(৫)

ফোন বাজছে, তার ধরতে ইচ্ছে করছে না, বেজে চলছে ফোন, ধরতে ইচ্ছে করছে না; সে জানে ফোনে ওই পাশে শ্যামলী ফরহাদ–তার একদা আনন্দ আর এখনকার অশেষ ক্লান্তি যন্ত্রণা রক্তক্ষরণ। তার ধরতে ইচ্ছে করছে না, কিন্তু সে ধরবে, না ধরলে কিছুক্ষণ পর সে শূন্যতা বোধ করবে।

হাসান বলে, হ্যালো।

শ্যামলী ফরহাদ বলে, তোমার এতো সময় লাগলো ফোন ধরতে?

হাসান বলে, আমি দুঃখিত, একটু দেরি হয়ে গেলো।

শ্যামলী বলে, কাজের মেয়েটিকে নিয়ে শুয়ে আছো না কি? তোমার কাজের মেয়েটি তো রূপসী আর যুবতী।

হাসানের রক্তের ভেতর দিয়ে একটি ছুরিকা তীব্ৰ বেগে ছুটে চলে।

হাসান বলে, হ্যাঁ, সে রূপসী এবং যুবতী, আঠারো বছর।

একগুচ্ছ ছুরিকা হয়তো আরো তীব্ৰ বেগে ছুটে চলছে শ্যামলীর রক্তের ভেতর দিয়েও; শ্যামলী বলে, এই জন্যেই তোমাকে ক্লান্ত লাগছে? কবার করলে? তোমার তো আবার ক্ষুধার শেষ নেই।

হাসান বলে, দু-বার, না তিনবার মনে নেই, আরেকবার উদ্যোগ নিচ্ছি, খুব ক্ষুধা, সারাজীবনেও মিটবে না।

হাসান ফোন রেখে দেয়, তবে আবার ফোন বেজে ওঠে, বাজতে থাকে, বাজতে থাকে, বাজতে থাকে; অথচ শ্যামলী ফরহাদের ফোনের জন্যে সে এক সময় ভোর হ’তে না হ’তেই অ্যান্ড ২০০০-এ গেছে, সন্ধ্যার অনেক পরে ফিরেছে অ্যাড থেকে; আর শ্যামলীর জন্যেই সে নিজের ফোন নিয়েছে, টাকা ছিলো না, ধার করতে হয়েছিলো শ্যামলীর থেকেই অর্থাৎ শ্যামলীই টাকাটা গুজে গিয়েছিলো তার হাতে, টাকাটা শ্যামলীকে আর ফেরত দেয়া যায় নি, যদিও হাসান বারবার চেষ্টা করেছে। ফোন এক সময় ভরা ছিলো সুধায়, আজ ভ’রে উঠেছে তীব্রতম কালকূটে— মানুষের সম্পর্কের এই অবধারিত পরিণতি। এটা বেজে উঠলে আজ সে ভয় পায়: মনে হয়। মনসার হাজার হাজার সাপ ঢুকছে তারের ভেতর দিয়ে, ওই তার সাপের মতো ফণা তুলছে, সেটটাকে মনে হয় কুণ্ডলিপাকিয়ে শুয়ে থাকা বিষধর, সে এক লখিন্দর, আটকা প’ড়ে আছে লোহার বাসরে।

শ্যামলী ফরহাদ, তার সুধা, তার একরাশ কবিতার অপার্থিব উজ্জ্বল প্রেরণা, তার কবিতাকে কাম থেকে প্রেমের দিকে নিয়ে আসার পার্থিব দেবী, তার প্রেম, তার কাম, আজ হয়ে উঠেছে আদিগন্ত বিভীষিকা। হায়, মানুষ, দণ্ডিত মানুষ, তোমার দণ্ডিত পরস্পরকে ছিন্নভিন্ন করার দণ্ডে; যেদিন তোমরা প্রথম চুম্বন করো সেদিনই তোমরা হনন শুরু করো।

 

হাসানের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ বেরিয়েছে, আজ দশ বছর হলো, বেশ প্রশংসা এবং একটি দুটি ছোটােখাটাে পুরস্কার পাচ্ছে; তবে সবচেয়ে অমূল্য যা সে পায় তার আটাশ বছর বয়সে, তা হচ্ছে শ্যামলী ফরহাদ, যে আকাশভরা চাঁদের মতো বনভরা পুষ্পের মতো ঢোকে তার জীবনে, সে ভ’রে ওঠে। শূন্যতায় মানুষ বাঁচতে পারে না, ভ’রে উঠতে হয় মানুষকে: শ্যামলী তার ভ’রে ওঠা।

এক বিকেলে একটি টেলিফোন আসে, আমি কবি হাসান রশিদের সাথে একটু কথা বলতে চাই।

হাসান বলে, আমি হাসান বলছি।

ওই কণ্ঠ বলে, আমি আপনার কবিতার একজন অনুরাগিণী।

শুধু কণ্ঠ, শুধু কণ্ঠস্বর, স্বরভরা শুধু অনুরাগ।

হাসান বলে, আপনার কথা শুনে আমি ধন্য হলাম, সুখী হলাম।

শুধু কণ্ঠস্বর, শুধু কণ্ঠ, কণ্ঠস্বরভরা শুধু অনুরাগ।

ওই কণ্ঠ বলে, আপনি আমার প্রিয় কবি, প্রিয়তম কবি।

হাসান বলে, আমি মুগ্ধ হচ্ছি। ধন্য হচ্ছি। ভ’রে উঠছি।

সে কি একটু বাড়িয়ে বলছিলো? না। তার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তে তার এমনই মনে হয়েছিলো, কয়েক দিন ধ’রে এমনই মনে হয়েছিলো।

ওই কণ্ঠস্বর ফোন রেখে দেয়, হাসান তবু সারা বিকেল সন্ধ্যা মধ্যরাত স্বপ্নে জাগরণে ওই স্বর শুনতে পায়; মাটি নীলিমা জলভূমি বনভূমি ভ’রে যায় ওই স্বরে, সারা শহরে ওই স্বর ছাড়া কোনো স্বর নেই, ট্রাক কোনো শব্দ করছে না, গাড়ি সব হর্নে চারপাশ জীর্ণ করছে না, শুধু একটি কণ্ঠস্বরই অসুস্থ শহরকে সুস্থ ক’রে রেখেছে, তার ভেতর থেকে জেগে উঠছে পংক্তি চিত্রকল্প ধ্বনি কল্প। শহরের কোন প্রান্ত থেকে আসতে পারে ওই স্বর? হাসানের মনে হয় ওই স্বরে সুগন্ধ আছে, সেই সুগন্ধের রেশ ধ’রে সে পৌঁছে যেতে পারে স্বরের দিকে। সে ওই স্বর দেখতে পায়, ওই স্বরের একটি শরীর কেঁপেকেঁপে ওঠে তার চোখে, সে স্বরের সুগন্ধ পায়, তার সুগন্ধ টেনে নিতে থাকে বুকের ভেতরে, জিভ দিয়ে সে চুষতে থাকে স্বরের জিভ আর ওষ্ঠ, সে আঙুল বোলাতে থাকে। ওই স্বরের কোমল শরীরে, আঙুল পাহাড়ে উঠতে থাকে উপত্যকায় নামতে থাকে নদীতে ভুবতে থাকে।

কয়েক দিন হাসান ওই স্বরের মুঠোতে পালকের মতো প’ড়ে থাকে।

আবার এক বিকেলে স্বর বেজে ওঠে, আমি কবি হাসান রশিদকে চাই।

হাসান বলে, কতোখানি চান?

স্বর বলে, সম্পূর্ণ চাই।

হাসান বলে, আপনাকে সম্পূর্ণ দিলাম।

স্বর আমগাছের ঘন সবুজ পাতার ওপর বৃষ্টির ফোঁটার মতো হেসে ওঠে, পিচঢালা পথের ওপর জ্যোৎস্নার মতো ছড়িয়ে পড়ে, আমি আপনার অনুরাগিণী, অ-নু-রা-গি-ণী, আপনি আমার প্রিয়তম কবি।

হাসান বলে, সাত দিন ধ’রে আপনি আমার কাছে কণ্ঠস্বর হয়েই আছেন, কিন্তু আপনার তো একটা নাম আছে?

কণ্ঠস্বর বলে, আছে, কিন্তু সেটা তুচ্ছ।

হাসান বলে, কিন্তু নাম ছাড়া কাউকে কল্পনা করা যায় না, আপনাকে অন্তত আমি কল্পনায় দেখতে চাই।

কণ্ঠস্বর বলে, বাস্তবে দেখতে ইচ্ছে করে না?

হাসান বলে, করে।

কণ্ঠস্বর বলে, কখন?

হাসান বলে, এই মুহূর্তেই।

কণ্ঠস্বর বলে, আমি তো বাতাস নাই যে এ-মুহূর্তেই উপস্থিত হবো, পাখি নাই যে উড়ে যাবো।

হাসান বলে, আপনি যা সেভাবেই আসুন।

কণ্ঠস্বর বলে, অফিসে থাকবেন, আমি আসছি।

সেই শুরু, সেই জীবনের আশ্চর্য বদল, সেই গুচ্ছগুচ্ছ তারকাকে মুঠোতে পাওয়া, সেই অপূর্ব আলোকিত অন্ধকারের দিকে যাত্রা।

হাসানকে অ্যান্ড ২০০০–এ যেতে হবে, দেরি হয়ে যাচ্ছে, বারবার টেলিফোন বাজছে, সে ধরছে না, ধরতে ইচ্ছে করছে না। কী হবে শ্যামলীকে ধ’রে, কী হবে সুন্দর ক্লান্তিকে ধ’রে?

অবশেষে সে টেলিফোন ধরে, এবং অপরপারে খুব উদ্বিগ্ন স্বর শুনতে পায়, কে বলছেন? হাসান রশিদ সাহেব বলছেন, হাসান সাহেব?

হাসান বলে, হ্যাঁ, হাসান বলছি।

আহমেদ মাওলা বলে, আপনেরে টেলিফোন কইর‍্যা কইর‍্যা আমরা পাগল হইয়া যাইতেছি, হার্ট অ্যাটাক হইয়া যাইতেছে, আপনে ধরতেছেন না ক্যান?

আহমেদ মাওলা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে, আপনে ভাল আছেন ত? বলেন, আপনে ভাল আছেন ত?

হাসান বলে, হ্যাঁ, ভালোই তো আছি; কিন্তু কী হয়েছে বলুন?

আহমেদ মাওলা বলে, এখন বলুম না, তাড়াতাড়ি আসেন, আসলে বলুম।

আবার টেলিফোন বেজে ওঠে, হাসান ধরতেই আলাউদ্দিন বলে, আরো দোস্ত, তাইলে তুমি আছো, বাচলাম, তোমারে ফোন কইর‍্যা শ্যাষ হইয়া যাইতেছি।

হাসান জিজ্ঞেস করে, কেনো, কী হয়েছে?

আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত, তুমি তাড়াতাড়ি অ্যাডে আসো, আমিও যাইতেছি, তোমারে না দেখলে বিশ্বাস করুম না যে তুমি আছো।

চৌধুরী ব্রাদার্সের ছোটাে পুত্রটি ফোন করে, কবি হাসান রশিদ বলছেন?

হাসান বলে, হ্যাঁ।

সে বলে, আপনি ভালো আছেন?

হাসান বলে, হ্যাঁ, ভালো আছি, কিন্তু কেনো বলুন তো?

ছেলেটি বলে না, এমনিই, না এমনিই।

সে ফোন রেখে দেয়। হাসান চঞ্চল বিচলিত হয়ে ওঠে, নিশ্চয়ই কিছু ঘটেছে তাকে ঘিরে, যার জন্যে এই উদ্বিগ্ন চাপা অস্বস্তিকর ফোন।

হাসান একটি বেবি নিয়ে দ্রুত অ্যাডে পৌঁছে, আরো দ্রুত পৌঁছতে পারলে সে এবং সবাই আরো বেশি স্বস্তি পেতো। অফিসে ঢুকতেই সবাই তাকে ঘিরে ধরে, জড়িয়ে ধরে, কেউ কেউ তার গালে গাল ঘষে, খুবই বিহ্বল বোধ করে সে।

আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত, গুজব রটছে যে কবি হাসান রশিদ খুনী হইয়া গ্যাছে, শুইন্যা আমরা পাগল হইয়া গেছি।

আলাউদ্দিন তাকে জড়িয়ে ধরেছে, আর ছাড়তে চায় না; সেও ধ’রে রাখে। আলাউদ্দিনকে, তারও ছাড়তে ইচ্ছে করে না।

হাসান মনে মনে নিজেকে জিজ্ঞেস করে, আমি কি মৃত, আমি কি মৃত? শ্যামলীর সাথে এখন আমার যে-সম্পর্ক, তাতে আমি কি মৃত নাই?

আহমেদ মাওলা বলে, গুজব শুইন্যা আমরা পাগল হইয়া গেছি, আপনেরে দেইখ্যা কানাতে ইচ্ছা করছে।

আহমেদ মাওলা তাকে জড়িয়ে ধ’রে কাঁদতে থাকে।

হাসান হেসে বলে, খুন। আমি হতে পারি, তবে এখনো হই নি; আপনারা সবাই প্রস্তুত থাকুন।

আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত তুমি বাইচা আছো তাতে আমরা বাইচা আছি; তয় খুন একজন হইছে, আমি খবর লইয়া জানলাম কবি হাসান করিম খুন হইয়া গ্যাছে কাইল রাইতে।

হাসান বলে, তাই না কি? হাসান করিম খুন হয়েছে?

আলাউদ্দিন বলে, দোস্ত, তোমাগো নামের মিল আছে, আর তুমিই বেশি বিখ্যাত বইল্যা গুজব ছড়াইয়া পড়ছে যে তুমি খুনী হইয়া গ্যাছো।

হাসানের এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়, তার মনে হয়। সেই খুন হয়ে গেছে। হাসান করিমের সাথে তার সামান্য হ’লেও একটা জীবন ছিলো, দেখা হ’লে অন্তত তারা একবার হাসতো পরস্পরের দিকে চেয়ে, তার সেই জীবনটি খুন হয়ে গেছে। তাদের আর দেখা হবে না, মৃদু হাসা হবে না। কেউ খুন হ’লে সে একা খুন হয় না, তার পরিচিতরাও একটু একটু খুন হয়।

হাসান ও আলাউদ্দিন যায় হাসান করিমের বাসায়; গিয়ে দেখে ছোটােখাটাে ভিড় জমেছে, কাঁদছে হাসান করিমের স্ত্রী, দুটি বাচ্চা, আর হাসান করিমের লাশ পড়ে আছে। কয়েকটি পুলিশও দাঁড়িয়ে আছে। এখানে ওখানে।

হাসানকে অনেকেই জড়িয়ে ধরে, হাসান বিব্রত বোধ করে, তারা যেনো খুন হওয়া হাসান করিমকে জড়িয়ে ধরছে তাকে জড়িয়ে ধ’রে।

একজন তাকে জড়িয়ে ধ’রে বলে, আমি ভেবেছিলাম। আপনিই খুন হয়েছেন, সারা রাইত ঘুমাইতে পারি নাই, আমি আপনার আরো কবিতা পড়তে চাই।

লোকটিকে সে দেখেছে আগে, চেনে না; লোকটি তাকে ধ’রে কাঁদতে থাকে, হাসানের মনে হয় সেও কেঁদে ফেলবে।

হাসান চেনা একজনকে জিজ্ঞেস করে, কেনো এমন ঘটলো?

তিনি বলেন, হাসান করিম সর্বহারা দলের সদস্য ছিলেন, তাদের দলে এখন ভাঙাভাঙি আর খুনখুনি চলছে, শুদ্ধি অভিযান চলছে, তিনি হয়তো নিজের দলেরই কারো হাতে খুন হয়েছেন।

আরেকজন বলেন, কাল সন্ধায় তার পরিচিত কয়েকজন তাঁর সাথে দেখা করতে আসে, তাদের সাথে তিনি বের হন, বের হওয়ার সাথে সাথেই তারা তাঁকে গুলি করে।

হাসান জিজ্ঞেস করেন, হাসান করিমের স্ত্রী তাদের চেনেন?

লোকটি বলেন, হয়তো চেনেন হয়তো চেনেন না; তবে তারা তার দলেরই।

বিপ্লবীরা একে অন্যকে এখন সমাধান করছে, নিজেদের সমাধান ক’রে ক’রে একদিন তারা পৃথিবীতে সর্বহারার সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত করবে।

 

শ্যামলী ফরহাদ কিছুক্ষণ পরেই, যখন সন্ধ্যা নেমে আসছে, প্রথম এসেছিলো তার কাছে; এবং হাসান তাকে দেখে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলো।

কণ্ঠস্বর বাস্তব রূপ নিয়ে এসেছিলো, কিন্তু ওটাকেই হাসানের মনে হয়েছিলো সবচেয়ে অবাস্তব ঘটনা, সবচেয়ে বড়ো বিস্ময়।

কণ্ঠস্বর এসে বলেছিলো, আমি এসেছি, একটু দেরি হয়ে গেলো।

হাসান স্থিরভাবে শ্যামলীর দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, হ্যাঁ, এক শতাব্দীর মতো দেরি, তবে আমি আরো কয়েক শতাব্দী অপেক্ষা করতে পারতাম।

কণ্ঠস্বর আনন্দে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে বলেছিলো, পারতেন। কয়েক শতাব্দী অপেক্ষা করতে? দশ, বারো, তিরিশ শতাব্দী?

হাসান বলেছিলো, মহাজাগতি ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত আপনার জন্যে অপেক্ষা করতে পারতাম, তারপরও মনে হতো খুবই কম অপেক্ষা করলাম।

কণ্ঠস্বর বলেছিলো, ততোদিনে আপনি আমাকে ভুলে যেতেন।

হাসান বলেছিলো, মৃত্যুর পরও মনে পড়তো যে আপনি আসবেন ব’লে কথা দিয়েছিলেন, তখনো অপেক্ষা ক’রে থাকতাম।

কণ্ঠস্বর বলেছিলো, চলুন আমার সাথে।

হাসান জিজ্ঞেস করেছিলো, কোথায়? কণ্ঠস্বর বলেছিলো, আপনি যেখানে যেতে বলবেন।

পৃথিবীর, মহাজগতের কোনাে এলাকা সে চেনে না; তাই সে কোথাও যেতে বলতে পারে না। তার মনে পড়ে একটি হিজলগাছের ছায়াকে, তার লাল চেলিকে, সে কি সেই হিজলগাছের নিচে যেতে বলবে? সে কি বলবে, চলুন। একটি পুকুরপারে, যেখানে ঢুকছে জোয়ারের জল?

হাসান বলেছিলো, আপনার যেখানে ইচ্ছে আমাকে নিয়ে চলুন, আমার ইচ্ছে হচ্ছে আমাকে কেউ যেখানে ইচ্ছে নিয়ে যাক, যে-কোনো স্বর্গে যে-কোনো নরকে যে-কোনো আকাশে যে-কোনো পাতালে।

কণ্ঠস্বর বলেছিলো, আমিই তো এমন ইচ্ছে নিয়ে বেরিয়েছি, বলতে এসেছি যেখানে ইচ্ছে আমাকে নিয়ে চলুন, যে-কোনো আলোতে যে-কোনো অন্ধকারে যেকোনো আগুনে যে-কোনো জ্যোৎস্নায়।

হাসান বলেছিলো, আমরা দুজনেই হয়তো মুক্তি চাচ্ছি। চারপাশের শেকল থেকে, আমাদের ভেতরের শোকাল থেকে।

কণ্ঠস্বর বলেছিলো, আমরা সবাই বন্দী, কেউ সুখকররূপে কেউ অসুখকররূপে; তবে আমি বন্দী, আপনি হয়তো বন্দী নন; কবিরা তো মুক্ত।

হাসান তাকে সেদিন যেখানে ইচ্ছে সেখানে নিয়ে যেতে পারে নি, শ্যামলীর গাড়িতে হিজলগাছের নিচে বা তীব্ৰ জোয়ারভরা পুকুরের পারে যাওয়া সম্ভব ছিলো না, আর কোনো জায়গাও তার মনে পড়ছিলো না, যাওয়ার যোগ্য মনে হচ্ছিলো না, শ্যামলীই তাকে নিয়ে গিয়েছিলো এক অভিজাত রেস্তোরাঁয়। একটি নারী, সম্পূর্ণ নারী, সম্পূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠোঁট স্তন উরু বাহু গাল ভুরু নিয়ে তার মুখোমুখি বসে আছে, এটা পরম বিস্ময় মনে হচ্ছিলো তার; সে ধ’রে নিয়েছিলো সে শুধু নারীর স্বপ্ন দেখবে, স্বপ্ন দেখে কবিতা লিখবে, কোনো বাস্তব নারী দেখবে না; মুখোমুখি বসে হাসান তীব্র আকর্ষণ বোধ করছিলো শ্যামলীর প্রতি, যা কোনো স্বপ্নের নারীর প্রতিও সে বোধ করে নি—তার মুখে সে হিজল ফুলের লাল চেলি দেখতে পাঁচ্ছিলো, প্রবল বৃষ্টিতে হিজল ফুল ভেসে যাচ্ছে তার মুখের ওপর দিয়ে, বুকে বাহুতে দেখতে পাঁচ্ছিলো জৈষ্ঠের জোয়ার; তার মুখ চোখ ঠোঁট চুল আঙুল বাহু তাকে টানছিলো। যেমন মেঘ জ্যোৎস্না আষাঢ় শ্রাবণ তাকে টানে। কী সে বোধ করছিলো? প্ৰেম? কাম? শরীরের জন্যে শরীর? সে শ্যামলীকে ছাড়া শ্যামলীর আর কিছু জানে না, জানার কোনো প্রয়োজন আছে ব’লে তার মনে হয় নি, শ্যামলীকে দেখার পর আর কিছু জানার থাকে না।

কয়েক দিন পরই এক দুপুরে সে শ্যামলীকে নিয়ে এসেছিলো তার ঘরে।

সে কি আনতে পারে ওই স্বপ্নকে? ওই স্বপ্নই এসেছিলো তার ঘরে; তার ঘর হয়ে উঠেছিলো অবাস্তব অলৌকিক আমরা।

সেটি ছিলো অনাদি মহাজগতের অনাদি প্রথম দুপুর, অনন্য দুপুর, শেষ ও অ্যাদি ও অনন্ত দুপুর; ওই দুপুরের আগে কোনো পূর্বাহ্ন নেই, পরে কোনো অপরাহ্ন নেই, এক দুপুরের সমাপ্ত মহাকাল। সেই দুপুরে, হাসানের মনে হচ্ছিলো, সে যাপন করছে তার সমগ্র জীবন- সমগ্র জীবন আশি বা একশো বছরের যোগফল নয়, সমগ্র জীবন হচ্ছে বিশেষ মুহূর্তের তীব্র পরম অবর্ণনীয় রূপ, যার পর আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না; জীবন তার কাছে এতো তীব্র এতো সম্পূর্ণরূপে কখনাে ধরা দেয় নি, হয়তো আর ধরা দেবে না। সেই দুপুরে সে মদ্যপান করে নি, কিন্তু তার মনে হচ্ছিলো সে অজস্র কাল ধ’রে মদ্যপান ক’রে কোনো আদিম দেবতার মতো বিভোর মাতাল হয়ে পড়ে আছে প্রান্তরে, তাকে ঘিরে চলছে উৎসব, সে শুধু পান ক’রে চলছে অশেষ অমৃত। শ্যামলী কি পদ্মানদী? মানসসরোবর? শ্যামলী কি বঙ্গোপসাগর? শ্যামলী কি জ্যৈষ্ঠের জোয়ার? শ্রাবণের আদিগন্ত বন্যা? শ্যামলী কি মেঘ ঝড় বিদ্যুৎ? তারা ডুবে গিয়েছিলো নুহের প্লাবনে, বিশ্ব জুড়ে জল জল জল ছাড়া আর কিছু ছিলো না, অবিরল বৃষ্টি ঝরছিলো সমস্ত আকাশ ভেঙে চল্লিশ রাত চল্লিশ দিন ধ’রে, তারা দুটি মহাদেশ হারিয়ে যাচ্ছিলো পারদের মতো অতল জলের তলে; তারা ভেঙে পড়ছিলো ব্যাবিলন জেরুজালেমের মতো, অজস্র শতাব্দী ধ’রে ভেঙে পড়া ছাড়া আর কিছু ছিলো না, শুধু ভেঙে পড়ার সুগভীর শব্দ উঠছিলো তাদের শরীরের কক্ষের পর কক্ষ থেকে, গম্বুজ থেকে, মিনার থেকে, তোরণ থেকে; তারা গ’ড়ে উঠছিলো বিদিশা বিক্রমপুর ময়নামতি মহাস্থানগড়ের মতো, তাদের শরীরের পাশ দিয়ে বয়ে চলছিলো প্ৰমত্ত পদ্মা ব্ৰহ্মপুত্র মেঘনা যমুনা, যেখানে এক বিষগ্ন কবি তার নৌকোয় বসে লিখে চলছিলো তার তীব্রতম কবিতা।

অজস্র শতাব্দী কেটে গেলে এক শরীর আরেক শরীরকে জড়িয়ে ধ’রে পড়ে ছিলো ক্লান্ত সুখী প্রসন্ন পরিতৃপ্ত জনপদের মতো; তাদের শরীরের পলিমাটিতে এসে পড়ছিলো ধানের বীজ, গমের অঙ্কুর, ছড়িয়ে পড়ছিলো কলমিলতা, শেকড় ছড়াচ্ছিলো উদ্ভিদগণ, দিকে দিকে ডেকে উঠছিলো শালিক চড়ুই চিল।

শ্যামলী নদীপারের জনপদের মতো কণ্ঠস্বরে তাকে বলেছিলো, হাসান, আমি তোমাকে ভালোবাসি।

হাসান, আরেক জনপদ, পদ্মার জলকল্লোলের স্বরে বলেছিলো, আমি তোমাকে ভালোবাসি, শ্যামলী।

শ্যামলী বলেছিলো, আমাদের শরীর একথাই শুধু বলছে; আজই আমি প্রথম আমার যে শরীর আছে বুঝলাম।

হাসান বলেছিলো, একমাত্র শরীরই শুধু সত্য বলতে পারে, শরীরের থেকে বড়ো কোনো ঈশ্বর নেই।

শ্যামলী বলেছিলো, হাসান, তোমাকে একটি কথা বলার আছে আমার। হাসান বলেছিলো, পরে বোলো, এই সুখকর ক্লান্তির পরে বোলো, আমি এখন ক্লান্তির পরম সুখ অনুভব করছি; আমি ক্লান্তি উপভোগ করতে চাই।

শ্যামলী বলেছিলো, না, এখনই আমি বলতে চাই, এখনই বলার সময়, যখন আমরা সুখে ক্লান্ত তখনই আমার কথাটি বলা ভালো।

হাসান বলেছিলো, বোলো।

শ্যামলী বলেছিলো, হাসান, আমি বিবাহিত।

হাসান চোখ বুজে শ্যামলীকে জড়িয়ে ধ’রে বলেছিলো, তাতে কিছু আসে যায় না, শ্যামলী।

শ্যামলী জিজ্ঞেস করেছিলো, এরপরও আমাকে ভালোবাসবে?

হাসান বলেছিলো, হ্যাঁ।

শ্যামলী বলেছিলো, আমার দুটি শিশু আছে।

হাসান বলেছিলো, বেশ তো, নিশ্চয়ই তারা খুব সুন্দর।

শ্যামলী জিজ্ঞেস করেছিলো, হুঁ, এরপরও আমাকে ভালোবাসবে?

হাসান বলেছিলো, হ্যাঁ, ভালো না বাসার কিছু নেই, শিশুরা চমৎকার।

শ্যামলী বলেছিলো, তোমার থেকে আমি ছয় বছরের বড়ো।

একটু চমকে উঠেছিলো হাসান, এবং বলেছিলো, মনে হয় না; তোমাকে তো আমার থেকে ছোটােই মনে হয়; তোমাকে যে আমি মুঠোর ভেতরে ভরে রেখেছি, ভেঙেছি পাপড়ির মতো, তোমাকে আমার বালিকা মনে হয়।

শ্যামলী বলেছিলো, তোমাকে আমি ভালোবাসি।

হাসান বলেছিলো, আমি তা অনুভব করছি।

শ্যামলী বলেছিলো, চিরকাল তোমাকে আমি চাই।

হাসান বলেছিলো, আমিও চাই।

শ্যামলী বলেছিলো, বলো, আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না।

হাসান বলেছিলো, কখনো ছেড়ে যাবো না, এভাবে জড়িয়ে থাকবো।

দশ বছর হলো, কখনো মনে হয়। কয়েক মাস, কখনো মনে হয় শতাব্দীর থেকেও দীর্ঘ। এই দশটি বছর তুমুলভাবে যাপন করেছে। হাসান, কবিতায় ও বিজ্ঞাপনে তার জীবন বেশ সফলই হয়ে উঠেছে। এখন সে অ্যান্ড ২০০০-এর একজন প্রধান ব্যক্তি, অন্যতম ব্যবস্থাপক: এখন আর তার অ্যাড লিখতে হয় না, বদমাশাদের থেকে অ্যাড সংগ্রহ করতে হয়, লেখার থেকে অনেক সহজ।

কয়েক দিন ধ’রে একটা উৎকট বিচ্ছিরি ঝামেলায় রয়েছে হাসান; একটা নোংরা। অশিক্ষিত কোটিপতিকে ধরেছে অচিকিৎসা কবিতা ব্যারামে, কোটিপতিটা হাসানের সাথে অ্যাডের থেকে কবিতা আলোচনা করতেই বেশি পছন্দ করছে, সারাক্ষণ কবিতা, যেনো ওই কোটি কোটি টাকা, পাজেরো, কারখানা, আমদানিরাপ্তানি, গাড়ির, চামড়ার ও আরো চৌত্ৰিশটা ব্যবসা কিছু নয়, কবিতাই সব, তাকে এখন অবিনশ্বর অমরতার রোগে ধরেছে। টাকা হয়েছে, এখন অমরতাও ওর চাই; পারলে কিনে ফেলতো, অমরতা যদি নিউইয়র্ক হনুলুলু সিডনি লন্ডনের একটা ফ্ল্যাট হতো, তাহলে এতো দিনে ও কিনে ফেলতো। ওর ফার্মের একটা অ্যাড পাওয়ার পরই হাসানের পরিচয় ওই মোটা গ্যালগ্যালে থুতুছিটানো ঋণখেলাপিটার সাথে; হাসানকে পাওয়ার পর সে অ্যাডের কথা ভুলতেই বসেছে; জসীমউদদীন সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মতো পদ্যে, ‘আমার মাথা নত ক’রে দাও’, ‘মিলন হবে কত দিনে’ ধরনের মরমী গানে দামি খাতা ভ’রে তুলছে, হাসানকে নিমন্ত্ৰণ ক’রে চলছে তার বনানীর বাড়ি গিয়ে পান করতে করতে ওগুলো একটু দেখে দিতে। এই চােদানি পাছামারা কোটিপতিগুলোকে কেনো যে শেষ বয়সে চাকরানিরোগের মতো কবিতারোগে ধরে, হাসান বুঝতে পারে না; এই চার ডেঞ্চারঅলাটা একলাই নয়, আরো কয়েকটিকে দেখেছে হাসান, তারা কবিতা লিখে অমর রবীন্দ্রনাথ হ’তে চায়। কোটি কোটি বনানী পাজেরো ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদির পর কেনো এই পেটমোটা গাড়লগুলোর এই অমরত্যারোগ? ওরা পাক্কা ঝানু লোক, অন্ধিসন্ধি সব জানে; কিন্তু হাসান ওদের পদ্য দু-একটি পড়ে দেখেছে, ভেতরে ভেতরে ওরা শিশু, ক্লাশ ফোরের শিশু, তুচ্ছ সরল মহান আবেগে ওরা ফুলেফেপে আছে। এক দিকে যারা ঈশ্বরের থেকেও এতো প্রাপ্তবয়স্ক অন্য দিকে তারা কীভাবে হয়। এতো অপ্রাপ্তবয়স্ক? এই ঝানু পাক্কা কোটিপতিটাও একটা শিশু, বস্তি, ব্রিজ, রেলগাড়ি, ধর্ষিতা হালিমা রহিমা সালেহাকে নিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ জসীমউদদীনের মতো অনেক পদ্য লিখে ফেলেছে, জীবনে যে সে কিছুই করতে পারে নি, তার সোনার মানবজীবন যে ব্যর্থ গেছে, চাষটাষ কিছুই করতে পারে নি, তার জন্যে সে পাতায় পাতায় হাহাকার করেছে, ‘প্রভু’, ‘প্রেম’, ‘হৃদয়’ লিখতেও বানান ভুল করেছে, কিন্তু কবি তাকে হ’তে হবে, অমরতা তার চাই।

হাসানকে যেতেই হবে তার বনানীর বাড়িতে, একটু পানাহার করতে করতে দেখে দিতে হবে তার ওই অবিনাশী রচনাবলি; সে কিছু চায় না, একটু অমরতা চায়। হাসান একা যেতে রাজি হয় নি, বলেছে সে তার এক কবিবন্ধুকে নিয়ে যাবে, যে আরো বড়ো কবি, যে তার কবিতা দেখে দিলে সে কবি হবেই, এমনকি রবীন্দ্রনাথও হয়ে যেতে পারে। রাকিব সুলতানকেই মনে পড়েছে হাসানের, রাকিব পান করতে পছন্দ করে, এবং এসব কোটিপতির সামনে সহজেই জিপ, টেনে খুলে অনায়াসে একটা পরম দীর্ঘ উত্তেজিত সত্য দেখিয়ে দিতে পারে।

গাড়লটা একটা বাড়ি করেছে বটে, আরেকটুকু হ’লেই বাড়িটার নাম তাজমহল রাখতে পারতো। না কি রেখেছে? হাসানদের গাড়ি যখন ভেতরে ঢুকছে পাঁচসাতটা দারোয়ান এসে টানাটানি ক’রে তোরণ খুলে দেয়, একটা ছোটােখাটাে জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে গাড়ি গিয়ে তাজমহলের দরোজায় থাকে; গাড়লটা লোক বেশ, মনেপ্ৰাণে কবি তো, গ্রহের চক্রান্তেই শুধু টাকা পয়সা করেছে, তার সম্পূর্ণ মোটা শরীরটা নিয়ে ছুটে আসে তাদের অভ্যর্থনা করার জন্যে, যদিও একটা চাকর পাঠিয়ে তাদের ওপরে নিয়ে গেলেই হাসান যথেষ্ট ধন্য বোধ করতো। কিন্তু না, তারা তো কোনো কোটিপতির বাড়ি আসে নি, তারা দুজন বড়ো কবি এসেছে এক ছোটাে অপ্রতিষ্ঠিত কবির বাড়িতে, তাদের এভাবেই অভ্যর্থনা করতে হবে, নইলে এ-বাড়িতে তারা পা ফেলবে কেনো?

রাকিব সুলতান কোটিপতিটার পেট হাত বুলোতে বুলোতে বলে, ভাই, আমরা দুইজন বড় কবি আসলাম একজন ছোট কবির বাড়িতে, রবীন্দ্রনাথরা আসলো কুমুদরঞ্জনের বাড়িতে, এই মহান ঘটনার কথা বাঙলা কবিতার ইতিহাসে বোন্ড টাইপে ল্যাখা থাকবো।

কোটিপতিটা বলে, হ, কবিভাই, ল্যাখা থাকবো; জীবন আমার ধইন্য হইল।

জন্যে আপনে সেইরকম আয়োজন ত করেন নাই। বড় কবিগো সম্মান না দিলে ছোট কবিরা কবি হইবো কিভাবে?

কোটিপতিটি মেঝে গ’লে পড়ার ভঙ্গিতে বলে, আমার ভুল হইয়া গ্যাছে, বলেন কবিভাই, কি আয়োজন করতে হইবো?

হাসান অত্যন্ত কষ্টে হাসি চেপে রেখে বলে, না, না, আপনি বিচলিত হবেন না, কোনো ভুল হয় নি, আর কোনো আয়োজন করতে হবে না।

রাকিব বলে, আমরা দুইজন বড় কবি একটা ছোট কবির বাড়িতে আসলাম, এই ঘটনা ত শতাব্দীতে একবারই ঘটবো, দুইবার ঘটবো না, আপনের উচিত আছিল আমরা যেই পথ দিয়া উপরে যামু যেই পথে আমাগো পায়ের ধুলা পরবো সেই পথে বিশ পঁচিশ কেজি গোলাপের পাপড়ি ছারাই ছারাই রাখন।

উত্তেজিত হয়ে ওঠে কোটিপতি কবি, চিৎকার ক’রে ডাকতে থাকে ডজনখানেক চাকরবাকরকে, খুবই বিব্রত হয়ে বলতে থাকে, কিছু মনে কইরেন না কবিভাইরা, কিছু মনে কইরেন না, আমার ভুল হইয়া গ্যাছে, এখনই আমি এক মোন গোলাপের পাপড়ি আইন্যা আপনাগো পথে ছারাই দিতেছি।

ওপরে গিয়ে দেখে বসার একশোবর্গমাইল ঘরটিতে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ সমস্ত শিল্পকলা সমস্ত সৌন্দর্য গাদাগাদা জড়ো করা আছে, মাটির নিচের মাটির ওপরের সমুদ্রের ভেতরের উত্তর মেরুর দক্ষিণ মেরুর বিষুব রেখার কর্কট ক্রান্তির পর্বত চূড়োর আকাশের ওপরের আফ্রিকার জঙ্গলের আমেরিকার শহরের ইউরোপের বন্দরের সব কিছুর আবর্জনাস্তূপ সৃষ্টি করা হয়েছে।

রাকিব বলে, এইখানে ত বসনের কোনো জায়গা নাই। কোটিপতি কবিটি বুঝতে না পেরে বলে, এই যে সোফাগুলি দেখতেছেন, এইগুলিতেই বসেন কবিভাই, পাঁচলাখ দিয়া বানাইছি।

রাকিব বলে, এইগুলি বসনের লিগা বুঝি, কবিভাই? আমি ত ভাবতেছিলাম হাগনের লিগা।

লোকটি চমকে উঠে বলে, কি কইলেন কবিভাই, কি কইলেন? রাকিব বলে, না, কবিভাই, কিছু কই নাই; কিন্তু কথা হইছে আমি আবার মহাকবি মধুসূদনের মতো পিঁড়ি না হইলে বসতে পারি না, মহাকবিরা পিঁড়িতে বসতে পছন্দ করে।

লোকটি বলে, ফিরি? ফিরি? ফিরি কই পামু? গ্যারামে ফিরিতে বইতাম, আমাগো অনেক ফিরি আছিল, এইখানে ত ফিরি নাই। দুইটা ফিরি কিন্যা আনুম?

হাসান কার্পেটের ওপর বসতে বসতে বলে, এখানেই বসি, বিলের ঘাসের মতো মনে হচ্ছে।

লোকটি বলে, কার্পেটের ওপরই বসবেন, কবি ভাই? বসেন।

হাসান আর রাকিব কার্পেটের ওপর বসে পড়ে।

রাকিব বলে, লগে একটা লুঙ্গি আর গামছা লইয়া আসলেই ভাল হইত। কোটিপতি কবিটি দৌড়ে গিয়ে গোটাচারেক মোটােগাটা দামি ডায়েরি এনে রাখে। তাদের সামনে, এবং ডাকতে থাকে, ও মনোরা, ও হালিমা, ও রোকেয়া, এইদিকে আসো।

তার ডাকের সাথে সাথে বেশ তরতাজা বেশ টাটকা বেশ সুগন্ধি বেশ মাংস মনোরা, হালিমা, রোকেয়া এসে হাজির হয়।

কোটিপতি কবি বলে, আমার বড় কবি ভাইরা আসছে, দ্যাশের দুইজন অইত্যান্ত বড় কবি, বোতল আর পারোটা গোস্ত, প্লেট, গোলাশ লইয়া আসো, বাইর‍্যা দেও।

মেয়ে তিনটি গোটাচারেক ব্ল্যাক লেবেলের বোতল, পারোটা, গোস্ত, কাবাব, প্লেট, চামচ, ধবধবে শাদা পানিপাত্র নিয়ে আসে। তারা ছুরি নিয়ে কাটা কুমড়োর ফালির মতো হেসে হেসে প্লেটে প্লেটে মাংস পরোটা কাবাব বেড়ে দিতে থাকে, রাকিব গেলাশে গেলাশে ব্ল্যাক লেবেল ঢালতে থাকে।

ঢেলেই রাকিব এক গেলাশ ঢক ঢক ক’রে গিলে ফেলে, এবং বলে, ও মিস মনোরা মিস হালিমা মিস রোকেয়ারা, বোঝলা আমরা বড় কবি।

মেয়ে তিনটি নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি ক’রে ইলশের ঝোলে হলদে কুমড়োর ফালির মতো হাসতে থাকে।

হায়রে নারী, তোমরা সতী, তোমরা হইলে মায়ের জাতি, তাই ত আমরা পুরুষগণ তোমার পায়ে মাথা পাতি। তোমরা ছারা ক্যামন হইত, এই দুনিয়া খালি রইত।

রাকিব পান করতে করতে জিজ্ঞেস করে, কবিভাই, আপনের ইস্ত্রী আর পোলাপােনরা কই?

কবি বলে, আহ, আমার ইস্ত্রী ত আমরিকায় থাকে, আর এক পোলা থাকে লন্ডনে, একপোলা নিউইয়র্কে, আরেকপোলা সিডনিতে, এক মাইয়া থাকে ওয়াশিংটনে, আরেক মাইয়া থাকে টরন্টোতে…

রাকিব বলে, আর আপনে কবিভাই কষ্ট কইরা মিস মনোরা মিস হালিমা মিস রোকেয়ারে লইয়া এই গরিবকুটিরে একলাই থাকেন?

কবি বলে, কি আর করুম কবিভাই, অগো লইয়াই আছি।

হাসান বলে, ধনীদের নিঃসঙ্গ দুঃখ খুবই ব্যাপক, ধনীরা খুবই দুঃখী।

রাকিব কয়েক গেলাশ গিলে ফেলেছে, খুবই চমৎকার আছে, জিজ্ঞেস করে, কবিভাই, মাইয়াগুলিরে আপনে একলাই ইউটিলাইজ করেন, না অন্য কবিগোও ব্যবহার করতে দেন?

কবিও এর মাঝে তার পাঁচ সাতটি কবিতা পড়তে পড়তে দু-তিন গোলাশ গিলে ফেলেছে, তার কণ্ঠে কবিতা জড়িয়ে আসছে।

কবি বলে, বয়স হইলেও তিন চাইরটা মাইয়া আমার একলাই লাগে, আমার প্রোস্টেট গ্র‍্যান্ড ঠিক আছে।

রাকিব বলে, দুইটা আইজ বড় কবিগো ইউটিলাইজ করতে দেন, পত্রিকায় আপনের কবিতা ছাপাই দেঅনের ব্যবস্থা করুম।

মেয়ে তিনটি ঘোরাঘুরি করছে, হাসছে, গেলাশে ব্ল্যাক লেবেলও ঢেলে দিচ্ছে, মনে হচ্ছে বড়ো কবিদের ওরা অপছন্দ করছে না।

কবি একটু রেগে ওঠে, কবিভাইরা, আমার কবিতা শোনেন, কবিতা শোনানের লিগা আপনাগো দাওয়াত দিয়া আনছি, ব্ল্যাক লেবেল খাওয়াইতেছি।

রাকিব বলে, আপনের ওই বালের কবিতা শুনতে শুনতে আমার প্যাট ভাইর‍্যা মুতে ধরছে।

কোটিপতি কবি রাকিবকে টয়লেট দেখানোর জন্যে একটি মেয়েকে ডাকাডাকি করতে তাকে ।

রাকিব বলে, বড় কবিরা ছোট কবির বাসায় আইস্যা টয়লেটে মোতে না, তাগো কার্পেটে মোতে সোফায় মোতে লাখট্যাকার ফুলদানিতে মোতে রঙিন মাছের বাক্সে মোতে তাগো মোখে মোতে।

রাকিব দাঁড়িয়ে জিপ খুলতে থাকে, এবং এক সময় শাশা ক’রে এদিকে সেদিকে প্রস্রাব করতে থাকে, তার ধারা থামে না।

কোটিপতি কবিটি চিৎকার ক’রে ওঠে, এ আপনে কি করতেছেন, এ আপনে কি করতেছেন? এইটা বাথরুম না, এইটা বাথরুম না, এইটা আমার দশ লাখ ট্যাকার কাশ্মিরি কাপেট।

রাকিব বলে, হাসান, এই ভাগাড়ে তুমিও একটু মোতো, মোতার জইন্যে এর থিকা ভাল জায়গা আর পাইবা না, বড় কবিরা কোটিপতির বাড়িতে এইভাবেই মোতে, মোতো হাসান মোতো।

রাকিব সুলতান যেনো পাঁতাগ্রুয়েল হয়ে উঠেছে।

হাসানেরও তীব্র প্রস্রাবে ধরেছে, তার তলপেট ফেটে যাচ্ছে, শিশ্ন শক্ত হয়ে প্রচণ্ড ব্যথায় ভেঙে পড়ছে, তার মাথার চারদিকেও সবুজ কুয়াশা জমে আসছে গোলাপি গন্ধ জ’মে আসছে রুপোলি জল টলমল করছে; সে টয়লেটে যাওয়ার জন্যে উঠে দাঁড়ায়, বসার একশোবর্গমাইল দশকোটি টাকার ঘরটিকে তার রেলস্টেশনের রাস্তার পাশের একটা নোংরা প্রস্রাবখানা মনে হয়, যার দেয়ালে লেখা আছে ‘এখানে প্রস্রাব করিবেন না’, কিন্তু যাকে দেখলেই রিকশাঅলা পকেটমার ভিখিরি পিয়ন হকারদের তীব্র প্রস্রাবে ধরে। পচা ইঁদুর পড়ে আছে। এখানে ওখানে, ছড়িয়ে আছে পাতলা পায়খানা, পাগলের বমি, ভজভজ ক’রে ময়লা ছুটছে, ছড়িয়ে আছে মাসিকভেজা ত্যানা, কুকুরের গু; এতো ঘিনঘিনে জায়গায় সে প্রস্রাব করে কী করে? তার একটি পরিচ্ছন্ন ঝকঝকে টয়লেট দরকার।

হাসান বলে, আমার একটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন টয়লেট দরকার, বড্ডো প্রস্রাবে ধরেছে, আমার একটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন টয়লেট দরকার।

কোটিপতি কবি বলে, ওই দিকে যান, একটা বড়ো টয়লেট আছে।

হাসান তলপেট চেপে একলা হাঁটতে হাঁটতে একটি পাঁচকোটি টাকার ঘরে ঢোকে, মনে হয় এখানে প্রস্রাব করতে পারবে, কিন্তু ঘরটি দেখে তার শরীর ঘিনঘিন করতে থাকে, সে বলে, ‘এতো নোংরায় আমি প্রস্রাব করতে পারি না’; সে আরেকটি পাঁচকোটি টাকার ঘরে ঢোকে, সেটা দেখেও বলে, ‘এতো নোংরায় আমি প্রস্রাব করতে পারি না’; সে আরেকটি পাঁচকোটি টাকার ঘরে ঢোকে, এবং বলে, ‘এতো নোংরায় আমি প্রস্রাব করতে পারি না’। সে ঘর থেকে ঘরে ঘুরতে থাকে, কোটি কোটি টাকায় সাজানো প্রত্যেকটি ঘরকে তার নোংরা আবর্জনাস্তূপ ব’লে মনে হয়, এবং সে বলতে থাকে, ‘এতো নোংরায় আমি প্রস্রাব করতে পারি না’। ঘুরতে ঘুরতে সে আবার একশোবর্গমাইল বসার ঘরটিতে এসে উপস্থিত হয়, দেখে প্রস্রাবের ওপর গড়াচ্ছে রাকিব সুলতান।

হাসান বলে, রাকিব ওঠে, বাইরে চলো, প্রস্রাবের জন্যে একটি পরিচ্ছন্ন জায়গা দরকার।

রাকিব বলে, চলো, এই ভাগাড়ে দম বন্ধ হইয়া আসতেছে। হাসান রাকিবকে টেনে তুলে ওই আবর্জনাস্তূপ থেকে টলতে টলতে বেরিয়ে আসে; এবং বলতে থাকে, একটি পরিচ্ছন্ন টয়লেট দরকার, একটা পরিচ্ছন্ন টয়লেট দরকার, খুব প্রস্রাবে ধরেছে।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x