আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ

মাননীয় বাকেরগঞ্জ জেলা প্রশাসক-সাহেব, উপস্থিত সুধীবৃন্দ ও আমার পল্লীবাসী আত্মীয়-বন্ধুগণ! আজ আমার জীবন ধন্য হল, তা দু’টি কারণে। প্রথমটি হল জেলা প্রশাসক সাহেবের হাতে আমার বহু আকাঙ্ক্ষিত ক্ষুদ্র লাইব্রেরীটির দারোদঘাটন দেখতে পেয়ে। দ্বিতীয়টি হল আমার চিরপ্রিয় পাঠশালার প্রাণপ্রিয় ছাত্রদের সুকোমল হস্তে সর্বপ্রথমবার বৃত্তি প্রদান করতে পেরে।

আজ আমার ৮০ বছর দীর্ঘ জীবনের মধ্যে পরম ও চরম আনন্দের একটি দিন। ‘পরম’ ও ‘চরম’ এই জন্য যে, এ লামচরি গ্রামের মতো একটি গণ্ডগ্রামে ভাইটগাছ, গুড়িকচু ও কচুরিপানায় আচ্ছাদিত জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে অবস্থিত আমার এ নগণ্য প্রতিষ্ঠানটির শুভ উদ্বোধন উপলক্ষে যে সমস্ত মনীষীবৃন্দের চরণদর্শন লাভের সৌভাগ্য আজ আমার হল, এ জীবনে তা আর কখনো হয়নি, হয়তো ভবিষ্যতে আর হবেও না কোনোদিন। কেননা আমি এখন খরস্রোতা-নদীতীরের ফাটল ধরা মাটির উপর দাঁড়ানো বৃক্ষের মতোই দাঁড়িয়ে আছি। যে কোনো মুহূর্তে ডুবে যেতে পারি অতল সলিলে।

হয়তো কেউ জানতে চাইতে পারেন যে, বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলে ‘অভাব’-এর তো অভাব নেই। তবে কেন আমার মনে লাইব্রেরীর মতো সামান্য একটা অভাব মোচনের প্রবণতা জাগলো? এর জবাবে আমি আপনাদের এই জানাতে চাই যে, এটা আমার আজীবনকালের ভিক্ষাবৃত্তি ও চুরিকর্মের পাপের প্রায়শ্চিত্ত। সে কি রকম সংক্ষেপে বলছি।

জন্ম আমার ৩রা পৌষ ১৩০৭ সালে। আমার শৈশবকালে এ গ্রামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিলো না। মাত্র চার বছর বয়সে পিতৃহারা ও আট বছর বয়সে বিত্তনিলামে সর্বহারা হয়ে বিধবা মায়ের আঁচল ধরে দশ দুয়ারের সাহায্যে শৈশবে আমাকে বেঁচে থাকতে হয়েছে। স্থানীয় মুন্সি মরহুম আ. করিম সাহেব একখানি মক্তব খোলেন তাঁর বাড়িতে ১৩২০ সালে। আমি অবৈতনিকভাবে তাঁর কাছে শিক্ষা করলাম স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ, বানান-ফলা পর্যন্ত। কিন্তু ছাত্রবেতন অনাদায়হেতু তিনি মক্তবটি বন্ধ করে দিলেন ১৩২১ সালে। আর এখানেই হল আমার বিদ্যাশিক্ষার সমাপ্তি বা সমাধি।

শৈশবে লেখাপাড়া শেখার প্রবল আগ্রহ ছিলো, কিন্তু কোন উপায় ছিলো না। উক্ত সামান্য বিদ্যার জোরেই চুরি করে পড়েছি জয়গুণ, সোনাভান, জঙ্গনামা, মোত্তল হোসেন ইত্যাদি পুঁথি এবং ভিক্ষা করে পড়েছি তৎকালে বরিশালে পড়ুয়া ছাত্রদের পুরোনো পাঠ্যবইগুলো। সে সব ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন প্রিয় ফজলুর রহমান (গ্রাজুয়েট)। তিনি অবসরপ্রাপ্ত এল.এ.ও.। বর্তমানে এখানেই আছেন।

বরিশালের পাবলিক লাইব্রেরী থেকে বই চুরি করে বাড়িতে এনে পড়তে শুরু করি ১৩৪৪ সাল থেকে। মিউনিসিপ্যাল এলাকার বাইরের কোনো পাঠককে তার বাড়িতে বই দেবার নিয়ম নেই বলে আমাকে বাড়িতে এনে বই পড়তে হয়েছে তৎকালীন বরিশালের টুপির ব্যবসায়ী জনাব ওয়াজেদ আলী তালুকদারের বেনামিতে। আমি তাঁর কাছে ঋণী। বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরীর বই সময় সময় এখনো বাড়িতে এনে পড়ি, তা-ও বেনামিতে আনতে হয়। এ সমস্ত আমার পক্ষে চুরিই বটে। এ চুরিকাজে যথাসম্ভব সাহায্য দান করেছেন মাননীয় লাইব্রেরীয়ান জনাব ইয়াকুব আলী (মোক্তার) সাহেব। আমি তাঁরও কাছে ঋণী। এর মধ্যে বরিশালের শঙ্কর লাইব্রেরী থেকেও বই-পুস্তক এনে পড়েছি দু-তিন বছর, তা-ও অনুরূপভাবে।

১৩৫৪-৫৫ সাল থেকে কিছু কিছু বই চুরি করে এনে পড়তে থাকি বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ লাইব্রেরী থেকে। সে চুরিকাজে সাহায্য দান করেছেন ও করেন মাননীয় অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির সাহেব। তিনি শুধু আমার চুরিকাজের সহযোগীই নন, আমার জীবনের সাধনার যবতীয় ফলাফলের তিনি সমঅংশীদার। হয়তোবা তার চেয়েও বেশি, তিনি আমার জীবনের সাথে এতোই ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত যে, কারো সাহায্য না নিয়ে তিনি আমার জীবনী লিখতে পারেন। মাননীয় অধ্যাপক শামসুল হক সাহেব এবং মাননীয় অধ্যাপক শামসুল ইসলাম সাহেবও সাহায্য করেছেন কলেজ লাইব্রেরী থেকে চুরির কাজে। ১৩৫৭ থেকে ৬২ সাল পর্যন্ত চুরি করে এনে কিছু কিছু বই পড়েছি বরিশালের ব্যাপটিস্ট মিশন লাইব্রেরী থেকে এবং ভিক্ষাও পেয়েছি কিছু পুস্তক-পুস্তিকা সেখান থেকে। আর এ কাজে আমাকে সাহায্য দান করেছেন তৎকালীন লাইব্রেরীয়ান মি. মরিস সাহেব। তিনি ছিলেন স্কটল্যান্ডের অধিবাসী। তবে বাংলা ভাষা জানতেন ভালো। আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।

যে সমস্ত মনীষীগণ আমার জন্য চুরি করেছেন বা আমার চুরিকাজে সাহায্য করেছেন, আমার মনে হয় যে, আইনের কাছে তাঁরা অন্যায় করে থাকলেও সমাজের কাছে তাঁরা মহৎ কাজই করেছেন। কেননা তাঁর একটি ‘জানোয়ার’কে মানুষ বানিয়েছেন। আর সেই মানুষটির আহ্বানে সাড়া দিয়ে আজ আপনারা এই জংলাভূমে পদধূলি দিয়েছেন।

প্রবাদ আছে – ‘চোরের বাড়িতে দালান নেই’ ভিক্ষার চালে ভরে না গোলা’। তাই ভেবে আজীবনকালের ভিক্ষা ও চুরি করা সম্পদটুকু মজুত করে রাখা নিষ্ফল মনে করে জনগণের কল্যাণ কামনায় তা সাধারণ্যে দান করে দেবার প্রয়াসী হয়ে, তা দান করলাম ‘সত্যের সন্ধান’ ও ‘সৃষ্টি রহস্য’ নামক দু’খানা ক্ষুদ্র পুস্তকের মাধ্যমে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, রাজধানীর বুদ্ধিজীবী মহলের অনেকেই বই দু’খানা আমার দান বলে স্বীকার করতে চাননি। তাঁরা অনেকেই বলেছেন যে, পল্লীবাসী কৃষকরা নিরক্ষর হলেও সাধারণত ভালোমানুষ এবং বেশির ভাগই ঈমানধনে ধনী। তাদের মধ্যে এমন আনাড়ি লোক ও সাধারণত ভালোমানুষ এবং বেশির ভাগই ঈমানধনে ধনী। তাদের মধ্যে এমন আনাড়ি লোক ও এ সমস্ত দানসামগ্রী থাকা অসম্ভব। এই বই নিশ্চয় কোনো বুদ্ধিজীবী লোকের লেখা। হয়তো তিনি ধুরন্ধরী করে নাম দিয়েছেন একজন কৃষকের। বই দু’খানা লেখা আমার পক্ষে সম্ভব কি-না, ,তা যাচাই করবার জন্য প্রাক্তন ডি.পি.আই. জনাব ফেরদাউস খান তো তাঁর ধানমণ্ডির বাসায় আমাকে আমন্ত্রণ দিয়ে নিয়ে রীতিমতো পরীক্ষাই নিলেন ৩.১.৭৬ তারিখে। সে পরীক্ষাকালে সেখানে উপস্থিত ছিলেন জনাব আ.ন.ম. এনামুল হক এবং চিত্রশিল্পী কাজী আবুল কাসেম সাহেব। সেদইন কাসেম সাহেবের হাতে পেন্সিলে আঁকা আমার একটি ছবি এখানেই আছে।

কিন্তু বুদ্ধিজীবী মহলের সে কথার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাজধানীর বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ প্রধান ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ও তাঁর প্রণীত ‘আরণ্যক দৃশ্যাবলী’ নামক বইখানিতে। তিনি অন্যান্যের উদ্দেশ্যে বলেছেন, “কল্পিত নাম নয়, ছদ্মনাম নয় কারো। আরজ আলী মাতুব্বরের নিবাস বরিশাল।“ তাঁর সে বইখানা এখানেও আছে।

ভিক্ষাবৃত্তি দ্বারা এবং চুরি করে করে যে পাপ অর্জন করেছি, তারই প্রায়শ্চিত্ত অথবা যে অপরাধ করেছি, তারই জরিমানা দিচ্ছি এখন প্রায় ৬০ হাজার টাকা। যার দ্বারা স্থাপিত হচ্ছে এই ক্ষুদ্র পাঠাগারটি, মজুত হচ্ছে জনতা ব্যাংকে ১০ হাজার টাকা এবং করা হচ্ছে দুইটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক বৃত্তিপ্রদানের ব্যবস্থা। এসমস্ত অর্থ আমার দান নয়, এগুলো পাপের প্রায়শ্চিত্ত বা অপরাধের জরিমানা। কেননা ঐসমস্ত পাপ বা অপকর্ম না করলে, হয়তো এসমস্ত জরিমানা দিতাম না কখনো।

দারিদ্র নিবন্ধন কোনো স্কুল-কলেজে গিয়ে পয়সা দিয়ে বিদ্যা কিনতে পারিনি দেশের অন্যসব ছাত্র-ছাত্রীদের মতো। তাই কোনো স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা আমার শিক্ষাপীঠ নয়। আমার শিক্ষাপীঠ হল লাইব্রেরী। আশৈশব লাইব্রেরীকে ভালোবেসে এসেছি এবং এখনো ভালোবাসি। লাইব্রেরীই আমার তীর্থস্থান। আমার মতে – মন্দির, মসজিদ, গির্জা থেকে লাইব্রেরী বহুগুণে শ্রেষ্ঠ।

তাই যখন কোনোরূপ একটি জনকল্যাণমূলক কাজ করবার জন্য মনস্থির করেছি, তখন সেই লাইব্রেরীপ্রীতিই জাগিয়ে তুলেছে আমার মনে লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার প্রবণতা। আর তারই ফল এ ক্ষুদ্র লাইব্রেরীটি। যেহেতু আমি লাইব্রেরীর কাছে ঋণী, আমি লাইব্রেরীর ভক্ত।

লাইব্রেরী ছাড়া আমার আরও একটি তীর্থস্থান ছিলো। তা হল প্রায় ৬৭ বছরের পুরোনো একখানা দোচালা খড়ের ঘর। অর্থাৎ মরহুম মুন্সি আবদুল করিম সাহেবের ক্ষুদ্র পাঠশালাটি। সেটি ছিলো আমার শৈশবকালের তীর্থস্থান। সেখানে গিয়ে লিখতে হয়েছে স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণ তালপাতায় এবং বানান-ফলা কলাপাতায় লেমের কালি ও টুনির কলম দিয়ে। সে পাঠশালায় সমপাঠী বা সহপাঠী যারা ছিলো, তাঁরা সবাই কালে বা অকালে এজগত ছেড়ে চলে গেছে, জীবিত আছি মাত্র দু’জন আরজ আলী।

সেকালের সেই পরলোকগত সহপাঠীদের কচি মনের সাথে আমার তখনকার রুচি মনের যে ভালোবাসা জন্মেছিলো, তা ভুলতে পারিনি আজও। তাই সময় সময় এ বৃদ্ধ মনটি যেন কচি হয়ে যায় এবং স্মৃতিপটে আঁকা সেই সব বাল্যবন্ধুদের সাথে মেলামেশা ও খেলা করে। কিন্তু সে খেলায় মন-মানস তৃপ্ত হয় না।

তাই আমার শৈশবের সেই কচি মনটি বন্ধুত্ব পাতাতে চায় আধুনিক কালের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কচিমনা শিশুদের সাথে। কিন্তু জানি যে, অধুনা কোনো শিশুছাত্রই আমার মতো চুল-দাঁড়ি পাকা, দন্তহীন বৃদ্ধের সাথে বন্ধুত্ব পাতাবে না, আমাকে ভালোবাসবে না। মনের সরলতায় আমি যে আজও একজন শিশু, তা কেউ বুঝবে না, বোঝবার কথাও নয়। তাই স্থির করেছি যে, ছাত্ররা আমাকে ভালোবাসুক আর না-ই বাসুক, আমি তাদের ভালোবাসবো। শৈশবকাল থেকেই আমার মনে বাসা বেঁধেছে পাঠশালাপ্রীতি ও ছাত্রপ্রীতি। কামনা করি যে, আমার মরআত্মা যেন অনন্তকাল ধরে পাঠশালার শিশুছাত্রদের সাথেই খেলা করে। আর তাই হবে আমার স্বর্গসুখ। এ ছাড়া অন্য কোনোরূপ স্বর্গ আমার কাম্য নয়। আর সেই পাঠশালা ও ছাত্রপ্রীতির নিদর্শন হল ছাত্রদের বৃত্তি দান অর্থাৎ আরজ ফান্ড থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অনন্তকাল স্থায়ী প্রতিযোগিতামূলক বার্ষিক বৃত্তিপ্রদান।

অর্থ আমার নেই। কেননা জীবনে অর্থের জন্য সাধনা করিনি, বেঁচে থাকার অতিরিক্ত। কর্মজীবনের শেষ অধ্যায়ে ১৩৬৭ সালে আমার স্থাবরাস্থাবর যাবতীয় সম্পত্তি ওয়ারিশদের দান ও বন্টন করে দিয়ে রিক্ত হস্তে সংসারত্যাগী হয়ে, সে সময় থেকে পুত্রগণের পোষ্য হয়ে জীবন যাপন করছি, তবে ছেলদের বলে দিয়েছি যে, অতঃপর এ বৃদ্ধ বয়সে দেহটি খাটিয়া যদি কিছু অর্থ উপার্জন করতে পারি, তবে তার প্রতি তোমাদের কারো কোনো দাবি থাকবে না, আমি তা ইচ্ছামতো কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করবো। ওয়ারিশগণ তাতে সম্মত ছিলো এবং এখনো আছে। বিশেষত আমার প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণে তাঁরা যথাসম্ভব সহযোগিতাও করছে। তবে তারা এতে কোনোরূপ আর্থিক সাহায্য দানে অক্ষম।

সংসারত্যাগী হয়েও নিষ্কর্মা হয়ে বসে থ্যাকিনি আমি, দিনমজুরি করেছি মাঠে মাঠে আমিন রূপে। সেই মজুরিলব্ধ অর্থ দ্বারা ভূসম্পত্তি খরিদ করেছিলাম আমি ইতঃপূর্বে। গত বছর তা সমস্তই বিক্রয় করেছি। ক্রেতারাও প্রায় সবাই এখানে আছেন। সেই সম্পত্তি বিক্রয়লব্ধ সামান্য পুঁজি নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনের বিরাট কাজে হাত দিয়েছি। সম্পত্তি বিক্রয়লব্ধ অর্থ ও অন্যান্য বাবদ তহবিল ছিলো মাত্র ৪৫ হাজার টাকা এবং পরিকল্পিত কাজের ব্যয় বরাদ্দ ছিলো ৬০ হাজার টাকা। আমি জানি যে, এর ঘাটতির ১৫ হাজার টাকা পূরণ করতে হবে আমাকে দিনমজুরি করে। মাননীয় জেলা প্রশাসক সাহেবকে প্রদত্ত পরিকল্পনায় এ ঘাটতির বা তা পূরণের উপায় সম্বন্ধে কোনো উল্লেখ করিনি। কেননা আমার দৃঢ় ধারণা এই যে, যদি মজুরগিরিতে অক্ষম হই, তাহলে ভিক্ষা করবো। ভিক্ষায় আমার লজ্জা নেই। লোকে আমাকে ভিখারী বলুক, তা আমি চাই। আর সেই কারণেই আমার একখানি জীবনী লিখে নাম দিয়েছি ‘ভিখারীর আত্মকাহিনী’। ভিক্ষা করা সম্প্রতি শুরুও করেছি। এবারে ঢাকায় গিয়ে কতিপয় বিদ্যোৎসাহী বন্ধুর কাছে বই ভিক্ষা পেয়েছি ১০৮ খানা, যার মোট মূল্য ৯৮৩.৭৫ টাকা। সে বইগুলো আমার লাইব্রেরীতে আছে।

টাকা আমার নেই। আর জীবিকা নির্বাহের জন্য আমার টাকার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু আমার প্রতিষ্ঠানটির যাবতীয় কাজ সমাধা করতে টাকার অভাব আছে, তা-তো আগেই বলেছি। অভাব আছে কিছু বইপত্রের ও আসবাবপত্রের। কিন্তু তা পূরণ করা আমার ক্ষমতার বাইরে নয়। সুধী মহোদয়গণ! আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন যে, এখন আমার জন্য কোনো ভবিষ্যত নেই। ‘ভবিষ্যত’ আমার হাতে থাকলে কোনো অভাবকেই অভাব বলে মনে করতাম না। তাই আপনাদের কাছে আমার অভাবের একটি তালিকা পেশ করছি।

(১) গরু-ছাগলের কবল থেকে ফুল-ফলের গাছ রক্ষার উদ্দেশ্যে লাইব্রেরীর সরহদ্দের সীমানা বরাবর একটি দেয়াল নির্মাণ করা।

(২) আগন্তুকদের পানীয় জলের জন্য একটি নলকূপ বসানো।

(৩) বয়স্কদের শিক্ষার জন্য নৈশবিদ্যালয়রূপে লাইব্রেরী সংলগ্ন একটি বারান্দা নির্মাণ করা।

(৪) দানপত্র রেজিস্ট্রীকরণের ব্য্য নির্বাহ করা (এটাই আমার সর্বপ্রধান সমস্যা এবং আশু প্রয়োজন)।

একবার আমার ৬০ বছর বয়সের সময়ে ঘোষণা করেছিলাম যে, অতঃপর যা-কিছু উপার্জন করবো, তা সমস্তই দেশের জনকল্যাণে ব্যয় করছি যে, অতঃপর যদি কোনো কাজের মজুরি পাই, কিংবা পুরস্কার বা উপহারপ্রাপ্ত হই, অথবা কোনো মহৎ ব্যক্তিদের নিকট হতে কোনোরূপ দানপ্রাপ্ত হই, বা মহামান্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মহৎ ব্যক্তিদের সাহায্যপ্রাপ্ত হই, তবে তা সমস্তই আমার এই ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের বার্ষিক বৃত্তিদানে ব্যয় করবে। আর এজন্য উপস্থিত সুধীবৃন্দের বিশেষ করে মাননীয় বাকেরগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাহেবের শুভদৃষ্টি প্রার্থনা করছি।

শ্রদ্ধেয় অতিথিবৃন্দ! আপনাদের আর অধিক কষ্ট দিতে চাই না। এখন আমি মৃত্যুপথের যাত্রী। অনেকের সাথেই হয়তো এ-ই আমার শেষ দেখা। আপনাদের মতো যে সমস্ত সুধীজনের সাথে সৌভাগ্যক্রমে আমার পরিচয় লাভের সুযোগ ঘটেছে, তাঁরা সবাই হচ্ছেন বিদ্যায়, জ্ঞানে, গুণে, ধনে, মানে, পরিবেশ ও আভিজাত্যে আমার সাথে এতটাই অসমান যে, তা পরিমাপ করা যায় না। আর আমি হলাম একজন অশিক্ষিত, পল্লীবাসী কৃষক। তাই অনেক সময় আপনাদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও ব্যবহারে সৌজন্য রক্ষা করে চলতে পারিনি। হয়তো ত্রুটি হয়েছে, হয়েছে বেয়াদবি। কিন্তু তা আমার অহংকার নয়, তা হচ্ছে স্বকীয় অজ্ঞতা, মূর্খতা বা বার্ধক্যহেতু জ্ঞানের খর্বতা। সেজন্য আমি আজ আপনাদের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাচ্ছি।

আমার পল্লীবাসী ভাই ও বোনেরা, যারা এখানে আছেন বা না আছেন, সবাইকে ধন্যবাদ জানাই এই জন্য যে, আমি আপনাদের গ্রাম্য সমাজের একজন আনাড়ি মানুষ। কেননা প্রচলিত সমাজবিধির বিরুদ্ধে অনেক কাজ করে যাচ্ছি। আর সেজন্য আপনারা আমাকে সমাজচ্যুত করতে পারতেন, পারতেন একঘরে করতে, বর্জন করতে। কিন্তু তা আপনারা করেননি, বরং আমাকে সাথে নিয়েই কাজ করেছেন সকলে সব সময়, মর্যাদা দান করেছেন। কোনো কোনো কারণে আপনাদের অবহেলার পাত্র হলেও অবহেলা করেননি আমাকে কেউ কোনোদিন। তাই আমি আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জীবনের শেষ প্রহরে বিদায় নিচ্ছি।

পরিশেষে – হে আমার মহান অতিথিবৃন্দ! সময়, শক্তি ও অর্থ নষ্ট করে এবং শরম স্বীকার করে আপনারা আমার এ ক্ষুদ্র লাইব্রেরীটির সামান্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগদান করে অনুষ্ঠানটিকে সাফল্যমণ্ডিত করেছেন, আমাকে করেছেন গৌরবান্বিত। বিশেষত মাননীয় জেলা প্রশাসক সাহেব উদ্বোধনপূর্বে পৌরহিত্য করায় অনুষ্ঠানটি হচ্ছে গৌরবোজ্জ্বল এবং তাঁর পদস্পর্শে লাইব্রেরীটি হয়েছে ধন্য, ধন্য হচ্ছে লামচরি গ্রামখানি। আমি নিজের ও লামচরিবাসীদের পক্ষ থেকে আপনাদের সকৃতজ্ঞ মোবারকবাদ জানাচ্ছি।

ধন্যবাদ, শুভ হোক।

২৫.১.১৯৮১

১. মানুষের পক্ষে

২. নিবেদন

৩. সৃষ্টি রহস্য

৪. ম্যাকগ্লেসান চুলা

অপ্রকাশিত

৫. কৃষকের ভাগ্য গ্রহ

৬. সীজের ফুল

৭. সংক্ষিপ্ত জীবন বাণী

৮. ভাষণ সংকলন

৮.১ মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ভাষণ

৮.২ বাংলাদেশ সোসিও-ফিলসফিক হিউম্যানিস্ট গিল্ড সেমিনারে ভাষণ

৮.৩ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৪ নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৫ গুণী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৬ বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.৭ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর বার্ষিক বিবরণী ভাষণ

৮.৮ মানবিক উন্নয়নে যুব সমাজের ভূমিকা সেমিনারে ভাষণ

৮.৯ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সভায় ভাষণ

৮.১০ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর বার্ষিক অধিবেশনে ভাষণ

৮.১১ বার্ষিক বৃত্তিপ্রদান উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.১২ বাংলাদেশ কুটির শিল্প সংস্থায় ভাষণ

৮.১৩ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর বার্ষিক বিবরণী ভাষণ

৮.১৪ বাংলাদেশ দর্শন সমিতিতে ভাষণ

৮.১৫ বার্ষিক বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে ভাষণ

৮.১৬ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীতে ভাষণ

৮.১৭ বাংলা একাডেমীর সংবর্ধনা ভাষণ

৮.১৮ আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর ষষ্ঠ বার্ষিক অনুষ্ঠানে ভাষণ

৯. নির্ঘণ্ট

১০. বিভিন্ন আলোকচিত্র

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x