১৩৫১ সালের কথা। চর বাড়ীয়া ইউনিয়নের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গাউয়াসার নিবাসী মৌঃ মোহাম্মদ আলী খান সাহেবের প্রথমা কন্যা শিরিন বেগমের বিবাহ। ইউনিয়ন বোর্ডের সদস্য এবং বন্ধু হিসাবে আমার নিমন্ত্রণ, মানী হিসাবেও। বহু লোকের সমাগম। কিন্তু অধিকাংশই আমার অপরিচিত। তথাপি একটি ছেলের চাল-চলন আমার দৃষ্টিকে আকর্ষণ করছিল। পরিচয় নিয়ে জানতে পারলাম যে, তিনি সাপানিয়া নিবাসী মুন্সি হাতেম আলী কাজী সাহেবের জ্যেষ্ঠ ছেলে, নাম কাজী গোলাম কাদির।

মুন্সি সাহেব আমার পুরানো বন্ধু। ইউনিয়ন বোর্ড, ঋণসালিশী বোর্ড, জুট কমিটি, ফুড কমিটি ইত্যাদি ইউনিয়নের বহু প্রতিষ্ঠানের সদস্য রূপে উভয়ে এক যোগে কাজ করেছি বহুদিন। মুন্সি সাহেব সময় সময় আমার কাছে বলতেন তার এই ছেলেটির লেখা-পড়ার একাগ্রতা ও চারিত্রিক বৈশিষ্টের কথা। তাঁর এ ছেলেটি নাকি স্বল্প ভাষী, ভাবগম্ভীর ও নির্জনপ্রিয়। ছেলেটি এ বছর বরিশালের বই, এম কলেজে দর্শন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র।

বিবাহের চারদিন পূর্বেই আমি সে বাড়িতে গিয়েছিলাম এবং দরজা বৈঠকখানা সাজাবার কাজে ব্যতিব্যস্ত ছিলাম। বিবাহের দিনও বরযাত্রী আসবার ও তাদের খানাপিনার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত এদিক সেদিক তাকাবার আমার ফুসরত ছিল না। আহারান্তে রাতে নিরবিলি হলাম।

বিবাহ বাড়ির দরজায় বিরাট সামিয়ানা টানানো হচ্ছিল এবং তার নিচে টেবিল-চেয়ার পাতা ছিল অনেক। আমি কাজী গোলাম কাদিরকে ডেকে এনে পূর্ব পূর্ব প্রান্তের এমন একটি টেবিল ঘিরে বসলাম, যেখানে কোন লোক সমাগম ছিল না। যদিও আমরা উভয়ে ওখানে ৪-৫ দিন যাবত অবস্থান করছিলাম, তথাপি কর্ম ব্যস্ততার দরুন পরিচয় জ্ঞাপক ছিটে ফোটা আলাপ ছাড়া কোন বিশেষ আলোচনার সুযোগ পাই নাই। মনে পড়ে রাত দশটায় আমাদের আলোচনা শুরু হ’ল।

আমাদের আলোচনার বিষয় সমূহ কি ছিল, তা পরিষ্কার ভাবে স্মরণ না থাকলেও উহা যে বিবিধ তত্ত্বমূলক ছিল, তা স্মরণ আছে। আলোচনা চলছিল প্রশ্নত্তরে। কিন্তু উহা এতোই গভীর ও ব্যাপক রূপে চলছিল যে, আলোচনা সমাপ্তির পূর্বেই মসজিদে ফজরের আজান পড়ল। আমাদের রাত ভর আলোচনা সমূহ দূর থেকে লক্ষ্য করছিলেন এক ব্যক্তি। তিনি হলেন মৌঃ মোহাম্মদ আলী খাঁ। ভোরে রসিকতা করে তিনি আমাকে বললেন- “মাতুব্বর সাব! কাদেরের সাথে বাজে কথায় রাতটা না কাটায়ে বরং তাস খেলে কাটালে লাভ হ’ত বেশি।

দুজন অপরিচিত ব্যক্তির প্রাথমিক পরিচয়ে আলোচনা যে এতোধিক ব্যাপক হতে পারল, তার কারণ বোধ হয় এই যে, জগত ও জীবন সম্পর্কে আমি যে সমস্ত প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলাম, তার যথাযথ সমাধান করা অনেক প্রধান শিক্ষাবিদের পক্ষেও সম্ভব ছিল না। অথচ শিক্ষোন্মুখ একজন তরুণের মুখে ওসবের বিজ্ঞান ভিত্তিক সুষ্ঠু সমাধান পেয়ে আমি বিস্মিত হচ্ছিলাম, যার ফলে আলোচনা বাড়ছিল। পক্ষান্তরে- একজন অশিক্ষিত কৃষকের মুখে এ ধরনের আলোচনা শুনে বোধ হয় যে তিনিও আমার মনো রাজ্যের অলিগলি পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় আলোচনা বাড়াচ্ছিলেন। ফলতঃ এ দিনের আলোচনার মাধ্যমেই আমাদের উভয়ের মানসিক পরিচয় হয়ে গেল। জানতে পেলাম যে, এ বছর বি,এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে কাজী সাহেব এম,এ ডিগ্রী লাভের জন্য কলকাতায় যাবেন।

কাজী সাহেবের সাথে আমার দ্বিতীয় বার সাক্ষাৎ ঘটে ১৩৫৪ সালে, তিনি এম, এ ডিগ্রী লাভ করে দেশে ফেরার পর। চর বাড়ীয়া ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মোঃ মোহাম্মদ আলী খান ছিলেন একজন গুণী ব্যক্তি। তাই তিনি গুণীদের যথোপযুক্ত সম্মান প্রদান করতে জানতেন। কাজী গোলাম কাদির সাহেব চরবাড়ীয়া ইউনিয়নের সর্ব প্রথম এম, এ ডিগ্রী প্রাপ্ত যুবক। তাই তার যথোপযুক্ত সম্মান ও ইউনিয়নবাসী অন্যান্য যুবক (ছাত্র)দের উৎসাহ প্রদানের উদ্দেশ্যে তিনি এক মহতী সভার আয়োজন করলেন কাগাশুরা হাই স্কুল প্রাঙ্গণে। এই সবায় বহু উচ্চ শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি উপস্থিত থাকা স্বত্বেও তাঁর প্রস্তাবের সমর্থনে আমাকে দান করা হয় সভাপতির আসন ও মর্যাদা এবং কাজী গোলাম কাদিরকে দান করা হয় পূষ্পমাল্য ও অভিনন্দন পত্র।

সামান্য বিষয় নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করাটা আমার একটা স্বভাব। হয়তো কখনো চিন্তা সাগরে ভেসে যেতাম বহু দূরে। কিন্তু কূল পেতাম না, শুধু হাবুডুবু খেতাম আর ভোগ করতাম নৈরাশ্যের মানসিক যাতনা। আমার তাত্ত্বিক চিন্তা জগতের সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত “আমি”। “আমি” হতেই আমার প্রাথমিক ভাবনার শুরু। যেমন- “আমি” কে? “আমি” পূর্বে কোথায় ছিলাম? “আমি” পরে কোথায় যাবো? “আমি” আছি কেন? “আমি” থাকবো না কেন? আমার কেহ সৃষ্টিকর্তা আছেন কি-না?  থাকিলে সে কোথায় এবং কি রূপ? ইত্যাদি। এ ভাবনাটা শুধু “আমি” তে সীমাবদ্ধ না রেখে সমস্ত মানুষ, জীব ও বিশ্বের প্রতি আরোপ করা হলে, দেখা যায় যে, আমার ভাবনার মৌলিক বিষয় থাকে তিনটি। যথা- জীবম জগত ও ঈশ্বর।

১৩৫৪ সালে কাজী গোলাম কাদির সাহেব বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে (দর্শন বিভাগে) অধ্যাপক পদে নিয়োজিত হলেন এবং আমি এই সময় হতে তাঁর কাছে যাতায়াত করে উপরোক্তরূপ বহুবিধ তত্ত্বমূলক সমস্যার সমাধান কল্পে আলাপ আলোচনা করতে লাগলাম।

আমার বহু প্রশ্নের যথাথ উত্তর বা দার্শনিক সমাধান আমি কাজী সাহেবের কাছে পেয়েছি। আর আশ্বাস পেয়েছি যে, দর্শনের পথ ধরে এগুতে থাকলে ভবিষ্যতে আরো বহু সমস্যার সমাধান পেতে থাকব। বাংলা ভাষায় দর্শনের পুস্তকাদি বেশি পাওয়া যায় না। তথাপি কাজী সাহেব আমাকে কয়েক খানা পুস্তক সংগ্রহ করে দিলেন। যথা- ন্যায় দর্শন, গ্রীক দর্শন, দর্শনের রূপ ও অভিব্যক্তি, মায়াবাদ ইত্যাদি। আমি কাজী গোলাম কাদির সাহেবের নিকট দর্শনে দীক্ষা নিলাম। (১০/৮/৫৪ বাং)।

বন্ধু পুত্র ও বয়ঃকনিষ্ঠ বলে কাজী গোলাম কাদির আমার পুত্রতুল্য। কিন্তু জ্ঞানের মাপকাঠিতে তিনি বৃদ্ধ পিতৃতুল্য এবং শিক্ষক হিসাবে তিনি আমার গুরুস্থানীয়। সুতরাং তিনি আমার শ্রদ্ধার পাত্র। আমার জীবনের মানোন্নয়নের একটি প্রধান অবলম্বন তিনি। তাঁর আন্তরিক সহানুভূতি ও সহযোগিতা না পেলে হয়ত আমার জীবন প্রবাহের গতি অন্য দিকে চলে যেত। বিশেষতঃ আমার কলমের চরিত্র সংশোধন করেছেন তিনি … আমার বাড়ি হতে সাপানিয়া কাজী বাড়ির দূরত্ব প্রায় ছয় মাইল। বরিশালে বাড়ি কেনার পূর্বে কাজী সাহেব বাড়ি হতেই যাতায়াত কলেজে যাতায়াত করতেন তাই কোন ছুটি ছাটা বা সাপ্তাহিক বন্ধে- কোন রূপ জিজ্ঞাসা বা টুকিটাকি লেখা নিয়ে আমি বহুদিন কাজী সাহেবের বাড়িতে গিয়েছি এবং যতবারই গিয়েছি, ততবারই তাঁর সাদর সম্ভাষণ ও আলোচনার আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ হইয়েছি। বিশেষতঃ সকল রকম জিজ্ঞাসার আশানুরূপ ফল লাভ করেছি। কোন কোন সময় আমাদের আলোচনা একটানা দু-তিন ঘণ্টা ধরে চলত। ইহা দেখে শুনে তাঁর আব্বা আমার কাছে জিজ্ঞাসা করতেন- “মাতুব্বর সাহেব! কাদের পড়ার কারো সাথে কোন রূপ আলাপ আলোচনা করে না সব সময় লোকের সমাগম বা সংশ্রব থেকে দূরে থাকতে চায়। এমন কি কলেজ হতে বাড়িতে এসে সামনের বারান্দায় কোন লোক-জন থাকলে সে পিছনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢোকে, দেখা পেলে লোকেরা তার সাথে আলাপ করবে সেই ভয়ে। আর আপনার সাথে আলোচনায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করে কেন? আমি তাঁকে বলতাম যে, ওটা তাঁর অহংকার-নয়, বাজে কথায় সময়ের অযথা অপচয় না করার প্রচেষ্টা মাত্র। আপনার ছেলেটি তার রুচি সম্মত আলোচনায় সর্বদাই উৎসাহী।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x