এখন হ’তে একটা নতুন আশার আলো দেখতে পেয়ে উৎফুল্ল হলাম এবং কর্মজীবনের নতুন পথের মাইল পোস্ট গুনতে লাগলাম।

একদা কোন কার্যোপলক্ষে চরবাড়ীয়া (বড় বাড়ি) মোতাহার উদ্দিন হাওলাদারের বাড়িতে গিয়ে একখানা বই দেখতে পেলাম এবং তাঁর নিকট চেয়ে বই খানা নিয়ে এলাম। বই খানার নাম “মটর শিক্ষক” লেখক শৈলেন্দ্র নাথ দত্ত, অধ্যক্ষ-ইন্ডিয়ান অটোমোবাইল ইন্সটিটিউট, কলিকাতা।

বই খানায় আছে বিভিন্ন ধরনের ডিজেল ইঞ্জিনের যাবতীয় যন্ত্র ও যন্ত্রাংশের বিস্তৃত বিবরণ। যথা- সিলিন্ডার, পিস্টন, কারবুরেটার, গিয়ার, ফ্লাই হুইল, সাক্সনফ্যান, স্টিয়ারিং হহুইল ইত্যাদি। এ ছাড়া আছে ও সবের ভিতর ও বাহিরের ছবি এবং উহাদেরফ কার্যকারিতা, প্রস্তুত বিধি, ফিটিং প্রণালী ইত্যাদিও। এতদ্ভিন্ন আছে স্টার্টিং ফায়ারিং, কোল্টিং ইত্যাদি বিষয়ের বিশদ আলোচনা। ইঞ্জিন বা মেশইনের কোন অংশটি কোন ধরণের লোহার তৈরি, তার পাইন পদ্ধতি এমনকি গাড়ির রং করা সম্বন্ধেও বই খানায় উপদেশ আছে। মূলতঃ ডিজেল ইঞ্জিন বা মটর গাড়ি সম্বন্ধে এমন কোন যন্ত্র বা জ্ঞাতব্য বিষয় নেই, যার সম্বন্ধে এ বই খানিতে কিছু না কিছু বলা হয় নি।

মাত্র মাস ছয়েক পরে যে বিষয়ে যার ছাত্র হতে চলেছি, তাঁরই লেখা সে বিষয়ের বই খানা  পেয়ে আমি, অতিশয় আনন্দিত হ’লাম এবং মনে হ’তে লাগল। আমি যেন এখন হতেই তাঁর ছাত্র হচ্ছি। বই খানা রীতিমত পড়তে লাগলাম।

ক্রমে কার্তিক মাস এলো। মটর শিক্ষক বইখানা বাস্তবিকই আমার শিক্ষকের কাজ করল। বই খানা- বিষয়গুলো বুঝে, ছবি গুলোর সাথে মিলিয়ে পড়লে পাঠককে প্রায় ব্যবহারিক জ্ঞান দান করে। বই খানিতে (বাংলা ভাষার- অভাবে) কলকব্জার নাম যদিও ইংরাজিতে লিখিত হচ্ছে, তথাপি উহা পড়তে ও বুঝতে বিশেষ অসুবিধা হ’ল না। আমার মনে হল আমি যেন দুবছরে শিক্ষাসূচীর মধ্যে এক বছর এগিয়ে গেছি।

কার্তিকের শেষভাবে আমি কলকাতায় যাবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। পোষাক পরিচ্ছেদ  বিছানাপত্র সংগ্রহ করলাম এবং বরিশালে সাহেবের সদর দপ্তরে গিয়ে সাহেব কলকাতায় আসবার সংবাদ নিতে লাগলাম। একদা সদরে জানতে পেলাম যে, সাহেব কলকাতায় আসবেন নাগাত ৩০ শে কার্তিক।

বাড়িতে এসে মাকে জানালে তিনি বললেন যে, আমার কলকাতা যাবার পূর্বে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে একদিন বিদায় ভোজ দরকার। এ জন্য তারিখ ধার্য করলাম। ভোজের আয়োজন চলল।

২৩শে কার্তিক ভোজন পর্ব, ভোজ্য দ্রব্যের প্রস্তুতি চলল সারাদিন। অতিথী নাইওরী ও ছেলে পুলের কোলাহলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলাম, তবুও বিরক্তি নেই, আছে আনন্দ। ভোজপর্ব রাত্রে। মেহমানরা সবাই এলে ভোজপর্ব শেষ হ’ল রাত দশটায়। বিদায় কালে মেহমানরা অনেকে আমাকে দাওয়াত করলেন। আমি বিভিন্ন কুটুম্ব বাড়িতে ৩০শে কার্তিক পর্যন্ত দাওয়াত কবুল করলাম এবং স্থির হল যে, ১লা অগ্রহায়ণ আমি কলকাতা যাত্রা করব। খাওয়া দাওয়া শেষ করে রাত ১১টায় আমি বিশ্রাম নিলাম ভুজ্যাবশিষ্ট ও পাত্রাদি গুছিয়ে রেখে, মা বিশ্রাম নিলেন কিছু সময় পরে।

রাত একটার সময় মা’র ডাকে হঠাৎ আমার ঘুম ভাঙ্গে। শুনতে পেলাম মা কাতর কন্ঠে ডাকছেন- “কুডী, ও কুডী, আমারে ধর।“ বাতি জ্বালিয়ে মা’র কাছে গিয়ে দেখতে পেলাম যে, মা পা মেলে ঈষৎ চিতভাবে বসে আছেন, হাত দুখানা পিছন দিকে মাটিতে ঠেশ দেওয়া, মুখ মেলে অতি কষ্টে শ্বাস করছেন। মা আর একবার মৃদু স্বরে বললেন, “আমারে ধর।“ আমি বাঁচমু না। হামজার মায়রে বোলা। মরণে বড় কষ্ট।“

আমি মা’র পিছনে বসে তাঁর গ্রীবার নিচে আমার হাত রেখে তাঁর মাথাটি তুলে ধরলাম, মা নিজেকে আমার কোলে এলিয়ে দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে মা’র শ্বাস ও কষ্ট দুই-ই কুমে এলো। হামজার মা অর্থাৎ আমার চাচীকে ডাকা হল। তিনি এসে দেখলেন যে, মা নীরব-নিষ্পন্দ। মাত্র দশ মিনিট সময়ের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল। ঘরের ও বাড়ির অন্যান্য সবাই জেগে উঠল। কিন্তু মা’কে কেউ জীবিত দেখতে পেল, কেউ পেল না, শোয়ানো হল মুর্দা রূপে।

উপস্থিত বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে মা’র জীবনী সম্বন্ধে আলোচনা-অনুশোচনার ঝড় বইতে লাগল। একান্ত দরদীরা কাঁদতে লাগল। কিন্তু আমার কান্না এলোনা। কি হচ্ছিল এবং কি হ’ল, ভেবে কোন কুল পেলাম না। একবার মনে হ’ল আমার যেন কেউ নেই, কিছু নেই, রোগ, শোক, দুঃখ, বেদনা, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, তাও নেই। শেষমেশ (সম্বিৎ হারাইলাম) আমি যেন নিজেও নেই। জ্ঞানোদয় হ’লে আবার মনে হতে লাগল এ যেন আমি ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখছি। ঘুম ভেঙ্গে গেলেই আবার সব ঠিক হয়ে যাবে, প্রভাত হলেই মা আমাকে “কুডী” বলে ভাত খেতে ডাকবেন।

আগুন যেমন জ্বলে ওঠতে না পারলে সৃষ্টি হয় ধোঁয়া, তেমন আমার শোকাগ্নি রোদন রূপে প্রকাশ হতে না পেরে সৃষ্টি হল ধুয়া। মা’র শিয়রে বসে সে ধুয়া (গান)টি লেখলাম- (রাত তিনটায়)

(আমার) সংসার সাগর মাঝে সুখ তরিতে

(আমি) শান্তি মালে বোঝাই দিয়েছিলে তাহাতে।

মহানন্দে পাল তুলিয়ে

ঘুমে ছিলেম সব ভুলিয়ে।

শোনলাম হঠাৎ মোরে

মা-জী বলছে “ওরে

(তুই) সজাগ হয়ে দেখনা চেয়ে আঁখেতে।“

 

(বলো) “দেখ এসে গেল ভেসে শান্তি ভরা তোর।“

(আমি) ডাক শুনিয়া গেলাম কাছে হইয়ে কাতর।

(বলে) “আচম্বিতে আসল ঝড়ী

ধর বাছা তোর সুখের তরী”

নিকটে গিয়ে সাথে

ধরলাম ডান হাতে।

(বলে) “আজ ডোব্বে তরী কাল শমনের বড় জোড়”।

 

(আমার) সুখ তরণী মা জননী ছিল চিরকাল।

শান্তি বোঝাই ছিল তাতে আর ছিল পাল।

(আমার) হাতের তরি হাতে ধরা,

দশ মিনিটে সাধের ভরা

ডুবল সুখনা- পরে;

নদী নয়, বসত ঘরে।

আরজ বলে “উদ্ধারিও হে বিভু। তাঁর পরকাল”।

 

বহুদিন হতে আমার একটা ছিল যে, মা’র একখানা ফটো তুলে ঘরে রাখব। কিন্তু এ পর্যন্ত তা সফল করতে পারিনি। ইচ্ছা হল আজ উহা করব। রাত চারটার সময় যাত্রা করে ভোরে বরিশাল পৌঁছে (সদর রোড) ফটোগ্রাফার মথুর বাবুকে নৌকো করে বাড়িতে নিয়ে এলাম। তখন বেলা আটটা। বাড়িতে লোক জনের অভাব নেই, কবর খোঁড়া হচ্ছে। মা’র ফটোতোলাবার আলোচনা শুনে এক দল আত্মীয় (মুছুল্লি) বলে উঠলেন যে, ফটোতোলা হলে এ মুর্দা তারা দাফন করবেন না। অপর একদল বলতে লাগলেন যে, মুর্দার ফটো তোলা বা মুর্দা সম্বন্ধীয় অন্য কোন নীতি গর্হিত কাজের জন্য কখনো মুর্দা দায়ী হতে পারে না, সে জন্য দায়ী তাঁর ওয়ারিশ। এ জন্য আমরা তাঁর ওয়ারিশের কেছাছ (শাস্তি বিধান) করতে পারি। কিন্তু দাফন না করে, ফলে রেখে, শেয়াল-কুকুরের ভক্ষ্য করে মুর্দাকে শাস্তি দিতে পারি না।

সদরের বহু কাজ ত্যাগ করে মফস্বলে ইঞ্চি দরে ফটো তোলতে মথুর বাবু আসেন নি, এসেছেন চুক্তি নিয়ে বিশ টাকায়। ফটো তোলা হো’ক আর না হো’ক, তাঁকে উহা দিতেই হচ্ছে। কাজেই ফটো তোলা হ’ল। দঃ লামচরি নিবাসী আঃ গফুর মৃধা ও কাজেম আলী সরদার প্রমুখ কতিপয় খাছ মুছুল্লি গোনাহ (দাফন) না করে বাড়িতে চলে গেলেন (হায়রে ধর্ম, হায়রে কু-সংস্কার)। আম মুছুল্লিগণ মাকে দাফন করলেন।

মাকে দাফন করা হলে আমি তাঁর সমাধি পার্শ্বে দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্বোধন করে মনে মনে বললাম “মা! আজীবন তুমি ছিলে ইসলাম ধর্মের একনিষ্ঠ সাধিকা। তুমি কখনো নামাজের ‘কাজা’ করনি, করনি কখনো তছবিহ তেলায়াত ও তাহাজ্জুদ নামাজে গাফিলতী। আর আজ সেই ধর্মের দোহাই নিয়ে এক দল মুছুল্লি তোমাকে করতে চাইল শেয়াল-কুকুরের ভক্ষ্য, তাঁদের কাছে হলে তুমি তুচ্ছ, অবহেলিতা ও বিবর্জিতা, হলে নিন্দা ও ঘৃণার পাত্রী। সমাজে আজ সর্বত্র বিরাজ করছে ধর্মের নামে ‘কুসংস্কার’। তুমি আমায় আশীর্বাদ কর- আমার জীবনের ব্রত হয় যেন ‘কুসংস্কার দূরীকরণ অভিযান’। আর সে অভিযান স্বার্থক করে আমি যেন তোমার কাছে আসিতে পারি। আশীর্বাদ কর, মোরে মা। আমি রেখে আসতে পারি যেন সেই অভিযানের দামামা।“ মাত্র তিন বছর বয়স্কা একটি কন্যা সহ স্ত্রীকে একা ঘরে রেখে আমার কলকাতার যাওয়া আর সম্ভব হল না, জীবনোন্নয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় দিতে হল জলাঞ্জলী এবং পাত্রে ঘুঘু সাহেবকে জানানো হল আমার কলকাতায় না যাবার কারণটি।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x