ভূত নেই নেই করে চেঁচাচ্ছেন, যারা বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে বলছেন, “মৃত্যুর পরেই মানুষের সব শেষ”, “আত্মা মোটেই অমর নয়,” তাঁদের চ্যালেঞ্জ জানিয়েই একটি ভূতের “সত্যি কাহিনী”  প্রকাশিত হল “পুলিশ ফাইল” নামের একটি মাসিক পত্রিকায়। পুলিশ ফাইল পত্রিকার সম্পাদক মোটেই এলে-বেলে লোক নন, দস্তুর মতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের অধ্যাপক অনীশ দেব। ভৌতিক ঘটনাটির নায়ক দেবেন, নায়িকা অনুরাধার ছবিও সম্পাদক প্রকাশ করেছিলেন, সেই সঙ্গে দিয়েছিলেন দেবেনের পুরো ঠিকানা।

ঘটানাটা ছোট্ট করে জানাচ্ছি।

দেবেন থাকেন কলকাতার শ্রীপুরের ২৬ নং শ্যামল মুখার্জী লেনে। দেবেনের বাবা রামদেববাবু পুরসভার কেরানী। দেবেন বয়সে তরুণ। বিয়ে করে ১২ জুন ১৯৮৫। স্ত্রী অনুরাধা ভুবনেশ্বর কাজী লেনের বাসিন্দা ছিলেন। বাবার নাম জগদেব নারায়ণ।

বিয়ের পর দিন ১৩ জুন প্রথম ভৌতিক ঘটনাটা ঘটল। ফুলশয্যার রাতেদ দেবেন অনিরাধাকে একা পেয়ে অনুরাধার গলা ও শরীরের নানা অংশে প্রচণ্ড জোরে কামড়ে রক্তাক্ত করে তুলল। সেই সঙ্গে ভয় দেখিয়ে বলল, “তুমি যতই চেষ্টা কর না কেন বাঁচতে পারবে না। আমি তোমাকে কাঁচা চিবিয়ে খাব।” আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল, দেবেন যখন এই কথাগুলো বলছিল তখন তা দেবেন গলার স্বর ছিল না, মেয়ের কণ্ঠস্বর বেরিয়ে আসছিল।

অনুরাধা ভয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে চিৎকার করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। চিৎকার অনুরাধার শাশুড়ী ও ননদের ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল।

শাশুড়ীর কাছে এসে ঘটনাটুকু সংক্ষেপে বলে অনুরাধা অজ্ঞান হয়ে পড়েন। অনুরাধাকে শুইয়ে দিয়ে দেবেনের মা বাবা ও দুই বোন ফুলশয্যার ঘরে ঢুকে দেখেন দেবেন ঘুমোচ্ছে। ঘুম থেকে তুলে দেবেনকে কামড়ানোর কারণ জিজ্ঞেস করায় দেবেন বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, এমন কিছু সে করেই নি। সকলে এবার এলেন অনুরাধার কাছে। ঘুমন্ত অনুরাধার ক্ষত থেকে আবরণ সরাতেই আর এক বিস্ময়? কোথায়ই বা ক্ষত? কোথায়ই বা রক্ত?

দ্বিতীয় রাতে অনুরাধাকে একা পেয়ে দেবেন আবার আক্রমণ চালাল। কামড়ে নাক আর দুটো কান কেটে নিল।

অনুরাধার চিৎকারে এ রাতে দেবেনের বাড়ির লোক ছাড়া প্রতিবেশীরাও ছুটে এলেন। অনুরাধাকে নীলরতন হাসপাতালে ভর্তি করা হল। কাশীপুর থানায় খবর গেল। পরদিন সকালে পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর পঙ্কজ কুমার লাহা তদন্ত করতে হাসপাতালে গেলেন। সেই সময় অনুরাধার নাক কান আর বুকে ব্যান্ডেজ বাঁধা। ডাক্তার ভট্টাচার্য জানালেন বেশি রক্তপাতের জন্য অনুরাধার বাঁচার আশা নেই।

শ্রীলাহা এবার এলেন কাশীপুরে দেবেনের বাড়িতে। দেবেন জানালেন, তিনি এইসব ঘটনার কিছুই জানেন না। শ্রীলাহা দেবেনকে নিয়ে গেলেন মৃত্যুর প্রহর গোনা অনুরাধার কাছে। কিন্তু কি আশ্চর্য? হাসপাতালে অনুরাধাকে পাওয়া গেল সম্পূর্ণ সুস্থ এবং অক্ষত অবস্থায়। নাক কানের অংশ যে কয়েক ঘণ্টা আগে কামড়ে কেটেন নেওয়া হয়েছিল, তার সামান্যতম প্রমাণও পাওয়া গেল না অনুরাধার শরীরে।

খবর পেয়ে অনুরাধার বাবা এসেছিলেন ভুবনেশ্বর থেকে। সন্দেহ প্রকাশ করলেন দেবেনের উপর ভূতে ভর করেছে। পরের দিন সকালে তিনি উত্তরপাড়া থেকে তান্ত্রিক অঘোর স্যানালকে নিয়ে এলেন। জানতে পারলেন গতরাতে অনুরাধা শুয়েছিলেন শাশুড়ীর ঘরে। শাশুড়ী নাকি গলা টিপে মেরে ফেলেছেন। ডাক্তার পরীক্ষা করে জানিয়েছেন অনুরাধা মৃত।

অঘোর তান্ত্রিক জানালেন এসবই এক ভূতের কারসাজি। পুলিশ ‘লাশ’ না নিয়ে গিয়ে যদি তাঁকে পুজো করার জন্য কিছুটা সময় দেন, তবে তিনি অনুরাধাকে বাঁচিয়ে দিতে পারবেন; সেই সঙ্গে  এই পরিবারের সকলকে চিরকালের জন্য ওই ভূতের হাত থেকে বাঁচাতে পারবেন।

পুলিশের অনুমতি মিলল। দ্রুত পুজোর আয়োজন করা হল। অঘোর তান্ত্রিক যজ্ঞ শুরু করতেই দেবেন মেয়ের গলায় চিৎকার করতে লাগল, “আমাকে ছেড়ে দাও। আমাকে মের না।” শেষ পর্যন্ত জানা গেল শাকিলা নামের একটি মেয়ে ৮৫-র ৮ জানুয়ারী আত্মহত্যা করেছিল। তারই আত্মা এই সব কান্ড ঘটিয়েছিল। এক সময় মৃত অনুরাধা সবাইকে আশ্চর্য করে উঠে বসল।

অনুরাধাকে মৃত ঘোষণা করা ডাক্তার অবাক বিস্ময়ে দেখেলন, অলৌকিক আজও ঘটে। মন্ত্রশক্তিতে মৃতকেও বাঁচান যায়।

কাহিনীর শেষে লেখা রয়েছেঃ ” এ এক অবিশ্বাস্য কাহিনী হলেও সত্য।”

কাহিনীর শুরুতেই লেখা ছিল “পুলিশ ফাইল থেকে”, অর্থাৎ পুলিশ ফাইল থেকেই এইসব তথ্য সংগৃহীত হয়েছে।

লেখাটি সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, বেশ কিছু চিঠি এই প্রসঙ্গে আমি পেয়েছিলাম। প্রতিটি ক্ষেত্রেই পত্র লেখক-লেখিকারা জানতে চেয়েছিলেন আমি এই “সত্য ঘটনা”কে স্বীকার করি কি না এবং সেই সঙ্গে স্বীকার করি কি না ভূতের অস্তিত্বকে। যুক্তিবাদী বিজ্ঞান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত অনেকেও লেখাটি পড়ে, বিভ্রান্ত হয়ে এই বিষয়ে আমার মতামত ও ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলেন। যুক্তিবাদীদের মনেও বিভ্রান্তি দেখা দেওয়ার কারণঃ (১) পত্রিকাটির সম্পাদক পরিচিত বিজ্ঞান পেশার মানুষ। (২) ঘটনাটি পুলিশ ফাইল থেকেই নেওয়া বলে ঘোষণায় জানান হয়েছে। (৩) কাহিনীর শেষাংশে বলা হয়েছে- “ঘটনাটি অবিশ্বাস্য কাহিনী হলেও সত্যি।” (৪) ঘটনার প্রধান চরিত্র দেবেন এবং অনুরাধার ফটোও ছাপা হয়েছে।

ভূতে পাওয়া প্রতিটি ক্ষেত্রেই হয় মানসিক রোগ নয় তো অভিনয়। মস্তিষ্ক-কোষ থেকেই আমাদের চিন্তার উৎপত্তি। একনাগাড়ে ভূতের কথা ভাবতে ভাবতে অথবা কোন বিশেষ মুহূর্তে ভূতে ভর করেছে ভেবে কোনও কোনও আবেগপ্রবণ মানুষের মস্তিষ্ক-কোষে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, যাকে চলতি কথায় বলতে পারি মাথার গোলমাল। এই সময় মানসিক রোগী ‘তার উপর ভূতে ভর করেছে’ এই একান্ত বিশ্বাসে অদ্ভুত সব ব্যবহার করে। ভূতে পাওয়া যদি মানসিক রোগ না হয় তবে অবশ্যই ধরে নেওয়া যায় রোগী বা রোগিনী ভূতে পাওয়ার অভিনয় করছে। এখানে অনীশ দেবের পত্রিকায় লেখক অমরজ্যোতি মুখোপাধ্যায়ের ‘সত্যি কাহিনী’টিতে এমন অনেক কিছু ঘটেছে, বিজ্ঞানে যার ব্যাখ্যা মেলে না। কাটা নাক কান জুড়ে যাচ্ছে, ক্ষত চিহ্ন মিলিয়ে যাচ্ছে, মৃত জীবিত হচ্ছে ইত্যাদি।

আমার মনে হয়েছিল- এর একটাই ব্যাখ্যা হয়, সম্পাদক ও লেখক আমাদের প্রত্যেককে প্রতারিত করেছেন। সত্যি কাহিনীর নামে আগাগোড়া মিথ্যে কাহিনী বলে গেছেন। কিছু বিজ্ঞানকর্মীর তাও সন্দেহ ছিল এমন একজন পরিচিত বিজ্ঞান পেশার মানুষ ও বিজ্ঞান বিষয়ক লেখক কি পাত্র-পাত্রীর নাম ঠিকানা ছবি ছাপিয়ে থানার সাব-ইন্সপেক্টরের নাম, হাসপাতালের নাম, ঘটনার তারিখ উল্লেখ করে পুরোপুরি মিথ্যে লিখবেন? রহস্য থাকতে তা হয় তো অন্য কোনও জায়গায়।

স্ট্রিট ডাইরেক্টরিতে শ্যামল মুখার্জি লেনের নাম খুঁজতে গিয়ে প্রথম ধাক্কা খেলাম। এমন নাম কোথাও নেই। ঠিক করলাম ঠিকানা যখন পেলাম না, এবার কাশীপুর থানা থেকে খোঁজ করা শুরু করি। দেখি তাঁরা এই ঘটনা সম্পর্কে কতটা আলোকপাত করতে পারেন। ঠিকানাটার হদিশও ওদের কাছ থেকেই পাওয়া যাবে।

প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভার তুলে দিলাম আমাদের সমিতির এক তরুণ বিজ্ঞান কর্মীর হাতে। তার হাত দিয়েই ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি’র রাইটিং প্যাডে কাশীপুর পুলিশ স্টেশনের অফিসার ইনচার্জকে উদ্দেশ্য করে লেখা একটি চিঠি পাঠাই। সঙ্গে পুলিশ ফাইলের তথাকথিত সত্যি ভূতের কাহিনীটির ফটো কপিও। চিঠিতে জানাই ‘পুলিশ ফাইল’ পত্রিকার জুন ১৯৮৮ সংখ্যায় একটি ভূতুরে ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত ২৬ নং শ্যামল মুখার্জী লেন কাশীপুর পুলিশ স্টেশনের নিয়ন্ত্রনাধীন বলে বলা হয়েছে। পত্রিকাটির ফটো কপি আপনার পড়ার জন্য পাঠালাম।

আমাদের সমিতি নানা অলৌকিক ঘটনার সত্যানুসন্ধান করে থাকে। আপনার এলাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনার বিষয়ে আমরা অনুসন্ধানে উৎসাহী। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য আমাদের সমিতির সদস্যকে পাঠান হল। তাঁকে সর্বপ্রকার সহযোগিতা ও সহায়তা করলে বাধিত হবো। চিঠির তারিখ ছিল ৫/৬/৮৮।

পরের দিনই বিজ্ঞানকর্মীটি কাশীপুর থানায় যোগাযোগ করে, চিঠিটি দেয় এবং প্রধাণত তিনটি বিষয়ে জানতে চায়ঃ (১) শ্যামল মুখার্জি লেন নামের কোনও ঠিকানা আদৌ এই থানা এলাকায় আছে কি না? (২) ঘটনাস্থল ১৯৮৫ সালে পঙ্কজকুমার লাহা নামের কোনও সাব-ইন্সপেক্টর আদৌ কাশীপুর পুলিশ স্টেশনে কাজ করতেন কি না? (৩) জুন ১৯৮৫-তে এই ধরনের কোনও ঘটনা থানার ডাইরিতে বা অন্য কোনও নথিতে আছে কি না?

৯ জুন আমাকে লেখা এক চিঠিতে থানার অফিসার ইনচার্জ স্পষ্ট ভাষায় যা জানালেন, তার সংক্ষেপ-সার (১) কাশীপুর পুলিশ স্টেশনের অধীনে এমন কোনও ঠিকানা নেই। (২) ১৯৮৫ সালে পঙ্কজকুমার লাহা নামের কোনও সাব-ইন্সপেক্টর ছিলেন না। (৩) এই ঘটনার কোনও তথ্য আমাদের পুলিশ স্টেশনের নথিতে নেই।

আমি বিস্মিত হলাম। কি চূড়ান্ত মিথ্যেকে সত্যি বলে চালাবার চেষ্টা করেছেন সম্পাদক ও লেখক। এরপরও কি আমার দেখা উচিৎ, সম্পাদকের ও লেখকের তাঁদের বক্তব্যের সমর্থনে কিছু বলার আছে কি না? একাধিক দিন আমি এবং ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির একাধিক সদস্য সম্পাদক অনীশ দেবের বাড়ি গিয়েছি। ওই বাড়িতেই পুলিশ ফাইল পত্রিকার অফিস। কোনও দিনই অনীশ দেবের দেখা পাইনি। আমাদের আসার উদ্দেশ্য প্রতিবারই অফিসের জনৈক কর্মীকে জানান হয়েছে। জানিয়ে ছিলাম, দেবেন-অনুরাধার ‘সত্যি কাহিনী’র ওপর আমাদের প্রাথমিক অনুসন্ধান এবং কাশীপুর থানার লিখিত উত্তর বলছে লেখাটির সঙ্গে বাস্তব সত্যের কোনও সম্পর্ক নেই। এটা স্রেফ গল্পকথা। এই বিষয়ে অনীশ বাবুর কাছে আত্মপক্ষ সমর্থনে কোনও প্রমাণ থাকলে তিনি প্রমাণ সহ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে বাধিত হবো।

অনীশ দেব আমার সঙ্গে দেখা করেননি। পরিবর্তে ১৮ জুন তারিখে লেখা তাঁর একটি পোস্ট কার্ড পাই। তাতে শুরুতে লেখা, “আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি বলে দুঃখিত।” মাঝখানে এক জায়গায় লেখা, “আমরা লেখাটি গল্পকথা হিসেবেই প্রকাশ করেছি।” শেষ অংশে লেখা, “পুলিশ ফাইল” আপাতত আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। ফলে আগামী সংখ্যাতে যে কোনও ত্রুটি স্বীকার করব সে সুযোগও নেই। সুতরাং এজন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। আপনার পরিচালনায় যুক্তিবাদী আন্দোলনের সাফল্য কামনা করে শেষ করছি।”

চিঠিটা অনীশ দেবের ডিগবাজীর সাক্ষ্য হিসেবে সযত্নে রেখে দিয়েছি। এর পরেও অনীশবাবুর কাছে কয়েকটি জিজ্ঞাসা আমার থেকেই গেল। অনীশবাবু, সত্যিই কি ‘গল্পকথা’ হিসেবেই লেখাটি প্রকাশ করেছিলেন? তবে আবার ‘সত্যি কাহিনী’ প্রমাণের জন্য ভূড়ি ভূড়ি বাক্যি খরচ করলেন কেন? কেনই বা কাল্পনিক দুটি চরিত্রের ফটোগ্রাফ প্রকাশ করলেন? ফটোগ্রাফ দুটি তবে কার? অনীশবাবু, আপনার কথাই যদি সত্যি হয়, অর্থাৎ কাহিনীটা ‘গল্পকথা’ই হয়, তবে ত্রুটি স্বীকারের প্রশ্ন আসছে কেন? আপনার কথাই আপনার মিথ্যাচারিতাকে ধরিয়ে দিচ্ছে না কি?

অনীশবাবু, আপনাকে শেষ প্রশ্ন, সত্যিই কি আপনি যুক্তিবাদী আন্দোলনের সাফল্য কামনা করেন? যুক্তিবাদী আন্দোলনের সাফল্য মানেই আপনার মতো অপ-বিজ্ঞানের ধারক-বাহক ও মিথ্যাচারীদের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x