ঝড় উঠল সত্যি সত্যি। অবরুদ্ধ জলতরঙ্গে বিক্ষোভ তৈরি করতে সৃষ্টি পরিকল্পনা সফল করতে এগিয়ে এলেন লে. জে. টিক্কা।

গভীর রাতে হইচই শুনে ঘুম ভাঙল। অফিসের টেলিফোন অনবরত বেজেই চলেছে। বাইরে বহু লোকের পদচারণা। মাইকের ঘোষণা–

‘মহাবিপদ, মহাবিপদ, সবাই আসুন থানার সামনে হাজির হোন। মহাবিপদ মহাবিপদ।’

আব্বা আগেই উঠেছেন। আম্মাও উঠেছেন। শেফু, ইকবাল, শিখুর ঘুমও ভেঙেছে। আমি আব্বা আর ইকবাল দৌড়ে চললাম থানায়। সঙ্গে আছে অফিসের পাংখাপুলার রশীদ, (পরবর্তীকালে পরিবারকে অনেক সাহায্য করেছে; একাত্তরের পরে আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।) রাত তখন দুইটা। থানার সামনে অনেকেই জড়ো হয়েছে। সবাই ভীত সন্ত্রস্ত কি জানি কি হলো। বেশ শীত করছিল। থানার o.c র সঙ্গে আলাপ করে আব্বা গেলেন wireless opgrpor-এর ঘরে। সেখান থেকে যখন বের হলেন তখন তাকে দেখে মনে হচ্ছিল একটা মরা মানুষ বের হয়েছে ক্লান্ত গলায় বললেন, wireless-এ খবর এসেছে মিলিটারিরা রাজারবাগ পুলিশ হেড কোয়ার্টার আক্রমণ করেছে। খুলনায় তারা পুলিশ লাইন ঘিরে আছে। কুমিল্লার পুলিশ ওয়ারলেস dead, চিটাগাং এ তুমুল যুদ্ধ চলছে। কিন্তু কেন এটা হচ্ছে কেউ বুঝতে পারছে না।

চারিদিকে নানা জল্পনা। কেউ বলছে জেনারেল হামিদ ইয়াহিয়াকে গ্রেফতার করেছে। কেউ বলছে সৈন্যদের মধ্যে গণ্ডগোল লেগেছে। কেউ বলছে শেখ মুজিবকে গুলি করে মেরে ফেলেছে তাই এ ঝামেলা। আবার অনেকে বলছে আমেরিকার গ্রিন টুপ নেমেছে।

সেই রাতেই খেয়া বন্ধ করতে লোক ছুটল যাতে খেয়া পার হয়ে মিলিটারি বাগেরহাট দিয়ে না আসতে পারে। লোক ছুটল রাস্তায় ব্যারিকেড দিতে। রশীদও তাদের দলে ভীড়ে পড়ল। কোলাহল আতঙ্ক আর হতাশার মধ্যে ভোর হলো। রেডিও ধরল সবাই। কই কিছু নেই, একটানা সেতার বেজে চলছে। আতঙ্কিত লোকজন আকাশবাণী শুনতে চেষ্টা করল। সেখানে রীতিমত প্রভাতী অনুষ্ঠান চলছে। এত সব যে হয়ে যাচ্ছে তার কোনো খবর নেই।

সকাল দশটায় সামরিক নির্দেশাবলি প্রচারিত হলো। ইয়াহিয়া ভাষণ দিলেন এগারোটায়–

‘…শেখ মুজিবকে বিচর্বিচারে আমি ছেড়ে দেবো না। আওয়ামী লীগ দেশের শত্রু। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ঘোষণা করলাম। এবং আমার দেশ প্রেমিক সেনাবাহিনী তাদের পূর্ব সুনাম অক্ষুন্ন রেখে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে এগিয়ে এসেছে…’

চারিদিক থমথম করছে। আতঙ্ক বুকের ওপর চেপে বসেছে। এই বুঝি মিলিটারি এসে পড়ল। আব্বা হতবুদ্ধি, S.P. বরিশাল নিশ্রুপ। পাকিস্তান রেডিও থেকে তখন অনবরত নাত-এ রসুল আর হামদ প্রচারিত হচ্ছে।

দুপুরে আচ্ছন্নের মতো বসে রয়েছি ট্রানজিসটার হাতে। কী করব ভেবে পাচ্ছি না। কলকাতা স্টেশন ধরে রেখেছি। হঠাৎ সেখান থেকে গীতিকা অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ রেখে হঠাৎ বলা হলো পূর্ব বাংলায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। পূর্ব-পাকিস্তান রাইফেলস, পূর্ব বাংলা রেজিমেন্ট, পূর্ব-পাকিস্তান পুলিশ, পূর্ব-পাকিস্তান আনসার, পূর্ব-পাকিস্তান মুজাহিদস দুর্জয় প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলেছে। তারপর বাজান হলো সেই বিখ্যাত গান ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’

বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ ওয়ারলেস থেকে বলা হলো EPR-এর জোয়ানরা এখানে প্রচুর মিলিটারি মেরেছে বন্দি করেছে আরো অনেক। তারা এগিয়ে চলেছে কুমিল্লার দিকে। আরো খবর পাওয়া গেল তুমুল লড়াই চলছে কুমিল্লায়, চিটাগাং-এ। আচ্ছন্নের মতো কাটল আরো একটি দিন। ২৮ তারিখ রাতে রেডিওর নব ঘুরাচ্ছি যদি কোন বিদেশি স্টেশন কিছু বলে হঠাৎ শুনতে পেলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। শরীরের সমস্ত রক্ত উত্তেজনায় ফুটতে লাগল। বাইরে তখন তুমুল উত্তেজনা, তুমুল হইচই ‘স্বাধীন বাংলা বেতার। স্বাধীন বাংলা বেতার।’ অল্প সময়ের অনুষ্ঠান অথচ আগুন দিয়ে ঠাসা।

‘… ওরা জানে না আমরা কি চিজ। জানে না EPR কি জিনিস? আমরা ওদের টুটি টিপে ধরেছি। তুমুল যুদ্ধ চলছে। জয় আমাদের সুনির্দিষ্ট। এই ছোট্ট অনুষ্ঠানটা বাঙালিদের চরম আর ভয়াবহ হতাশায় কি আনন্দের সওগাতই না এনে দিলো। আব্বার অর্ডারলি নাজিমত কেঁদেই ফেলল আনন্দে। রেডিও centre-টা কোথায় তাই নিয়ে জল্পনা-কল্পনা। ঘোষকের বাড়ি কোথায় তাই নিয়ে বাজি ধরাধরি। কেউ বলছে নোয়াখালি কেউ বলছে সিলেট। মিছিল বের হয়েছে ‘স্বাধীন বাংলার জয়’ ‘জয় বাংলার জয়।’

খুলনা শহরের অদ্ভুত সব খবর পাচ্ছি। কারা তৈরি করেছে সেসব কে জানে তবে তা থেকে পরিস্ফুটিত হচ্ছে একটা জিনিস তা হলো বাঙালি জাতীয়তাবোধ। খবরগুলো আনে নাজিম। হাসিহাসি মুখে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। ভাবটা এই রকম যে একটা খবর জানি তবে মরে গেলেও বলব না। আমরা জানতে চাই কী খবর নাজিম ভাই তখনই হাত পা নেড়ে নাজিম ভাইয়ের খবর বলা শুরু হয়। দু একটা খবর এই ধরনের :

১। খুলনা শহরের সদর রাস্তায় কে যেন একবস্তা অড়হড়ের ডাল ঢেলে ফেলে দিয়েছে। ফলস্বরূপ মিলিটারি যখন পার হতে যাচ্ছে। তখনই পা পিছলে আলুর দম।

২। ট্রেঞ্চে বসে গুলাগুলি চলছে। একদিকে পশ্চিমা মিলিটারি অন্যদিকে বাঙালি ই.পি.আর। ফায়ার ব্রিগেডের লোকরা তক্কে তকে ছিল হোস পাইপ দিয়ে দিয়েছে মিলিটারির ট্রেনে পানি ভরতি করে। মিলিটারিগুলি হাঁসফাঁস করে মরছে।

৩। একদল মিলিটারি যাচ্ছিল রাস্তা বেয়ে। পথে নজর পড়ল এক ভিমরুলের চাকের ওপর। এটা কী রে বাবা? বোমা নয়তো? মারল সেখানে এক গুলি। ঝাঁকে ঝাঁকে ভিমরুল উড়ে এলো। ফলস্বরূপ তিন মিলিটারি খতম এর ভেতর দুজন আবার মেজর।

ঠিক এই সময় আওয়ামীলীগ নেতার বিবেচনায় একটা বড়ো ভুল হলো। পিরোজপুর ট্রেজারি থেকে আড়াই শত রাইফেল লুট হয়ে গেল। যার সুদুরপ্রসারী কুফল আওয়ামী লীগ নেতারাই দেখে গেলেন। পুলিশের সঙ্গে সম্পর্কও খারাপ হয়ে গেল জনসাধারণের। আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে মহকুমা পুলিশ প্রধান হিসেবে মতভেদ হয়ে গেল আব্বার।

রাইফেলগুলো ছিল আনসারদের। ঠিক হয়েছিল সে-সব আনসারদের দিয়ে দেওয়া হবে। সেই সমস্ত আনসারদের, যারা সত্যিকার অর্থেই যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। তাদের পাঠানো হবে বাগেরহাটে। সারা রূপসার তীরে যে-EPR দলটা আছে তাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে খুলনার মিলিটারিদের উপর আক্রমণ চালাবে। স্থানীয় পুলিশ, বিভিন্ন থানা থেকে পুলিশ এনে নিজেদের ঘাঁটি সুরক্ষিত করে রাখবে যাতে মিলিটারি আক্রমণের সমুচিত জবাব দেওয়া যায়। এইরূপ আলাপ আলোচনা যখন চলছে ঠিক তখনি আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্য এনায়েত হুসেন শ তিনেক লোক নিয়ে ট্রেজারি ঘেরাও করলেন। ১৬ জুন armed police যারা ট্রেজারি দিন রাত পাহারা দিত তারা কী করবে ভেবে পেল না। আব্বা দৌড়ে গেলেন সেখানে বললেন, এইভাবে রাইফেল ডাকাতের হাতে পড়ে মহা মুশকিল হয়ে যাবে। বন্দুক আমরাও ধরব। আমাদের বিশ্বাস করো তোমরা। রাইফেল লুট হয়ে গেল। এবং সেই দিনই পঞ্চাশের বেশি রাইফে আর দুই হাজার রাউন্ড গুলি চলে গেল ডাকাতের হাতে। এবং বলা বাহুল্য এর ফল পরখ করল সবাই। আওয়ামী লীগের এই ভুল চালে পুলিশ সবাই ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠল। ট্রেজারি গার্ডের ১৬ জন পুলিশের মধ্যে দশ জন armed police পালিয়ে গেল পরদিনই।

থানা আর টাউন আউট পোস্ট থেকে একজন দুইজন করে পুলিশ সরতে থাকল। আব্বা কী করবেন ভেবে পেলেন না। বরিশালের এস.পি জানালেন ওয়ারলেস করে সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশ মেনে চলেন।

পিরোজপুরে তখন চরম বিশৃঙ্খলা। রাইফেল হাতে ছেলেরা যত্রতত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। দোকানপাট থেকে জোর করে জিনিসপত্র নিয়ে। আসছে। চাঁদা উঠানো হচ্ছে বড়ো হাতে। ডাকাতি শুরু হয়েছে। আসেপাশের গ্রামগুলোতে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে নকশালদের বিরোধ ধূমায়িত হচ্ছে। নেতৃত্বের চিহ্ন নেই কোথাও। বন্দুক হাতে পেয়ে সবাই নেতা। অবস্থার অবনতি হচ্ছে দ্রুত গতিতে। বিশেষ করে নকশাল-আওয়ামী লীগ বিরোধ। আওয়ামী লীগ বলছে দু-দলের উদ্দেশ্য যখন এক তখন এক সঙ্গেই আসুক তারা। নকশালদের কথা হলো আমাদেরটা আমরাই দেখব। তারপর নকশালরা যা শুরু করল তা মুক্তিসংগ্রামকে বহুলাংশে ক্ষতি করল। টাকাপয়সা, পেট্রল, কেরসিন, চাল, ডাল, তেল, মশলা ইত্যাদি যার কথাই মনে হতে লাগল তাই তারা জমাতে লাগল পর্বতপ্রমাণ। সমস্তই বন্দুক দেখিয়ে। অতিষ্ঠ হয়ে উঠল সবাই। সরকারি অফিসাররা হলো তাদের খেলার পুতুল। বন্দুক হাতে তাদের দিয়ে যা ইচ্ছা তা করাতে লাগল। একটা উদাহরণ দিচ্ছি–

রাত ন টার দিকে একদল নকশাল ছেলে হাজির হলো বাসায়। তাদের সবার হাতেই রাইফেল। কী চাই? আব্বাকে দরকার। আব্বা বেরিয়ে এলেন।

ফজলু : চাচাজান (আব্বাকে চাচা ডাকত তাদের সবাই) আমরা একটা জরুরি কাজে এসেছি আপনার কাছে।

আব্বা : কী কাজ?

ফজলু : আপনি আমাদের একটা প্রাইভেট টেলিফোনের ব্যবস্থা করে দেবেন আর আপনাদের যে-ওয়ারলেসটা আছে সেটা আমাদের দিয়ে দেবেন।

আব্বা : বল কী?

ফজলু : চাচাজান সেটি আপনাকে করতেই হবে।

যাই হোক শেষ পর্যন্ত আব্বা ওদের একটা প্রাইভেট টেলিফোনের ব্যবস্থা করে দিলেন ইঞ্জিনিয়ার T & T-কে বলে। ওয়ারলেসটা অবশ্য রয়ে গেল।

যাই হোক বন্দুক হাতে ছেলেদের প্রথম যারা সংঘবদ্ধ করল তাদের মধ্যে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের 2nd লেফটেন্যান্ট জিয়া আর একজন নেভাল অফিসারের দান খুবই বেশি। বেসামরিক দিক থেকে সাহায্য করলেন আলী হায়দার খান আর তরুণ ফোর্থ অফিসার মিজানুর রহমান।

Training camp খোলা হলো। সুসংঘবদ্ধ করে সত্যিকার অর্থেই ভালো Training দেয়া হলো। কিন্তু ইতিমধ্যে বড় দেরি হয়ে গেছে। ডাকাতের দল বন্দুকহাতে গ্রাম থেকে গ্রামাঞ্চলে অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। খুন তখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।

আলী হায়দার খানের নেতৃত্বে মহকুমার অভ্যন্তরীণ শান্তিরক্ষার জন্যে একটা কমিটি গঠন করা হলো। তারা গ্রামে গ্রামে শান্তি রক্ষার জন্যে রক্ষিবাহিনী গঠন করে বেড়াতে লাগল। তাদের যাতায়াতের জন্যে ছিল পুলিশের মোটরবোট। সে দলটা বেরুত তাদের মধ্যে ছিল। আলী হায়দার, কোর্ট ইন্সপেক্টর, দু-জন আর্মড কনস্টেবল, আলী হায়দার এর ভাগ্নে বাদশা এবং আমি বলতে বাধা নেই ব্যাপারটা হতো একটা প্লেজার ট্রিপ। স্পিড বোটে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়াতে চমৎকার লাগত। অবশ্য এই বেড়ানোর একটা মহৎ উদ্দেশ্যও ছিল সেটি হলো গ্রামবাসীকে এই স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্বন্ধে অবহিত করা।

দেখলাম হিন্দুদের ভাগ্য বিপর্যয় শুরু হয়েছে। সমস্ত বড়ো বড়ো হিন্দুবাড়ি ডাকাতি হয়ে যাচ্ছে। ডাকাতি ছাড়া আরো অনেক কুৎসিত ব্যাপারও হচ্ছিল। উঠোনে হ্যাজাক জ্বালিয়ে কমবয়সী মেয়েদের তার চারদিকে ন্যাংটো করে দাঁড়া করে রাখা থেকে শুরু করে, সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া ছিল খুবই কমন।

রাতের বেলা শহরও পাহারা দিতে হতো। ছয় জনের একটা গ্রুপ করে বন্দুক হাতে শহরে টক্কর মারতে হতো। এই পাহারার ব্যাপারটা আমার বেশ লাগত। নির্জন শহর ঘুমিয়ে, আমরা ক-জন জেগে জেগে অচেনাসব রাস্তা-ঘাটে হাঁটছি। স্নান জোছনা পড়েছে শহরে, বাতাসে নারিকেলের পাতা কাঁপছে। অল্প শীত বেশ লাগত।

শিখু কেন জানি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সমস্ত দিন পড়ে পড়ে ঘুমাত। তার অবস্থা দেখে আব্বা শঙ্কিত হয়ে ডাক্তার ডাকালেন, অষুধ পত্র কেনা হলো। অথচ আব্বা নিজেও খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন। খেতে পারতেন না, রাতে ঘুমুতে পারতেন না। অতি সামান্য খবরেও ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়তেন। মনে আছে আকাশবাণী থেকে সাড়ে আটটায় অধ্যাপক সমর গুহ যখন বলছিলেন–

‘… বাঙালির একটি মাত্র অপরাধ, বাঙালি চেয়েছে, স্বাধীকার। জনগণ-মন অধিনায়ক শেখ মুজিব বলেছেন বঞ্চিত মানুষের কথা…’

অতি সাধারণ আবেগের কথা, তবু তাই শুনে আব্বার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছিল।

আম্মা কিন্তু খুব নিশ্চিন্ত ছিলেন। তিনি বলতেন সব যাই হোক, আমাদের কিছু হবে না। তিনি খুব দৃঢ়তার সঙ্গেই এ-কথা বলতেন এবং আমরা তার কথা আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করতাম। তার কারণও ছিল। আম্মার ক্ল্যারিওভ্যানসি ক্ষমতা কিছু পরিমাণে ছিল। ভবিষ্যতের প্রায় ঘটনাই আগেআগে টের পেতেন। আগেও অনেকবার তার এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে আমাদের বিস্মিত করেছেন। তার। একটা উদাহরণ এখানে দিচ্ছি।

আম্মা দুপুরে পানটান খেয়ে পালঙ্কে বসে আমাদের সঙ্গে গল্প করছেন। বলছেন, গত রাতে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি। একটা বাচ্চা মেয়ে আমাকে এসে বলছে আমাকে চিনছেন না? আমি রাবেয়ার মেয়ে। আপনাদের এখানে থাকব কয়দিন। বলা শেষ হতেই পর্দা সরিয়ে বাচ্চা মতো একটা মেয়ে ঢুকে বলল সে রাবেয়ার মেয়ে, এখানে কয়েকদিন থাকত এসেছে। ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা বিস্মিত হয়েছিলাম। এমনকি এই ক্ষমতার জন্যেই তার ওপর আমাদের বিশ্বাস ছিল প্রখর। তাঁর সম্বন্ধে আরো একটি কথা বলবার লোভ সামলাতে পারছি না। তিনি কোথাও কিছু নয় অথচ খুব মিষ্টি। ফুলের গন্ধ পেতেন। আমার ছোটোবোন শেফুও তা পেত। তাদের দু-জন সম্বন্ধে এইটুকু কথা বলা চলে যে, দু-জনই চূড়ান্ত রকমের ধর্মনিষ্ঠ। ধর্মের সব অনুশাসনই যে শুধু গভীরভাবে বিশ্বাস করত তাই নয়, যথাযথ নিষ্ঠার সঙ্গে পালনও করত।

প্রথম দিককার কথায় ফিরে আসি। আমাদের সাফল্যের প্রথম দিনগুলোতে যখন স্বাধীন বাংলা বেতার, কলকাতা বেতার, BBC, VOA, আর রেডিও অস্ট্রেলিয়া একটির পর একটি সাফল্যের খবর দিচ্ছে, ঠিক তখনই একটা খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। টিক্কা খান ইজ ডেড। টিক্কা খান হ্যাস গন। খবরটা এসেছে মগবাজার থেকে চাঁদপুর টেলিফোনে। টেলিফোন অপারেটররা স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই খবরটা চারিদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছিল। থানায় আব্বাই প্রথম এ-খবর রিসিভ করে খুশিতে নাকি ‘জয় বাংলা’ বলে লাফিয়ে উঠলেন। মস্ত মিছিল বেরুল ই.পি. আর এর গুলিতে টিক্কা খান মরেছে। দু-একজন গরিব-দুঃখীদের পয়সা বিলালো এই উপলক্ষে। বিকেলের দিকে টিক্কা খানকে কীভাবে মারা হলো সে সম্বন্ধে অদ্ভুতসব গল্প নাজিম ভাই আনতে লাগলেন–

‘ই.পি. আর এর মেজর আব্দুল গফুর মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে সটান ঢুকে পড়েছিল টিক্কা খানের কনফারেন্স রুমে। ঢুকেই গুলি। সে নিজেও আর বেরিয়ে আসতে পারে নাই।’

BBC থেকেও যখন বলা হলো টিক্কা আহত। তখন টিক্কার মৃত্যু সম্বন্ধে সবাই নিঃসন্দেহ হয়ে বুকে হাতির বল পেল।

বাঙালির প্রতিরোধে ভাঙন ধরল ক্রমে। আকাশপথে জলপথে সৈন্য আসতে লাগল। যুদ্ধজাহাজ ইফতিখার আর বাবর থেকে ক্রমাগত শেল বর্ষিত হতে লাগল। বাঙালি অধিকৃত বন্দর চাটগাঁয় স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে মুহুর্মুহু বিদেশের বিবেকসম্পন্ন মানুষের কাছে সাহায্যের জন্য আকুল আবেদন জানানো হতে লাগল। বলা হতে লাগল যার যা অস্ত্র আছে নিয়ে এগিয়ে আসুন। এমনকি খুন্তি, দা, কুড়াল, মরিচের গুঁড়া। শুনতে শুনতে দুঃখে চোখে পানি এসে যায়, ভাবি কতটুকু অসহায় হলেই না এমন বলা যায়।

পিরোজপুরের কথা বলতে গেলেই আরেকজন এর কথা বলা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সে হচ্ছে প্রাক্তন সামরিক বাহিনীর একজন গেরিলা যুদ্ধের trainee. তার নাম (নাম সম্ভবত হাশেম) মনে নেই। এইখানে তাকে গেরিলা বলেই উল্লেখ করব। লোকটার গড়ন হালকা পাতলা, পেটা শরীর, চোখের তারা বেড়ালের মতো, বেশ লম্বা, গায়ের বর্ণ গাঢ় কালো। প্রথম থেকেই তার উন্মাদনা ছিল আকাশ ছোঁয়া। মুক্তিবাহিনীর সংগঠনে তাদের ট্রেনিং হওয়ানোয় সে মেশিনের মতোই। খাটছিল। তার ৬ জন বিশ্বস্ত অনুগামী নিয়ে সে একটা গেরিলা স্কোয়াডও করেছিল। সবার আস্থাও সে অর্জন করেছিল। কি করে তার একটা ছোট্ট উদাহরণ দিচ্ছি।

সবাই ঘুমিয়ে রয়েছি, রাত হবে তিনটা। গেরিলা এসে কড়া নাড়ল। দরজা খুলে দিলাম আমি। কী ব্যাপার? ব্যাপার খুব গুরুতর। ট্রেজারি লুট করবার জন্যে আলী হায়দার নাকি তার দলবল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আব্বা চিন্তিত মুখে তার বক্তব্য শুনছেন। সে বলে চলল, স্যার আমি ট্রেজারির পাশের রাস্তা দিয়ে আসছিলাম। হঠাৎ আলী হায়দার আমায় হল্ট বলে থামাল। দেখি আলী হায়দার তার জনাকয় বন্ধু নিয়ে ট্রেজারির চারপাশে ঘুরঘুর করছে। আলী হায়দার বলল এ রাস্তা ছেড়ে অন্য রাস্তায় যেতে। আমি অন্য রাস্তায় দৌড়ে আপনার কাছে এসেছি। আব্বা তার সিনসিয়ারিটির জন্য তার কাঁধে হাত রেখে তাকে ধন্যবাদ দিলেন। তারপর বললেন, আলী হায়দার ট্রেজারি রক্ষার জন্যেই এই ব্যবস্থা নিয়েছে। আলাপ-আলোচনা করেই এটা ঠিক করা হয়েছে চিন্তার কিছু নেই। পরদিন ভোরে গেরিলা আবার এলো। বিষম উত্তেজিত। ফায়ার ব্রিগেডের গাড়িতে করে এসেছে। উত্তেজনার কারণ সে একজন স্পাই ধরে ফেলেছে। একে মেরে ফেলবে কি-না তাই নিয়ে পরামর্শ করতে এসেছে আব্বার সঙ্গে। আব্বা শুধু বললেন-এ যে স্পাই বুঝলেন কী করে? এবার সে একটি প্রস্তাব করল। স্যার আপনারতো দুটো রিভলবার, একটা আমাকে দিয়ে দেন যদি তবে আমি গেরিলাযুদ্ধে কাজে লাগাতে পারি। আব্বা পরিষ্কার না বলে দিলেন। গেরিলা চলে গেল। আমার মনে হলো কাজটা বুঝি ঠিক হলো না। আব্বাকে বললাম, সমস্ত রাইফেল যখন তাদের হাতে তখন বাড়তি একটা রিভলবার কি আর ক্ষতি করবে। সে গেরিলা ফাইটার। রিভলবার সত্যিকার অর্থেই সে কাজে লাগাতে পারবে, দুটো রিভলবারেরও আপনার প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া ওদের হাতেই ক্ষমতা কাজেই সম্প্রীতি নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে এদের হাতে রাখা কর্তব্য। আব্বা আমার যুক্তিতে টলে গিয়ে গেরিলাকে ডেকে পাঠিয়ে নিজের Personal রিভলবার ৬ রাউন্ড গুলি দিয়ে দিলেন। এবং তার চাকরি জীবনে অন্যের কথা শুনে এই প্রথম হয়ত একটা বড় ধরনের ভুল করলেন। কেন সে কথা পরে বলছি।

এদিকে শেখ মুজিবের গ্রেফতার নিয়েও তুমুল হইচই হচ্ছে। স্বাধীন বাংলা বলছে তিনি গ্রেফতার হননি, তিনি সমগ্র মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনা করছেন। আকাশবাণী বলছে ২৫ শে মার্চের পরেও বিভিন্ন বেতার থেকে তার কণ্ঠ শোনা গিয়েছে। BBC-র একজন জাপানি সাংবাদিকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলল তিনি হয়ত-বা গ্রেফতার হন নি। বহুরকম গুজব শোনা যায় তার সম্বন্ধে। কেউ বলছে আই বি ব্রাঞ্চের আই, জি আগেই ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে তাকে সরিয়ে ফেলেছে। কেউ বলছে দু-জন বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর রাত ৯টার দিকে তাকে নিয়ে সরে পড়েছে। যদি সাংবাদিক গ্রিনের কথা অনুযায়ী শেখ মুজিব গ্রেফতার হয়েছেন এবং বলেছেন তাঁর প্রতিবেশীকে যে ‘আমি যদি ধরা না দেই তবে আমার খোঁজে সমস্ত ঢাকা তছনছ করে ফেলবে, এরচে গ্রেফতার হওয়াই ভালো।’

এমনি সময় খবর এলো যশোহর sector পাকিস্তান সৈন্যবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে। চিটাগাং থেকে বাংলা বাহিনী সরে গিয়েছে। নেভির জোয়ানরা গানবোটে করে ঢুকে পড়েছে গ্রামের ভিতর। শেলবর্ষণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে একটির পর একটি জনপদ। পরোক্ষভাবে অত্যাচারের চিত্র দেখতে পাচ্ছি। নদীর স্রোতের মতো লোক পালিয়ে আসছে খুলনা থেকে। তাদের দুঃখ-কষ্ট আর হতাশার কথা বর্ণনা নাই-বা করলাম।

রাতে ভালো ঘুম হয় না। বিকট সব দুঃস্বপ্ন দেখি। মাঝে মাঝে উড়োখবর আসে মিলিটারিজাহাজ হুলারহাটে ভিড়ছে। শুনে আতঙ্কে বুকের রক্ত জমে যায়। কি করা যায় ভেবে পাই না। শহরের লোকেরা। এস্তে ঘুরে বেড়ায়। অন্ধকার রাতি ভয়াবহ দুর্যোগের মতো বুকের ওপর চেপে বসে। আবার ভোর হয়, আবার আসে রাত্রি। এই বিভীষিকার মধ্যেও একটা আশার খবর পাওয়া গেল হঠাৎ। আকাশবাণীর প্রভাতী সংবাদে বলা হলো—‘সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট পদগের্নি ইয়াহিয়ার কাছে ব্যক্তিগত চিঠি পাঠিয়ে গণহত্যা বন্ধ করে রাজনৈতিক সমাধান করতে বলেছেন। বাংলার অবিসাংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের জীবনের নিরাপত্তা সম্বন্ধেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।’ আব্বা ঘুমিয়ে ছিলেন, তাকে ঘুম থেকে জেগে তুলে এই খবর শোনালাম। মুহূর্তে তার চোখমুখ থেকে দুশ্চিন্তার ছায়া অপসারিত হলো, বললেন—‘এইবার ইয়াহিয়া টাইট হবে। আর আমাদের ভয় নাই।’

পুরোনো স্মৃতির কথা লিখতে গিয়ে চোখ পানিতে ভরে ওঠে। একটা সুগভীর বেদনা অনুভব করি। প্রেসিডেন্ট পদগর্ণির চিঠিতে কোনো কাজ হয়নি। তবে আমাদের চরম হতাশায় বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে তারাই প্রথম খোলাখুলিভাবে আমাদের কথা বলেছে। তাদের সহানুভূতিটুকুতো পেয়েছি। তাই তাদের প্রতি আজ আমাদের অনেক ভালোবাসা, অনেক কৃতজ্ঞতা। জয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। জয় সোভিয়েত ইউনিয়নের বীর জনগণ।

দু-দিন পরের কথা। রাত্রিকালীন ডিউটি সেরে ফিরছি। সঙ্গে আলী হায়দার, তার ভাগ্নে বাদশা, নকশাল গ্রুপের একটি ছেলে। রাত হবে আড়াইটা। দেখি বাসায় আলো জ্বলছে, বসার ঘরে অনেক লোকের ভীড়। আমাদের পায়ের শব্দে আব্বা বেরিয়ে এলেন। আমাকে দেখে ভীষণ খুশি হয়ে গেলেন, আয়, ভিতরে আয় বলে ডাকলেন। আলী হায়দারের দিকে ফিরে বললেন, হায়দার সাহেব একটা ব্যাপার হয়েছে, কাল আপনার সঙ্গে আলাপ হবে। আব্বার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল তার বুক থেকে একটা মস্ত বোঝা নেমে গেছে।

[লেখকের লেখা ৫০ নং পৃষ্ঠাটি হারিয়ে গেছে।]

কারণ আপনি যে আমাকে প্রাইভেট রিভলবার দিয়েছেন এটা সে জেনেছে এবং সে সন্দেহ করছে যে, রিভলবার দেয়া হয়েছে তাকে যুদ্ধ করার জন্যে। গেরিলা আরো বলল, আপনার ছেলে যে তার সঙ্গে রাতে গিয়েছে তাকেও হয়ত মেরে ফেলবে, আজ রাতেই মারবার কথা। আব্বা টেলিফোন ০.c. সাহেবের হাতে দিতে বললেন। দেওয়া হলে বললেন গেরিলাকে এরেস্ট করে রিভলবার আর গুলিগুলো রিকভার করতে। ০.c, জানাল মাত্র তিন রাউন্ডগুলি পাওয়া গেছে। বাকি গুলি নাকি সে প্র্যাকটিস করেছে। আম্মা বললেন নিশ্চয়ই সে গুলি করে কোনো মানুষ মেরেছে।

আমার মনের যে কি অবস্থা হলো তা আমিই জানি। সম্পূর্ণ ব্যাপারটার জন্যে আমিই দায়ী আব্বা আমাকে কিছুই বললেন না। রাতে এক ফোঁটা ঘুমও হলো না। সারারাত ছটফট করলাম, আর শুধু বললাম, আল্লা তুমি দয়া কর, এই নিয়ে আর যেন কোনো নতুন ঝামেলা না হয়। মনে ভয় এই বুঝি বুলেটের আঘাতে মৃত একটি লাশ বেরিয়ে পড়ে।

শেষ পর্যন্ত সত্যি সত্যি একটা লাশ পাওয়া গেল। খুনি গেরিলা। খুন করেছে ছুরি মেরে। তাকে গ্রেফতার করা হলো।

দেশের কথা বাদ দিয়ে তখন শুধু নিজেদের কথাই ভাবতে লাগলাম। আব্বার যাতে কোনো বিপদ না হয় শুধু সেই দোয়াই করতে লাগলাম। মনে আতঙ্ক এই বুঝি যে-কোনো কিছু বলে আব্বাকে জড়িয়ে ফেলে। শেষ পর্যন্ত মেজর জলিলের নির্দেশে বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সুবাদার গেরিলাকে গুলি করে হত্যা করা হয় হত্যাপরাধে। গেরিলা কাহিনির যবনিকাপতন হলো। তার লাশ নিতে। কেউ এল না। শেষে আনসাররাই কবরখানায় কবর দিলো তাকে। পরদিনই কুকুর সেই লাশ তুলে ফেলল। গোস্তের টুকরা মুখে করে ঘুরে বেড়াতে লাগল শহরময়।

এই সময়ই পাকিস্তানবাহিনী নির্বিচার বোমাবর্ষণ করে চলল, বগুড়া, সিলেট, চিটাগাং, ময়মনসিং, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, কুষ্টিয়া আর দিনাজপুরে। স্বাধীংলা বেতার স্তব্ধ, স্রোতের মতো লোক আসছে খুলনা থেকে, এই স্রোতেই এসে পড়লেন রহুল মামা তার ভাবিকে নিয়ে। আব্বা খুশি হয়ে বললেন, এসে পড়েছ তোমরা। যাক হাজার শুকুর একটা বাজে স্বপ্ন দেখেছিলাম তোমাদের নিয়ে। অসংখ্য খবর শুনলাম তাঁর কাছ থেকে, যেগুলো তিনি সযতনে ডাইরিতে লিখে রেখেছেন। তার দু-একটা এই ধরনের :

বাবা একটু পানি দেবেন? ২৭ শে মার্চ আলমের আব্বা ঢাকা থেকে জয়দেবপুর যাচ্ছেন। রাস্তায় অসংখ্য মৃতদেহ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। আর ভিতর থেকে এই কথা কটি একজন আহত আলমের আব্বাকে লক্ষ্য করে বলল। তিনি পানি না দিয়েই পালিয়ে আসলেন। কারণ মিলিটারিরা তার দিকে তাকিয়েছিল এবং তারা চায়না বাঙালি বাঙালিকে দয়া করুক।

খুলনার একটি মসজিদে ক-জন লোক নামাজ পড়ছিল। বাইরে গোলমালের শব্দে বেরিয়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে বুলেট উড়ে আসে তাদের ওপর। ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান।

ভদ্রলোকের নাম আই. সি. বিশ্বাস। T.B. clinic-এর ডাক্তার। মিলিটারির ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। স্ত্রীকে সিঁদুর পরতে দিতেন না, হাতে শাঁখা-নোয়াও নেই যাতে সন্দেহ না হয় যে, সে হিন্দু। বেশিদিন পালিয়ে থাকতে না পেরে শেষমেষ মুসলমান হয়ে গেলেন। এখন তিনি মোহাম্মদ ইয়াকুব খান।

একটি কুকুরকে দেখলাম একটি মৃতদেহ টেনে নদীর পানি থেকে শুকনায় উঠিয়ে পরম তৃপ্তিতে লেজ দুলিয়ে দুলিয়ে খাচ্ছে। সাবাস পাকিস্তান।

পিরোজপুরে দ্বিতীয় খুনটি করল উত্তেজিত মানুষ। যাকে মারল তার একটিমাত্রই দোষ, সে অবাঙালি। অবাঙালিরা যে-নির্যাতন চালাচ্ছে তার খবর আসত হরদম। বাঙালির sentiment আগুন হয়ে জ্বলছিল। হতভাগ্য বিহারিটা সেই আগুনকেই প্রজ্বলিত করল শুধু।

পিরোজপুরে কিছু অবাঙালি পরিবার ছিল। তাদের নিরাপত্তার জন্যে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলো। এর উদ্যোক্তা হলেন আলী হায়দার খান আর আব্বা নিজে। পুলিশের মধ্যে একজন পশ্চিম পাকিস্তানি কনস্টেবল ছিল, তাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। 0.c সাহেবের বাসায় তার নিরাপত্তার জন্যে আব্বা বিশেষভাবেই উদ্বিগ্ন ছিলেন। সিন্ধের SDO সাহেব তার অনেক আগেই আশঙ্কা আঁচ করে বরিশালের ADC-র বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। গভীর রাতে টেলিফোন এলো একবার। করেছেন বরিশালের SDPO মহিবুল্লাহ শাহ–

‘ভাল আছেন SDPO সাহেব?

‘জি, আপনি ভালো?’

‘আছি আর কি। আপনাকে একটা কথা বলবার জন্যে phone করেছিলাম।

‘বলুন।’

‘বাংলা স্বাধীন হবে’ বলতে বলতে হাউ মাউ করে শিশুর মতই কেঁদে উঠলেন তিনি।

পিরোজপুরের বাসা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে চলে এলাম নাজিরপুর। আব্বা সেখানেই রইলেন।

নাজিরপুরের বাসাটা ছিল একটা বাংলো বাড়ি। হসপিটেলের মেডিকেল অফিসারের কোয়ার্টার। চমৎকার পরিবেশ সামনে নদী, চারিদিকেই ভীষণ খোলামেলা। বড়ো সড়ক ধরে হাঁটতে কি যে চমৎকার লাগত। চারিদিকে সবুজে সবুজে একেবারে সয়লাব। দিন কাটত গল্পের বই পড়ে আর তাস খেলে। নিজেদের সুবিধার জন্যে তাদের তাস খেলা শিখিয়ে নিয়েছিলাম। পাড়ার হিন্দু বৌ-ঝিরা বেড়াতে আসত। আম্মার সঙ্গে ভারি খাতির হলো, তাদের বাসায় আম্মাকে ধরে নিয়ে যেত। যুদ্ধের কথা শুধু মনে পড়ত খবর শোনার বেলা। মামির তখন Pregnancy first period. যা-ই মুখে দেন বমি করে ফেলে দেন। শুধু তাই নয় কেন জানি না কারো সঙ্গে কথা বলেন না, চোখ তুলে তাকান না। কি অসুবিধা তাও বলেন না। সে ভারি বিশ্রী পরিস্থিতি। আম্মা তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। দেশের এমন নাজুক পরিস্থিতিতে মামির ভূমিকাটা আমাদের সবার খুব খারাপ লাগছিল।

এদিকে আব্বা আছেন একা একা। রান্না বান্নার জন্য আছে রশীদ। রাতে আমাদের বাসাতেই থাকেন কোর্ট ইন্সপেক্টর। নাজেম ভাইও থাকেন। আম্মারই ব্যবস্থা। সেইখানেই খাওয়ার ব্যবস্থা।

এদিকে নাজিরপুরের o/c আমাদের বেশ যত্ন করছিল। সকাল বিকাল খোঁজ নিত। রাতে দু-জন পুলিশ এসে পাহারা দিত। দুধ পাঠাত নিজের বাড়ি থেকে। লোকটাকে একটুও ভালো লাগত না।

ধূর্ত চেহারা, নোংরা জামা কাপড়, ভিজে বেড়াল ভিজে-বেড়াল ভাব। সব মিলিয়ে ভীষণ বাজে। তার মতে, সমস্ত দুর্গতির মূলে মুজিবুর এবং মুজিবুর একটা জন্মচোরা।

নাজিরপুর বাসায় একজন ডাক্তার আসত। গ্রাম্য কোয়াক। হোমিওপ্যাথি, এলোপ্যাথি, কবিরাজি হাকিমি সমস্ত মিলিয়ে তার ডাক্তারিবিদ্যা। নাড়ু গোপাল নাড়ু গোপাল চেহারা। একবার আসলে আর নড়তে চাইত না। মামির নাড়ি ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকত। রোগিনীর জন্যে ঔষধত বটেই পথ্য পর্যন্ত পাঠাত। নিজে সে জামাতে ইসলামের একনিষ্ঠ পাণ্ডা। তার ধারণা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া মানেই সমস্ত মুসলমানের হিন্দু হয়ে যাওয়া। তার যুক্তি ছিল হাস্যকর আর উদ্ভট ‘বাঙালির স্বভাব খারাপ কাজেই বাঙালিরা গোলামই করবে। বেশি ‘জয় বাংলা’ বলেছ যে তাই আল্লাহ্ টাইট করতে মিলিটারি পাঠিয়েছেন’ এই জাতীয়।

যাই হোক দিন মন্দ কাটছিল না। টেলিফোনে আব্বার সঙ্গে আলাপ হতো। বিদেশীরা বাংলাদেশ সম্বন্ধে কে কি বলেছে শুনতে চাইতেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে।

মাঝে মাঝে নাজিরপুর আসতেন। একদিন থেকেই আবার চলে যেতেন। প্রায়ই তার সঙ্গে থাকত আলী হায়দার। আব্বা ছেলেটিকে বড়ো পছন্দ করতেন।

আব্বার কিছু সময় আমাদের সঙ্গে থাকার ইচ্ছে থাকলেও থাকতে পারতেন না। পিরোজপুরের এস.ডি.ও রাজ্জাক সাহেব তাহলেই বলতেন, SDPO সাহেব আমাদের একা রেখে আপনি চলে গেলে আমরা কী করে থাকি?

একদিন বিকেলে খুব গোলাগুলির শব্দ শোনা যেতে লাগল। সন্ধ্যা হতেই দেখা গেল দূরে কোথায় লক লক করছে আগুন। আকাশ গাঢ় রক্তবর্ণ। খবর পেলাম ঝালকাঠি বাজার মিলিটারিরা পুড়িয়ে দিয়েছে। রাতে নাজিরপুরের o/c এসে অভয় দিতে চাইল আমাদের। বলল, ও কিছু নয় ও কিছু নয়, লাল মেঘ। আমরা সবাই কিন্তু ভয় পেয়েছিলাম। এত কাছে মিলিটারি কখন পিরোজপুরে আসে কে জানে। খতমে ইউনুস পড়তে শুরু করলাম সবাই মিলে।

তার একদিন পরই নকশাল আর আওয়ামী লীগের ভিতর তিনঘণ্টাব্যাপী গুলি বিনিময় হলো পিরোজপুরে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে রেগুলার আর্মি, এক্স আর্মি, পুলিশ, আনসার আর কিছু নেভাল অফিসার। নকশালরাই কিন্তু জিতল অথচ এরা দলে মাত্র কুড়ি-পঁচিশজন। বন্দুক হাতে তারা সমস্ত শহরে আধিপত্য বিস্তার করে আওয়ামী লীগদের শহরের বাইরে বের করে দিলো। অথচ আওয়ামী লীগের হাতে তখন স্টেনগান, ব্রেটাগান, টমি গানের মতো অস্ত্র। নকশালদের সম্বল নাইট্রো গ্লিসারিনের হাই এক্সপ্লোসিভ বোমা, যা তারা নিজেই তৈরি করেছে আর গোটা পনেরো রাইফেল।

ইকবাল সন্ধ্যাবেলা আব্বাকে টেলিফোন করতে গেল। ফিরে এসে বলল আব্বা ভীষণ নার্ভাস হয়ে পড়েছেন। বলেছেন আমরা যেন সকাল-বিকাল তার সঙ্গে আলাপ করি, শফু-শিখুও যেন করে।

পরদিন সকালে আমি টেলিফোন ধরলাম।

‘কি রে বাচ্চু এত ককেলি সকাল-বিকাল টেলিফোন করতে আর তোরা চুপচাপ।’

‘করব আব্বা, সকাল-বিকালই করব।’

‘মন বড় খারাপ থাকে, একটা দিন যায় আর মনে হয় আরেকটা দিন বাঁচলাম। তোরা কথা বললে তাও একটু ভাল লাগে।’

নকশাল-আওয়ামী গণ্ডগোল মিটেছে আব্বা?’

‘হ্যাঁ উপরে উপরে মিটমাটই। মনি ভালো আছে?’

‘জি।’

‘ভয়-টয় লাগে?’

‘না। টেলিফোন রাইখা দিব?’

‘কি এত তাড়াতাড়ি। বিদেশি খবর টবর বল…’

বরিশাল শহর মিলিটারি দখল করে নিলো অল্প আয়াশে। তিন দিক থেকে সাড়াশি আক্রমণ চালিয়ে, উপর থেকে বোমা বর্ষণ করে মুক্তিবাহিনীকে হটিয়ে দিলো। চারিদিকে সবাই এতে ভয় পেয়ে গেল। আলী হায়দার একদিন এসে আমাদের সরিয়ে নিলো বাবলায়। এক ব্যারিস্টারের আত্মীয় এই পরিচয়ে সে ব্যারিস্টারের বাড়ি নিয়ে তুললেন আমাদের। প্রকাণ্ড দোতালা বাড়ি, বাড়ির মালিক মোবারক খান প্রবীণ বয়স্ক লোক, তিনি পরম সমাদরে আমাদের গ্রহণ করলেন। চারিদিক থেকে লোক ভেঙে পড়ল আমাদের দেখতে। ‘আহা এই দুঃসময়ে কি কষ্টেই না এরা পড়েছে।’ সবার মুখে এই কথা। ‘কি যত্নের মানুষ এরা কি দিয়ে এদের সমাদর করি।’

কিন্তু কেন জানি না এত যত্ন এত সমাদর সত্ত্বেও আমি খুব দমে গিয়েছিলাম। হয়ত জায়গাটির পরিবেশই মনের ওপর কাজ করছিল। জায়গাটা কেমন যেন দম বন্ধ করা। চারিদিকে ঘন বন জঙ্গলে আচ্ছন্ন, একটুকুও খোলামেলা নয়। কেমন একটা দমবন্ধ করা ভাব। দু-দিনেই আমি হাঁপিয়ে উঠলাম। আলী হায়দার সেই আমাদের রেখেই পালিয়েছে আর খোঁজ নেই। বলে গেছে under ground-এ থাকতে হচ্ছে, তবে কাছাকাছিই আছি। আমরা একেবারে একা পড়ে গেলাম। থাকার বন্দোবস্ত হলো দুই ভাগে। মেয়েরা দু-তলায়। ছেলেরা নিচের তলায়। বাড়িতে কঠিন পর্দা, কাজেই আমরা আম্মা আর শেফু শিখুর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম। তৃতীয় দিনে আলী হায়দার আবার এল। হাসি তামাশায় বেশ কাটল দিনটা। রাতে খেতে বসেছি কে এসে যেন বলল, খুব খারাপ স্তর, পিরোজপুরে ট্রেজারি লুট করেছে নকশালরা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে খুব গোলাগুলি হয়েছে। বেশ কয়েকজন মরেছে। বুকের ভিতর ধ্বক করে উঠল। ভাত বিস্বাদ হয়ে গেল। আলী হায়দার যদিও বারবার বলছে ও কিছু নয়, সব জায়গায় ট্রেজারি লুট হয়েছে; তবুও তার মুখ আতঙ্কে কালো হয়ে উঠল। আলী হায়দারকে জিজ্ঞেস করে জানলাম আব্বা বাবলায়, আমাদের বর্তমান ঠিকানা জানেন না। এই বিপদে কোথায় যাবেন তিনি? দারুণ দুঃশ্চিন্তায় রাত কাটল। পরদিন খুব সকালেই ইকবাল আর ইউনুসকে পাঠালাম নাজিরপুর। সেখান থেকে টেলিফোনে আব্বার সঙ্গে আলাপ করবে। আমি আর রহুল মামা চললাম পিরোজপুর। প্রায় আট মাইল রাস্তা। মানসিক উৎকণ্ঠায় খুব দ্রুত গতিতেই হাঁটছিলাম দু-জন। কোনোরকমে পিরোজপুরে পৌঁছতে পারলে বাঁচি। রাস্তায় অনেক পরিবারের সঙ্গে দেখা হলো তারা সবই শহর ছেড়ে গ্রামে এসে পড়ছে। অনেকেই আমাদের শহরে যেতে মানা করল। এরা সবাই নকশালদের ওপর বিষম ক্ষ্যাপা বলছে, এরা নকশাল নয় টাকশাল। শহরের উপকণ্ঠে আসতেই দেখা হলো জনাকয় বন্দুকধারী লোকের সঙ্গে। তারা আমাদের দেখে থমকে দাঁড়াল। আমার দিকে তাকিয়ে একজন বলল–

‘আপনি SDPO সাহেবের ছেলে?’

‘জি।’

‘চেহারায় অদ্ভুত মিল। মুখ দেখেই চিনেছি। কোথায় যাচ্ছেন?’

‘আব্বার খোঁজে পিরোজপুর।’

‘আরে তাঁর সঙ্গে কাল রাতে দেখা হয়েছে আমার। তিনি তো আপনাদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। পাগলের মতো। ঠিকানা জানেন না তো।’

‘আপনি বরংচ নাজিরপুর যান। শহরে গিয়ে মরবেন নাকি?’

ফিরে চললাম, মনে দারুণ উদ্বেগ। কি মুশকিল আলী হায়দার ঠিকানাটা পর্যন্ত জানায়নি। এখন কি উপায়। ঘামতে ঘামতে পরিশ্রমে আধমরা হয়ে পৌঁছলাম। শুনলাম ইকবাল এসেছে, খবর এনেছে আব্বা রওনা হয়েছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো এসে পড়বেন।

আব্বা আসলেন সন্ধ্যা নাগাদ। সে ছবিটা খুব স্পষ্ট মনে আছে। খোঁচা খোঁচা দাড়িগোঁফ, উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি, পাগলের মতো চাউনি, মুখ শুকিয়ে কালো হয়ে উঠেছে। ক্লান্ত আর অবসন্ন পায়ে তিনি উঠে আসলেন। সঙ্গে নাজিম ভাই আর দু-জন বন্দুকধারী জোয়ান। আব্বা বিছানায় বসে হাঁপাতে লাগলেন। গল গল করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে তার কপাল বেয়ে। ঘন ঘন জিব বের করে ঠোঁট ভিজাচ্ছেন। কাছে বসে মোবারক খান অসংখসংলগ্ন প্রশ্ন করে আব্বাকে বিরক্ত করতে লাগল। তিনি ক্লান্তগলায় প্রতিটির জবাব দিতে লাগলেন। আম্মা একটা পাখা নিয়ে তাকে হাওয়া করতে লাগলেন। আমি তাকে বিশ্রাম দেয়ার জন্যেই মামাকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে চলে গেলাম। মনটা অনেক হালকা।

[এখানে পৃষ্ঠা নম্বরের ধারাবাহিক পাতা নেই, তবে মনে হয় পৃষ্ঠা হারিয়ে যায়নি; পৃষ্ঠা নম্বর দিতে ভুল হয়েছে।]

ট্রেজারি লুট সম্বন্ধে আব্বা বিশেষ কিছু বললেন না। তিনি কেমন যেন বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। যা বললেন তার থেকে এইটুকু বুঝা যাচ্ছিল যে, দু-জন নকশাল রোববার সকালে হঠাৎ দুটি স্টেনগান হাতে এস,ডি,ও আর ট্রেজারি অফিসারের ঘরে ঢুকে পড়ে। তারপর বলে ট্রেজারি খুলে দাও, নয়তো মর গুলি খেয়ে। সকাল ৯টায় দিনে দুপুরে ৯ ট্রাঙ্ক টাকা নিয়ে যায় তারা, আব্বাকে একদল নকশাল ঘিরে রাখে। আওয়ামী লীগ টাকাটা নিজেদের কাছে রাখতে গিয়ে বাধা দেয়, তাতে প্রচুর গুলি বর্ষণ হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি তাজুল ইসলাম মেশিনগান দিয়ে খটাখট গুলিবর্ষণ করে চলে নকশালদের ওপর। তিনজন নকশাল মারা পড়ে এতে।

আব্বা সারাটা দিন ঘুমিয়ে কাটালেন। শিখু তার বুকে হাত বুলিয়ে দিলো। নামাজের সময়গুলাতে যন্ত্র চালিতের মতো উঠে শুধু নামাজ পড়লেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কিরে নমাজ? নমাজ পড়লি না। সন্ধ্যাবেলা হঠাৎ বাদশা এল। হাতে মস্ত এক রামদা। আমাদের আর হায়দারের খোঁজে এসেছে। সে যা বলল তা শুনে আমরা স্তম্ভিত। সে বলল এস.ডি.ও আর ট্রেজারি অফিসারকে আওয়ামী লীগের মুক্তিবাহিনী গ্রেফতার করে আটকে রেখেছে তাদের গেরিলা ট্রেনিংক্যাম্পে। সেখানে তাদের কিছুই খেতে দেওয়া হয় না, কারো সঙ্গে কথা বলতে দেয়া হয় না। বাদশা খবর পেয়ে তাদের উদ্ধার করে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছে। আব্বা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, যাক তারা দুইজন বেঁচে আছে আর ভয় নাই। রাত ৯টার দিকে এল আলী হায়দার। আব্বা খুব খুশি হলেন। বললেন, হায়দার সাহেব ট্রেজারি লুটের পিছনে অনেক রুই-কাতলা আছে, যদি বেঁচে থাকি তবে একদিন নিশ্চয়ই বলব।

রহুল মামাকে নিয়ে পরদিন চলে গেলাম শ্রীরাম কাটির বাজারে। দু-একটা জিনিস কিনতে। সেখানেই শুনলাম পিরোজপুরে মিলিটারি এসেছে। হুলারহাটে ৬ জনকে গুলি করে মেরেছে নেমেই।

খবর শুনে আব্বার কেনো ভাবান্তর হলো না। আর চুপচাপ হয়ে গেলেন। মোবারক খান (বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ মারা যাবার পর মোবারক খান বাড়ি থেকে পুরো পরিবারকে বের করে দিয়েছিল) প্রচুর যত্ন করেছে আব্বাকে। এটা খাওয়াচ্ছে, সেটা খাওয়াচ্ছে। মুখে এক বুলি এত বড় অফিসার আমার ঘরে কি দিয়ে যত্ন করি।

পরদিন ভোর ৯টায় একটা ছেলে এসে হাজির নাজিরপুরের o.c–র একটা চিঠি হাতে। চিঠি আমিই প্রথম পড়লাম, চমৎকার চিঠি। অনেকটা এই ধরনের :

‘… স্যার, আমাদের তো আল্লা ছাড়া কোনো ভরসা নাই আপনি আল্লার নাম নিয়েই পিরোজপুরে যান। এ-ছাড়া এই বিদেশ বিভূইয়ে আমরা কী করতে পারি? পিরোজপুরের o.c আমায় টেলিফোনে জানিয়েছেন কোনো ভয় নাই। তা ছাড়া খুলনারেঞ্জের DIG সব পুলিশ অফিসারদের বেলা বারোটার আগে হাজির হতে বলেছেন।’

বারোটার আগে জয়েন করতে হলে সময় নেই। আম্মা আব্বাকে ডেকে তুললেন। আব্বা চিঠি পড়েন আর জিজ্ঞেস করেন, কিরে যাব পিরোজপুরে? সবাইকেই প্রশ্ন। আমরা সবাই বলি, কোনো ভয় নাই যান। মিলিটারি এডমিনিস্ট্রেশন চালু করতে চাইছে কাউকে কিছু বলবে না। আব্বা নিজেও বলেন ঠিকিইতো, কই পালাব? আজ পালালে ছেলেপেলেসহ কালই ধরিয়ে দেবে। আব্বা আশা আর। আশঙ্কায় দুলতে দুলতে সেভ করলেন। চিড়া খেলেন। কাপড় পরলেন। নৌকা ঠিক হলো। আব্বার মুখ দেখে মনে হলো সাহস পাচ্ছেন। আব্বাকে সাহস দেবার জন্যে ইকবাল চলল সঙ্গে।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x