মনসা, শীতলা, কালী, তারা, দুর্গা, চড়ক পুজোর সময় শিব এবং কীর্তনের আসরে রাধা বা গৌরাঙ্গের ভর, এমনি আরও কত পরিচিত, অল্পপরিচিত, অপরিচিত ঠাকুর-দেবতারা যে মানুষের ওপর ভর করে তার ইয়ত্তা নেই। ঠাকুরে ভর হওয়া মানুষগুলোর বেশিমাত্রায় খোঁজ মিলবে মফস্বলে গ্রামে-গঞ্জে। শহর কলকাতাতেও অবশ্য ভর হওয়া মানুষের সাক্ষাৎ মেলে। ভবিষ্যৎ জানতে, অসময় থেকে উত্তরণের জন্য দৈব ওষুধ পেতে শিক্ষিত, অশিক্ষিত , ধনী- দরিদ্র নির্বিশেষে বহু মানুষই এইসব ভর হওয়া মানুষগুলোর দ্বারস্থ হন। অনেক  ক্ষেত্রে ঠাকুরে ভর হওয়া মানুষগুলো এমন সব অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য আচরণ করেন যে সাধারণ বুদ্ধিতে অনেকে এতে অলৌকিকের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন। বিশ্বাস করেন মানুষটির শরীর ঈশ্বর দখল করাতেই এমনটি ঘটেছে।

কৈশোরের একটি ঘটনা। তখন দমদম পার্কে থাকি। আমার এক বন্ধুর বাড়িতে মাঝে-মধ্যে নাম গানের আসর বসত। শুনেছিলাম নাম-গান শুনতে শুনতে বন্ধুর মায়ের ওপর রাধার ভর হত। একবার দেখতে গেলাম। বন্ধুর মা নাম সঙ্কীর্তন করতে করতে এক সময় হঠাৎ প্রচণ্ডভাবে মাথা দোলাতে লাগলেন। মনে হতে লাগল মাথাটাই বুঝি বা গলা থেকে ছিঁড়ে বেড়িয়ে আসবে। উন্মত্তের মত আচরণ করতে লাগলেন। ভক্তরা তাঁকে ধরাধরি করে এক জায়গায় বসালেন। ভক্তরা অনেকেই এই সময় বন্ধুর মাকে শুয়ে পড়ে প্রণাম জানাচ্ছিলেন। সেদিন শারীর-বিদ্যা বিষয়ে জ্ঞানের অভাবে বন্ধুর মায়ের এমন অদ্ভুত ব্যবহারের কারণ আমার অজানা ছিল, তাই বিস্মিত হয়েছিলাম। আজ কিন্তু শারীর-বিদ্যার কল্যাণে জানতে পেরেছি সে-দিন আমার বন্ধুর মা নাম-সঙ্কীর্তন করতে করতে ভক্তিরসে, ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে যা যা করেছিলেন স সব ছিল হিস্টিরিয়া রোগেরই অভিব্যক্তি, অথবা নিজেকে অন্যদের চেয়ে বিশিষ্ট, শ্রদ্ধেয় বলে প্রচার করার মানসিকতায় তিনি ইচ্ছে করেই পুরো ব্যাপারটা অভিনয় করছিলেন।

প্রাচীন যুগ থেকেই হিস্টিরিয়া রোগকে মানুষ অপার্থিব বলেই মনে করতেন। রোগের উপসর্গকে মনে করা হত ভূত বা ঈশ্বরের ভরের বহিঃপ্রকাশ। এ যুগেও সংস্কারাচ্ছন্ন মানুষই সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে এখনও অনেক ক্ষেত্রেই হিস্টিরিয়া রোগী পূজিত হয় ঈশ্বরের প্রতিভূ হিসেবে। সাধারণভাবে অশিক্ষিত, অল্প শিক্ষিত বা প্রগতির আলো থেকে বঞ্চিত সমাজের মানুষদের মধ্যেই এই ধরনের হিস্টিরিয়া রোগীর সংখ্যা বেশি। সাধারণভাবে এই শ্রেণীর মানুষদের মস্তিষ্ককোষের স্থিতিস্থাপকতা বা সহনশীলতা কম। যুক্তি দিয়ে বিচার করে গ্রহণ করার ক্ষমতা অতি সীমিত। বহুজনের বিশ্বাসকে অন্ধভাবে মেনে নিতে অভ্যস্ত। মস্তিষ্ককোষের সহনশীলতা যাদের কম তারা এক নাগাড়ে একই ধরনের কথা শুনলে বা ভাবলে অনেক সময় মস্তিষ্কের কার্যকলাপে বিশৃঙ্খলা ঘটে। একান্ত ঈশ্বরে বিশ্বাস বা ভূতে বিশ্বাসের ফলে রোগী ভাবতে থাকে তার শরীরে ঈশ্বরের বা ভূতের আবির্ভাব হয়েছে, ফলে রোগী ঈশ্বর বা ভূতের প্রতিভূ হিসেবে অদ্ভুত সব আচরণ করতে থাকে।

‘ভূত-ভর’ প্রসঙ্গে এই নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা আগে করা হয়েছে। তাই পাঠকদের একই ধরনের কথা বলে তাঁদের ধৈর্যের উপর অত্যাচার করার চেষ্টা থেকে নিজেকে বিরত করলাম। বরং এখানে একটি গণহিস্টিরিয়ার উদাহরণ তুলে দিচ্ছি।