অধ্যাপক স্টিফেন হকিং-এর “A Brief History of Time” –এঁর বাংলা অনুবাদ “কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস” প্রকাশিত হল। বাউলমন প্রকাশনের সাধারণের জন্যে বাংলায়  বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ পুস্তক প্রকাশ প্রকল্পে এটা নবতম সংযোজন।

  আমাদের আগেকার বিজ্ঞান বইয়ের পরিকল্পনার সঙ্গে এ বইয়ের পরিকল্পনায় অনেকটা মিল রয়েছে- মিল রয়েছে সুবিধা অসুবিধায়ও।

আইনস্টাইন পরিভাষার বিবর্তন সম্পর্কে একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর মতঃ সাধারণ কথ্য ভাষা থেকে বিজ্ঞানের ভাষা গ্রহণ করা যায়। প্রথমে হয়তো একই শব্দের সাধারণ ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক ব্যভারে কোন পার্থক্য থাকে না। কিন্তু সে শব্দ পরিভাষায় রুপান্তরিত হলে তার একটি নির্দিষ্ট নিশ্চিত অর্থ এবং সংজ্ঞা স্থিতিলাভ করে। আইনস্টাইনের এই ইঙ্গিত অনুসরণ করায় আমাদের কিছু অসুবিধা আছে, ইংরেজি ও অন্যান্য যে সমস্ত ভাষায় সৃজনশীল বিজ্ঞান লেখা হয়েছে সেই সমস্ত ভাষায় বৈজ্ঞানিক পরিভাষার এই ধরণের স্বাভাবিক বিবর্তন হয়েছে। তাছাড়া পাশ্চাত্য দেশে গ্রীক, ল্যাটিন ভাষার সাহায্যও নেওয়া হয়েছে। তবে সে সমস্ত ক্ষেত্রে শুরুতেই পারিভাষিক শব্দের নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্দেশ করা হয়েছে।

আমাদের দেশের বৈজ্ঞানিকরা বিজ্ঞান চর্চায় মাতৃভাষা ব্যবহার করেন না। যদিও আজকাল অন অনেক স্কুলে, কলেজে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু বিষয়ে স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত মাতৃভাষার মাধ্যম ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, তবুও সৃজনশীল বিজ্ঞান, গবেষণাপত্র এবং মাতৃভাষায় হয় না বললেই চলে। তাছাড়া মাতৃভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রপত্রিকাও বিশেষ নেই। সেইজন্য আমাদের বাংলাভাষায় বিজ্ঞান চর্চায় ভাষাগত অসুবিধা খুবই বেশী। বাংলাভাষীদের বৈজ্ঞানিক পরিভাষা যতদিন না সুস্থিত হবে ততদিন এই অসুবিধা চলবে।

আমরা প্রধানত পরিচিত পরিভাষা কোষগুলির সাহায্য নিতে চেষ্টা করেছি। এগুলির ভিতর উল্লেখযোগ্যঃ শ্রদ্ধেয় দেবীপ্রসাদ রায় চৌধুরীর ‘পদার্থবিদ্যার পরিভাষা’, ‘সংসদ অভিধান’, ‘চলন্তিকা’, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কৃত ‘পরিভাষা’, দিল্লী থেকে প্রকাশিত ‘হিন্দী পরিভাষা কোষ’- ইত্যাদি।

কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনুবাদককে পরিভাষা তৈরি করতে হয়েছে। অনুবাদকের করা পরিভাষা সবার বোধগম্য হবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ থেকে যায়, সেইজন্য বারবার বন্ধনীতে মূল ইংরেজি শব্দ দিতে হয়েছে। এখানে দু একটি উদাহরণ দেওয়া বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। Big Bang –এর বাংলা করা হয়েছে বৃহৎ বিস্ফোরণ। Big Crunch –এর বাংলা করা হয়েছে বৃহৎ সঙ্কোচন। কোনটিই আক্ষরিক হয়নি। কিন্তু অনুবাদককে তার ক্ষমতা অনুসারে যতটা সম্ভব অর্থের কাছাকাছি যেতে হয়েছে। সম্প্রসারণের যেখানে অতিদ্রুত সেখানে অধ্যাপক হকিং ব্যবহার করেছেন Inflationary শব্দ। অনুবাদককে ব্যবহার করতে হয়েছে ‘অতিস্ফীতি’ শব্দ।

অবশ্য অনুবাদকের এক্ষেত্রে আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর শরণ নেওয়া সম্ভব। তিনি বলেছিলেন লিখে যেতে- পরিভাষা সম্পর্কে চিন্তা না করতে।

বিজ্ঞান সম্পর্কিত কোন বইই অধ্যাপক হকিং- এর এই বইটির মতো জনপ্রিয় হয়নি। আমরা আশা করি বাংলা ভাষাতেও সে জনপ্রিয়তা অক্ষুন্ন থাকবে।

বিংশ শতাব্দীতে পদার্থবিদ্যার দুটি স্তম্ভঃ অপেক্ষবাদ এবং কণাবাদী বলবিদ্যা। এর আগে আমরা আইনস্টাইনের “অপেক্ষবাদঃ বিশিষ্ট ও ব্যাপকতত্ত্ব” এবং বাট্রান্ড রাসেলের “অপেক্ষবাদের অ আ ক খ” বাংলায় প্রকাশ করেছি। এই দুটি বইয়েরই বিষয়বস্তু অপেক্ষবাদ। আমাদের প্রকাশিত আইনস্টাইন-ইনফেল্ডের “পদার্থবিদ্যার বিবর্তন”- এ কণাবাদী বলবিদ্যা নিয়ে আলোচনা খুবই কম।

আমাদের ইচ্ছা কনাবাদী বলবিদ্যা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পাঠ্য একটি পুস্তক প্রকাশ করা। কিন্তু এখনো আমরা সে ব্যাপারে খুব বেশি এগোতে পারি নি।

অধ্যাপক হকিং –এর এই বইটিতে কণাবাদী বলবিদ্যা, হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তাবাদ ইত্যাদি নিয়ে বেশ খানিকটা আলোচনা রয়েছে। আশা করি এ আলোচনা এক দিকে পাঠকদের কৌতূহল খানিকটা পরিতৃপ্ত করবে আবার অন্যদিকে বাড়িয়ে তুলবে তাঁদের অনুসন্ধিৎসা।

মাতৃভাষায় বিজ্ঞান প্রচলিত এবং প্রসারিত হয়নি অথচ জ্ঞান-বিজ্ঞানে জাতি হিসাবে অগ্রগতি হয়েছে এরকম কোনো দেশের অস্তিত্ব আমার জানা নাই। বাউলমন- এর বাংলাভাষায় বিজ্ঞান প্রচার প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য বাংলাভাষীদের ভিতর বৈজ্ঞানিক কৌতূহল সৃষ্টি করা। আমাদের আশা, এ প্রচেষ্টা জাতি হিসেবে আমাদের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে সাহায্য করবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষার যে প্রচেষ্টা করছেন এই প্রসঙ্গে তার প্রশংসা করতেই হয়। তবে শুধুমাত্র সরকারী প্রচেষ্টা ছাড়াও বেসরকারি প্রচেষ্টারও যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।

পণ্ডিতেরা বলেন, একটি জঙ্গলকে চিনতে হলে যেমন গোটা জঙ্গলকে দেখতে হয়, তেমনি দেখতে হয় এককভাবে গাছগুলিকেও। এই বইয়ে কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধ্যাপক হকিং এক দিকে যেমন বিজ্ঞানের গোটা জঙ্গলের আংশিক ছায়াপাত করেছন তেমনি বহুক্ষেত্রে অনেক একক গাছ অর্থাৎ জটিল তত্ত্বও তিনি বুঝিয়েছেন।

এই প্রকল্পে বাউলমন প্রকাশন সাধারণের উপযুক্ত সহজসাধ্য বিজ্ঞানের বই বেছে নিয়েছে। সেইজন্য সব সময়ই আমাদের চেষ্টা গাণিতিক জটিলতা এড়িয়ে যাওয়ার। এই বইটিও কোনো ব্যতিক্রম নয়। E= mc2 ছাড়া কোনো সমীকরণ এই বইয়ে ব্যবহার করা হয়নি।

আইনস্টাইন বলেছেন, গণিত বিজ্ঞানীদের ভাষা হলেও সে ভাষাকে সাধারণের ভাষায় অনুবাদ করা অসম্ভব নয়। অধ্যাপক হকিং তাঁর পূর্বসূরি নির্দিষ্ট পন্থা পরিত্যাগ করেন নি। তিনি বোধ করেছেন বিজ্ঞান মানুষের জন্য-  সাধারণ মানুষের ভাষায় বিজ্ঞান অনুবাদ প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রচার এবং প্রসারের স্বার্থেই। আমরা আশা করব  অধ্যাপক হকিং বিজ্ঞানের সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের এই প্রচেষ্টাকে ভবিষ্যতে আরো বেশি এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

বইটি পড়তে পড়তে অনেক সময়, সন্দেহ হয় কোন কোন প্রসঙ্গে তিনি কি জটিলতা এড়ানোর চেষ্টায় গভীরতাকেও এড়িয়ে গিয়েছেন? কিন্তু পুরো বইটি পড়লে মনে হয় বিষয়টির উপর তাঁর অধিকার এতো গভীর যে তিনি যে কোন প্রসঙ্গকেই সাধারণ মানুষের বোধগম্য সরলতম ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন। আশা করি ভবিষ্যতে তিনি আরো বই লিখবেন এবং তখন তিনি জটিলতম প্রসঙ্গকে আমাদের মতো স্বল্পবুদ্ধি মানুষের জন্য সরলতম রূপে প্রকাশ করবেন। বইটি পড়লে যে কোন পাঠকই বুঝতে পারবেন লেখকের ভাষাজ্ঞান এবং রসবোধ বহু পেশাদার সাহিত্যিকের চাইতে অনেক বেশি।

পাশ্চাত্য দেশের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির পশ্চাৎপটে রয়েছে ইহুদী, ক্রীশ্চান চিন্তাধারার প্রভাব। সেই চিন্তাধারা অনুসারে ঈশ্বর একদিন বিশ্বসৃষ্টি করতে শুরু করেন এবং ছ’দিনে সৃষ্টিকর্ম শেষ করে সপ্তম দিনে বিশ্রাম গ্রহণ করেন। আমাদের ভারতীয়দের বৈজ্ঞানিক দর্শন প্রধাণত সাংখ্যভিত্তিক, সেই দর্শনে ঈশ্বরকে এরকম কোনো প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। সাংখ্যকাররা বলছেন, প্রমাণ না থাকার দরুন ঈশ্বরকল্পন অসিদ্ধ। সেজন্য সাংখ্যের চতুর্বিংশতি তত্ত্বে ঈশ্বরের কোন স্থান নেই। অনেক পণ্ডিতের মতে সাংখ্যের পঞ্চবিংশতত্ত্ব অর্থাৎ পুরুষ সম্পর্কীয় ধারণাও প্রক্ষিপ্ত কারণ সাংখ্যের মূল চিন্তাধারার সঙ্গে তার কোনো সঙ্গতি নেই।

সাংখ্যের সৃষ্টিতত্ত্ব বিবর্তনভিত্তিক। এ দর্শনের মতে প্রকৃতির বিবর্তনের ফলেই মহাবিশ্ব এবং জীবজগৎ সৃষ্টি হয়েছে। মহাবিশ্বের সৃষ্টি যেমন হয়েছে, স্থিতি যেমন চলছে প্রলয়ও তেমনি হবে। প্রলয়ের পর আবার সৃষ্টি হতে পারে। অধ্যাপক হকিং- এর মহাবিশ্বতত্ত্বে আমরা সাংখ্যের ছায়া বেশ স্পষ্টই দেখতে পাই।

সাংখ্যের মতে জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং কর্মেন্দ্রিয়ের সার পদার্থ নিয়ে মন গঠিত। পাশ্চাত্য জড়-বিজ্ঞানের অধিকাংশ পণ্ডিতের মতে অধ্যাপক হকিংও মন সম্পর্কে কোন মন্তব্য করেন নি। আসলে আধুনিক জড়-বিজ্ঞানের অভিমুখ সম্পূর্ণ ব্যক্তি-নিরপেক্ষ বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান আহরণ করা। এক্ষেত্রে ব্যক্তি শব্দের অর্থ ব্যক্তির মন।

জড়-বিজ্ঞানের এই আচরণে আমাদের অর্থাৎ মানসিক চিকিৎসকদের অনেক সময়ই নিজেদের বিজ্ঞান-জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি কি ইহুদী, ক্রীশ্চান পশ্চাৎপটের ফল?

আমাদের মনে হয় মনেরও আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ E= mc2 –এর অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন। যদি অন্তর্ভুক্ত হয় তা হলে স্বভাবতই মন ও মানসিক ক্রিয়াগুলি শক্তি-বস্তু সাংতত্যকে (Continuum) স্থান পাওয়ার যোগ্য। ভারতীয় বিজ্ঞানের দর্শন কিন্তু মনকে সে স্থান অনেক দিন আগেই দিয়েছে। বিশেষ করে সাংখ্যের তস্মাত্র সম্পর্কীয় চিন্তাধারা স্পষ্টতই জড় জগতের সঙ্গে অনুভূতির সেতু বন্ধন করেছে। আমরা জানি অনুভূতি একটি প্রধান মানসিক ক্রিয়া।

তবে সাংখ্য বিজ্ঞান নয়। শুধুমাত্র দর্শন। বিজ্ঞান সুষ্ঠু যুক্তি এবং বাস্তব জগৎ সম্পর্কীয় জ্ঞানের একটি সমন্বয় (? পরীক্ষামূলক)। এই অর্থে সাংখ্য বিজ্ঞান পর্যায়ে আসে না। তবে দর্শন পর্যায়ে নিশ্চয় আসে। আমরা জানি সমগ্র জ্ঞানের আদি জনক দর্শনশাস্ত্র।

বিজ্ঞানের আলোচনায় মনের অনস্তিত্ব কিছু সমস্যার সৃষ্টি করে। মানব জ্ঞানের প্রধান উৎস অনুভূতি। মন অংশ গ্রহণ না করলে অনুভূতি অসম্পূর্ণ থাকে। একটা উদাহরণ দিলে আমার বক্তব্য অনেক স্পষ্ট হবে।

আমাদের অক্ষিপটে আঘাত করে বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ। সেখান থেকে মস্তিষ্কে যা পৌঁছায় সেটা স্নায়ু স্পন্দন মাত্র। কিন্তু আমরা কখনো অনুভব করি বর্ণ, কখনো আকার আবার কখনো রূপ। আমার সামনে যদি কেউ দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে অক্ষিপটে তার ছায়া পড়ে উল্টো। অর্থাৎ ছায়ার মাথাটা থাকে নিচের দিকে কিন্তু পা-টা থাকে উপর দিকে। অথচ আমি অনুভব করি লোকটা সোজা দাঁড়িয়ে আছে। এই সংশোধনকে আমরা মানসিক ক্রিয়াই বলি। এই রকম অসংখ্য ক্রিয়াকে মানসিক ক্রিয়া বলা হয়। তার ভেতর কিছু চেতন, কিছু অচেতন, কিছু আংশিক চেতন। অনেকে মনে করেন, চেতনাই মনের মূলগত প্রকাশ। আসলে এই রকম অসংখ্য ক্রিয়ার পিন্ডকৃত রূপের নাম মন। না, মন বলে দেহের কোন বাস্তব অঙ্গ  নেই। মানুষই এই জাতীয় বহুক্রিয়ার পিন্ডকৃত ধারণার নাম দিয়েছে মন। বহুক্রিয়া আমরা দেখতে পাই সুতরাং প্রকল্প হিসাবে মেনে  নেওয়া হয়েছে তার একটি (? একাধিক) কর্তাও আছে। সেই কর্তার নাম দেওয়া হয়েছে মন। সুতরাং শক্তি-বস্তু সাংতত্যকের (Continuum) অন্তর্ভুক্ত, মন একক একটি শক্তি হতে পারে আবার হতে পারে বহু শক্তির বহু প্রকল্পের একটি পিন্ডকৃত রূপ। এই মনপিন্ডের অনেক উপাদান চেতনাকে ঘা দিতে পারে আবার অনেক উপাদান চেতনাকে স্পর্শমাত্র না করতে পারে।

এর সঙ্গে তুলনা করা যায় বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের। কোনো তরঙ্গ আমাদের দেহে তাপের অনুভূতি সৃষ্টি করে আবার কোনো তরঙ্গ আমাদের চেতনায় দৃষ্টির অনুভূতি সৃষ্টি করে। আবার তারই ভিতরে এক ধরনের তরঙ্গ এক এক ধরনের রঙ্গের অনুভূতি সৃষ্টি করে। এমন অনেক বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ আছে যারা কোন অনুভূতিই সৃষ্টি করে না। কিন্তু আমাদের কম্পনে এদের পিন্ডকৃত নাম বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ।

তেমনি হয়তো আমরা এক গোষ্ঠীর বহু শক্তির পিন্ডকৃত কম্পনের নাম দিয়েছি মন।

মনের অবস্থার উপর আমাদের অনুভূতির রূপ অনেকটাই নির্ভর করে। মানসিক রোগ সম্পর্কীয় যে কোনো পাঠ্যপুস্তকেই এ ধরনের ভুরিভুরি উদাহরণ পাওয়া যাবে। উদাহরণঃ এমন মানসিক অবস্থা হতে পারে যে অবস্থায় সাধারণ মানুষ যাকে দ্রষ্টব্য রং বলে অনুভব করে সে অবস্থায় বিশেষ মানুষটি তাকে শ্রোতব্য শব্দ বলে অনুভব করবে।

সুতরাং, মন সম্পর্কে সম্যক আলোচনা না থাকলে বহির্বিশ্ব তথা মহাবিশ্ব বুঝতে অসুবিধা হবে সন্দেহ নেই।

বিভিন্ন জাতি, ,বিভিন্ন শ্রেণী, বিভিন্ন যুগের মানুষেরও দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য হবে। তার কারণ তাঁদের পরিবেশে পার্থক্য থাকলে মনের গঠনেও পার্থক্য থাকবে। অথচ এই পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আমাদের হতে হবে বৈজ্ঞানিক সত্যের নিকটতম।

সেজন্য মন সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি কোনো বিজ্ঞানকর্মীই অস্বীকার করতে পারে না।

অ্যারিস্টোটলের বিশ্বদৃষ্টি, গ্যালিলিও-নিউটনের বিশ্বদৃষ্টি এবং আইনস্টাইনের বিশ্বদৃষ্টিতে যে পার্থক্য তার কারণ কি শুধুমাত্র তাঁদের প্রতিভা? তাঁদের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত এবং তার ফলস্বরূপ তাঁদের মানসিক গঠনের যে পার্থক্য তার সঙ্গে কি তাঁদের বিশ্বদৃষ্টির কোনো সম্পর্ক নেই?

এক জায়গায় লেখক আধুনিক গাণিতিক পদার্থবিদ্যাভিত্তিক হিসাব করে দেখিয়েছেনঃ যেহেতু মহাবিশ্বের পরা এবং অপরা শক্তি প্রায় সমান সমান সুতরাং যোগ বিয়োগ করলে দেখা যাবে যোগফল শূন্য। ব্যাপারটা প্রায় মায়াবাদ কিম্বা শূন্যবাদের পর্যায়ে এসে পড়ে।

অধ্যাপক হকিংয়ের গণিতশাস্ত্রকে “দূর হইতে গড় করিবার” যুক্তি সহজবোধ্য। গাণিতিক সমীকরণ থাকলে অনেক পাঠকই পলায়ন করতেন সন্দেহ নেই। সে সম্পর্কে কোনো সন্দেহ থাকলেও বাংলা ভাষার অনুবাদক যে পলায়মান পাঠকদের পথপ্রদর্শক হোত সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

বিজ্ঞানের ভিত্তি সুষ্ঠু যুক্তি এবং বিশ্ব সম্পর্কে সম্যক বাস্তব জ্ঞানের সমন্বয়। কিন্তু যুক্তি অর্থাৎ গণিত যদি বাস্তব বাস্তব মহাবিশ্বকেই অদৃশ্য করে দেয়, তাহলে সমাজ কি নিজেদের নিরাপদ বোধ করবে?

তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ আর বৌদ্ধদের শূন্যবাদ সত্ত্বেও মানুষের জীবন ধারা তার নিজের ছন্দেই চলে এসেছে।

পদার্থবিদ্যার সার্বিক ঐক্যবদ্ধ তত্ত্ব আবিষ্কার সম্পর্কে হকিং খুবই আশাবাদী। সে তত্ত্বের আগমনী পদধ্বনি তিনি স্পষ্টই শুনতে পাচ্ছেন। কিন্তু সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্ব সদা পরিবর্তনশীল। মহাবিশ্ব এক না একাধিক সে সম্পর্কেও বিজ্ঞান নিশ্চিত নয়। সুতরাং, মহাবিশ্ব সম্পর্কে স্থিরতত্ত্ব আবিষ্কার কি সম্ভব?

যদি আমরা মনে রাখি জড় এবং জীবের সমন্বয়েই মহাবিশ্ব এবং মানসিক ক্রিয়াও মহাবিশ্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ তা হলে আমাদের মনে সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়। বিশেষ করে প্রাণ এবং মন সম্পর্কেও বিজ্ঞান নিশ্চিত নয়। সুতরাং মহাবিশ্ব সম্পর্কে কোনো সঠিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের অভাব মনে রাখলে সে সন্দেহ আরো বৃদ্ধি পায়।

অধ্যাপক হকিংয়ের মস্তিষ্কের সংবাদ সারা বিশ্বেরই জানা। কিন্তু হৃদয়ের সংবাদ কি সবাই জানে? আমরা কিন্তু জানি। আমরা শব্দের অর্থ অনুবাদক আর বাউলমন প্রকাশন।

অধ্যাপক হকিং কেমব্রিজে লুকেসিয়ান অধ্যাপকের পদে রয়েছেন। এ পদে স্যার আইজাক নিউটনও ছিলেন। কিন্তু ব্যক্তি হিসাবে দুজনের পার্থক্য লক্ষণীয়। হৃদয়বান বলে কোনো খ্যাতি নিউটনের ছিল না।

কিন্তু অধ্যাপক হকিং?

আমাদের এ অনুবাদ প্রায় দু বছর আগে প্রেসে দেওয়ার জন্য তৈরি ছিল। কিন্তু প্রকাশকদের অনুমতি নিতে হলে যে পরিমাণ ডলার দিতে হোত তাতে বইটা অনেকের নাগালের বাইরে চলে যেত।

তখন আমরা শরণাপন্ন হই এ্যান্ডু জন্স নামে একজন ইংরেজ বন্ধুর। পেশায় তিনি মানসিক রোগের চিকিৎসক। তিনিই যোগাযোগ করে অধ্যাপক হকিংয়ের সঙ্গে। অধ্যাপক হকিং এই বাংলা সংস্করণে তাঁর অনুমোদনপত্র তৎক্ষণাৎ পাঠিয়ে দেন। শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর প্রাপ্য রয়ালটি সম্পর্কিত দাবীও সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেন। তার ফলে এই বই বৃহত্তর পাঠক সমাজে আরো সহজপ্রাপ্য হবে বলে আমরা আশা করি।

এই সুযোগে আমরা ডাক্তার এ্যান্ডু জন্স- এর কাছেও আমাদের কৃতজ্ঞতা জানাই- কৃতজ্ঞতা অনুবাদকের পক্ষ থেকে, বাউলমন প্রকাশনের পক্ষ থেকে- আর হয়তো বৃহত্তর বাঙ্গালী সমাজের পক্ষ থেকেও।

আমরা জানি আধুনিক সম্রাজ্যবাদের জন্মদিন ১৪৯২ খৃষ্টাব্দের ১০ই অক্টোবর- অর্থাৎ কলাম্বাসের বাহামা দ্বীপে অবতরণের তারিখ। না, কলাম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেন নি। তিনি করেছিলেন আক্রমণ। কলাম্বাস আবিষ্কার করেছিলেনঃ আদিবাসীদের সম্পদ আছে, কিন্তু মারণ-প্রযুক্তিতে ওরা হীন। লুন্ঠনের চাইতে লাভজনক কিছু নেই। লুন্ঠন বজায় রাখতে হলে মারণ প্রযুক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব প্রয়োজন।

কলাম্বাসের এই মহান আবিষ্কার আজও বিশ্বের লুন্ঠনকারীদের জীবনদর্শন।

কলাম্বাসের বাহামা দ্বীপে অবতরণের সময় অর্থাৎ আধুনিক সম্রাজ্যবাদের জন্মলগ্নে আধুনিক বিজ্ঞান বিকাশ লাভ করতে শুরু করেছে   মাত্র। তখনও প্রযুক্তিবিদ্যার সঙ্গে তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। কালের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সে সম্পর্কও দৃঢ়তর হয়েছে। প্রযুক্তির প্রগতির মানদন্ড একটিইঃ অপরকে বঞ্চনা করা এবং শোষণ করার ক্ষমতা। সুতরাং প্রযুক্তির সঙ্গে তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের আত্মিক বন্ধন বিজ্ঞানের পক্ষে শুভ হয়নি। শুভ হয়নি মানুষের পক্ষেও। সে জন্যই আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের মানুষ অর্থাৎ অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন মানুষ কখনোই প্রযুক্তিবিদ্যা এবং তার পরম আত্মীয় তাত্ত্বিক বিজ্ঞানকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে পারে নি। গ্রহণ করতে অক্ষমতার জন্য শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন দেশের জনসাধারণই দায়ী নয়, সম্রাজ্যবাদের জন্মলগ্ন থেকেই দেশগুলি কপিরাইট আইন এবং পেটেন্ট আইনের মতো কতগুলি দুর্ভেদ্য বর্মে তাদের বঞ্চনার নীতিকে সুরক্ষিত করেছিল। তাছাড়া ছিল ভাষার ব্যবধান। তাছারাও কি কারণ উল্লেখ করা যায়? যেমন প্রথম বিশ্বের সচেতন অনীহা? আমাদের সংগ্রাম জীবন সংগ্রাম, ওদের সংগ্রাম আমাদের শোষণ করার অধিকারের জন্য। সে সংগ্রামে মারণ প্রযুক্তিতে শ্রেষ্ঠত্বের যেমন গুরুত্ব তেমনি গুরুত্ব শিকারকে যথাসম্ভব অজ্ঞ রাখার।

অনেকে মনে করেন প্রযুক্তিবিদ্যা এবং বিজ্ঞানের কোন জাতি নেই, কোনো বন্ধু নেই, কোনো শত্রু নেই। এঁরা বারাঙ্গনার মতো। যথোচিত মূল্য পেলে এরা যে  কোনো প্রেমিককে সেবা করতে পারে। এই ভরসায় পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ মানুষ কাঁধে খুড়োর কল লাগিয়ে চন্ডিদাসের খুড়োর মতো দৌড়েই চলেছে। কিন্তু সামনে ঝোলানো মিঠাইমণ্ডা খুব কম লোকের ভাগ্যেই জুটছে।

তবুও আমরা জানতে চাই। পরিবেশকে জানার চেষ্টা জীবের জন্মগত কিন্তু বই, পত্রপত্রিকা, যন্ত্রপাতি ইত্যাদির মূল্য এমন যে পৃথিবীর দুই তৃতীয়াংশ মানুষের আর্থিক ক্ষমতা থেকে তার অবস্থান অনেক দূরে। সে দূরত্ব দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে।

প্রথম বিশ্বের নেতারা কি আমাদের অজ্ঞতার বন্ধন দৃঢ়তর হওয়াতে খুশী?

আমি জানি না।

তবে অধ্যাপক হকিং কিন্তু এরকম প্রচেষ্টার অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি শুধু বাংলায় অনুবাদ প্রকাশের অনুমতি দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, নিজের প্রাপ্য দক্ষিণার দাবীও তিনি ত্যাগ করেছেন।

অর্থাৎ অসুস্থ বিকলাঙ্গ অধ্যাপকের রয়েছে আকাশের মতো উদার একটি হৃদয়।

সে হৃদয়কে আমি নমস্কার জানাই। সে হৃদয়ের কাছে আমি ঋণী, ঋণী বাউলমন প্রকাশন। ভবিষ্যতেও হয়তো ঋণী থাকবেন বাংলা বিজ্ঞান সাহিত্যের পাঠকরা।

একটি দেশ কিম্বা সমাজের ব্যক্তি এবং সমষ্টিতে পার্থক্য থাকে। বিশেষ করে পার্থক্য থাকে সমষ্টির নেতা এবং ক্ষমতার অধিকারীদের সঙ্গে একক সাধারণ মানুষের। ক্ষমতার অধিকারীরা অধিকার অর্জন করার জন্য এবং অধিকার রক্ষা করার জন্য- উপায়ের কোন ভালমন্দ বিচার করেন না। অধিকার অর্জন এবং রক্ষার সংগ্রাম নির্মম। কিন্তু সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা থাকে ক্ষুদ্রতর। তারা চায়- আহার, আশ্রয় আর সুস্থ পরিবেশ। তারা ভালবাসতে চায়, ভালবাসা চায়, চায় পরিবেশ সম্পর্কে জানতে। তারা ভাবতে চায়- “আমরা কারা?” আমরা কোথায় ছিলাম- কোথায় এলাম আর যাবই বা কোথায়?”

আমাদের অধ্যাপক হকিং তেমনই একজন সাধারণ মানুষ। তাঁর জীবনে বিফলতা এসেছে নিজের স্বাস্থ্যে, সাফল্য এসেছে কর্মে, ভালবাসায়। তিনি ভালবাসতে পেরেছেন- ভালবাসা পেয়েছেন।

আমরা কামনা করি সেই সাধারণ মানুষ বেঁচে থাকুন। তাঁদের ভিতরে বেঁচে থাকুন অধ্যাপক হকিং- দূর হোক তাঁর অস্বাস্থ্য-শ্রীবৃদ্ধি পাক তাঁর কর্ম, তাঁর ভালবাসা- ভালবাসতে পারা- ভালবাসা পাওয়া। তবে আবার বলছি ডাঃ এ্যান্ড্রু জন্সের সহৃদয়তার কথাও আমরা ভুলব না।

আমি পদার্থবিদ নই। বিদ্যাবুদ্ধি আমার সীমিত। পরিবেশ জানার প্রেরণায় আমি অনেক সময়ই হয়তো নিজের অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করি। আইনস্টাইন কিংবা হকিং- এর বইয়ের বাংলা অনুবাদের চেষ্টা তার একটা উদাহরণ মাত্র। এ প্রচেষ্টায় ভুল ত্রুটি অনেক আছে- সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। যতবারই নতুন করে পড়ছি, ততবারই নতুন করে নজরে আসছে নতুন নতুন ত্রুটি। পাঠকরা যদি আমার এ ত্রুটি সংশোধন করে আমাকে সাহায্য করেন তা হলে এই প্রবীণ যুবক বাধিত বোধ করবে।

                                                                                                     ইতি

বাউলমন                                                                   শত্রুজিৎ দাশগুপ্ত

মহালয়া

১৩৯৯

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x