যুক্তিবাদী আন্দোলনকে যাঁরা জীবনের শ্বাস-প্রশ্বাস করে নিয়েছেন, যাঁদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন বেঁচে থাকার ভাত রুটি, যাঁরা আদর্শের বারুদ ঠেসে শরীরের খোল ভরিয়ে রেখেছে, যাঁরা বঞ্চিত মানুষগুলোর প্রেমে লায়লা কী মজনু প্রেমের মূল্য তো তাঁদের দিতে হবেই। প্রেম করব কিন্তু মূল্য দেব না; এ হয় না, হতে পারে না। সে মানব মানবীর প্রেমই হোক আর দেশপ্রেমই হোক। আদর্শের প্রতি এই প্রেম, বঞ্চিত মানুষদের প্রতি এই প্রেমই আত্মোৎসর্গে অনুপ্রাণিত করে,

আদর্শের বারুদে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দেয়
নিজের শরীরের সঙ্গে সঙ্গে শত্রু শরীরও। এমন আদর্শে
নিবেদিত প্রাণ সারা শরীরে বারুদ ঠাসা মানুষ ইতিহাসের
পাতা থেকে হঠাৎ উঠে আসে না। এরা তৈরি হয়। আদর্শ
এদের তৈরি করে।

এরা আবেগতাড়িত হিষ্টিরিয়াগ্রস্থ অবস্থায় টপ করে প্রাণ দিয়ে ফেলে না। এরা উত্তেজনাহীন, আবেগহীন অবস্থাতেও নিজ আদর্শে অবিচল। আবারও বলি, এমন মানুষ তৈরি হয়েছে আদর্শকে সামনে রেখেই। আত্মোৎসর্গ ব্যাপারটা এইসব আদর্শবাদীদের কাছে দৈনন্দিন আর দশটা কাজকর্মের মত এতই স্বাভাবিক যে, এর মধ্যে তারা কোনও বিশেষ বীরত্ব বা বিশেষ মাত্রা আছে বলে মনে করে না। নিছক কল্পনা থেকে এসব কথা লিখছি না। এসব কথা কলম থেকে উঠে এসেছে বাস্তব অভিজ্ঞতার ফসল হিসেবে। আন্দোলন করব, শাসক শ্রেণী ও রাষ্ট্রক্ষমতাকে আক্রমণ করব, অথচ আক্রান্ত হব না এমন বোকার মত প্রত্যাশা রাখি না। আক্রান্ত হয়েছি, হচ্ছি, হবো !

আজ এক চরম যুগ-সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট বুঝে নেবার প্রয়োজন আছে যুক্তিবাদ নিয়ে আন্দোলন খেলায় সামিল না হয়ে সত্যিকারের গণআন্দোলন গড়ে তুলতে থাকলে আঘাত আসবেই। এই আন্দোলন যাদের স্বার্থকে আঘাত করবে, যাদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলবে, তারা যে আঘাত হানবেই এবং সে ভাঘাত হবে অবশ্যই নিষ্ঠুর ভয়ংকর! এই আন্দোলনে প্রয়োজন ব্যাপক জনসমর্থন। শোষিত জনগণ যে-দিন তাঁদের নিজেদের যুক্তিতে বুঝতে পারবেন কুসংস্কারের সঙ্গে শোষণের সম্পর্কটা, সে-দিন যে গণ-আন্দোলন গড়ে উঠবে, তাতে বর্তমান সমাজ-ব্যবস্থার ভিত্তিমূল পর্যন্ত আন্দোলিত হবে। সেই আন্দোলনকে ধ্বংস করতে হুজুরের তল্পিবাহক সরকার ময়দানে নামবেই নানাভাবে। নামবে অত্যাচার, কুৎসা, চরিত্রহনন, ব্ল্যাক- মেইলিং ইত্যাদি অস্ত্র নিয়ে। আজকাল সরকার আর শত্রুদের বিরুদ্ধে শুধু মাইনে করা সেনা, পুলিশ নামায় না। হাজির করে গোয়েবেলস-এর মিথ্যেকে লজ্জা পাইয়ে দেওয়া নানা ফন্দিফিকির, ষড়যন্ত্র। ফলে আন্দোলনের নেতৃত্বে আপনি এগিয়ে এলে হঠাৎই এক রাতে দেখতেই পাবেন পুলিশ আপনার আস্তানায়। তারপর ভ্যানে তোলা । গুলির শব্দ, আর্তনাদ, সব শেষ। তারউপর, রাত দুপুরে পুলিশের কোনও বড়কর্তা পত্রিকার অফিস ও সংবাদ মাধ্যমগুলোকে ফোনে দারুণ একটা খবর শোনাবেন ; কোন পতিতার ঘরে এক সমাজ বিরোধীর সঙ্গে বাগড়ায় লিপ্ত হয়ে গুলি বিদ্ধ হয়ে আপনার মারা যাওয়ার খবর। অথবা ছড়ান হতে পারে অন্য কোনও গপ্পো যা সাধারণ মানুষ চেটে পুটে খাবেন, সেই সঙ্গে খাওয়া হবে আন্দোলনেরও কিছুটা। ষড়যন্ত্রের শিকাবে কত রকমভাবেই না খেলে বিশাল প্রভাবশালী রাষ্ট্রক্ষমতা। সরকারের একান্ত ইচ্ছেয় সাধুকে চোর বানান কঠিন কী ?

আপনার আমার দাবি জানানোর গণতান্ত্রিক অধিকার, আপনার আমার বেঁচে থাকার গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করতে পুলিশ ও প্রশাসন এগিয়ে আসবে এবং পুলিশ ও প্রশাসনের দেওয়া নিরাপত্তার ঘেরটোপের ওপর নির্ভর করে আমাদের আন্দোলন এগোবে এমন অদ্ভূত চিন্তা করলে এখনই সচেতন হওয়ার প্রয়োজন আছে। আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে বাস্তব সত্যকে বুঝতেই হবে। বুঝতে হবে হুজুবের দলের সঙ্গে হুজুরদেব অর্থে জেতা সরকার-গঠণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক এবং সরকারের সঙ্গে পুলিশ ও সেনার সম্পর্ক। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে যাঁদের জন্য আন্দোলন, যাঁদের নিয়ে আন্দোলন, তাঁরাই আমাদের আন্দোলনের শক্তি। আমরা আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে যখনই আক্রান্ত হয়েছি জনবোধ আক্রমণকারীদের ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। আজ যুক্তিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এমন বহু মানুষ তৈরি হয়েই গেছেন, যাঁরা প্রয়োজনে অবলীলায় নিজের হৃদপিণ্ড পেতে দিতে পারেন শত্রুর গরম সীসায় বিদীর্ণ হতে। দেশপ্রেমই তাঁদের এমন করে গড়েছে।

তবু এরপরও একটা অতি প্রয়োজনীয় কথা বলার থেকেই যায়, সেটা হলো- আন্দোলন এগোয় উত্থান পতনের পথ ধরে, আন্দোলন অনেক উত্থান পতনের সমষ্টি। আন্দোলনের সংকট মুহূর্তে, প্রয়োজনে পিছু হটার মুহূর্তে এই সত্যটা স্মরণে রাখলে লড়াই করার প্রেরণা পাওয়া যায়, উজ্জিবীত হওয়া যায়, হারতে হারতেও হারাকে জেতায় রূপান্তরিত করা যায়।

আন্দোলনে যতই বেশি বেশি করে বঞ্চিত মানুষরা অংশ নেবে ততই আন্দোলন ধ্বংসে আক্রমণ তীব্রতর করবে রাষ্ট্রশক্তি। খেটে খাওয়া মানুষদের বিরুদ্ধে খেটে খাওয়া মানুষদের কাজে লাগাতে উগ্রপন্থী ছাপও মারা হবে লড়াকু আপোষহীন

আন্দোলনকর্মীদের বুকে পিঠে। উগ্রপন্থীদের নির্মূল করার প্রশ্নে ভারতবর্ষের প্রায় সমস্ত

রাজনৈতিক দল ও তাদের পকেটের বুদ্ধিজীবীরাই প্রচণ্ড সোচ্চার। বিপজ্জনক মতৈকের জোয়ারে বলিষ্ঠ সত্যটুকু প্রকাশ করতে ভয় পায় অনেকেই। জেনে-বুঝেও এইসব শঙ্কিত কণ্ঠগুলো যা বলতে পারে না, তা হলো— উগ্রপন্থীরা তো উদ্ধার মতন আকাশ থেকে এসে খসে পড়েনি। অবহেলিত বঞ্চিত মানুষগুলোর অধিকার দাবীর ক্ষেত্র থেকে উঠেছে এই সমস্যা। উগ্রপন্থী মারতে হবে শুনলে জনসাধরণের অর্থে পোষা সরকারী পুলিশ ও সেনাবাহিনীর চোখে মুখে ফুটে ওঠে একটা জিঘাংসা, কিলার ইনস্টিংক্ট। তারপর তারা আন্দোলনকারী জনগোষ্ঠির ওপর যে অত্যাচার চালায় তা নাৎসি অত্যাচারকেও হার মানায়। ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠির যাঁরা মানুষ নন, তাঁদের একথা শুধু কলমে লিখে বোঝান যাবে না ।

এখানে একটি ছোট্ট উদাহরণ টানছি, ৯১-এর অক্টোবর হারাবে মিলিত হয়েছিল কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্র প্রধানেরা। বহু দেশের প্রধানরাই ছিলেন ঋণভিক্ষু। ব্রিটেন ও কানাডা প্রস্তাব আনতে চেয়েছিল- ঋণপ্রার্থী দেশগুলোর মানবাধিকার রক্ষার রেকর্ড দেখে ঋণ দেওয়া হবে। এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছিল ভারত সহ তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সব দেশই। কারণ একটাই— রেকর্ড ঘাটলে দক্ষিণ আফ্রিকায় মানবাধিকার রক্ষিত হচ্ছে না বলে চোখের জলে বুক ভাসান এইসব দেশের ঋণ পাওয়া অসম্ভব হয়ে যায় মানবাধিকারকে অতি বর্বরতার সঙ্গে নিষ্পেষিত করার অপরাধে।

যুক্তিবাদী আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন ও দেবেন তাঁদের তাই সচেতন থাকতে হবে, বুঝতে হবে আন্দোলনের শত্রু-মিত্রকে। আন্দোলনকর্মী ও নেতাদের আন্তরিকতা, তাঁদেব নিপীড়িত মানুষদের প্রতি সমুদ্র-গভীর প্রেমই দিতে পারে আন্দোলনের অসামান্য সাফল্য। এই আস্তবিকতা ও প্রেমের মাঝখানে কখনই আসতে পারে না আপসমুখী কোনও চিন্তা। এই আপসমুখী মানসিকতার দ্বিধাই আপনাকে হিসেবী পা ফেলতে শেখাবে, ক্যারিয়ার গোছাতে শেখাবে। প্রেম কখনও হিসেবি পা ফেলতে শেখায় না।

সাংস্কৃতিক আন্দোলনকর্মী ও বিজ্ঞান আন্দোলনকর্মীদের
সচেতন থাকতেই হবে তাঁদের নেতাদের কাজকর্মের বিষয়ে,
যাতে চ্যুতি ঘটলে নজর না এড়ায় ।

আন্দোলনকে বিপথে চালিত করতে শোষক ও শাসকরা নানাভাবে প্রতিটি সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিজ্ঞান ক্লাব এবং কুসংস্কার-মুক্তির কাজ-কর্মের সঙ্গে জড়িত সংস্থাতে থাবা বসাতে চাইবেই। চাইবেই তাদের মত কবে কুসংস্কার মুক্তির আন্দোলন খেলায় সাংস্কৃতিককর্মীদের মাতিয়ে রাখতে। সাধারণ মানুষের চেতনা রোধ করতে ওর এমনটা করবেই। আর সেইজন্য অতি সরলীকৃত পদ্ধতিটি হলো— সংস্থার নেতাদের চিহ্নিত কর, তাদের কিনে পকেটে পুরে ফেল।

যে নেতা নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছে, তাকে আপনারা আন্দোলনকর্মীরাই চিহ্নিত করুন, বিছিন্ন করুন আন্দোলন থেকে। আপনার আমার যদি লক্ষ্য সম্বন্ধে সঠিক ও স্বচ্ছ ধারণা থাকে, তবেই বুঝতে পারব নেতৃত্ব আমাদের অন্য দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে চাইছে কী না।

কোনও অপছন্দের আন্দোলনকে ধ্বংস করতে রাষ্ট্রশক্তি সেই আন্দোলনে ঢুকিয়ে দেয় ট্রয়ের ঘোড়া। যাদের অন্তর্ঘাতে আন্দোলন ধ্বংস হয়ে যায়। সব দেশের ইতিহাসেই ছড়িয়ে রযেছে এমন বহু উদাহরণ। বহু থেকে একটিকে তুলে দিচ্ছি। নকশালপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যে কোনও কৌশলেই হোক মিশে গিয়েছিল সমাজবিরোধী গোষ্ঠি। আর সমাজবিরোধীদের প্রয়োগ করা হয়েছিল ওই আন্দোলন ধ্বংস করবার কাজে। এ বিবরণ রঞ্জিত গুপ্তেরই দেওয়া, যিনি নকশাল দমনকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে পরিচিত।

নকশালপন্থার সমর্থন বা অসমর্থন আমার এই উদাহরণ টেনে আনার উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য আন্দোলনকারীদের সামনে দৃষ্টান্ত এনে বোঝার ব্যাপারটা আরো ‘জল-ভাত’ করে দেওয়া।

কুসংস্কার-মুক্তি আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যে-সব বিষয়গুলো মাথায় রাখা প্রাথমিকভাবে প্রযোজনীয় সেগুলো হলো :

১। সাংস্কৃতিক জগতে শাসক ও শোষকদের একচেটিয়াপণা বন্ধ করতে হবে। নতুন সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে আমাদেরও সমস্ত রকমভাবে চেষ্টা করতে হবে প্রতিটি গণমাধ্যম ও প্রচার মাধ্যমকে কাজে লাগাতে। যে-সব গণমাধ্যম ও প্রচারমাধ্যম মানুষকে আকর্ষণ করে, তার প্রতিটিকে কাজে লাগিয়েই আমরা আমাদের চিন্তা-চেতনাকে পৌঁছে দেব, প্রতিটি মানুষের মধ্যে। মানুষ যেখানে, সেখানেই আমাদের পৌঁছতে হবে আমাদের চিন্তধারাকে পৌঁছে দেবার স্বার্থেই। পরিস্কারভাবে মাথায় রাখতে হবে, আমরা গণমাধ্যম ও প্রচারমাধ্যমগুলোকে আন্দোলনের স্বার্থে কাজে লাগাব, কিন্তু গণমাধ্যম ও প্রচার মাধ্যমগুলো যেন হুজুর শ্রেণীর স্বার্থে আমাদের কাজে না লাগাতে পারে।

যাঁরা মনে করেন বৃহৎ পত্র-পত্রিকায় না লেখাটাই বুঝি লড়াকু মানসিকতার পরিচয় তারা ভুল করেন, সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের বক্তব্য পৌঁছে দেবার লক্ষ্য থেকেই সরে যান। সাধারণ মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠি মাত্র হয়ে পড়েন। সব সময এমন চিন্তা যে ভুল ধারণা থেকে উঠে আসে, তাও নয়। অনেক তথাকথিত লড়াকু মানুষদের চিনি, যাঁরা বড় পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করাটা প্রতিক্রিয়াশীলতার লক্ষণ বলে সোচ্চারে ঘোষণার পাশাপাশি গোপনে বড় পত্রিকায় ‘লাইন’ করার চেষ্টা করেন স্রেফ নিজের লেখা ছাপাতে। এঁদের অনেকেই নিজের বিবেক বিক্রি করেছেন লেখা ছাপানোর প্রতিশ্রুতি কিনতে। যাঁদের লেখায় ধার নেই, পাঠক-পাঠিকাদের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার আকর্ষণী ক্ষমতা নেই, তাঁরা বিবেক জামিন রাখতে চাইলেও কেনার খদ্দের জোটে না। এই অক্ষমতা থেকেও অনেক সময় আসে বড় প্রচার মাধ্যমগুলোর প্রতি বৈরাগ্য। এ যেন ভিখারীর বৈরাগ্য, নপুংসকের ব্রহ্মচর্য।

বড় পত্রিকায় লেখার সুযোগ পেলে আমরা নিশ্চয়ই নেব। কিন্তু তা বিবেক জামিন রেখে অবশ্যই নয়। সুযোগ নেব আমাদের দর্শন, আমাদের আদর্শকে পৌঁছে দেবার স্বার্থেই। বড় পত্রিকার মধ্য দিয়ে আদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা অবশ্যই আছে, এটুকু মাথায় রেখেই বলছি সাধারণ মানুষের ধোলাই করা মগজকে পাল্টা ধোলাই করার সামান্যতম সুযোগ ছাড়াও উচিত হবে না।

এরই পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব লেখক তৈরি করতে, সম্পাদক তৈরি করতে স্থানীয মানুষদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বাড়াতে, স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে ভাব বিনিময় করতে, তাঁদের ভাববাদ-বিরোধী লেখা-পত্তরের সঙ্গে পরিচিত করাতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলো আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হলে নিশ্চয়ই তারা পারবে ভাববাদ-বিরোধী, কুসংস্কার বিরোধী বুলেটিন, পত্র- পত্রিকা, বই ইত্যাদি প্রকাশ করতে ; তা সে যতই অকিঞ্চিৎকরই হোক না কেন, যত কৃশ কলেবরেই হোক না কেন। এখান থেকেই আমরা জ্বালাব মনুষ্য চেতনায় জ্ঞানের আলো। এখান থেকেই আমরা তৈরি করব আমাদের নিজস্ব ‘রবীন্দ্রনাথ,’ ‘আমাদের নিজস্ব ‘সত্যজিৎ’।

সাধারণ মানুষের কাছে আমাদের লেখাপত্তার, বক্তব্য, নাটক ইত্যাদিকে গ্রহণযোগ্য করতে হলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমাদের কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ বাড়াতে হলে আমাদের লেখাপত্তরকে এতটাই আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে যাতে পাঠক- পাঠিকারা আপন তাগিদে ওইসব লেখাপত্তর পড়তে উৎসাহিত হন। যে মানুষদের সামনে পৌঁছতে চাইছি, যাদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে চাইছি। তাদের ভাললাগা না লাগার খবরও আমাদের রাখতে হবে; বুঝতে হবে তাদের মনস্তত্ব।

রাজনৈতিক শ্লোগানধর্মী নাটক, গল্প, উপন্যাস মানুষকে সাধারণভাবে টানতে পারছে না। পুজো প্যান্ডেলে মার্কসবাদী সাহিত্যের স্টলে রাজনৈতিক দলের কর্মীদের ভিড় যতটা থাকে ক্রেতাদের ভিড় ততটা থাকে না। এর একটাই কারণ, সাধারণ মানুষকে এসব আকর্ষণ করতে পারছে না। এই জাতীয় অনেক বইই ভারি ভারি শব্দে এতই ভারাক্রান্ত যে সাধারণ মানুষ সভয়ে ও-সব লেখাপত্তর এড়িয়ে চলেন

আমরা ‘ছোটি-বাড়ি বাঁতে এর মতন অতি সফল টি.ভি. সিরিয়াল দেখেছি, যেখানে : হাঁচি কাশি টিকটিকির ডাকের মতন নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বক্তব্য এসেছে জমাটি কাহিনীর সঙ্গে। আমরা ‘রজনী’ হিন্দি টিভি সিরিয়ালের প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা অর্জনের ইতিহাসও জানি। রজনীর বিপুল জনপ্রিয়তায় নায়িকা প্রিয়া তন্ডুলকরকে তাঁর পরিচিত মানুষরাও ডাকতে শুরু করেছিলেন রজনী নামে। সেখানেও এসেছে বুজরুকের ভাঙাফোড় করার কাহিনী। জ্ঞান দিচ্ছে বলে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। গ্রহণ করেছে। বিষয়বস্তুর আকর্ষণীয়তাই এগুলোকে সাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছে।

ঢাল তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দাবের গল্প আমরা জানি, আমাদের ভাববাদ-বিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনকর্মীদের অবস্থাও অনেকটা ঢাল তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারের মত। আমাদের না আছে একজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, না একজন বিভূতি বাড়বে। ফলে আমাদের অনেকের হাতেই নিপীড়িত মানুষের কথা বেরিয়ে আসছে শ্লোগান হয়ে। পরমান্ন রাঁধতে গিয়ে আমরা যদি লঙ্গরখানার খিচুড়ি রেঁধে বসি, তাহলে মানুষ মুখে তুলবে কেন ?

শহরে গ্রামে যেদিকেই তাকান দেখতে পাবেন সিনেমা ও ভিডিওর রমরমা ব্যবসা। শহরের বস্তিবাসী থেকে গ্রামের গরীব চাষার প্রধান বিনোদন এই সিনেমা, ভিডিও । ওরা হলে এসে ভুলে যেতে চায় ওদের সমস্ত বঞ্চনার কথা, দৈনন্দিন দুঃখ দারিদ্রের কথা। ওরা আসে সব কিছু ভুলে কিছুক্ষণের আনন্দে ডুবে থাকতে। হতদরিদ্র মানুষগুলোকে নিয়ে তোলা সিনেমা তাই গরীব মানুষদের তেমন টানে না।

‘রজনী’তে গরীবদের নিয়ে অনাকর্ষণীয় কোনও প্যানপ্যানানি ছিল না, ছিল সমাজের নানা সমস্যা এবং সেইসব সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করে মোকাবিলা করার শিক্ষা ৷

‘ছোটি বড়ি বাঁতে’ তে পাজি— পুথি- মঘা-এ্যহস্পর্শ-বারবেলা মান্য করা, বৃহস্পতিবার ও শনিবার ক্ষৌরকর্ম না করা, পিছু ডাক, হাঁচি, টিকটিকির ডাক ইত্যাদি মেনে চলাকে হাসির খোরাক করা হয়েছে এবং দর্শকরা তা দারুণভাবে উপভোগ করেছে। এই সিরিয়ালের চরিত্রগুলো কিন্তু শোষিত মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করেনি । কিন্তু সিরিয়াল থেকে উঠে এসেছিল আমাদেরই কথা। এই ধরনের কুসংস্কার মেনে চলাটা নেহাৎই হাসির খোরাক হওয়া— এই প্রচার লাগাতারভাবে চালাতে পারলে এই সব কুসংস্কার না মানাটাই বহু মানুষের ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’ হয়ে দাঁড়াত।

আমার এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে গল্পে উপন্যাসে নাটকে গরীব অত্যাচারিত মানুষদের চরিত্রগুলোকে নিয়ে আসা নিয়ে সামান্যতম বিরোধীতা করছি না। এইসব চরিত্র-চিত্রণ করতে গিয়ে বিষয়বস্তু আকর্ষণ হারালে আমাদের উদ্দেশ্য সাধিত হবে না— এই সত্যটুকুর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে চাইছি শুধু। বলতে চাইছি- লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকলে নানা আকর্ষণীয় ভাবেই হাজিব করা যেতে পারে আমাদের বক্তব্য।

২। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রচার ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের দেশের জনসমষ্টির সিংহভাগই বই পড়ার মত লেখা-পড়ার সুযোগলাভে অক্ষম। এদের কাছে আমরা আমাদের লেখাপত্তর নিয়ে হাজির হতে পারব না। আমরা সাধারণ মানুষের চেতনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াব জন্য শুধুমাত্র আমাদের লেখাপত্তরের ওপর নির্ভর করলে দেশের বৃহত্তর জনসমষ্টি পিছিয়েই থেকে যাবে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলে আদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে আমবা কাজে লাগাতে পারি নাটক, যাত্রা, গান, এবং ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ শিরোনামে বিভিন্ন অলৌকিক ক্ষমতার রহস্য ফাঁস করে।

আমরা সকলের কাছেই হাজির হবো। যেখানেই মানুষ, সেখানেই হাজির হবো। যে সংস্থাই আমন্ত্রণ জানাক, আমরা যাব- তা সে দক্ষিণ, অতিদক্ষিণ, বাম, অতিবাম – যেই ডাকুক না কেন। যুক্তিবাদ প্রসারে ব্রতী সংস্থাগুলোর একটু জরুরী কাজ হবে তাদের এলাকার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও ক্লাবগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সহায়তায় নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জন-চেতনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা এবং একই সঙ্গে এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আরো নতুন নতুন মানুষকে এই আন্দোলনের শরিক করা, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা।

৩। ভাববাদী বইপত্তরের তুলনায় ভাববাদ-বিরোধী বা যুক্তিবাদী বই পত্তরের সংখ্যা অতি নগণ্য। ভাববাদী মানসিকতা ঠেকাতে ও যুক্তিবাদী চেতনা বাড়াতে সাধারণ মানুষের মধ্যে হাজির করতে হবে যত বেশি কবে সম্ভব যুক্তিবাদী বইপত্তর। এই দায়িত্ব পালন করতে হবে আপনাকে আমাকে প্রতিটি দেশপ্রেমিককে। আসুন আমরা আজই কেন প্রতিজ্ঞা করি না— শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে যে সংস্কার-মুক্তির প্রয়োজন তারই স্বার্থে আমরা বেঁচে থাকার জন্যেই প্রয়োজন ভেবে সংস্কার-মুক্তির বই কিনব, বই পড়ব, বই পড়াব এবং বই উপহার দেব।

৪। যুক্তিবাদী আন্দোলনে সামিল সংস্থা ও গণসংগঠনগুলোর একান্ত কর্তব্য হওয়া উচিত কর্মীদের তৈরি করে তোলার জন্য নিরন্তর ‘স্টাডি ক্লাস’ করা। কীভাবে স্টাডি ক্লাসগুলো চালাতে হবে, এই নিয়ে দ্বিতীয় খণ্ডে আলোচনা করেছি বলে আবার বিস্তৃত আলোচনায় গেলাম না।

৫। কোনও সাংস্কৃতিক বা যুক্তিবাদী সংস্থা কোনও ধরনের কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হলে বা কোনওভাবে আক্রান্ত হলে তাঁরা সমমনোভাবাপন্ন মানুষ ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করে তাদের পরামর্শ, সাহায্য ও সহযোগিতা গ্রহণ করুন। একইভাবে কোনও আক্রান্ত সংস্থা যোগাযোগ করলে সমস্ত রকমভাবে আপনারা প্রত্যেকে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই-এ জয় ছিনিয়ে নিয়ে আসুন । যদি সংস্কারের শেকল ভাঙতে গিয়ে আক্রান্ত হন— অঙ্গীকারবদ্ধ রইলাম আমাদের সমিতি তার সমস্ত শাখা সংগঠন ও সহযোগী সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে আপনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়বে ।

৬। গণ-সংগঠণগুলোর কর্মীদের এমনভাবে তৈরি করতে হবে, এবং এমন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এগুতে হবে যাতে নেতৃত্বের চ্যূতি, ভ্রান্তি বা বিপথগামীতার ক্ষেত্রে সদস্যরা নেতাদের সমালোচনা করতে পিছ-পা না হয় ।

৭। সমালোচনা যিনিই করবেন তাঁকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে সমালোচনার লক্ষ্য যেন হয় সংগঠনের উন্নতি এবং আন্দোলনের শ্রীবৃদ্ধি ।

সমালোচনা হবে খোলাখুলি এবং অবশ্যই সংগঠনের মধ্যে। কোনও বিষয়ে আলোচনায় মতপার্থক্য অবশ্যই থাকতে পারে। শেষ পর্যন্ত সংগঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের মতামতই প্রত্যেককে মেনে চলতে হবে সংগঠনের স্বার্থে। সংগঠনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই শুধু নিজস্ব মতামত থাকতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর সংগঠনের বাইরে কেউ এই বিষয়ে সমালোচনা করলে সেটা সংগঠন-বিরোধী কাজ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত। সংগঠনের বাইরে সামালোচনাকারীকে প্রয়োজনে সংগঠনের স্বার্থেই সংগঠন থেকে বের করে দিতে হবে, তা সেই সমালোচক সংগঠনের যত উচ্চ-পদাধিকারীই হোন না কেন ।

মধ্যবিত্তসুলভ মানসিকতার দরুণ অনেক সময়ই সমালোচনা হয়ে পড়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন ; কখনও সমালোচনা উঠে আসে ব্যক্তিত্বের সংঘাত থেকে, কখনও ঈর্ষাপরায়ণতা থেকে। সমালোচনা হওয়া উচিত সংগঠনের স্বার্থে ইতিবাচক। শুধুমাত্র নেতিবাচক বা নাকচ করে দেবার সমালোচনা অর্থহীন হয়ে পড়ে, যদি না পরবর্তী পথনির্দেশ দেওয়া হয়। দায়িত্বজ্ঞানহীন সমালোচনা সংস্থায় বিশৃঙ্খলাই শুধু টেনে আনতে পারে।

৮। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বিষয়ে স্পষ্ট স্বচ্ছ ধারণা থাকলে কোনও শক্তির সাধ্য নেই মগজ ধোলাই করে বিপথে চালিত করে। সংগঠনের প্রয়োজনেই নেতৃত্বের অবশ্য কর্তব্য আন্দোলনকর্মীদের ধাপে ধাপে শিক্ষিত, নিবেদিতপ্রাণ করে তুলে প্রত্যেককে এক একজন সংগঠক, সংগ্রামী করে তোলা। তাঁদের দৃঢ় মতাদর্শগত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া। মতাদর্শগত ভিতই উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যের দিকে আন্দোলনকর্মীদের চালিত করবে ।

৯। সংগঠন যাঁদের নিয়ে গড়ে উঠবে তাঁরাই সংগঠনকর্মী বা আন্দোলনকর্মী। আর নেতা তিনি, যিনি নিজে যে কোনও ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং আন্দোলনকর্মীদের বিশ্লেষণ-পরবর্তী করণীয় বিষয়ে সঠিক নির্দেশ দিতে সক্ষম। এরই পাশাপাশি নেতাকে হতে হবে সৎ, আবেগহীন, আত্মবিশ্বাসী, বিনয়ী, জনসাধারণের সঙ্গে আন্তরিকভাবে মিশতে সক্ষম, আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বিষয়ে সচেতন ও কৌশলগত দিক বিষয়ে ওয়াকিবহাল।

ভারি ভারি নাম বা বড় বড় ডিগ্রী দেখে নেতা বাছবেন না। নেতা বাছুন কাজে মানুষ বিচার করে। যে যত বেশি দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবে, যত বেশি আন্তরিক হবে, ততই সে অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্যে দিয়েই নেতৃত্বের গুণগুলোকে অতি স্বাভাবিকভাবেই অর্জন কবে নেবে।

১০। আন্দোলনকর্মীদের মধ্যে অনেক সময়ই এই জিজ্ঞাসা দেখা দিতে পারে— আমাদের আন্দোলনকে আঘাত করতে যদি রাষ্ট্রশক্তিই হাজির হয, তবে কী আমরা আন্দোলনকে শেষ জয় এনে দিতে পারব ? অথবা কখনও যদি এমন প্রশ্ন হাজিব হয়, গোটা ভারত বা গোটা পৃথিবীর মানুষ কুসংস্কারমুক্ত হয়ে তাদের শোষণের পদ্ধতিগুলো ধরে ফেলে বর্তমান সমাজ-কাঠামোটাই পাল্টে দিতে লড়াইয়ে সামিল হবে, অধিকার ছিনিয়ে নিতে সোচ্চার হবে– এ এক অবাস্তব কল্পনা নয় তো? তখন প্রশ্নকর্তাদের দৃষ্টির কুয়াশা কাটিয়ে আলো দেখাতে দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরুন আমাদেরই দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠির সংগ্রামী ইতিহাস। বুঝিয়ে দিন আন্দোলনের শরিক যেখানে কোনও জনগোষ্ঠির বৃহত্তর অংশ, সেখানে আন্দোলন শেষ করার সাধ্য পৃথিবীব কোনও রাষ্ট্রশক্তিরই নেই। একটি অঞ্চলের জনগোষ্ঠিকে যুক্তিবাদী চেতনার আলোকে আলোকিত করা নিশ্চয়ই অসম্ভব কোনও কাজ নয়। কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করুন ; আন্দোলনকর্মীরা উদ্দীপ্ত হলে জনগণকে সচেতন করা, সংগঠিত করার কাজটা অতি সহজ হয়ে যায়।’

১১। সাধারণ ভাবে ধর্ম ধর্মনিরপেক্ষতা, দেশপ্রেম, বিছিন্নতাবাদ, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিষয়ে যে সব ধ্যান ধারণা শোষকশ্রেণী তাদের তাঁবেদার রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও প্রচার মাধ্যমগুলোর সাহায্যে প্রচার করে চলেছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা যুক্তি হাজির করুন। ওদের যুক্তিকে সুযোগ পেলেই আক্রমণ চালিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক চিন্তাগুলো পৌঁছে দেবার চেষ্টা করুন। এতদিনকার কুযুক্তির বিরুদ্ধে কোনও সুযুক্তি হাজির হয়নি বলেই সাধারণ মানুষ মগজ ধোলাইয়ের শিকার হয়েছেন। সুযুক্তি পেলে সাধারণ মানুষ তা অবশ্যই গ্রহণ করেন, আমাদের সমিতির অভিজ্ঞতা তাই বলে।

১২। শুধু নাকচ বা বর্জনের ওপর কোনও কিছুর স্থায়ী ভিত গড়ে উঠতে পারে না। বর্তমান সমাজের নেতিবাচক দিকগুলোর নিশ্চয়ই সমালোচনা করতে হবে, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে, জনমত গড়তে হবে। কিন্তু তারই পাশাপাশি ইতিবাচক, গঠনমূলক পথও দেখাতে হবে।

আমাদের অশ্রদ্ধা পুরনো সবকিছুর প্রতি নয়, আমাদের
অশ্রদ্ধা যুক্তিহীনতার প্রতি। আমাদের শ্রদ্ধা যা নতুন তার
প্রতি নয়, আমাদের শ্রদ্ধা যুক্তির প্রতি।

১৩। যুক্তিবাদী আন্দোলন সঠিক পথে চললে যাদের স্বার্থে এই আন্দোলন আঘাত করবে তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। তারা প্রত্যাঘাত হানবেই। এই প্রত্যাঘাত বোঝার সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষ। তারই পাশাপাশি একথাও মনে রাখতে হবে সংগঠন যদি বাস্তবিকই সংগ্রামী মানুষদের নেতৃত্ব দিতে যায়, তবে সেই সংগঠনের অনেক কিছুর ক্ষেত্রে অবশ্যই গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।

গোপন সংগঠন সম্পর্কে একটা অদ্ভুত ধারণা সাধারণের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন সংগঠনের কয়েকজন নেতা আত্মগোপন করলেই বুঝি ‘গোপন সংগঠন’ হয়। গোপন সংগঠন চোরের মতন লুকিয়ে লুকিয়েও করতে হয় না । সংগঠনের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য এ-সব কোনও কিছুরই প্রয়োজন হয় না। বরং সাধারণভাবে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীরা আত্মগোপন করলে সাধারণ কর্মীদের থেকে তাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আর আত্মগোপনকারী নেতা গণ-সংগঠনের কাজ চালাতে গেলে ধরা পড়বেনই। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবী, সংবাদিক, সাহিত্যিক ইত্যাদি বহু পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য একদল কর্মী তৈরি করতে হবে। এঁরা বিভিন্ন পেশার মানুষ হতে পারেন, এঁদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে প্রতিটি লড়াইতে জনসমর্থন পাওয়া সহজতর হবে ।

১৪। গণ-সংগঠন সর্বস্ব আন্দোলনের ক্ষেত্রে যে-সব অসুবিধে দেখা দিতে পাৱে, সেগুলো নিয়েও অবশ্যই সচেতন থাকা প্রয়োজন :

ক) আন্দোলন তীব্রতর হলে শোষক ও শাসকশ্রেণী সমস্ত গণ-সংগঠনগুলোকেই চরবৃত্তির কাজে লাগাতে চেষ্টা করে। গণ-সংগঠনের নেতাদেব লোভ, ভয়, ইত্যাদির দ্বারা কিনে ফেলার চেষ্টা চলে।

খ) গণ-সংগঠনের অনেক নেতৃত্বই কম ত্যাগ ও কম ঝুঁকি নিয়ে বেশি রকম আত্মপ্রচারে উৎসাহী হয়ে পড়ে ।

গ) সরকারী-বেসরকারী সাহায্য ও প্রচারের মোহে বাঁধা পড়ে অনেক নেতৃত্বই কথায় ও কাজে দুই মেরুতে অবস্থান করতে শুরু করেন। নেতা বিক্রী হয়ে যাওয়ায় সংগঠন ভুল পথে চালিত হতে থাকে, প্রকৃত আন্দোলনের শত্রুতা করতে থাকে।

ঘ) গণ-সংগঠনের নেতারা অনেক সময় যুক্তিবাদী আন্দোলনের আদর্শগত দিকটা আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ না করে কিছুটা হুজুগেও যুক্তিবাদী আন্দোলনের শরিক হতে এগিয়ে আসতে পারে। আর হুজুগে আন্দোলনে ঢুকে পড়া গণ-সংগঠনের নেতারা যা খুশি তাই করে ফেলতে পারে।

১৫। আন্দোলনের স্বার্থে সমমনোভাবাপন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিজ্ঞান ক্লাব, যুক্তিবাদী আনেদালনে সামিল সংস্থাগুলোর উচিত নিজেদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা। সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধিত হলে প্রতিটি আক্রমণের, প্রতিটি সমস্যার মোকাবিলায় সমস্ত সংগঠন একত্রিত হতে পারবে অতি দ্রুত। সকলে কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে লড়লে লড়াই জেতা, সমস্যা ডিঙিয়ে যাওয়া সহজতর হয়।

ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি বহু সংগঠনের সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। আরও বেশি বেশি করে সংগঠন এগিয়ে এলে প্রত্যেকের কাছেই উদ্দেশ্য পৌঁছন সহজতর হবে।

কোনও সংগঠনের স্বাধীনতায় হাত না দিয়েই যুক্তিবাদ প্রসার, কুসংস্কার-মুক্তি, মরণোত্তর দেহদান, স্বাক্ষরদান, প্রগতিশীল নাটক, গান এবং আরো কিছু ‘কমন’ কর্মসূচীর ভিত্তিতে আমরা একত্রিত হয়েছি। আমাদের সম্মিলিত ও পরিকল্পিত প্রয়াসই এমন একটা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে, যাতে বর্তমান সমাজের মূল কাঠামোই আন্দোলিত হতে পারে, নাড়া খেতে পারে। আর তারপর আন্দোলনে সামিল জনগণই সৃষ্টি করবে এক নতুন ইতিহাস, জাগরণের ইতিহাস ।

১৬। যুক্তিবাদী আন্দোলনকে জোরদার করতে আসুন না কেন, প্রতিটি যুক্তিবাদী আন্দোলন প্রসারকামী মানুষ ও সংস্থা বছবের একটি দিনকে, ১ মার্চ দিনটিকে ‘যুক্তিবাদী দিবস’ হিসেবে পালন করে যুক্তিবাদী আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত করি। এই দিনটিতে আমরা প্রতেকে অন্ততঃ সংস্কার মুক্তির সহায়ক, যুক্তি নির্ভর কিছু লিখি, কিছু পড়ি, অথবা কিছু আলোচনা করি। সাংস্কৃতিক আন্দেলনে অগ্রনী সংস্থাগুলো ওই দিনটিতে নানা ধরণের কার্যক্রম গ্রহণ করে নিশ্চয়ই যুক্তিবাদী আন্দোলনে প্রচন্ড গতি সঞ্চার করতে পারি। ‘৯২-এর ১ মার্চ ভারত ও বাংলাদেশের এক হাজারটির ওপর সংস্থা ‘যুক্তিবাদী দিবস’ পালন করবে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের যুক্তিবাদী মানুষও ওই দিনটি ‘যুক্তিবাদী দিবস’ হিসেবে পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আপনি আমিই পারি ১ মার্চকে আক্ষরিক অর্থে ‘আন্তর্জাতিক যুক্তিবাদী দিবস’ করে তুলতে।

আমি অতি-সচেতনভাবেই মনে করি, এ-দেশের বর্তমান সমাজের হুজুর-মজুর সম্পর্কযুক্ত ব্যবস্থাই আমাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা। আর এই শোষক-শোষিতের সামাজিক কাঠামো টিকে রয়েছে মানুষের অন্ধ-বিশ্বাস, কুসংস্কার ও অসংস্কৃতির এক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করে, তাকে পরিপুষ্ট করে। সমাজ-বিজ্ঞান ও বাস্তব-ঐতিহাসিক পরিস্থিতি নিয়ে সুগভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এই সত্যটি অবশ্যই বেরিয়ে আসে — অন্ধ বিশ্বাসজাত কুসংস্কার ও অসংস্কৃতির পরিমণ্ডল অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে এদেশের আর্থিক কাঠামো এবং শোষক-শোষিতের শ্রেণীবিন্যাসের সঙ্গে, এবং এরা পরস্পর পরস্পরের পরিপূরকও বটে। অর্থাৎ এ-দেশের আর্থিক কাঠামোকে নিম্নস্থ কাঠামো বা ভিত্তি-কাঠামো

(infrastructure) আর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকে উপরি কাঠামো (superstructure) বলে ভাবলে ভুলই ভাবা হবে। অন্ধ-বিশ্বাস ও কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে উঠে আসা ভ্রান্ত-চেতনাপ্রসূত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো এ-দেশে অবশ্যই ভিত্তি-কাঠামোর সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকার প্রসঙ্গ ‘অলৌকিক নয, লৌকিক’ বইটির তিনটি খণ্ডেই ঘুরে-ফিরে বারবার এসেছে ; এত যুক্তি হাজির হয়েছে যে আবাব নতুন করে এই বক্তব্যের সমর্থনে যুক্তি হাজির করার অর্থ হয়ে দাঁড়ায়—পাঠক-পাঠিকাদের বোধশক্তির প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করা। এই তিন খণ্ড আলোচনার শেষে নিশ্চয়ই এখন আমরা সুনিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি –

হুজুর-মজুর সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে নতুন সমাজ গঠনের
আগে এবং পরে এ-দেশে সাংস্কৃতিক বিপ্লব একইভাবে
প্রয়োজনীয়: প্রগতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এবং ধরে
রাখতেই এর প্রয়োজন ।

কোনও কোনও পাঠক-পাঠিকার মনে হতে পারে ‘কিছু কথা’ শিরোনামে লেখা ভূমিকাটিতে ‘মগজ ধোলাই’ প্রসঙ্গ নিয়ে এত বিস্তৃত আলোচনা কতটা প্রাসঙ্গিক ? যুক্তিবাদী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবার তাত্ত্বিক ও প্রয়োগ-কৌশল নিযে আলোচনাকে টেনে আনাই বা কতটা সঙ্গত হয়েছে ? শ্রদ্ধেয় পাঠক-পাঠিকাদের কারো কাছে এমন আলোচনা ধৈর্য-চ্যুতি ঘটিয়ে থাকলে আস্তবিকতার সঙ্গে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি; সেই সঙ্গে কৈফিয়ৎ হিসেবে জানাচ্ছি, ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ বইটিকে শুধুমাত্র অলৌকিক বহস্য-জাল ছিন্ন করার তথ্যে ঠাসা বই করতে চাইনি। আমার চাওয়াটা এর চেয়ে আরও কিছু বেশি। তাই যুক্তিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলাব স্বার্থে যে বিষয়গুলো নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করা একান্ত প্রয়োজন মনে করেছি, যে বিষয়গুলো নিয়ে স্পষ্ট ও স্বচ্ছ ধারণা থাকা একান্তই আবশ্যক বিবেচনা করেছি, সে-সব বিষয়ের অনেক কিছুই ‘কিছু কথা’য় এনেছি; বাকি আনব পরবর্তী খণ্ডেও। প্রথম খণ্ডের ‘কিছু কথা’ দিয়ে যে সচেতন পরিক্রমা শুরু করেছি, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ডের ‘কিছু কথা’ তাব সঙ্গে একান্তভাবেই সম্পর্কযুক্ত।

আমার লেখা থেকে তাত্ত্বিক ও প্রযোগের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সহযোদ্ধারা উপকৃত হলে আমিই হবো পৃথিবীর সুখীতম মানুষ ।

আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই এ-দেশ ও এ-দেশের বাইবের সহযোদ্ধা ও সহমতের সাথীদের। কৃতজ্ঞতা জানাই তাঁদের উদ্দেশ্যেও, যাদের প্রতিটি যোগাযোগ, প্রতিটি উষ্ণ অভিনন্দন, প্রতিটি গঠনমূলক সমালোচনা, প্রতিটি উপদেশ, প্রতিটি সাহায্য ও সহযোগিতা আমাকে ও সমিতিকে এগিয়ে যেতে প্রেরণা দিয়েছে, সাহস জুগিয়েছে, গতিশীল রেখেছে।

ক্ষমাপ্রার্থী তাঁদের কাছে, যাঁদের কাছ থেকে নিয়েছিই শুধু, কিন্তু দিতে পারিনি চিঠির উত্তরটুকুও। পত্র-লেখক-লেখিকাদের কাছে বিনীত অনুরোধ- চিঠির সঙ্গে অনুগ্রহ কবে একটি জবাবী খামও পাঠাবেন।

এমন কিছু চিঠির উত্তর দিতে পারিনি, যার উত্তরে বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজন ছিল, যা চিঠির স্বল্প পরিসরে সম্ভব ছিল না। পরবর্তী খণ্ডে সে-সব উত্তর নিয়ে নিশ্চয়ই হাজির হবো।

সংগ্রামেব সাথী, প্রেরণার উৎস প্রত্যেককে জানাই সংগ্রামী অভিনন্দন।

যুক্তিবাদী আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন জয়যুক্ত হবেই ।

প্রবীর ঘোষ

৭২/৮ দেবীনিবাস বোড

কলকাতা-৭০० ০৭৪