১৯৮৬-র ২৮ ফেব্রুয়ারী। আগরতলা প্রেস ক্লাবের হলে একটা প্রেস কনফারেন্স ছিল ‘অলৌকিক নয়, লৌকিক’ শিরোনামের অলৌকিক বিরোধী এই প্রেস কনফারেন্সে যোগ দিতে আমি তিনদিন আগেই আগরতলা পৌছোই। সেখানে এক সাংবাদিক বন্ধু আমাকে প্রথম ফুলবাবুর কথা বলেন। তাঁর কথামতো ত্রিপুরার সবচেয়ে ক্ষমতাবান অবতার এই ফুলবাবা। ইতিমধ্যে স্থানীয় তিনটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক ও কিছু সংগঠন এবং সেই সময়কার ত্রিপুরা বিধানসভার উপাধ্যক্ষ বিমল সিনহা ফুলবাবার বিপুল জনপ্রিয়তার কথা বলেছিলেন।

শনি, মঙ্গলবার সকাল থেকেই ফুলবাবার আশ্রম ঘিরে বিশাল ভিড় জমে ওঠে। দূর-দুরান্ত থেকে মানুষ আসেন রোগ মুক্তির আশায় ও বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের আশায়। কামদেবপুরের পীরের মতোই এখানেও দর্শনার্থীরা সকালে নাম লিখিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। দুপুর থেকে দর্শনার্থীদের ডাক পড়তে থাকে। ফুলবাবাও ফকির বাবার মতোই ভক্তদের নাম শুনেই বলে দিতে থাকেন কি সমস্যা নিয়ে তাঁরা এখানে এসেছেন। কাউকে হয়তো বলেন, “কীরে, মায়ের অসুখ?” আবার কাউকে বলেন, “অফিসের কাজে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে, না রে?”

অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় ফুলবাবা কৃপাপ্রার্থীদের মনের কথাই বলে দিয়েছেন। যাঁদেরটা মেলে তাঁরা ফুলবাবার এমন অলৌকিক ক্ষমতা দর্শনে মুগ্ধ হয়ে বাবার মহিমা প্রচারে নেমে পড়েন। স্বভাবতই বাবার জীবন্ত কিংবদন্তি হতে অসুবিধে হয় না।

কামদেবপুরের ফকিরবাবা

বাবাকে একটু নেড়েচেড়ে দেখার ইচ্ছেয় ২৭ ফেব্রুয়ারী এক স্থানীয় সাংবাদিক পারিজাতকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হলাম ফুলবাবার ডেরায়। যদিও সেদিন বৃহস্পতিবার, তবু ভিড়ের খামতি ছিল না। ফুলবাবা মন্দিরের সামনের চাতালেই বসেছিলেন। সাংবাদিক বন্ধুটি ফুলবাবাকে প্রণাম করে নিজের পরিচয় দিয়ে আমার সঙ্গে পরিচয় করালেন। আমার পরিচয় দিলেন সাহিত্যিক-সাংবাদিক হিসেবে। বাবাকে প্রণাম করলাম। বাবা আমার সারা শরীরে চোখ বোলালেন। আমার গলায় ও আঙ্গুলে ছিল ঘণ্টা কয়েক আগে ধার করে পরা রুদ্রাক্ষের মালা ও প্রবালের আংটি। বাবা ও দুটি দেখে নিশ্চিন্ত হলেন আমি নাস্তিক নই। বাবা আশীর্বাদ করে বসতে বললেন।

ফুলবাবার সঙ্গে কথা বলে তাঁর সম্পর্কে কিছুকিছু শুনলাম। বর্তমান বয়স ৫৬। আদি নিবাস বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। আগরতলায় চলে আসেন ২২/২৩ বছর আগে। সাধকজীবনের আগে নাম ছিল শান্তিকুমার দে। মহারাজ অদ্বৈতানন্দ পুরীর কাছে দীক্ষা। ফুলবাবার আশ্রমে রয়েছ্যে ভুবনেশ্বরী দেবীর মূর্তি। মা ভুবনেশ্বরীই ফুলবাবার একমাত্র আরাধ্যা দেবী। মা ভুবনেশ্বরীর অপার কৃপার ফুলবাবা যে কোনও মানুষের ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দেখতে পান। মায়ের কৃপাতেই মানুষের সমস্যার সমাধান করেন।

শাক্ত হলেও ফুলবাবার কথায় ছিল বৈষ্ণবের পেলবতা। বাবার আদেশমতো একজন  ইতিমধ্যে রেকাবিতে প্রসাদি সন্দেশ নিয়ে এলেন। সন্দেশ আর জলপানের পর আমার সমস্যার কথা বললাম। -রোজগারপাতি মন্দ করছি না। একটা ফ্ল্যাটও কিনেছি। ঘর হলেও ভাগ্যে এখন ঘরণী জোটেনি। একটি মেয়েকে ভালবাসতাম। বছর তিনেক আগে ওর সঙ্গে আমার বিয়ের তারিখ ঠিক হল। তার কয়েক দিনের মধ্যেই ওর ক্যানসার ধরা পড়ল। মাস তিন-চারেকের মধ্যে বেচারা মারা পড়ল। এরপর আরও দু’জায়গায় বিয়ের কথা কিছুটা এগোলেও শেষ পর্যন্ত ম্যাচিওর করেনি। যথেষ্ট বয়েসও হয়েছে।

ফুলবাবা অভয় দিলেন। দুর্ভোগ দিন শেষ হয়েছে। এবার ভোগের দিন শুরু। আর তাই তো মা ভুবনেশ্বরী আপনাকে আজকে টেনে এনেছেন। যার সঙ্গে আপনার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, তিনি সমস্ত দিক থেকেই ছিলেন আপনার উপযুক্ত। আপনারা দু’জনেই দু’জনকে গভীরভাবে ভালবাসতেন। যিনি দেওয়ার তিনিই তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন। তিনিই আবার দেবেন। আগামী ১৯৮৭-র আগস্টের মধ্যে আপনার বিয়ে হবে। ভাল বিয়ে।

ফেরবার পথে সাংবাদিক বন্ধুটিকে দেখলাম ফুলবাবার ক্ষমতার দৌড় দেখে অবাক। আমার অবশ্য অবাক হওয়ার মতো কিছু ছিল না। জানতাম, আমার বলা কথাগুলো যে পুরোটাই গপ্পো, সেটুকু ধরার মতো অলৌকিক ক্ষমতা আর সব অবতারদের মতোই ফুলবাবারও নেই। আমি বিবাহিত, একটি পুত্রের পিতা। ফ্ল্যাট কিনিনি। এবং প্রসঙ্গত জানাই ’৮৯-এর এই ডিসেম্বরেও আমার নতুন করে কোনও বিয়ে হয়নি। প্রেমিকার ক্যানসারে মৃত্যু? সেটাও নিছকই গপ্পো কথা।

২৮ ফেব্রুয়ারীর প্রেস কনফারেন্সে বিভিন্ন আলোচনার মাঝে ফুলবাবার প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলাম, “আপনাদের অনেকের কাছেই ফুলবাবা জীবন্ত অলৌকিকতার প্রতীক। তাঁর কাছে আপনাদের কেউকেউ হয়ত ফুলবাবার কাছে ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে হাজির হয়ে অবাক বিস্ময়ে দেখেছেন, আপনার আসার উদ্দেশ্য ফুলবাবার অজানা নয়। আপনাদের কারও কারও একান্ত ব্যক্তিগত কিছু অতীত ঘটনাও ফুলবাবা বলে দিয়েছেন, এই অভিজ্ঞতাও বোধহয় এখানে উপস্থিত কারও কারও আছে।

আপনারা নিশ্চয়ই ভেবেছেন –আমাকে তো ফুলবাবা আগে থেকে চিনতেন না। তবে কি করে তিনি আমার আসার উদ্দেশ্য, অতীতের ঘটনা সবই ঠিক-ঠাক বলে দিলেন? শেষ পর্যন্ত আপনাদের যুক্তিতে এর কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে না পেয়ে ধরে নিয়েছেন ফুলবাবা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী।

ত্রিপুরায় আমি নির্ভেজাল আগন্তুক। সদ্য দিন দু’য়েক হল এসেছি। উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে হাতে গোনা দু’চারজন ছাড়া সকলেই আমার পরিচিত। অপরিচিত দর্শকদের কাছে অনুরোধ, আপনারা যারা নিজেদের অতীত আমার মুখে শুনতে আগ্রহী, হাত তুলুন। পরিচিতদের প্রতি অনুরোধ, আপনারা অনুগ্রহ করে হাত তুলবেন না। অবশ্য এই পরিচিতদের সঙ্গেও পরিচয় ঘটেছে মাত্র দিন দু’য়েক। অতএব তাঁদের অতীতের খুঁটিনাটি জানার মতো সময়-সুযোগ এখনও ঘটেনি।

বিরাট সংখ্যক দর্শক হাত তুললেন। বললাম, আপনাদের সবার অতীত বলতে গেলে তো রাত কাবার হয়ে যাবে। তারচেয়ে বরং আপনারাই ঠিক করুন, কার অতীত বলব। আপনারা যারা হাত তুলেছেন, ব্যবস্থাপকরা আপনাদের প্রত্যেকের হাতে এক টুকরো করে কাগজ তুলে দেবে। আপনারা তাতে নিজেদের নাম লিখে ফেলুন।“

একটা ফাঁকা বাক্স দেখিয়ে বললাম, “আমি এই বাক্সটা নিয়ে আপনাদের কাছে যাচ্ছি। আপনাদের নাম লেখা কাগজের টুকরোগুলো এই বাক্সতে ফেলুন।“

তাই হল। এবার দর্শকদের অনুরোধ করলাম, “আপনাদের মধ্যে থেকে একজন কেউ আসুন, এবং চোখ বুজে এই নামগুলো থেকে একটা নাম তুলে দিন।“

একজন এলেন। নাম তুললেন। বললাম, “এবার নামটা পড়ে শোনান।“

তিনি পড়লেন। বললাম, “যার নাম পড়া হল তিনি এবার উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে মাইক্রোফোনের একটা মাউথ-পিস ধরিয়ে দিলাম।

বললাম, “আমি এবার আপনার অতীত সম্পর্কে বলতে শুরু করছি। মিললে হ্যাঁ বলবেন। না মিললে না।“

আমি শুরু করলাম, “আপনি কি ১৯৭৩ সালে চাকরি পেয়েছেন?”

-“হ্যাঁ।“

-“বিয়ে’ ৮০ তে।“

-“হ্যাঁ।“

-“৮২-তে পুত্রলাভ?”

-“হ্যাঁ।“

-“৮৪-তে প্রমোশন।“

-৮৩-তে বাবা মারা যান।“

-“হ্যাঁ।“

-“আপনার তো একটিই সন্তান।“

-হ্যাঁ”

এমনি আরও অনেক কিছুই বলে গিয়েছিলাম, আর প্রতিটির ক্ষেত্রেই উত্তর পেয়েছিলাম, “হ্যাঁ”।

উপস্থিত দর্শকরা ঘটনার নাটকীয়তা দারূণ রকম উপভোগ করেছিলেন। টান-টান উত্তেজনায় তুমুল হাততালি দিয়ে অভিনন্দিত করেছিলেন। দর্শকদের এই বিমূঢ় বিস্ময়ের পেছনে আমারও সেই কৌশলই ছিল, যা ফুলবাবা এবং কামদেবপুরের ফকিরবাবা প্রয়োগ করে থাকেন।

প্রেস ক্লাবের হলে এসে আমি দু’তিনজনকে আমার লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করে নিয়ে দ্রুত তাঁদের সম্পর্কে খবর সংগ্রহ করেছিলাম ব্যবস্থাপকদের সহায়তায়। তারপর সামান্য যাদু কৌশলের সাহায্যে আমার ইচ্ছে মতো ব্যক্তিটির নাম তুলতে বাধ্য করেছিলাম। আর তাঁরপরই ঘটিয়ে ফেললাম অসাধারণ অলৌকিক (?) ঘটনা।

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x