আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরী, লামচরি

২৫ জানুয়ারী ১৯৮১

মাননীয় বাকেরগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাহেব, উপস্থিত সুধীবৃন্দ ও আমার পল্লীবাসী আত্মীয় বন্ধুগণ! আজ আমার জীবন ধন্য হল, তা দু’টি কারণে। প্রথমটি হল, জেলা প্রশাসক সাহেবের হাতে আমার  বহু আকাঙ্ক্ষিত ক্ষুদ্র লাইব্রেরীটির দারোদঘাটন দেখতে পেরে; দ্বিতীয়টি হল আমার চিরপ্রিয় পাঠশালার প্রাণ-প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের সুকোমল হস্তে সর্বপ্রথমবার বৃত্তিপ্রদান করতে পেরে।

আজ আমার ৮০ বৎসর দীর্ঘ জীবনের মধ্যে পরম ও চরম আনন্দের একটি দিন। ‘পরম’ ও ‘চরম’ এই জন্য যে, এ লামচরি গ্রামের মতো একটি গণ্ডগ্রামে ভাইটগাছ, গুড়িকচু ও কচুরীপানায় আচ্ছাদিত জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে অবস্থিত আমার এ নগণ্য প্রতিষ্ঠানটির শুভ উদ্বোধন উপলক্ষে যে সমস্ত মণীষীবৃন্দের চরণদর্শন লাভের সৌভাগ্য আজ আমার হল, এ জীবনে তা আর কখনো হয়নি, হয়তো ভবিষ্যতে আর হবেও না কোনদিন। কেননা আমি এখন খরস্রোতা নদীতীরের ফাটলধরা মাটির উপর দাঁড়ানো বৃক্ষের মতোই দাঁড়িয়ে আছি। যে কোন মুহূর্তে ডুবে যেতে পারি অতল সলিলে।

হয়তো কেউ জানতে চাইতে পারেন যে, বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলে ‘অভাব’-এর তো অভাব নেই। তবে কেন আমার মনে লাইব্রেরী করার প্রবণতা জাগলো? এর জবাবে আমি আপনাদের কাছে এই জানাতে চাই যে, ওটা আমার আজীবনকালের ভিক্ষাবৃত্তি ও চুরিকর্মের পাপের প্রায়শ্চিত্ত। সে কি রকম সংক্ষেপে তা বলছি।

জন্ম আমার ৩রা পৌষ ১৩০৭ সালে। আমার শৈশবকালে এ গ্রামে কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। মাত্র চার বছর বয়সে পিতৃহারা ও আট বছর বয়সে বিত্তনিলামে সর্বহারা হয়ে বিধবা মায়ের আঁচল ধরে দশ দুয়ারের সাহায্যের বেছে থাকতে হয়েছে আমাকে আমার শৈশবে। স্থানীয় মুন্সী মরহুম আ. করিম সাহেব একখানি মক্তব খোলেন তাঁর বাড়িতে ১৩২০ সালে। আমি অবৈতনিকভাবে তাঁর কাছে শিক্ষা করলাম স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ ও বানান-ফলা পর্যন্ত। কিন্তু ছাত্র বেতন অনাদায়হেতু তিনি মক্তবটি বন্ধ করে দিলেন ১৩২১ সালে। আর এখানেই হল আমার বিদ্যাশিক্ষার সমাপ্তি বা সমাধি।

শৈশবে লেখাপড়া শেখার প্রবল আগ্রহ আমার ছিল, কিন্তু কোন উপায় ছিল না। আমি আমার উক্ত সামান্য বিদ্যার জোরেই চুরি করে পরেছি জয়গুন-সোনাবান, জঙ্গনামা, মোক্তল হোসেন ইত্যাদি পুঁথি এবং ভিক্ষা করে পড়েছি তৎকালে বরিশালে পড়ুয়া ছাত্রদের পুরানো পাঠ্য বইগুলো। সে সব ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন প্রিয় ফজলুর রহমান (গ্র্যাজুয়েট)। তিনি অবসরপ্রাপ্ত এল.এ.ও.। বর্তমানে এখানেই আছেন।

বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরী থেকে বই চুরি করে বাড়িতে এনে পড়তে শুরু করি আমি বাং ১৩৪৪ সাল থেকে। মিউনিসিপ্যাল এলাকার বাইরের কোন পাঠককে তার বাড়িতে বই দেবার নিয়ম নেই বলে আমার বাড়িতে এনে বই পড়তে হয়েছে তৎকালীন বরিশালের টুপির ব্যবসায়ী জনাব ওয়াজেদ আলী তালুদারের বেনামীতে। আমি তাঁর কাছে ঋণী। বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরীর বই আমি সময় সময় এখনো বাড়িতে এনে পড়ি, তা-ও বেনামীতে আনতে হয়। এ সমস্ত আমার পক্ষে চুরিই বটে। আমার এ চুরিকার্যে যথাসম্ভব সাহায্য দান করেছেন মাননীয় লাইব্রেরীয়ান জনাব এয়াকুব আলী (মোক্তার) সাহেব। আমি তাঁর কাছেও ঋণী। এরমধ্যে বরিশাল শঙ্কর লাইব্রেরী থেকে বইপুস্তকও এনে পড়েছি দুই-তিন বৎসর, তা-ও অনুরূপভাবেই।

বাংলা ১৩৫৪-৫৫ সাল থেকে কিছু কিছু বই চুরি করে এনে পড়তে থাকি বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ লাইব্রেরী থেকে। সে চুরি কাজে আমাকে সাহায্য দান করেছেন ও করেন মাননীয় অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির সাহেব। তিনি শুধু আমার চুরি কাজের সহযোগীই নন, আমার জীবনের সাধনার যাবতীয় ফলাফলের তিনি সম-অংশীদার। হয়তোবা তারচেয়েও বেশি। তিনি আমার জীবনের সাথে এতোই ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত যে, কারো সাহায্য না নিয়ে তিনি আমার জীবনী লিখতে পারেন। মাননীয় অধ্যাপক শামসুল হক সাহেব এবং মাননীয় অধ্যাপক শামসুল ইসলাম সাহেবও সাহায্য করেছেন আমাকে কলেজ লাইব্রেরী থেকে বই চুরির কাজে। ১৩৫৭-৬২ সাল পর্যন্ত চুরি করে এনে কিছু কিছু বই পড়েছি বরিশালের ব্যপ্টিস্ট মিশন লাইব্রেরী থেকে এবং ভিক্ষাও পেয়েছি কিছু পুস্তক-পুস্তিকা সেখান থেকে। আর এ কাজে আমাকে সাহায্যদান করেছেন তৎকালীন লাইব্রেরীয়ান মি. মরিস সাহেব। তিনি ছিলেন স্কটল্যান্ডের অধিবাসী, তবে বাংলা ভাষা জানতেন ভালো। আমি তাঁর কাছেও কৃতজ্ঞ।

যে সমস্ত মনীষীগণ আমার জন্য চুরি করেছেন বা আমার চুরি কাজের সাহায্য করেছেন, আমার মনে হয় যে, আইনের কাছে তাঁরা অন্যায় করে থাকলেও সমাজের কাছে তাঁরা মহৎ কাজই করেছেন। কেননা তাঁরা একটি ‘জানোয়ার’কে মানুষ বানিয়েছেন। আর সেই মানুষটির আহ্বানে সাড়া দিয়ে আজ আপনারা এই জংলাভূমে পদধূলি দিচ্ছেন।

প্রবাদ আছে – ‘চোরের বাড়িতে দালান নেই’ এবং ‘ভিক্ষার চালে ভরে না গোলা’। তাই ভেবে আমি আমার আজীবনকালের ভিক্ষা ও চুরি করা সম্পদটুকু মজুদ করে রাখা নিষ্ফল মনে করে জনগণের কল্যাণ কামনায় তা সাধারণ্যে দান করে দেবার প্রয়াসী হয়ে তা দান করলাম – ‘সত্যের সন্ধান’ ও ‘সৃষ্টি রহস্য’ নামক দুখানা ক্ষুদ্র পুস্তকের মাধ্যমে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে,  রাজধানীর বুদ্ধিজীবী মহলের অনেকেই বই দু’খানা আমার দান বলে স্বীকার করতে চাননি।  তাঁরা অনেকেই বলেছেন যে, পল্লীবাসী কৃষকরা নিরক্ষর হলেও সাধারণত ভালো মানুষ এবং বেশিরভাগই ঈমান-ধনে ধনী। তাদের মধ্যে এমন আনাড়ি লোক ও এ সমস্ত দান সামগ্রী থাকা অসম্ভব। এই বই নিশ্চয়ই কোনো বুদ্ধিজীবী লোকের লেখা। হয়তো তিনি ধুরন্ধরী করে নাম দিয়েছেন একজন কৃষকের। বই দি’খানা লেখা আমার পক্ষে সম্ভব কি-না, তা যাচাই করবার জন্য প্রাক্তন ডি. পি. আই. জনাব ফেরদাউস খান তো তাঁর ধানমণ্ডির বাসায় আমাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে রীতিমতো পরীক্ষাই নিলেন ৩-১-৭৬ তারিখে। সে পরীক্ষাকালে সেখানে উপস্থিত ছিলেন জনাব আ.ন.ম এনামুল হক এবং চিত্রশিল্পী কাজী আবুল কাসেম সাহেব। সেদিন কাসেম সাহেবের হাতের পেন্সিলে আঁকা আমার একটি ছবি এখানেই আমার লাইব্রেরীতে আছে।

কিন্তু বুদ্ধিজীবী মহলের সে কথার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাজধানীর বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ প্রধান ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ও তাঁর প্রণীত ‘আরণ্যক দৃশ্যাবলী’ নামক বইখানিতে। তিনি অন্যান্যদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, কল্পিত নাম নয়, ছদ্মনাম নয় কারো, আরজ আলী মাতুব্বরের নিবাস বরিশাল। তাঁর সে বইখানা এখানেই (আমার লাইব্রেরীতে) আছে।

ভিক্ষাবৃত্তি দ্বারা এবং চুরি করে আমি যে পাপ অর্জন করেছি, তারই প্রায়শ্চিত্ত অথবা যে অপরাধ করেছি, তারই জরিমানা দিচ্ছি আমি এখন প্রায় ৬০ হাজার টাকা। যার দ্বারা স্থাপিত হচ্ছে এই ক্ষুদ্র পাঠাগারটি, মজুত হচ্ছে জনতা ব্যাংকে ১০ হাজার টাকা এবং করা হচ্ছে ২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক বৃত্তিদানের ব্যবস্থা। এ সমস্ত অর্থ আমার দান নয়, এগুলো আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত বা অপরাধের জরিমানা। কেননা, ঐ সমস্ত পাপ বা অপকর্ম না করলে হয়ত আমি এই সমস্ত জরিমানা দিতাম না কখনো।

দারিদ্র নিবন্ধন কোন স্কুল-কলেজে গিয়ে পয়সা দিয়ে বিদ্যা কিনতে পারিনি আমি দেশের অন্যসব ছাত্র-ছাত্রীদের মতো। তাই কোন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা আমার শিক্ষাপীঠ নয়। আমার শিক্ষাপীঠ হল ‘লাইব্রেরী’। আশৈশব আমি লাইব্রেরীকে ভালোবেসে এসেছি এবং এখনো ভালোবাসি। লাইব্রেরীই আমার তীর্থস্থান। আমার মতে- মন্দির, মসজিদ, গির্জা থেকে লাইব্রেরী বহুগুণ শ্রেষ্ঠ।

তাই আমি যখন কোনরূপ একটি জনকল্যাণমূলক কাজ করবার জন্য মনস্থির করেছি, তখন আমার সেই লাইব্রেরীপ্রীতিই জাগিয়ে তুলেছে আমার মনে লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার প্রবণতা। আর তারই ফল আমার এ ক্ষুদ্র লাইব্রেরীটি। যেহেতু আমি লাইব্রেরীর কাছে ঋণী। আমি লাইব্রেরীর ভক্ত।

লাইব্রেরী ছাড়া আমার আরো একটি তীর্থস্থান ছিল। তা হল প্রায় ৬৭ বছর পুরানো একখানা দোচালা খড়ের ঘর। অর্থাৎ মরহুম মুন্সী আব্দুল করিম সাহেবের ক্ষুদ্র পাঠশালাটি। সেটা ছিল আমার শৈশবকালের তীর্থস্থান। সেখানে গিয়ে লিখতে হয়েছে স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণ তালপাতায় এবং বানান-ফলা কলাপাতায়, লেমের কালি ও টনির কলম দিয়ে। সে পাঠশালায় আমার সমপাঠী বা সহপাঠী যারা ছিলো, তারা সবাই কালে ও অকালে এ জগত ছেড়ে চলে গেছে। জীবিত আছে মাত্র দুজন আরজ আলী।

সেকালের সেই পরলোকগত সহপাঠীদের কচিমনের সাথে আমার তখনকার কচিমনের যে ভালোবাসা জন্মেছিলো, তা ভুলতে পারিনি আমি আজো। তাই সময় সময় আমার এ বৃদ্ধ মনটি যেন কচি হয়ে যায় এবং স্মৃতিপটে আঁকা সেইসব বাল্যবন্ধুদের সাথে মেলামেশা ও খেলা করে। কিন্তু সে খেলায় মন-মানস তৃপ্ত হয় না। তাই আমার শৈশবের সেই কচি মনটি বন্ধুত্ত পাতাতে চায় আধুনিক কালের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কচিমনা শিশুদের সাথে। কিন্তু আমি জানি যে, অধুনা কোন শিশু ছাত্রই আমার মতো চুল-দাঁড়ি পাকা, দন্তহীন বৃদ্ধের সাথে বন্ধুত্ব পাতাবে না, আমাকে ভালোবাসবে না। মনের সরলতায় আমি যে আজো একজন শিশু তা কেউ বুঝবে না, বোঝবার কথাও নয়। তাই আমি স্থীর করেছি যে, ছাত্ররা আমাকে ভালোবাসুক আর না-ই বাসুক, আমি তাদের ভালোবাসবো। শৈশবকাল থেকেই আমার মনে বাসা বেঁধেছে পাঠশালাপ্রীতি ও ছাত্রপ্রীতি। আমি কামনা করি যে, আমার মরআত্মা যেন অনন্তকাল ধরে পাঠশালার শিশু ছাত্রদের সাথেই খেলা করে। আর তাই হবে আমার স্বর্গ-সুখ। এছাড়া অন্য কোনরূপ স্বর্গ আমার কাম্য নয়। আর আমার সেই পাঠশালা ও ছাত্রপ্রীতির নিদর্শন হল’ ছাত্রদের বৃত্তিদান’। অর্থাৎ আরজ ফান্ড থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অনন্তকাল স্থায়ী প্রতিযোগীতামূলক বার্ষিক বৃত্তি প্রদান।

অর্থ আমার নেই। কেননা জীবনে অর্থের জন্য আমি সাধনা করিনি বেঁচে থাকার অতিরিক্ত। আমার কর্মজীবনের শেষ অধ্যায়ে ১৩৬৭ সালে আমার স্থাবরাস্থাবর যাবতীয় সম্পত্তি আমার ওয়ারিশদের দান ও বন্টন করে দিয়ে রিক্তহস্তে সংসারত্যাগী হয়ে সে সময় থেকে আমি আমার পুত্রগণের পোষ্য হয়ে জীবনযাপন করছি। তবে ছেলেদের বলে দিয়েছি যে, অতঃপর এ বৃদ্ধ বয়সে আমার দেহটি খাটিয়ে যদি কিছু অর্থ উপার্জন করতে পারি, তবে তার প্রতি তোমাদের কারো কোন দাবী থাকবে না, আমি তা আমার ইচ্ছামতো কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করবো। আমার ওয়ারিশগণ তাতে সম্মত ছিলো এবং এখনো আছে। বিশেষত আমার প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণে তারা যথাসম্ভব সহযোগিতাও করছে। তবে তারা এতে কোনরূপ আর্থিক সাহায্য দানে অক্ষম।

সংসারত্যাগী হয়েও নিষ্কর্মা হয়ে বসে থাকিনি আমি, দিনমজুরী করেছি মাঠে মাঠে আমিন-রূপে। সেই মজুরীলব্ধ অর্থ দ্বারা কিছু ভূ-সম্পত্তি খরিদ করেছিলাম আমি ইতিপূর্বেই। গত বছর তা সমস্তই বিক্রয় করেছি। ক্রেতারাও প্রায় সবাই এখানে আছেন। আমার সেই সম্পত্তি বিক্রয়লব্ধ অর্থ ও অন্যান্য বাবদ আমার তহবিল ছিল মাত্র ৪৫ হাজার টাকা এবং আমার পরিকল্পিত কাজের ব্যয় বরাদ্দ ছিলো ৬০ হাজার টাকা। আমি জানি যে, এই ঘাটতির ১৫ হাজার টাকা পূরণ করতে হবে আমাকে দিনমজুরী করে। মাননীয় জেলা প্রশাসক সাহেবকে প্রদত্ত পরিকল্পনায় এ ঘাটতির বা তা পূরণের উপায় সম্বন্ধে কোন উল্লেখ আমি করিনি। কেননা আমার দৃঢ় ধারণা এই যে, যদি আমি মজুরীগিরিতে অক্ষম হই, তাহলে ভিক্ষা করবো। ভিক্ষায় আমার লজ্জা নেই। লোকে আমাকে ‘ভিখারী’ বলুক, তা আমি চাই। আর সেই কারনেই আমি আমার একখানি জীবনী লিখে নাম দিয়েছি তার ‘ভিখারীর আত্মকাহিনী’। ভিক্ষা করা সম্প্রতি আমি শুরুও করেছি। এবারে ঢাকায় গিয়ে কতিপয় বিদ্যোৎসাহী বন্ধুর কাছে বই ভিক্ষা পেয়েছি ১০৮ খানা, যার মোট মূল্য ৯৮৩.৭৫ পয়সা। সে বইগুলো আমার লাইব্রেরীতে আছে।

টাকা আমার নেই। আর জীবিকা নির্বাহের জন্য আমার টাকার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু আমার প্রতিষ্ঠানটির যাবতীয় কাজ সমাধা করতে টাকার অভাব আছে, তা তো আগেই বলেছি। অভাব আছে কিছু বইপত্রের ও আসবাবপত্রের। কিন্তু তা পূরণ করা আমার ক্ষমতার বাইরে নয়। সুধী মহোদয়গণ! আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন যে, এখন আমার জন্য কোন ভবিষ্যত নেই। ‘ভবিষ্যত’ আমার হাতে থাকলে কোনো অভাবকেই আমি ‘অভাব’ বলে মনে করতাম না। তাই আপনাদের কাছে আমার অভাবের একটি তালিকা পেশ করছি –

(১) গরু-ছাগলের কবল থেকে ফুল-ফলের গাছ রক্ষা করার উদ্দেশ্যে লাইব্রেরীর সরহদ্দের সীমানা বরাবর একটি দেয়াল নির্মাণ করা।

(২) আগন্তুকদের পানীয় জলের জন্য একটি নলকূপ বসানো।

(৩) বয়স্কদের শিক্ষার জন্য নৈশবিদ্যালয়রূপে লাইব্রেরী সংলগ্ন একটি বারান্দা নির্মাণ করা।

(৪) ‘দানপত্র’ রেজিষ্ট্রীকরণের ব্যয় নির্বাহ  করা (এটাই আমার সর্বপ্রধান সমস্যা এবং আশু প্রয়োজন)

একবার আমি আমার ৬০ বছর বয়সের সময় ঘোষণা করেছিলাম যে, অতঃপর আমি যা কিছু উপার্জন করবো, তা সমস্তই দেশের জনকল্যাণে ব্যয় করবো। আপনারা দেখেছেন যে, তা আমি করেছি। আজ আমার ৮০ বৎসর বয়সে আবার ঘোষণা করছি যে, অতঃপর আমি যদি কোন কাজের মজুরী পাই, কিংবা পুরষ্কার বা উপহারপ্রাপ্ত হই, বা মহামান্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনরূপ সাহায্যপ্রাপ্ত হই তবে তা সমস্তই আমার এই ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের বার্ষিক বৃত্তিদানে ব্যয় করবো। আর এজন্য উপস্থিত সুধীবৃন্দের, বিশেষ করে মাননীয় জেলা প্রশাসক সাহেবের শুভদৃষ্টি প্রার্থনা করছি।

শ্রদ্ধেয় অতিথিবৃন্দ, আপনাদের আর আমি অধিক কষ্ট দিতে চাই না। এখন আমি মৃত্যুপথের যাত্রী। অনেকের সাথেই হয়তো এই আমার শেষ দেখা। আপনাদের মতো যে সমস্ত সুধীজনের সাথে সৌভাগ্যক্রমে আমার পরিচয়লাভের সুযোগ ঘটেছে, তাঁরা সবাই হচ্ছেন বিদ্যায়, জ্ঞানে, গুণে, মানে, পরিবেশ ও আভিজাত্যে আমার সাথে এতোই অসমান যে, তা পরিমাপ করা যায় না। আর আমি হলাম একজন অশিক্ষিত, পল্লীবাসী কৃষক। তাই আমি অনেক সময় আপনাদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও ব্যবহারে সৌজন্য রক্ষা করে চলতে পারিনি। হয়তো আমার ত্রুটি হয়েছে, হয়েছে বেয়াদবী। কিন্তু তা আমার অহংকার নয়; তা হচ্ছে আমার স্বকীয় অজ্ঞতা, মূর্খতা বা বার্দ্ধক্য হেতু জ্ঞানের খর্বতা। সেজন্য আমি আজ আপনাদের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাচ্ছি।

আমার পল্লীবাসী ভাই ও বোনেরা, যারা এখানে আছেন বা না আছেন, সবাইকে আমি ধন্যবাদ জানাই এইজন্য যে, আমি আপনাদের গ্রাম্য সমাজের একজন আনাড়ি মানুষ। কেননা প্রচলিত সমাজবিধির বিরুদ্ধে আমি অনেক কাজ করে যাচ্ছি। আর সেজন্য আপনারা আমাকে সমাজচ্যুত করে পারতেন, আমাকে পারতেন একঘরে করতে, বর্জন করতে। কিন্তু তা আপনারা করেননি। বরং আমাকে সাথে নিয়েই কাজ করেছেন সকলে সব সময়, মর্যাদা দান করেছেন। কোনো কোনো কারণে আমি আপনাদের অবহেলার পাত্র হলেও অবহেলা করেননি আমাকে কেউ কোনদিন। তাই আমি আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জীবনের শেষ প্রহরে বিদায় নিচ্ছি।

পরিশেষে – হে আমার মহান অতিথিবৃন্দ! সময়, শক্তি, অর্থ নষ্ট করে এবং শ্রম স্বীকার করে আপনারা আমার এ ক্ষুদ্র লাইব্রেরীটির সামান্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগদান করে আমার অনুষ্ঠানটি সাফল্যমণ্ডিত করেছেন, আমাকে করেছেন গৌরবান্বিত। বিশেষত মাননীয় জেলা প্রশাসক সাহেব উদ্বোধনপর্বে পৌরহিত্য করায় অনুষ্ঠানটি হচ্ছে গৌরবোজ্জ্বল এবং তাঁর পদস্পর্শে আমার লাইব্রেরীটি হয়েছে ধন্য এবং ধন্য হচ্ছে লামচরি গ্রামখানি। আমি আমার নিজের ও লামচরিবাসীদের পক্ষ থেকে আপনাদের সকৃতজ্ঞ মোবারকবাদ জানাচ্ছি।

ধন্যবাদ – শুভ হোক।

মাননীয় জেলা প্রশাসক সাহেব তাঁর ভাষণে লাইব্রেরীর উন্নয়নকল্পে ১০০ খানা মূল্যবান পুস্তক, একটি গভীর নলকূপ ও আমার দানপত্র রেজিষ্ট্রি সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যয়ের অর্থ দান করার কথা ঘোষণা করেন।

অনুষ্ঠানের শেষপর্বে মাননীয় জেলা প্রশাসক সাহেব আমার পরিকল্পনা মোতাবেক উত্তর লামচরি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দক্ষিন লামচরি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৯৭৯ সালের বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী ছাত্র-ছাত্রীদের ‘আরজ ফান্ড’ থেকে মং ২০০.০০ টাকা বৃত্তি প্রদান করেন। এ সময়ে উক্ত বিদ্যালয়ের ১৯৮০ সালের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলেও তার ফলাফল প্রকাশিত না হওয়ায় উক্ত সালের বৃত্তিদান স্থগিত থাকে।

এ অনুষ্ঠানে সমাগত অতিথি জনাব কাইয়ুম চৌধুরী (সাংবাদিক)- এর লিখিত সচিত্র একটি খবর প্রকাশিত হয় বিগত ৩০-১১-৮৭ (বাং) তারিখে ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায়। খবরটি নিম্নে উদ্ধৃত করা হল।

ইত্তেফাকের খবর

৩০-১১-৮৭

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x