লেখকদের প্রকাশিত বই পত্রে উৎসর্গ পাতা বলে একটা পাতা থাকে। সেখানে লেখকতা তাঁদের প্রিয়জনদের নামে বইটা উৎসর্গ করেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি উৎসর্গ করার মতো কোন বন্ধু তাঁর লেখক জীবনে পান নি।

আমি দুইশ’র মতো বই লিখে ফেলেছি। প্রতিটি বইয়ের উৎসর্গ পাতা আছে। এমনও হয়েছে এমন মানুষকে দু’বার-তিন বার বই উৎসর্গ করেছি।

মানুষ ছাড়া পশুপাখিকেও বই উৎসর্গ করার ঘটনা ঘটিয়েছি। শহীদুল্লাহ হলে যখন থাকি, তখন একটা বিড়ালের সঙ্গে আমার বেশ ঘনিষ্ঠতা হয়। বিড়ালটা শহীদুল্লাহ হলের একজন হাউস টিউটর সাহেবের কন্যার। তার নাম এখন মনে করতে পারছি না। বিড়ালটার উচিত ছিল সে বাড়িতেই থাকা। কিন্তু কোন এক বিচিত্র কারণে আমি যখন লেখার টেবিলে লেখালেখি করি, সে এসে লাফ দিয়ে টেবিলে ওঠে এবং এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমাদের মধ্যে কিছু কথাবার্তা হয়। যেমন-

আমিঃ খবর কি রে?

বিড়ালঃ মিয়াও (ভালো)।

আমিঃ খাওয়াদাওয়া হয়েছে?

বিড়ালঃ মিয়াও মিয়াও (একটু আগে খেয়েছি)।

আমিঃ আমি চা খাচ্ছি, তুই খাবি? দেবো পিরিচে ঢেলে?

বিড়ালঃ মি-য়া-ও (ধন্যবাদ দাও)।

এই বিড়ালটাকে আমি যে বই উৎসর্গ করি, সেই বইটির নাম ‘নিষাদ’।

বিড়াল ছাড়াও দু’তিনটা বই ভূত-প্রেতকে উৎসর্গ করেছি। ওরা সেই সব পড়েছে কি না জানি না।

তাহলে ঘটনাটা এই দাঁড়াল যে, বই উৎসর্গ করার ব্যাপারে আমার কোন বাছবিচার নেই। ঘটনা কিন্তু সত্যি না। বাছবিচার অবশ্যই আছে। আমি ক্ষমতার ধারেকাছে বাস করেন এমন কাউকে বই উৎসর্গ করি না। সারা জীবনই ক্ষমতার কাছ থেকে দূরে থাকতে চেয়েছি।

ঢাকা ক্লাবের প্রেসিডেন্ট কি ক্ষমতাধর কেউ?

অবশ্যই। বাংলাদেশের ক্ষমতাবানদের আসর হল ঢাকা ক্লাব। এই আসরে আমার মতো অভাজনের থাকার কথা না। সাত থেকে আট বছর আগে ঢাকা ক্লাব থেকে আমাকে জানানো হল, তারা আমাকে সম্মানিত সদস্য করেছেন।

ঢাকা ক্লাবের যে প্রেসিডেন্ট এই কাজটি করেছেন, তাঁর সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয় নি। আমি ক্লাব টাইপ  মানুষ না। ক্লাবে যাই না বললেই চলে।

ক্লাবের বর্তমান প্রেসিডেন্টকে আমি চিনি। আমার বই উৎসর্গ নীতিমালায় তাঁকে বই উৎসর্গ করা যায় না। তিনি ক্ষমতাবানদের একজন। তারপরেও কেন বই উৎসর্গ করা হল? কারণ তাঁর পক্ষীপ্রেম। আমি তাঁকে তাঁর নাম ধরে ডাকি না। আমি ডাকি পক্ষীবন্ধু নামে। তাঁকে উৎসর্গ করা বইটার নাম, ‘উঠোন পেরিয়ে দু’পা’। উৎসর্গ পাতায় লেখা-

‘পক্ষীবন্ধু’ সাদাত সেলিম,

আপনি পাখিদের ভালোবাসেন।

পাখিরা কি আপনাকে ভালোবাসে?

তিনি আমাকে জানিয়েছেন যে, পাখিরাও তাঁকে ভালোবাসে। আমি তাঁর কথা বিশ্বাস করেছি।

ঢাকা ক্লাবে যতবারই যাই, তিনি কিছু সময় আমার সঙ্গে কাটান। দু’জনের মধ্যে কথা হয় পাখি বিষয়ে। এই বিষয়ে তাঁর জ্ঞান দেখে মুগ্ধ হই। একদিন তাঁকে বললাম, আচ্ছা ভাই মানুষ যেমন পাগল হয়ে যায়, পক্ষী সমাজে কি এমন ঘটনা ঘটে? একটা পাখি হঠাৎ পাগল হয়ে গেল? আমাদের নুহাশ পল্লীতে এরকম একটা পাগল পাখি আছে।

তিনি বললেন, কি পাখি?

একটা কোকিল।

সে কি পাগলামি করে?

আমি বললাম, তার বসন্তকালে ডাকার কথা। সে সারা বছরই ডাকে।

সেলিম সাহেব বললেন, এরকম হওয়ার তো কথা না। কোকিল হিমালয়ের পাখি। গরমের সময় সে হিমালয়ে চলে যাবে।

তিনি কোকিল সম্পর্কে বিস্তারিত বলা শুরু করলেন। দু’জন মুগ্ধ শ্রোতা- একজন আমি, অন্যজন আমার স্ত্রী শাওন।

সাইকোলজিস্টরা মানুষের মানসিকতা বুঝার জন্যে একটা পরীক্ষা করেন। এই পরীক্ষা হল, তারা দ্রুত কিছু শব্দ উচ্চারন করেন। যার উপর পরীক্ষা করা হচ্ছে, তাকে শব্দ শুনে প্রথম কি মাথায় আসছে তা বলতে হয়। উদারহণ-

সাইকোলজিস্টঃ রাত্রি।

সাবজেক্টঃ অন্ধকার।

সাইকোলজিস্টঃ গোলাপ।

সাবজেক্টঃ সুগন্ধ।

সাইকোলজিস্টঃ যুবতী।

সাবজেক্টঃ রূপবতী।

এরকম একটা পরীক্ষায় আমাকে যদি সাইকোলজিস্ট বলেন, ঢাকা ক্লাব। এর উত্তরে আমি বলব, পক্ষীবন্ধু সাদাত সেলিম। ঢাকা ক্লাব উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথায় পক্ষীবন্ধুর ইমেজ আছে।

অন্যদিন ঢাকা ক্লাব-কে নিয়ে একটা বিশেষ সংখ্যা করছে। আমি তাঁদের পোষা লেখক। আমাকে তো লিখতেই হবে। পক্ষীবন্ধুর উপরে লিখতে পেরে ভালো লাগছে। তাঁর প্রিয় ঢাকা ক্লাব এবং অতিপ্রিয় পক্ষীরা ভালো থাকুক। এই শুভ কামনা।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x