ভূপাল ভৌমিক আমার সঙ্গে কলেজে পড়ত একই ইয়ারে। দীর্ঘদেহী। অসুরের মতন স্বাস্থ্য। স্বামী বিবেকানন্দের মত দৃষ্টি। কথা বলত চোখে চোখ রেখে, উত্তমকুমারের মতন ভরাট গলায়। কথায় তেজ ছিল। তেজ ছিল পড়াশুনোতেও। কলেজের ইলেকশনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল এস. এফ. আই. ও পি. এস. ইউ। আমাদের ক্লাশে এস. এফ. আই-এব প্রার্থী ছিলেন শ্যামল চক্রবর্তী (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী)। পি. এস. ইউ ভূপালকে প্রার্থী করার বহু চেষ্টা করেছিল। ভূপাল কি সব নীতির প্রশ্ন নিয়ে পি. এস. ইউ. নেতা মিহির সেনগুপ্তের সঙ্গে একমত হতে না পেরে দু-দলের বিরোধীতা করে নির্দল প্রার্থী হলো । হেরেছিল, তবে লড়াই দিয়েছিল। ভূপালের স্বপ্ন ছিল অধ্যাপক হবে। ইউনিভার্সিটির শেষ পরীক্ষাতেও ভাল রেজাল্ট করেও ভূপাল ওর স্বপ্নকে স্বার্থক করতে পারল না। ভূপাল ওর চোখের সামনে ওর চেয়ে নিরেস রেজাল্ট করা সহপাঠী ও বন্ধুদের কাজ জুটিয়ে নিতে দেখল। মফস্বল কলেজের অধ্যাপক, মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানীর একজিকিউটিভ, সাংবাদিক, নিদেন ব্যাঙ্ক বা ইন্সিওরেন্স কোম্পানীর কেরানির কাজ জুটিয়ে নিয়েছিল খুঁটি বা ঘুষের জোরে। ভূপাল একটু একটু করে নিরাশায় ভেঙে পড়ছিল। ও প্রায়ই বলত, “আমার ভাগ্যটাই খারাপ। আমার হবে না। কিছু হবে না।” ভূপাল শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে গিয়েছিল। স্থান হয়েছিল পাগলা গারদে।

আমার এক আত্মীয় বি. কম. পাশ এবং ধারাবাহিকভাবে শেষ সুযোগটি পর্যন্ত চ্যাটার্ড অ্যাকাউনটেন্সি পরীক্ষায় ফেল। এক মন্ত্রীর কল্যাণে জুট কর্পোরেশনে মোটামুটি ভাল পদে কাজ করেন। তিনি নদীয়ার একটি শহরে যখন পোস্টেড ছিলেন, তখন সপ্তাহে একটি দিন অফিস যেতেন এবং অ্যাটেনডেন্স খাতায় সারা সপ্তাহের সই করে আসতেন। দেশে যখন তীব্র বেকার সমস্যা, বহু শিক্ষিত বেকার যখন এমপ্লয়মেন্ট কার্ড করে ইন্টারভিউ দিতে দিতে চাকরি পাওয়ার বয়েস পেরিয়ে যাচ্ছেন, ডুবে যাচ্ছেন হতাশায়, তখন একটা অতি সাধারণ শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে এমন একটি মোটা মাইনের ফাঁকি মারা সুখের চাকরি পেয়ে আমার আত্মীয়টি নিজেকে প্রচণ্ড ভাগ্যবান বলে গর্ব করতেন।

আমার এক স্নেহভাজন ক্যারাটে, জুডো ও যোগ ব্যায়ামের প্রশিক্ষক হঠাৎ এক মন্ত্রীর কৃপায় সল্ট লেকে একটা প্লট পেয়ে যাওয়ায় ভাবতে শুরু করেছিলেন, ভাগ্যটা ওর খুবই ভাল যাচ্ছে।

এবার আসুন একটু সাহিত্যজগতে বিচরণ করা যাক। অনুমাণ করুন তো, কে সেই বাংলা সাহিত্যের দিকপাল অসাধারণ সাহিত্যিক যিনি ‘৭৬ সালে আমেরিকার বালটিমোরে অনুষ্ঠিত ৩য় বিশ্ব কবি সম্মেলনে, ‘৭৭-এ অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ৪২-তম বিশ্ব সাহিত্য সম্মেলনে, ‘৭৭-এই ফিলিপাইনে প্রশান্ত মহাসাগরীয় লেখক সম্মেলনে, ‘৭৮-এ কোরিয়ার সিওন-এ ৪র্থ বিশ্ব কবি সম্মেলনে এবং ‘৮১-তে সানফ্রানসিসকোতে ৫ম বিশ্ব কবি সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন ?

আপনাদের চোখের সামনে নিশ্চয়ই অনেক নামই ভেসে উঠছে, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অরুণ মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, দিব্যেন্দু পালিত, রমাপদ চৌধুরী, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, দেবেশ রায়, বিমল কর, নবনীতা দেবসেন; না, হলো না। আপনাদের অনুমাণ মিলল না। উনি হলেন বিশ্বজয়ী সাহিত্যিক ডঃ সুধীর বেরা। ওঁর নাম শোনেননি মনে হচ্ছে ? তবে ওঁর বিখ্যাত কাব্য গ্রন্থগুলোর নাম জানাচ্ছি, ‘লগ্ন’, ‘শাহানা’, ‘সূর্যরাগ’, ‘অন্যদিন’ ও ‘অভিজ্ঞান’। কী ? এইসব কাব্যগ্রন্থগুলোর নাম কোনদিনই শোনেন নি ? দেখেননি ? পড়েন নি ? আমিও শুনিনি, দেখিনি, পড়িনি। ডঃ বেরার লেখা একটি জ্যোতিষ বিষয়ক চটি বই ‘নস্ট্রাডামের ভবিষ্যৎবাণী’-তে ছাপা সুবিশাল জীবনীপাঠে এসব অমূল্য তথ্য জানতে পেরেছি। আরো জানতে পেরেছি তিনি ছিলেন ১৯৭১ থেকে ৭৭ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাঢ় সদস্য এবং ‘৭৫-এ সুপ্রীম কোর্টে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী আপীল মামলায় শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর অন্যতম কৌঁশুলি। জানি না রাজনীতির কল্যাণেই সাহিত্যিক হিসেবে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছিলেন কিনা ? তেমনটি ঘটে থাকলে অবশ্য ভাগ্যে বিশ্বাসী, জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাসী হয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক ।

আমাদের মতন সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোতে, যেখানে পদে পদে অনিশ্চয়তা, সেখানে মানুষ ভাগ্যে বিশ্বাসী হবে, দৈবকে আশ্রয় করে বাঁচতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক।

একদিকে লক্ষ কোটি মানুষ যেমন জীবনযুদ্ধে বার বাঢ় ব্যর্থ হয়ে অদৃষ্টে বিশ্বাসী হয়ে পড়ে, অন্যদিকে তেমনই শাসকগোষ্ঠির কৃপায়, মামা-দাদার জোরে অথবা যে কোনও প্রকার ঘুষের বিনিময়ে, কিংবা অন্য কোনও কূট-কৌশলে যখন কিছু সাধারণ মানুষ হঠাৎই অর্থে, সম্মানে অসাধারণ হয়ে ওঠে, তারাও একে নিজেদের সৌভাগ্য বলেই মনে করতে থাকে।

আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় বহু ক্ষেত্রেই পুরুষকার অর্থাৎ কর্মপ্রয়াস জীবন-সংগ্রামে শুধুমাত্র ক্লান্ত ও পর্যুদস্ত হয়, নৈরাশ্যের কাছে হয় নতজানু। আর সেই সময় পরিবেশগতভাবে প্রাপ্ত বিশ্বাসের ভিত্তিতে জীবনযুদ্ধে বঞ্চিত, পর্যুদস্ত মানুষগুলো এর জন্য আমাদের সমাজের অন্যায়, অত্যাচারগুলোর বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়িয়ে সেগুলো ‘ভাগ্যেঢ়ই মার’ বলে গ্রহণ করে সমাজে অন্যায়, অত্যাচার ও শোষণকে স্থায়ী ও শক্তিশালী করতেই পরোক্ষভাবে মদত জুগিয়েছে।

দৃষ্টি ফেরানো যাক খেলোয়াড়, অভিনেতা, সংগীতশিল্পী, আইনজীবী, রাজনীতিবিদদের দিকে। দেখবেন এদের অনেকেই আন্তরিকতার সঙ্গেই ভাগ্যে বিশ্বাসী। এই বিশ্বাস এসেছে তাঁদের জীবনযুদ্ধের অনিশ্চয়তা থেকে। এঁদের কর্মজীবনের উত্থান-পতনকে এঁরা ভাগ্য বলেই ধরে নেন। বহুদিন রানের মধ্যে না থাকা ব্যাটসম্যান রান পেলে নিজের ভাগ্যের চাকা ঘুরছে বলে ধরে নেন । অতি সাধারণ আর্থিক অবস্থা থেকে বা দরিদ্রতম জীবন থেকে যখন কোনও অভিনেতা বা অভিনেত্রীর উত্তরণ ঘটে সুপারস্টাবে, তখন বিশাল নাম, বিপুল বৈভবের সুখে ডুবে যেতে যেতে সবকিছুই স্বপ্নের মতন মনে হয। হঠাৎ পাওয়া যে সুযোগের হাত ধরে এতখানি উঠে আসা (তা সে যত কঠিন কঠোর সংগ্রামের জেঢ় হিসেবেই আসুক না কেন) তাকে একটি ‘ঘটনা’ বলে মেনে না নিয়ে ‘ভাগ্য’ বলে মানতেই মন চায়।

এ-কালের সুপারস্টার মিঠুন চক্রবর্তী আজ চূড়ান্ত অদৃষ্টবাদী। যে সংগ্রামী মিঠুন এক সময় নিজেকে মার্কসবাদী বলে সোচ্চারে প্রচাঢ় করতেন, পরিচয় দিতেন একজন যুক্তিবাদী হিসেবে, তিনিই সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের কারণ হিসেবে ভাগ্যকে চিহ্নিত করলেন অতি অবহেলে। পেলে থেকে পি. কে., সোবার্স থেকে গাভাস্কার, মাইকেল জ্যাকশন থেকে কুমার শানু, এঁদের প্রত্যেকেরই একটি বিষয়ে প্রগাঢ় বিশ্বাস, আর তা হলো ‘ভাগ্য’ । এঁদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই ভাগ্য-বিশ্বাস এসেছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাময় জীবনের অতিশ্চয়তা থেকে। এঁরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে পড়ার সম্ভবনার কথা মাথায় রেখে সৌভাগ্যকে ধরে রাখতে কখনও জ্যোতিষীর স্মরণাপন্ন হন, কখনও বা অলৌকিক শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

আমাদের দেশের সমাজব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে দেখুন একটিবার, আন্তরিকতার সঙ্গে দেখুন—পদে পদে এখানে অনিশ্চয়তা। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠি বিভৎস, ভয়ংকর দারিদ্র্যের শিকার। এদের যেদিন পেটে ঢোকাবার মতন কোনও বস্তু জোটে (তা সে কোনও বাড়ির এঁটো-পচা খাবার, শামুক, গুগলি, কাকের মাংস, পাস্তা, রুটি, মুরগীর নাড়ি-ভুড়ি যাই হোক না কেন) সেদিন জানে না পরের দিন কী খাবে, খেতে পারে কি না, অথবা কতদিন পরে আবার খাবার জুটবে ?

দারিদ্র্য ও অপুষ্টির সঙ্গে হাত ধরাধরি আপনি যখন আপনার ছেলেটিকে স্কুলে পাঠান, স্কুল থেকে কলেজে পাঠান, তখন নিশ্চয়ই অনেক সুখ স্বপ্ন থাকে। কলেজের পড়া শেষ হলেই স্বপ্নের ছেলে হারিয়ে যায় কোটি কোটি বেকার ছেলের ভিড়ে। বছর ঘোরে, আরো বেশি বেশি কবে তরুণ-তরুণী আপনার ছেলের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সঙ্গী হয়। কবে চাকরি হবে, আদৌ চাকরি হবে কিনা, এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। যেখানে বেকারের তুলনায় চাকরিতে নিয়োগের সংখ্যা বিশাল সমুদ্রের তুলনায় এক গন্ডুস জলের মতনই, সেখানে শিক্ষার সুযোগ পাওয়া মানুষদের জীবনও চরম অনিশ্চিত হতে বাধ্য।

অনিশ্চিত জীবনে মুহূর্তের নিশ্চয়তাকেই অজ্ঞ মানুষ ‘ভাগ্য’
বলে ভুল করেন। এই অজ্ঞতা বা অজ্ঞানতা সব সময়
কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বহু শিক্ষিত বলে স্বীকৃত
মানুষও অনিশ্চিত পেশায় বা জীবনযাপন প্রণালীর সঙ্গে
যুক্ত থাকলে ভাগ্যে বিশ্বাসী হয়ে পড়ে।

অর্থনীতির দিক থেকে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোতে পদে পদে অনিশ্চয়তা বেশি বলেই অদৃষ্টবাদী মানুষের সংখ্যাও বেশি। কিন্তু যে সব উন্নত দেশে পুরুষকার বা প্রচেষ্টার দ্বারা মানুষ তার জীবন ধারণের সাধারণ দাবিগুলোকে ‘মেটাতে সক্ষম, সে সব দেশে অদৃষ্টে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যাও কম। এইসব উন্নত দেশের অদৃষ্টবাদীদের মধ্যে একটা বিরাট অংশই খেলোয়াড়, অভিনেতা, সংগীতশিল্পী ইত্যাদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলক অনিশ্চিত পেশার মানুষ । বাকি অংশ ভাগ্যবিশ্বাসী হয়েছে পারিপার্শ্বিক সামাজিক পরিবেশের প্রভাবে