নদীয়া জেলার মদনপুর স্টেশনে নেমে সগুণা গ্রাম, সে গ্রামের গৌরী মণ্ডলের ওপর ভোলাবাবা ও সন্তোষী মা’র অপার কৃপা। সোম-শুক্কুর পালা করে তাঁরা গৌরীর ওপর ভর করেন। গৌরী আঠাশ-তিরিশের সুঠাম যুবতী। ভরে পড়লে নাকি যে কোনও প্রশ্নের নিখুঁৎ উত্তর দেন। বাৎলে দেন নানা সমস্যার সমাধানের উপায়। হপ্তার ওই দুটি দিন গৌরী মা’র থানে বেজায় ভিড় হয় বলে লাইন ঠিক রাখতে স্বেচ্ছাসেবক, স্বেচ্ছাসেবিকা দর্শনার্থীর নম্বর লেখা টিকিট ধরিয়ে দেয়।

ভারতীয় বিজ্ঞান যুক্তিবাদী সমিতির মদনপুর শাখার দুই সদস্য অসীম হালদার এবং সুবীর রায় শাখা সম্পাদক চিররঞ্জন পালের কথা মত হাজির হলেন গৌরী মা’র থানে। গৌরী মা’র ছোট বোন সন্ধ্যা অসীম ও সুবীরের হাতে নম্বর লেখা টিকিট ধরিয়ে দিলেন। বাঁশের ঢোকার দেওয়াল ও টালির ছাদের নিচে বসেন গৌরী মা। ধীরে ধীরে লাইন এগোচ্ছিল। সুবীরের ঢোকার সুযোগ যখন এলো, পিছনে তখনও বিরাট লাইন। এক সবেচ্ছাসেবিকা জানালেন, জুতো খুলে পা ধুয়ে ঢুকুন। ভিতরে ঢুকতেই আবার স্বেচ্ছাসেবিকা। তিনি বললেন, “ষোল আনা দক্ষিণা নামিয়ে রেখে প্রণাম করে বলুন- বাবা আমি এসেছি।“

আজ সোমবার ২০ অক্টোবর ৯০। অতএব বাবার ভর লেগেছে গৌরীর ওপর। সুবীর পরম ভক্তের মতই নির্দেশ পালন করলেন। চোখ বোলালেন ঘরের চারপাশে। একটা বড় সিংহাসনে অনেক দেব-দেবীর মূর্তি। কিন্তু যে বস্তুটি বিশেষ করে নজর কাড়লো, সে হল একটা বিশাল উই ঢিবি। ঢিবিটা কিসের প্রতীক কে জানে? তবে নজর টানে।

গৌরী মা, একটু ভুল হল, আজ তিনি বাবা, সামনে পিছনে দোল খাচ্ছিলেন। খোলা ছড়ানো চুলগুলো একবার নেমে আসছিল সামনের দিকে, ঢেকে যাচ্ছিল মুখ। আর একবার চলে যাচ্ছিল পিছনে। ‘বাবা’র পাশে বসে এক প্রৌঢ়া।

প্রৌঢ়া বললেন, “বাবা প্রশ্ন করলে উত্তর দিও। উত্তর দিলে সায় দিও।“

সুবীর মাথা নাড়লেন। বাবা মাথা নাড়তে নাড়তেই জিজ্ঞেস করলেন, “কার জন্য এসেছিস?”

“আমার আর দাদার জন্যে।“

“তোমার মন স্থির নেই। কোনও কাজে মন দিতে পারিস না। নানা দিক থেকে বাধা বিপত্তি হাজির হচ্ছে। তোর কাজ হতে দিচ্ছে না।“

সুবীর প্রোঢ়ার নির্দেশমত প্রতি কথায় সায় দিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলে যেতে লাগলেন। ‘বাবা’ সামান্য সময়ের জন্য কথা বলা থামালেন। তারপর বললেন, “তোর সমস্যা মিটিয়ে দেবো, খুশি করে দেবো। তুইও আমাকে খুশি করবি তো?”

-“নিশয়ই করব বাবা।“

-“তুচ্ছ করবি না তো?”

-“না, না।“

-“আমার আদেশ মানবি?”

-“নিশ্চয়ই মানব।“

-“আগামী সোমবার একটা জবা ফুল আর একটা বোতল নিয়ে আসিস। ফুলটা পড়ে দেব। ওটাকে রোজ সন্ধ্যায় ধূপ আর বাতি দিবি, ভক্তি ভরে পুজো করবি। কাউকে নোংড়া কাপড়ে ছুঁতে দেব। রোজ সন্ধ্যায় ফুল পুজো সেরে একটু করে খাবি। যা এবার।“

-“কিন্তু বাবা, আমার আসল সমস্যার কথাই তো কিছু বললেন না।“

-“সেটা আবার কি?”

-“পেটে প্রায়ই ব্যথা হয়…”

-“সুবীরের কথা শেষ হবার আগেই স্বর্গ থেকে গৌরীতে নেমে আসা ভোলাবাবা বলতে শুরু করলেন, “তোর অম্বলের রোগ আছে। গলা বুক জ্বালা করে, প্যাটে ব্যথা হয়, খিঁচ ধরে। যখন ব্যথা ওঠে সহ্য করতে পারিস না।“

সায় দেন সুবীর- “হ্যাঁ। কিন্তু কি করলে সারবে?”

-“আরে জল পড়াটা সে জন্যেই তো দিয়েছি। অসুখ তো তার আসল সমস্যা নয়, আসল সমস্যা তোর মন নিয়ে, কাজে বাধা নিয়ে। যা, এবার আয়।“

-“আমার দাদার বিষয়ে কিছু বললেন না?”

-“তোর দাদার বুকে যন্ত্রণা হয়, গা-হাত-পায়ে ব্যথা, বুক জ্বালা করে, প্যাটে ব্যথা হয়। তোর দাদাও ফুল পুজো করবে, ধূপ আর বাতি জ্বেলে। পুজো সেরে জল পড়া খাবে।“

-“কিন্তু দাদাকে ফুল-জল দেব কেমন করে?”

-“কেন, বাড়ি এলে দিবি?”

-“ওখানে তো সমস্যা। দাদা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। কোথায় গেছে, কেমন আছে, আদৌ বেঁচে আছে কি না, কিছুই জানি না।“

-“চিন্তা করিস না। ওই ফুলের অপার ক্ষমতা। ফুলই তোর দাদাকে এনে দেবে।“

-“করে?”

-“তাড়াতাড়ি।“

-“তাড়াতাড়ি মানে দু মাসও হতে পারে, আবার দশ বছরও হতে পারে? ঠিক কবে নাগাদ আসবে?”

-“ছ’মাস থেকে এক বছরের মধ্যে।“

সুবীর বেরিয়ে আসতেই গৌরীর বোন সন্ধ্যা বললেন, “আপনি আমাকে আগে বলবেন তো – দাদা নিখোঁজ। সমস্ত উত্তর পাইয়ে দিতাম। মনে হয় ওকে কেউ ওষুধ করেছে।“

ইতিমধ্যে আরও কিছু ভক্ত ঘিরে ধরলো। তাদের অনেক প্রশ্ন- “আপনার দাদা বুঝি নিখোঁজ?” “বাবা বলে দিয়েছেন কবে আপনার দাদা ফিরবে?” “মনে হয় আপনাদের বাড়িতে কেউ ওষধ পুঁতেছে।“

সন্ধ্যা ভক্তদের বোঝাতে লাগলেন, “বাবার কাছে অজানা তো কিছু নেই, তাই ওঁকে দাদা নিখোঁজ হওয়ার কথা বলে দিয়েছেন। কবে ফিরবে, তাও। তবে নিয়ম পালন করতে হবে নিষ্ঠার সঙ্গে।“

সন্ধ্যার কথায় আরও অনেক ভক্ত উৎসাহী হলেন। এঁদের অনেকেই হয় তো গৌরী-সন্ধ্যাদের এজেন্ট, কেউ বে-ফাঁস কিছু বলে গোলমাল পাকাবার চেষ্টা করলে নেবার জন্য মজুত রয়েছেন। সুবীর তাই ওখানেই সোচ্চার হতে পারলেন না- নিজের পেটে ব্যথার গপ্পোটা বাবা-মা’র ভরের পরীক্ষা নিতেই বলানো। আর দাদার নিখোঁজ হওয়াটা? নিজেই বড় ভাই। দাদা কই, যে নিখোঁজ হবে?

আমাদের সমিতির শাখা ও সহযোগী সংস্থাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভরের জালিয়াতি ধরেছে কাজল ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে আমাদের সমিতির ময়নাগুড়ি শাখা- ১৯টি। তারপরই অমিত নন্দীর নেতৃত্বে আমাদের চুঁচড়ো শাখা ৩টি। শশাঙ্ক বৈরাগ্যের নেতৃত্বে কৃষ্ণনগরের ‘বিবর্তন’ – ৩টি।

ঈশ্বরে ভর নিয়ে আমাদের সমিতির বিভিন্ন শাখা ও সহযোগী সংস্থা কম করে এক’শর ওপর (আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির হিসেব বাদ দিয়ে) শীতলা, মনসা, কালী, তারা, বগলা, তারকভোলা, পাঁচুঠাকুর, বনবিবি, ওলাইচন্ডী, জ্বরাসুর, পীর গোরাচাঁদ ওলাবিবি ইত্যাদি দেবতার ভরের দাবিদারদের ওপর অনুসন্ধান চালিয়েছেন। সমস্ত তথ্য পর্যালোচনা করে এবং অনুসন্ধানকারীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সঙ্গে সহমত হয়েছি- এঁরা কেউই মানসিক রোগী নন। ভর এঁদের ভড়ং। অর্থ উপারজনের সহজতর পন্থা। এঁরা প্রত্যেকেই নিজেদের শক্তি বা ক্ষমতা বিষয়ে অতি সচেতন। ভরের রোগী হলে সচেতনতা বোধ দ্বারা কখনোই তাঁরা পরিচালিত হতে পারতেন না।

একশোর ওপর এই ভরে পাওয়া বাবাজী-মাতাজীর বিষয়ে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেখতে পাচ্ছি- এঁরা প্রত্যেকেই রোগ মুক্তি ঘটাতে পারেন বলে দাবি রাখেন। ভরে পাওয়া অবস্থায় এঁরা বিভিন্ন প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেন, বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের সঠিক উপায় বাৎলে দেন বলেও দাবি করেন। এঁরা প্রত্যেকেই ভর হওয়ার আগে নিম্নমধ্যবিত্ত বা গরিব ছিলেন। ভর পরবর্তীকালে এঁদের প্রত্যেকেরই আর্থিক সঙ্গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এঁরা অনেকেই ক্যান্সার সারিয়েছেন, বোবাকে দিয়ে কথা বলিয়েছেন, অন্ধকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে দাবি রেখেছেন। এইসব দাবিদারকে প্রতিটি দাবির ক্ষেত্রেই অনুসন্ধানকারীরা অনুসন্ধান চালিয়ে দেখেছেন, ওই নাম-ঠিকানার কোনও মানুষের হদিশ পাওয়া গেলেও তাঁরা বাস্তবিকই বোবা, বা অন্ধ ছিলেন, অথবা ক্যান্সারে ভুগছিলেন- এমন কোনও তথ্যই ওইসব মানুষগুলো হাজির করতে পারেননি। বরং দেখা গেছে ওইসব মানুষগুলো হয় ভর হওয়া বাবাজী-মাতাজীদের

কাজল ভট্টাচার্য ও জনৈক অলৌকিক ক্ষমতার দাবিদার

আত্মীয়, অথবা ভক্ত। ওরা যে এজেন্ট হিসেবে প্রচারে নেমেছে, এই বিষয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

শ্রদ্ধেয় পাঠকদের কাছে একটি বিনীত অনুরোধ- কারও কথায় কারও অলৌকিক ক্ষমতায় আস্থা স্থাপন না করে একটু জিজ্ঞাসু মন নিয়ে অবতারটিকে বাজিয়ে দেখুন- আপনার চোখে তার মিথ্যাচারিতা ধরা পড়বেই।

তবু আমরা, সাধারণ মানুষরা, বিভ্রান্ত হই। আমাদের বিভ্রান্ত করা হয়। নামী দামী বহু প্রচারিত পত্র-পত্রিকায় অলৌকিকতা, জ্যোতিষ বা ভরের পক্ষে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলিই আমাদের, সাধারণ মানুষদের, বিভ্রান্ত করার হাতিয়ার।

বহু থেকে একটি উদাহরণ হিসেবে আপনাদের সামনে হাজির করছি। ৩০ মে ৯০ আনন্দবাজার পত্রিকায় বহুবর্ণের তিনটি ছবি সহ একটি বিশাল প্রতিবেদন প্রকাশিত হল “পূজারিণীর শরীর বেয়ে” শিরোনামে। আপনাদের অবগতির জন্য এখানে তুলে দিচ্ছি।

পূজারিণীর শরীর বেয়ে

দেবদেবীর ভর হয় পূজারিণীর শরীরে। সে সময় যা বলা যায় তাই মেলে। যা দাওয়াই দেওয়া হয় তাতেই রোগ নির্মূল হয়। ভর হয় কিভাবে?

শনিবার বেলা দুটো। ঢাকুরিয়া স্টেশনের পাশে তিন-চার হাত উঁচু ছোট্ট একটি কালী মন্দির। মন্দিরের মাথায় চক্র ও ত্রিশূল। মন্দিরটির নাম ‘জয় মা রাঠের কালী।‘ মন্দিরের সামনে একটি সিমেন্টের বাঁধানো চাতাল। সেই চাতাল ও পাশের মাঠে ইতস্তত ছড়ানো অনেক লোক। আর সেই দাওয়ার ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে এক যুবতী, পরনে লাল পাড় সাদা শাড়ি এলোমেলো, চোখ দুটি বোজা, নাকের পাটা ফোলা, মুখের

দুপাশে ক্ষীণ রক্তের দাগ। মহিলাটির ভর হয়েছে। কালী পুজো করতে করতে অচেতন হয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েন মহিলা। মুখ দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। হঠাৎ মহিলা বলে উঠলেন, ‘স্বামীর লগে এয়েছিস কে?’ উপস্থিত জনতার মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। শাঁখা-সিঁদুর মাঝবয়সী এক আধা-শহুরে মহিলা ঠেলাঠেলি করে সামনে এলেন। মন্দিরে ছোট দরজার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে ‘মা’ বলে হাতজোড় করে ডাকতে লাগলেন। ‘মা’ বললেন- ‘সব ঠিক হয়ে যাবে। কিচ্ছু হবে না। আমার জল পড়া খাইয়েছিস?’

‘খাইয়েছি মা। সারছে না মা’।

‘ওতেই সব ঠি হয়ে যাবে।‘

এরপর ‘মা’ ডেকে উঠলেন, “ব্যবসার জন্য এয়েছিস কে? বোস। আমার কাছে আয়।“ শার্ট-প্যান্ট পরা মাঝবয়সী ব্যক্তি এগিয়ে এলেন। একইভাবে- হাত জোড়। হাঁটু মুড়ে বসা। ‘মায়ের কাছে সমস্যার কথা জানালেন। মা অভয় দিলেন। ভদ্রলোক চলে গেলেন। ফের ‘মা’ ডাকলেনঃ ‘কোমরে পিঠে পেটে ব্যথার জন্য এয়েছিস কে? আয়, আয় সামনে আয়।‘

এক এক করে ছেলে মেয়ে বুড়ো মাঝবয়সী সবাই হাজির হতে লাগল। ‘মা তাদের কোমরে, পিঠে পেটে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। তারা এক এক করে চলে গেলে একটি যুবক এগিয়ে এল। ‘মা’ তার পেটে হাত বুলিয়ে দিলেন নাভিতে হাত রাখলেন। ‘মা’য়ের মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল। মায়ের ‘ঝাড়া’র রকমই এই।

‘সন্তানের লগে এয়েছিস কে?’ যুবকটি চলে যেতেই ‘মা’-য়ের ডাক। শিশুকোলে এক রমণী এগিয়ে এলেন। ‘মা’ শিশুটিকে তাঁর বুকের ওপর শুইয়ে দুই হাতে সজোরে শিশুটির পিঠের ওপর চড় মারতে লাগলেন। তারপর শিশুটিকে দু হাত দিয়ে উঁচু করে তুলে ধরলেন এবং আবার চড় মারতে লাগলেন, এরপর ‘মা’ শিশুটিকে তার মা-য়ের কাছে ফিরিয়ে দিলেন।

মায়ের ভর মুক্তির সময় হয়ে এল। মহিলা, পুরুষ ঠেলাঠেলি করে এগোতে লাগলেন। নিজের নিজের সমস্যার কথা বলবেন এঁরা। মায়ের ভরমুক্তি হল। চিৎ হওয়ার অবস্থা থেকে উপুর হয়ে শুলেন ‘মা’। কিছুক্ষণ পর উঠে বসলেন তিনি। পুজো করতে লাগলেন। মন্ত্র পড়ে, হাততালি দিয়ে দেবীর আরাধনা চলল।

এক মধ্যবয়সী মহিলার হাত-পা কাঁপে। উঠে বসতে পারেন না। কথা বলতেও কষ্ট হয়। জানা গেল, তাঁর অসুখ দীর্ঘদিনের। তাঁকে ‘মা’ সামনে বসিয়ে প্রথমে মন্ত্র পড়ালেন। তারপর ওঠ বস করতে বললেন। মহিলা ওঠবস করতে পারছিলেন না। তাঁকে জলপড়া খাওয়ানো হল। মহিলা উঠে বসলেন। এক মধ্যবয়স্ক পুরুশের পিঠ ও কোমরের ব্যথা এবং এক মহিলার গ্যাস্ট্রিকের বেদনার একইভাবে উপশম করলেন ‘মা’। পরিচয় হল বিজয়ভূষণ গুহর সঙ্গে। তিনি ন্যাশনাল হেরাল্ডের সঙ্গে যুক্ত। তিন-চার বছর আগে তাঁর স্ত্রী হাঁপানি সেরে যাওয়ার পর থেকে তিনি ‘মা’য়ের একনিষ্ঠ ভক্ত। এখন মা’য়ের কাছে আসেন নিয়মিত। কোনও উদ্দেশ্য নয়, শুধু ‘মা’য়ের টানে আসেন।

মহিলার নাম প্রতিমা চক্রবর্তী। স্বামী রেলে কাজ করেন। ছেলে একটিই। বয়স, বারো তেরো। স্বাস্থ্য মাঝারি, চোখগুলি কোটরে বসা, গভীর। চেহারার গড়ন মজবুত হলেও কোথাও একটা ক্লান্তির ছাপ আছে। মাঝে মাঝে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। কাজ করতে পারেন না। ‘মা’য়ের দয়াতেই তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

যাদবপুর পলিটেকনিকের ঠিক পেছনে শীতলবাড়িতেও ভর হয়। এখানে একটি নেপালী পরিবার থাকে। যাদবপুর পলিটেকনিকের পিওনের কাজ করতেন ভদ্রলোক। সম্প্রতি রিটায়ার করেছেন। তাঁর স্ত্রীর ভর হয় প্রতি শনিবার। ভদ্রমহিলার বয়স চল্লিশের কোটায়, গায়ের রং কালো হলেও চেহারায় বেশ একটি সুশ্রী আছে। মুখের গড়নটি ভারি সুন্দর। ছেলে, নাতি-নাতনী নিয়ে তিরিশ বছরের পরিপূর্ণ সংসার। ৬৫ সালে দেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা। যাদবপুর পলিটেকনিকের কর্মী হিসেবে পলিটেকনিকের পিছনেই থাকার জায়গা পেয়েছিলেন তাঁরা। ১৯৭০ সালে নকশাল আন্দোলনের সময় দিল্লি থেকে আসা ১৬০০ পুলিশ ইউনিভার্সিটির চত্বরেই বাস করতে থাকে। তারা চাঁদা তুলে ‘মা’য়ের জন্য পাকা দালান তৈরি করে দেয়। এখন সেই দালানে প্রতি শনিবার ভক্ত সমাগম ঘটে। যে যার সমস্যা নিয়ে আসে। পুজো শুরু করার কিছুক্ষণ পরই ‘মা’য়ের ভর হয়। তখন সবাই প্রশ্ন করতে শুরু করে এবং ‘মা’ প্রশ্নের উত্তর দেন। সব মিলে যায়। একটি বোবা মেয়েকে সারিয়ে তুলেছেন ‘মা’। মায়ের দেয়া জলপড়ায় উপশম ঘটেছে একটি সুন্দরী নববধূর জটিল  ব্যাধির, একটি শিশুর কঠিন অসুখ।

কলকাতার বাইরে আন্দুলের সরু রাস্তা দিয়ে ঘেরা একটি পুকুরের পিছনে বহুদিন থেকে একটি বাড়িতে পাশাপাশি রয়েছে লক্ষ্মী-নারায়ণ, রাধা-কৃষ্ণ ও কালী। বাংলা ১৩৭১ সালে মূর্তি প্রতিষ্ঠা। তার আগে একটি ছোট্ট বেড়া দেওয়া ঘরে পুজো হত। তখনই ‘মা’-এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল এখানে ওখানে।

মন্দিরে যিনি পুজো করেন, তাঁর বয়স ষাটের কোঠায়। শীর্ণকায়। বিধবা, কিছুদিন হল স্বামী বিয়োগ হয়েছে। ভক্তদের দেওয়া অর্থেই সংসার চলে। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার পুজোয় বসায় পর ‘মা’য়ের ভর হয়। তখন ‘মা’-কে যে প্রশ্ন করা যায়, ‘মা’ তার উত্তর দেন। প্রশ্ন করার জন্য কুড়ি পয়সা দক্ষিণা। পুজোয় বসার কিছুক্ষণ পর মায়ের মাথা দুলতে থাকে। কাঁসর-ঘণ্টার আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের মাথার দোলাও ক্রমশ বাড়তে থাকে। তারপর এক সময় ‘মা’য়ের হাত থেকে ফুল খসে পড়ে, ঘণ্টা স্ফলিত হয়। ‘মা’ আচ্ছন্ন হয়ে যান। ভর হয়। ভক্তরা তখন প্রশ্ন করতে শুরু করেন। ‘মা’ আচ্ছন্ন অবস্থায় উত্তর দিয়ে থাকেন।

এবং উত্তর মিলেও যায়। রোগভোগ সেরে যায়। মানুষগুলির ভিড় তাই বাড়ে।

সাবর্ণী দাশগুপ্ত

ছবিঃ শুভজিৎ পাল

প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ আমার ও আমাদের সমিতির কাছে প্রশ্ন হাজির করেছিলেন, এই বিষয়ে আমাদের মতামত কি? আমরা কি তুড়ি দিয়েই প্রতিবেদকের বক্তব্যকে উড়িয়ে দিতে চাই? আমরা কি ঈশ্বরের ভরে পাওয়া ওইসব পূজারিণীদের মুখোমুখি হবো? আমার বন্ধু আকাশবাণী কলকাতার অধিকর্তা ডঃ মলয় বিকাশ পাহাড়ীও জানতে চেয়েছিলেন, ভরে পাওয়া মানুষগুলো বাস্তবিকই রোগীদের সারাচ্ছেন কি? সারালে কিভাবে সারাচ্ছেন? উত্তর কি সত্যি মেলে? মিললে তার পিছনে যুক্তি কি? এ জাতীয় প্রশ্ন শুধু ডঃ পাহাড়ীকে নয়, বহু মানুষকেই দ্বিধাগ্রস্থ করে তুলেছিল।

যথারীতি উত্তর দিয়েছিলাম। ৩ জুলাই, ৯০ আনন্দবাজারে আমাদের সমিতির একটি চিঠি প্রকাশিত হয়েছিল। চিঠিটি এখানে তুলে দিচ্ছি।

 
পূজারিণীর শরীরে দেবতার ভর?

সাবর্ণী দাশগুপ্তের ‘পূজারিণীর শরীর বেয়ে’ প্রতিবেদনটি (৩০ মে) পড়ে অবাক হয়ে গেছি। লেখাটি পড়ে বিশ্বাস করার সংগত কারণ রয়েছে যে, সাবর্ণী দাশগুপ্ত ‘ভর’ হওয়ায় বিজ্ঞানসম্মত কারণগুলি বিষয়ে অবহিত নন এবং উনি ভরগ্রস্থদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন। অবশ্য তিনি তাঁর লেখার সত্যতা বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকেন তবে ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি এ বিষয়ে সত্যানুসন্ধানে মুক্ত মনে তাঁর সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করছে। সাবর্ণীর হাতে তুলে দেব পাঁচজন রোগী। ভর লাগা পূজারিণীরা রোগীদের রোগ মুক্ত করতে পারলে এবং প্রশ্নকর্তাদের প্রশ্নে সঠিক উত্তর পেলে আমরা সাবর্ণীর কাছে চির কৃতজ্ঞ থাকব এবং আমরা অলৌকিকতা-বিরোধী ও কুসংস্কার বিরোধী কাজকর্ম থেকে বিরত থাকবো।

শারীর বিজ্ঞানের মতানুসারে ‘ভর’ কখনো মানসিক রোগ, কখনো স্রেফ অভিনয়। ভরলাগা মানুষগুলো হিস্টিরিয়া, ম্যানিয়াক ডিপ্রেসিভ, স্কিটসোফ্রিনিয়া – ইত্যাদি  রোগের শিকার মাত্র। এইসব উপসর্গকেই ভুল করা হয় ভূত বা দেবতার ভরের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। সাধারণভাবে যেসব মানুষ শিক্ষার সুযোগ লাভে বঞ্চিত, পরিবেশগতভাবে প্রগতির আলো থেকে বঞ্চিত, আবেগপ্রবণ, যুক্তি দিয়ে বিচার করার ক্ষমতা সীমিত তাঁদের মস্তিষ্ককোষের সহনশীলতাও কম। তাঁরা এক নাগাড়ে একই কথা শুনলে বা ভাবলে অনেক সময় মস্তিষ্কের কার্যকলাপে বিশৃঙ্খলা ঘটে। দৈবশক্তির বা ভূতে বিশ্বাসের ফল অনেক সময় রোগী ভাবতে থাকে, তাঁর শরীরে দেহবতার বা ভূতের আবির্ভাব হয়েছে। ফলে রোগী দেবতার বা ভূতের প্রতিভূ হিসেবে অদ্ভুত সব আচরণ করতে থাকেন। অনেক সময় পারিবারিক জীবনে অসুখী, দায়িত্বভারে জর্জরিত ও মানসিক অবসাদগ্রস্থতা থেকেও ‘ভর’ রোগ হয়। স্কিটসোফ্রিনিয়া রোগীরা হন অতি আবেগপ্রবণ, তা সে শিক্ষিত বা অশিক্ষিত যে শ্রেণীরই হোন না কেন। এই আবেগপ্রবণতা থেকেই রোগীরা অনেক সময় বিশ্বাস করে বসেন তাঁর উপর দেবতা বা ভূত ভর করেছে।

তবে ‘ভর’ নিয়ে যারা ব্যবসা চালায় তারা সাধারণভাবে মানসিক রোগী নয়; প্রতারক মাত্র।

ভর-লাগা মানুষদের জলপড়া, তেলপড়ায় কেউ কেউ রোগমুক্তও হন বটে, কিন্তু যারা রোগমুক্ত হন তাঁদের আরোগ্যের পিছনে ভর-লাগা মানুষের কোনও অলৌকিক ক্ষমতা সামান্যতমও কাজ করে না, কাজ করে ভর- লাগা মানুষদের প্রতি রোগীদের অন্ধবিশ্বাস। রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে বিশ্বাসবোধের গুরুত্ব অপরিসীম। হাড়ে, বুকে বা মাথায় ব্যথা, বুক ধড়ফড়, পেটের গোলমাল, গ্যাসট্রিকের অসুখ, ব্লাডপ্রেসার, কাশি, ব্রংকাইল-অ্যাজমা, ক্লান্তিউ, অবসাদ ইত্যাদি রোগের ক্ষেত্রে রোগীর বিশ্বাসবোধকে কাজে লাগিয়ে ওষিধ-মূল্যহীন ক্যাপসুল, ইঞ্জেকশন বা ট্যাবলেট প্রয়োগ করে অনেক ক্ষেত্রেই ভাল ফল পাওয়া যায়। একে বলে ‘প্ল্যাসিবো’ চিকিৎসা পদ্ধতি।

‘যা বলা যায় তাই মেলে’ -এক্ষেত্রে কৃতিত্ব কিন্তু কৃতিত্ব কিন্তু ভর-লাগা মানুষটির নয়; তাঁর খবর সংগ্রহকারী এজেন্টদের।

প্রবীর ঘোষ। সাধারণ সম্পাদক,

ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি,

কলিকাতা- ৭৪।

না, সাবর্ণী দাশগুপ্ত বা ভরে পাওয়া পূজারিণীদের কেউ আজ পর্যন্ত আমার বা আমাদের সমিতির সঙ্গে সহযোগিতা বা সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি। কারণটি শ্রদ্ধেয় পাঠকরা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন।