কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিজ্ঞান

জাদুকর জাদুর খেলা দেখান মনোরঞ্জনের জন্য। সেই খেলা দেখে বিস্মিত হলেও আমরা বুঝতে পারি এর পেছনে অলৌকিক কিছু নেই। আছে কিছু কৌশল, যা সাধারণ মানুষ চেষ্টা করলে আয়ত্ব করতে পারে। কিন্তু সরল বিশ্বাস ও কুসংস্কারের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর চতুর লোক যখন স্রেফ কিছু কৌশলয়ের খেলা দেখিয়ে, অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন বলে নিজেদের প্রায় ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে রাখে, তখন তা নির্দোষ মনোরঞ্জনের পর্যায়ে থাকে না।

আসুন, আমরা প্রত্যেকেই খোলামেলা যুক্তিবাদী মন নিয়ে অলৌকিক বলে কথিত ঘটনাগুলোকে পর্যালোচনা করে দেখি, এগুলি কতখানি লৌকিক ও কতখানি অলৌকিক। সেই সঙ্গে প্রতিটি পাঠক পাঠিকাকে অনুরোধ করব যুক্তিবাদী মনের অধিকারী হতে সেই মুহূর্তে প্রতিজ্ঞা করুন-

কোন অন্ধ-বিশ্বাসে বশ হওয়া নয়। বহুজনে বা বিখ্যাত জনে মেনে নিয়েছেন বলে কোন ধারণাকে মেনে নেওয়া নয়। যুক্তি দিয়ে বিচার করব, যাচাই করব শুধু। তারপরই গ্রহণ করব বা বাতিল করব।

এই অলৌকিক ক্ষমতাবানদের প্রসঙ্গে একটা অসাধারণ ঘটনার উল্লেখ না করে পারছি না। একজন জাদুকর বুজরুক মোল্লাদের তথাকথিত ক্ষমতার মায়াজাল থেকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন আলজিরিয়ার অধিবাসীদের মুক্ত করেছিলেন।

আলজিরিয়া তখন ফ্রান্সের অধীন। আলজিরীয়রা আরব মুসলমান সম্প্রদায়ের বংশধর। স্বভাবে দুঃসাহসী হলেও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। মোল্লা-সম্প্রদায় ঐ সব সরল ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকদেরকে নানা রকম জাদুর খেলা দেখিয়ে এমন মুগ্ধ করে রেখেছিল। দেশের লোকেরা মনে করত মোল্লারা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ও আল্লাহর মতই পূজনীয়। মোল্লারা জনসাধারণের উপর ফরাসি সরকারের কর্তৃত্বে সন্তুষ্ট ছিল না। কারণ, এতে তাদের দীর্ঘদিনের একচেটিয়া কর্তৃত্বে বাধা পড়ছিল। মোল্লারা এক সময় জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করতে শুরু করল যে, তারা আল্লার কাছ থেকে জানতে পেরেছে ফরাসি সরকারের আলজিরিয়া শাসনের দিন ফুরিয়েছে। মোল্লারা ফরাসি সরকারের বিরুদ্ধে জনতাকে নানাভাবে উস্কানি দিতে লাগল।

মোল্লাদের কথা আলজিরিয়দের কাছে স্বয়ং আল্লাহর কথা। অতএব, তারা আর ফরাসি সরকারকে পাত্তা দিতে রাজি হল না। আলজিরিয়ার ফরাসি সরকার প্রমোদ গুনলেন। মোল্লাদের ওইসব কথার পেছনে যে কোন যুক্তি নেই, তা অধিবাসীদের বোঝাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে তাঁরা শঙ্কিত হলেন। এই বিপদের কথা জানিয়ে ফ্রান্সে খবর পাঠালেন। ফ্রান্সের ফরাসি সরকার দীর্ঘ আলোচনার পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে, সেনা পাঠিয়ে সাময়িক ভাবে দমননীতি চালানো গেলেও এটা কোন স্থায়ী সমাধান নয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন, চতুর মোল্লাদের প্রভাব নষ্ট করা। জনসাধারণকে বুঝিয়ে দিতে হবে মোল্লাদের কোন অলৌকিক ক্ষমতা নেই। ওরা এতোদিন শুধু মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে লোক ঠকিয়ে এসেছে।

ফরাসি সরকার এই কাজের ভার দিলেন ফ্রান্সের সেরা জাদুকর রবেয়ার উদ্যাকে। এতদিন শুধু চিত্ত বিনোদনের জন্যই উদ্যা তাঁর জাদুর খেলা দেখিয়েছেন। এবার দেশের জন্য অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন আলজিরীয় মোল্লাদের মুখোমুখি হলেন। দলবল নিয়ে আলজিরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্স শহরে হাজির হলেন। সেখানকার সেরা থিয়েটার হলে তাঁর জাদু প্রদর্শনের ব্যবস্থা হল। বিশেষ ভাবে আমন্ত্রিত হলেন শহরের বহু গ্ণ্যমান্য আরব মুসলমান ও মোল্লারা। ফরাসি জাদু দেখার ব্যাপারে অবশ্য জনসাধারণের খুব একটা উৎসাহ ছিল না। ওরা বিশ্বাস করত মোল্লাদের নানা ধরনের অলৌকিক কান্ডকারখানার ফরাসি জাদুকরের জাদু নেহাতই ছেলেখেলা।

কিছু খেলা দেখানোর পর উদ্যা light and heavy chest (হালকা ও ভারি বাক্স) খেলাটি দেখালেন। একটি ফরাসি সুন্দরী একটি ছোট্ট হালকা লোহার বাক্স লোহার পাটাতন পাতা মঞ্চে এনে রাখল। উদ্যা এবার মঞ্চে আহ্বান জানালেন উপস্থিত সেরা শক্তিমান দর্শককে। শহরের সেরা পালোয়ান বিশেষ আমন্ত্রিত হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অতএব তিনি উঠলেন মঞ্চে।

উদ্যা বললেন, “দেখো তো বাক্সটা তুলতে পারো কি না?”

পালোয়ান অতি তাচ্ছিল্যে তাঁর বাঁ হাত দিয়ে তুলে আবার নামিয়ে রাখলেন।

উদ্যা এবার পালোয়ানটিকে বললেন, ‘আমি আমার জাদুর বলে তোমার সব শক্তি কেড়ে নিচ্ছি।‘

উদ্যা কথা বলার সঙ্গে সজ্ঞে সম্মোহন করার বিশেষ ভঙ্গিতে দু’হাত নাড়তে লাগলেন। তারপর এক সময় বললেন, “এবার তোমার কোনও শক্তি নেই। তুমি বাক্সটা আর তুলতে পারবে না।“

পালোয়ান তাচ্ছিল্যভরে হাত দিলেন বাক্সের হাতলে, কিন্তু এ কি! উঠছে না তো! তাচ্ছিল্যের হাঁসি মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। সমস্ত শক্তি দিয়ে হেঁচকা দিলেন, কিন্তু বাক্সটা এক ইঞ্চিও উঠল না।

দর্শকের চোখে বিস্ময় ও আতঙ্ক। এমন দৈত্যের মত লোককে শিশুর চেয়েও দুর্বল করে দিয়েছেন জাদুকর।

উদ্যা এবার অলৌকিক শক্তি অধিকারী মোল্লা দর্শকের আহ্বান জানালেন পালোয়ানটিকে শক্তি ফিরিয়ে দিতে।

দর্শকদের একান্ত অনুরোধে স্টেজে উঠলেন শহরের দুই সেরা মোল্লাপীর। অনেক ঝাড়ফুঁক করলেন, কিন্তু তবুও পালোয়ানটি ঐ ছোট্ট লোহার বাক্সটা তোলার শক্তি ফিরে পেলেন না।

শেষ পর্যন্ত উদ্যাই তাকে শক্তি ফিরিয়ে দিলেন। দর্শকরা অবাক বিস্ময়ে দেখল, এবার পালোয়ান অবহেলায় বাঁ হাতেই বাক্সটা তুলে ফেললেন। কৃতজ্ঞতায় উদ্যার পায়ে মাথা ঠেকালেন পালোয়ান।

এরপর একের পর এক শহর ঘুরে উদ্যা তাঁর আশ্চর্য খেলা দেখিয়ে মোল্লাদের প্রভাবিত ভীত কাঁপিয়ে দিলেন। তারপর শুরু করলেন আর এক নতুন খেলা। আলজিরিয়দের বোঝালেন, এতোদিন ধরে তাঁর খেলাগুলো সকলে অলৌকিক বলে মনে করছেন, তার কোনটাই অলৌকিক নয়। সবই লৌকিক কৌশলের সাহায্যে দেখানো হয়েছে। উদ্যা এবার মোল্লাদের দেখানো নানা ভোজবাজির খেলা দেখিয়ে সেগুলো যে নেহাতই লৌকিক কৌশলে দেখানো হয় তা বুঝিয়ে দিলেন।

পালোয়ানের শক্তিহরণের খেলায় উদ্যা বৈদ্যুতিক চুম্বকের সাহায্য নিয়েছিলেন। মঞ্চের আড়ালে উদ্যার সহকারী ইশারা পেলেই বিদ্যুৎ-তরঙ্গ চালু করে দিতেন। বাক্সের তলার লোহা, মঞ্চের উপরের লোহার পাটাতনের সঙ্গে বৈদ্যুতিক চুম্বকের আকর্ষণে আটকে থাকত। সে লোহার মঞ্চের উপরই দাঁড়িয়ে বাক্সকে তোলা পৃথিবীর কোনও মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। কারণ, তখন বাক্স তুলতে হলে তাকে চুম্বকের আকর্ষণের চেয়েও বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে হবে।

মোল্লাতন্ত্রের ও কুসংস্কারের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে আলজিরীয়রা উদ্যাকে যে কতখানি ভালোবেসেছিলেন তা উদ্যাকে তাঁদের অভিনন্দন পত্রের প্রতিটি লাইনে ছড়িয়ে রয়েছে।

আলজিরিয়ার উদ্যার প্রয়োজন শেষ হলেও পৃথিবীর বহু দেশেই এমনকি আমাদের ভারতেও উদ্যার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়নি। কারণ-

আমরা অনেকেই প্রয়োজনমতো যুক্তিকে এড়িয়ে চলতে ভালোবাসি। ভালোবাসি কিছু কিছু কুসংস্কারের কাছে মাথা নোয়াতে। চমক লাগানো গল্প বলতে ভালোবাসি। পরের মুখে শোণা ঘটনাকে নিজের চোখে দেখা সত্য ঘটনা বলে জাহির করার তীব্র লোভের শিকার হই। মেই তীব্র লোভ থেকেই জন্ম নেয় বহু অতিরঞ্জিত কাহিনী। যা অনেক সময় বহু কথিত হওয়ার ফলে আমরা বিশ্বাসও করে ফেলি।

এই সুযোগে ম্যাজিকের ওপর একটা গুল-গল্প শোনাই আপনাদের।

এক বিখ্যাত ম্যাজিশিয়ানের ম্যাজিক দেখতে এসে দর্শকরা একটু একটু করে অধৈর্য হয়ে উঠছেন, শো’র সময় কখন পার হয়ে গেছে, অথচ তখনও ম্যাজিশিয়ানের দেখা নেই।

অধৈর্য জনতা যখন ক্ষুব্ধ, সেই সময় মঞ্চের পর্দা উঠল। জাদুকর হাসিমুখে এসে দাঁড়ালেন। কয়েকজন ক্ষুব্ধ দর্শক জাদুকরের কাছে দেরি করার কৈফিয়ত দাবি করতেই জাদুকর অবাক চোখে নিজের ঘড়ি দেখে বললেন, “এক মিনিটও তো দেরি করিনি।“

যাঁদের হাতে ঘড়ি ছিল তাঁরা সকলেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে বোবা হয়ে গেলেন। প্রত্যেকের ঘড়িই একটু আগে দেখা সময় থেকে দেড় ঘণ্টা পিছিয়ে গেছে। এমন এক অসাধারণ খেলা দিয়ে ম্যাজিক শুরু হতে দেখে দর্শকরা প্রচন্ড হাততালি দিয়ে অভিনন্দন করলেন জাদুকরকে।

ম্যাজিক নিয়ে এই গণসম্মোহনের গল্পটা বহু প্রচলিত, মূল গল্পের কাঠামো প্রতিটি ক্ষেত্রেই এক। যে জাদুকরদের নিয়ে এই ধরণের কিংবদন্তি বা আষাঢ়ে গল্প বিভিন্ন সময়ে দারূনভাবে চালু হয়েছিল, তাদের মধ্যে রয়েছে ভারতীয় জাদুকর গণপতি, রাজা বোস, রয়-দি মিসটিক এবং জাদু পি সি সরকার। বিশ্বে যাকে নিয়ে এই আষাঢ়ে গল্প শুরু হয়েছিল তিনি এক মার্কিন জাদুকর হাউয়ার্ড থার্সটন।

এই গণসম্মোহনের জাদু এঁরা কোনদিনই দেখান নি। কারণ, দেখানো সম্ভব নয়। অথচ, ভাবতে অবাক লাগে, আজও অনেকেই বিশ্বাস করেন এই বিস্ময়কর জাদুর খেলা বিভিন্ন জায়গায় দেখানো হয়েছে এবং অনেক প্রত্যক্ষদর্শী এখনো আছেন। দোষ এইসব বিশ্বাসকারীদের নয়। দোষ সেইসব আষাঢ়ে গল্পবাজদের, যারা শোনা গল্পকে নিজের চোখে দেখা বলে চালিয়েছেন।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x