টলমল করতে থাকে তাদের শরীরের মতো।

হাসান মেঘাকে বলে, বাসায় ফোন ক’রে দাও তুমি এখানে থাকবে।

মেঝেতে গড়াতে গড়াতে মেঘা জিজ্ঞেস করে, কী বলবো?

হাসান তার ওপরে গড়িয়ে পড়ে বলে, বলবে তুমি এখানে আছো, এখানে থাকবে।

মেঘা বলে, বাসায় একটা হৈচৈ পড়ে যাবে না?

হাসান বলে, সব মহৎ ঘটনা শুরু হয় হৈচৈ দিয়ে, সব ঐতিহাসিক ঘটনা মূলত হৈ চৈ,  আজো তা হবে।

মেঘা বাসায় ফোন ক’রে বলে, আম্মা।

মেঘার আম্মা বলেন, রাইত বারোটা বাজে, তুই যে এখনও আসলি না, চিন্তায় চিন্তায় আমরা পাগল হইয়া আছি।

মেঘা বলে, আম্মা, আমি আজ আসবো না।

আম্মা বলেন, ক্যান আসবি না?

মেঘা বলে, আমি এখানেই থাকবো, আম্মা।

আম্মা জিজ্ঞেস করেন, কই থাকিবি তুই?

মেঘা বলে, আমার বাসায়, আম্মা।

আম্মা বলেন, তর বাসা কই? তর বাসা ত এইটা।

মেঘা বলে, না, আমি যেখানে আছি সেটা আমার বাসা, আম্মা।

আম্মা রেগে ওঠেন, তুই কি আমাগো না জানাইয়া বিয়া করছিস?

মেঘা বলে, না, আম্মা।

আম্মা বলেন, তুই কোনখানে আছস, ঠিকানা দে।

মেঘা বলে, কাল সকালে এসে আমি সব বলবো, আম্মা।

পরদিন মেঘার সাথে তাদের বাসার সামনের সড়ক পর্যন্ত যায় হাসান; সে নেমে অ্যাডে যায়, মেঘা চলে যায় তাদের বাসায়।

দুপুরেই মেঘার আব্বা ফোন করেন অফিসে, আমি মেঘার আব্বা।

হাসান বলে, আপনার সাথে দেখা করতে যাবো ব’লে আমি ভাবছিলাম।

মেঘার আব্বা বলেন, আমরাই আজ। আপনার সাথে দেখা করতে আসতে চাইতেছি।

হাসান বলে, কখন আসবেন?

মেঘার আব্বা বলেন, আপনেই সময় দেন।

হাসান বলে, সন্ধ্যার পর আমার বাসায় আসুন।

সন্ধ্যার পর মেঘা, তার আব্বা, একটি ছোটো বোন, এবং শক্তিশালী একটি পুরুষ আসে হাসানের বাসায়।

মেঘা হাসানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় সবাইকে।

মেঘার ছোটো বোনটি বলে, আপনার ঘরটি এতো সুন্দর!

হাসান বলে, তোমার ভালো লাগছে?

শক্তিশালী পুরুষটি, মেঘার মেজো চাচা, বলে, আমরা আসছি মেঘার লগে তোমার বিয়ার তারিক ঠিক করতে।

হাসান বলে, বেশ ভালো করেছেন।

শক্তিশালী পুরুষটি বলে, তারিখটা ঠিক করন দরকার।

হাসান বলে, আমি তো বিয়েতে বিশ্বাস করি না।

শক্তিশালী পুরুষটি বলে, বিয়াতে তুমি বিশ্বাস কর না, কিন্তু মাইয়াটারে ত প্র্যাগন্যাণ্ট কইর‍্যা ছারছো।

মেঘা চিৎকার ক’রে ওঠে, চাচা।

হাসান বলে, মেঘা আমার সাথে থাকবে।

মেঘার আব্বা বলেন, বিয়ে ছাড়া কি ক’রে থাকবো?

হাসান বলে, আমরা ভালোবাসি, মেঘা এখানেই থাকবে।

মেঘা বলে, আমরা ভালোবাসি, বিয়ে ছাড়াই তো আমরা ছিলাম, বিয়ে ছাড়াই থাকতে পারবো।

শক্তিশালী পুরুষটি বলে, বিয়া ছারা পুরুষমাইয়ালোক এক লগে শুইতে পারে না, জিনা আয়, তোমরা জিনা করছে।

মেঘা চিৎকার ক’রে বলে, চাচা।

হাসান বলে, আপনি উত্তেজিত হবেন না।

শক্তিশালী পুরুষটি বলে, তোমাগো দুইটারে পাথর মাইরা খুন কইর‍্যা ফ্যালন দরকার। তোমরা জিনা করছো।

মেঘার আব্বা বলেন, আপনারে আমরা পছন্দ করি, মেঘা যারে চায় তারে পছন্দ না ক’রে পারি না। আপনারে ভাল মানুষই মনে হচ্ছে, মেঘা আপনের সঙ্গে সুখেই থাকবো, এখনই কাজি ডেকে আনি, বিয়াটা পড়াই দেই।

হাসান বলে, বিয়েতে আমার বিশ্বাস নেই, কাজিরও দরকার নেই।

মেঘা বলে, আব্বু, বিয়ে লাগবে না, আমরা ভালোবাসি; আমাদের সন্তান হবে ভালোবাসার, আমি এখানেই থাকবো।

শক্তিশালী পুরুষটি বলে, বিয়া ছাড়া তুই থাকতে পারবি না, জিনা করতে আমি দিমু না; দুনিয়ায় ইসলাম শ্যাশ হইয়া যায় নাই; আমি দুইটারেই খুন কইর‍্যা ফেলুম।

মেঘা বলে, আব্বা, তোমরা যাও, আমি এখানেই থাকবো, সুখে থাকবো; আমার জন্যে চিন্তা কোরো না।

শক্তিশালী পুরুষটি বলে, তোমাগো সুখে থাকন আমি বাইর কইর‍্যা দিমু, জিনা করতে আমি দিমু না।

হাসান বলে, আপনি বেশি ক্ষেপে গেছেন।

চাচা বলে, আগেই ভাইরে কইছিলাম মাইয়াগুলিরে ল্যাখাপরা শিখানের কাম নাই, নাচগান শিখানের কাম নাই, মডেল বানানের কাম নাই। তাই ত মাইয়া আইজ জিনা কইর‍্যা বেরায়, প্যাট বানায়।

মেঘা বলে, চাচা, আপনি চুপ করুন।

শক্তিশালী পুরুষটি বলে, আমি চুপ করুম না, জিনা করতে আমি দিমু না।

হাসান বলে, আপনি আমাদের নিয়ে ভাববেন না, আমাদের জীবন আমাদের।

শক্তিশালী পুরুষটি বলে, ভাবতে আমারে হইবোই, ইসলাম আছে।

তারা বেরিয়ে যায়, মেঘা থেকে যায় হাসানের সাথে; তার বাসায়, তাদের বাসায়। যাওয়ার সময় মেঘার চাচা, শক্তিশালী পুরুষটি, হাসানের ও মেঘাম দিকে এমনভাবে তাকায় যেনো সে একটি পবিত্র জরুরি কাজ অসম্পন্ন রেখে যাচ্ছে, ওই কাজটি তাকে সম্পন্ন করতে হবে অচিরে।

হাসান বলে, মেঘা, আমাদের জীবনে বিপর্যয় শুরু হলো।

মেঘা বলে, তোমাকে আমি ভালোবাসি, আমাকে তুমি ভালোবাসো, এর পাশে কোনো বিপর্যয়ই বড়ো নয়।

হাসান বলে, তোমার চাচাকে বেশ ভয়ঙ্কর মানুষ মনে হলো।

মেঘা বলে, হ্যাঁ, দরকার হ’লে সে খুন করতে পারে।

হাসান বলে, আমি হয়তো খুন হয়ে যাবো।

মেঘা বলে, তাহলে আগে আমি খুন হবো।

ছুরিকার ছায়ার নিচে একটি দীর্ঘ নগ্ন পরস্পরভেদী আলিঙ্গনে তাদের রাত কেটে যায়।

পরদিন সন্ধ্যায় মেঘার আম্মা আসেন মেঘার দুটি বোনকে নিয়ে। একটি বোন আগের দিনও এসেছিলো, সে মুগ্ধ; নতুন বোনটিও যে এসেই মুগ্ধ হয়ে গেছে, তা বোঝা যায়। তার চোখ দেখলেই এমনকি মেঘার আম্মার চোখেও মুগ্ধতা।

মেঘা বলে, আম্মা, সব দেখে বুঝতে পারছে না আমি ভালো আছি?

আম্মা বলেন, তুই ভালো আছস তা ত দেখতেই পাইতেছি, কিন্তু নিয়ম মতো বিয়াটা হওনা দরকার।

মেঘা বলে, তার কোনো দরকার নেই।

আম্মা বলেন, জামাইরেও আমার পছন্দ হইছে, তারা খালি কাজি ডাইক্যা বিয়াটা কইর‍্যা নে।

মেঘা বলে, তোমার পছন্দ হয়েছে। এতেই আমি সুখী; কাজি ডাকার দরকার নেই, আম্মা।

আম্মা বলেন, দরকার আছে। দ্যাশে সমাজ আছে, ধর্ম আছে, নিয়ম আছে; তা ছাড়া আমার আরো তিনটা মাইয়া আছে, তাগো বিয়া দিতে লাগবো।

মেঘা হাসানের দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি কী বলো, বিয়ে কি করতেই হবে; কাজিকে কি ডেকেই ফেলবো?

হাসান বলে, কোনো দরকার নেই।

মেঘার আম্মা বলেন, বিয়া যদি না করো, কাবিন যদি না করো, তারপর তুমি যদি আমার মেয়েটারে ছাইরা দেও, তখন কে দেখবো?

হাসান বলে, ছেড়ে দেয়ার কথা ওঠে না; আর ছেড়ে দিলে ওই কাবিন আমাদের ধরে রাখতে পারবে না।

মেঘা বলে, আম্মা, কাবিনের দরকার নেই আমার।

আম্মা বলেন, বিয়া ছাড়া পোলাপান হইলে লোকে জাউর‍্যা বলবো, সমাজে তার জায়গা হইবো না।

হাসান বলে, সমাজ বদলে যাচ্ছে, আপনি ভাববেন না।

আম্মা বলেন, মেঘা, তুই আমার সঙ্গে ল, হাসান তরে বিয়া কইর‍্যা উঠাই লইয়া আসবো।

মেঘা বলে, না, আম্মা, আমি আজ যাবো না, পরে যাবো।

কয়েকটি দিন তারা বৈষ্ণব পদাবলির মতো। রবীন্দ্রনাথের কবিতার মতো যাপন করে, যেখানে আছে শুধু হৃদয় যেখানে শুধু শরীর, সমাজসংসার মুছে গেছে যেখান থেকে, যেখানে শুধু থারথার ক’রে কাঁপতে থাকে অজস্র অমরাবতী। মেঘা মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলে বোনদের সাথে, বোনরা বিকেলে অল্প সময়ের জন্যে এসে বেড়িয়ে যায়; হাসানের মনে হয় পৃথিবীতে অবসান ঘটেছে সব বিপর্যয়ের।

কিন্তু এক সন্ধ্যায় আসেন মেঘার আব্বা ও শক্তিশালী চাচা।

আব্বা বলেন, আমরা আবার আসলাম, কাজি ডেকে আইজ বিয়েটা পড়াই যাইতে চাই।

হাসান বলে, তার তো কোনো দরকার নেই।

মেঘা বলে, আব্বা, আমরা এভাবেই ভালো আছি।

শক্তিশালী চাচা বলে, বিয়া ছারা তরে এইখানে থাকতে দিমু না; তাইলে দুইটারেই সাজা পাইতে হইবো।

মেঘা বলে, চাচা, আপনি গুণ্ডামি করতে আসবেন না।

শক্তিশালী চাচা বলে, ভাইজান, আপনের এই ব্যাশ্যা মাইয়াটার কথা শোনেন, আমার মাইয়া হইলে এখনই খুন কইর‍্যা ফেলতাম। দুইটারে এক লগে খুন কইর‍্যা ফেলতাম।

হাসান বলে, আপনি খুব হিংস্র মানুষ।

শক্তিশালী চাচা বলে, তা তুমি সময় আসলে টের পাইবা। সেই জন্যেই বলতেছি। কাজি ডেকে আইজই বিয়াটা পরাই যাই।

হাসান বলে, না।

আব্বা বলেন, মেঘা, তুই আজ আমার সঙ্গে ল, কয়দিন পর চইল্যা আসিস।

মেঘা বলে, আজ না, আব্বা, দু-এক দিন পর যাবো; আমার বইপত্রগুলো আনতে হবে।

আব্বা বলেন, তরে বাসায় না দেখলে আমার ভাল লাগে না।

মেঘা বলে, আমি যাবো, আব্বা।

শক্তিশালী চাচা বলে, আইজই তরে যাইতে হইবো, আমি আর জিনা সহ্য করুম না।

মেঘা বলে, চাচা, আপনি গুণ্ডামি করবেন না।

শক্তিশালী চাচা বলে, ভাই মনে হইতেছে মুসলমান না, ভাই জিনা মানলেও আমি মানুম না; দুইটারেই সাজা পাইতে হইবো।

মেঘা বলে, চাচা, আপনি দুটি বউ তালাক দিয়েছেন, এখনো আপনার তিনটি বউ আছে।

শক্তিশালী চালা বলে, আমি শরিয়ত মোতাবেক তালাক দিছি, আমি বিয়া করছি, জিনা করি নাই।

মেঘার আব্বা বলেন, আমার সঙ্গে, ল, মেঘা ৷

মেঘা বলে, আমি আগামীকাল আসবো, আব্বা।

পরদিন বিকেলে মেঘা তাদের বাসায় যায়; হাসান তাকে বাসার সামনের পথ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে নিজের ঘরে এসে অপেক্ষা করতে থাকে মেঘার ফোনের, কিন্তু মেঘা ফোন করে না; হাসান নিজেই ফোনের পর ফোন করতে থাকে, কিন্তু ওই দিকে ফোন নিস্তব্ধ, হয়তো নষ্ট। হাসান আর ফোন না ক’রে উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে ফোনের ও মেঘার। একবার বাথরুমে গেলে হঠাৎ ফোন বেজে ওঠার শব্দ পায় সে, দৌড়ে বেরিয়ে এসে সে বুঝতে পারে ওটা ফোনের শব্দ ছিলো না, নিজের ভেতরেই বেজে উঠেছিলো। ওই শব্দ; কয়েকবার তার মনে হয় কলিংবেল বেজে উঠলো, গিয়ে দেখে কেউ নেই। সে কি বেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে মেঘার জন্যে? না কি গিয়ে উঠবে মেঘাদের বাড়ি? একবার নিচে নেমে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে; তখন তার মনে হয় হয়তো ফোন করেছে মেঘা, সে ঘরে ফিরে আসে, এসেই পড়ে অসীম নিস্তব্ধ শূন্যতার মধ্যে। কটা বাজে? সাড়ে দশটা বেজে গেছে। তাহলে কি মেঘা আসবে না? আসবে না, মানে হচ্ছে তাকে আটকে রাখা হয়েছে, সে না এসেই পারে না, আটকে রাখা হয়েছে মেঘাকে; সে কি মেঘাকে আনতে চ’লে যাবে মেঘাদের বাসায়? যাবে, তবে আরো কিছুক্ষণ দেখা যাক, হয়তো এখন মেঘা পথে; সে যাবে, সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত দেখবে, তারপরই বেরিয়ে পড়বে। হাসান বোধ করে সে কাঁপছে।

একটু পরেই কলিংবেল বেজে ওঠে; দৌড়ে গিয়ে দরোজা খোলে হাসান।

মেঘা নয়, চারটি মুখোশপরা, লোক তাকে নিয়ে ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ে, দরোজা বন্ধ ক’রে দেয়।

হাসান জিজ্ঞেস করে, আপনারা কারা?

তারা কোনো কথা বলে না। একজন ঘুষি দিয়ে ফেলে দেয় তাকে, এবং মুখ চেপে ধ’রে টেনে হাসানকে তার ঘরের ভেতরে নিয়ে যায়।

হাসান চিৎকার করার চেষ্টা করে, পারে না; নাড়ার চেষ্টা করে, পারে না।

টেনে তারা হাসানের জিন্স খুলে ফেলে, হাসান বাধা দিতে পারে না।

তিনজন হাসানকে জোরে মেঝেতে চেপে রাখে, এবং একজন একটি ধারালো ছুরিকা দিয়ে গোড়া থেকে কেটে ফেলে হাসানের শিশ্নটি।

হাসান প্রথম বুঝতে পারে না, একবার চিৎকার ক’রে ওঠে; তারা হাসানকে মেঝেতে ফেলে রেখে শিশ্নটি নিয়ে চ’লে যায়।

হাসানের একটি হাত গিয়ে পড়ে তার শিশ্নের গোড়ায়, সে তীব্র যন্ত্রণা বোধ করে; তাকিয়ে দেখে তার শিশ্নটি নেই–সে কোনো যন্ত্রণা বোধ করে না।

এটা নেই? হাসি পায় হাসানের। এটা নেই?

আমি আছি?

মেঘা, মেঘা আছে?

রক্ত করছে; হাসান উঠে টলতে টলতে ডেটলের শিশিটা নেয়, বড়ো এক মুঠো তুলো নেয়; পুরো শিশিটা ঢেলে দেয় তুলোয়, এবং শিশ্নের গোড়ায় চেপে ধ’রে অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে যায়।

কিন্তু তার হাত যেনো চেপে ধ’রে থাকে শিশ্নমূল।

মেঘাদের বাসায় মেঘার ঘরে তখন মেঘাকে ঘিরে আছে মেঘার শক্তিশালী চাচা ও মেঘার আব্বা; বেরোনোর চেষ্টা ক’রে ক’রে ক্লান্ত হয়ে সে বিছানার ওপর বসে আছে ছিন্নভিন্ন, ভবিষ্যৎহীন, মহাজগতে একলা, অন্ধ। অন্ধ, তবু সে দেখতে পায় একটি লোক ঘরে ঢুকলো, মেঘার শক্তিশালী চাচার হাতে কাপড়ে মোড়ানো একটি বস্তু দিলো, বেরিয়ে গেলো।

শক্তিশালী চাচা বলে, কাম ঠিক মতো হইছে?

লোকটি বলে, হইছে।

শক্তিশালী চাচা মেঘার আব্বাকে বলে, ভাইজান, আপনে বাইরে যান; আমি অর লগে কয়টা কথা কই।

মেঘার আব্বা বেরিয়ে গেলে শক্তিশালী চাচা বলে, ওই শয়তানটারে সাজা দেওয়া হইয়া গেছে, বাকি আছে তর সাজা।

মেঘা কোনো কথা বলে না।

শক্তিশালী চাচা বলে, আগামীকাইল তর গর্ভপাত করতে হইবো।

মেঘা চিৎকার করে, না, না, না।

শক্তিশালী চাচা বলে, তরেও খুন করা শরিয়তের নিয়ম, তয় তরে খুন করুম না। গর্ভপাতই হইবো তর সাজা।

মেঘা চিৎকার করে, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি হাসানের কাছে যাবো।

শক্তিশালী চাচা বলে, সেইটা আর নাই।

মেঘা ভয়ে কেঁপে তাকায় শক্তিশালী চাচার দিকে। শক্তিশালী চাচা হাসানের শিশ্নটা মেঘার দিকে ছুড়ে দিয়ে বলে, দ্যাখ, যেইটা দিয়া শয়তানটা জিনা করছে, সেইটা কাইট্যা লইয়া আসছি। শয়তানটা আর নাই।

মেঘা চিৎকার ক’রে বলে, না।

সে অজ্ঞান হয়ে মেঝের ওপর গড়িয়ে পড়ে।

শক্তিশালী চাচা ঘর থেকে বেরোয়, বেরিয়ে তালা লাগিয়ে দেয়।

সকালে মেঘার ঘর খুলে প্রথম ঢোকেন মেঘার আম্মা; ঢুকেই চিৎকার ক’রে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। সবাই দৌড়ে এসে দেখে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে ঘরের একপাশে ম’রে প’ড়ে আছে মেঘা ৷

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x